somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সাদাত হোসাইন
লিখি, ফিল্ম বানাই, ছবি তুলি। বই প্রকাশিত হয়েছে ৫ টি। উপন্যাস, ছোট গল্প আর (অ)কবিতার বই। প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নাম 'বোধ'। ২০১৩ তে জিতেছে জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড। স্বপ্নের সবটা জুড়ে গল্প। সেই গল্প বলতে চাই লেখায়, চলচ্চিত্রে, ছবি

গরু ছোট করে আঁকলেই কি বাছুর হয়?

১৯ শে জুন, ২০১৩ দুপুর ১২:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের ছেলেবেলায় পাঠ্য বইয়ের ছবিগুলো ছিল অসাধারণ! ছবিগুলো ছবির মতই। কি যে অসম্ভব সুন্দর! বুকের ভেতর কোথায় যেন তিরতির করে ছুঁয়ে দিত নরম বাতাস। আজকাল কারা বাচ্চাদের বইয়ের ছবি আঁকেন জানিনা, তবে এসকল ছবিতে প্রাণ নেই, অনুভূতি নেই, সেই তিরতির ছুঁয়ে যাওয়া নরম বাতাসও নেই! সেদিন ছোটবোনের বই ওলটাতে গিয়ে দেখি ভেতরের ছবিগুলোয় কারো হাতের চেয়ে মাথা বড়, গাছের চেয়ে পাতা বড়, ডালের চেয়ে পাখি বড়! একটা বেখাপ্পা কার্টুন কার্টুন ভাব!
অবশ্য আজকাল কার্টুনেরই যুগ।

আমরা গাওগ্রামে বেড়ে উঠেছি বলেই কিনা কার্টুন সংক্রান্ত বিষয়ে ছিলাম পুরোপুরি অন্ধকারে। ইউনিভার্সিটি ফার্স্ট ইয়ারে কিনশিপ ক্লাশে একদিন ফারজানা ম্যাম বলছিলেন, তিনি এখনও টম এন্ড জেরী দেখেন। শুনে ক্লাস সুদ্ধ আমার সহপাঠীরাও যেন আবেগাপ্লুত হয়ে পরলেন,-‘জানেন ম্যাম, এখনও টিভিতে টম এন্ড জেরি শুরু হলে, রিমোট নিয়ে আব্বু আম্মুর সাথে মারামারি লাগিয়ে ফেলি, কতদিন রাগ করে যে ভাতও খাইনি’। আমি তখন ভ্যাভ্যাভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে ছিলাম। কারণ, টম এন্ড জেরী বলতে আমি ভেবেছিলাম, আমাদের এইচএসসি ইংরেজি পাঠ্য বইয়ে ‘মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পের জেরী। তখন পর্যন্ত আমার পৃথিবীতে জেরী নামক প্রানী ওই একজনই, সেই গল্পের 'মা-হারা' পিচ্চি জেরী। কিন্তু সেখানে টম কোথায়? অনেক খুঁজে টুজে অবশ্য টম একজন পেয়েছিলাম, তিনি হচ্ছেন ‘আঙ্কল টম’স কেবিন’ গল্পের আংকল ‘টম’! এদের তাহলে টিভিতেও দেখা যায়!! পরে অবশ্য বুঝেছিলাম, এই টম-জেরী সেই টম এন্ড জেরী নহে!

বাচ্চাদের ন্যাশনাল কারিকুলাম বোর্ডের টেক্সট বইয়ের গল্প কবিতার ছবিগুলো দেখে ভেতরে ভেতরে চূড়ান্ত রকম অস্বস্তিকর ফিলিংস হতে থাকে। কিছুতেই দূর করতে পারিনা। গ্রাম থেকে শহর অবধি ছেলে মেয়েরা এখন টম এন্ড জেরী চেনে। শুধু চেনেইনা, এইসকল কিছু খায়, ঘুমায়, স্বপ্ন দেখে। ডোরেমন কার্টুনের ছবিওয়ালা ব্যাগ না হলে তারা স্কুলে যাবেনা। বাচ্চাদের কি দোষ? আমরা না হয় ঠাকুর মা'র ঝুলি পড়েছি, কিন্তু প্রযুক্তি যেখানে সময়ের প্রয়োজনে আগাচ্ছে, আমরা সেখানে কই?

