`আমারেও ডাকেনি কি কেউ এসে জ্যোৎস্নায়'

০৬ ই মার্চ, ২০০৮ বিকাল ৫:৪৯

শেয়ারঃ
0 0 0


`সারারাত দখিনা বাতাসে
আকাশের চাঁদের আলোয়
এক ঘাইহরিণীর ডাক শুনি-
কাহারে সে ডাকে!
...............................
কোথাও অনেক বনে- যেইখানে জ্যোৎস্না নাই আর
পুরুষ-হরিণ সব শুনিতেছে শব্দ তার;
.................................................
জীবনের কোনো এক বিস্ময়ের রাতে
আমারেও ডাকেনি কি কেউ এসে জ্যোৎস্নায়- দখিনা বাতাসে
ওই ঘাইহরিণীর মতো?
................................................
বসন্তের জ্যোৎস্নায় ওই মৃত মৃগদের মতো
আমরা সবাই।'
(ক্যাম্পে : জীবনানন্দ দাশ)

ক্যাম্পে কবিতাটি যতবারই পড়ি, সমূহ প্রশ্ন ডানা মেলে উড়তে থাকে চিন্তার আকাশে-বাতাসে। চাঁদের আলোয় এক ঘাইহরিণীর ডাক- কাহারে সে ডাকে? কেন ডাকে? নিজে ঘাই হয়ে (শিকারকে ফাঁদে ফেলার জন্য সজাতীয়ের ঘাই বা টোপ দেওয়া হয়) শিকারীর জালে অন্যকেও বন্দি করাতেই কি ঘাইহরিণীর এত ডাকাডাকি- কোন সে শিকারী- সে কি নিষ্ঠুর- সে কি উন্মাদ প্রেমিক-হন্তারক- না চাঁদের আলোয় জ্যোৎস্নায় চঞ্চল হরিণী-মন প্রেমিকের প্রেমাস্পদের সান্নিধ্য লাভে ব্যাকুল হয়ে ওঠে? না এই ডাকাডাকির মাঝে লুকিয়ে আছে কোনো ছলনা, মিথ্যাচার? এ যজ্ঞে কে তবে দায়ী? ঘাইহরিণী, না জ্যোৎস্না-দখিনা বাতাস-চঞ্চলমন, নাকি ওই শিকারী, সমাজযন্ত্র?
আবার দেখা যায়, কোথাও অনেক বনে- যেখানে জ্যোৎস্না নেই, ওইখান থেকে পুরুষ-হরিণ তার কাঙ্ক্ষিত ঘাইহরিণের ডাক শুনছে। এবং ছুটে যাচ্ছে তার দিকে! মানে ওই জ্যোৎস্নাস্নাত ঘাইহরিণীর দিকে। তাহলে যেখানে জ্যোৎস্না নেই, সেইখানেই কি পুরুষ-হরিণেরা থাকে? পুরুষ-হরিণদের জন্য কি কোনো ব্যক্তিগত জ্যোৎস্না নেই? জ্যোৎস্নার মায়াময় বিভ্রম ও ছলনা শুধু! তবু কেন জ্যোৎস্নায় লালসা- আকাঙ্ক্ষা-সাধ-প্রেম স্বপ্ন স্ফুট হয়ে ওঠে?
অন্যত্র দেখি, কবিকেও ডেকেছিল কেউ এমনিভাবেই, ওই ঘাইহরিণীর মতো, জ্যোৎস্নায়- দখিনা বাতাসে। যে ডেকেছিল, সে কে? কেনই-বা ঘাইহরিণীর মতো? সত্যিই কি তেমন কোনো নারী ডেকেছিল তাঁকে, গোপনে বসন্তরাত্রিতে জ্যোৎস্নায় প্রেমের উৎসবে? আর কবিও চিতার চোখের ভয়- চমকের কথা সব পিছে ফেলে ধরা দিতে চেয়েছিলেন, সেই ঘাইহরিণীর মতো কেউ একজনকে। হয়তো ধরা দিতে পারেননি তিনি। তাই বুকের প্রেম মৃত মৃগদের মতো ধুলোয় রক্তে মিশে গেছে। প্রেমের সাহস- সাধ-স্বপ্ন নিয়ে ব্যথা, ঘৃণা-মৃত্যু পেয়ে তবু কবি বেঁচে থাকেন মৃত মৃগদের মতো।
