শেষ বিকালে পৌছালাম কাঠমান্ডু। নেমে ইমিগ্রেশন পার হলাম বিনা বাক্যব্যায়ে, এটাও প্রথম আমার জন্য, কোন প্রশ্ন ছাড়া যে ইমিগ্রেশন পার হওয়া যায় একটা দেশের জানা ছিল না আগে
এয়ারপোর্ট এর বাইরে বের হতেই হাজার খানেক মানুষ আমাদের ধরে বসল, হোটেল, গাইড ইত্যাদি ইত্যাদি..... আগের দিন কাঠমান্ডু গেস্ট হাউজ এ ইমেইল করেছিলাম রুম বুকিং এর জন্য, রিপ্লাই পাই নাই, দুরে দেখি ওদের গাড়ি দাড়িয়ে আছে, আমরা সোজা যেয়ে উঠে পড়লাম। বেশ অনেক্ষন লাগলো এয়ারপোর্ট থেকে থামেল এরিয়াতে হোটেল এ পৌছাতে, যেয়ে দেখি আমাদের নামে কোন রুম বুকিং নাই, উনারা নাকি ইমেইল পান নাই। যাই হোক আসল ঝামেলা শেষ, থামেল যা কিনা টুরিস্ট এরিয়া সেখানে ফ্রি ফ্রি পৌছে গেছি হোটেলের গাড়িতে, রুমের কি অভাব আছে আসে পাসের হোটেলে... এই ভেবে আরেকটা হোটেলে ঢুকে পড়লাম। কাঠমান্ডুর প্রথম রাত ভয়াবহ গেল, সারারাত ইলেক্ট্রিসিটি নাই,এই হোটেলে জেনারেটর ও নাই। কোনরকমে একটু ফ্রেশ হয়ে আসে পাসের দোকান দেখতে বের হলাম, একফাঁকে সেরে নিলাম রাতের খাওয়া। পরেরদিন সকালে যাব পোখারা, আসে পাসে অসংখ্য ট্রাভেল এজেন্ট এর দোকান, ৫০০ রুপি দিয়ে টিকেট করলাম কাঠমান্ডু-পোখারা টুরিস্ট বাসের।
পরেরদিন সকালে উঠে হাঁটতে হাঁটতে পৌছালাম বাস স্টপেজে, ধারনা ছিল টুরিস্ট বাস নিশ্চয় অনেক সুন্দর হবে, যেয়ে দেখি মিনিবাস টাইপের লক্কর ঝক্কর বাস, মাল সব ছাদে উঠানো হচ্ছে, আমাদের ব্যাগ ও চলে গেল ছাদে। এই বাসে উঠে বসলাম আমরা একগাদা বিদেশি মানুষ। ফুটপাতে দেখি মালয় চায়ে বিক্রি হচ্ছে, বিদেশিগুলা ভীড় করে তাই খাচ্ছে, আমিও নিলাম এক কাপ..... কিছুই না বেশি করে দুধ চিনি দেয়া চা।
১.টুরিস্ট বাস:

বাস যাচ্ছে শহরের ভেতর দিয়ে, কিছুক্ষন পর শহর থেকে বের হয়ে আসল। একপাশে খাড়া খাঁদ নেমে গেছে, অনেক নিচে বয়ে চলেছে এক পাহাড়ি নদী, নদীর ঐ পাশে আবার পাহাড় উঠে গেছে। আমাদের চোখ সরে না, এত সৌণ্দর্য কথায় প্রকাশ করা সম্ভব না। মুড়িরটিন বাসের দূ:খ মূহুর্তে ভুলে গেলাম আমরা।
২.পাহাড়ি নদী:

পথে আরো কিছু পাবলিক লোকাল বাস চোখে পড়লো, এইবার বুঝলাম আমাদের এই মুড়িরটিনই এখানকার সবচেয়ে ভাল বাস। অনেকদিন পর ট্রাকের মত সামনের দিকওয়ালা বাস দেখলাম। মাঝপথে সাড়ে ১০ টার দিকে বাস থামলো এক রেস্টুরেন্টে (হাইওয়ে ইন বা নুরজাহান এর মত না), পুরাতন এক দোতলা বিল্ডিং, বেন্চি আর টেবিল অনেকগুলা। টয়লেট এর অবস্থা ঢাকা শহরের পাবলিক টয়লেটের মতন। সবাই দেখি একি জিনিষ খাচ্ছে (কারন আর কিছু নাই), "থালি", একটা বড় থালার মধ্যে ভাত, পাশে ছোট ছোট বাটির মত গর্ত, সেখানে কিছু শাক, ডাল, আর একটা কি যেন মাছ। খিদা থাকলে সবই খাওয়া সম্ভব বুঝতে পারলাম (চোখে তখন ভাসছে দেশের হাইওয়ে রেস্টুরেন্টের গরম পরোটা আর গরুর গোশত ভুনা)।
৩.পোখারা বাস স্টপেজ:

