পর্নোগ্রাফি, পর্নো ভিসিডি এবং নিঃশেষ হয়ে যাওয়া কৈশোর
আজ থেকে ছয় বছর আগের কথা। পড়ি ক্লাস সেভেনে। সদ্য প্রাইমারি লেভেল পেরিয়ে হাইস্কুলে উঠেছি। চারপাশে নতুন মুখ, সবই কিশোর... কিশোরীর দ্যাখা নেই, এ কারণে স্কুলের প্রতি কিছুটা অনাগ্রহ! নতুন বন্ধু হলো, সদ্য শৈশব পেরিয়ে স্বচ্ছ কচি ধানের মতো কৈশোরের রঙিন জীবন অনেকটাই একঘেয়ে হয়ে উঠছিলো। তার উপর দুর্দান্ত কম্পিটিশন, ফার্স্ট কিংবা সেকেন্ড প্লেস ধরে রাখার কী দুর্মর চেষ্টা! ক্লাসে যার সাথে সবচে' ভালোভাবে মিশতাম (এখনো যার সাথে সম্পর্ক অটুট আছে) তার সাথেই সবকিছু শেয়ার করতাম। মানে, পড়াশোনা, সিনেমা, গান প্রভৃতি। তখন সম্ভবত নতুন একটা সুপার হিট হিন্দী সিনেমা রিলিজ হয়েছিলো। ঘরে ঘরে কম্পিউটার পৌঁছেনি সবার। ক্লাসের ভেতরে শুধু আমার আর সেই বন্ধুর ঘরেই ছিলো কম্পিউটার। একদিন আলাপ চলছিলো সেই বন্ধুর সাথে...
- সিনেমাটা নাকি ভালোই হিট করছে, তোর কাছে কী সিডি আছে?
- থাকবে না মানে? তোর লাগবে?
- হ্যাঁ, দেখতে পারলে ভালো লাগতো...
- আচ্ছা ঠিক আছে। কালকে নিয়ে আসবো নি স্কুলে...
- আরে দরকার নাই! স্যাররা দেখে ফেললে মাইর দিবে... আমি পরে তোর বাসায় গিয়ে নিয়ে আসবো...
- আরে ধুর! আমি ব্যাগে করে লুকায়া নিয়ে আসবো... নো টেনশন...
২.
পরদিন স্কুল পৌঁছতেই ও বললো, সিডি নিয়ে এসেছে। আমি খুশি হলাম। ক্লাস শুরুতেই ও চারটা সিডি আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলো। চারটার মধ্যে একটা সিডির খাপ দেখে বুঝলাম সেটা হিন্দি ছবিটা। কিন্তু বাকি তিনটার ওপর কোনো কাভার নাই... এগুলো কীসের সিডি? জিজ্ঞাসা করতেই ও মুচকি হেসে বললো, আরে দোস্ত, দারুণ জিনিস! বাসায় নিয়া গেলেই বুঝবি... সমানে দেখবি শুধু... বুঝলি?
