টলস্টয় বলেছিলেন, হাতের কাজটিই সেরা কাজ। এবং একজনের উচিত এর সমাধান করা সবার আগে এবং এভাবেই চলতে থাকবে। তাহলে ভবিষ্যৎ এর ভেতর দিয়ে বর্তমানে এসে পরিস্ফূট হবে কাক্সিক্ষতপ্রায়চেহারায়। আর কর্মকৌশল নির্ধারণে তো অতীত আমাদের মধ্যে ক্রিয়া করছেই মানসবাস্তব হিসেবে। ফলে এর প্রতিও আলাদা মনোযোগ দেয়ার কিছু নেই। নিরাপোষীক্রিয়াদর্শনই আমাদের সমৃদ্ধ করে। এ থেকে জাত বিষয়ই আমাদের কাক্সিক্ষতÑ বস্তুগত এবং চেতনাগত ফল হিসেবে। এ আমাদের যেমন আইডিয়ার দাসত্ব থেকে মুক্ত রাখে, তেমনি আমাদের সাহিত্যকেও ভাববাদীমূর্তিমুক্ত রাখে। যেকোন ক্রিয়াই আমাদের দুটি উপহার দেয়, যা উল্লেখিত হয়েছে। তো এর মধ্যে যেটি মানসিক, আসলে সেটি ভাষিক। ফলে ক্রিয়া ব্যক্তিভাষার জন্ম দেয়Ñযা অন্যের সাথে ভাগ করে নেয়া বা যার ভাষা-প্রকাশের নামই সম্ভবত সাহিত্য হতে পারে। আর নিষ্ক্রীয় জীবন যখন আলাদাভাবে ভাষা পাল্টানোর ভাববাদী প্রকল্প হাতে নেয় তখন আসলে কৃত্রিমতার জন্ম ঘটে, যার সাথে জীবনের যোগ নেই, জীবননাশের ছাড়া। কেননা এ ঝুঁকিমুক্ত কল্পভয়ভালবাসা আর কল্পষ্ক্রিয়ার সাথে কাল্পনিকভাবে যুক্ত করে জীবনকে নয়, জীবনের বাসনাকে, পরিণতিতে নির্ভেজাল অবক্ষয়ী-আনন্দের ভাঁড়ার হয়ে উঠে। পাঠক এর সাথে নিজেকে বিযুক্ত রেখে একধরণের খেলার বোধে আক্রান্ত হয়। যা তাকে বাস্তবের সাথে তার জীবনের ক্রিয়াময়তাকে ক্রিড়াময়তায় উদ্বায়ু করে তোলে। একজন বাস্তবের সাথে সমাজের সাথে যতোটা সংঘর্ষে যাবে তার মানসিক অর্জন হিসেবে ভাষাও জীবনের বিকাশের শর্তে ততটাই ঝলসে উঠবে, জ্বলবে চেতনাপ্রভায়, নিজশৈলীতে যাকে বলেÑএমনই ভাবি আমি।
ভাষাকে যে এটাক করে সেই ভাষাকে বাঁচায়Ñ এমত মতের আড়ালে যেনো একটা কথা হারিয়ে গেছে, যেনো জীবন নয় ভাষাই আমাদের টার্গেট, যেনো বাস্তবতা নয়, ভাষাই আমাদের টার্গেট, হারিয়েছে গেছে যেটা সেটা হলো বাস্তবতার সাথে জীবনের সংঘর্ষই ভাষাকে প্রাণ দেয়, প্রচলভাষাকে এটাক করেÑসেকথাটা। বাস্তবতায় জীবন চূড়ান্তসক্রিয় হয়ে উঠলে, ভাষা এটাক্ড হয় অনিবার্যভাবেই, আলাদাভাবে এটাক করতে গেলে ভাষা ডিফরম্ড হয়, মেলফরমেশন ঘটে যা আমাদের কোন কাজে আসে না, কোন প্রাজ্ঞ বা বয়স্কর দেশে এ কেবল খেলার বাহুল্য, এ কেবল পণ্য হয়ে উঠে, পুজিপ্রচলের সখা। একটি শিশুর বিকাশÑ বাস্তবতার সাথে তার জীবনের ক্রিয়ার ফলÑ তার ভাষাকে বিকশিত করেছে। ফলে ব্যক্তি যতো বেশি বাস্তবতার সাথে বিচিত্র ক্রিয়ার ভেতর নিজেকে ঠেলে দেবে ততই সে নিজে সমৃদ্ধ হবে এবং ততই তার ভাষা পল্লবিত হবে ব্যক্তিমুদ্রার ছাপরূপে যা ব্যক্তির ছাপ নয় কেবল, তার ক্রিয়ার ছাপ, যা ভাষাসমাজে তার পরিচয়, যেহেতু ব্যক্তিটি তার ক্রিয়ার সমষ্টি সে অর্থে এই ভাষা তার সামগ্রিক জীবনের ছাপই বহন করে ভাষায়। তাই ভাষার আলাদা কোন অস্তি¡ত্ব কোন সাহিত্যিক স্বীকার করতে পারে না এবং ভিন্ন অর্থে কোন সাহিত্যিক নামের বিচ্ছিন্ন প্রাণীর অস্তিত্ব বস্তুত অশালীন। জীবনছিন্নসাহিত্য রাজতন্ত্রের আবিস্কার এবং তুমুল বিকশিত পুজিবাদী বিশ্বের আজও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ মুনাফাখোর এই জীবটি।
