somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আগুন পৃথিবী [গল্প] - শেষ পর্ব

১২ ই জুন, ২০০৮ বিকাল ৩:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পর্ব ১
পর্ব 2


এবারে বাসটায় একটা গুন্জন পাকিয়ে উঠলো৷ অনেকেই মেয়েটিকে বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলো৷ মেয়েটি অবশ্য শীতল মুখে তর্ক করে যাচ্ছিলো৷ শফিক তিক্ত মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকলো৷ একটু আগের রোমান্টিক কল্পনার জন্য এখন প্রচন্ড লজ্জা লাগতে লাগলো৷ শালার পৃথিবী!

বাংলাদেশে একটি মেয়ে বড় হয় অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে, অনেক সামাজিক অনুশাসনের মধ্য দিয়ে৷ এই সব অনুশাসনের মধ্যে থেকে থেকে অনেক মেয়েরই পুরুষদের প্রতি মনোভাব এই মেয়েটির মত হয়ে ওঠে৷ সে জন্য তাদেরকে দোষ দেয়া যায় না৷ কিন্তু যুক্তির বিচারে দোষ দেয়া না গেলেও শফিকের রাগ কমছিলো না৷ রাগে তার মাথা জ্বলে যাচ্ছিলো৷

শাহবাগের কাছাকাছি আসতেই একটা উত্তেজনার অস্তিত্ব টের পাওয়া গেলো৷ একটা আধলা ইট ছুটে এসে আছড়ে পড়ে বাসের সামনের উইন্ডশিল্ডের উপর৷ যে জায়গাটায় ইটটা আছড়ে পড়ে, সে জায়গাটাকে কেন্দ্র করে নিখুঁত একটা জালের সৃষ্টি হয় উইন্ডশিল্ডের উপর৷ বাসটা দুম করে দাঁড়িয়ে পড়ে৷ আরো কয়েকটা ইট চারদিক থেকে ছুটে এসে আঘাত করে বাসটার গায়ে৷ বাসের ভীতর হুড়োহুড়ি পরে যায়, সবাই যে যার মত দৌড়ে বের হয়ে যাবার চেষ্টা করে বাস থেকে৷ কয়েকজন জানালা গলে লাফ দিয়ে পরে৷ বাকিরা জটলা পাকায় দরজায়, প্রানপন চেষ্টা করতে থাকে বাস থেকে বের হয়ে যাবার৷

অনেক কষ্টে বাস থেকে বের হয় শফিক৷ রাস্তায় একদল ছেলেকে দেখা যায় লাঠিসোটা হাতে গাড়ি ভাঙতে ব্যস্ত৷ ঘটনা কি হয়েছে ঠিক বোঝা যায় না৷ ইউনিভার্সিটিতে কোন গন্ডগোল হয়েছে নাকি? কোন নেত্রী কি গণতান্ত্রিক হরতালের ডাক দিয়েছেন? সরকারের কোন কাজ নিয়ে তারা কি অসন্তুষ্ট? নাকি আল্লা মালুম কি হয়েছে! শফিক খুব একটা কৌতুহল বোধ করে না৷ এই দেশে প্রিয় দল ফুটবল খেলায় হেরে গেলেও রাস্তায় গাড়ি ভাঙচুর হয়৷

একদল ছেলে দৌড়ে এসে তাদের বাসটায় আগুন দিতে ব্যস্ত৷ একটু পরেই একটু আগে যে বাসটায় তারা এসেছিলো, সেটা দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে৷ 'সেই মেয়েটা গেলো কই? সে কি নামতে পেড়েছিলো ঠিক মত?' ভাবে শফিক৷ ভাবতেই মনের তিক্ত ভাবটা আবার জেগে ওঠে৷ 'ধুত্তোর যাগগে যেখানে খুশি, আমার কি?'