এখানে `ঘাইহরিণী' রূপকের আড়ালে লুকিয়ে আছে কি জীবনের কোনো এক গূঢ় বিস্ময় জড়ানো ক্ষত, যে ক্ষতের কোনো সেবা হয় না, শুশ্রূষা হয় না, কেবলি বয়ে বেড়ানো ছাড়া। কবিকে সেই কেউ একজন ডেকেছিল জীবনের কোনো এক `বিস্ময়ের রাতে'। তা-ও আবার জ্যোৎস্নায়! জ্যোৎস্নায় কি তবে বিস্ময়? জীবনে কি বিস্ময় অপরিহার্য? কোনো এক ক্ষত? যে ক্ষতের যে বিস্ময়ের ঘোরে কবি ঘাইহরিণীর ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে মৃত মৃগীদের যন্ত্রণার মাঝে নিজের অন্তর্বেদনাকে প্রকাশিত হতে দেখেছেন।
প্রতিটি জীবনেই কি তবে এরকম বিস্ময়ের রাত আসে? আর ওই রাতে ঘাইহরিণীর মতো কেউ একজন ডেকে যায়- জ্যোৎস্নায়- দখিনা বাতাসে। কেন সে ডাকে? জ্যোৎস্নায়ই বা কেন? তার কাছে ধরা দিতে চাইলেই কি ধরা দেওয়া যায়? না তার কাছে গেলে আর তাকে পাওয়া হয় না, বন্দি হয়ে পড়তে হয় অন্য কোনো এক শিকারীর জালে। যে শিকারের জাল ছেড়ে আর বের হওয়া যায় না কোনোদিনই।
তবু নিরন্তর এই যে ডাকাডাকি, ইশারা-সংকেত, এই যে কারো কাছে গিয়ে ধরা দিতে চাওয়ার বাসনা, না পাওয়ার বেদনা- এই নিয়েই তো চলছে জগত-সংসার, মানুষের জীবন- ওই মৃত মৃগদের মতো! তারপরও জ্যোৎস্না এলেই প্রেমমন উত্তাল হয়ে ওঠে, সমস্ত ডরভয় পেছনে ফেলে ছুটে যায় ঘরবাহিরে, বনে, কাঙ্ক্ষিত কারো সান্নিধ্য লাভের আশায়। হয়তো কেউ পায় তাকে, কেউ পায় না। যে পায় না, যার পাওয়া হয়ে ওঠে না, হয়তো তার মনঘরেই চুপিসারে ঢুকে যায় কোনো এক বিস্ময়, বিমূর্ত ও আশ্চর্য ক্ষত। যাকে তাড়ানো যায় না কখনো। কেননা সেই ক্ষতটিকে আমরা নিজের অজান্তেই মৃত মায়ের মুখের মতো আগলে রাখি সারাজীবন।

 

বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ০৬ ই মার্চ, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৪৭
জাহিদ সোহাগ বলেছেন: নারীর হৃদয় কি ঘাই হরিণ?

