সকল চিন্তা ঝেড়ে হাটায় মন দেন তিনি। ঘড়িতে বাজে মাত্র ছটা অথচ এরই মধ্যে চারিদিক রীতিমত অন্ধকার। তারমাঝে আবার তাকে যেতে হবে ভুতুরে শিমুলগাছটার নিচ দিয়ে। স্কুল থেকে তার বাড়ির দুরত্ব অনেকখানি আর পথের মাঝেই পড়ে গাছটা যাতে একটা ভুত পরিবার বাস করে বলে গুজব আছে। অবশ্য এসব চকদার স্যার একদম পাত্তা দেন না। বরং এখন তার চিন্তা বৃষ্টি নিয়ে, পিনপিন করে পড়া বৃষ্টি এবার ঝুমঝুমে রূপ নিয়েছে। ওইতো, একটু দুরেই বিশাল পুরনো গাছটা। জোরে হেটে গিয়ে ওর নিচে আশ্রয় নিলেন তিনি। গাছের বিশাল ডালপালা বৃষ্টিকে প্রায় আটকে দিয়েছে। গাছের কান্ডে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে ফুসে ওঠা খোয়াই নিয়ে ভাবতে লাগলেন তিনি। খেয়ালই করলেন না আশেপাশে একটু ফোটা ফোটা পানি ডালপালা ফাকি দিয়ে পড়লেও আশ্চর্যজনক ভাবে তার উপর একটুও পড়ছে না। তার চিন্তার সুত্র ভাঙল তখনই যখন তিনি তার কাধে একটা ভারী বোঝা অনুভব করলেন। অন্যমনস্কভাবেই কাধে হাত দিতে চাইলেন চকদার স্যার। ওমনি কে যেন কিনকিনে কন্ঠে কথা বলে উঠল, 'কাধে হাত দিবেন না স্যার'।
ভ্যাবাচেকা খেয়ে উঠলেন চকদার স্যার। এদিকওদিক তাকিয়ে কঠিন স্বরে বললেন,
-'কে কথা বলল?'
-'আমি।'
-'আমি কে?'
-জ্বি, আমি কিকির।'
একটু যেন বিরক্ত হলেন এবার তিনি।
-'কিকির কে?'
-'জি, আমি ভূতের বাচ্চা। আমার বাবার নাম মিকির, উনি জন্মগ্রহন করেন এক দুর্যোগময়....'
-'চুপ। একদম চুপ, ফালতু কথা রাখ।' এবার রেগে গেলেন চকদার স্যার । নিশ্চই কোন দুষ্ট ছেলে গাছের ডালে লুকিয়ে আছে।
কিন্তু দুষ্টটা দুষ্টুমি থামাল না।
-'আমি সত্যিই ভুতের বাচ্চা স্যার। আপনার কাধে বসে আছি।'
চমকে উঠে নিজের কাধের দিকে তাকালেন চকদার স্যার।
-'কই, কিছু তো নেই কাধে।'
-'আমি তো অদৃশ্য স্যার। আমাকে দেখবেন কিভাবে, আমার ওজন অনুভব করছেন না?'
এবার সত্যিকার অর্থেই চমকালেন স্যার।সত্যি সত্যি তিনি কাধে ওজন অনুভব করছেন, লোকজনের গুজব কি তাহলে সত্যি...?
-' আপনি কি লক্ষ্য করেছেন স্যার আপনার উপর বৃষ্টি পড়ছে না?' ভাবনায় বাধা দিল ভূতটা।
-'তাই নাকি?' বললেন তিনি।
-'মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের কথা বলাটা কিন্তু এত স্পষ্ট হবার কথা না স্যার। কিভাবে আপনি আমার কথা এত স্পষ্ট শুনতে শুনছেন জানেন স্যার?' প্রশ্ন করল কিকির।
-'না।'
-' আমরা আসলে কথাই বলছি না।'
বিরক্তিতে নাক উচু করলেন স্যার। 'মানে?'
