কখনও এমন হয়। স্মৃতির জঠর থেকে আচমকাই একদিন উঠে আসে পুরনো পাপেরা। মানুষ যখন ধরে নেয় প্রায়শ্চিত্ত বুঝি করতে হবে না কোনো দিন,কিংবা ভুলেও যায় যে সে কখনও অংশীদার ছিল অমন একটি পাপের.. .. ..
ঠিক তখনই আবার সজীব হয়ে উঠে জীবনের কবরে চাপা পড়া পুরনো কোনো কাহিনী। ফিরে আসে,পুনরাবৃত্তি করে ইতিহাস নিজেকে।
কিন্তু তাতে কি সত্যি লাভ হয় কোনো?প্রভাব কি পড়ে অপরাধী সেই মানুষটির মনে?
১)
রিয়া এতটাই আর্কষনীয়া যে চোখ ফেরানো দায়।অবশ্য সে চেষ্টাও কখনও করে না সুদীপ।এই নারী তার ভালোবাসা,হবু স্ত্রী।তাকিয়ে থাকার শতভাগ অধিকার তার আছে।
চমৎকার একটি মেয়ে।দারুণ সুন্দরী,পেশায় ডাক্তার।ফ্যামিলি ব্যাক গ্রাউন্ড অসম্ভভব ভালো।রিয়া হচ্ছে এমন একটি মেয়ে যাকে দশ জনের সামনে পরিচয় দিতে বাধে না,যাকে দেখে বন্ধুরা ঈর্ষা করে সুদীপের ভাগ্যকে।এবং সর্বোপরি- নিজের পরিবারের সামনে যাকে বিয়ের কথা বলতে সংকোচ করতে হয়নি এতটুকু।আফটার অল,সমাজে রিয়ার পরিবারের খুব ভালো একটা অবস্থান আছে!
"আজ হঠাৎ লানচ আওয়ারে হাজির যে সাহেব?"ভ্রু নাচায় রিয়া।"মা ভাত বেড়ে বসে নেই আপনার জন্যে?"
কথাটা একটু গায়ে লাগলেও পাত্তা দেয় না সুদীপ।হাসে।"চলো,আজ বাইরে লানচ করি।"
"বাব্বাহ!এতো উন্নতি?"
"যাবে কিনা বলো!"
"যাওয়ার আগে ছোট্ট একটা কাজ সারতে হবে।এক পেশেন্টকে একটু দেখবো।চলো!"
পাশে পাশে চলে সুদীপ,যখন করিডর ধরে কেবিনগুলোর দিকে এগোয় রিয়া ধীর পায়ে।
"হসপিটালে একটা মেয়ে ভর্তি হয়েছে.. .. খুব সাদাসিধে একটা মেয়ে।নিজেই এসে ভর্তি হয়েছে কিছু টাকাপয়সা ডিপোজিট দিয়ে। ভালো পরিবারের মেয়ে-কথা বার্তা,চেহারা থেকেই বোঝা যায়।সাথে আছে শুধু একটা বাচ্চা মেয়ে,বছর চারেক হবে বয়স.. .. .."
"স্ট্রেন্জ!!কি হয়েছে মেয়েটার?কঠিন কিছূ?"
"বাঁচবে না।কোনো আশাই নেই।লিভার থেকে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে শরীরের ভেতরে।এতদিন যে কি করে বেঁচে আছে সে,সেটাই আশ্চর্য!
এবার যেন একটু আগ্রহী হয়ে ওঠে সুদীপ।"আহারে বেচারী!আত্মীয়-স্বজন কেউ খোঁজ নেয়নি?"
"কেউ না।একটা কাক-পক্ষীও না।আমি শুধু ভাবি আফসানা মারা গেলে ওর মেয়েটার কি হবে।সারাদিন মুমূর্ষ মায়ের পাশে বসে থাকে সে।একটু কাঁদে,বিরক্ত করে না।"
"মেয়েটার নাম তাহলে আফসানা?"
"হ্যাঁ।"
জানে না কেন,অকারণেই বুকের মাঝে কিছু একটা এলোমেলো হয়ে যায় সুদীপের।"বেচারা মেয়েটা!.. ..ওর স্বামী?সে কই?"