একটি বিষয় বিবেচ্য এখানে, জীবন, বাস্তবতা, ক্রিয়া, চেতনা, ভাষা ও ব্যক্তিভাষা নিয়ে কথা হলো, কথা হলো এদের মধ্যে অনুমিত সম্পর্ক নিয়ে। বাস্তবতা আসলে প্রকৃতি, সমাজ, ক্ষমতা ও আধিপত্যÑ যার মাঝে একটি প্রাণ জন্ম লয় এবং যার সাথে সহাবস্থানজাত ক্রিয়া ও সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে ঐ প্রাণটি নিজের এবং প্রকৃতি ও সমাজের বিকাশ নিশ্চিত করে।
সাহিত্যিক জীবের সাহিত্যফাহিত্য আমাদের জন্য বিচ্ছন্ন বিনোদন সমাগ্রী হয়ে বেঁচে থাকে এবং এর দিকে আমাদের দৃষ্টিপাতও হয়ে থাকে ঐচ্ছিক, অনিবার্যতার নয়। বিনোদনসামগ্রীর আলাদা উৎপাদন এই পূজিসমাজের বিলক্ষণ পণ্য। এবং এর সাথে জীবনের অনিবার্যতাকে অস্বীকার করে একে অবনমন করা হয় এবং একে এড়িয়ে গেলে আমাদের অসুবিধা হয়না, একে আকড়ে ধরলে আমাদের কোন বিকাশও হয় না, অবক্ষয় ছাড়া।
বিনোদন সামগ্রীর ধর্মই হলো ক্রিয়াবিচ্ছিন্ন অংশগ্রহণকারীর কাছে নিরাপদ অবলোকন ও পক্ষপাতের সুবিধা নিশ্চিত করা। তখন সে সমস্যাকে উপভোগ করে, এর দ্বারা ক্ষীণ আলোড়িত হয় এবং সমস্যা নিয়ে ভাবিত হয় না বা সক্রিয়তা কর্তাকে ছুঁয়ে যেতে পারে না মানসিক জগতমুক্ত হয়ে বাস্তবতায়। এবং বাস্তবতা ও জীবনের মিথস্ক্রিয়াকে চেনার বদলে একে একধাপ বা বহুধাপ আড়াল করে ফেলে, উন্মোচনের নামে। এবং ব্যক্তিসুবিধার দিকে তাকে প্রচন্ড চালিত করে, যেভাবে পুজিবাদী যেকোন প্রকল্পই সামষ্টিক চেতনার বদলে ব্যক্তির সংকীর্ণ সুবিধাবাদকে লালাউপচানো ভঙ্গিতে উৎসাহিত করে থাকে, এবং এর ভেতর দিয়ে ব্যক্তির বিচারবোধকে বিকৃত করা হয়, সমাজে থেকে সবার সমস্যাকে চাপা দিয়ে ব্যক্তির একার লাভের দিকটাকে বড় করে তোলে এবং সবাইকে আরো অধঃপতিত করার খেলায় অবচেতনে সকলে নেমে আসে। এবং তারা সক্রিয়ভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে নিজেদের আবিস্কার করে করে আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠে এবং একমাত্র সান্ত্বনা ব্যক্তিগতজয়, যেখানে ব্যক্তি কখনোই ঝুঁকিমুক্ত হয় না সফলতাশিখরে এসেও, ভোগের পরিমাণ যেমন বাড়ে, তেমনি ভোগান্তিরও।
