somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সময় হয়েছে (ফিরে যাবার)...

১৭ ই জুন, ২০০৭ রাত ১:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


খুব ছোট বেলায় গ্রামের কিছু ছেলের সাথে ভয়ানক রকমের বন্ধুতা হয়ে গিয়েছিলো। একটু বড় হওয়ার পরে সেই বন্ধুদের ছেড়ে যেতে হলো সম্পূর্ণ নতুন এক জায়গায়। স্কুলে যাওয়া শুরু হলো আমার। জীবনের প্রথম স্কুলের প্রথম দিন থেকেই হয়ে গেলো কিছু বন্ধু। স্কুলের প্রতি মায়া জমে গেলো, স্যারদের সাথে সম্পৃক্ততা বেড়ে গেলো। আমি গ্রামের পুরানো বন্ধুদের কথা আস্তে আস্তে ভুলে গেলাম! কিংবা কি জানি, ভুলে হয়তো যাই নি, হয়তো বর্তমান এসে মাথার ভেতরের সেই অংশগুলোতে খানিক আড়াল টেনে দিলো। মজে রইলাম বর্তমানে, দিন গত হতে থাকলো নিজের মতো করে...!

হঠাত সরকারী চাকুরে বাবার বদলীর আদেশ! চোখের পানি নাকের পানি এক করে স্কুলের বন্ধুদের সাথে হৃদয়ের বাঁধন ছিঁড়ে, সবচেয়ে কঠিনতম স্যারের চোখেও পানি এনে বিদায় নিলাম সেই জায়গা থেকে। দূরে চলে গেলাম কাছের, খুব কাছের কিছু মানুষজন, প্রকৃতি থেকে। শুরু হলো নতুন এক জায়গায় আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করার পার্বন!

কয়েকমাসের মধ্যে পড়াশুনায় 'স্থায়ীত্ব' এনে দেয়ার লক্ষ্যে, একটা নির্দিষ্ট স্কুলে রাখার অভিপ্রায়ে বাবা-মা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেন। আবারো আমার স্থান পরিবর্তন, বন্ধু পরিবর্তন, আমার শিশুমনের আঙিণা পরিবর্তন। আমরা সবকিছু বেঁধে রওনা দিলাম আবারো। খুব অল্প সময়েই একেবারে কাছের হয়ে যাওয়া টিপু, কাঁকন, পিলু, ইতি-রা মুখ থুবরে দাঁড়িয়ে থাকলো রাস্তার পাশে, চোখের কোণায় চিকচিক করা নোনা জল নিয়ে। রাস্তার বাঁকের সাথে আমাদের বাহন বাঁক নেয়ার সময় তাদের দেখা সেই মুখায়বটাই আমার শেষ দেখা, গ্রে-ম্যাটারের সিন্দুকে রাখা আমার কাছের কিছু বন্ধুর শেষ স্মৃতি। আরতো দেখা হয়নি, হবেও না হয়তো কোনদিন! কতো কাছের বন্ধুরা হারিয়ে গেলো কতো স্বাভাবিকভাবে একটা রাস্তার বাঁকের কাছে!

আবার গ্রামে ফিরে এলাম ঠিকই। কিন্তু কোথায় যেন ছন্দপতনের সুর। পুরাতন সেই বন্ধুরা কেমন 'বড়' হয়ে গেছে, আগের সেই নির্মলতাও অনুপস্থিত। হলোনা আর তাদের সাথে পুরানো বন্ধুতার সাঁকো বেয়ে চলা। স্কুলে ভর্তি হয়ে নতুন মুখের মাঝে হারিয়ে যাবার চেষ্টা করলাম। বছরের প্রায় মাঝমাঝি একটা সময়ে এসে ভর্তি হওয়ায় তেমন কেউই খুব সহজে দলে নিতে আসলো না। সবার চোখেই একটা তাচ্ছিল্যের চাহনী! খুব খারাপ লাগতো তখন। ফেলে আসা শরিফ, তোতা, নাসির, কাঁকন, টিপু, কবিতা, ইতি, পিলুরা থেকে থেকেই চলে আসতো মনে, আমাকে সঙ্গ দিতো। কিন্তু বাস্তবতা বিষাদে মন ভরিয়ে তুলতো পরক্ষণেই।

অনেক চড়াই উতড়াই করে অবশেষে ভিড়তে পারলাম বন্ধুদের মাঝে। নতুন বন্ধু সার্কেল, নতুন করে শুরু আবার। ফেলে আসা বন্ধুরা সরে গেলো খুব ধীরে ধীরে...! শুরু হলো নতুনদের কাছে চলে আসা। স্কুল জীবনের শেষের দিকে কয়েকজনের সাথে বন্ধুতা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হলো, ছেড়ে থাকা যায় না এমন অবস্থা।