শফিক আর দাঁড়ায় না সেখানে৷ একপাশ ধরে রাস্তা পার হয়ে বারডেমের পাশ দিয়ে শিশু পার্ক ডাইনে রেখে রমনা পার্কের দিকে হাঁটতে থাকে সে৷ গরমে টপ টপ করে ঘাম ঝরতে থাকে৷ ধুত্তোর ভাল্লাগে না আর এই জীবন! প্রতিদিন সেই একঘেয়ে কাজ করে যাওয়া৷ সকালে দীর্ঘক্ষন বাসের লাইনে দাঁড়িয়ে অফিসে যাওয়া, অফিস শেষ করে আবার দীর্ঘ লাইনের পর বাস ধরে বাসায় ফেরা৷ সেই একই রুটিন৷ বড় বেশি একঘেয়ে জীবন৷ হাঁটতে হাঁটতে শফিক অনুভব করে, বেঁচে থাকাটা বড় বেশি অর্থহীন৷ কোন অর্থ নেই এই বেঁচে থাকার৷ হয়তো ছোট বা বড় সাফল্যের পিছনে ইঁদুর দৌড়, যৌনতা, বিয়ে, সংসার, বাচ্চা কাচ্চা ক্যাওভ্যাও, সব বড় বেশি একই রকম ছকে বাঁধা৷ বড় বেশি অর্থহীন!
রমনা পার্কের গেটে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায় সে৷ রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে৷ সব গাড়ি অন্য পথ ধরে যেতে শুরু করায় রাস্তা ফাঁকা৷ উত্তপ্ত রোদে ফাঁকা পিচঢালা পথ, ঢাকা শহরের বুকে এরকম খুব কম দেখা যায়৷ ধোঁয়া ছেড়ে সেই অন্যরকম দৃশ্যটা দেখতে থাকে সে৷

পার্কের ভীতরে লেকের পাড়ে একটা বেন্চে বসলো শফিক৷ শাহবাগের উত্তেজনার চিহ্নমাত্র এখানে নেই৷ চারদিক শান্ত, নীরব৷ বসে বসে আবার ঝিমুনি আসে তার৷ হঠাৎ খিলখিল হাসির শব্দে চটকা ভেঙে পাশে তাকায়৷
পাশের বেন্চটায় একজোড়া কপোত কপোতী বসে৷ মেয়েটি হাসছে খিলখিল করে৷ তার মুখ শফিকের দিকে ফেরানো৷ মেয়েটিকে দেখে বুকের ভীতর চিনচিন একটা ব্যাথা টের পায় শফিক৷ এত সুন্দর? এইসব মেয়েরা থাকে কোথায়?

মেয়েটি বোধহয় তার কপোতকে কিছু বলে, সে মুখ ঘুরিয়ে শফিকের দিকে তাকায়৷ শফিকের মুখটা আবার তিক্ততায় ভরে যায়৷ আহ, কান্ড দেখো শালার! এই মেয়ে এই খাটাশটার সাথে কি করছে? এই ছেলের আছে কি? চেহারা দেখলে ডারউইনের থিওড়ি সত্যি বলে মনে হয়৷ তা সেটা নাহয় বাদ দেয়া গেলো, কিন্তু রুচির কি ছিড়ি, দেখলেই মনে হয় মালোশিয়ায় হাড়ি ঠেলে৷ অথচ মেয়েটাকে দেখো, দেখলে মনে হয় স্বর্গের অপ্সরা৷ জামা কাপড় বা মুখ দেখে তার রুচির সাথে এই ছেলের রুচিরতো কোন মিল পাওয়া যায় না, তবে সে এই ছেলের সাথে ভেড়ে কি করে? শালা দুনিয়াটা বড়ই গোলমেলে জায়গা!

তিক্ত মুখে তাকিয়ে থাকে শফিক৷ কেমন পাগল পাগল লাগে৷ অস্থীর লাগতে থাকে ভীতরটায়৷ কাউকে খুন করতে ইচ্ছে করে খুব!

মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সামনে তাকায় সে৷ সামনে লেকের পাড়টা ঢালু হয়ে নেমে গেছে, সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ঘাসের মধ্যে একটা ছুরি পরে থাকতে দেখে৷ চমকে ওঠে সে৷ লম্বা, চকচকে, ধারালো একটা ছুরি, যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে৷ শফিকের দু'চোখ চকচক করতে থাকে উত্তেজনায়৷

(সমাপ্ত)

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০০৮ দুপুর ১:১৫
১৪টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×