-' মানে স্যার আমরা মনে মনে কথা বলছি, আপনার যাকে বলেন টেলিপ্যাথি। টেলিপ্যাথিতে কথা বলা খুব নিরাপদ, কেউ শুনে ফেলবে এমন ভয় নেই।সবচেয়ে বড় কথা হল এতে ঠোট নাড়ার কষ্টুটুকুও করতে হয় না...।'
-'এ্যাই।' হেকে উঠলেন স্যার। ' ভূতেদের আবার ঠোট হয় নাকি?'
-' হয় স্যার হয়। মানুষের যাযা আছে ভূতেদেরও তাই তাই আছে। মানুষ মরেই তো স্যার ভুত হয়। তবে কারও কারও অবশ্য চেহারা পাল্টে যায়।যেমন ধরুন পাশের গ্রামের কানা মফিইজ্জা। ওই বেটা মরার পর বান্দরের রূপ নিয়ে ভুত হয়েছে। যেমন স্বভাব ছিল। খালি বাদরামী করে বেড়াত...এখনও ক্ষান্ত দেয় নি। যদিও আমরা তাকে পাত্তা দিই না। আর এই গ্রামে ঢোকা তার জন্য বারন....।'
-' তা ,তোমার কিভাবে মৃত্যু হয়েছিল? বৃষ্টিতে আটকে পড়ায় সময় কাটানোর পন্থা বের করেন চকদার স্যার। তার নির্লিপ্ত জীবনে এমন অবাক করা ঘটনাও তেমন কোন ছাপ ফেলতে পারে না সহজে।
-' জি স্যার, আমার তো মৃত্যু হয়নি...'
-' মানে?'
-' মানে স্যার, আমার দাদার দাদার মৃত্যু হয়েছিল। তারপর আমার দাদার দাদা আমার দাদার দাদীকে বিয়ে করেন। আমার দাদার দাদা আর দাদার দাদীর ছেলে আমার দাদার বাবা। আমার দাদার বাবা বিয়ে করেন আমার দাদার মাকে । তাদের ছেলে আমার দাদা। তিনি বিয়ে করেন আমার....'
-'চুপ কর।'
-'কেন স্যার বলব না?'
-'না, আমি বুঝেছি।' শোনার অত্যাচার থেকে মুক্তি চান চকদার স্যার। বুঝে গেছেন বৃষ্ঠি সহজে না থামলে আজকে তাকে ভীষন অত্যাচার সহ্য করতে হবে। এ বড় বাচাল ভুতের বাচ্চা। এ কথা বলেই যাবে। এমনও করা যাবে না যে কান মুচরে থামানো যাবে। তবু চেষ্টা করে দেখা যাক এর ভেতরে কোন ভয় ঢুকানো যায় কিনা, ভাবলেন চকদার স্যার।
প্রশ্ন করলেন-' তোমার বাবা মা কোথায়?'
প্রশ্নটা যেন লুফে নিল বাচ্চাভুতটা। আজকে বড্ড একা বোধ করছিল ও। এই নিপাট ভাল অথচ সাহসী মানুষটাকে পেয়ে ভাল লাগছে তার। এমনিতো কেউ তার কথা শুনতেই পারে না। ভিরমি খায়।
-'উনারা ইউনিয়ন কমিশনার এর কাছে গেছেন...ভীষন জরুরী কা....।
-'কার কাছে গেছে?; প্রায় হতবুদ্ধি স্যার।
-' ভুত কমিশনার এর কাছে স্যার। আমার বাবা বেশ অবস্থাপন্য ভূত। তিনি এই গ্রামের ভুতপ্রধান। জানেন তো এই গ্রামে অসংখ্য ভুতের বাস, তিনি তাদের নেতা।তাই এলাকার সুবিধা অসুবিধার কথা তিনি বলবেন ইউনিয়ন ভুত কমিশনার এর কাছে। ইউনিয়ন ভূত কমিশনার বলবেন উপজেলা ভুত কমিশনার এর কাছে, উপজেলা ভুত কমিশনার বলবেন জেলা ভুত কমিশনার এর কাছে , জেলা ভুত কমিশনার বলবেন বিভাগীয় ভুত কমি....