"স্বামী?.. ..হায়রে স্বামী!!যে পুরুষের সন্তান বুকে আগলে বেঁচে ছিল বোকা মেয়েটা,তার সাথে আফসানার কোনোদিন বিয়েই হয়নি।প্রেমিক ছিল,বিয়ের ওয়াদা করেছিল। কিন্তু বাচ্চা পেটে আসতেই.. .. সাহেব ফুরুৎ!.. ..সেই চির পুরনো কাহিনী!"
"এইসব বোকা মেয়েরা তো এসব করেই নিজের সর্বনাশ ডেকে আনে।শরীরের চাহিদা সামলাতে পারে না,পরে প্রেগনেন্ট হয়ে.. .."
"এভাবে বলবে না।এখানে আফসানার কি খুব বেশী দোষ?মানুষ নিজের ভালোবাসাকেও বিশ্বাস করবে না,তো কাকে করবে?"
"তাই বলে নুন্যতম বাস্তবতার বোধ তো থাকা উচিত।"
"তা অবশ্যই উচিত।কিন্তু আফসানা মেয়েটা আর দশজনের মতো নয়।খুব সরল,পরিষ্কার মনের একটা মেয়ে।বেশী সাদামাটা।নিজের সরলতার মূল্য এখন বোকা মেয়েটাকে জীবন দিয়ে শোধ করতে হচ্ছে।কিন্তু একটা জিনিস দেখো,এত কিছুর পরেও সেই প্রতারকের সন্তানকে বুকে আগলে মানুষ করেছে সে!"
"তুমি মেয়েটার প্রতি বেশী দুর্বল হয়ে পড়েছো,জান।তাই এতো খারাপ লাগছে।"
"হয়তো.. ..তুমি আজ এসেছো,ভালো হয়েছে খুব।আফসানার খুব ইচ্ছা তোমার সাথে পরিচিত হবার।"
"আমার সাথে?"
"আফসানাকে তোমার ছবি দেখিয়েছিলাম।তারপর থেকে দেখা হলেই তোমার কথা বলতো।"
"এখনই যেতে হবে?"
"মৃত্যু পথযাত্রী একটা মানুষের শেষ ইচ্ছা তুমি রাখবে না?"
"আচ্ছা,ঠিক আছে বাবা।যাচ্ছি তো।"
পুরষ্কার স্বরূপ ভীষন সুন্দর একটা হাসি উপহার দেয় রিয়া।এতই সুন্দর যে ঘোর লাগে সুদীপের চোখে।একবারও মনে পড়ে না-অনেক বছর আগে অপর একটি মেয়ে প্রেমিকা ছিল তার।মেয়েটাকে কখনও ভালোই বাসেনি সে,বিয়ে করা তো অনেক দূরের ব্যাপার।সাদামাটা,সাধারণ একটি মেয়ে ছিল।তাই সহজলভ্যও।মেয়েটা ছিল কেবলই তার শয্যাসঙ্গিনী,অল্প বয়সের এক্সপেরিমেন্ট।
এসবের কথা কেউ মনে রাখে? না,রাখে না।জীবনের পথে চলতে গেলে এসব হাবিজাবি মানে রাখলে চলে না।
সুদীপের একবারও মনে পড়ে না যে সাদাসিধে,আটপৌরে সেই মেয়েটার নাম ছিল আফসানা।যাকে সে ফেলে এসেছিল স্মৃতির ডাস্টবিনে।
২)
হ্যাঁ,সেই মুখটাই!
গায়ের রঙ বিবর্ন হয়ে গেছে কাগজের মতো।চেহারা জুড়ে অসুস্থতার রেখে যাওয়া কুৎসিত ছাপ।চোখ জোড়া স্থির তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে,চিহ্ন রয়ে গেছে গালে গড়িয়ে নামা অশ্রদের সর্বশেষ বিন্দুগুলোর।
হ্যা,কোনো সন্দেহ নেই যে এটা সেই চেহারা।সেই শ্যমলা বরণ রঙ,কাজলে আঁকা জলভরা চোখ,লম্বা একটা বিনুনী।সেই একই মুখ।নিঃসন্দেহে সেই একই চেহারা.. .. ..
কিন্তু এই মুহূর্তে-
স্রেফ একটা লাশের চেহারা।একটা লাওয়ারিশ লাশের চেহারা!
কষ্ট হয় না,বরং সাবধানে স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে সুদীপ।ভাগ্যিস জীবন্ত আফসানার সাথে দেখা হয়ে যায়নি!না জানি কি একটা সিন করতো,কি নাটক করতো।রিয়া সব জেনে গেলে যে কি হতো,আল্লাহই জানেন.. .. ..
