খুব ছোট বেলায় গ্রামের কিছু ছেলের সাথে ভয়ানক রকমের বন্ধুতা হয়ে গিয়েছিলো। একটু বড় হওয়ার পরে সেই বন্ধুদের ছেড়ে যেতে হলো সম্পূর্ণ নতুন এক জায়গায়। স্কুলে যাওয়া শুরু হলো আমার। জীবনের প্রথম স্কুলের প্রথম দিন থেকেই হয়ে গেলো কিছু বন্ধু। স্কুলের প্রতি মায়া জমে গেলো, স্যারদের সাথে সম্পৃক্ততা বেড়ে গেলো। আমি গ্রামের পুরানো বন্ধুদের কথা আস্তে আস্তে ভুলে গেলাম! কিংবা কি জানি, ভুলে হয়তো যাই নি, হয়তো বর্তমান এসে মাথার ভেতরের সেই অংশগুলোতে খানিক আড়াল টেনে দিলো। মজে রইলাম বর্তমানে, দিন গত হতে থাকলো নিজের মতো করে...!
হঠাত সরকারী চাকুরে বাবার বদলীর আদেশ! চোখের পানি নাকের পানি এক করে স্কুলের বন্ধুদের সাথে হৃদয়ের বাঁধন ছিঁড়ে, সবচেয়ে কঠিনতম স্যারের চোখেও পানি এনে বিদায় নিলাম সেই জায়গা থেকে। দূরে চলে গেলাম কাছের, খুব কাছের কিছু মানুষজন, প্রকৃতি থেকে। শুরু হলো নতুন এক জায়গায় আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করার পার্বন!
কয়েকমাসের মধ্যে পড়াশুনায় 'স্থায়ীত্ব' এনে দেয়ার লক্ষ্যে, একটা নির্দিষ্ট স্কুলে রাখার অভিপ্রায়ে বাবা-মা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেন। আবারো আমার স্থান পরিবর্তন, বন্ধু পরিবর্তন, আমার শিশুমনের আঙিণা পরিবর্তন। আমরা সবকিছু বেঁধে রওনা দিলাম আবারো। খুব অল্প সময়েই একেবারে কাছের হয়ে যাওয়া টিপু, কাঁকন, পিলু, ইতি-রা মুখ থুবরে দাঁড়িয়ে থাকলো রাস্তার পাশে, চোখের কোণায় চিকচিক করা নোনা জল নিয়ে। রাস্তার বাঁকের সাথে আমাদের বাহন বাঁক নেয়ার সময় তাদের দেখা সেই মুখায়বটাই আমার শেষ দেখা, গ্রে-ম্যাটারের সিন্দুকে রাখা আমার কাছের কিছু বন্ধুর শেষ স্মৃতি। আরতো দেখা হয়নি, হবেও না হয়তো কোনদিন! কতো কাছের বন্ধুরা হারিয়ে গেলো কতো স্বাভাবিকভাবে একটা রাস্তার বাঁকের কাছে!
আবার গ্রামে ফিরে এলাম ঠিকই। কিন্তু কোথায় যেন ছন্দপতনের সুর। পুরাতন সেই বন্ধুরা কেমন 'বড়' হয়ে গেছে, আগের সেই নির্মলতাও অনুপস্থিত। হলোনা আর তাদের সাথে পুরানো বন্ধুতার সাঁকো বেয়ে চলা। স্কুলে ভর্তি হয়ে নতুন মুখের মাঝে হারিয়ে যাবার চেষ্টা করলাম। বছরের প্রায় মাঝমাঝি একটা সময়ে এসে ভর্তি হওয়ায় তেমন কেউই খুব সহজে দলে নিতে আসলো না। সবার চোখেই একটা তাচ্ছিল্যের চাহনী! খুব খারাপ লাগতো তখন। ফেলে আসা শরিফ, তোতা, নাসির, কাঁকন, টিপু, কবিতা, ইতি, পিলুরা থেকে থেকেই চলে আসতো মনে, আমাকে সঙ্গ দিতো। কিন্তু বাস্তবতা বিষাদে মন ভরিয়ে তুলতো পরক্ষণেই।
অনেক চড়াই উতড়াই করে অবশেষে ভিড়তে পারলাম বন্ধুদের মাঝে। নতুন বন্ধু সার্কেল, নতুন করে শুরু আবার। ফেলে আসা বন্ধুরা সরে গেলো খুব ধীরে ধীরে...! শুরু হলো নতুনদের কাছে চলে আসা। স্কুল জীবনের শেষের দিকে কয়েকজনের সাথে বন্ধুতা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হলো, ছেড়ে থাকা যায় না এমন অবস্থা।