আমার একটু সন্দেহ হলো। এমন কী জিনিস হতে পারে? তখন স্থানীয় এবং জাতীয় পত্রিকাগুলোতে প্রায়ই শিরোনাম হতো, 'টু-এক্স, থ্রি-এক্স, অশ্লীল চায়নিজ ছবিতে ভর্তি কাটপিস প্রদর্শিত হচ্ছে নামী দামী প্রেক্ষাগৃহগুলোতে..." পত্রিকা পড়ার কারণে একটু হলেও মন বলছিলো, এই সিডিগুলোতেও সম্ভবত তেমনই কিছু থাকতে পারে! সহপাঠীদের মধ্যে কতিপয় বিকৃত রুচির বখাটে কিশোর (তাদের বখাটে বলে অসম্মান করছি না, সবাই পরিস্থিতির শিকার!) দের আলাপচারিতাও মাঝে মাঝে অনেক কিছুরই ইশারা দিতো। ছুটির ঘণ্টা পড়বার আগে সেই সিডিগুলো ওকে ফেরত দিতে চাইলে ও ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেলো। আবারো একই কথার পুনরাবৃত্তি করলো। আমি অনেকটা জোর করে সিডিগুলো ঢুকিয়ে দিলাম ব্যাগে। এদিকে অন্যান্য সহপাঠীরাও কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। আমি কথা না বাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। সারা রাস্তা একটা কৌতূহল কিংবা অপরাধবোধ তাড়িয়ে বেড়ালো। মা'র সাথে বাসায় ফিরে আনুষঙ্গিক কাজ-কর্ম সেরে হিন্দী সিনেমার ডিস্কগুলো একটা করে কম্পিউটার রম ড্রাইভে ঢোকালাম। দু'টো সিডি, ডিস্ক-১ এবং ডিস্ক-২। নাহ্ কই... এটাতো সেই হিন্দি সিনেমারই সিডি! আমি অযথাই ওকে সন্দেহ করেছি! আমি অনুতপ্ত হলাম অযথাই সন্দেহ করবার জন্যে। প্রথম সিডিটা দেখা শেষ হলে দ্বিতীয় সিডিটা প্রবেশ করিয়ে হিরো সফটে চালু করতেও আঁতকে উঠলাম!
এ কী???
আমার সমগ্র চিন্তা চেতনাকে ধ্বংস করে দিয়ে প্রিয় বন্ধু হিন্দী সিনেমার দুটো সিডির একটাতে পর্নো ছবি দিয়ে দিয়েছে! আমার হৃৎপিণ্ড গর্জে উঠলো... লজ্জা, ক্ষোভ আর অভিমানে...
সাথে সাথে সেকেন্ডর ভেতরে কম্পিউটার বন্ধ করে দিলাম। লজ্জা-গ্লানিতে বুক চেপে আসলো। রাতে শুরু হলো ভীষণ জ্বর... অপমানবোধ, অপরাধবোধে সারা রাত নির্ঘুম কাটলো...
৩.
পরদিন স্কুলে গিয়ে ওকে খুঁজলাম। জোরে একটা আঘাত করার পর ওর সামনেই সিডিটা ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেললাম... আমার ওভার-রিঅ্যাকশনের কারণ ও বুঝতে পেরেছিলো বলেই হয়তো আমাকে আঘাত করার চিন্তা ওর মাথায় আসেনি কিংবা সত্যিই আমাকে ভালোবাসতো বলেই বুঝতে পেরেছিলো। ও অনেক চেষ্টা করেছে, আবারো যেন দুই বন্ধু আমরা একসাথে হাসি, খেলি... শেয়ার করি সবকিছু... নাহ্, আমি আর ওর সাথে মিশলাম না। ওর ভেতরেও অপরাধবোধ তীব্র হয়ে উঠলো।
- তোর পার্ট বেড়ে গেছে রুদ্র... কথাই বলিস না এখন!
- তাতে তোর কী? সারাদিনতো ফালতু ছবি দেখিস...
- আমার বড় ভাই যদি দ্যাখে আমি কেন দেখবো না? প্রথম প্রথম আমারো খারাপ লাগছিলো রে দোস্ত...
- তুই আর তোর বড়ভাই এক মানুষ না। তুই আলাদা...
ওর সাথে দীর্ঘ দু' বছর কথা না বলার পর আবারো ও আমার বন্ধু হয়ে উঠলো। এবার সে দারুণ প্রতিবাদী। অশ্লীলতা কিংবা বাথরুমের চিপায় সিগারেট খাওয়া- এসবের বিরুদ্ধে সে সতর্ক।
সেই বন্ধুটা আমার এস.এস.সি. তে এ+ পেয়েছিলো। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, এটাই জীবন, তাই না? ওর চোখের অশ্রু আমাকে ফাঁকি দিতে পারলেও, ও একটা কথাই বললো, সবই তোর জন্য...
