এক,
খুব একচোট বৃষ্টি হয়েছিল। কি ভালই না লাগছিল। টিনের চালের বৃষ্টির রিমিঝিমি শব্দ মনকে জুড়িয়ে দেয় শানুর। একবার মনে হয়েছিল তার, বৃষ্টিটা যেন না থামে, কিন্তু যেই ভাবল, ওমনি থেমে গেল বৃষ্টি। কি আর করা।
বৃষ্টি থেমে যেতেই সিগারেট খাওয়ার জন্য প্রানটা আকুলি বিকুলি করতে লাগল শানুর আর এটাও মনে পড়ল, শেষ সিগারেটটাও পুড়িয়ে ফেলেছে সে ঘুমুতে আসার আগেই। তাই , রাত একটার সময় তাকে বেরুতে হল বাইরে। উদ্দেশ্য বারেক মিয়ার দোকান। বারেকমিয়ার দোকানটা অদ্ভুত, দিনরাত চব্বিশ ঘন্টাই খোলা। রাতেও দুজন কর্মচারী আধোজাগা হয়ে থাকে, কাউন্টারের মত একটা ছোট্ট জানালার মত জায়গা খোলা থাকে। ওখান দিয়ে ডাক দিলেই এরা জেগে উঠে। যা ইচ্ছা আনা যায়, দাম একটু বেশী নেয় রাতের বেলা। ভারী মজার কান্ড। তবে পাড়ায় রাতে একটি দোকান খোলা থাকলে বিপদে আপদে সাহায্য পাওয়া যায়।
শানুদের বাসা থেকে বারেক মিয়ার দোকানটা একটু দুরেই। যাবার সময় সিগারেটের নেশায় পথটুকু পেরুতে একটুও বেগ পেতে হল না শানুর। আসার সময় এতটুকু পথ পেরুতে গা ছমছম করতে লাগল তার। চারিদিকে গুমট অন্ধকার, কোথাও একবিন্দু আলো নেই। যেন ব্ল্যাকহোল। স্ট্রিটল্যাম্পগুলোও নেভানো। ভয় পাবারই কথা। কিন্তু সিগারেট থাকতে সমস্যা কি..একটু সিগারেট ধরিয়ে ভয় কাটাতে কিছু একটা চিন্তা করতে গেল শানু। হঠাৎ করেই ঝনঝন করে অনেক কিছু মনে পড়তে লাগল শানুর। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা। আহা! কি সুন্দরই ছিল না সে দিনগুলো। এখনও আফসোস হয়। কি আনন্দেরই না ছিল। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় এর সেইদিন গুলোর স্মৃতি হঠাৎ এই অন্ধকার রাতে নির্জন রাস্তায় মনে হল কেন শানুর কে জানে। ক্যাম্পাসে প্রথমদিনই শানুর সাথে পরিচয় হয় বকুলের। বকুল। একটি ফুলের নাম। ফুলের মত একটি মেয়ের নাম। এরপর শুরু তাদের একসাথে পথচলা। কতবিকেল কেটে গেছে ক্যাম্পাস ছেড়ে দুরে এমসি কলেজের পুকুর পাড়ে, কতদিন বন্ধুর গাড়ি ধার করে এয়ারপোর্ট রোড ধরে লংড্রাইভে কেটে গেছে অসাধারন সময়। আলপাইনের বিরিয়ানি খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুড় তুলে কতদিন বকুলের গালমন্দ সইতে হয়েছে ওকে, আলপাইন কোনদিনই বকুলের মনজয় করতে পারেনি, ইষ্টিকুটুম ছিল বকুলের পছন্দের লিষ্টে। আর বকুল যেদিন শানুর মেসে আসল প্রথম দিন। স্পষ্ট মনে আছে সব শানুর।
বাসায় পৌছে গেছে শানু, বিছানায় বসে আরেকটা সিগারেট ধরালো ও। পুরনো স্মৃতি ভাবতে বড় ভাল লাগছে।
তাদের মেসটা ছিল আজব। পুরো বানিজ্যিক। মেসটা চালু করেছিল আম্বরখানার এক বুদ্ধিমান বাড়িওয়ালা, এমনিতে ভাড়া দিলে যা আয় হত এর চেয়ে ঢেরবেশী হত এই মেস থেকে। সিটপ্রতি ভাড়া গুণত মেস ম্যানেজার। অন্ধকার একটা গুহার চেয়ে বেশীকিছু ছিলনা মেসটা। বকুল প্রথম দিন এসেই ঝাড়ি দিল শানুকে। এরপর বেশীদিন ওইখানে থাকা হয় নি শানুর। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে অবশ্য প্রায়ই যাওয়া হত সেখানে পরেও।
কত স্মৃতি সেদিনগুলোর। বকুলের। ...আচ্ছা বকুল এখন কোথায়? কেমন আছে?
হঠাৎ করেই প্রশ্নটা ঝাকিয়ে আসল শানুর মাথায়। কিন্তু উত্তর খুজে পেল না ও। কিছুই মনে করতে পারল না। অনার্স শেষ পরার পর কি হয়েছিল? বিয়ে হয়ে গিয়েছিল বকুলের? কোন কিছুই মেন করতে পারল না শানু। অস্থির হয়ে উঠল ও।
কেন জানি না? কি হয়েছিল বকুলের? কি হয়েছিল? প্রচন্ড এক চিৎকার করে উঠে জ্ঞান হারাল শানু।
দুই,
ঘড়িতে সাতটার এলার্ম বাজতেই ঘুম ঝাড়ল শানু। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছাড়ল। নটায় অফিস। বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাড়াল অভ্যাসবশত। সেভ করার সময় মনে পড়ে গেল গতরাতের কথা। মনে পড়ে গেল বকুলের কথা। রাতে বারেকমিয়ার দোকান থেকে সিগারেট কিনে ফেরার পথেই তো স্মৃতিরা ঝাপি খুলেছিল।
আস্তে আস্তে মুখটা বিকৃত হয়ে আসে শানুর। কাল রাতে ওসব কি ভেবেছে ও! বকুলের কথা! বকুল কে? বকুল নামের কাউকে তো কোনকালেই সে চেনে না। আর চিনবেই বা কি করে? সে তো শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনকালেই পড়েনি। তার কজন বন্ধু পড়ত, তাদের মুখে ওই বিশ্ববিদ্যালয় এর নানা গল্প শুনত, কিন্তু কোনকালে সিলেট যায়ও নি ও।
অনার্সও করেনি। বিকম করেছি ঢাকা কলেজ থেকে। তাহলে?
দুহাতে মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরে শানু। কিন্তু কালরাতের চিন্তাগুলো এতো স্পষ্ট! পাগল হয়ে গেলাম নাকি? অস্থির হয়ে ভাবল ও।
হতে পারে ওটা স্বপ্ন ছিল। এটা ভেবে নিজেকে স্বান্তনা দিল শানু। কিন্তু পরক্ষনেই মনে পড়ল, তাহলে তো পুরোটাই স্বপ্ন। সিগারেট আনাটাও। পকেটে হাত দিল শানু, সাথে সাথে জমে গেল। বুকপকেটে সিগারেটের প্যাকেটের অস্তিত্ব অনুভর করছে ও।
গোল্ডলিফের প্যাকেটটা পকেট থেকে বের করল শানু। গতরাতে আসার পথে আর বাসায় এসে দুটা খেয়েছিল ও। স্পষ্ট মনে পড়ে। খুলে দেখল। আঠারোটাই আছে।
তারমানে রাতের ঘটনাটা স্বপ্ন নয়। তবে কেন আবোল তাবোল চিন্তা করছিল? নাকি বকুল নামের কারও সাথে সত্যিই পরিচয় ছিল?
পাগল হয়ে গেলাম নাকি? আরেকবার নিজেকে এ কথা শোনাল শানু।
তিন,
'আপনার পুরো কেস স্টাডি করে যা বুঝতে পারছি, আপনার ব্যাপারটা আসলে স্লিপওয়াকিং।' চোখ থেকে চশমা খুলে সামনের বিশাল টেবিলটাতে রাখতে রাখতে কথাটা শানুকে বললেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ আনিস।
গত দশদিন ধরে রাতের ঘটনাটা নিয়ে অস্থির হয়েছিল শানু। কারও সাথে শেয়ারও করতে পারছিল না। আবার শান্তিও পাচ্ছিল না। গ্রহনযোগ্য কোন ব্যাখ্যাই দাড়করাতে পারছিল না। দশদিন পাগলের মত কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত ডঃ আনিসের শরনাপন্ন হয়েছে ও।
-'কিন্তু, সেক্ষেত্রেতো রোগীর কিছুই মনে থাকে না।' বলল শানু।
-'তা ঠিক। আপনার বেলায়ও তাই হয়েছে।'
-'তবে?
-'ভার্সিটির কথা আর সিগারেটের কথা বলছেন?'
-'হু'
-'শাহনুর সাহেব'। একটু ঝুকলেন ডঃ আনিস। আমাদের মস্তিস্ক এক দারুন রহস্যময় বস্তু। সেকি করে না করে তা বড়ই জটিল। আমার ধারনা আপনি স্লিপওয়াকিং করে বারেকমিয়ার দোকান থেকে সিগারেট এনেছিলেন ঠিকই। এবং দুটা খেয়ে ঘুমিয়েও পড়েছিলেন।'
-'কিন্তু?....'
-'হ্যা সবকিছুই ঘটেছে ঘোরের মধ্যে ওসব আপনার মনে নেই। আপনি ঘুমুবার পর আপনার মস্তিস্ক এ নিয়ে একটি পরিপূর্ন স্বপ্ন তৈরি করেছে। স্বপ্ন ওত নিখুত হয় না। আপনার ক্ষেত্রে তা হয়েছে।'
-'একি সম্ভব!' হতবাক শানু।
-'সম্ভব। আপনার তো আগে স্লিপওয়াকিং ছিল না। এখন হয়েছে।'
-'কিন্তু বকুলের কথা?'
-'হাহ হা। হাসলেন ডঃআনিস। আপনি মানুষটা হয়ত খুব রোমান্টিক। তাই আপনার মস্তিস্ক স্বপ্নের মধ্যে বোরিং জায়গাগুলো সিলেটের আনন্দঘন স্মৃতি দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে।'
-'কিন্তু আমি তো কখনও সিলেট যাইও নি। কিন্তু ওসব জায়গা, এত স্পষ্ট...।'
-' আমার বিশ্বাস ওগুলো আপনার সৃষ্টিশীল মস্তিস্কের কল্পনা। আপনি আপনার বন্ধুদের কাছ থেকে জায়গাগুলোর অনেক বর্ননা শুনেছেন। আপনার মস্তিস্ক এগুলোর সফল চিত্রায়ন করেছে। আপনি একবার সিলেট থেকে ঘুরে আসেন তাহলেই আপনার সংশয় দুর হবে।
চার,
দুদিন পর সিলেট গেল শানু। শহর ঘুরে বেড়াল। শাবিপ্রবিতে গেল। মদিনা মার্কেট এলাকা দেখে অবাক হল ও। একেবারে স্বপ্নের মতই দেখতে। ওর অতি পরিচিত। স্বপ্নে বকুলের সাথে ঘুরে বেড়ানো প্রতিটা জায়গায় যাবার চেষ্টা করল ও। চৌহাট্টার আলপাইন, এমসি কলেজ, ইষ্টিকুটুম সবজায়গাই ভীষন চেনা চেনা মনে হল। খুজে খুজে স্বপ্নের মেসটাতে গিয়েও হাজির হল শানু। মেসের ম্যানেজার ওকে দেখা মাত্রই উঠে দাড়িয়ে বলল ' ও কিতাবা শাহেদ ভাই, ওতদিন ফরে আমরারে মনো ওইল নি?'
উত্তরে কোনকিছুই বলতে পারল না শানু। মাথাটা ঘুরে উঠল ওর। সত্যিকারের অজ্ঞান হল এবার।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুলাই, ২০০৮ সকাল ৭:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