আর এসথেটিক্স যে শ্বাশ্বতবোধের কথা বলে, তা আদৌ আলাদামনোযোগ পাওয়ার বিষয় নয়, কেননা তা মানুষের বাস্তবতার সাথে ক্রিয়ার ফলে যে অনুভব উপলব্ধি লাভ করে, যে প্রতিক্রিয়া সে ব্যাক্ত করে তার সাথে সবসময়ের মানুষের একটা অনুমেয়সাদৃশ্য থাকেই, ফলে একে পরবর্তী জেনারেশনের পাঠকও ছুঁয়ে যেতে পারে এবং একে শ্বাশত মনে হয় এবং শ্বাশ্বতবোধ আসলে মানুষের সক্রিয়তাবিচ্ছিন্ন কিছু নয়, এ আসলে সক্রিয়দের গ্রেট হিউম্যান কমননেস বা অনাদিমনুমিল। এবং এর প্রতি আলাদাভাবে মনোযোগের কিছু নেই, এর প্রতি আলাদা মনোযোগ দিলেই ভাববাদ এসে আমাদের ঘাড়ে ভুতের আছড় ঘটায়, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতাকে বিকৃত ও উন্মূল করে। ভূত Ñযার শরীর নেই, কিন্তু বাস্তবতার উপর মানুষের ক্রিয়াকে অভিভুত করতে পারে, ডিরেইল্ড করতে পারে অর্থাৎ ক্রিয়া আছে বলেই তা ক্ষতিকর, না হলে ভূতের প্রতি আমাদের কোন অনীহা থাকতো না।
এককথায় আমাদের কাছে জীবনসক্রিয়তা বিচ্ছিন্ন সাহিত্যের অস্তিত্ব নেই, এবং বিমূর্তভাবে কিছু ভাবতে আমরা রাজি নই এবং বাস্তবতাকে আলাদভাবে রহস্যযোজনের কাব্যিকায়নের এবং নান্দনিকতার নামে ডিফরম্ড করার জীবনবিচ্ন্নিতাকে প্রশ্রয় দিতে পারি না। জীবন তার ভালবাসা, চূড়ান্ত সক্রিয়তা এবং নিরাপোষপ্রকাশের ভেতর দিয়ে বাস্তবতার সাথে যখন সংঘর্ষে ভাষায় ঝলসে উঠে, তখন তা মানুষকে আলোড়িত করেই ক্ষান্ত হয় না, তাকে বাস্তবসংঘর্ষে নামিয়ে এনে জীবনকে উদযাপন যোগ্য করে তোলার লড়াই চালায়। এবং জীবনের এই প্রকাশ অন্যের জীবনের জন্য কোনভাবেই উপদেষ্টার ভূমিকা নেয় না, বরং তাকে সক্রিয় করে তার জীবন বাস্তবতায়Ñএটাই সাহিত্যের ভূমিকা, শ্রেষ্ঠ সাহিত্যফাহিত্যে আমাদের কী আসে যায়, যদি তা আমাদের নিষ্ক্রিীভোক্তায় রূপান্তর করে।
বাস্তবতার উপর চূড়ান্ত এবং নিরাপোষী সক্রিয়তাই চূড়ান্ত ব্যক্তি-কাব্যিক এবং ব্যক্তি-শৈল্পিকভাষার উদ্ভব ঘটায়, ভিন্নভাবে নয়। কেননা ভাষার ভেতর দিয়ে আমরা আসলে জীবনের বাস্তবতার উপর আমাদের সক্রিয়তাকেই প্রকাশ করি। তাই ভাষার গঠন অবচেতনের গঠনের মতো। অবচেতন ভাষার গঠনের মতো Ñবললে বাস্তবতার উপর জীবনের ক্রিয়া থেকেযে ভাষা জাত হয়, একজনের মাঝেযে এর ক্রমঅন্তর্ভূক্তি হয়, তা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে, সমাজের বাস্তবতায় ভাষা আগে হলেও, ভাষার জগতে মানুষের জন্ম হলেও, মানুষ ব্যক্তি হিসেবে ভাষার সাথে নিজেকে ক্রমে একাত্ম করে নিতে পারে, তার বাস্তবতার উপর তার সক্রিয়তার অনুপাত ও ধরণ থেকে। তাই ব্যক্তি জীবনের এই অনন্যতা একজনের প্রকাশভঙিকে অনিবার্যভাবেই অনন্য করে তুলবে। বুর্জোয়া সাহিত্য ব্যক্তিস্বাত›েত্র্যর কথা বললেও সাহিত্যিক ও পাঠককে জীবন ও বাস্তবতার উপর এই সক্রিয়তাকে আড়াল করতে এসথেটিক্সকে ষোলআনাই খাটিয়ে নেয়, এবং একে আড়ালের ভেতর দিয়ে লেখককে নিষ্কাম উৎপাদকশ্রমিকে এবং পাঠককে নিষ্ক্রীয়ভোক্তা হিসেবে, দায়িত্ব থেকে উভয়ের অপসারণ ঘটায় সুকৌশলে। তখন বিনোদনই শেষ কথা Ñবলে উঠে সাহিত্যিক পাঠক উভয়েই। জীবনের দায় এবং এর বিকাশে তাদের সক্রিয়তাইযে একমাত্র দরকার, তাযে তাদের জীবনের জন্যই সমান জরুরি তা ভুলে যায় বা ভুলে থাকতে চায়।