হারামজাদী একটা!
মরার আগেও ঝামেলা পাকাতে চেয়েছে তার জীবনে।প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে।
.. ..একটু যেন বিষন্নই হয় রিয়া।"জানো,কতবার আমি ওর কাছে জানতে চেয়েছি লোকটার নাম-পরিচয়।একটাবারও মুখ থেকে বের করতে পারিনি।মৃত্যুর আগেও ওর বিশ্বাস ছিল য়ে মানুষটা ওকে ইচ্ছা করে ছেড়ে যায়নি।নিশ্চয়ই তার কোনো বড় সমস্যা হয়েছিল।"
কিছু বলে না সুদীপ,হয়তো বলতে পারে না।
একজন বয়স্কা ডাক্তার এসে লাশের পাশে স্থির বসে থাকা শিশুটিকে আলতো করে কোলে তুলে নেন।একবারও বাধা দেয় না বাচ্চা মেয়েটি,যেন এর অপোতেই সে ছিল।এবং.. ..
এতক্ষণে প্রথমবার বাচ্চা মেয়েটিকে লক্ষ্য করে সুদীপ।টুকটুকে ফর্সা একটা শিশু।মাথা ভরা এলোমেলো চুল,গোলাপী ঠোঁট আর নিঃশব্দ অশ্রু মাখা চোখজোড়া ধূসর-সবুজ।ঠিক যেন.. ...ঠিক যেন....
এই শিশুটি তার নিজের সন্তাণ?তার আপন রক্ত?ধোঁকা দেবার পরেও আফসানা সত্যিই এতকাল তার সন্তানকে বুকে আগলে মানুষ করেছে?.. .. ..এত বোকাও মানুষ হয়?
জানে না কেন,এতকাল পরে আফসানা নামের মেয়েটির জন্যে কষ্ট হতে শুরু করে সুদীপের।
পরিশিষ্টঃ
"লাশটার কি হবে,রিয়া?"
"তিনদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে হাসপাতাল কতৃপক্ষ।এর মাঝে কেউ দায়িত্ব না নিলে দাফন করে ফেলা হবে লাওয়ারিশ লাশ হিসাবে।"
শেষ একবার আফসানার মুখের দিকে তাকায় সুদীপ।"আর বাচ্চাটার কি হবে?"
"বাচ্চাটার দায়িত্ব তো আর হাসপাতালের না।কেউ যদি স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসে,তাহলে অবশ্য অন্য কথা।ডা. রোখসানা বলছিলেন দেখে শুনে ভালো কোনো এতিমখানায় দিয়ে আসবেন।"
"এতটুকু একটা বাচ্চা.. .."
"কি আর করা যাবে বলো।কপাল!.. ..চলো,লানচে যাই আমরা।"
প্রেমিকাকে অনুসরন করে সুদীপ,জানে না কখন নিজের অজান্তেই একটু যেন ভিজে আসে চোখজোড়া।
"কি হলো তোমার?এতো ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছো কেন?"
"নাহ!কোথায়?"
"বাই এনি চান্স.. .. ..আফসানাকে চিনতে নাকি তুমি?তোমার ভার্সিতেই পড়তো.. .."
"ছিঃ,জান!আমি এধরনের মেয়েদের সাথে মেলামেশা করি,তাই মনে হয় তোমার?"
"না।.... ...জাস্ট বললাম আরকি!"
প্রেমিকার হাত ধরে হাসপাতালের আবছা আধাঁর করিডর ছেড়ে বাইরের আলোর পথে অগ্রসর হয় সুদীপ।কিংবা জীবনের পথে।
পেছনে পড়ে থাকে একজন সাদাসিধে নারীর লাশ,যাকে সামান্য দাফন-কাফনের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে সুদীর্ঘ তিনটি দিন।এবং পড়ে থাকে একটি বাচ্চা মেয়ে,ভাগ্যে অনাথ আশ্রমের লিখনের অপেক্ষায়।যে মেয়েটির ধূসর-সবুজ চোখজোড়া অবিকল তার বাবার মতো।
অথবা আমরা এভাবেও বলতে পারি-
পড়ে থাকে এক লাওয়ারিশ প্রেমিকা।এবং এক লাওয়ারিশ সন্তান!
২৩.০১.২০০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

