লাইব্রেরি বা পাঠাগারের সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত ৷বড় বড় সেলফ থেকে মনের মতো বই নিয়ে পড়ার আনন্দ শুধু লাইব্রেরিতেই পাবেন৷ অনেকেই লাইব্রেরিকে পৃথিবীর সব থেকে পবিত্র স্থান হিসাবে বিবেচনা করেন ৷ কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের প্রচলিত সেই লাইব্রেরির ধারণাটি এখন বদলে যাচ্ছে ৷ তথ্যপ্রযুক্তি লাইব্রেরির মূল কাঠামোর সাথে সংযুক্ত হয়ে লাইব্রেরিগুলোতে একটি নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে, যার নাম ই-লাইব্রেরি (e-library) বা ই-পাঠাগার ৷ সাধারণ পাঠাগারের সাথে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাগুলোকে ব্যবহার করে লাইব্রেরির কাজগুলো আরও দ্রুত ও যেকোনো জায়গা থেকে লাইব্রেরির বই পড়ার সুবিধাগুলো ভোগ করাই এর উদ্দেশ্য ৷
ই-লাইব্রেরির প্রথম ধাপেই থাকবে ডিজিটাল ক্যাটালগ ৷ যারা লাইব্রেরিতে বই খুঁজতে যান, তারা নিশ্চয় ক্যাটালগ কার্ড দিয়ে বই খোঁজার চেষ্টা করেন ৷ সনাতন কাগজের কার্ডগুলো রূপান্তরিত হচ্ছে ডিজিটাল কার্ডে, অর্থাৎ বইয়ের তথ্যগুলো যেমন বইয়ের নাম, লেখক, প্রকাশক, বছর ও অন্যান্য তথ্য থাকবে ডিজিটালে ৷ এর ফলে খুব সহজেই আপনি আপনার কাঙ্খিত বইটি খুঁজে পাবেন ক্যাটালগ কার্ডে ৷ যেসব লাইব্রেরি এভাবে তাদের বইয়ের তথ্যগুলো ডিজিটালে রূপান্তর করছে, সেগুলোতে সাধারণত লাইব্রেরির ভেতরেই কমপিউটার দিয়ে বই খোঁজার সুবিধাটি পাওয়া যায়৷ আবার অনেক ই-লাইব্রেরি বই খোঁজার এই সুবিধাটি দেয় অনলাইনে বা কোনো ইন্টারনেট ব্রাউজারের মাধ্যমে ৷এই সিস্টেমটি দিয়েই আপনি কোনো বই ইচ্ছে করলে বুকিং করতে পারবেন, কিংবা আপনার ডিপার্টমেন্টের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে পারবেন৷ অর্থাৎ পুরো লাইব্রেরির বই ম্যানেজমেন্টের কাজগুলো ই-লাইব্রেরির কল্যাণে দ্রুত ও সহজেই করতে পারবেন৷আপনি চাইলে আপনার নামে লগইন করে দেখে নিতে পারবেন আপনি কী কী বই বর্তমানে লাইব্রেরি থেকে ধার নিয়েছেন এবং কবে তা ফেরত দিতে হবে৷
এরপরের স্তরে ই-লাইব্রেরি যে সুবিধা দেবে তা হলো শুধু বইয়ের তথ্যগুলো ডিজিটালে নয়, বইগুলোই থাকবে ডিজিটালে ৷ চাইলে বইটি ডাউনলোড করে নিতে পারবেন কমপিউটারে এবং তা পড়তেও পারবেন। এ ছাড়া মাইক্রোফিল্মে সংগৃহীত আর্কাইভগুলোকে ডিজিটালে রূপান্তর করে কমপিউটারে তা দেখার সুযোগতো থাকছেই ।
ডিজিটাল লাইব্রেরির বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
বিশ্বের অনেক লাইব্রেরির মতই বাংলাদেশেরও বেশকিছু লাইব্রেরিতে এখন ই-লাইব্রেরির এ ধারণাগুলো প্রয়োগ করা হচ্ছে ৷বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ই-লাইব্রেরি কয়েকটি ধাপে প্রয়োগ করা যেতে পারে। যেমন-
প্রথম ধাপ :
বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইব্রেরিসমূহ ডিজিটাল লাইব্রেরিতে বা ই-লাইব্রেরিতে রূপান্তর করা যেতে পারে ৷ এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ উদ্যোগ নিতে পারে অথবা এর জন্য অন্য দাতা সংস্থাগুলোর সাহায্যও নেয়া যেতে পারে ৷
দ্বিতীয় ধাপ :
