কবি জয়দুল হোসেন জেলা শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংশপ্তক সাংস্কৃতিক কর্মী। আমি এই বাক্যটি লেখার আগে ভেবেছিÑ ভেবেছি তাঁর ওপর লেখা আমার এই গদ্যটি যারা পড়বেনÑ এই একুশ শতকের পাঠক; তারা কথাটিকে কোন অর্থে নেবেন কিংবা তারা আদৌ আমি কি বলতে চাইছি সে কথাটা বুঝবেন কি না! আকাশ সংস্কৃতি আর অন্তর্জালের যোগাযোগের এই যুগের পাঠকের কাছে কথা ক’টি বেখাপ্পা লাগবে বলেই আমার কাছে মনে হচ্ছে, যেহেতু নিজে আমি আকাশ সংস্কৃতি আর অন্তর্জালের যোগাযোগে পুরোপুরি আত্মস্থ এবং আত্তীকৃত নই তাই বোঝা না বোঝার ধার না ধেরেই আমার নিজস্ব বোধ এবং অনুভূতিটিকে ব্যক্ত করছি।
আমরা যারা ঊনবিংশ শতাব্দীতে বেঁচে বেড়ে উঠেছি তারা জানি সংস্কৃতির সংগ্রাম কি! একুশ শতকে যারা অনলাইনে সংবাদপত্র পাঠ করেন তারা যেমন বুঝতে পারবেন না ঊনবিংশ শতকে শিসার টাইপ, কাঠের ব্লকে ছাপা সংবাদপত্র কি রকম ছিলÑ তেমনই তাদের পক্ষে বোঝা কঠিন সংস্কৃতির আন্দোলন কি?
কবি জয়দুল হোসেন-এর কাব্য পাঠের আগে তাই তাঁর কৃত্য সম্পর্কে বোঝা চাই বলে আমি মনে করি। সংস্কৃতির সংগ্রামে যারা তাদের জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করেছেন তাদের কাছে সংস্কৃতি শুধু জীবন যাপনের সস্তা বিনোদনের উপকরণ নয়Ñ তাদের কাছে সংস্কৃতি আরো গভীরতর কিছু। তাদের কাছে সংস্কৃতিÑ সমষ্টির জীবনবেদ। জীবনকে চিনতে, চেনাতে আর বৃহত্তর কল্যাণে সমাজকে পাল্টে দেবার আয়ুধ। সেই সাংস্কৃতিক যোদ্ধা যখন কবি তখন তার তাৎপর্য অনেক বেশি। কবি জয়দুল হোসেন সেটাই প্রমাণ করেছেন। তার এই কাব্যের উৎসর্গ পংক্তিমালা থেকেই ধারণা পাওয়া যায় কি বলতে চেয়েছেন তিনি কবিতায়Ñ
“অন্ধকার থেকে/আলোর সন্ধানে/হেঁটে হেঁটে/ আলোর শিকারী/নতুন কবিতা এখন/ সমুদ্রতীরের একা পরিব্রাজক/আমার কোনো বন্ধু নাই/ কবিতারা থাকে না পরাধীন.....”