ঠাকুরমার ঝুলির কিছু কার্টুন এনিমেশন দেখলাম, ভালো উদ্যোগ ভেবে বাহবাও দিলাম, কিন্তু যারা দেখবে, তারা কিন্তু আমরা না। তারা এ যুগের বাচ্চা। চাইলেই এদের 'ছেলেভুলানি' গান শুনিয়ে ঘুম পারিয়ে রাখা যাবেনা। অমন আনাড়ি গ্রাফিক্স আর এনিমেশন তারা কেন দেখবে! টিভির রিমোট ঘুরালেই তারা দুর্দান্ত এনিমেশন দেখে, গ্রাফিক্স দেখে, মুভমেন্ট দেখে- টম এন্ড জেরী, বেনটেন, স্পাইডার ম্যান আরও কি কি যেন!! আর আমরা গ্রাফিক্স এনিমেশন দূরে থাক, অসাধারণ সব ছবিগুলোর বদলে টেক্সট বইখানাও এ কি দিয়ে ভরিয়ে ফেলছি! নদীর দেশ, মাঠের দেশ, গ্রামের দেশ বাংলাদেশকে এই শেকরহীন নতুন প্রজন্ম কি করে চিনবে? কোথায় চিনবে?

আমাদের ছেলেবেলায় টেক্সট বইয়ের ছবিগুলো সম্ভবত হাশেম খান কিংবা কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা। বইয়ের বেশিরভাগ গল্প কবিতাই ছিল গ্রামের। ছবিগুলোও। হয়তো সেকারনেই আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। কমলাফুলির ছবি, সফদার ডাক্তার, মামাবাড়ির পুকুর ভর্তি মৃগেল মাছ, আসমানিদের রসুলপুরের ছোট্ট বাড়ি, খেয়াঘাটের বিশাল বট, পরিশ্রান্ত পথিক আর শান্ত নদীতে ঘুমের মতন নিঃশব্দে বয়ে চলা পাল তোলা নৌকোর সারী... চোখের সামনের রোজকার পৃথিবীটা কেমন করে এমন ছবি হয়ে চলে এলো বইয়ের পাতায়, কি যে অবাক হতাম ভেবে!

ক্লাস থ্রী কিংবা ফোরে চমৎকার এক ছড়া ছিল-, ‘‘বিষ্টি এলো কাশবনে, লাগলো সারা ঘাসবনে, বকের সারি কোথায়রে...” গোটা গোটা হরফে লেখা ছোট্ট ছড়াটার পটভূমিকায় পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে থাকতো বৃষ্টির ছবি। বাতাসে হেলে পড়া কাশবনে চরাচর ভেসে যাওয়া বৃষ্টি। সাদাকালো ছবিতে যেন বুকের ভেতর জুড়েও নামতো বৃষ্টির ঢল, যেন মেঘ কালো মেঘে আঁধার নেমে আসে বইয়ের পাতায়। বাতাসে তেরছা হয়ে পড়া সেই বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে কলশি কাঁখে ছুটে যায় পল্লীবধূ, অবাধ্য গরুর পালের পেছনে ছোটে কৃষক। বৃষ্টির ফোটায় যেন টুপ টুপ খই ফোটে বর্ষার ভরা গাঙে, সে গাঙে ভেসে যায় পাল তোলা নাও... হাঁসেদের দল। আহা আমার দেশ!

ছবিগুলো কেমন করে যেন আমাদের ভিজিয়ে দিত বৃষ্টিতে! আসলে ছবিগুলো যারা একেছিলেন, সেখানে 'কল্পনার সব রঙ' নয়, ছিল জীবনের সব রঙ। আমাদের জীবন, আমাদের গাও, আমাদের নদী, আমাদের বৃষ্টি, আমাদের কাশবন, আমাদের জলে ভরা গাঙে পাল তোলা নৌকার সারী।

সেদিন ছোট বোনের বই দেখে রীতিমত আঁতকে ওঠার দশা। বইয়ের পাতায় পাতায় কি হাস্যকর সব ছবি, সে ছবিতে প্রাণ নেই, চিন্তা নেই, জীবন নেই। নৌকার মাঝির সাইজ যেন নৌকার সমান, কখনো কখনো নদীও খানিকটা ছোট লাগে পাল তোলা নৌকোর কাছে। গরু ছোট করে বাছুর আঁকার চেষ্টা।

কিন্তু গরু ছোট করে আকলেই কি বাছুর হয়?

বিলম্বে হলেও আমি যেমন বুঝেছিলাম, এই টম-জেরী সেই টম এন্ড জেরী নহে!
তেমনি সর্বক্ষেত্রে যাহা লাউ, তাহাই কদু নহে...
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুন, ২০১৩ দুপুর ১২:৩২
৩৩টি মন্তব্য ৩৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×