এর পরদিন আমার পরীক্ষা ছিলো
০৪ ঠা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:৫৬
আগামীকাল আন্তর্জাতিক আইনের পরীক্ষা। পড়ছি। বিষয়টিও বেশ মজার। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক ও নিয়ন্ত্রণবিধি। আচরণ কেমন করে প্রথা হয়, প্রথা কেমন করে হয় আইন, এসবই এর বিষয়। এমন সময় দরজায় ঠক ঠক শব্দ হলো।
কে? হুংকার দিলাম। বিরক্তও হলাম। ফাইনাল পরীক্ষার এসময়ে বন্ধুরা অযথাই আসে। নানা পরিকল্পণার ফানুস উড়িয়ে সময় নষ্ট করে। গত রাতে এই কাজটি করেছে তুষার। রাত দুটোয় এসে, গেছে ভোর পাঁচটায়। সকালে তাই দরজায় একটা সাইনবোর্ড দিয়েছি। তাতে লিখেছি , সামনে পরীক্ষা আসুন আড্ডা মারি। আসুন শব্দটা লাল কালিতে মোটা করে লেখা। যেন লজ্জায় কেউ না আসে।
ঠক ঠক শুনে মনে হলো তাতে কোন কাজ হয়নি।
কে?
আমি গার্ড স্যার ।
কি চাই ?
আপনের ফোন আইছে।
কোত্থেকে?
ঢাকা।
সুতরাং উঠতেই হয়। বাড়ি থেকে ফোন। একবার মনে হলো যাবোনা। বন্ধুরা মজা করছে। এমন অনেকবার হয়েছে। গার্ড বলে, রফিক ভাই আপনের ফোন । লেডিস হল থেইকা। পরে দেখা যায় বোগাস। আবার ভাবলাম যাই। গুরুত্বপূর্ণ কিছু হতে পারে।
পাঁচতলা থেকে নামি। গার্ড আমার সাথে পাল্লা দিয়ে নামতে পারেনা। হাঁপায়। সিড়ির গোড়ায় আছড়ে পড়ে বাঁশির শব্দ। উৎস টিভি রুম। সে শব্দ ক্রমশ বিলীন হয় ঢোলের শব্দে। দুর্গা পূজায় যেমন তাল তোলে ঢুলিরা তেমনি।
একচকিতে টিভির পর্দা দেখতে পাই। তাতে একটি রিক্সার চাকা ঘুরছে। মনযোগ কাড়ে । দাঁড়াই । তখনই নেতা গোছের একজন বদলে দেয় চ্যানেল। শুরু হয় দিলবর দিলবর। আমি গতি বাড়াই ফোনের দিকে।
ফোনের চারপাশে ভন ভন করছে কয়েকজন। ছাত্রী হলে লাইন লাগাবে। সরে না । তাই রিসিভার হাতে নিয়ে বলি, প্রাইভেসি লাগবে।
ছেলেগুলো যতদুরে সরে গেল, তারচেয়ে বেশী সতর্ক করলো কানকে। কি জানি কারো প্রেমিকা চান্সে প্রেমালাপ করে কিনা।
হ্যালো রফিক বলছি।
শোন রফিক , খবর ভালো না।
কে বলছেন ?
তোর ভাই । চিনতে পারস নাই? মার শরীর খারাপ।
কিন্তু কন্ঠ এতো অচেনা লাগছে কেনো! কি হয়েছে মার?
মার অবস্থা ....
লাইন কেটে যায়। ফোনের ওপ্রান্তে টো টো ধাতব শব্দ। যেন নীরবতা ভাঙা গির্জার ঘন্টা ।
এক্সচেঞ্জ ট্রাই করে এতো করে বোঝালাম দরকারটা। ওরা বোঝলো ছাত্রদের তৃতীয় হাতটার নাম অজুহাত।
ফোন ছেড়ে সিঁড়িতে কিছুক্ষণ বসে থাকি।
দিলবর দিলবর গান বাজতে থাকে।
গত বন্ধেও মাকে সুস্থ্য দেখে এসেছি। কীহলো এই অল্প সময়ে। কারো সাথে পরামর্শ করা গেলে ভালো হতো । প্রথমেই যার নাম মনে পড়লো, সে তো আমার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে গলা একদম না কাঁপিয়ে জানতে চায়, তিন ভূবনে আমার কেউ আছে কি না?