দুপুর পার করে অবশেষে পৌছালাম পোখারা বাস স্ট্যান্ডে। আসার আগে উইকিট্রাভেল থেকে কিছু হোটেলের নাম মুখস্ত করে এসেছি, ইচ্ছা লেকের ধারে যেকোন একটাতে উঠে পরা। বাস থেকে নামতেই আবারো কয়েকশত লোক ছেকে ধরল আমাদের, কেউ ট্যাক্সি ড্রাইভার, কেউবা হোটেলের লোক। কি করব ভাবছি, সামনে সাইনবোর্ডে লেখা আছে ট্যাক্সি ভাড়া ১৫০ রুপি, এদিক ওদিক তাকাচ্ছি দেখে এক ট্যাক্সি ওয়ালা এগিয়ে আসল আর আমার হাতে একটা হোটেলের কার্ড ধরিয়ে দিল। আমি তাকে একটা হোটেলের নাম বলে যানতে চাইলাম যাবে কিনা, সে বলল এই হোটেলে উঠতে। আমি বললাম না, আমি যেখানে বলি সেখানে চল, সে বলল অনেক কমে রুম দিবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষে সে প্রস্তাব দিল, প্রথমে সে যেই হোটেলের নাম বলছে সেখানে যাব, ওখানে দেখে পছন্দ হলে ট্যাক্সি ভাড়া লাগবে না, আর পছন্দ না হলে সে আমাদের পছন্দের হোটেলে নামিয়ে দিবে আর আমরা ট্যাক্সি ভাড়া দিব। ভেবে দেখলাম কোন ক্ষতি নাই। মাত্র ২০ মিনিটের পথ, পৌছে গেলাম লেকের পাড়ে টুরিস্ট এরিয়াতে, ট্যাক্সি থামলো এক ছোট্ট বাড়ির সামনে। এটাই হোটেল, ভেতরে ঘুরে ফিরে দেখলাম, দোতলায় ৮ টা রুম দুই সারিতে, একদিকে বারান্দা আছে রুমের সাথে, খারাপ না। ৫০০ রুপি ভাড়া চাইলো, আমি কিছুক্ষন দামদর করে ৩০০তে রাজি করালাম। ৩০০ রুপি আমাদের ৩০০ টাকার সমান, আমি মোটামুটি খুশি, অনেক সস্তা কাঠমান্ডুর ৩০ডলারের রুমের তুলনায়। এতক্ষনে বুঝে গেছি ট্যাক্সি ড্রাইভার অশোক বাবু ই এই হোটেলের মালিক
৪. ফিউয়া তাল লেক:

৫. ফিউয়া তাল লেক:

৬. দুরে দেখা যায় মাউন্ট ফিশটেল এর চুড়া:

৭. ফিউয়া তাল লেক:

৮. ফিউয়া তাল লেক:

৯. ফিউয়া তাল লেক:

হোটেলের মাধ্যমে এক ট্যাক্সি ঠিক করা হলো, ভোর বেলা আমাদের নিয়ে যাবে সারনকোট ভিউপয়েন্টে, আবহাওয়া ভাল থাকলে ওখান থেকে দেখা যাবে মাউন্ট ফিসটেইল বা মাছের লেজ পর্বতে সূর্য উদয়। তারপর আরো ২,৩ টা যায়গায় ঘুরাবে, ১০০০ রুপি দিলেই খুশি। টুরিস্ট এই সময় খুব একটা নাই ঠান্ডার কারনে, তাই সবকিছুই সস্তা এই এক সুবিধা
ভোর অন্ধকার থাকতে আমরা রওয়ানা দিলাম পরের দিন, হাতে গ্লাভস, মাথায় টুপি, জ্যাকেট তো আছেই। ঘন্টাখানেক পর পাহাড় বেয়ে উঠে ট্যাক্সি থামলো ভিউ পয়েন্টে, নেমে দেখি পাহাড়ের চুড়ায় কয়েকশত পর্যটক দাড়িয়ে আছে, নীচে অন্ধকার শহর, মিট মিট বাতি জ্বলে, আরেকদিকে দুরে কালো কালো পাহাড়ের সারি, অর্নপুর্না রেন্জ। বেশ কিছুক্ষন পর সূর্য মামার দেখা পেলাম, সবাই পাহাড়ের দিকে তাকায়ে ছিল, কিন্তু মামা উঠছেন অন্য দিক দিয়ে। হালকা হালকা ভাবে ভোরের আলোয় এখন দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের চুড়া। হালকা আলোতেই সবাই ছবি তুলে যাচ্চ্ছে। কিছুক্ষন পর সূর্য আরেকটু উপরে উঠলো, হঠাৎ দেখি সামনে পাহাড়ের চুড়ায় যেন কে যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে......
১০. সূর্য উদয়ের আগে:

১১. হালকা দেখা যায় চূড়া:

১২. পাহাড়ে সূর্যদয়:

১৩. পাহাড়ে সূর্যদয়:

১৪. প্রথমও আলো:

১৫. মাচ্ছাপুচ্ছরে পর্বত:

১৬. মাচ্ছাপুচ্ছরে পর্বত:

১৭. অর্নপূর্না:

