somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... আমার প্রথম বই লেখক নাম: সফেদ ফরাজী
প্রচ্ছদ: শহীনুর রহমান
প্রকাশক: ঐতিহ্য
মূল্য: ১০০ টাকা

একুশে বইমেলায় স্টল নম্বর, ১৬৬, ১৬৭ ও ১৬৮]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29534138 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29534138 2012-02-02 23:02:41
প্রসঙ্গ: গানের কথা আর একটা হবে না তো যমুনা
না হবে পদ্মা না হবে মেঘনা
না হবে তাজমহলের নমুনা...'

_গানটির গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী কে?

এ তথ্যটি যাঁর জানা আছে দয়া করে একটু জানান প্লিজ...

খুব দরকার... ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29375096 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29375096 2011-05-04 17:32:29
উৎপলকুমার বসুর নতুন কাব্যগ্রন্থ `পিয়া মন ভাবে' থেকে দুটি কবিতা
১.
খট্টাশ- প্রসূতিপারা, স্ফীতোদর, নৌবাহিনীর নেতা।
আশ্রয়দাতা তুমি, এই নাবিকশ্রেষ্ঠরে তীরে বেঁধে রাখো
ঊষাপতি অকস্মাৎ মধ্যাহ্নকটালে যেন অস্থির, অনিশ্চয়-
ঢেউ দিগন্তে লাফিয়ে ওঠে- সাতসমুদ্রের লবণসার

লাগে আকাশের গায়- হায়, দাগানো তালিকা এই
কর্মচারীর হাতে, তাই নিয়ে ঘুরি- এত নাম, শতাধিক,
এদের কোথায় সন্ধান পাব? কোন জনপদে? কোন
গোপন কৌশলে এদের দ্বীপান্তরী করা যাবে? জলচর

দেব ও দেবতাগণে মিনতি জানাই, পায়ে পড়ি, এ-যাত্রা
উদ্ধার করো, ঠিক সময়মতোই যেন এদের গ্রেপ্তার করি,
অত্যাচারে দিকভ্রান্ত করে রাখি- যতণ জলযান অ-প্রস্তুত,
আমাদের তৈরি হতে যতণ লাগে।

২.
কতদিন লাফিয়ে নামিনি মাঠে। ইদানীং ধরা পড়ে যাই
চিহ্নের বাগানে। কখনো-বা ভণিতাবাজারে।

যে-দেহ ভৌতিক হয় তারও চাই খাদ্য ও ব্যায়াম-
পলায়নপর হতে পারা চাই।

ভাবি, যমুনা-পুলিনে যে বাঁশি বাজলো
সে কি পুলিশের বাঁশি?

ঐ গোঠে জেট-বিমানের ধ্বনি, ঐ বনে পারমাণবিক
কদম্বরেণুর ঘ্রাণ-

তারই মধ্যে বেঁচে থাকা- ন্যায় ও অন্যায় নিয়ে
কথা কাটাকাটি আছে।

(বইয়ের প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০১১, প্রকাশক: সপ্তর্ষি)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29365143 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29365143 2011-04-18 21:21:23
কবি মজনু শাহ্'র `জেব্রামাস্টার' প্রসঙ্গে তাৎক্ষণিক মজনু শাহ্‌ নব্বই দশকের কবি। ইতোপূর্বে প্রকাশিত তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো: আনকা মেঘের জীবনী (১৯৯৯), লীলাচূর্ণ (২০০৫) এবং মধু ও মশলার বনে (২০০৭)। এর মধ্যে `আনকা মেঘের জীবনী' পাঁচমিশালী কবিতার সংকলন; লীলাচূর্ণ- ৫৬টি চতুর্দশপদী সিরিজ কবিতার গ্রন্থ; আর `মধু ও মশলার বনে' একটি দীর্ঘ কবিতার পুস্তিকা। তিনটি গ্রন্থের মধ্যে লীলাচূর্ণই সবচেয়ে বেশি আলোচিত কাব্যগ্রন্থ। এ গ্রন্থটি প্রকাশের পর বিশেষত তরুণ কবি ও পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলে। তবে `জেব্রামাস্টার' গ্রন্থে মজনু শাহ্‌ যে ব্যতিক্রম এক জগতের নির্মাণ করেছেন, তা হয়তোবা আগের সবগুলো থেকে একেবারেই আলাদা। এমনকি আমাদের পাঠঅভিজ্ঞতায়ও হয়তোবা অনেকটাই নতুনত্ব অনুভব হবে এ গ্রন্থপাঠে। এতগুলো কথা বললাম এ কারণে যে, এ গ্রন্থের সব কবিতার সঙ্গেই আমার একটা পাঠক-সম্পর্ক অনেক দিন ধরেই গড়ে উঠেছে। প্রতিটি কবিতা অন্তত ৮-১০ বার করে ইতেমধ্যে পড়া হয়েছে আমার। আমি মনে করি, এ গ্রন্থটি অনুসন্ধিৎসু-কাব্যপাঠকের অবশ্য-পাঠ দাবি করে। হে পাঠক, `জেব্রামাস্টার'-এর ভুবনে আপনাকে স্বাগতম। ]]> http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29329324 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29329324 2011-02-18 18:10:54 আত্মগোপন প্রতিটি লেখকের ধর্ম হওয়া উচিত : দেবেশ রায় [পঞ্চাশের দশকের উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায়। দেবেশ রায়ের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর। পশ্চিমবঙ্গেই বসবাস করছেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে- তিস্তাপাড়ের বৃত্তান্ত, মফস্বলি বৃত্তান্ত, সময় অসময়ের বৃত্তান্ত, আত্মীয় বৃত্তান্ত, শিল্পায়নের প্রতিবেদন, দাঙ্গার প্রতিবেদন, খরার প্রতিবেদন, যযাতি, তিস্তাপুরাণ, বরিশালের যোগেন মণ্ডল ইত্যাদি। গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে দেবেশ রায়ের ছোটগল্প (৬ খণ্ড), প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর আদি গদ্য, সময় সমকাল, উপন্যাস নিয়ে, উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে, শিল্পের প্রত্যহে, উপনিবেশের সমাজ ও বাংলা সাংবাদিক গদ্য ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ২০০৯ সালের ১৬ জানুয়ারি ঢাকা থিয়েটারের আমন্ত্রণে তিনি বাংলাদেশে এসে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় ছিলেন। এর আগে ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসেও বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। দু’বারই তাঁর সঙ্গে বেশকিছু খণ্ড খণ্ড আড্ডা হয়। সেই আড্ডা থেকেই এ লেখাটি তৈরি করেছেন সফেদ ফরাজী ]


‘লেখকের অপরিচয়ে আমি বিশ্বাস করি। আত্মগোপন প্রতিটি লেখকের ধর্ম হওয়া উচিত বলে মনে করি। এটা তো প্রচল কোনো ধর্ম নয়, এটা অভ্যাস। নিজেকে নির্বাসন দণ্ড না দিলে কেউ কবি বা লেখক হতে পারে না।’ সাহিত্যিক জীবনের দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পার হয়ে ৩০ জানুয়ারি ২০০৮-এর আলো-আঁধারি এক রাতে দৃঢ় প্রত্যয়জড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বললেন কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায়। লেখকের জন্য তাহলে কি অপরিচয় অপরিহার্য? কোনো এক আত্মগোপন? কেন এই অপরিচয়, কেনই-বা আত্মগোপন? লেখক কি তাহলে আড়ালে থেকে সবকিছু কেবলি দেখে যাবেন, কিন্তু নিজেকে দেখাবেন না। যত বোঝাপড়া ওই সৃষ্টিকর্মের সঙ্গেই। কথায় কথায় এমতো ভাবনাগুলো উস্কে দিচ্ছিলেন তিনি।
আমরা তখন জীবনানন্দের জন্মধন্য বরিশাল শহর থেকে ফিরছিলাম, লঞ্চে। দোতলা কেবিনের একটি বারান্দায় বসে আছি। শীতকাল চলছে। নদীতে তুমুল বাতাস। হালকা বৃষ্টিও পড়ছে। আমরা কাঁপছি শীতে। আকাশে চাঁদের ক্ষীণ আভা। মাঝে মাঝে দূর থেকে হাত নাড়ছে যেন জেলেনৌকার কুপিবাতিগুলো। জলের ওপর জল ভেঙে পড়ার শব্দ হচ্ছে ছলাৎ ছলাৎ...। এক অপূর্ব ব্যঞ্জনায় ভেসে চলছে আমাদের লঞ্চ। আমরা দেবেশ দা’র কাছ থেকে উনার সাহিত্য ও ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন বিষয় শুনতে চাইলাম। তিনি স্বভাবসুলভ ধীরকণ্ঠে থেমে থেমে বলছিলেন নিজের চিন্তা ও মধুর স্মৃতিকথাগুলো। যেহেতু আমরা জীবনানন্দের শহর থেকে ফিরছিলাম, তাই জীবনানন্দের সাহিত্য বিষয়ে তাঁর মতামত কী, জানতে চাইলাম। তিনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘জীবনানন্দ দাশ কবি হিসেবে কত বড় তা আন্দাজ ছিল, কিন্তু এত বড় ঔপন্যাসিক তা আগে আন্দাজ ছিল না। ৩২, ৩৬, ৩৭, ৩৮ বছরে তিনি মূলত উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর জীবনের ১২টি বছর কোথাও কোনো কবিতা প্রকাশিত হয়নি। সে সময় তিনি উপন্যাস লিখেছেন। ওই সময়ে উনার কোনো কবিতা প্রকাশিত হয়নি, হতে পারে কেউ উনার কবিতা ছাপেননি কিংবা তিনি নিজেই দেননি। একজন এত বড়মাপের কবির ক্ষেত্রে এটা কতটা বিস্ময়ের ব্যাপার, একবার ভাবুন তো! আমি তো মনে করি তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। ১৯৩৬ সালে বসে জীবনানন্দ দাশ ২০০৮ সালের আধুনিকতা করে গেছেন। তিনি গল্প-উপন্যাসে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তাঁর সময়কালের লেখকদের থেকে তা অনেক বেশি আধুনিক। যদিও জীবনানন্দের ঔপন্যাসিক স্ট্যাটেজি ব্যাপক গোলমেলে। তবুও তিনি যা করেছেন তা বিস্ময়কর। জীবনানন্দের মতো আমি যদি একটি উপন্যাস ঘটাতে পারতাম, তাহলে দু’চারদিন মূর্ছিত থাকতাম।’ এদিকে বাতাসের বেগ ক্রমাগত বাড়ছেই। ঠাণ্ডাও পড়েছে ভীষণ। যদিও বারান্দায়ই ভালো লাগছিল কিন্তু দেবেশ দা’র শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করেই তাঁর কেবিনে ঢুকে আবার আড্ডায় মেতে উঠলাম। উপন্যাস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘উপন্যাসের শব্দ ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- আমার মনে হয়। উপন্যাসে ‘অনৈতিক শব্দ’ ব্যবহার করাটাকে আমি সমর্থন করি না। ধরুন, একজনের চারটি বউ, তার শেষ পরে বউয়ের সঙ্গে প্রথম পরে বউয়ের ছেলের বিয়ে হয়ে গেল। এরকম বিষয়কেও আমি ঘৃণা করি।’ স্বপ্নময় চক্রবর্তীর লেখা কেমন লাগে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ভালো লাগে না। আমি ভাই ভালো লেখার দাস।’ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের বিষয়ে তিনি জানান, ‘একসময় সন্দীপনের লেখার যারা এত নিন্দা করতো, আমি চ্যালেঞ্জ করলে তারা সন্দীপনের, একবারে একটি বাক্য পড়তে পারবে না। একবার আমার এক তরুণ বন্ধু খবর দিল, সন্দীপনের লেখা বন্ধই হয়েছিল প্রায়। ১৯৮২ বা ১৯৮৫ সালে ‘প্রতিণ’ শুরু হলো। সন্দীপনকে লিখতে বললাম। ‘আজকাল’-এ উপন্যাস লিখতে বললাম। সন্দীপন লিখল। এর মাঝে ১০টি বৎসর সন্দীপন লিখে নাই। আমি চাইতাম সন্দীপন লিখুক, ওর ভেতর শক্তি আছে। সন্দীপনকে লিখিয়ে আমার কী লাভ হলো, জানি না। সেসময় অনেকেই বলতেন, সন্দীপন দু’জন উকিল জোগাড় করেছে, একজন দেবেশ রায়, আর অন্যজন শঙ্খ ঘোষ। আফসারের লেখা খুব শক্তিশালী। ওর লেখা আমার খুব ভালো লাগে। আমার তো মনে হয় আফসার আমেদ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভালো লিখিয়েদের অন্যতম একজন ঔপন্যাসিক। একবার আফসারকে একটি কাগজের জন্য গল্প দিতে বললাম। এবং বলে দিলাম যেহেতু বন্যার সময় চলছে, তোমার গল্পটির প্রথমেই জল থাকা চাই। দুদিন পর ও ঠিকই একটি গল্প নিয়ে হাজির হলো। এবং পড়ে দেখলাম, প্রথম বাক্যেই জল ঢুকে গেছে, অসম্ভব সুন্দর গল্প।’ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিষয়ে বলেন, ‘‘কুবেরের বিষয় আশয়’ খুব ভালো লেখা। ‘বৃহন্নলা’ যখন লেখে তখনও লেখক হবে কি-না ও জানতো না। এ বিষয়ে আর কিছু বলব না।’ বলেই মুচকি হাসলেন কিছুণ। আমরা বললাম, আপনার লেখালেখি সম্পর্কে কিছু বলবেন কি? তিনি বললেন, ‘আমার লেখা নিয়ে কিছু বলতে বা শুনতে আমার ভালো লাগে না। পারতপে আমি সাহিত্যের সভা-সেমিনারে যেতে চাই না। আমি আড়ালেই থাকতে চাই।’