দ্বিতীয় ধাপে বাংলাদেশের লাইব্রেরিগুলো একে অপরের সাথে নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হয়ে একটি আন্তঃলাইব্রেরি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে এবং লাইব্রেরিগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস অর্থাৎ বই খোঁজা ও বই নেবারব্যাবস্থা করা যেতে পারে ৷ এর ফলে একটি লাইব্রেরি আরেকটি লাইব্রেরির তথ্যগুলো ব্যবহার করার সুযোগ পাবে৷ উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনি হয়তো রংপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো কলেজে বসেই অনলাইনে ই-লাইব্রেরির মাধ্যমে খুঁজতে পারেন ঢাকা পাবলিক লাইব্রেরিতে কি কি বই রয়েছে এবং কোনো বই যদি আপনার প্রয়োজন হয়, সে বইটি রংপুরের লাইব্রেরিতে পাঠানোর অনুরোধ করতে পারেন৷ পরবর্তীতে রংপুরের লাইব্রেরিতে বসেই বইটি পড়তে পারেন৷
তৃতীয় ধাপ :
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ই-লাইব্রেরি স্থাপন হয়ে গেলে আমরা বিশ্বের ই-লাইব্রেরিগুলোর সাথে সংযোগ করতে পারি ৷তবে ই-লাইব্রেরি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হচ্ছে কপিরাইট সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো ৷ ই-লাইব্রেরির প্রথম স্তর যেখানে লাইব্রেরির বইগুলোর ব্যবস্থাপনা চলবে ডিজিটালের মাধ্যেমে, সে ব্যাপারে কারো আপত্তি নেই৷ কিন্তু আপত্তি হচ্ছে দ্বিতীয় ধাপে যেখানে বইগুলোকেই ডিজিটালে রূপান্তরিত করা হবে ৷কেননা, বইগুলো ডিজিটাল হলে বাধাই করা কাগজের বইয়ের বিক্রি কমে যাবে৷ এতে প্রকাশনা শিল্প নামে প্রতিষ্ঠিত একটি শিল্প ধ্বংস হয়ে যেতে পারে৷ ইতোমধ্যেই অনলাইনে অসংখ্য বই ডিজিটালে রূপান্তর করে গুগল এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে৷
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেসব বইয়ের কপিরাইটে কোনো সমস্যা হবে না, সে ধরনের পুরনো ও লুপ্ত প্রায় বইগুলো ডিজিটালে রূপান্তর করা জরুরি৷ এছাড়া কোনো লেখক বা প্রকাশক যদি তাদের প্রকাশিত বইকে ডিজিটালে রূপান্তর করার অনুমতি দেন তবে ডিজিটালে রূপান্তর করে তা সংরক্ষণ করা যেতে পারে ৷একথা অনস্বীকার্য, ডিজিটালে রূপান্তরের মাধ্যমে আমরা বইগুলোকে আজীবন সংরক্ষণ করতে পারি এবং খুব সহজেই তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারি ৷কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ওপেনসোর্স নেটওয়ার্ক বেশ কয়েকটি বই লেখকের মাধ্যমে কপিরাইটটি উন্মুক্ত অর্থাৎ পাবলিক ডোমেইন করার উদ্যোগ নেয় ৷ বাংলাদেশে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের কপিরাইটগুলোও একদিন উন্মুক্ত হবে আশা করা যায়৷
লাইব্রেরিতে না গিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমেই লাইব্রেরির বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এভাবেই ই-লাইব্রেরির মাধ্যমে উপভোগ করা সম্ভব৷ যদিও ই-লাইব্রেরির ধারণাটি বাংলাদেশে নতুন, তবুও সামনে এটি ব্যবহার করে শিক্ষার্থী, গবেষক ও বইপিপাসু মানুষ সকলেই উপকৃত হবেন এমনটিই আশা করা যায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