স্তব্ধ ভাবে তাকিয়ে আছি, মাঝে মাঝে মানুষের ফাক ফোকর দিয়ে ছবি তুলছি। বাম পার্শে ধবলগিরি, মাঝখানে মাউন্ট ফিশটেইল, ডানে অর্নপূর্না রেন্জ। শুনলাম এই ফিশটেইল বা মাছের লেজ পর্বত নেপালিদের পবিত্র পর্বত, এই পর্বতে ট্রেক করার পারমিশন কাউকে দেয়া হয়না, বেশ শিহরন লাগল পর্বতটাকে দেখে।
১৮. মাউন্ট ফিসটেল (মাচ্ছাপুচ্ছরে):

১৯. পাহাড়ের গায়ে ঘরবাড়ি:

২০. পাহাড়ের গায়ে ঘরবাড়ি:

দেখতে দেখতে একসময় ক্লান্ত হয়ে গেলাম, সবাই একে একে ফিরে যাচ্ছে, আমরাও ফেরার পথ ধরলাম। ট্যাক্সিতে উঠার আগে চা আর গরম গরম শেদ্ধ ডিম খেয়ে নিলাম দুই বন্ধু মিলে। এরপর আমরা গেলাম এক মন্দিরে, মন্দির থেকে গেলাম স্বেতি নদী তে, এই নদীর পানি দুধের মত সাদা। পাহাড় থেকে নেমে আসা এই নদীটা দেখে বেশ ভাল লাগলো।
২১. স্বেতি নদীর সাদা পানি:

২২. স্বেতি নদীর সাদা পানি:

১০টার দিকে হোটেলে ফিরে এসে নাস্তা করে বের হলাম শপিং করতে। রাস্তার দুই পাশে ট্রেকিং এর দোকান, সাজানো আছে পৃথিবীর সব দামি দামি নামকরা আউটডোর স্পোর্টস গিয়ার আর ক্লোথস। যেদিকেই তাকাই দেখি নর্থফেস, মাউন্টেন হার্ডওয়ার, মারমট এর ছড়াছড়ি। জ্যাকেট আর বুটের প্রতি আমার প্রখর ভালবাসা, নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগলাম, দাম দেখি খুব বেশি না, নর্থফেসের গোরটেক্সের তৈরী জ্যাকেট ৩০০০রুপি... একটু সন্দেহ হচ্ছে, এরি মাঝে দেখি হুবুহু একই জ্যাকেট মারমট এর সিল লাগানো। বুঝলাম সবই নকল, তাই তো দাম এত কম, আসল জিনিষতো এতো কম হওয়ার কথা না। জেনেশুনে একটা নকল নর্থফেসের জ্যাকেট কিনলাম, আসল তো আর কিনতে পারবো না।
এরি মাঝে এক দিদির দোকানে খাতির করে ফেলেছি, উনি আমাদের সাথে হিন্দি বলা শুরু করাতে আমরা যখন হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম আর ইংরেজিতে কথা শুরু করলাম উনি বেশ অবাক হলেন, ভেবেছিলেন আমরা ভারতীয়। গল্প দিলাম আমরা স্টুডেন্ট, বাংলাদেশ থেকে ভারত এসেছিলাম চিকিৎসার জন্য, অনেক কস্ট করে এখন নেপাল টা ঘুরে যাচ্ছি স্হলপথে
বিকালে একটা নৌকা ভাড়া করলাম ২ ঘন্টার জন্য, ঘন্টা হিসাবে রেট ফিক্স করা আছে। ফিউয়া তাল লেকের মাঝে সন্ধা ঘনিয়ে এলে আমরা ফিরে এলাম। শন্ধার পরে কিছু বার আর দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া কিছু করার নাই। পরের দিন আরো কিছু জায়গা নিজেরা নিজেরা ঘুরে বেড়ালাম লোকাল বাস, টেম্পু ধরে, এর মাঝে আছে ডেভিস ফলস, মাহেন্দ্র কেভ ইত্যাদি।
২৩. ফিউয়া তাল লেকে নৌকা ভ্রমন:

পরদিন সকালে আবার রওয়ানা হলাম কাঠমান্ডুর পথে, পথে এক যায়গায় বাস থামলো, কয়েকটা মহিলা পথের পাশে কমলা নিয়ে বসে আছে। শুনলাম নিজেদের পাহাড়ি বাগানের কমলা নিয়ে এরা বিক্রি করে এখানে, ৪০ রুপি কেজি দরে আমরা ৩ কেজি কমলা নিয়ে নিলাম। কমলা গুলা ছোট হলেও খুবই মিস্টি। এত টাটকা কমলা মনে হয় আর কখন খেতে পাব কিনা জানি না, পাতা গুলো পর্যন্ত সবুজ.....
২৪. কমলা:

২৫. আকাশে উড়ে ছোট্ট পাওয়ার গ্লাইডার:

পরে আরো লিখব কাঠমান্ডু ঘুরার কথা, কিভাবে বান্দরে কমলা হামলা করলো, কিভাবে এয়ারপোর্টে শেভিংকিট চুরি গেল ইত্যাদি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