আমার বুকের ভেতরটা দেখি চাঁদমারি!
২২ শে জুন, ২০০৮ বিকাল ৪:৩৩

লেখক বলেছেন: কি জানি। হয়তো বা, হয়তো না।

২২ শে জুন, ২০০৮ বিকাল ৪:৩৩

লেখক বলেছেন: থ্যাংকু

৩. ০৬ ই মার্চ, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৩৯
আকাশচুরি বলেছেন: এখানে `ঘাইহরিণী' রূপকের আড়ালে লুকিয়ে আছে কি জীবনের কোনো এক গূঢ় বিস্ময় জড়ানো ক্ষত, যে ক্ষতের কোনো সেবা হয় না, শুশ্রূষা হয় না, কেবলি বয়ে বেড়ানো ছাড়া।

অনিবার্য উপলব্ধি....
২২ শে জুন, ২০০৮ বিকাল ৪:৩৪

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।

৪. ১৩ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১:০৭
তারিক টুকু বলেছেন: গদ্যটা লিকারের সাথে সেদিন ভাল লেগেছিলো।

+
২২ শে জুন, ২০০৮ বিকাল ৪:৩৫

লেখক বলেছেন: হ

২২ শে জুন, ২০০৮ বিকাল ৪:৩৬

লেখক বলেছেন: তাই তো। কই আমি?

৬. ৩০ শে মার্চ, ২০০৮ রাত ১০:৪৩
সুতরাং বলেছেন: ভালোই লিখেছেন দাদা। ক্যাম্পে কবিতাটি আমার প্রিয় কবিতাগুলোর একটি। ওখানে একটা লাইন আছে না, ঐ যে-
'আমার হৃদয় এক পুরুষ-হরিণ
সেও কি চায় নাই ধরা দিতে'

যতবার পড়ি, চমকে উঠি। আমার হৃদয়ে যে পুরুষ-হরিণ লুকিয়ে আছে, সেও কি চমকে ওঠে? এই চমকে ওঠা কি কোনও গোপন ছলনা? আমাদের মনে মনে একজন শিকারী বাস করে, যে নিজেই কখনও শিকার হতে চায়, ধরা দিতে চায়। আর সেখানেও আছে ছলনা, গোপনে বেঁধে রাখার কৌশল।
২২ শে জুন, ২০০৮ বিকাল ৪:৩৯

লেখক বলেছেন: আমার প্রিয় কবিতা।

৭. ০৩ রা এপ্রিল, ২০০৮ বিকাল ৩:২১
আমজাদ সুজন বলেছেন: আপনাকে দেখি এখানে ব্যাপক গদ্যকার হিসেবে পাওয়া গেল?

যা হোক, আচ্ছা ব্লগে কি লেখা চাওয়ার রেওয়াজ আছে?

সফেদ, সংসার ভালো?
২৩ শে এপ্রিল, ২০০৮ বিকাল ৪:৫৬

লেখক বলেছেন: আমার সংসার চলছে মোটের ওপর ভালোই। আপনার?

৮. ১২ ই এপ্রিল, ২০০৮ বিকাল ৩:২২
মুজিব মেহদী বলেছেন: পড়লাম। মনে পড়ল--

লালসা-আকাঙ্ক্ষা-সাধ-প্রেম-স্বপ্ন স্ফুট হয়ে উঠিতেছে সব দিকে
আজ এই বসন্তের রাতে ;
এইখানে আমার নকটার্ণ--।


ক্যাম্পে কবিতার কোনো যথাযথ ব্যাখ্যা কি সম্ভব?

সফেদের ব্যাখ্যা পড়ে আমার আরো গুলিয়ে গেল সব।
৯. ২৩ শে এপ্রিল, ২০০৮ বিকাল ৪:৫৪
সফেদ ফরাজী...... বলেছেন: মুজিব ভাই, কবিতার কি আসলে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হয়? তারপরও আমরা যার যার মতো ভাবনাচিন্তার নিরিখে মেলাতে চাই কোনো কিছুর সঙ্গে। এই যা। আপনাকে ধন্যবাদ।
০৯ ই মে, ২০০৮ দুপুর ১:২৬

লেখক বলেছেন: ওয়ালাইকুম

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯০৯৪ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
safedfarazi@gmail.com
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই