ছেলেটি খুবি সাদা সিধে- সহজ সরল,এতো সহজ সরল যে এ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে দায় পরে নিলয়ের।
ছোট বেলা থেকে হরেক রকম নাম উপাধি পেয়ে আসছে বন্ধুদের কাছে নিলয়।
যেমন ..হুজুর ,হাবলা ,কেউবা সাধুরাম বলেও ডাকে নিলয়কে।
নিলয় যেনো সবার কাছে একটা খেলার পাত্র , শুধু সমবয়সী বন্ধুরা যে তা না,
মাঝে মাঝে বিদ্যালয়ে সম্ম্মানিত শিক্ষকদের মতো বয়সি বন্ধুদের মুখ ফসকে কয়েকটা কথা বের হয়ে যায় বুলেটের মতো নিলয়ের উপর।
সেদিন রহিম স্যার কেনো জানি নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন এখানে এভাবে হাবলার মতো বসে না থেকে, বাসায় বসে থাকলেই তো পারিস।
স্যারের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে শ্রেনী কক্ষের সব ছাত্র ছাত্রী হু হু করে হেসে উঠে। এসব কথা কখনো নিলয়ের কাছে লজ্জার মনে হয়না। বরং সেদিন সব ছেলে মেয়েদের সাথে নিলয়ও হেসেছিলো।
শুধু হাসতে পারেনি একজন , যে শুধু নিলয়কে নিয়ে ভাবে, ভাবে কেনো এরা এই ছেলেটার সাথে এমন করে। কেনো তারা বুঝেনা নিলয় তাদের মতো স্বাভাবিক না, সে একজন প্রতিবন্ধী।
তাসি আর নিলয় একে অপরের প্রতিবেশী, তাদের দুই পরিবারের মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক রয়েছে...তাসি নিলয়কে নিয়ে ভাবতে ভাবতে এক সময় বন্ধু হয়ে নিলয়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। তাসির কেনো জানি মনে হয়েছিলো সে যে ভাবে হোক নিলয়কে ভালো করতে পারবে। আর কেউ নিলয়কে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করতে পারবেনা। সে অন্য স্বাভাবিক ছেলেদের মতো হবেই। এর জন্য তার পাশে সব সময় কেউ একজন বন্ধু হয়ে পাশে থাকার দরকার ।
সে বন্ধুটা আর কেউনা নিযে হলেই ভালো হয়।
এই ভেবে তাসি এগি আসে নিলয়ের পাশে ।
সুধু একটা শপত ছিলো তার মাঝে ,নিলয়ের যতো দুঃখ কষ্ট সব দেখবে নিজের মতো করে ।এভাবে অনেকটা বছর পেরিয়ে গেলো ...........
এখন তারা অনেক বড় হয়েছে, বিদ্যালয় ছেড়ে কলেজে উঠেছে পরিবর্তন হয়েছে নিলয়েও, আগের চেয়ে স্মার্ট , মুখে একটু রাগ অভিমান ভান রাখা...যা ছোট জীবনে কেউ নিলয়ের কাছ থেকে কখনোও পাইনি।
শুধু তাইনা এখন কেউ আর নিলয়কে কথায় কথায় হাবলা , সাধুরাম, বলে নাম উপধি দেয়ার সাহসও পায়না।
যদিও বন্ধুরা নিলয়কে ছেড়ে তাসিকে এখন পেয়ে বসেছে, নিলয়ে ডাক্তার, নিলয়ের জান ইত্যাদি, এসব কথা তাসির কিছু যায় আসেনা, কারন সে এসব কথার উচিত জবাব দিতে পারে যখন তখন।
তাছারা এসব কথা যে একেবারে ফেলে দেয়ার মতো ,তা না ।
যেমন তাসি সত্যি নিলয়ের ডাক্তার । ডাক্তার আগে শতো চেস্টায় যা পারেনি ,তাসি তা পারছে ।পারছে নিলয়ের পাশে থেকে নিলয়কে আস্তে আস্তে সুস্থ করে তুলতে ।
যা কখোনো কেউ ভাবেনি ।
তাসি যখন তখন নিলয়দের বাসায় এসে নীলয়ের খোঁজ খবর নেয়, নিলয়ের সাথে গল্প হাসি উল্লাসে থাকে। যদিও নিলয়কে হাসানো অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। আজ নিলয়ের জন্মদিন কারো মনে নেই , সে কথা মনে রেখেছে তাসি , কারণ সে একবার নিলয়ে মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে জেনে নেয় এই দিনটির কথা। তার পর সে গেঁথে নেই মনের মাঝে ঐ তারিখ টি ...........আজ সেই দিন, তাসি ভাবছে নিলয়কে কি দেয়া যেতে পারে। ভাবতে ভাবতে সমাধান পায় তাসি। ওকে একটা মোবাইল দেয়া যায় , যখন মন চাইবে তখন নিলয়ের সাথে কথা বলত পারবে। তা ছাড়া হয়তো নিলয় মোবাইল পেয়ে অনেক খুশি হবে।
তাসি নিলয়ের রুমে গিয়ে পিছন থেকে নিলয়ের চোখ চেপে ধরে আলতো করে দু হাতে।
নিলয় কিছুই বললোনা চুপচাপ হাতটা সরিয়ে নিলো। তাসি এতো বছরে এই প্রথম একটু কষ্ট পেলো। সে দেয়ালে ঝুলানো নিলয়ের একটা ছবির কাছে গিয়ে বির বির করে বলছে তুই কখনো ভালো হবিনা, তুইকি সাধারণ দশ জন ছেলের মতো হতে পারবি না কখনো?
এই বলে তাসি কাদতে থাকে, নিলয় সেই একি রুমে সে একবারো তাকিয়ে দেখলনা তাসির দিকে, জানতে চায়লোনা কি হয়েছে ওর। তাসি চোখ দুটো মুছে নিলয়ের হাতে মোবাইলটা ধরিয়ে দিয়ে চলে যায় .........
আজ বন্ধুত্ব দিবস তাসির মোবাইলে অনেকে এস এম এস বা কল করে উইশ করছে তাকে, কিন্তু তাসি যে এক জনের আশাতে বসে আছে তার কিছু এখনো পাচ্ছেনা। নিলয় এখন অনেক ভালোর দিকে। তাই তাসি অপেক্ষায় আছে নিলয় কিছু একটা পাঠাবে ।
সাথে সাথে নিলয়ের একটা মেসেজ আসে তাসির মুবাইলে .........তাসি অনেক আনন্দের সাথে মেসেজটা পড়ে নেয়।
অন্যদিনের চেয়ে ,তাসিকে আজ বেশ লাগছে
কারন সে আজ সেজেছে অসাধারণ ,নিলয়কে নিয়ে ঘুরবে সারাটাদিন ।হাতে কিছু ফুল নিয়ে চলে যায় নিলয়ের কাছে। ঐ দিকে নিলয় জানে তাসি আসবে তাই সে তাকে একটা গান শুনাবে বলে কম্পিওটার থেকে গানটা মোবাইলে ডাওনলোড করে নেয়। তাসি এসে দেখে নিলয় কম্পিওটারের সামনে বসে আছে। তাসি চুপি চুপি ঘরে ঢুকে পিছন থেকে আবারো নিলয়কে জড়িয়ে ধরে ফুলগুলো তার নাকের সামনে ধরে। নিলয় পিছনে হালকা একটু তাকিয়ে ফুল গূলো নিয়ে তাসিকে ধন্যবাদ জানায়।
তাসিকে আজ খুব আনন্দিতো দেখাচ্ছে। সে নিলয়ের সামনা সামনি বসে ।
নিলয়ের একটা হাত ধরে কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পর বলে ঘুরতে যাবি? নিলয় লাজুক ভাবে মাথাটা বাঁকা করে জানান দেয় যাবে। সাগর দেখতে যাবি? নিলয় আবারো যাওয়ার ইচ্ছা দেখায়।
আজ একটা বিশেষ দিন বলে কথা না! এই সমুদ্র পার সব সময় লোকে কানায় কানায় ভরপুর থাকে। এতো মানুষ দেখে তাসির কেনো জানি ভালো লাগছেনা। সে চেয়েছিলো তার নিলয়কে নিয়ে এমন জায়গায় বসবে যেখানে তারা দুজন ছাড়া আর কেউ থাকবেনা। তাই তাসি এমন নির্জন জায়গা খুঁজতে লাগলো। এক সময় তারা হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো সৈকতের এমন এক প্রান্তে যেখানে তেমন কাউকে দেখছেনা তারা। তাসি আসার সময় খেয়াল করেছে নদীতে কিছু ছেলে মেয়ে লাফালাফি দেখে নিলয় খুব মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলো, আর ফিসফিস করে বলছিলো ওয়াও ওয়াও।
পাশা পাশি বসে দুজন অনেকক্ষণ গল্প করলো। নিলয়ের এতো উন্নতি দেখে তাসি দিশে হারা প্রায় । সে নিলয়কে বলে চল পানিতে নামি।
নিলয় বলে আমি নামবোনা, তাসি বললো তাইলে আমি নামবো। নিলয় একটু আনন্দের সাথে বলে যা।
তাসি গায়ের ওড়নাটা ভালো করে গায়ের সাথে জড়িয়ে নেয়। আর নিলয়কে পানি ছিটকা দিতে দিতে চলে যায় কোমর পযর্ন্ত পানিতে পানিতে নামার সময় তাসির একবারো মনে পড়েনি যে, সে সাতার জানেনা। তাসি কোমর পানিতে লাফালাফি করছে আর নিলয়কে ডাকছে।
নদীর পানির রং এখন লালচে হয়ে এসেছে। সূর্য টা লাল আকার ধরেছে। একটু পরেই যেন ডুব দেবে পৃথিবী থেকে। সাথে নিয়ে যাবে পৃথিবীর সব আলো দিয়ে যাবে অন্ধকার।
এমন সময় তারা দুই প্রিয় বন্ধু দুই জায়গায় একজন জলের সাথে আরেকজন জলের পারে বসে।
নিলয় পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ঐ গানটা এনে রেডি করে রাখে তাসি উঠলে তাকে শুনাবে।
এমন সময় তাসির কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে নিলয় সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখে তাসি নেই সাথে সাথে সাথে তার বুক ধব করে ওঠে, সে ওঠে দাড়ায়। একটু পর দেখতে পেলো তাসির একটা হাত , এবার সে নিশ্চিৎ হলো তাসি ডুবে যাচ্ছে। সে তাসির নাম ধরে হাও মাও করে কাদতে লাগলো আর সাহায্য চাইতে লাগলো। নিলয়ে চিৎকার তখন কারো কানের কাছে পৌছাইনি, কারন সেখানে আশে পাশে ছিলোনা কেউ। একটু দূরে যারা ছিলো যে যার আনন্দে মগ্ন ছিলো। নিলয় এবার তাসির দুটো হাত দেখতে পাই হাত দুটো যেন বাচার চেষ্টাতে লাফালাফি করছিলো। নিলয় আর থাকতে পারেনা। সে তার সাহয্যের আবেদন, কান্না বন্ধ করে। এবার সে ঝাপিয়ে পরে তার প্রিয় বন্ধুকে বাচাতে।
এক পর্যায়ে নিলয় চলে যায় তাসির কাছে দূজন দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বাচার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের পেয়ে যেনো সমুদ্রের জল আজ বড়ই আনন্দিত। বড় একটা ঢেউ এসে চলে যায় তাদের ওপর দিয়ে। ঐ ঢেউয়ের পর আর দেখা যায়নি নিলয় আর তাসিকে। দেখা গিয়েছে শুধু সাগর পারে কিছুফুল যে ফুল গুলো ছিলো তাসির হাতে। আর নিলয়ে মোবাইলটি যে মোবাইলে একটা গান ডাওনলোড করে এনেছিলো তাসিকে শুনাতে ..........গানটা অবিরাম বেজে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু শুনার মানুষ গুলো আর নেই ............
.......আমার মন্দ স্বভাব জেনেও তুমি কেনো চাইলে আমারে
এতো ভালো মানুষ হয় কি নিজের ক্ষতি করে ..........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