তাকে ফোন করলে, এর কী অনুবাদ হবে জানিনা। তারপরো পথে নামি। একই সাথে নিজের ভেতর গুটিয়ে যাই। এতো রাতে ভদ্রলোকের মেয়েকে ফোন করে সমস্যায় টেনে আনা ঠিক হবেনা। তারচেয়ে বরং ঢাকা চলে যেতে পারলে মাকে শেষবারের মতো দেখা যাবে।
ট্রেনতো ছেড়ে গেছে সেই পৌঁনে নয়টায়। সাড়ে নয়টায় যে টিচার বাসটা যায়, যেখান থেকে বেছে বেছে ছাত্রদের ধমকি-ধামকি দিয়ে নামিয়ে দেয় শিক্ষকরা , সেটাও এতোক্ষণে শহর ছুঁই ছুঁই। কোনভাবে শহরে পৌঁছাতে পারলে না হয় বাস ট্রাক একটা কিছুতে করে ঢাকা যাওয়া যাবে।
কিন্তু পরীক্ষা ছেড়ে যাবো কি না সে সিদ্ধান্ত কার সাথে আলোচনা করে নেই? ক্লাসমেটদেরও পরীক্ষা। আঁকিয়ে বন্ধুদের প্রায় সবাই থাকে শহরে। হলে যে দুয়েকজন ক্লাসমেট থাকে তাদের বোঝানো গেলনা সমস্যাটা । তারা মনে করলো সময় নষ্ট করার নতুন ফন্দি এটেছি আমি। চোখ উল্টে একজনতো বলেই দিলো , ছয় মাস আগে সিলেবাস শেষ করে রফিক গায়ে হাওয়া লাগাচ্ছে। এখন এসেছে আমাদের ফেল কনফার্ম করতে।
ক্লাসমেটদের প্রতি তীব্র অভিমান হলো আমার। চার বছর একসাথে পড়লাম অথচ আমাকে বোঝার চেষ্টা করলো না তারা!
অযথাই হলের এমাথা ও মাথায় দুই চক্কর দেই । বুঝতে পারিনা কী করবো।
রুমমেট গেছে রাঙামাটি। ধান ছিটিয়ে যে চড়াই পাখিটাকে লোভ দেখাই প্রতিদিন, সেটিও আজ আসেনি। উদ্বেগ আর সিদ্ধান্তহীনতায় ঘামি। বাকী ক্লাসমেটদের রুমে না পেয়ে ঘাম আরো বাড়ে। চিকন ঘাম বলে যে একটা বস্তু আছে তা টের পাই এই প্রথম ।
সেই সাথে মাকে মনে পড়লো ।
ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি মোদের বাড়ী এসো । বাটা ভরে পান দিব মুখ ভরে খেয়ো।
মায়ের পানের বাটাটিও পিতলের।
আহা আর বেশী ভাবা গেলো না। চিন্তার সুতা কেটে যায় কেবলি। মা মারা যাচ্ছে। আর আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিনা। কী করবো। মা নাকি পরীক্ষা?
একবার ভাবি পরীক্ষা দেবনা। ভবিষ্যৎ ভাবনাটা মাথায় আসতেও দেরি হয়না। সামনে ইলেকশন । সরকার ফল করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কী হবে বলা মুশকিল। চার বছরের শ্রম নষ্ট হবে।
তখনই আবারো মার কথা মনে পড়ে। তিনি বলেন, রফিক সোনামনি, বিচারপতি হয়ে একদম নিরপেক্ষ থাকবে কিন্তু। নিরপরাধ যেন সাজা না পায়। কথায় কথায় তৈরী মায়ার বাধনে ব্যাকুল হই আমি।
আমি মূলত একটা সিদ্ধান্ত নিতে চাই । পরীক্ষায় বসবো নাকি মাকে দেখতে ঢাকায় চলে যাবো। একটা নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়ার কঠিন এই সময়। যদি কোন কারনে সিঁড়ি থেকে পড়ে হাত পা মাথা ভেঙে ফেলতাম তবে কি পরীক্ষার কথা ভাবতাম আমি? না মোটেই না।
কেউ যদি নল ঠেকিয়ে বলে পরীক্ষা দিস না, কী করার থাকে আমার? ড্রপ দেয়া ছাড়া।
যাহোক, কাপালে যাই থাকুক পরীক্ষা দেবো না।
কিন্তু এটাই শেষ পরীক্ষা। এরপর চাকরী, কোর্ট, টাকা ,একটা বাসা , আর অহংকারি মেয়েটাকে কবুলের সুতোয় বৌ বানিয়ে রঙ্গিন একটা জীবন। বিছানায় শুয়ে থাকবে আমাদের বাচ্চাটা। আমরা দাঁড়াবো বেলকনিতে। চাঁদের আলো, নারকেলের পাতা পিছলে পড়বে আমাদের গায়ে। ও আমার হাত ধরবে । অস্ফুটে বাজবে রবীন্দ্রনাথ। ভালোবাসি ভালোবাসি।
স্বপ্নটা মিলায় বাতাসে। ভাসে মায়ের মুখ । যার জন্য এই পৃথিবী দেখা তার মৃত্যুর সময় আমার সুখ কল্পণা!