-'চুপকর।' দাত কিড়মিড় করে উঠে চকদার স্যারের। ভুতে কথার তোড়ে মাথায় চিনচিনে ব্যাথা শূরু হয়েছে তার। একে থামাতেই হবে।
-' কেন স্যার । আমি কি ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলব না।? আমার শিক্ষক বলেছেন যখন যা বলব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বল...
-' আমি বুঝেছি বাপু।' বৃষ্টি এখনও কমছে না। অথচ এ হারে কথা শুনতে থাকলে শূধু মাথা ব্যাথা না, মনেহয় পাগর ই হয়ে যাবেন, ভেবে অস্থির হলেন চকদার স্যার । একে জব্দ করারা একটা পরিকল্পনা কষলেন। ভুতটা তার শিক্ষকের কথা বলেছে, তারমানে পড়াশোনা করে..নিশ্চই গনিৎ পছন্দ করে না। দেখা যাক এক অংক ধরে।
-' তা তুমি এখানে একা?' জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
-' জি । আজকে আমি একা। বাবামা তো ইউনিয়ন ভুত...,'
-' আমি জানি সেটা, তোমাদের কি স্কুল আছে?'
-' হ্যা আছে। আমারদের অনেক রকম স্কুল। আমরা স্কুল পাস করে কলেজে যাই , কলেজ পাশ....।
-'তুমি অংক জান?' ভুতটাকে থামিয়ে দিলেন।
-জি। জানি' ভূতের নির্বিকার উত্তর।
-' আচ্ছা, তিন লক্ষ ষাট হাজার পাচশ পচিশকে পনের দিয়ে ভাগ করে দেখাও তো দেখি।' বাচ্চা ভুত। এইটা কি পারবে? ভাবলেন স্যার।
-' এটাতো স্যার বাশের মত সোজা'। ভুতের বাচ্চার পিলে চমকানো জবাব। ; উত্তর হল চব্বিশ হাজার পয়ত্রিশ।
বাহ। মনে মনে খুশিই হলেন চকদার স্যার। এতবছর ধরে মানুষ ছাত্র পড়িয়ে এত মুগ্ধ হননি তিনি। ভুতটাকে একটু যেন ভাল লাগতে শূরু করল তার। একবার ভাবলেন আরও কটা অংক বিষয়ক প্রশ্ন করবেন বাচ্চাভুতটাকে। কিন্তু প্যানপ্যানির কথা মনে হতেই লোভটা সামাল দিলেন তিনি।
-' এবার আরেকটা প্রশ্ন করি। উত্তর শেষ না করে থামবে না।' এবার আসল চাল চাললেন স্যার। বুঝতে পেরেছেন ভুতের বাচ্চাটা একবার বলা শুরু কররে কেউ না থামালে থামতে পারে না। ' বাইশকে সাত দিয়ে ভাগ করে দেখাও তো।
হো হো করে হেসে উঠল ভুতের বাচ্চা টা। বলল-' এটা কোন প্রশ্ন হল স্যার, এ তো তালগাছের মত সোজা। এর উত্তর হবে, তিন দশমিক এক চার দুই আট পাচ সাত এক চার দুই আট পাচ সাত এক...চার...দুই ...আট....পাচ...সাত...এক...চার...দুই ...আট....পাচ...সাত...এক.......
নিজের কাজে মজা পেয়ে মুচকি হাসলেন লাকুড়ীপাড়া হাইস্কুলের অংক শিক্ষক।
ইতিমধ্যেই বৃষ্টি অনেকখানি থেমে এসেছে। আর অপেক্ষা করলেন না চকদার স্যার। বকবক করার শাস্তি হিসেবে এমন এক সমস্যা দিয়ে আসলেন যার উত্তরের কোন শেষ নেই। একসময় হয়ত থেমে যাবে বাচ্চাভূতটা। হয়ত বা থামবেই না।তাতে কি আর আসে যায়! ভূতের বাচ্চা বরে কথা , কিছুই হবে না। তারতো কথা শোনার অত্যাচার আর সহ্য করতে হল না।
যেতে যেতে একবার পিছন ফিরে বিশাল গাছটার দিকে তাকালেন চকদার সাহেব, একটু চমকে উঠে হাত দিলেন কাধে...নাহ..কাধটা হালকাই লাগছে এখন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

