ঘ্যাচ করে সিএনজি ক্যাবটা থেমে যাওয়ায় ভয় পেয়ে গেল আলীবাবা। যা ভেবেছে তাই-গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। এরকম একটা নির্জন-ব্যাকওয়ার্ড জায়গায় এসে ক্যাবের গ্যাস ফুরিয়ে যাবে কিছুতেই ভাবেনি আলীবাবা। আসলে সকাল বেলা বউয়ের সঙ্গে করে বের হওয়াতে আজ মেজাজটাই বিগড়ানো ছিল। তাই লং জার্নির আগে বেশি করে গ্যাস নিতে ভুলে গিয়েছিল। এক গ্যাস সমস্যা আর ঠিক এই মুহুর্তে আলীবাবার টয়লেট চাপল। তাও আবার শুধু এক নাম্বার নয় দুই নাম্বার। উপায় না দেখে একটা গাছের আড়ালে সিএনজিটাকে ঠেলে পার্ক করল। এর পর চীপার খোজে পা বাড়াল আলীবাবা। উদ্দেশ্য আর কিছুই না, স্রেফ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া। একটা পাথুরে দেয়াল দুই টিলার মাঝামাঝি একটা জুতসই জায়গা দেখে বসে পড়ল আলীবাবা। কর্মআধাআধি সারবার পরই বিকট শব্দে চমকে উঠল আলীবাবা। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল একটা উড়ন্ত সসার এদিকেই আসছে। আলীবাবা কী করবে না করবে তার আগেই তার কাছে ল্যন্ড করল সসারটা। ততনে আলীবাবা ত্যাগকর্ম সম্পাদন করলেও সেখান থেকে না সরে আরএকটু আড়ালে গিয়ে ঘটনাটা কি ঘটে তা দেখতে থাকে। সসারটা থামতেই ওটার ভেতর থেকে কতগুলো ষন্ডামার্কা লোক বেরিয়ে এল। নেমেই এরা সবাই গোল হয়ে দাড়ালো। আলীবাবা গুনে দেখল সংখ্যায় এর ৪০জন। আলীবাবা ঘটনার আগামাথা কিছুই বুঝল না তবু চাতক পাখির মতো চেয়ে রইল। ওই লোকগুলোর পোশাক আশাক একই রঙের মতো না হলেও সবার মাথাতেই হিমেল রেশামিয়ার মতো একই রঙের ক্যাপ আছে। আর সবার হাতে একই মোবাইল সেট শোভা পাচ্ছে। ১৫-২০ জনের কোমরে পিস্তলের হোলস্টারে পিস্তল দেখে আলীবাবা বুঝতে পারল লোকগুলো ভালো নয়। সবাই গোল হয়ে দাঁড়ানোর পরই কথাবার্তা শুরু হয়ে গেল। একজন বলল - বস, কাজ শুরু করে দেব নাকি।
: হু, তা তো করতেই হবে। বসের কথা শেষ না হতেই আরেকজন বলে উঠল-
: আচ্ছা, এক বিচ্ছিরি দর্গন্ধ কিসের? একেবারে মানুষের ইয়ের মতো? ষণ্ডাটার কথা শুনেই আলীবাবার বুকটা ধক্ করে উঠল। কারণ এই মহান কর্মটা যে তারই করা!
: আরে কোথায় দুর্গন্ধ? কিছুই না। জলদি কাজ শুরু কর। আরেকটা ষণ্ডা ব্যাপারটাতে পাত্তা দিল না বলে এ যাত্রায় বেঁচে গেল আলীবাবা। এরপর ওদের বস একজনকে লক খোলার নির্দেশ দিল। আলীবাবা ল করল একজন লোক একটু কোণার দিকে এগিয়ে গেল। সেদিকে গিয়ে লোকটা একটা বড় পাথর সরাল। পাথরের নিচ থেকে একটা চাবি বের করল। এবার ওই চাবিটা দিয়ে ওইখান থেকে হাত তিনেক দূরে একটা ঢাকনা খুলল লোকটি। আলীবাবা বুঝল ওটা একটা বাক্স। সেই বাক্স থেকে লোকটি কী যেন একটা বের করল। একটু পরেই জিনিসটাকে চিনতে পারল আলীবাবা।
ওটা আসলে একটা রিমোট কন্ট্রোলার। রিমোট কন্ট্রোল হাতে লোকটা এগিয়ে গিয়ে সেই পাথরের দেয়ালের পাশে একটা টিলার সামনে দাঁড়াল। এরপর বলল-
: বস কোডটা যেন কত?