২.
তারপর আমরা দেবেশ দা’র জীবনস্মৃতির পাতার ’পরে কান পাতলাম। প্রথমেই তিনি একজন পাগলের গল্প দিয়ে শুরু করলেন, ‘আগে আমাদের পাড়ায় কিছু পাগল থাকত, এরা ছিল সিজনাল পাগল। পাগল তো আর পুরো পয়েন্টে পাগল না, একটা পয়েন্টে। কেননা পাগল তার একটা যুক্তিতে অটল থাকে। তো আমাদের গ্রামের নিধু পাগলা। সে কবে পাগল হয় তা জানা যায় না। তার বউ আমাদের বাড়িতে কাজ করত। যমুনা নদী তো পাড় ভাঙা। একদিন কি কারণে যেন সেই পাড়ভাঙা নদীতে ভরা বর্ষায় নিধু দিল ঝাঁপ, আর তখনি একটি পাড় পড়ল ভেঙে। অর্থাৎ নিধুর মৃত্যু নিশ্চিত হলো! হিন্দু শাস্ত্রমতে, কারো স্বামী নিখোঁজ হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে যদি ফিরে না আসে, তাকে মৃত ধরে নেওয়া হয়। এবং তার স্ত্রীকে বৈধব্য গ্রহণ করতে হয়। রীতি অনুযায়ী নিধুর বউকেও বৈধব্য গ্রহণ করতে হলো। কিন্তু একবছর পর নিধু ফিরে এল। জলজ্যান্ত। আমাদের চেনা নিধুই। আমার দাদু সাধু ভাষায় কথা বলতেন। তিনি নিধুকে বললেন, নিধু তুই তো পরলোকগত। পরলোক থেকে কী করে ফিরলি? নিধু বলল, ফিইরা আইলাম আর কি। দাদু বললেন, তোর তো শ্রাদ্ধ হইল, হরিষ্যি হইল। নিধু বলে, আমিও হরিষ্যি খাব। দাদু বলে, নিধু তুই এই ভরা বর্ষায় যমুনায় ঝাঁপ দিয়ে কি করিয়া বাঁচিলে? নিধু বলে, কর্তা, মইরা দেখলাম, মইরা কোনো সুখ নাই! -নিধুর এই ঘটনাটা আমি সারাজীবনেও ভুলতে পারি না। বিশেষত ওই কথাটি, ‘কর্তা, মইরা দেখলাম, মইরা কোনো সুখ নাই’। অসংখ্যবার এই কথাটি ভেবেছি। সত্যিই কি মরণে সুখ নাই, বেঁচে থাকাতেই সুখ?’
এরপর দেবেশ দা’ বলেন, ‘তখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। একবার আমরা বন্ধুরা মিলে বুদগয়ায় পিকনিকে যাই। সেখানে ঘোরাফেরা করছি, এমন সময় এক পুরোহিত আমার পিছু নিল। আমি জানতে চাইলাম, কী চান? তিনি বললেন, পিণ্ডি দিতে হবে। আমি বলি, কার পিণ্ডি দেব? তিনি বলেন, ঠাকুর্দা, ঠাকুর্মা... এমন কারো। আমি বলি, সেই কবে উনারা মারা গেছেন, উনাদের পিণ্ডিও দেওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু নাছোড়বান্দা পুরোহিত, আমার কাছ থেকে পিণ্ডি না আদায় করে ছাড়বেন না, দিতেই হবে পিণ্ডি। তো কি আর করা। মজাও পাচ্ছিলাম ভেতরে ভেতরে। বললাম, দিন, ৫০ পয়সার পিণ্ডি দিন। পুরোহিত পিণ্ডিদানের আয়োজন করলেন এবং বললেন, পিণ্ডি যার নামে উনার নাম কী? আমি বললাম, উনার নাম শ্রী দেবেশ রায়। তিনি বললেন, পিতার নাম কী, মাতার নাম কী, গোত্র কী ? আমি ওগুলোও বললাম। এরপর তিনি বললেন, এবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন, উনি মানে শ্রী দেবেশ রায় স্বর্গীয় চেহারা নিয়ে এসে পিণ্ডি খাচ্ছেন। আমি চোখ বন্ধ করে থাকলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, দেখতে পাচ্ছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। উনি বললেন, এবার উনার জন্য মঙ্গল কামনা করুন। আমি বললাম, হ্যাঁ করলাম। এরপর ৫০ পয়সা দিয়ে চলে আসতে আসতে ভীষণ হাসি পেল। বাড়ি এসে কথাটি কোনোভাবেই পেটে রাখতে পারলাম না। বলে দিলাম। আমার বাবা রাশভারী মানুষ ছিলেন। বাবার রাগ তখন সে যে কি, সবাই ভয় পেতাম। পিণ্ডি দেওয়ার কথা শুনে রেগে বাবা বললেন, সন্ন্যাসীরা সন্ন্যাসী হওয়ার আগে শ্রাদ্ধ করে। যে ছেলে পিণ্ডি দিয়েছে, শ্রাদ্ধ করেছে, সে ছেলে গেছে! মা বলল, তুই এ-কি করলি বাবা? আমার নামে পিণ্ডি দিলেওতো পারতি, আমার বয়স হয়েছে। এখন কি যে হবে! এই পিণ্ডিদানের ঘটনাটা সারাবাড়ি জুড়ে তখন এক বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সবাই খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছে বিষয়টাকে। কিন্তু আমি বেশ মজাই পাচ্ছিলাম। তো কি আর করা, পিণ্ডি ফিরাতে হবে। পরদিন শাস্ত্রমতে স্নান করিয়ে একজন পুরোহিত ডেকে মন্ত্রপাঠের আসরে যজ্ঞে বসাল আমাকে। যাতে শ্রাদ্ধ দূর হয়, পিণ্ডি ফেরত যায়। পুরোহিতের তন্ত্রমন্ত্রপাঠের কর্ম শেষ হলে আমি ঠাকুর মশায়কে জিজ্ঞেস করলাম, মশায়, আমি কি এইমাত্র পৃথিবীতে অবতীর্ণ হলাম? তিনি বললেন, ধর, হ্যাঁ। আমি বললাম, তাহলে কি আমার জীবনের বিগত ১৭/১৮ বছর ক্যান্সেল হয়ে গেল!’ এ পর্যন্ত বলেই শিশুবাচ্চার মতো তুমুল হাসতে লাগলেন দেবেশ রায়। হয়তো কিছুণের জন্য ফিরে গেলেন সেই সোনালি শৈশবে।
সাহিত্য জীবনের মজার কোনো অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে দেবেশ দা’ বলেন, ‘সাহিত্য মহলে বা আমার সাহিত্য জীবনে আমি মজার লেখক হিসেবে পরিচিত হতে পারিনি। একবার শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে একটি ছেলে বলল, আপনার লেখা পড়লে হাসি পায়, আপনার কথা শুনলে কান্না পায়। আমি বললাম, আমার কথা শুনলে হাসি পেলে ভালো হতো। তারপর সবাই মিলে হেসে উঠল।’
এদিকে রাত রাড়ছে। লঞ্চ এগিয়ে চলছে মাঝ নদী বরাবর। তখনও রাতের খাবার খাওয়া হয়নি। এবার খাওয়াদাওয়ার পালা। দেবেশ দা’সহ সবাই খাওয়াদাওয়া করলাম আমরা। খেতে খেতে আড্ডা চলছিল। সবার খাওয়া শেষ হলেও দেবেশ দা’ খুব ধীর গতিতে খাচ্ছেন, যতটা ধীর গতিতে কথা বলেন তিনি। খাওয়া শেষ হলে তিনি বললেন, ‘রাতের খাওয়ার পর আমার তো মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস। আমাকে মিষ্টি খাওয়াতে হবে।’ আমাদের কাছে মিষ্টি ছিল না। এত রাতে লঞ্চে কোথায় মিষ্টি পাওয়া যায়! কিন্তু তিনিও নাছোরবান্দা। মিষ্টি খাওয়াতেই হবে। তিনি বললেন, ‘লঞ্চে ৮-৯শ মানুষ, কারো না কারো কাছে মিষ্টি আছেই, আমার বিশ্বাস। যেখানে মানুষ আছে সেখানে কোনো কিছু নেই, এমনটি হতে পারে না।’ তো আমরা মিষ্টির সন্ধানে বেরুলাম, লঞ্চের কেবিন বয়কে ডাকা হলো, তাকেও মিষ্টি সংগ্রহ করে দেওয়ার জন্য বলা হলো। কিন্তু কোথাও মিষ্টি পাওযা গেল না। শেষে উনাকে মিষ্টির পরিবর্তে সাদা চিনি ও চকোলেট দেয়া হলো। উনি দুধের স্বাদ গোলে মিটানোর মতো চিনি ও চকলেট খেতে খেতে জানালেন, ‘আমার মিষ্টি খাওয়া নিয়ে কলকাতায় এমন কথা আছে যে, আমি নাকি মিষ্টির জন্য পাগলের মতো ব্যবহার করি। আবার কেউ নিন্দা করতে গিয়ে বলে, ও দেবেশ রায়, ওর জন্য তো বৌঠান রি রেঁধে দেয়, ও খায়, কাকলী বাজার করে দেয়।’
কথা প্রসঙ্গে উনাকে জিজ্ঞেস করা হলো, দাদা, কখন থেকে মদ ছেড়েছেন? উনি রসিকতা করে বললেন, ‘তার মানে কবে থেকে মদ খাওয়া শুরু করেছি, এটা তো আগে জানা দরকার, তাই না! একবার জর্জিয়ায় গিয়েছি, নিমন্ত্রনে। ব্যাপক জলতৃষ্ণা পেয়েছে। এয়ারপোর্টে নেমে দেখি এক রেস্টুরেন্টের সামনে কাঠের চোঙের ভেতর থেকে জুসের মতো কি যেন অনেকেই গ্লাস ভরে নিচ্ছে আর খাচ্ছে। আমিও একটি গ্লাস ভরে নিলাম। এবং খেয়ে ফেললাম। দেখলাম ভালোই তো লাগে। এভাবে জুস ভেবে পর পর বেশ কয়েক গ্লাস খেলাম। পাশে যারা ছিল, তারা অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। আমি তখন বুঝতে পারিনি রহস্যটা কী! পরে জানলাম, জুস ভেবে আমি যা খেয়েছি, তা আসলে জুস না, মদ। তো যারা আমাকে নিমন্ত্রন করেছিল, তারা আমাকে নিতে এসে যখন শুনল যে আমি পর পর বেশ কয়েক গ্লাস চুমুকেই ইতিমধ্যেই পান করে ফেলেছি, ওরা তো শুনে ভাবল ভারতবর্ষের মানুষ তাহলে দারুণ মদ খায়। সেজন্য আমি যেখানে উঠলাম, সেখানে বেশ কয়েক বোতল সরবরাহ করা হলো। সন্ধ্যার দিকে, বিকেলের শেষ মুহূর্তে আমি রেস্টহাউসের বেলকনিতে বসে সূর্যের সোনালি আভা এবং সূর্যডোবা দেখছিলাম। ওখানকার একটি ছেলে দু’বোতল নিয়ে এসে আমার পাশে বসল। এবং মদভর্তি গ্লাস আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। আমি বুঝলাম, এয়ারপোর্টের ঘটনাটাই এজন্য দায়ী। আমি তো আসলে মদ খাই না। জীবনে কখনোই না। না জেনে জুস ভেবে কয়েক গ্লাস খেয়েছি, কিন্তু জেনে তো এক ফোঁটাও খেতে পারবো না। কিন্তু ভারতবর্ষের সম্মান বলে কথা। ছেলেটির হাত থেকে গ্লাস নিয়ে ছেলেটিকে আমার বামপাশে বসতে দিলাম এবং আমি ডানপাশে বসলাম। কারণ ডানপাশে ছিল একটি জানালা। আমি গ্লাস হাতে নিয়ে ছেলেটির সাথে গল্পে মেতেছি, আর সূর্যডোবা দেখছি, ছেলেটি মদ খাচ্ছে। আর আমি ছেলেটির চোখ ফাঁকি দিয়ে জানালা দিয়ে মদটুকু বাইরে ঢেলে দিচ্ছি। এভাবে আবার ছেলেটি দুটো গ্লাসে মদ ঢালে, একগ্লাস সে খায়, অন্য গ্লাস আমাকে দেয়। আমিও যথারীতি বাইরে ঢেলে দিই। একসময় মদ শেষ হয়ে এল। ছেলেটি তখন মদাসক্ত, নেশায় ঢুলোঢুলো। আমি তো স্বাভাবিক। এরপর সেই ছেলেটি অনেকটা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে চলে গেল।’
দেবেশ দা’ স্মৃতিগল্পগুলো বলতে বলতে একসময় বললেন, ‘ছোটবেলায় একবার দাওয়া থেকে পড়ে গিয়েছিলাম বালতির ভেতর, মাথা নিচের দিকে, পা উপরের দিকে, এমনভাবে। সবাই দৌড়ে এসে আমাকে ওখান থেকে উদ্ধার করলো। কিন্তু আমার মাথার বাম পাশে বেশ খানিকটা কেটে গেল। অনেক রক্তও ঝরেছিল। সেই কাটাদাগটি এখনো আমার মাথায় রয়ে গেছে। তখন সেই ঘটনায় আমাকে অনেকেই বকাবকি করলো। আমার ঠাকুরদা বললেন, ও তো বোমভোলা। ওর তো কোনো হুশজ্ঞান নেই। সেই থেকে পারিবারিক মহলে আমার আরেকটি নাম স্বীকৃত হয়ে যায় ‘বোমভোলা’। যদিও নামটি ছিল রসিকতাপূর্ণ। কিন্তু সেই নাম ধরে যারা আমায় ডাকতো সেই লোকগুলোর সংখ্যাও দিন দিন কমতে কমতে এখন প্রায় শেষ দিকে চলে এসেছে। হয়তো একদিন আর ‘বোমভোলা’ নাম ধরে আমাকে ডাকবে না কেউ!’
কথাগুলো বলে দেবেশ দা’ কিছুটা চুপ হয়ে গেলেন। হয়তো অনেক হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের মুখ-স্মৃতি মনে পড়ায় তিনি অতীত জীবনের দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন, একা। সবার সমর্থন এবার গানের দিকে। মালা ভাবী গান ধরলেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত- ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দমধুর হাওয়া, দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী বাওয়া’... । মাঝনদীতে ছুটে চলা লঞ্চের কেবিনের নির্জনতায় এতই মায়াবী রূপ নিয়ে ভাসছিল গানটি, যে আবহটি সত্যিই বর্ণনাতীত; চমৎকারভাবে খুব দরদ দিয়েই গাওয়া হলো গান। গানটি শেষ হতেই দেবেশ দা’ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন, ‘একবার বাবার সঙ্গে কোথায় যেন যাচ্ছিলাম। গ্রামের পথ ধরে, ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে, হেঁটে হেঁটে। বাতাস বইছিল। এমন সময় আমার বাবা এই গানটিই ধরেছিলেন ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দমধুর হাওয়া..’ এত সুন্দর গান এর আগে আমি আর শুনিনি। এরপর অনেকবার বাবার কণ্ঠে অনেক গান শুনেছি কিন্তু সেইদিনের এই গানটির কথা ভুলতে পারিনি কোনোদিনই। বাবার মুখে শোনা ওই গানটিই আমার শোনা প্রথম রবীন্দ্র সঙ্গীত। বাবা চলে গেছেন অনেকদিন। কিন্তু যখনই এই গানটি শুনি, বাবার কথা মনে পড়ে যায় খুব....।’
স্মৃতিতাড়িত হয়ে এত বড়মাপের কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায়ের চোখও জলে ছলছল করে উঠতে দেখলাম। এরপর ওই রাতে উনার সাথে আর কথা নয়। সবাই যার যার কেবিনের দিকে চলে গেলাম আমরা। আমাদের আড্ডাসঙ্গী ছিলেন আসাদ মান্নান, সালমা বাণী, পারভেজ হোসেন, শহীদুল আলম, অনিকত শামীম, শামীম রেজা, জাহানারা পারভীন, আশফাকুর রহমান, মালা ভাবী, নাজমা মান্নান ও মুন্নী ফরাজী। এছাড়াও পথসঙ্গী ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক, সোহেল রহমান, কচি রেজা, মানসী কীর্তনিয়া, জুয়েল মোস্তাফিজ, মামুন খান প্রমুখ।