কিন্তু একটা সময় এলো যখন এই বন্ধুদেরও ছেড়ে যেতে হলো দেশের সবচাইতে নামী কলেজে ভর্তি হতে। কোন উপায়ই ছিলনা। ছাড়তে হলো মায়ের আঁচল, প্রথমবারের মতো। অনেক কাছের মানুষেরা আবারো দূরে সরে গেলো একটু একটু করে। সেখানে এলো নতুন মুখ, নতুন নাম, নতুন পরিস্থিতি।

কলেজ জীবনের শেষে সবচাইতে কাছের বন্ধু, যার সাথে জীবনের প্রতিটা দাড়ি কমা শেয়ার করতাম, সেও চলে গেলো প্যাসিফিকের পাড়ের দেশে। প্রচন্ড একা হয়ে পড়লাম, আক্ষরিক অর্থেই একা। ছয় মাসের মাথায় পাড়ি জমালাম আমিও।

সেখানেও খুব ভালো, খুব কাছের, খুব কেয়ারিং কিছু মানুষের সান্নিধ্যে নিজেকে গর্বিত মনে করা শুরু করলাম। এ বন্ধন কখনোই ছেদ হবার নয়! কিন্তু আবারো ছিঁটকে গেলাম সেই বন্ধন থেকে। পিছনে পড়ে রইলো, সেই কেয়ারিং মুখ গুলো। খুব কাছের একজনের সাথে দেখা হলো বছর কয়েকপর। আমার সবচাইতে কাছের শুভাকাংখীদের একজন। সবই ঠিক আছে, কিন্তু তারপরেও কোথায় যেন আর আগের সেই ছন্দটা নেই। আবারো তৈরী হলো দূরত্ব!

খুব ঘনিষ্ঠ হওয়া একটা বলয় থেকে আবারো বের হয়ে আসতে হয়েছে সময়ের তোড়ে। এখানে এসে আগের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে ঠিক করে নিয়েছিলাম, কারো সাথে ঘনিষ্ঠ হবো না। কারো কাছে যাবো না, কাউকে আপন মনে করবো না, কাউকে হারানোর কষ্টও পাওয়া হবে না। কিন্তু লটেড এবং কান্ট বী ব্লটেড-এর পাল্লায় পড়ে একই লুপে ঘুরপাক খাওয়া থেকে আমাকে বাঁচায় কে!

সত্যিকারের মানুষগুলো কাছে যাওয়ার পর পরই কেমন দূরে চলে যায়, সরে যায়, আমি হারিয়ে যাই, হারিয়ে ফেলি তাদেরকে। সামহোয়্যারের কল্যানে ভেবেছিলাম ভার্চুয়ালিটি নিয়ে থাকবো। নিজের ভেতরের সব দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে, কোন আলো প্রবেশ করতে না দিয়ে। থাকবো একদম নিজের মতো। কিন্তু হলো না এখানেও।

সামহোয়্যার এক মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে, আমার একাকী জীবনে যখন গলা পর্যন্ত বিষাদ ছেয়ে ফেলেছিলো তখন একটু একটু করে রিলিফ দিয়েছে, বেঁচে থাকার অক্সিজেন যুগিয়েছে। কিন্তু ওইযে, আমিতো কারো একান্ত সান্নিধ্যে কাটাতে পারি না বেশিদিন। যারই কাছে এসেছি, অথবা আমি যারই খুব কাছে গিয়েছি- অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই কাছে থাকাটা হয়ে গেছে অনেক দুরের। দূরত্ব বেড়ে গেছে অনেক অনেক গুণে। পূর্বের ঘটনার পুনরাগমনে সামহোয়্যারও একসময় আমার থেকে দূরে সরে যাবে। কাঁকন, টিপুর আবছা হয়ে যাওয়া মুখের মতো একসময় সামহোয়্যারও হয়তো ফিকে হয়ে আসবে। হয়তো আজ হতে অনেক বছর পর মনে পড়বে, একটু নস্টালজিক হবো, একটু কষ্ট লাগবে, একটু মায়া লাগবে, কিন্তু আগের মতো করে কি আর ফিরে আসা হবে?

লালনের এই ইনস্ট্রুমেন্টালটার জন্য এর প্রেরককে অনেক ধন্যবাদ

৩৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×