: ফোর টুয়েন্টি ফোর টুয়েন্টি।
আলীবাবা ও মনে মনে উচচ্চারণ করল কথাটা । এর মধ্যেই আলীবাবা অবাক হয়ে ল করল সেই টিলাটা দুই ভাগ হয়ে গেছে। ভেতরে কিছুটা অন্ধকার। অন্যদিকে বাকি লোকগুলো সসার থেকে গোল গোল কী যেন নামতে শুরু করেছে। কিছুণ পরই জিনিসগুলো চিনতে পারল আলীবাবা। ওগুলো সব ম্যানহোলের ঢাকনা। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে পৃথিবীতে হঠাৎ করেই লোহার ঘাটতি দেখা দেয়ায় লোহার দাম এখন সোনার মতো অনেক বেড়ে গেছে। এ কারণেই লোহা নিয়ে চারদিকে এত বেশি টানাটানি। কিন্তু এত সংখ্যক ম্যানহোলের ঢাকনা লোকগুলোর কাছে কিভাবে এল? আলীবাবা বুঝল এরা নিশ্চয়ই ঢাকনা চোর। এদের নিয়েই ভাবছিল আলীবাবা। হঠাৎ মশার কামড় খেয়ে আলীবাবা নড়ে উঠল। আর নড়ার ফলে তার বাঁ পায়ে ময়লা লেগে গেল। দারুণ বিব্রতকর অবস্থর মদ্যে পড়েও এতটুকু নড়ল না আলীবাবা। প্রায় আধা ঘন্টা ধরে ওরা সসার থেকে ঢাকনা নামাল। এরপর ওরা সেই গুহার ভেতর কিছুক্ষণ সময় কাটাল। গুহা থেকে বেরিয়ে সবাই সসারে উঠে গেল। কেবল একজন লোক রিমোটটা দিয়ে দরজা বন্ধ করে সেটাকে একটা বাক্সের মধ্যে রেখে তালা দিয়ে দিল। আর চাবিটাকে পাথর চাপা দিয়ে সেও সসারে উঠে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই আকাশে উড়তে লাগল সসার। আলীবাবাও গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। প্রথমেই সে তার ময়লা লাগা পা-টাকে ওয়াশ করল। তারপর দুরু দুরু বুক নিয়ে পাথরচাপা চাবিটা বের করল। সেই লোকটার মতো করে চাবিটা দিয়ে পাশের বাক্সটা খুলে রিমোটটা বের করল আলীবাবা। এরপর সেই টিলারূপী গুহামুখের সামনে এগিয়ে গেল আলীবাবা। সিএনজির ড্রাইভার হলেও আলীবাবা ক্লাস এইট পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। তাই রিমোটটা হাতে নিয়ে সাহস করে ফোর টুয়েন্টি ফোর টুয়েন্টি বোতাম চেপে 'ইয়েস' বাটন চাপল আলীবাবা। সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল সেই রহস্যময় টিলার দরজা। ভেতরে ঢুকেই অবাক হয়ে গেল আলীবাবা। প্রচুর ম্যানহোলের ঢাকনা আর সোনাদানা থরে থরে সাজানো। পাশেই একটা কাঠের খোলা আলমারীর মতো তাকে প্রচুর টাকার বান্ডিল সাজানো।
আলীবাব যতগুলো সম্ভব ততগুলো টাকা তার গাড়িতে উঠাল। বেশ কয়েকটা ঢাকনাও সে গাড়িতে তুলে নিল। কিন্তু গ্যাস ছাড়া গাড়ি চলবে কী করে? চিন্তায় পড়ে গেল আলীবাবা তখনি হঠাৎ গুহার কোণায় রাখা একটা কনটেইনারের দিকে চোখ পড়ল আলীবাবার। প্রায় দৌড়ে গিয়ে কনটেইনারের ছিপি খুলে গন্ধ শুঁকে আলীবাবা বুঝল এটা পেট্রোল। আলীবাবার সিএনজি ডুয়েল লাইন করা। গ্যাসেও চলে তেলেও চলে। তেল ঢেলে স্টার্ট দিতেই দেখল সব ঠিক আছে।
এরপর আলীবাবা আবার গুহায় ঢুকে কনটেইনারটা জায়গামতো রেখে বাইরে এসে ফোর টুয়েন্টি ফোর টুয়েন্টি চেপে দরজা বন্ধ করে দিল। প্রথমে রিমোটটাকে বাক্সবন্দী করার পর চাবিটাকে পাথরচাপা দিয়ে গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরল আলীবাবা। সে দিনই দ্বিতীয়বারের মতো সেখানে গিয়ে ইচ্ছামতো গাড়ি ভরে টাকা-পয়সা আর ধনসম্পদ নিয়ে এল আলীবাবা।