৩.
এর এক বছর পর আবার ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলেন দেবেশ রায়। ১৮ জানুয়ারি শাহবাগের আজিজ মার্কেটে সেলিম আল দীন পাঠশালার অনুষ্ঠানে এক ঘণ্টার মতো বক্তব্য রাখলেন। এখানেও তাঁর জীবনের অনেক মূল্যবান তথ্য জানিয়েছেন তিনি। বক্তব্যের এক পর্যায়ে জানালেন, ‘একবার তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পত্রালাপ হয়, তাঁর একটা লেখা প্রসঙ্গে। চিঠি পেয়ে উনি জবাব দেয়, বেশ মুগ্ধতাসহ। এরপর বেশ কয়েকবার চিঠি চালাচালি হলে একবার তারাশঙ্কর চিঠিতে জানায়, যে, তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য। কিন্তু আমি দেখা করবো না ঠিক করেই নিয়েছি। এরপর একবার এক অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেয়ে সেখানে গিয়ে দেখি বারান্দায় তারাশঙ্কর বসে আছে। দূর থেকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়ি। এমন সময় আমার এক বন্ধু, যে কি-না আয়োজক কমিটির একজন, সে বলল, কি তুই নিমন্ত্রণ পাসনি, তোকে তো নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে। আর তারাশঙ্কর তোর সাথে দেখা করার জন্য তোকে খবর পাঠিয়েছে, খবর পাসনি? আমি বললাম, হ্যাঁ পেয়েছি। সে বলল, তাহলে উনার কাছে যাচ্ছিস না কেন? আমাকে উনার কাছে যাওয়ার জন্য বন্ধুটি বেশ কয়েকবার তাগাদা দিল। কিন্তু আমি গেলাম না। দেখলাম কিছুণের মধ্যেই তারাশঙ্করকে ঘিরে বেশ কিছু কবি সাহিত্যিকের ভিড় জমে গেল। আমি চুপ করে পাশ কেটে অনুষ্ঠানে ঢুকে গেলাম। তারাশঙ্করের মতো বিখ্যাত লেখকের সঙ্গে দেখা করার আমার যে ইচ্ছে হয়নি তা নয়, আমিও তো মানুষ। কিন্তু কেন যেন মনে সায় পাচ্ছিলাম না। লেখকের আড়ালে থাকাটাকে আমি সমর্থন করি।’
এরপর এক পর্যায়ে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস তিস্তা পুরাণ লেখার মুহূর্ত প্রসঙ্গে জানালেন, ‘একদিন দুপুরে শুয়ে আছি, দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমাতে আমার বেশ ভালো লাগে। তো দুপুরে খেয়ে শুয়ে আছি, ঘুম আসছে না কিছুতেই, বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছি, এপাশ-ওপাশ করছি। তন্দ্রামতো ভাব। এরকম সময় শুনতে পেলাম আমার কানের কাছে কেবলি সংলাপ আসছে। তখনি বিছানা ছেড়ে উঠে টেবিলে গিয়ে কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসে গেলাম তিস্তা পুরাণ। আমার হয় কি, একটা লিখা কাগজে কলমে লেখার বহু আগে মাথায় প্রস্তুতকার্য চলে। কি রকম কাগজে, কি রকম কলমে, কি রকম লাইনগুলো, অরগুলো কি রকম হবে- এগুলো যদি ঠিক ঠিক আমার চোখের সামনে ভেসে না ওঠে তাহলে আমি লিখতে পারি না। একটা লিখা লেখার জন্য বহু সময় লেগে যায় এজন্য আমার। কোনো কোনোটা আবার দ্রুতও হয়ে যায়।’



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29219482 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29219482 2010-08-10 19:33:22
`কে বলে আজ তুমি নেই.................' জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা হোক

বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, মফিদুল হক, আবুল হাসনাত, ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের, তুষার দাশ, নাসরিন জাহান, আহমাদ মোস্তফা কামাল, হামিদ কায়সার, প্রশান্ত মৃধা, শামীম রেজা, সফেদ ফরাজী, আশফাকুর রহমান

সত্যিকার অর্থে কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের কোনো দেশ ছিল না। যদিও আজ তিনি এসবের উর্ধ্বে। দেশভাগের পর পরই পশ্চিমবঙ্গ থেকে সপরিবারে তিনি ঢাকায় এসে বসবাস করতে শুরু করেন। শৈশবের সেই অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতা তিনি বহন করেছেন পুরো জীবন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়, সৃজনকর্মে, এমনকি তার জীবন-যাপনেও এ প্রসঙ্গটি ওঠে এসেছে নানাভাবে। যদিও তৎকালীন ঢাকাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য জগতের একজন মূর্তিমান পুরুষ হিসেবে সকলের নজর কাড়তে খুব বেশি সময় লাগেনি তার। বই প্রকাশের পূর্বেই তার লেখা নিয়ে লিখিতভাবে আলোচনা তাকে নিয়ে আসে পাদপ্রদীপের আলোয়।
জন্মভূমি, দেশ ও বাংলা সংস্কৃতির মধ্যে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই মানুষ ও তার কাজকে আমরা কেন বার বার স্মরণ করি? বাংলা সাহিত্যের প্রবহমানতায় তার কী অবদান? বাংলা ভাষা নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে তার কলমে। বাংলা ভাষা সম্পর্কে আলাদা ভাবনার কথা তার সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন তিনি। ভাষার গীতল বৈশিষ্ট্য তার রচনায় প্রতীয়মান হয়েছে বিচিত্রভাবে। সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার অপূর্ব ব্যবহারে তার সৃজনশীল মতা পাঠক সহজেই বুঝে নেয়। সবচে’ বড় ব্যাপারটি হলো, বাঙালি জাতির জীবনে মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল ঘটনা তার রচনার প্রধান অবলম্বন। মুক্তিযুদ্ধের এমন ভিন্ন ইতিহাস পাঠ সমকালীন বাংলা সাহিত্যে বিরল। তার জীবন আমার বোন উপন্যাসটি যেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধেরই অসামান্য এক দলিল। এছাড়া অনুর পাঠশালা, কালো বরফ, মাটির জাহাজ, নিরাপদ তন্দ্রা, খেলাঘর, অশরীরী, পাতালপুরী প্রভৃতি উপন্যাস ও প্রতিদিন একটি রুমাল, মানুষ মানুষ খেলা ছোটগল্পগ্রন্থে তিনি তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
আজ ২ অগ্রহায়ণ। কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের ৭০তম জন্মদিন। জন্মেছিলেন ১৯৪০ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণার বারাসাতে। বাবা সিরাজুল হক ছিলেন অর্থ বিভাগের উপ-সচিব, মা মাহমুদা ছিলেন গৃহিণী। দশ/বার বছর বয়সেই সপরিবারে চলে আসেন তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশে। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে ১৯৫১ সালে ঢাকার আজিমপুর কলোনিতে উঠেন তারা। ঢাকার ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে মাধ্যমিক ও জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। পরবর্তীতে জড়িয়ে পড়েন পারিবারিক ব্যবসায়।
খুব ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির শুরু করেছিলেন মাহমুদুল হক। আজিমপুর কলোনিতে থাকার সময় তার পরিচয় হয় কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর সঙ্গে। তার অনুপ্রেরণায়ই লেখালেখির শুরু। এরপর শহীদ বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক শহীদ সাবেরের সংস্পর্শে তার চিন্তাচেতনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তার প্রথম বড়দের গল্প উঁচু তলার সিঁড়ি প্রকাশিত হয় কবি আহসান হাবীব সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকীতে। ছাত্র অবস্থায়ই যুক্ত হন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে গেছেন আজীবন। মাহমুদুল হক ও হোসনে আরা কাজল দম্পতির দুই সন্তান- ছেলে শিমুল হক সিরাজী টোকন, মেয়ে তাহমিনা মাহমুদ মলি। টোকন থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে আর মলি কানাডায়।
২১ জুলাই ২০০৮ আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নেন কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হক। তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। ১৯৮২ সালের পর থেকে তিনি নেন কলম বিরতি। যা অব্যাহত ছিল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। এর কারণ আজও আমাদের কাছে রহস্যময়। ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার লাভ করেননি তিনি। সকলের মধ্যমণিতে থাকা এই মানুষটি শেষ জীবনেও ছিলেন এসব থেকে দূরে।
বাংলা সাহিত্যের এমন অমর স্রষ্টাকে কি আমরা যোগ্য সম্মান দিতে সক্ষম হয়েছি? তার মৃত্যুর পর সুধী সমাজের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তাকে সমাহিত করার স্থানটিকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হবে। কিন্তু তার মৃত্যুর প্রায় দেড় বছর পরও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। ইতিমধ্যেই আরেক প্রয়াত কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরের সমাহিত করার স্থানটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাহলে মাহমুদুল হক কেন নয়? অতিসত্বর তাকে সমাহিত করার স্থানটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এছাড়াও তার নামে একটি রাস্তা ও স্মৃতি পাঠাগার স্থাপন করা হোক। আমরা এ ব্যাপারে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, এবং অতিদ্রুত উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।
একটি জাতির ইতিহাস নির্মাণ হয় তার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল প্রয়াসের ভেতর দিয়ে। যাদের অবদানে এই ইতিহাস তৈরি হয় জাতি তাদের স্মরণ করে কৃতজ্ঞচিত্তে। অন্যদিকে ভবিষ্যত প্রজন্ম তাদের খুঁজে নেয় অনুপ্রেরণা পাওয়ার নিয়ামক হিসেবে। আমরা যদি এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছে কী জবাব দিবো ? আজকের দিনে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে নিভৃতচারী কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের ৭০তম জন্মদিনে তার স্মৃতির প্রতি আমাদের বিনীত শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখকবৃন্দ: মাহমুদুল হক সুহৃদ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29044472 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/29044472 2009-11-16 18:04:43
রোজার দিনে মেয়ে মানুষের দিকে........... আমি বললাম, কেন? বন্ধু বলল, তাতে রোজা হালকা হয়ে যায়। আমি বললাম, আর রোজা না রেখে কেউ যদি তাকায়? বন্ধু বলল, সেই-টা অন্য কথা। আমি বললাম, অন্যকথার কি কোনো জবাব নেই? বন্ধু বলল, পরে বলব। আবার জিজ্ঞেস করলাম, আর রোজার দিনে মেয়ে মানুষ যদি পুরুষ মানুষের দিকে তাকায়? তাইলে? কয়েক বছর চলে গেল, বন্ধুকে প্রায়ই সেই প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করি, কিন্তু বন্ধু বারবার বলে, পরে বলব। কিন্তু কেন পরে বলবে, তা সেও বলে না, আমিও আজও বুঝে উঠতে পারি না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28999576 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28999576 2009-08-25 18:09:49
মহাজোট কী পারবে? আপনার কী মত? ২. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা
৩. সন্ত্রাস, দুর্নীতি বন্ধ করা
_এগুলোই প্রধান।
এবং দেশের আপামর জনগণের প্রাণের দাবিও এগুলো, বলা যায়।

