somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হিমেল হাওয়ায়...একদিন

১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৪:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সকাল সকাল বাসা থেকে বের হচ্ছি দেখে ভাবী বললেন, 'কি ব্যাপার! এত সাজুগুজু করে এত তাড়াতাড়ি আজ কোথায় যাওয়া হচ্ছে?' 'এই তো এক ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করে আসি।' আমার উত্তরে ভাবী যেন সন্তুষ্ট হলেন না। কেমন একটা রহস্যময় হাসি দিলেন। কাল মাঝরাতে যখন মোবাইলে কথা বলছিলাম ভাবী তা শুনে ফেললেন নাকি? আমি আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম।
এখন আমাকে অনেক দূর যেতে হবে_খিলগাঁও থেকে মিরপুর। ঢাকাতে আমি তেমন একটা আসি না। তাই অপরিচিত পরিবেশে কেমন যেন অসহায়বোধ করছিলাম। এত দূর কিভাবে যাব? কিন্তু যেতে যে আমাকে হবেই। আজ এগারটায় ওর সাথে দেখা করার কথা। মিরপুর শেওড়াপাড়া ওভারব্রিজের নীচে আসবে সে। তারপর..আপাতত জানি না।
খিলগাঁও থেকে ম্যাক্সি চড়ে মালিবাগ মোড়ে পৌছালাম। তারপর একটা বাসে চড়ে বসলাম। এটা যাবে ফার্মগেট। আমি জানালার পাশে বসেছিলাম। এত মানুষ, এত ছুটোছুটি! কেমন যেন কান্তিকর মনে হচ্ছিল। ফার্মগেট এসে পড়লাম ঝামেলায়। এখন মিরপুর কিভাবে যাব-তা তো জানি না। শেষে এক পান বিক্রেতা বললেন, '10 আর 11 নম্বর বাসগুলো মিরপুর যায়।' বাসে উঠে এবার আর বসার জায়গা পেলাম না। এক হাত দিয়ে মাথার উপরের হাতল ধরে রইলাম। অন্য হাতে পকেট শক্ত করে চেপে ধরলাম পাছে যদি পকেট কাটা যায়! এবারের ড্রাইভার বেশ রসিক মানুষ মনে হল। সে গান বাজাচ্ছিল, 'গুলশান, বনানী আবার জিগায়... তেজকুনিপাড়ায় হালায় আবার জিগায়...।'
শেওড়াপাড়া পৌছে দেখি ঘড়িতে পৌনে এগারটা বাজে। আরো এখনো পনের মিনিট বাকি। কি করা যায়? ওকে একটা ফোন দিলাম, হ্যালো হিমেল! আমি তো চলে এসেছি।
-চলে এসেছেন। কোথায় আপনি?
-এই তো তোমাদের বাসার গলির ভেতর হাঁটছি।
-কি? যান যেখানে দাঁড়ানোর কথা সেখানে গিয়ে দাঁড়ান। আমি পনের মিনিটের মধ্যে আসছি।
অজানা অচেনা জায়গায় কারো জন্য অপো করাটা যে কতখানি বিরক্তিকর তা বলে বোঝানো যাবে না। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। শেওড়াপাড়া বাজার থেকে হেঁটে ওভারব্রিজ পর্যন্ত এলাম। আবার উল্টো পথে গেলাম। একটু পরে সে এল। বাহ! গতবারের তুলনায় এবার সে অনেক সুন্দর হয়েছে। চুলও বড় হয়েছে।
-কি খবর? কেমন আছ?
-ভাল। আপনি?
-এই তো।
-তারপর কোথায় যাবেন?
-আমি কিভাবে বলব? আমি তো এখানকার তেমন কিছুই চিনি না। তুমি যেখানে নিয়ে যাবে আমি সেখানেই যাব।
এসব ঘটনায় সাধারণত ছেলেটা মেয়েটাকে পথ দেখায়। আমার েেত্র ঘটল উল্টোটা। হিমেলই চালকের আসনে বসল।
আমরা মিরপুর বাঁধের উদ্দেশ্যে রিকশা নিলাম। রিকশার পেছন রিকশা। গাড়ির পেছন গাড়ি। হাজার মানুষের ছুটে চলার মাঝে আমদের রিকশাও এগিয়ে চলল। দুজনই চুপচাপ। হঠাৎ কেমন যেন সিনেমাটিক ডায়ালগ দিয়ে ফেললাম, তুমি না আগের চেয়ে সুন্দর হয়ে গেছ..অনেক সুন্দর।
-কি যে বললেন! মুখে পিম্পলে ভরে গেল। আর আপনি বলেন সুন্দর!