এ ঘটনার পর রাতারাতি বদলে গেল সিএনজি ড্রাইভার আলীবাবার অবস্থ। সিএনজি ছেড়ে আলীবাবা লিমুজিন হাঁকায়। পাড়া-প্রতিবেশীর পাশাপাশি ব্যাপারটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও নজর এড়াল না। ফলে র্যাবের এক সোর্সকে রহস্যের কুলকিনারা করার জন্য নিয়োগ দেয়া হলো। সেই সোর্সের আবার প্রেম ছিল আলীবাবার সুন্দরী কন্যা মর্জিনার সঙ্গে। ফলে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিল। র্যাবের সোর্স কুদ্দুস প্রেমিকা মর্জিনাকে তার মিশনের ব্যাপারটা বলে ফেলল। এরপর মর্জিনাকে বাপ আলীবাবাও কুদ্দুস আলীকে পুরো ঘটনা খুলে বলল। সব শোনার পর কুদ্দুস জানাল এরা হচ্ছে ৪০ চোরের একটা গ্যাং। লোহার দাম বেড়ে যাওয়ার পর থেকে এরা ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করছে আর সবখান থেকে লোহা লুট করছে। দীর্ঘদিন থেকে পুলিশ এদেরকে খুঁজছে। কিন্তু আলীবাবা এদের খোঁজ পাওয়ার পরও পুলিশকে না জানিয়ে অন্যায় করে ফেলেছে। শেষে মর্জিনা কেঁদে-কেটে কুদ্দুসকে এ বিষয়টার একটা বিহিত করার অনুরোধ করল। কুদ্দুস তার বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টা আলাপ করল। কর্তৃপক্ষ আলীবাবাকে সাহায্য করবে তখনোই যখন আলীবাবা কর্ত"পকে ঠিকানা পর্যন্ত নিয়ে যাবে। মা পাওয়ার আশায় আলীবাবা এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। আলীবাবা র্যাবের বিশাল বাহিনী নিয়ে ওই স্থনে উপ¯ি'ত হলো।
এরপর আগের মতো করে সেই রহস্যময় দরজা খুলে দিল। প্রথমেই র্যাব তাদের হেলিকপ্টার দিয়ে গুহার টাকা-পয়সা, ম্যানহোলের ঢাকনাসহ সবকিছু সরিয়ে ফেলল। তারপর এই আস্তানার বিভিন্ন কোনায় সাতটি শক্তিশালী বোমা সেট করে রেখে র্যাবের একটি ইউনিটকে চোরদের অপোয় রাখা হলো। নির্দেশ দেয়া হলো যখনই চোরেরা গুহায় প্রবেশ করবে তখনই রিমোর্ট চেপে গুহাটা বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে হবে। এক দিন-দুই দিন কেটে গেল কিন্তু চোরেরা আর আসে না। কুদ্দুসের নেতৃত্বাধীন র্যাবের ইউনিট অপে করতে করতে বিরক্ত হয়ে পড়ল। তৃতীয় দিন বেলা ১টার দিক একটা সসার এসে থামল গুহার সামনের দিকের সমতল জায়গায়। নড়েচড়ে উঠল র্যাবের ইউনিট। সবাই কানে তুলা গুঁজে নিল।
শুরু হলো অপোর পালা। ধীরে ধীরে ওরা সবাই সসার থেকে নামল।এদের মধ্য থেকে একজন এগিয়ে গিয়ে রিমোট বের করে দরজা খুলল। এদিকে কুদ্দুস বাহিনীও রিমোট হাতে রেডি। গুহার দরজা খুলতেই একজন ভেতরে চিৎকার করে ওঠল। সম্ভবত গুহা খালি দেখে। সে বাইরে এসে ব্যাপারটা সবাইকে জানাতেই সবাই একযোগে গুহার দিকে ছুটল। শেষ চোরটা গুহার ভেতর প্রবেশ করতেই কুদ্দুস বাহিনী বোম ফাটাল। ব্যস ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেল গুহাটি। আর মানুষগুলোও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। আলীবাবা মেয়ে মর্জিনার সঙ্গে কুদ্দুসের বিয়ে হয়ে গেল। যৌতুক হিসেবে আলীবাবা কুদ্দুসকে মূল্যবান ১০টি ম্যানহোলেন ঢাকনা প্রদান করে। অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