আপনার কি মনে হয়, মহাজোট রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে এই প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন করতে পারবে? এ বিষয়ে, আপনার কী মত?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28891060 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28891060 2008-12-31 17:13:55
প্রথম `শহীদ মিনার' ভেঙেছিল সরকার! লালনের ভাস্কর্য ভাঙল কে? বরাবরই রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত `প্রভুরা' এদেশের মেহনতি মানুষের অধিকার নিয়ে শুধু খেলাই করেনি, করেছে ধর্ম ও অর্থনীতির নিরিখে বিভেদরেখার নির্মাণও। সম্প্রতি লালনের ভাস্কর্য ভাঙার বিষয়টিও এর বাইরের নয়। এটিও নতুন ঘটনা নয়, এর আগে পাকিস্তান সরকার এদেশে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার পর্যন্ত ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিল। দুটো ঘটনার বাস্তবতা ভিন্ন হলেও মূলগত সাদৃশ্য আছে। সাম্রাজ্যবাদী আশীর্বাদপুষ্ট, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে জারিত, বেড়ালস্বভাবী `সুশীল' জ্ঞানপাপী পরিবেষ্টিত এইসব রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছ থেকে এর থেকে ভালো আর কি আশা করার আছে! এরা যে শহীদ মিনার ভাঙবে, লালনের ভাস্কর্য ভাঙবে, প্রগতিশীলতার পথে কাঁটা বিছিয়ে দেবে, অসাম্প্রদায়িক চিন্তার গলা চেপে ধরবে, এটাই স্বাভাবিক। কেননা এরা প্রগতিশীলতাকে ভয় পায়, এদের মেরুদণ্ডের জোর কম, তথাপি এরা ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করতে পারে না। যদিও গণআন্দোলনের মুখে সবসময়ই এদের পট পরিবর্তন ল্ক্ষ্য করা যায়, কিন্তু এদের প্রেতাত্মারাই আবার সেই স্থান দখল করে রাখে। ভবিষ্যতেও হয়তো তাই ঘটতে থাকবে! ৪৭ এর পর থেকে দেখলেও দেখা যায়, এদেশের গণমানুষের দাবিকে, মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িকতার পথকে রুদ্ধ করতে `ক্ষমতাসীন যন্ত্র' দানবের মতো এগিয়ে এসেছে বারবার। তারই উদাহরণস্বরূপ ৫২তে প্রথম শহীদ মিনার ভেঙে দেয় সরকারের পুলিশ বাহিনী আর ২০০৮ সালে অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী বাউল লালন শাহের স্মরণে নির্মিতব্য ভাস্কর্য ভেঙে দিল কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্র ও ধর্মীয় মৌলবাদী ব্যক্তি! অথচ রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এই `মৌলবাদী বাহিনী' তাহলে কার শক্তিতে শক্তিমান? সরকারের? নাকি বিদেশি কোনো শক্তির? এখানেই মূল প্রশ্ন দানা বাঁধে, লালনের ভাস্কর্য ভাঙল তবে কে? মৌলবাদী বাহিনী? নাকি সরকার? নাকি বিদেশি কোনো শক্তি?

প্রথম `শহীদ মিনার' ভাঙার কাহিনী:

৫২'র ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের যেসকল কর্মী পুলিশের গুলিতে নিহত হন, তাঁদের স্মরণে ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে একটি শহীদ স্মৃতিসৌধ বা শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। এটিই ছিল শহীদদের স্মরণে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার। ভাষা শহীদদের লাশ সরকার পুলিশ কর্তৃক সরিয়ে গোপনে দাফন করার পর থেকে আওয়াজ উঠেছিলো `শহীদ স্মৃতি অমর হোক'। এই আওয়াজকে আরও নির্দিষ্ট রূপ দেওয়ার জন্য যে জায়গায় ছাত্রেরা গুলির আঘাতে প্রথম শহীদ হন সেখানে, সেই ১২ নং শেডের পাশে, মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা একটি শহীদ মিনার নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তাঁদেরই সক্রিয় উদ্যোগে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত্রের মধ্যেই সেখানে শহীদ মিনারটি গড়ে ওঠে। এ বিষয়ে শহীদ মিনারের নকশা প্রণয়নকারী মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন ছাত্র সাঈদ হায়দার বলেন :
``এটাকে স্বতঃস্ফূর্ত একটা পরিকল্পনা বলা চলে। দলমত নির্বিশেষে সকল ছাত্র শহীদ মিনার তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২২ ফেব্রুয়ারির রাত থেকেই শহীদ মিনার তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু হয়। ২৩ তারিখ বিকেল থেকে শুরু করে সারারাত সেখানে কাজ হয় (কার্ফু থাকা সত্ত্বেও)... ইট-বালির কোন অভাব ছিল না। মেডিক্যাল কলেজ সম্প্রসারণের জন্য প্রচুর ইট-বালি ছিল। ছাত্ররাই ইট বয়ে এনেছে। বালির সঙ্গে মিশিয়েছে। দুজন রাজমিস্ত্রী ছিল। তাদের নাম বলতে পারব না। আমাদের মেডিক্যাল হোস্টেলে প্রায় তিনশ ছাত্র ছিল। তাদের সকলেই সেদিন কোন না কোন কাজ করেছিল। আর শহীদ মিনারের নকশা তৈরি করেছিলাম আমি। শহীদ মিনারের কাজ শেষ হলে দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল এবং নকশাটি সেখানেই টাঙিয়ে দেয়া হয়েছিল।... শরফুদ্দীন (তাকে আমরা ইঞ্জিনিয়ার বলতাম। সে অঙ্ক ভালো জানতো...) শহীদ মিনার নির্মাণের কাজে যথেষ্ট যত্ন নিয়েছিল। এছাড়া মাওলা, হাশেম, জাহেদ, আলিম, জিয়া আরও অনেকে শহীদ মিনার নির্মাণে প্রাণপাত পরিশ্রম করে। এছাড়া ছিল আমাদের অনেক বয়-বেয়ারা। এরাই ছিল সেদিনকার বড় কর্মী। নকশায় ৯ ফুটের পরিকল্পনা হয়েছিল, কিন্তু শেষ হওয়ার পর দেখা গেল মূল পরিকল্পনাকে তা ডিঙিয়ে গেছে। মিনারটি সম্ভবত ১১ ফুট তৈরি হয়েছিল। বদরুল আলমও মিনার নির্মাণে সাহায্য করেছিল। তার হাতের লেখা ছিল চমৎকার। কাগজে লিখে মিনারের গায়ে সেঁটে দিলে মর্মর পাথরের মতো দেখাতো। আজকের শহীদ মিনার যেখানে, প্রায় তার কাছাকাছি মিনারটি তৈরি করা হয়েছিল। ...শহীদ শফিউর রহমানের পিতাকে এনে ২৪ ফেব্রুয়ারি মিনারটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। আমি সেখানে ছিলাম।''
পরে পরিষদ সদস্যপদ থেকে ইস্তফাদানকারী তৎকালীন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক, আবুল কালাম শামসুদ্দীনকে দিয়ে শহীদ মিনারটি দ্বিতীয়বার উদ্বোধন করা হয়। এবং একটি সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়।
কিন্তু সেই শহীদ মিনারটির আয়ু ছিল খুবই অল্প। তৎকালীন সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলের দিকে পুলিশ দিয়ে সেটি ভেঙে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এরপর বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি ভাস্কর হামিদুর রহমানের দ্বারা নির্মিত হয়।

(তথ্যসহযোগিতা নেওয়া হয়েছে : পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি -বদরুদ্দীন উমর)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28873104 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28873104 2008-11-23 16:56:49
কবি শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে কিছু কথাবার্তা
[কবি শঙ্খ ঘোষের জন্ম ১৯৩২ সালে, চাঁদপুরে, মামা বাড়িতে। পৈতৃকবাড়ি বরিশালের বানারীপাড়ায়। ১৯৪৭-এ দেশ-ভাগের সময় তিনি সপরিবারে চলে যান ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। বর্তমানে সেখানেই বসবাস করছেন। ৫০-এর দশকের উল্লেখযোগ্য কবিদের অন্যতম প্রধান একজন তিনি। তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে- দিনগুলি রাতগুলি, নিহিত পাতাল ছায়া, পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ, মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে, ধুম লেগেছে হৃদকমলে, লাইনেই ছিলাম বাবা, গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ, সবকিছুতেই খেলনা হয়, বাবরের প্রার্থনা, মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বেশকিছু গদ্য ও প্রবন্ধগ্রন্থও রয়েছে তাঁর। সম্প্রতি তিনি ঢাকায় এসেছিলেন এক পারিবারিক নিমন্ত্রণে। উঠেছিলেন ধানমণ্ডি ৭/এ সড়কের অরণি বিদ্যালয়ের পাশের এক বাসায়। সেই বাসার ৩য় তলার ফ্লাটে (১৩ অক্টোবর ২০০৮ রাতে) এবং শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণের সামনে এক আড্ডায় (১৫ অক্টোবর ২০০৮ সন্ধ্যায়) তাঁর সঙ্গে বেশ কিছু বিষয়ে আলাপ-আলোচনার সুযোগ হয়েছিল। এগুলোর কিছু অংশ এখানে পত্রস্থ করা হলো- সফেদ ফরাজী।]