সুন্দর কদাকার সহজ জটিল প্রতারক পৃথিবীতে নাড়ির বাঁধন ব্লেডে কেটে দিলেই কী সব কাটা যায়?
কী করবো আমি ?
মা
না ভবিষ্যৎ
না মা
ভবিষ্যৎ
মা
ধুৎ
যেখানে প্রতিটি সেকেন্ডের মূল্য জীবন দিয়ে দিতে হয় সেখানে এতোটা সময় কেবল ভেবে ভেবে পার করা উচিত না। গোল্লায় যাক আমার পরীক্ষা। গোল্লায় যাক আমার ভবিষ্যৎ । আমি পরীক্ষা দেবোনা। ঢাকা চলে যাবো। মায়ের যদি কিছু হয় অন্তত শেষ দেখাটা দেখতে পাবো।
দ্রুত পাঁচ তলায় যাই । লকার থেকে টাকা নেই। সাথে দুচারটা কাপড়। হাতল টানতেই আইনের বইগুলো যেন কাঁদে।
অনিশ্চিতের পথে যাওয়া ভীষণ কঠিন।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামি । হাতঘড়িতে সাড়ে দশটা। মেইন গেইটে পাহারাদার। পোষাকী এবং ছাত্র।
এতো রাইতে যান কই?
যেন পরীক্ষার ভাইবা।
আমি উতরে যাই । কোন রকম ঝামেলা ছাড়া। পথে নামি । হলের সামনের দোকানগুলো এরইমধ্যে বন্ধ। ল্যাম্পপোষ্টের আলোতে পাতাদের সারি সারি ছায়া আন্ধকারকে ফিকে করে অবহেলায় শুয়ে আছে রাস্তায়। দিনে ঝরা পাতা মাড়িয়ে স্টেশনে পৌছি। সেখানে একটা রিকশা থেমে। তাতে মিটমিট করে জ্বলে হারিকেন। অদূরে মেহগনি গাছটার নিচে কাদের যেন জটলা। ডাইলখোর কেউ হয়তো হবে। আমি রিকশাচালককে ইঙ্গিত দেই।
যাবেন?
জটলা নড়ে ওঠে।
আরে রফিক, কই যাস?
সমস্বরে জানতে চায় ওরা। তিনজন। আমার অন্য হলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এতক্ষণ এদের আমি খুঁজেছি।
ঢাকা যাই।
ক্যান?
ওরা মূলত: জানতে চায়।
এতো চাপ আমার শরীর আর বইতে পারছিলো না। লুকিয়ে শার্টের হাতায় চোখের পানি মুছে, বাষ্পীভূত গলায় বললাম - আমার মা বুঝি বাঁচে নারে।
হা হা হো হো (প্রচন্ড ) শব্দে ওরা হাসতে থাকলো। তারপর তলপেট দুহাতে চেপে এদিক-ওদিক নিজের চারপাশে ঘুরতে থাকলো আর হাসতে থাকলো আর ঘুরতে থাকলো আর হাসতে থাকলো।
ওদের একজন বললো নতুন মোবাইল নিছি দোসত্ । তোর লগে একটু জোকস করলাম। তোর মার অসুখের ভুয়া খবর দিয়া।
এইবার আমি আর গোপনে নয় প্রকাশ্যে চোখ মুছলাম।
সমাপ্ত
এই গল্পটি ২০০২ সালে খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছিলো- আনোয়ার সাদী।
কৌশিক বলেছেন:
দুর্দান্ত। + এন্ড ফেভারিটে।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ কৌশিক।
শুভেচ্ছা।
মমমম১২ বলেছেন:
সুন্দর।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ মমমম।
শুভেচ্ছা।
ফারহান দাউদ বলেছেন:
চমৎকার।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ ফারহান দাউদ।
শুভেচ্ছা।
অনন্ত দিগন্ত বলেছেন:
অসম্ভব সুন্দর লেগেছে ...........
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ অনন্ত দিগন্ত।
শুভেচ্ছা।
মানবী বলেছেন:
চরিত্রের অনুভূতিগুলো চমৎকার ভাবে বর্ণনায় ফুটে উঠেছে।ভালো লেগেছে গল্পটি পড়ে, ধন্যবাদ আনোয়ার সাদী।
+
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ মানবী।
শুভেচ্ছা।
অ্যামাটার বলেছেন:
চমৎকার লিখেছেন
লেখক বলেছেন: আমার ব্লগে স্বাগতম অ্যামাটার। সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
শুভেচ্ছা রইলো।


