আর আসে রাজনীতির প্রশ্নটাও এবং অবশ্যই যেহেতু সাধারণীকরণের বিশাল ফাঁদ এখানে রচিত হয় না, সেহেতু এটা ব্যক্তির স্বরকে চাপা দেয় না এবং যেহেতু ব্যক্তির বিকাশের অনন্যতাকে স্বীকৃতি দেয়, ফলে অন্যের, সময়ের এবং স্থানের সাপেক্ষে তুল্যবিচারের মাপে বিচার্য হতে গিয়ে কাউকে চাপা দেয় না, বরং উদ্ভাসিত করে।
আর যে যেখানে অবস্থান করছে সেখান থেকে যেহেতু তার সক্রিয়তা জারি রয়েছে এবং অবশ্যই ব্যক্তির, সময় এবং স্থানের সাপেক্ষে অনন্য সত্যসাথে সম্পর্কিত হচ্ছে, কোন ইগোস্টিক আড়াল থেকে তা মুক্ত থাকতে পারার সম্ভাবনাকে লালন করতে পারে, অনিবার্য প্রশ্নের অনিবার্যউত্তরও একে অপরকে সরবরাহ করতে পারে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই, এবং এর ফলে স্থানীকতা-আন্তর্জাতীকতা, দেশী-বিদেশী, নারী-পুরুষ প্রভৃতি ক্ষেত্রে ধারণাজোড়ের মধ্যে প্রতিযোগিতার বদলে এক অনন্য সহযোগিতার ক্ষেত্রই বিকশিত হতে থাকে বলে অনুমেয়।
জীবনকে অস্বীকার করে যে কল্পনাকে আকড়ে নন্দনতত্বের নামে সাহিত্যকে চালাতে চায়, তার পরিণতি সবসময়েই করুণÑএ নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। কল্পনাÑ সে এই অর্থেই আমাদের যে, তা জীবনকে আর বাস্তবের মধ্যে যে যৌথবন্ধন এবং সংঘর্ষ তাকে স্পষ্টতা দিতে সহায়তা করতে পারে কোনকোনমুহুর্তে । যেজীবন আমরা পাই এবং যেবাস্তবতা এবং এর মাঝেযে অনিবার্য সংবন্ধন অর্জনের জন্যযে সংঘর্ষ বিদ্যমানÑ তাকে অনুধাবন ও তুলে ধরতে আমাদের যা করা দরকার তাই করতে হবে। বাস্তবতার সাথে সংঘর্ষের ভেতর দিয়েই সেই পথ সেই ভাষা আমাদের হাতে উঠে আসে। চূড়াসক্রিয়তার ভেতর দিয়ে উদ্ভুত চেতনা পরাচেতনা বিশৃঙ্খলা এক অনাসৃষ্টি যাই বলি না কেন তা জীবনের অনিবার্য প্রকাশÑ তাই আমাদের সাহিত্য, এই চূড়ান্ত সকিয়তাবিন্দুটিতেই এসে মিলিত হয় অতীত, ইতিহাস আর ভবিষ্যত সক্রিয়সমাধানের প্রয়োজননিরিখে। সাহিত্য নামে আলাদা কোন প্রজাতিকে ঠাঁই দিলে তা কেবল পলায়নই হয় আর সে পথ জীবনের নয়, সাহিত্যের নয়, পণ্যের বলেই উপলব্ধ হয় আমার।
সাহিত্য এক অর্থে বাস্তবতার সাথে যৌথবন্ধন জারি রাখতে নিরাপোষীভাবে সংঘর্ষপূর্ণজীবনকে উদযাপন এবং অন্যকে উদ্ধার নয়। যে নিজেকে উদ্ধার করতে পারে না সেসাহিত্য অন্যের কাছেও প্রজ্ঞাসজ্ঞাসাহসসংঘর্ষউজ্জীবন নিয়ে উপস্থিত হতে পারে না, এটাই তো স্বাভাবিক, ব্যতিক্রমতো এখানে কখনই প্রধান বিবেচ্য হতে পারে না, তাই না?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