কবিতায় তরুণরা, বিশেষত বাংলাদেশের তরুণ কবিরা ছন্দকে কেউ বুঝে কিংবা কেউ না বুঝে প্রচলিত ছন্দের ব্যবহার বাদই দিয়েছেন প্রায়। এটা আপনি (শঙ্খ ঘোষ) কিভাবে দেখেন? সঙ্গে আরও যোগ করলাম, আমি নিজে যখন কবিতা লিখতে বসি, তখন প্রচল ছন্দের বিষয়টি মাথায় নিয়ে কবিতা লিখতে চাইলে কখনো কখনো কেমন যেন বাধার সম্মুখীন হচ্ছি বলে মনে হয়, কেন যেন মনে হয় ছন্দের জন্য, মাত্রা মিলানোর জন্য কবিতাটিতে আমি আমার মনের ভাবটি সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারছি না। তো ছন্দ বিষয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই। এরপর শঙ্খ ঘোষ বলতে শুরু করলেন, কবিতায় ছন্দ ব্যবহার করা, না করা, এটা একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। কেউ যদি মনে করে আমি ছন্দে লিখব না, সে লিখবে না। ছন্দে লিখতেই হবে এমন তো কথা নেই। তবে চিত্রশিল্পী যেমন একটি শিল্পকর্ম নির্মাণের আগে তার রঙ, রঙের বিন্যাস ও তুলি চালানো বিষয়ে একটি ধারণা নিয়েই শিল্পকর্ম করতে বসেন। অবশ্য কেউ ইচ্ছে করলে রঙের বিন্যাস ও তুলি চালানোর সুনির্দিষ্ট ধারণা ছাড়াও রঙ নিয়ে বসে তুলি চালাতে পারেন। কিন্তু রঙের বিন্যাস ও তুলি চালানোর বিষয়ে সম্যক ধারণা থাকার পর যদি তিনি তাঁর সেই ধারণায় তুলি না চালিয়ে অন্য কোনো প্রকারে তুলি চালান, চালাতে পারেন। তার তো বিষয়টি জানা আছে, কোনভাবে চালালে কি হয়। না জানলে সেটি হয়তো অন্য বিষয় হবে। এ জন্য বলি, ছন্দটা জানা থাকা দরকার। ছন্দটা জানা থাকলে ছন্দ ভাঙাটা সহজ হয়। শিল্পের বিষয়টিই তো পরিশ্রমের। কেউ যদি সেই পরিশ্রম না করতে চায়, করবে না। আপনার যদি মনে হয় ছন্দের জন্য আপনি আপনার মনের ভাবটি সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে পারছেন না, তাহলে ছন্দের ব্যবহার করবেন কেন? এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে যে, যারা ছন্দ ব্যবহার করেন, মিল দিয়ে কবিতা লিখেন তারা কি মনের সম্পূর্ণভাব প্রকাশ করতে পারেন না? আবার অনেকে মনে করেন কবিতায় অন্তমিলটাই বুঝি ছন্দ! তা তো নয়। প্রচল ৩টি ছন্দের ভেতরই লিখতে হবে এমন তো কথা নেই। এগুলো জেনে, এগুলো ভেঙে নতুন কিছুও হতেই পারে। ছন্দ ছাড়া যে কবিতা হবে না এমনটি নয়।
কলকাতায়ও ছন্দ বিষয়ে তরুণদের অনীহা আছে। তাদের অনেকেই আমাকে বলেছে, `ছন্দের দিন শেষ, বিশ্বকবিতা থেকে ছন্দ উঠে যাচ্ছে, তাহলে আমরা কেন ছন্দ নিয়ে পড়ে থাকব'। কিন্তু মজার বিষয় হলো, গত ৪০/৫০ বছরের বিদেশি কবিতার যতগুলো উল্লেখযোগ্য জার্নাল আমার হাতে এসেছে, তাতে ল করে দেখেছি, কোথাও ছন্দহীন কবিতা নেই, সবখানেই ছন্দে কবিতা লিখা হয়েছে, হচ্ছে। ব্যতিক্রম দু'একটা যে নেই, তা নয়। তাহলে কী করে বলি যে, বিশ্বকবিতা থেকে ছন্দ উঠে যাচ্ছে!
একবার পদাতিকের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একটি কবিতার বই প্রকাশ পাওয়ার পর তা নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। অনেকেই বলতে শুরু করেছিলেন `সুভাষ, একি করল, একি করল'! বুদ্ধদেব বসু তো এ বিষয়ে একটি গদ্য লিখেও ছাপিয়েছিলেন। বিষয়টি হয়েছিল, সুভাষ দা'র ওই বইয়ের কবিতায় মনে হচ্ছিল কোথাও ছন্দের মাত্রা ঠিক আছে, কোথাও নেই। পরে দেখা গেল যে তিনি অক্ষরবৃত্তেই কবিতাগুলো লিখেছেন কিন্তু কোথাও কোথাও মাত্রা ভেঙে নতুন বিন্যাস করেছেন। তো একদিন সুভাষ দা' আর আমি রাতের বেলায় একসঙ্গে হাঁটছি, এমন সময় জিজ্ঞেস করলাম, দাদা আপনি এই কাজটি কেমন করে করলেন? সেই রাতের অন্ধকারে সুভাষ দা' আমার হাত জাপটে ধরে বললেন, বিশ্বাস করো, আমি এই বইয়ে এমন কি লিখেছি, আমি নিজেই জানি না। আমি তো তোমাদের মতো এত ছন্দ জানি না। এটি লিখার সময় ছন্দ সম্পর্কে আমি কোনো চিন্তাই করিনি, ছন্দ গুনে গুনেও লিখিনি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে কিভাবে এটি সম্ভব হলো? উনি বললেন, আমি প্রথমে লক্ষ করেছি মানুষ কিভাবে কথা বলে, আর আমার চেনা একটি ধোপা বাড়ি ছিল, সেখানে ধোপারা কাপড় কাচার সময় যেভাবে শব্দ করে, সেই শব্দের রেশটি আমার কানে ছিল। এই তো।
ছন্দ বিষয়ে কবি শঙ্খ ঘোষের একটি উল্লেখযোগ্য বই `ছন্দের বারান্দা'। এটি সম্পর্কে তিনি জানান, ছন্দের বারান্দা বইটি আসলে প্রাথমিক ছন্দ শিক্ষার বই না। এটিতে কয়েকজনের কিছু কবিতা নিয়ে ছন্দ বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে। কারো যদি ছন্দ সম্পর্কে ধারণা না থাকে তাহলে এটি পড়তে পারবেন না। কলকাতায়ও এটিকে ছন্দ শিক্ষার বই ভেবে ভুল করেন অনেকেই। একবার দেখলাম, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের রেফারেন্স বইয়ের তালিকায় এই বইটির নাম। হয়তো নির্বাচকমণ্ডলী এই বইটি সম্পর্কে না জেনেই রেফারেন্স বইয়ের তালিকাভুক্ত করে থাকবেন। যারা ছন্দ জানেন, তাদের কিছুটা উপকারে আসতে পারে এটি। আসলে ছন্দ বিষয়টিই অভ্যাসের ব্যাপার। একবার অভ্যাস হয়ে গেলে ছন্দে, ছন্দ ভেঙে, যেকোনোভাবেই কবিতা লেখা যায়। আর ছন্দ বিষয়টি তো অনেকটা কানের ব্যাপার। লক্ষ করতে হবে, কান কি বলে। আর শুধু ছন্দই তো কবিতা নয়, কবিতার থাকে আরো অনেক উপাদান। অনেকের কবিতায় দেখা যায় ছন্দ মাত্রা তাল লয় সব ঠিকই আছে, কিন্তু ওতে কবিতা নেই। শুধু ছন্দ মাত্রার জন্যই কি কবিতা পড়ে কেউ? মূল ব্যাপারটি হলো, কবিতাটি কবিতা হয়ে উঠলো কি-না। কবিতা হয়ে উঠাটাই আসল বিষয়।

`গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ' শঙ্খ ঘোষের উল্লেখযোগ্য একটি কাব্যগ্রন্থ। গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ লেখার পটভূমি বিষয়ে জানতে চাইলে কবি জানালেন, তখন ১৯৮৭ সালের দিকে শিমলাতে থাকতাম। ওখানে গিয়েছিলাম এক বছরের জন্য। আমাকে এই সুযোগ দেয়া হয়েছিল একটি শর্তে, আমি সেখানে থাকব আর লেখালেখি করব। এছাড়া আর কোনো কাজ নেই আমার। তো গেলাম শিমলাতে। সেখানে যে বাড়িটিতে থাকতাম, সেটি ছিল পুরনো গভর্নেন্স হাউস। বিশাল বড় বাড়ি। লোকজন কেউ থাকে না। একা আমি। অনেকেই বলতেন, এই বাড়িতে ভূত আছে। একবার একজন এসেছিলেন আমার সঙ্গে সেই বাড়িটিতে থাকার জন্য। একরাত থেকে পরদিনই ব্যাগট্যাগ গুছাচ্ছে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার? কোথাও যাচ্ছেন? তিনি বললেন, আমি চলে যাচ্ছি। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, এই বাড়িতে ভূত আছে। আমি বললাম, আপনি ভূত দেখেছেন? উনি বললেন, না দেখিনি, তবে আছে মনে হয়। তো সেই বাড়িতে থাকাকালে একদিন মেঘকুয়াশা ঘেরা সকালবেলায় খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসে গেলাম, `গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছে'র কবিতা। একটানে পাঁচটি কবিতা লিখে ফেললাম। ছয় নাম্বার কবিতাটার দেড় লাইন লেখার পরই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। কে যেন কড়া নাড়ছে। দরজা খুলে দেখি, আমার পরিচিত একজন। উনি বললেন, কি কিছু করছেন, বিরক্ত করলাম না তো? আমি বললাম, না না, কিছু করছি না, আসুন ভেতরে আসুন। উনি ভেতরে এলেন। উনার সঙ্গে প্রায় ঘণ্টাখানেক কথাবার্তা বলার পর উনি চলে গেলেন। এরপর আমি আবার টেবিলে গিয়ে বসলাম, কাগজ-কলম নিয়ে অসমাপ্ত কবিতাটি লিখতে চাইলাম। কিন্তু সেটি আর হলো না, সেই দেড় লাইনের কবিতাটিকে আমি আর সম্পূর্ণ করতে পারলাম না। এরপর বিভিন্ন সময়ে `গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছে'র কবিতাগুলো লেখা হয়েছে। কিন্তু সেই না-লিখতে পারা কবিতাটির জন্য সারাজীবন একটি দুঃখ থেকে গেল!


২.
শঙ্খ ঘোষের জন্ম যেহেতু বাংলাদেশে, শৈশব-কৈশোরও কেটেছে এখানেই, সেহেতু বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর মনে দুর্বলতা কাজ করা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি হয়তো অনেক স্মৃতিও তাড়া করে ফিরে তাঁকে। বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর অনুভূতি কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে বরিশালের বানারীপাড়ার নিজেদের বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে যেতে হয় আমাকে। এরপর দীর্ঘ ৫০ বছর পর ১৯৯৭ সালে একবার শুধু বানারীপাড়া গিয়েছিলাম, নিজের গ্রাম দেখতে, বাড়িটি দেখতে। এছাড়া ৪৭-এর পর বাংলাদেশে বেড়াতে আসা হয়েছে ৭৫, ৮৪, ৯৫, ৯৭ ও ২০০১ সালে। প্রতিবারই একটু ঘোরাফেরা করে, পরিচিত কয়েকজন কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে চলে গেছি। সভা-সেমিনারের বিষয়টিতে আমার ভয় লাগে। তাই সভা-সমিতিতে আমি খুব একটা যাই না। এবারও এক পারিবারিক নিমন্ত্রণে বেড়াতেই এসেছি। বাংলাদেশের প্রতি আমার যে অনুভূতি তা তো ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
আমার জন্ম চাঁদপুরে, মামা বাড়িতে। পৈতৃক বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়ায়। বাংলাদেশ বলতে যে জায়গাটি আমার সবচেয়ে ভালো লাগার, সেটি হচ্ছে পাকশি (পাবনায়)। কারণ ওখানেই আমার শৈশব-কৈশোরের অধিকাংশ সময় কেটেছে। স্কুলজীবনের পুরোটাই পড়েছি পাকশি স্কুলে। আমার বাবা ছিলেন ওই স্কুলের হেডমাস্টার। আমার বড়দা' ওই স্কুলে ছয় মাস, আর ছোটভাই কাস সিক্স পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। এক্ষেত্রে আমি আমার স্কুলজীবনের পুরোটাই বাবার স্কুলে পড়তে পেরেছি বলে একটা গর্ব গর্ব ভাব ছিল মনে। পাকশিতে আমার জীবনের খুবই মূল্যবান সময়গুলো কেটেছে। তাই পাকশির স্মৃতি আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমার কাছে পৃথিবীর সেরা জায়গা হলো পাকশি। একবার বাংলাদেশে আসার পর ইচ্ছে হলো পাকশি থেকে ঘুরে আসি। তখন এখানকার দুই লেখক আবুল হাসনাত ও মফিদুল হক আমার সঙ্গে যেতে চাইলেন। তো একসঙ্গে পাকশি গেলাম। ঘুরেফিরে দেখলাম। তারাও আমার সঙ্গে ঘুরেফিরে দেখল। আমার মনে হলো, আমার চোখে আমি যা দেখি, তারা তো তা দেখতে পাবে না। কারণ আমার শৈশব-কৈশোরের পনের বছরের স্মৃতিবিজড়িত এলাকাটাকে আমি তো আমার স্মৃতি দিয়ে বিচার করছি আর তারা তো তা নয়। কিন্তু কৌতূহল থেকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, জায়গাটা খারাপ লাগছে না তো? তারা বলল, না জায়গাটা খুবই ভালো। অবশ্য সেই শৈশব-কৈশোরে দেখা পাকশির অনেক কিছুই আজ বদলে গেছে, আবার অনেক কিছুই আছে সেই আগের মতোই। ৪৭ সালে ম্যাট্রিক দিলাম। কলেজে ভর্তি হলাম। তখনই দেশভাগ হয়ে গেল। তারপর চলে গেলাম কলকাতায়। তারপর শুরু হলো অন্যরকম জীবন। বাংলাদেশের তিন জায়গা- চাঁদপুর, বানারীপাড়া ও পাকশির অনেক স্মৃতি আমাকে টানে। সবচেয়ে বেশি মন কাঁদে পাকশির জন্য। এখনও মাঝে মাঝে ঘুমে স্বপ্নের ভেতর দেখতে পাই পাকশি স্কুলে পড়ার সময়টাকে। ওখানে বেশ বড় একটা চর ছিল। সেখানে বেড়াতে যেতাম। জলে নামতাম। মাঝে মাঝে বিপদও হতো। একবার আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে বেড়াতে গিয়ে জলে নেমেছি। কিছুণ পর একবন্ধু চিৎকার করে বলতে লাগল, `আমি ডুবে যাচ্ছি আমাকে ধর, আমি ডুবে যাচ্ছি আমাকে ধর'। ওই বন্ধুটি প্রায়ই মিথ্যা কথা বলত বলে কেউই প্রথমে পাত্তা দিচ্ছে না। পরে দেখা গেল যে সত্যি সত্যিই ও ডুবে যাচ্ছে। তখন সবাই দৌড়ে গিয়ে ওকে টেনে তোলা হলো। ও আসলেই চোরাবালিতে পড়েছিল। আমার জীবনের কত কত স্মৃতি যে পাকশির!
বানারীপাড়ার সঙ্গেও আমার নাড়ীর যোগ অবিচ্ছেদ্য। ৫০ বছর পর ১৯৯৭ সালে যখন বানারীপাড়ায় গিয়েছিলাম তখনও নিজেদের বাড়িটি চিনতে একটুও ভুল হয়নি। ঠিক ঠিকই চিনতে পেরেছি। আমার স্মৃতির সেই গ্রাম, সেই বাড়ি, সেই বাগানবাড়ি, সেই গাছপালা ঘেরা প্রকৃতি, সেই পথঘাট, সেই নদী ৫০ বছর পরও সেই একই রকম রয়ে গেছে। বানারীপাড়া ঘুরে কলকাতা যাওয়ার পর পরিবারের সবাই আমার কাছে ওখানকার গল্প শুনতে চাইল। আমি কি ঠিক ঠিক চিনতে পেরেছি বাড়িটি? ওটি কি আগের মতো আছে? এমতো আরো অনেক প্রশ্ন। আমি বললাম, হ্যাঁ কারো সাহায্য ছাড়াই দিব্যি চিনতে পেরেছি, আর বাড়িটি একটুও বদলায়নি, কিছুই বদলায়নি। তখন আমার এক কাকা রেগে গিয়ে সবাইকে বললেন, ওর কথা বিশ্বাস করো না, ও মিথ্যা বলছে, আমি নিজে দেখে এসেছি কিছুই নেই আগের মতো, আর ও বলছে সব আগের মতো আছে, ডাহা মিথ্যা কথা। আমার এই কাকা দেশভাগের পর ৮৫/৮৬ সালের দিকে একবার এসেছিলেন বানারীপাড়ায়। তিনি তখন বাড়িটি দেখে গিয়ে খুব দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। উনার চোখে যে পরিবর্তনগুলো বেশি পড়েছিল সেগুলো হচ্ছে পুজোর ঘরটিতে প্রতিমা নেই, ঘরবাড়িতে কেমন যেন পরিবর্তন আনা হয়েছে, এইসব। কিন্তু আমি দেখলাম সেই গ্রাম, সেই পথ, সেই নদীনালা, সেই বাগানবাড়ি, গাছপালা, সেই মানুষজন সবই প্রায় আগের মতোই। দু'জনে আসলে দুই রকম অনুভূতি দিয়ে দেখা হয়েছে তো।
বানারীপাড়ায় গিয়ে যে বিষয়টি জেনে খুবই দুঃখ পেয়েছি তা হলো, আমার শৈশববন্ধু সহপাঠী আনোয়ারুল ইসলামের মৃত্যুর সংবাদ। ওখানে গিয়েই ওর খোঁজ করেছিলাম। একজন জানাল, ৭১ সালে যুদ্ধের সময় ওকে মেরে ফেলা হয়েছে। কলকাতায় চলে যাওয়ার পর ওর সঙ্গে আর দেখা হয়নি আমার। ৭১ সালের আগে একবার ও কলকাতায় গিয়েছিল। একদিন রাতে বাসায় ফেরার পর শুনি আমার একজন বন্ধু এসেছিল বাংলাদেশ থেকে, একটি ঠিকানা ও টেলিফোন নাম্বার কাগজে লিখে দিয়ে গেছে। এবং বলে গেছে, যত রাতই হোক ওকে যেন একটি ফোন করি আজই। আমি কাগজটি হাতে নিয়ে দেখি, তাতে লেখা নাম আনোয়ারুল ইসলাম, আর ঠিকানা ও ফোন নাম্বার কলকাতার একটি হোটেলের। রাত দুটো পর্যন্ত আমি ফোনে চেষ্টা করেছি আনোয়ারকে পেতে, রিং হয় কিন্তু কেউ ফোন ধরে না। সকালেও ফোন করেছি, রিং হয় কিন্তু ধরে না কেউ। সম্ভবত লাইনের কি যেন সমস্যা ছিল। পরে নিজেই ঠিকানাটা নিয়ে ওই হোটেলে গেলাম। গিয়ে খবর পেলাম আনোয়ারুল ততক্ষণে চলে গেছে। তখন খুবই খারাপ লেগেছিল, বেশি খারাপ লেগেছিল এই ভেবে, ও হয়তো ভেবে গেল, আমি ওকে ভুলে গেছি, তাই ওর সঙ্গে যোগাযোগ করিনি!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, `রাইফেল রোটি আওরাত' উপন্যাসের লেখক, কবি, ঔপন্যাসিক আনোয়ার পাশা (জন্ম মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে), যিনি ৭১ সালে বাংলাদেশে শহীদ হয়েছেন, তিনি তো আপনার (শঙ্খ ঘোষ) খুব কাছের বন্ধু। আনোয়ার পাশার `স্মৃতি লেখা' পড়ে জেনেছি, তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ `নদী নিঃশেষিত হলে' প্রকাশের আগে আপনার পরামর্শেই `আনোয়ার পাশা' নামে বইটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। আনোয়ার পাশা তো আগে `মুহম্মদ আনোয়ার' নামে লিখতেন। ও সময়ের কিছু স্মৃতিচারণ যদি করেন। কিছুটা দম নিয়ে শঙ্খ ঘোষ জানান, আনোয়ার পাশা আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা একসঙ্গে পড়েছি। ওই সময়ে অশ্রুকুমার সিকদারসহ আরো অনেকেই আমরা একসঙ্গে ছিলাম। আনোয়ারের সঙ্গেও আমার যে কত স্মৃতি! কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি ম্যাগাজিন বের হয়েছিল। এবং এটি সম্পাদনার দায়িত্ব পড়েছিল আমার উপর। তখন আনোয়ারেরও একটি কবিতা ওতে ছাপা হয়েছিল। আনোয়ার তখন `মুহম্মদ আনোয়ার' নামে লিখত, কিন্তু আমি ওটিকে `আনোয়ার পাশা' বানিয়ে ছেপে দিয়েছিলাম। (মৃদু হাসি)। এরপর, ও আনোয়ার পাশা নামেই লিখত। কবিতার বই করার সময়ও জানতে চেয়েছিল কোন নামে বই প্রকাশ করবে, তখন আনোয়ার পাশা নামটিকেই আমি সমর্থন করেছিলাম। এই আর কি। আনোয়ার পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে চাকরি পেয়ে বাংলাদেশে চলে আসার আগে আমার সঙ্গে দেখা করে একটি ডায়লগ দিয়ে এসেছিল, এখনও স্পষ্ট মনে আছে। একদিন হুট করে আনোয়ার এসে আমাকে বলল, আমি চললাম। আমি বললাম, চললাম মানে? ও বলল, পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে শিকতার একটি চাকরি পেয়েছি, তাই পাবনায় চলে যাচ্ছি, এখন তুমি থাক আমার দেশে, আমি গেলাম তোমার দেশে। আনোয়ারের এই কথাটি আমার মনে গেঁথে আছে!

