somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চলচ্চিত্রের শৈল্পিক যৌনদৃশ্য বনাম বাংলা ছবির অশ্লীলতা

০৭ ই মে, ২০০৯ দুপুর ১:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্টার মুভিজ কিংবা এইচবিও চ্যানেলের কোন একটি হলিউড মুভির কথা চিন্তা করি। একটা বয়সে কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে কিছু মানুষ বিশেষ কারণে ঘন্টার পর ঘন্টা স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে ঢুঁ মেরে রোমান্টিক ধাঁচের হলিউড মুভি দেখে বিশেষ কিছু দৃশ্যের জন্য, যেগুলোকে সচরাচর আমরা Sex Scene বা যৌনদৃশ্য বলি। পাশ্চাত্যের একটা চলচ্চিত্রে এ ধরণের দৃশ্য থাকাটা অতি স্বাভাবিক। ঋতুপর্ণ ঘোষের একটা স্বগতোক্তি না করে পারছি না। আগে সন্তান জন্মদানের জন্য ভারতের নারীদের যৌন নিপীড়ন করা হতো। এ সত্যটিকে উপলব্ধি করে ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর একটি ছবিতে যৌনদৃশ্য উপস্থাপন করেন। এতে অনেকেই তাকে বলেন, তিনি নাকি পর্নোগ্রাফী তৈরী করেছেন! ঋতুপর্ণ ঘোষ তখন বলেন, পর্নোগ্রাফী আর চলচ্চিত্রের যৌনদৃশ্য এক না। পর্নোগ্রাফীর কাজ মূলত মানুষকে শারীরিকভাবে উত্তেজিত করা। আর চলচ্চিত্রে মানুষের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছুই প্রদর্শিত হয়। এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, যৌনতা জীবনের অপরিহার্য অংশ। তাই এটা চলচ্চিত্রেরও অংশ। তবে আমি এসব বাদ দিয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি। ঋতুপর্ণ ঘোষের এই উক্তি কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা জানি না, তবে এটা বলতে পারি, এই উপমহাদেশে যৌনদৃশ্যের প্রচলন ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে হলিউড কিংবা বিদেশি ছবির অনুকরণেই। তবে একেবারে রাখঢাক না রেখে যৌনদৃশ্যের প্রচলন মূল ধারার বাণিজ্যিক ছবিগুলোতে কখনোই দেখা যায় নি। ফুল ন্যুড যৌনদৃশ্য এখন পর্যন্ত ইন্ডিয়ার মূল ধারার বাণিজ্যিক ছবিগুলোতে প্রদর্শিত হয়নি। ফ্যাশন (২০০৮) ছবির একটি দৃশ্যে একজন মডেল (কঙ্গনা রনৌত) কে ক্যাটওয়াকিং এর সময় উর্ধ্ব বসন খুলে পড়ে যেতে দেখা যায়। তবে দৃশ্যটা ব্লার (ঝাপসা) করে দেয়া এবং বুকের অংশ বোঝার উপায় নেই!

সম্প্রতি দেখা একটি ছবির কথা উল্লেখ করি। কেট উইন্সলেট অভিনীত 'হলি স্মোক' ছবিতে যৌন উত্তেজক কিছু দৃশ্য আছে। তবে সেগুলো রাতের অন্ধকারে ধারণ করা এবং লাইটিং এফেক্ট দিয়ে স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখা হয়েছে। তারপরও দৃশ্যগুলোর আবেদন অতিমাত্রার স্বীকার করতেই হয়। সেখানে অরগাজমের কথা বলা হলেও তা দেখানো নিষিদ্ধ। অনেক নিষিদ্ধ কথা-বার্তাই হলিউড ছবিতে আমরা শুনি। Fuck শব্দটা চিরপরিচিত হলিউড মুভির নায়ক-নায়িকার কণ্ঠে। পাশ্চাত্যের শব্দ, ইংরেজি গালি তাই আমাদের কাছে তা স্বাভাবিক। এখন পর্যন্ত এই শব্দ বলিউডের কোন ছবিতে শোনা যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশের সস্তা বাণিজ্যিক ছবির অশ্লীল গালিগুলো শুনতে শুনতে কান পচে যায়, একঘেয়েমি ও বিরক্তির সৃষ্টি হয়। এর কারণ কী?

