কঠিন ছেলেবেলা। কিন্ডারগার্টেনে যাই। রোজ সকালে শতাধিকবার ডেকে কুম্ভকর্নের কানে বার্তা পৌছাতে ব্যর্থ হয়ে আম্মা বিছানা থেকে টেনে তুলে কোলে করে নিয়ে মুখ ধুইয়ে, পরিপাটি করে সাজিয়ে, খাইয়ে ছোটভাইয়া বা আপাদের কারও হাতে ধরিয়ে দেন, এরপর রিক্সা করে দুলতে দুলতে, কখনও বা ভাইয়ার হোন্ডার পেছনে চড়ে আমার স্কুল যাত্রা। গেট পেরিয়ে যখন আমি ক্লাসে ঢুকতে যাব তখনই ঘুম থেকে জেগে উঠে পৃথিবীটাকে আবিস্কার করি ক্লাসরুমে! এর আগের এইসব ধুন্ধুমার কান্ডগুলো, ঘুম থেকে উঠা, গায়ে পোষাক চড়ানো, খাওয়া বাস্তব কেবলি আম্মার জন্য..আমার কাছে এ সবই স্বপ্ন ঠেকে।
ক্লাসে পেছনের সারিতেই আমার সবসময়ের স্থান, পছন্দেরও, যে বেঞ্চগুলো নিয়ে কারও কোন কাড়াকাড়ি দাবীদাওয়া নেই সেগুলোতেই আমার ঝোক! যদিও বা এডমিশন টেষ্ট এ সবার চোখ কপালে তুলে কিভাবে জানি নাম্বার ওয়ার প্লেস পেয়েগিয়েছিলাম, তা কোন পার্থক্য তৈরি করে না আমার বসার ব্যাপারে, শুধু মাঝে মধ্যেই সামান্য দেরী করে ক্লাসে আসায় রোলকলটা মিস করে ফেলি। প্রথম বেঞ্চিতে বসার সাহস আমার কোনকালেই হয় না। প্রথম বেঞ্চিওয়ালাদের চোখ দেখলেই চুপসে যাই। সেকেন্ড ক্যাপটেনের সাগরেদ এরা। সেকেন্ড ক্যাপটেনই ক্লাসের সরদার। আমিতো...তার সহকারী হতে পারি মাত্র!
টিফিন পিরিয়ডের নামে যে আধাঘন্টা বিরতি, ক্লাসের প্রায় সবাই তখন ছোট্টমাঠটায় লাফজাফে ব্যস্ত আমি তখন ক্লাসের সামনের বারান্দাটার পিলার আকড়ে দাড়িয়ে সাদাচোখে তাদের খেলা দেখি। ইছড়ে পাকা কজন তখন আমার জাপান থেকে ছোটচাচার পাঠানো লাল টকটকে ব্যাগটা বর্বরের মত খুলে মায়ের বানিয়ে দেয়া স্যান্ডউইচ আর রঙিন ফ্লাক্সের তরল উজার করতে ব্যস্ত। চুরি করে খাচ্ছে, বোঝার কি সাধ্য? আর জিনিসগুলো যদি আমার হয় তাহলে সেটা সরকারী ট্যাগ সমৃদ্ধ! এগুলো খাওয়া যায়!
'এই! এটা কি? শরবত নাকি?' বিকট চিৎকার শুনে পেছনে তা। বকাই, দেখি ক্লাসের গুন্ডা বলে খ্যাত ছেলে আর মেয়েদের কটা আমার প্লাষ্টিকের সুদৃশ্য লাল ফ্লাক্সটা থেকে মুখ নামিয়ে কড়া দৃষ্টি নিয়ে আমার পানেই তাকিয়ে!
এই গাধা! পানি খেতে চাইলাম, এইটা কি? শরবত নিয়ে এসছিস? তুই শরবত খাস? দুদু খাস? বেটা খাটাস!!
আমি হতভম্ভ। বিরাট অপরাধ করেছি বুঝতে পেরে হতচকিত কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এই ফাঁকে দুষ্টকুলের শিরোমনি বাহ্যিক সুন্দরী মেয়েটা (ইদানিং ওকে ক্ষেপিয়ে শোধ তুলি অতীতের, দান পাল্টে গেছে এখন) চেচিয়ে ওঠে....ওই..ওই...ও তো দেখি লাল শরবত খায়...দুদু খায়...বাচ্চা একটা ..লাল শরবত খাওয়া লালু একটা...এর নাম আজকে থিকা লালু...ওই লালু...ওই লালু...!
আর যায় কোথায়! পিঠে সীল পড়ে গেল। ফ্লাক্সের সবটুকু কোকাকোলা শেষ হল, তারপর ক্লাসময় উড়াউড়ি করতে লাগল ফ্লাক্সটি পাখা ছাড়াই অবালীলায়! খেলার মাঠ থেকে ছুটে এল গুনী সহপাঠীরা..তাজা খবর কে মিস করতে চায়? আর আমি তখন খুব কষ্টে সটকে পড়ে টিচার্স কমনরুমে গিয়ে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি নোনাজল পান করি।
বাসায় ফিরে তোতলাতে তোতলাতে বলতে যেয়ে ঢুকড়ে কেদে উঠি...'আম্মা...আম্মা...আমার সব কোকাকোলা...'
আমি তখন নিতান্তই শিশু। কিন্ডারগার্টেনের অতিস্মার্ট সহপাঠীদের নিষ্টুর আচরেনর স্বীকার হয়ে বাসায় ফিরে ভাবছি এটাই আমার আসল জায়গা, সকল দুঃখ ঘোচাবার জায়গা...। কিসের কি! হাসির হলকা ছুটে...বয়ে যায় আমার কানের পাশ দিয়ে গুলির মত..চোখে আবার সেই পৈতৃক নোনা শরবত। ভাইয়া, বড়পা,মেজপা,ছোটপা,ছোটভাইয়া,আম্মা সবাই এখন আমার সহপাঠী সাদৃশ। নিঃশেষিত হয়ে আমি যখন পৃথিবীকে একটা যন্ত্রনার আস্তাকুড় ভেবে ধিক্কার দিচ্ছি নিজের জীবনের প্রতি, তখন এল ঘোষনা আম্মার..সাথে সাথে সমস্বর সমর্থন সব ভাইবোনদের। ''এখন থেকে সপ্তাহে পাচদিনই তোমাকে কোকাকোলা দেয়া হবে, তুমি খেতে না পারলে তোমার দোষ, তোমাকে লোকে লালু বললে আমরা কি করতে পারি।'
আগে হয়ত সপ্তাহে দুদিন আমার কাকুতি মিনতিতে কোক দেয়া হত আমি লুকিয়ে তা সাবার করতাম, এখন আজকের ঘটনায় তা তো সবদিনের জন্য হল..কিন্তু এখন আমি কি চাই আর?
করুন দৃষ্টি নিয়ে সবার মুখ পানে তাকাই আমি। কোথাও একবিন্দু মায়া মমতার চিহ্ন নেই। কী নিষ্ঠুর পৃথিবী, তবে কি সত্যিই আমি কুড়িয়ে পাওয় ছেলে..?
আগামীদিনগুলোতে ক্লাসের মাঝে খালি ফ্লাক্সের উড়াউড়ি দিব্যচোখে ভাসতে লাগল, কানে যন্ত্রনার মিছিল....লালু...ওই লালু...লালুরে...আজও লাল শরবত...ওই লালু...এহ...হে..হে..!
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুন, ২০০৮ ভোর ৪:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