শঙ্খ দা' এসব প্রসঙ্গগুলো যখন বলছিলেন, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছিলেন থেকে থেকে, বিষণ্ণও লাগছিল খানিকটা। মাতৃভূমির অনেক স্মৃতি, শৈশব-কৈশোরের নানারঙের দিনগুলো, হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের মুখ কিংবা নিজের দেশ ত্যাগের যন্ত্রণা ইত্যাকার নানা অনুষঙ্গ অনেক বড় বেদনা হয়ে শঙ্খ দা'র মনে তখন প্লাবিত হচ্ছিল হয়তোবা। আর তখন আমার খুব মনে পড়ছিল শঙ্খ ঘোষের কবিতার সেই পংক্তিগুলি- `ডানার সীমানা নেই, নাশকের নিশানা পেরিয়ে/ কোথায় তোমার বাড়ি কোথায় তোমার দেশগাঁও-/ গ্রহতারকার নিচে পড়ে আছে সজল সময়/ বুকে হাত দিয়ে বলো আজও তাকে কতখানি চাও।' কিংবা `একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি/ তোমার জন্য গলির কোণে/ ভাবি আমার মুখ দেখাব/ মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।/ একটা দুটো সহজ কথা/ বলব ভাবি চোখের আড়ে/ জৌলুসে তা ঝলসে ওঠে/ বিজ্ঞাপনে, রংবাহারে।/ কে কাকে ঠিক কেমন দেখে/ বুঝতে পারা শক্ত খুবই/ হা রে আমার বাড়িয়ে বলা/ হা রে আমার জন্মভূমি!...'




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28864115 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28864115 2008-11-03 18:19:47
ঔপন্যাসিক মীনা ফারাহ'র ছেলের লাশকে প্রথমে জানাজা, পরে দাহ!!! নিউ ইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশী লেখিকা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, ডেন্টিস্ট মীনা ফারাহ'র ছেলের লাশ প্রথমে জানাজা ও পরে দাহ করা নিয়ে নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে বেশ আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
জানা যায়, মীনা ফরাহ'র বড় ছেলে সাফায়েত রেজা গত ২ সেপ্টেম্বর এক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে টানা আট দিন হাসপাতালে থাকার পর মারা যান ১০ সেপ্টেম্বর। সাফায়েত এ বছর ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন করেছিলেন। মৃত্যুর পর মীনা ফারাহ'র স্বামী অর্থাৎ সাফায়েতের পিতা ফরহাদ রেজার ইচ্ছানুয়ায়ী ওইদিনই সকাল সাড়ে আটটায় মুসলিম রীতি অনুযায়ী তার জানাজার নামাজ সম্পন্ন করা হলেও পরে মা মীনা ফারাহ'র তত্ত্বাবধানে কঠোর পুলিশি পাহারায় হিন্দু ধর্মমতে একটি সেমিটারিতে নিয়ে তার মৃতদেহ দাহ করা হয়।
এ নিয়ে নিউ ইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশী বিশেষত মুসলিম কমিউনিটিতে প্রচণ্ড প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ১০ সেপ্টেম্বর ঘটিত ওই ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার সন্ধ্যায় ভলান্টিয়ার অব বাংলাদেশ কমিউনিটির উদ্যোগে মুসলিম যুবকের লাশ দাহ করাকে মানবাধিকারের পরিপন্থী আখ্যায়িত করে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বক্তারা দেশে বিদেশে সকল বাংলাদেশীর প্রতি মীনা ফারাহকে বয়কটের আহ্বান জানিয়ে জ্যাকসন হাইটসে অবস্থিত মীনা ফারাহ'র মালিকানাধীন বাংলাদেশ প্লাজার সামনে জুতা বিক্ষোভ প্রদর্শনের ভিতর দিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশের সমাপ্তি ঘটান।
এই ঘটনার দুইদিন পর ১২ সেপ্টেম্বর দুপুরে বাংলাদেশ প্লাজায় এক সংবাদ সম্মেলন করে মীনা ফারাহ উপস্থিত সকলের উদ্দেশে বলেন, তার ছেলে অর্ধেক হিন্দু এবং অর্ধেক মুসলমান ছিল। সে যেমন তার পিতার সাথে মসজিদে নামাজে যেত, একইভাবে তার সাথে মন্দিরে পুজা দিতেও যেত। আর তার ছেলের শেষকৃত্য কিভাবে হবে সেটা তাদের ব্যক্তিগত বিষয় বলেও জানান তিনি। এ নিয়ে কেউ কেউ জল ঘোলা করার প্রয়াস চালাচ্ছে, আর বেশি বাড়াবাড়ি হলে তিনি আইনি ব্যবস্থার দ্বারস্থ হবেন বলে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
এই সংবাদ চলাকালে বাংলাদেশ প্লাজার অনতিদূরে সাফায়েতের সহপাঠী কয়েকজন ছাত্রছাত্রী একটি ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। ব্যানারে তারা সাফায়েতকে মুসলিম দাবি করে বলেন, দুর্ঘটনার দিনও সে রোজা রেখেছিল এবং সে নিয়মিত নামাজ পড়ত।
ওই সময় স্থানীয় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কয়েকজন নেতা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে পড়ায় সবাই দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
উল্লেখ্য, ঔপন্যাসিক মীনা ফারাহ একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারী। তার মূল নাম মীনা রানী সাহা। স্বামী ফরহাদ রেজা একজন মুসলিম ধর্মাবলম্বী পুরুষ। দু'জনে একত্রে সংসার করলেও তারা স্ব স্ব ধর্ম পালন করে আসছেন দীর্ঘদিন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28856877 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28856877 2008-10-19 15:59:15
`ঈশ্বরের চোখ' থেকে : কবি রণজিৎ দাশের ১০টি কবিতা
কবি রণজিৎ দাশ, সত্তর দশকের অন্যতম প্রধান একজন কবি। জন্ম ১৯৪৯ সালে, আসামের শিলচর শহরে। শৈশব-কৈশোর কেটেছে সেখানেই। ১৯৭১ সাল থেকে কলকাতাবাসী। পৈতৃক নিবাস ঢাকার বিক্রমপুরে। পেশায় ছিলেন সরকারি আমলা। কিছুদিন আগে চাকরিজীবনের অবসান ঘটেছে। এখন ফুলটাইম কবি। বাংলা কবিতায় রণজিৎ দাশের সংযোজন বেশ মজবুতই বলা চলে। তিনি বেশিরভাগ কবিতায় গল্পচ্ছলে জীবনের অমোঘ জিজ্ঞাসাগুলোকে উন্মোচিত করেন, যেখানে শব্দ ও বাক্যবন্ধ খুবই সহজ মনে হবে, কিন্তু বিষয় ও ভাবের দিক থেকে এগুলো অনেক উচ্চমার্গীয়, দার্শনিক বোধসম্পন্ন। তাঁর বেশ অনেকগুলো কাব্যগ্রন্থ ও গদ্যগ্রন্থ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তাঁর 'ঈশ্বরের চোখ' কাব্যগ্রন্থটির প্রতি আমার এক ধরনের ভালো লাগা থাকার ফলে এ থেকেই ১০টি কবিতা ব্লগের পাঠকদের জন্য পোস্ট দেওয়া হলো। আপনাদের কেমন লাগলো জানাবেন অবশ্যই। -সফেদ ফরাজী



একটি দুঃখের কথা

একটি দুঃখের কথা, পথে ও বিপথে ঘুরে,
প্রত্যাখ্যাত হতে হতে, গান হয়ে ওঠে।

শহরে, চলন্ত ট্রেনে, মন্দিরের পথে
শোনা যায় সেই গান- ধুলোমাখা, অন্ধ, মায়াময়
যে কোনও গরিব দেশে ভিখারিরা সুগায়ক হয়।

কোথা থেকে আসে সুর,
ছেঁড়া-ফ্রক-পড়া এক বেদনার পিছু পিছু,
কুকুরছানার মতো, কোথা থেকে আসে?