কিন্তু একটা সময় এলো যখন এই বন্ধুদেরও ছেড়ে যেতে হলো দেশের সবচাইতে নামী কলেজে ভর্তি হতে। কোন উপায়ই ছিলনা। ছাড়তে হলো মায়ের আঁচল, প্রথমবারের মতো। অনেক কাছের মানুষেরা আবারো দূরে সরে গেলো একটু একটু করে। সেখানে এলো নতুন মুখ, নতুন নাম, নতুন পরিস্থিতি।
কলেজ জীবনের শেষে সবচাইতে কাছের বন্ধু, যার সাথে জীবনের প্রতিটা দাড়ি কমা শেয়ার করতাম, সেও চলে গেলো প্যাসিফিকের পাড়ের দেশে। প্রচন্ড একা হয়ে পড়লাম, আক্ষরিক অর্থেই একা। ছয় মাসের মাথায় পাড়ি জমালাম আমিও।
সেখানেও খুব ভালো, খুব কাছের, খুব কেয়ারিং কিছু মানুষের সান্নিধ্যে নিজেকে গর্বিত মনে করা শুরু করলাম। এ বন্ধন কখনোই ছেদ হবার নয়! কিন্তু আবারো ছিঁটকে গেলাম সেই বন্ধন থেকে। পিছনে পড়ে রইলো, সেই কেয়ারিং মুখ গুলো। খুব কাছের একজনের সাথে দেখা হলো বছর কয়েকপর। আমার সবচাইতে কাছের শুভাকাংখীদের একজন। সবই ঠিক আছে, কিন্তু তারপরেও কোথায় যেন আর আগের সেই ছন্দটা নেই। আবারো তৈরী হলো দূরত্ব!
খুব ঘনিষ্ঠ হওয়া একটা বলয় থেকে আবারো বের হয়ে আসতে হয়েছে সময়ের তোড়ে। এখানে এসে আগের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে ঠিক করে নিয়েছিলাম, কারো সাথে ঘনিষ্ঠ হবো না। কারো কাছে যাবো না, কাউকে আপন মনে করবো না, কাউকে হারানোর কষ্টও পাওয়া হবে না। কিন্তু লটেড এবং কান্ট বী ব্লটেড-এর পাল্লায় পড়ে একই লুপে ঘুরপাক খাওয়া থেকে আমাকে বাঁচায় কে!
সত্যিকারের মানুষগুলো কাছে যাওয়ার পর পরই কেমন দূরে চলে যায়, সরে যায়, আমি হারিয়ে যাই, হারিয়ে ফেলি তাদেরকে। সামহোয়্যারের কল্যানে ভেবেছিলাম ভার্চুয়ালিটি নিয়ে থাকবো। নিজের ভেতরের সব দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে, কোন আলো প্রবেশ করতে না দিয়ে। থাকবো একদম নিজের মতো। কিন্তু হলো না এখানেও।
সামহোয়্যার এক মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে, আমার একাকী জীবনে যখন গলা পর্যন্ত বিষাদ ছেয়ে ফেলেছিলো তখন একটু একটু করে রিলিফ দিয়েছে, বেঁচে থাকার অক্সিজেন যুগিয়েছে। কিন্তু ওইযে, আমিতো কারো একান্ত সান্নিধ্যে কাটাতে পারি না বেশিদিন। যারই কাছে এসেছি, অথবা আমি যারই খুব কাছে গিয়েছি- অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই কাছে থাকাটা হয়ে গেছে অনেক দুরের। দূরত্ব বেড়ে গেছে অনেক অনেক গুণে। পূর্বের ঘটনার পুনরাগমনে সামহোয়্যারও একসময় আমার থেকে দূরে সরে যাবে। কাঁকন, টিপুর আবছা হয়ে যাওয়া মুখের মতো একসময় সামহোয়্যারও হয়তো ফিকে হয়ে আসবে। হয়তো আজ হতে অনেক বছর পর মনে পড়বে, একটু নস্টালজিক হবো, একটু কষ্ট লাগবে, একটু মায়া লাগবে, কিন্তু আগের মতো করে কি আর ফিরে আসা হবে?
লালনের এই ইনস্ট্রুমেন্টালটার জন্য এর প্রেরককে অনেক ধন্যবাদ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