(উৎসর্গ/ সমুদ্রতীরে একা)
কবি জয়দুল হোসেন ‘হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে হাঁটা’ কবিরই সহোদরÑ কবি হিসেবে। তাই জীবন তাকেও পীড়িত করে, ঢেকে ফেলে কালো অমানিশায় কিন্তু তা সত্ত্বেও তার আদর্শবাদিতা, বিশ্বাস অনড়Ñ তা সত্য বলেÑ
“চলার পথে হেঁটে হেঁটে সন্ধ্যা নেমে আসে ধীরে/ পানকৌড়ির ঝাঁকের মতন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে/ গোধূলীর রঙ রঙধনু কালো হয়ে যায়/ হংসমালারা ছিঁড়ে পড়ে গাছের ডালে/সূতাকাটা ঘুড়ির মতন উড়ে যায় এপার থেকে ওপারের বিশ্বে/বিশ্ব বিভক্ত হলেও থেকে যায় অখণ্ড আকাশ।”
(ষষ্ঠপদী কবিতার চার সংখ্যক স্তবক/ পৃ. ১৪)
বিভক্ত বিশ্বে, টুকরো টুকরো বিশ্বে এই নিখিল ‘অখণ্ড আকাশ’কে উপলব্ধি করে পাঠকের হƒদয়ে চারিয়ে দিতে পারেন কেবল স্বপ্নদর্শী সত্যিকার কবিই।
তাঁর কবিতায় আশা ভঙ্গের বেদনা বিধৃত হয়েছে, প্রতিশ্র“তি ভঙ্গের পরিণতি ব্যক্ত হয়েছেÑ
“অথচ এমন কথা তো ছিল না/ কথা ছিল আকাশের রঙ হবে নীল/ কিন্তু আমি তো নীল দেখছি না/ ইটের ভাটা আর শ্মশানের ঘাট থেকে উড়ে যাওয়া/শাঁকচুন্নিরূপ কালো কালো ধোঁয়া দেখছি/ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে আকাশের রঙ”
(এমন কথা তো ছিল না/ পৃ. ৩৪)
মানুষের বঞ্চনাকেও শনাক্ত করতে পারেন কবি জয়দুল হোসেন অব্যর্থভাবে। তাই তিনি লিখতে পারেন এমন পংক্তিমালাÑ
“বালক বালিকা জলে খেলে লাই খেলা/ গায়ে কাদাজল কেটে যায় বেলা/বেলা বয়ে যায় তবু খেলার আসর/বসে না আগের মত মেলার বাসর/অগাধ জলের মাছ ডুবে ডুবে জল/খেয়ে যায় বারে বারে শস্যের ফসল/ফসল ওঠে না আর কৃষকের ঘরে/ অভাবী মানুষ মরে অনাহারে চরে।”
(তিতাসের নামাবলী / পৃ. ৪৫)
অন্তর্ভেদী এক অবলোকনের দৃষ্টিভঙ্গি আছে জন্যই সমুদ্রতীরে একা-র কবির একাকীত্বকে সমুদ্র বিস্তারিত করে অনেক অস্তিত্বে। তাই সমুদ্রের, নিখিলের অংশ হয়ে ওঠা কবি জয়দুল হোসেন-এর বোধপরিক্রমায় এক ফোঁটা অশ্র“ও হয়ে ওঠে সমুদ্রের সমার্থকÑমানব কল্যাণে। তাই-ই তিনি লিখতে পারেনÑ
‘এক ফোঁটা অশ্র“ ঝরে পড়ে গিয়েছিল তিতাসের জলে/... জানি না সে অশ্র“ গড়াতে গড়াতে সাগরে পৌঁছাবে কি না/যদি পৌঁছে, তবে হে সাগর, হে আকাশ, হে বাতাস/সে ভ্রুণের কয়েকটাকে তোমার মতোই বিশাল করে দিয়ো/ যেন বইতে পারে জীবনের যতো গ্লানি, যতো দুঃখ, যতো শোক-সংশয়।”
(মানবকল্যাণ/ পৃ.৩৫)
মানবকল্যাণের মন্ত্র, জীবনবীক্ষা যে কবিরÑ সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক সংশপ্তক জয়দুল হোসেন-এর এক ফোঁটা অশ্র“র নৈবেদ্যে কেবল সমুদ্র নয় পবিত্র হয়ে ওঠে তার জনপদ, তার মানুষ আর সংস্কৃতির সংগ্রাম।
একুশ শতকের তরুণ যদি এই এক ফোঁটা অশ্র“র নৈবেদ্যকে উপলব্ধি করতে পারে তাহলে সে উপলব্ধি করতে পারবে অতিঅবশ্যই তার সংস্কৃতির শেকড়কেও, তার অস্তিত্বের নিজস্বতাকেও।
শুচি সৈয়দ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