খেলা করে, কোলে ওঠে, শূন্যতা ও বাসি রুটি ভাগ করে খায়
তারপর একদিন, রক্তচক্ষু সূর্যের জগতে
কারা এসে বেদনাকে তুলে নিয়ে যায়

কুকুরছানাটি শুধু শুয়ে থাকে, বোবা চোখে,
প্রান্তরের সীমাহীন ঘাসে

একটি দুঃখের কথা, পথে ও বিপথে ঘুরে,
প্রত্যাখ্যাত হতে হতে, গান হয়ে মিলায় আকাশে




কামিনীফুলের গন্ধে

কামিনীফুলের গন্ধে সত্য আছে, ছলনাও আছে।

প্রবাসে, রাত্রির পথে একা একা, অঝোর বৃষ্টিতে
হেঁটেই চলেছি, কোনো রহস্যগল্পের
সন্দেহজনক এক চরিত্রের মতো। মাঝে মাঝে
পুলিশের টর্চ জ্বলে, ছুটন্ত লরি-র
জলকাদা ছিটকে-ওঠা আলো সরে যায়।
অজস্র বৃষ্টির ফোঁটা বিশাল মেঘের
উড়ন্ত কফিন থেকে লুকোনো মার্বেল হয়ে ঝরে।

বাড়ি ফিরব না আর, এই মর্মে, ঝোড়ো বাতাসের
পথসঙ্গী হয়ে ঘুরি, তোমার ঘুমের চরাচরে।
যে ঘুম কামিনীগাছ- বিদ্যুৎ-জাগ্রত, একা, অন্ধকারে ভগ্নমনোরথ-

রাত্রি যত বাড়ে, তত কামিনীফুলের
উগ্র গন্ধে লুপ্ত হয় পৃথিবীর সমস্ত শপথ।



ট্রাফিক পুলিশ

শহরে যখন কেউ পাগল হয়, তখন সে ট্রাফিক পুলিশ হয়ে যায়। নিজের খেয়ালে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে, দিনের পর দিন। নিখুঁত তার হাতের মুদ্রা, অটুট তার গাম্ভীর্য। কেবল তার নিয়ন্ত্রিত গাড়ি-ঘোড়াগুলি সম্পূর্ণ অলীক। যেসব গাড়ি-ঘোড়া কাউকে চাপা দেয় না, কোনো প্রিয়জনকে বাসস্টপে নামিয়ে দিয়ে যায় না...




পানশালা


কলম এবং ছাইদানির সঙ্গমের ফলে জন্ম নেয় হাতঘড়ি। বিকেলে, বাড়ি ফিরে, আমি টেবিলের ওপর ফুটফুটে হাতঘড়িটিকে দেখি। টিক টিক করে ঘুরছে তার কাঁটা। ঘুরছে একটি বৃত্তের ভিতর, যার পরিধি ঘিরে রয়েছে বারোটি সময়জ্ঞাপক পানশালা। বস্তুত, পৃথিবীর সমস্ত সভ্যতাই গড়ে উঠেছে একটি মানুষ সন্ধেবেলা পানশালায় যাবে বলে। সেখানে গিয়ে, তোমার আধভাঙা গান এবং নক্ষত্রদের জুয়াখেলার কথা ভাববে বলে।

অনেক রাতে, তার বাড়ি-ফেরার পথে যদি চাঁদ ও কুয়াশা থাকে, তাহলে সে তোমারই পুরুষ...



তাপমান

নিজের শরীরে হাত দিয়ে যখন মনে হয় অন্যের শরীরে হাত দিয়েছি, তখন জল এবং পাহাড়িগান ভীষণ বিপজ্জনক। তখন বৃষ্টি মানে, বিষ, বাথরুম মানে বিদ্যুৎচুল্লি। তখন শ্যাম্পু-করা চুলের গন্ধে পারমানবিক বিস্ফোরণ ঘটে যেতে পারে।

নিজের শরীরে হাত দিয়ে যখন মনে হয় অন্যের শরীরে হাত দিয়েছি, তখন বাস্তবতার শেষ, তোমার চিঠির শুরু...



মদ

নারীর ভিতরে ডুবে পুরুষটির মৃত্যু হয়েছিল। বালির ওপর ছড়িয়ে আছে তার চশমা, বই ও ব্রিফকেস। সে নেই, কিন্তু একটা পড়ে-থাকা শূন্য কাঁচের বোতলে তার আবছা প্রতিবিম্ব আটকে আছে। সেই প্রতিবিম্ব এখনো হাসছে, হাত নাড়ছে, কথা বলছে, মাঝে-মধ্যে রুমালে মুছে নিচ্ছে চুম্বনসিক্ত ঠোঁট।

আর, অসংখ্য ডুবুরি সেই বোতলের ভিতরে ঢুকে খুঁজে চলেছে তার মৃতদেহ...



মাকড়সা

বাস্তবতার একমাত্র প্রমাণ স্মৃতি। একটি বৃদ্ধ মাকড়সার স্মৃতি। আমি দেখেছি সেই মাকড়সার জাল- যার মধ্যে আটকে আছে চাঁদ, জেলেনৌকো, কিশোরীদের গানের বই, অজস্র ডাকটিকিট, রঙিন প্লাস্টিকের গ্লোব, মৃত্যু-টেলিগ্রাম। আমি নিজে সেই জালের সরু তারের ওপর দিয়ে হেঁটেছি। হাততালির শব্দ, কাউনের হাসি এবং রোগা সিংহের গর্জন আমার দ্বারাই প্রমাণিত হয়েছে। এরপর আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে সার্কাসতাঁবুর বাইরে, এটাই নিয়ম। সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে দেখেছি, কীভাবে বিহার জুড়ে গ্রীষ্মের লু বয়, কীভাবে ধু ধু করে খুনকান্ত এম.এল.এ-দের নির্বাচনকেন্দ্রগুলি, কীভাবে পর্যটক বাঙালি দম্পত্তিরা আরো পরস্পর-বিচ্ছিন্ন হয়ে শিমুলতলা থেকে ফিরে আসে।

সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে দেখেছি, আমিই সেই বৃদ্ধ মাকড়সা...



দ্বিতীয় বেদনা

পুরনো বেদনা ভুলে যাওয়াও আরেক বেদনা।
শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতের মতো, চাপ দিলে আর ব্যথা লাগে না। বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। কই, চিতায় শোয়ানো সেই আলতা-পরা পা দুটির কথা মনে পড়লে আর চোখে জল আসছে না তো? তাহলে কি, এতদিন পর, সত্যিই ভুলে গেলাম তাকে? বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। কান্না হারানোর বোবা কান্নায় দমবন্ধ হয়ে আসে। এই দ্বিতীয় বেদনা সত্যিকারের বিমূর্ত আর ভয়ংকর। মরুভূমির বিষাক্ত বিছে-র মতো, মাথার ভিতরে এর বাস শুরু হয়। শুরু হয় শূন্যতার। এই দ্বিতীয় বেদনার আতংকে মানুষ তার প্রথম বেদনাটিকে মায়ের স্মৃতির মতো আঁকড়ে ধরে থাকে। কিন্তু কতদিন? সমস্ত ক্ষত শুকিয়ে দেয় যে ছদ্মবেশী সময়, এই দ্বিতীয় বেদনা তো তারই ক্ষুধার্ত কামড়। ... কেউ জেনেছে কি ঈশ্বরের মন?



ক্ষত

মহান শিল্পীদের জীবনীতে প্রায়শই পড়ি তাঁদের অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতা কথা। পড়ি, এবং ভীষণ বিভ্রান্তবোধ করি। ভাবি যে, যে-মানুষ ব্যক্তিজীবনে এতটা হৃদয়হীন এবং নির্মম, তাঁর শিল্পের আদৌ কী আমি দেব? যতই মহৎ হোক সেই শিল্পকীর্তি, তবু আমি তার কানাকড়ি মূল্যও দেব কি? পণ্ডিতেরা বলেন, ভুল, এই বিচার ভুল। শিল্পীও একজন মানুষ, আর সব মানুষের মতো তার ভিতরেও রয়েছে একই সঙ্গে সাধু এবং শয়তান। এবং নিজের ভিতরে এই সাধু-শয়তানের দ্বন্দ্ব থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে তার শিল্প। সুতরাং, শিল্পীর ব্যক্তিজীবন দিয়ে তার শিল্পের বিচার এক মারাত্মক ভুল। পণ্ডিতেরা সর্বদাই এত ঠিক কথা বলেন! এত খাঁটি সত্য কথা! এবং সব সত্যই কি অদ্ভুত নির্মম! কোমলতার পক্ষে কি কোনও সত্য নেই? না, কোমলতার পক্ষে কোনও সত্য নেই, শুধু বেদনা রয়েছে। সেই বেদনার কাছে আমি আজীবন গুম হয়ে থাকি। দেখি যে, আমার মনে গোঁজ হয়ে আছে একটিই কঠিন কথা। কথাটা এই যে, শিল্পী হবার তাড়নায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বামী-স্ত্রীতে মিলে সংসার ভেঙে দিয়ে, এবং নিজেদের সদ্যোজাত শিশুকন্যাকে তার গ্রামের মামাবাড়িতে ফেলে রেখে, প্যারিসে এসে রদ্যাঁর শিষ্য বনে যাওয়ার জন্যে রিলকে-র সমস্ত কবিতা আমার কাছে অস্পৃশ্য মনে হয়; অসুস্থ সঙ্গিনী ফ্রাঁসোয়া জিলো-র গালে জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার জন্যে পিকাসো-র সব ছবি আমি পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দিতে পারি। জীবনের অপরাধ ঢাকতে শিল্পের সাফাই হয় না। সেই অপরাধ, সেই আঘাত আরেকটি নীরব প্রাণে যে ক্ষত সৃষ্টি করে, শিল্পীর আজীবনের সকল শিল্পকর্ম দিয়েও সেই ক্ষতটির ক্ষমা হয় না, শুশ্রূষা হয় না। সমস্ত শিল্পের চেয়ে সেই ক্ষতটি বড়।

সমস্ত শিল্পের বিরুদ্ধে, সেই ক্ষতটিই ঈশ্বরের বিষণ্ণ কবিতা...



ঈশ্বরের চোখ

আমাদের শরীরের প্রতিটি ফুটোয়
জেগে আছে ঈশ্বরের চোখ

ভিতরে চক্রান্ত, চাঁদ, নিহত বন্ধুর রক্ত, ক্রিমি, কীট, উলঙ্গ রাক্ষস
ভিতরে মুখোশ, জুয়া, নাচ, মদ, বেশ্যাদের হাসি

তিনি দেখছেন, ঠিক যেভাবে বালক তার
পিতৃঘাতকের সঙ্গে নিজের মায়ের
অবৈধ সঙ্গমদৃশ্য দেখে
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28826960 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28826960 2008-08-03 16:31:05
কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হককে মূল্যায়নে আমরা কি অক্ষম?
কখনো আমার মাহমুদুল হকের সঙ্গে দেখা করা হয়ে উঠেনি। তাঁর `জীবন আমার বোন' উপন্যাসটি পড়ার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে দেখা করার এক দুরন্ত তাড়া অনুভব করছিলাম। বেশ অনেকবার প্লান-পরিকল্পনাও করেছি, কিন্তু কোনো না কোনো কারণে সম্ভব হয়নি। অবশেষে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে দেখা হলো তাঁর সাথে, কিন্তু কথা হলো না কোনো!

আশ্চর্য হলাম ওখানকার উপস্থিতি দেখে। এত কম উপস্থিতি! এত বড় মাপের কথাশিল্পী যার হাত দিয়ে বেরিয়েছে- খেলাঘর, জীবন আমার বোন, অনুর পাঠশালা, নিরাপদ তন্দ্রা, কালো বরফ, প্রতিদিন একটি রুমাল, মাটির জাহাজ, চিক্কোর কাবুক, অশরীরী ইত্যাদি রচনা- তাঁর কফিনের পাশে সাহিত্যিকমহলের হাতেগোনা মাত্র ৪০/৫০ জন, আত্মীয়পরিজন ২০/৩০ জন, এবং বাংলা একাডেমীর কর্মকর্তা-কর্মচারী ৭/৮জন!
বাংলা একাডেমীতে জানাজা শেষে ২.৩০টা/৩ টার দিকে যখন লাশ নিয়ে মীরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের দিকে রওনা দেওয়া হলো, তখন দেখা গেল কফিনের গাড়িতে সাহিত্যিকমহলের আমরা তিনজন ছাড়া বাকি সবাই মাহমুদুল হকের আত্মীয় পরিজন। সামনে ড্রাইভারের পাশে `লোক' সম্পাদক অনিকেত শামীম, আবু তাহের সরফরাজ এবং পিকআপের ওপরে লাশের কফিনের পাশে অন্যান্য লোকজনের সাথে আমি দাঁড়িয়ে, বুক পকেটে আমার মাহমুদুল হকের ডেথসার্টিফিকেট। আর পেছনে ট্যাক্সিক্যাবে কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল, কবি শামীম রেজা, কবি চঞ্চল আশরাফ এবং অন্য গাড়িতে সাহিত্যিক মারুফ রায়হান ও হামিদ কায়সার। এই আটজন ছাড়া শবযাত্রায় সাহিত্যিকমহলের আর কাউকে চোখে পড়েনি। কেন পড়েনি, জানি না। জানি না!

এছাড়া বাংলা একাডেমীতে কবি রফিক আজাদকে ছাড়া ষাটের উল্লেখযোগ্য কাউকে চোখে পড়েনি। কেন তারা এলেন না, তারাই ভালো জানেন। অথচ এদেশের অনেক চোর-বাটপারের জানাজা বা শেষকৃত্যতেও অনেক লোকসমাগম ঘটে এবং আমাদের সাহিত্যিকমহলের অনেকেই সেখানে দৌড়ে যান। মাহমুদুল হক প্রথাগত তথাকথিত বাজারি লেখক ছিলেন না বলে, দলবাজি-মিডিয়াবাজি-তেলবাজি করতেন না বলেই কি তার শেষকৃত্যে এত কম উপস্থিতি ছিল? নাকি মাহমুদুল হকের মতো এত বড়মাপের লেখককে আমরা বুঝতে পারিনি এখনও?