জাঁদরেল কিংবা নষ্টা মেয়ের কথা উল্লেখ করতেই হয়। বিকৃত গানের কথার তালে তালে নারীদেহের সম্পূর্ণ নগ্ন দৃশ্যের ধিকৃত প্রদর্শন আর উন্মত্ত ধর্ষণদৃশ্য...উফ! আমাদের রুচিবোধকে দারুণভাবে আহত করে। অনেকে ক্ষেত্রে নায়িকার অনুমতি না নিয়ে তার শরীরের মুখের অংশ প্রদর্শনের পাশাপাশি ডামি মেয়েদের নগ্ন শরীর জুড়ে দেয়া হয় এবং তা বিকৃতভাবে প্রদর্শিত হয়। বাসররাতের স্বাভাবিক যৌন কার্যকলাপের দৃশ্যগুলোও বাংলা চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত হয় অস্বাভাবিকভাবে। ডিপজল কিংবা মিশা সওদাগর এর বাংলার পাঁচ মার্কা অভিনয়, গুটিকয়েক নায়ক-নায়িকার ছিনালিপনা সবমিলিয়ে বারোটা বাজা বাংলা চলচ্চিত্র সুস্থ ধারার মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে রিক্সাচালক শ্রেণীর মানুষদের কাছে এখন পর্যন্ত জনপ্রিয়। আমাদের কেন বিদেশের ছবি দেখতে হয় স্বদেশের ছবির চাইতে? কেন বাংলা চলচ্চিত্র অসুস্থ পথে হাঁটছে? এই প্রশ্নের পাশাপাশি আশা জাগানিয়া উত্তর পাই যখন ওরা ১১ জন, নিরন্তর, শ্যামল ছায়া'র মতো সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রগুলোর কথা ভাবি।
হুমায়ূন আহমেদের জনম জনম উপন্যাস থেকে তৈরী আবু সাইয়ীদ পরিচালিত নিরন্তর ছবি প্রসঙ্গে আসি। জনম জনম একটা সার্থক উপন্যাস এবং প্রাণছোঁয়া, বাস্তবধর্মী। সে দিক থেকে নিরন্তর একটু হলেও মূল উপন্যাস আঙ্গিক থেকে দূরে সরে গেছে। আর বাংলা চলচ্চিত্রে পুরনো মুখ দেখতে দেখতে চোখ প্রায় অন্ধ হবার জোগাড়! নতুন মুখ পাবোই বা কী করে? পরিচালকদের চরিত্র ভালো না, এফডিসি ভালো জায়গা না, সিনেমার নায়িকাদের স্ক্যান্ডাল সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক ফিল্ম মিডিয়া আসলেই কী বাণিজ্যিক হয়ে গেছে? শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থে অশ্লীল কিংবা 'গরীবের ছেলে' টাইপ ছবি নির্মিত হবে সেকেলে জিনিসপত্র দিয়ে?নিরন্তর ছবিতে একটি কৌশলী যৌনদৃশ্য আছে। অবাক লাগে, যখন ডিভিডির দোকানে যুবক ছেলেরা ছবির ডিভিডি নিতে চায় শুধুমাত্র সেই দৃশ্যটার কারণে! কষ্ট লাগে, আমার বয়সীরা নিরন্তর ছবির মূল ভাবটাকে উপলব্ধি না করে সেই বিশেষ দৃশ্যটাই উপজীব্য হিসাবে দেখছে।

তাহলে এটাই দাঁড়াচ্ছে যে, বাংলা চলচ্চিত্র স্বাভাবিক কিংবা অস্বাভাবিক যৌনদৃশ্যের জন্য এখনো প্রস্তুত না। এখনো অনেক পরিবার আছে, যেখানে ধর্মীয় আলাপ ব্যতীত হলিউডের ছবি দেখা তো দূরের কথা, বেদআতি যে কোন কাজ-কর্মই হারাম! যৌনদৃশ্যসংবলিত সিনেমা কোন চ্যানেলে প্রদর্শিত হলে চ্যানেল পাল্টে অন্য চ্যানেল অন করার মনোভাবাপন্ন পিতা-মাতার অভাব নেই এদেশে। এ থেকে কিশোর-কিশোরীরা কি শিখবে? এতে করে তাদের স্বাভাবিক একটা জিনিসের প্রতি কৌতূহল থেকেই যাবে। এর উত্তর খুঁজতে তারা এক্স-রেটেড ছবিগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হবে। বিকৃত যৌনাচরণ তাদের সহিংস করে তুলবে। তাই বাংলা চলচ্চিত্রে এতদিন আমরা যৌনতার শৈল্পিক উপস্থাপন দেখি নি যতটা না দেখেছি গণধর্ষণদৃশ্য, ফায়ার ছবিতে পলির বস্ত্রহরণদৃশ্য আর অহেতুক ছিনালীপনা। হলিউডের বাণিজ্যিক ছবিগুলোর যৌনদৃশ্য স্বাভাবিক মনে হয়, কেননা পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি আর বাঙালি সংস্কৃতি এই দুটো যোজন যোজন দূরের বিষয়। আমরা আমাদের নারীদের পর্দায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় দেখতে চাইনা বলেই সুস্থধারার চলচ্চিত্রে যৌনদৃশ্যের স্থান নেই। যেটা আছে সেটা কৌশলী। কোনরকমে বুঝিয়ে দেয়া। খোলামেলা নয়। টেকনিক্যাল। কনডম এর বিজ্ঞাপনগুলো যেরকম। কিন্তু জাঁদরেল কিংবা ফায়ার এর মতো ভায়োলেন্ট বাংলা চলচ্চিত্রগুলো একেবারেই 'লাগামছাড়া ঘোড়া'র মতো। চলচ্চিত্র নির্মাণের কলা-কৌশল সব ছাপিয়ে সেগুলোর পরিচালকরা যেন একটা থার্ড গ্রেডেড বাংলা সেক্স কালচার তৈরী করেই যাচ্ছেন। তাইতো অশ্লীলতা ঠেকাতে আমাদের প্রয়োজন অশ্লীলতাবিরোধী টাস্কফোর্স, সিনেমা হলগুলোতে ভ্রাম্যমান বারবনিতাদের পদচারণা...বাণিজ্যিক ছবি মানেই ব্যবসা, গোঁফওঠা কিশোরদের স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে ব্রোথেল হাউসগুলোর মতো সিনেমার হলেও উঁকি-ঝুঁকি করা। তাইতো,বাংলা চলচ্চিত্রের অস্বাভাবিক যৌনদৃশ্যগুলো অশ্লীলতা আর পাশ্চাত্যের চলচ্চিত্রগুলো আন্তর্জাতিক ভাষায় Sex Scene. এই সেক্স জিনিসটাকেই চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা তাদের নেই তাইতো বিকৃতিঢঙে নারীদেহ উপস্থাপন, তাও আবার গানের তালে তালে!

আমরা অপেক্ষা করছি একটা সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায়...
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মে, ২০০৯ দুপুর ১:৫৮
৪২টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×