সত্যি বলতে কি সেদিন ওকে আসলেই সুন্দর লাগছিল। বলতে দ্বিধা নেই ওর চোখ দুটো আমাকে যেন চুম্বকের মত টানছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল ছুঁয়ে দেখি! আরেকটা জিনিস অনুভব করলাম। এর আগেরবার যখন ও আমার সাথে রিকশায় উঠেছিল তখন আমাদের মাঝে প্রায় পাঁচ ইঞ্চি দূরত্ব ছিল। অথচ আজ সেটা নেই।
মিরপুর বাঁধ আমার কাছে আজব জায়গা বলে মনে হল। শুধু জুটি আর জুটি। রিকশায় জুটি। রাস্তায় জুটি। পার্কে জুটি। হঠাৎ এক লোক বলল, মামা সইওয়ালা নৌকা আছে। আসেন আপুরে নিয়া নৌকাই ঘুইরা আসেন।
আমি বললাম, নৌকায় উঠবে?
হিমেল আমাকে এক বাক্যে না-করে দিল।
আমরা বাঁধের উপর বসলাম। সামনে শুকনো নদী। নদীর পাড় ঘেষে ধানের চারা লাগানো হয়েছে। একটা ছোট কার্গোকে দেখলাম ঘুরে ঘুরে বালি তুলছে।
-তারপর কি অবস্থা? কি খবর? আমি বললাম।
-কি আর খবর হবে? প্রতিদিনই তো আপনার সাথে কথা হয়। সবই তো জানেন। নতুন কোন খবর নেই।
এরপর কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। আসলে এখানে আসার আগে মনে হয়েছিল ওকে সামনে পেলে কথার ঝড় বইয়ে দেব। অথচ এখন বলার মত কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না। আমি বললাম, মোবাইলেই তোমার সাথে গল্প জমে। এখন কেমন যেন লাগছে।
-আচ্ছা ঠিক আছে। যান দূরে যেয়ে আমাকে কল দেন আমি রিসিভ করছি।
আবার কিছুণ চুপচাপ বসে থাকি।
-আচ্ছা তুমি আমাকে আর কতদিন 'আপনি' করে বলবে? আমার এসব আপনি-টাপনি আর ভাল লাগছে না। প্লিজ 'তুমি' করে বল। প্লিজ।
-আচ্ছা বাবা বলব, বলব। পরে বলব। গান শুনবেন। নেন গান শুনেন।
হিমেল তার এমপিথ্রি প্লেয়ারের হেডফোনের একটা কড আমার কানে ভরে দিল। অন্যটা নিজের কানে রেখে দিল। মাহামুদুজ্জামান বাবুর গান বাজছে, আমি বাংলার গান গাই।
আস্তে আস্তে সূর্যের তাপ বাড়তে লাগল। এমনিতেই আমার মাথায় চুল কম। তারপর এমন খোলা জায়গায় সরাসরি সূর্যের আলো। মাথা ঝিমঝিম করা শুরু করল। ওর অবশ্য তেমন একটা লাগল না। কারন আমাকে দিয়ে সূর্যকে আড়াল করে সে বসেছিল। বসুক। বেশিণ সূর্যের আলোয় থাকলে আমার হাত-পা কাঁপতে থাকে। যাক তারপরও ওকে আড়াল করে রাখারই চেষ্টা করলাম। কেননা আমি যে ওকে ভালবাসি, ভীষণ ভালবাসি।
হঠাৎ ওর হাত ধরলাম। এক ঝটকায় ও হাত ছাড়িয়ে নিল। একটু কষ্ট পেলাম। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, এটা ঠিক না। এটা ঠিক না।
কিন্তু পারলাম না। পরে যে কখন আবার ওর হাত ধরে ফেলেছিলাম তা নিজেই টের পাইনি। এভাবে কতণ যে ওর হাত ধরে ছিলাম তা বলতে পারব না।
দুপুর হয়ে এলে আমার জায়গা পরিবর্তন করলাম। একটা পুকুরের পাশে গাছের নিচে ছায়ায় গিয়ে বসলাম।
সত্যি বলতে কি সারাদিন আমাদের তেমন একটা কথা হল না। শুধু চুপচাপ পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে বসে থাকা হল। বেশিরভাগ সময়ই আমি বেহায়ার মত ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ও প্রায়ই বলছিল, দ্যাখেন, এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না। আমার ব্যাপারটা ভাল লাগে না।
কিন্তু আমি কি করব? আমি যে কিছুতেই নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারছিলাম না। শুধু ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল। দূরে দেখলাম, আমাদের মত এক জোড়া বসে আছে। হঠাৎ ছেলেটা মেয়েটাকে জোর করে ধরে একটা কিস দিয়ে দিল। মেয়েটা রাগ করে উঠে গেল। ছেলেটা 'সরি, সরি' বলতে বলতে তার পেছন পেছন ছুটল।
আজকের দিন আমার কাছে বছরের সবচেয়ে ছোটদিন বলে মনে হচ্ছিল। এত তাড়াতাড়ি বিকাল হয়ে গেল! ইচ্ছে হচ্ছিল না ফিরে যাই। তবুও ফিরতে হল। হিমেল রিকশা নিয়ে বাসায় চলে গেল। আমি শেওড়াপাড়া বাজারের সামনে নেমে গেলাম। আবার সেই ফেরার পালা, আবার সেই বাস, 'গুলশান, বনানী আবার জিগায়... তেজকুনিপাড়ায় হালায় আবার জিগায়...। '
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×