আমরা এখনো বন্ধু আছি। বন্ধু থাকবো। সারাটা জীবন। মৃত্যু পর্যন্ত...
৪.
তখন আমার বয়স ছিলো দশ কি এগারো। একটা শিশু কিংবা কিশোর যখন প্রথম অশ্লীল ছবি দ্যাখে তার প্রতিক্রিয়া কিন্তু এরকমই হয়! হয়তো অনেকে প্রস্তুত থাকে... কিন্তু গড়পড়তায় নিষ্পাপ একজন কিশোর যার হয়তো সেক্সুয়ালিটি সম্পর্কে হালকা ধারণা থাকলেও ভিজুয়াল কোনো কিছু সম্পর্কে ধারণা নেই, সে তখন কৌতূহলী হয়ে থ্রি-এক্স ছবি দেখে কিছু ভুল ধারণাকে সঠিক বলে মেনে নেবে এবং বিপথগামী হবে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটাই বাস্তবতা। আমরা এভাবেই বড়ভাই কর্তৃক কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক পর্নো সিডির ব্যবসায়ী কর্তৃক প্রলোভিত হয়ে বিপথগামী হচ্ছি। কে দেখাবে সঠিক পথ? এখনো কেন পাঠ্যবইতে সেক্সুয়ালিটি সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা হয় নি? যেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা থাকবে। কৈশোরের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানও থাকবে।
৫.
একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে উদ্বিগ্ন হয়েই পোস্টটা লিখলাম। রাজধানীতেই পর্নো ভিসিডি নির্মাণ হচ্ছে - এই সংবাদ শুধু আতঙ্কিত নয়, তিরিশ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার বার্তাকেও ধিকৃত করে। আমরা জানি, আমেরিকা, ভারত, ব্যাংকক এর কী অবস্থা! ভারতে এমএমএস, বিশেষ করে পর্নো উপাদানে ভরপুর এমএমএস দারুণ জনপ্রিয়! আর আমাদের দেশেও তো তার নমুনা দেখছি... প্রাপ্তবয়স্করাই এসব করছে, কোনো ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কিশোর, প্রতারণার শিকার কিশোরী মেয়েটি। সম্প্রতি গণধর্ষণের দৃশ্য ভিডিও করার ঘটনাও ঘটেছে। বাড়ছে প্রতারণা। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত কালক্ষেপণ না করে দ্রুত অপারেশনে ঝাঁপিয়ে পড়া। আমরা এমনিতেই মাদক-সমস্যায় জর্জরিত। সেখানে এই অশ্লীলতা বারুদে আগুনের মতো। দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। প্রয়োজনে ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফিও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ, এখন ঘরে বসেই অশ্লীল ছবি প্রদর্শন সহজলভ্য। পর্নোগ্রাফি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য যদি হয়েই থাকে তাহলে এর শিকার কেন শিশু-কিশোররা! রাজধানীতে ৭৭ শতাংশ কিশোর পর্ন অ্যাডিক্ট (মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন জরিপ ২০০৯)। অর্থাৎ পর্নোগ্রাফি এখন সংস্কৃতির একটা অংশ হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এর বিস্তার রোধে যুবসমাজকেই কাজ করতে হবে। ১৯৭১ এ কিন্তু এত কিছু ছিলো না। তবুও ঋষি-মুনিদের মতো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো রুমির মতো রক্ত টগবগে তরুণ। ১৯৭১ ই আমাদের আদর্শ হলে অশ্লীলতাকে ঘৃণা করতে হবে। রক্ষা করতে হবে মানুষকে... কিশোর সমাজকে... যুবসমাজকে... (যদিও এটা প্রায় দুঃসাধ্য তবে মানুষের অসাধ্য বলে তো কিছু নেই, তাই নয় কি?)
আসলে কেউ ফেরে না।
মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর
যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।