সম্প্রতি দেখা একটি ছবির কথা উল্লেখ করি। কেট উইন্সলেট অভিনীত 'হলি স্মোক' ছবিতে যৌন উত্তেজক কিছু দৃশ্য আছে। তবে সেগুলো রাতের অন্ধকারে ধারণ করা এবং লাইটিং এফেক্ট দিয়ে স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখা হয়েছে। তারপরও দৃশ্যগুলোর আবেদন অতিমাত্রার স্বীকার করতেই হয়। সেখানে অরগাজমের কথা বলা হলেও তা দেখানো নিষিদ্ধ। অনেক নিষিদ্ধ কথা-বার্তাই হলিউড ছবিতে আমরা শুনি। Fuck শব্দটা চিরপরিচিত হলিউড মুভির নায়ক-নায়িকার কণ্ঠে। পাশ্চাত্যের শব্দ, ইংরেজি গালি তাই আমাদের কাছে তা স্বাভাবিক। এখন পর্যন্ত এই শব্দ বলিউডের কোন ছবিতে শোনা যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশের সস্তা বাণিজ্যিক ছবির অশ্লীল গালিগুলো শুনতে শুনতে কান পচে যায়, একঘেয়েমি ও বিরক্তির সৃষ্টি হয়। এর কারণ কী?
জাঁদরেল কিংবা নষ্টা মেয়ের কথা উল্লেখ করতেই হয়। বিকৃত গানের কথার তালে তালে নারীদেহের সম্পূর্ণ নগ্ন দৃশ্যের ধিকৃত প্রদর্শন আর উন্মত্ত ধর্ষণদৃশ্য...উফ! আমাদের রুচিবোধকে দারুণভাবে আহত করে। অনেকে ক্ষেত্রে নায়িকার অনুমতি না নিয়ে তার শরীরের মুখের অংশ প্রদর্শনের পাশাপাশি ডামি মেয়েদের নগ্ন শরীর জুড়ে দেয়া হয় এবং তা বিকৃতভাবে প্রদর্শিত হয়। বাসররাতের স্বাভাবিক যৌন কার্যকলাপের দৃশ্যগুলোও বাংলা চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত হয় অস্বাভাবিকভাবে। ডিপজল কিংবা মিশা সওদাগর এর বাংলার পাঁচ মার্কা অভিনয়, গুটিকয়েক নায়ক-নায়িকার ছিনালিপনা সবমিলিয়ে বারোটা বাজা বাংলা চলচ্চিত্র সুস্থ ধারার মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে রিক্সাচালক শ্রেণীর মানুষদের কাছে এখন পর্যন্ত জনপ্রিয়। আমাদের কেন বিদেশের ছবি দেখতে হয় স্বদেশের ছবির চাইতে? কেন বাংলা চলচ্চিত্র অসুস্থ পথে হাঁটছে? এই প্রশ্নের পাশাপাশি আশা জাগানিয়া উত্তর পাই যখন ওরা ১১ জন, নিরন্তর, শ্যামল ছায়া'র মতো সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রগুলোর কথা ভাবি।
হুমায়ূন আহমেদের জনম জনম উপন্যাস থেকে তৈরী আবু সাইয়ীদ পরিচালিত নিরন্তর ছবি প্রসঙ্গে আসি। জনম জনম একটা সার্থক উপন্যাস এবং প্রাণছোঁয়া, বাস্তবধর্মী। সে দিক থেকে নিরন্তর একটু হলেও মূল উপন্যাস আঙ্গিক থেকে দূরে সরে গেছে। আর বাংলা চলচ্চিত্রে পুরনো মুখ দেখতে দেখতে চোখ প্রায় অন্ধ হবার জোগাড়! নতুন মুখ পাবোই বা কী করে? পরিচালকদের চরিত্র ভালো না, এফডিসি ভালো জায়গা না, সিনেমার নায়িকাদের স্ক্যান্ডাল সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক ফিল্ম মিডিয়া আসলেই কী বাণিজ্যিক হয়ে গেছে? শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থে অশ্লীল কিংবা 'গরীবের ছেলে' টাইপ ছবি নির্মিত হবে সেকেলে জিনিসপত্র দিয়ে?নিরন্তর ছবিতে একটি কৌশলী যৌনদৃশ্য আছে। অবাক লাগে, যখন ডিভিডির দোকানে যুবক ছেলেরা ছবির ডিভিডি নিতে চায় শুধুমাত্র সেই দৃশ্যটার কারণে! কষ্ট লাগে, আমার বয়সীরা নিরন্তর ছবির মূল ভাবটাকে উপলব্ধি না করে সেই বিশেষ দৃশ্যটাই উপজীব্য হিসাবে দেখছে।
তাহলে এটাই দাঁড়াচ্ছে যে, বাংলা চলচ্চিত্র স্বাভাবিক কিংবা অস্বাভাবিক যৌনদৃশ্যের জন্য এখনো প্রস্তুত না। এখনো অনেক পরিবার আছে, যেখানে ধর্মীয় আলাপ ব্যতীত হলিউডের ছবি দেখা তো দূরের কথা, বেদআতি যে কোন কাজ-কর্মই হারাম! যৌনদৃশ্যসংবলিত সিনেমা কোন চ্যানেলে প্রদর্শিত হলে চ্যানেল পাল্টে অন্য চ্যানেল অন করার মনোভাবাপন্ন পিতা-মাতার অভাব নেই এদেশে। এ থেকে কিশোর-কিশোরীরা কি শিখবে? এতে করে তাদের স্বাভাবিক একটা জিনিসের প্রতি কৌতূহল থেকেই যাবে। এর উত্তর খুঁজতে তারা এক্স-রেটেড ছবিগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হবে। বিকৃত যৌনাচরণ তাদের সহিংস করে তুলবে। তাই বাংলা চলচ্চিত্রে এতদিন আমরা যৌনতার শৈল্পিক উপস্থাপন দেখি নি যতটা না দেখেছি গণধর্ষণদৃশ্য, ফায়ার ছবিতে পলির বস্ত্রহরণদৃশ্য আর অহেতুক ছিনালীপনা। হলিউডের বাণিজ্যিক ছবিগুলোর যৌনদৃশ্য স্বাভাবিক মনে হয়, কেননা পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি আর বাঙালি সংস্কৃতি এই দুটো যোজন যোজন দূরের বিষয়। আমরা আমাদের নারীদের পর্দায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় দেখতে চাইনা বলেই সুস্থধারার চলচ্চিত্রে যৌনদৃশ্যের স্থান নেই। যেটা আছে সেটা কৌশলী। কোনরকমে বুঝিয়ে দেয়া। খোলামেলা নয়। টেকনিক্যাল। কনডম এর বিজ্ঞাপনগুলো যেরকম। কিন্তু জাঁদরেল কিংবা ফায়ার এর মতো ভায়োলেন্ট বাংলা চলচ্চিত্রগুলো একেবারেই 'লাগামছাড়া ঘোড়া'র মতো। চলচ্চিত্র নির্মাণের কলা-কৌশল সব ছাপিয়ে সেগুলোর পরিচালকরা যেন একটা থার্ড গ্রেডেড বাংলা সেক্স কালচার তৈরী করেই যাচ্ছেন। তাইতো অশ্লীলতা ঠেকাতে আমাদের প্রয়োজন অশ্লীলতাবিরোধী টাস্কফোর্স, সিনেমা হলগুলোতে ভ্রাম্যমান বারবনিতাদের পদচারণা...বাণিজ্যিক ছবি মানেই ব্যবসা, গোঁফওঠা কিশোরদের স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে ব্রোথেল হাউসগুলোর মতো সিনেমার হলেও উঁকি-ঝুঁকি করা। তাইতো,বাংলা চলচ্চিত্রের অস্বাভাবিক যৌনদৃশ্যগুলো অশ্লীলতা আর পাশ্চাত্যের চলচ্চিত্রগুলো আন্তর্জাতিক ভাষায় Sex Scene. এই সেক্স জিনিসটাকেই চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা তাদের নেই তাইতো বিকৃতিঢঙে নারীদেহ উপস্থাপন, তাও আবার গানের তালে তালে!
আমরা অপেক্ষা করছি একটা সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায়...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