কবি বিনয় মজুমদার অবশ্য লিখেছেন `ভালোবাসা দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?' এ প্রশ্নটির সঙ্গে সুর মিলিয়ে এখানে বলা যায় `কথাশিল্পী মাহমুদুল হককে মূল্যায়নে আমরা কি অক্ষম?'
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28823411 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28823411 2008-07-23 17:29:23
কবি আল মাহমুদের একটি সাক্ষাৎকার এবং এর প্রতিক্রিয়ায় নব্বইয়ের তিন কবি দশক বিচারে পঞ্চাশের দশকের কবি আল মাহমুদ। তিরিশের দুর্দণ্ড প্রতাপ ও প্রভাব মাথার উপর থাকা সত্ত্বেও `সোনালী কাবিন' কাব্যগ্রন্থ লিখেই বাংলা কাব্যাঙ্গনে আলোচনায় চলে আসেন তিনি। এরপর অসংখ্য কবিতা, ছড়া, গল্প, গদ্য, উপন্যাস প্রভৃতি লিখেছেন এবং লিখে যাচ্ছেন এখনো। বাংলা কবিতার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘবাসের অভিজ্ঞতা। ফলে উত্তরপ্রজন্ম তাঁর কাছ থেকে কবিতা বিষয়ক `মূল্যবান' অনেককিছুই শুনতে চাইবে, এবং নিজেদের কবিতা ভাবনার আলোকে গ্রহণ কিংবা বর্জন করবে, এটাই স্বাভাবিক, এটাই তারুণ্যের রীতি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আজকের কাগজের সুবর্ণরেখার ১২ জুলাই ২০০৭ সংখ্যায় আল মাহমুদের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। সাক্ষাৎকারে তিনি সমকালীন কবিতা বিষয়ে বেশ কিছু মতামত প্রকাশ করেন। তাঁর এই মতামত তরুণ কবিরা কীভাবে দেখছেন, উত্তরে তাঁরা কী বলছেন, এর জন্য মুখোমুখি হয়েছিলাম নব্বইয়ের তিন কবি মজনু শাহ, চঞ্চল আশরাফ ও সাখাওয়াত টিপু'র। এবং এই তিন কবির প্রতিক্রিয়াগুলোও সুবর্ণরেখার ১৯ জুলাই ২০০৭ সংখ্যায় ছাপা হয়।
-[স. ফ]



আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার
`কবির পক্ষে শেষ পর্যন্ত থাকে তার কবিতা'

সুবর্ণরেখা: একটা বয়সে এসে কবিদের কবিতা লেখা থামিয়ে দেওয়া উচিত বলে অনেকেই মনে করেন। পৌনঃপুনিকতার আশঙ্কা থাকে বলেই এমন প্রশ্ন ওঠে। আপনার কি এরকম কিছু মনে হয়?
আল মাহমুদ: আমি অনেকদিন থেকেই কবিতা লিখছি। আধুনিক কবিতা সম্পর্কে আমারও ধারণা গড়ে উঠেছে। আমি সেই ধারণা থেকেই লিখছি। আমাদের কবিতা এই সময়ে এসে দিশেহারা একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কবিতা যেন একটা চরে আটকে গেছে। অধিকাংশ কবিতার বিষয়ই গতানুগতিক। বিষয় শুধু `আমি' আর `তুমি'! এই আমি-তুমির কোনও দেশ নেই, কাল নেই, কিছু নেই। এতে করে বাংলা কবিতার ধারা এক জায়গায় এসে পথ হারিয়ে ফেলেছে। কোনও বক্তব্য নেই। বক্তব্য না থাকলে তো আঙ্গিক দাঁড়ায় না। এ কারণেই বাংলা কবিতার এই দুর্গতি।
কিছুদিন আগে ‘তুমি তৃষ্ণা তুমি পিপাসার জল’ শিরোনামে আমার একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। আমি সেখানে নতুনত্ব আনায়নের চেষ্টা করেছি।
সুবর্ণরেখা: একজন তরুণতম লিখিয়ের কাছেও আপনি অনেক ঈর্ষণীয় কবি ব্যক্তিত্ব। অনেক তরুণ কবি আপনাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি কি তরুণদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন?
আল মাহমুদ: না, করি না। বয়সে তরুণ হলেই তিনি ভালো লিখবেন- এমন কোনও গ্যারান্টি নেই। তবে তরুণদের কাছে মানুষ আশা করে।
সুবর্ণরেখা: আপনি কী আশা করেন?
আল মাহমুদ: তরুণরা আঙ্গিক ভেঙ্গে বেরিয়ে আসবে, আমি-তুমির বৃত্ত ভেঙ্গে বেরিয়ে পড়বে, কবিতা পাঠকদের কাছে পৌঁছোবে।
সুবর্ণরেখা: বৈষ্ণব পদকারকার দেহাত্মা আর পরমাত্মার সংশ্লেষণ ঘটিয়েছিলেন তাদের কবিতায়। আপনার কবিতায় দেখি দেহাত্মা অর্থাৎ দেহজ প্রেমের আধুনিক রুপান্তর। আপনার কি মনে হয় না কবিতায় আপনিও একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন?
আল মাহমুদ: দেহাত্মা, পরমাত্মা এসব আমার কবিতার বিষয় নয়। আমার কবিতার বিষয় নর-নারী, প্রেম, দেশ, বহমান জীবন এইসব।
সুবর্ণরেখা: দীর্ঘ একটা সময় ধরে আপনি ঢাকা শহরে বাস করছেন। নাগরিক সমস্ত সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত একজন কবি আপনি। অথচ আপনার কবিতায় যে আল মাহমুদের সাক্ষাৎ আমরা পাই, তিনি গ্রাম্য, সরল, প্রকৃতির কাছাকাছি একজন প্রান্তিক মানুষ। তবে কি একজন ব্যক্তি আল মাহমুদ ও কবি আল মাহমুদ পৃথক কোনও সত্তা?
আল মাহমুদ: না । আমি গ্রাম থেকে আসা মানুষ। আমার মধ্যে আছে একই সাথে গ্রাম, একই সাথে শহর। এই দুটি বিষয়ে আমি অভিজ্ঞ। এই শহরের (ঢাকা শহরের) গড়ে ওঠা আমি দেখেছি, এর বৃদ্ধি দেখেছি। কিন্তু আজও আরবানিটি গড়ে উঠতে পারছে না। দেখবে, ঈদে কিংবা কোনও উৎসবে ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে যায়। এই মানুষগুলো যায় কোথায়? এরা যায় শিকড়ের টানে। এই যে আরবান-মেন্টালিটি- তা গড়ে ওঠেনি। আমি যা কিছু লিখি, আমার অভিজ্ঞতা থেকেই লিখি।
সুবর্ণরেখা: একটা সময় কবি শামসুর রাহমান ও কবি আল মাহমুদের মধ্যে ‘প্রধান কবি’ কে- তা নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলতো। যদি অভিযোগের সুরে বলি, এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রশ্রয় পেত আপনাদের কারণেই- তাহলে আপনার মন্তব্য কী হবে?
আল মাহমুদ: শামসুর রাহমান আমার থেকে বয়সে একটু বড় ছিলেন। আমি তাঁকে সবসময় সম্মান দিয়ে এসেছি। কোনও সময় তাঁকে ঘিরে ঈর্ষা কাজ করেনি। শেষের দিকে তাঁর কবিতায় পৌনঃপুনিকতা এসেছে। তিনি প্রচুর লিখতেন বা লিখতে বাধ্য হতেন। হয়তো তিনি সমবসময় পত্রিকায় সবার উপরে থাকতে চেয়েছেন। এতে তাঁর কোনও উপকার হয়নি। আমি কখনও হুকুম তামিল করতে গিয়ে কবিতা লিখিনি। আমার মনে কবিতা না আসলে আমি লিখিনি। আমার রাস্তা আলাদা, কবিতার বিষয়বস্তু আলাদা। আমার কাজ আমি করেছি। আমি কখনই তাঁর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিনি। এর মধ্যে তিনি প্রবেশ করেছিলেন, আমি করিনি। কেউ যদি আমাকে প্রতিযোগিতার মধ্যে বিবেচনা করে সেটা তার বা তাদের ব্যাপার, আমার ব্যাপার নয়।
সুবর্ণরেখা: কিন্তু আপনাদেরকে ঘিরে যারা থাকতো বা যারা আপনাদের পরে লোক, এই বিরোধটাতো তাদেরই তৈরি! আপনিও আপনার পরে লোকদের নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন...
আল মাহমুদ: আমি যাদের নিয়ে লিখেছি, দায়িত্ব নিয়েই লিখেছি। আমি তাদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ লিখেছি এবং লেখাটি আমার প্রবন্ধগ্রন্থেও নিয়েছি। তারা আমার পরে লোক বলে লিখেছি- তা নয়। কবির পে শেষ পর্যন্ত আসলে কেউ থাকে না। কবির পে শেষ পর্যন্ত থাকে তার কবিতা।
সুবর্ণরেখা: আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ও একজন লেখক। কবিতার পাশাপাশি ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখছেন দীর্ঘদিন ধরে। আপনার একটি উপন্যাস মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক হলেও কবিতায় এদিকটি প্রায় অনুপস্থিত। কারণটা জানতে চাইছি।
আল মাহমুদ: তোমাকে আগে দেখতে হবে মুক্তিযুদ্ধে এদেশের কবি-লেখকরা অংশগ্রহণ করেছিলেন কি-না। দু’একজন যারা করেছেন তাদের কথা আমরা জানি। এইজন্য মুক্তিযুদ্ধের ওপর কেউ যদি কাজ করে থাকে তা আমি-ই করেছি। আমার একটি বই আছে ‘উপমহাদেশ’। কবিতাতেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আচে। তবে সেটা হয়তো ততটা উচ্চকণ্ঠ নয়। কবিতা সে কাজও করে না। আগেই বলেছি, কবিতায় আমার বিষয় নর-নারী, দেশ, প্রেম, নদী, বহমান জীবন ইত্যাদি।
সুবর্ণরেখা: কিন্তু আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন ‘বন্দী শিবির থেকে’ নামক একটি বহুলপঠিত কাব্যগ্রন্থ। পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও এই বইটি যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য।
আল মাহমুদ: দেখো, সাহিত্য হলো নিজের অভিজ্ঞতা থেকে, অন্তরঙ্গতা থেকে সৃষ্ট হয়। কোনও নকল কিছু শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকে না। শামসুর রাহমান যখন ‘বন্দী শিবির থেকে’র পাণ্ডুলিপি কলকাতায় আবু সয়ীদ আইয়ুবের কাছে পাঠান আমি তখন সেখানে ছিলাম। শামসুর রাহমানের ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থ পড়ে কখনও তো মনে হয়নি তিনি বন্দী শিবিরে ছিলেন! কথা হলো, শামসুর রাহমান এই বইয়ে এমন কী কাজ করেছেন যা পড়ে মনে হবে তিনি সত্যি বন্দী শিবিরে ছিলেন- যা আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে? আমি শুধু বলছি, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্য অভিজ্ঞতা আমার আছে। আমি দেখেছি, লড়েছি। যদি বলো পরবর্তী প্রজন্মের কথা; তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কি ভ্রান্তির মধ্যে থাকবে? তা থাকবে না।
আমার মনে হয় শামসুর রাহমানের অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। অনেক সমস্যায় ছিলেন তিনি। ফলে দেশত্যাগ করতে পারেননি। এজন্য তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না।
সুবর্ণরেখা: বেশ ক’বছর আগে ‘সবাই ফিরে আসছে লিরিকে’ শিরোনামে আপনি কবিতা বিষয়ক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। কিন্তু বলা হচ্ছে, এটি গদ্য কবিতার যুগ। আপনি কী বলেন?
আল মাহমুদ: আমাদের বাংলা কবিতা হলো গীতিপ্রবণ। আমি নিজেও মোটামুটি গীতিধর্মী কবিতা লিখতে চাই। আর কবিতাকে অ-কবিতা থেকে আলাদা রাখার জন্য ছন্দ, মিল, অনুপ্রাস এসবের ঝোক বানাতে হয়। এটা গদ্য কবিতার যুগ- কথাটা আমি স্বীকার করি না। তাছাড়া কবি হতে হলে তাকে অবশ্যই মাত্রাজ্ঞান থাকতে হবে। এই যে বিল্ডিংটা দেখছো, যে ঘরে বসে তুমি কথা বলছো- তা একটা চতুস্কোণ আকৃতির। এটা আঁকাবাঁকা হতে পারতো। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো মিলের মধ্যে থাকা। স্থাপত্যরীতিতেও তাই আছে। সব জায়গায় এটা আছে।
তবে ছন্দহীন কবিতাও কবিতা হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ শেষের দিকে অনেক ছন্দহীন কবিতা লিখেছেন। কবিতাকে কবিতা করে তুলতে হবে। যদি চন্দ না থাকে তবে ছন্দের অভাব অন্যকিছু দিয়ে পূরণ করতে হবে। নইলে মানুষ পড়বে না; শুধু তাকিয়ে দেখবে। আমাদের দেশে অনেকই তো গদ্যে কবিতা লিখছে কিন্তু কয়টা কবিতা মনে থাকে? অথচ কবি সমর সেনও গদ্যে কবিতা লিখেছেন, সেখান থেকে আমি অনেক কবিতা মুখস্থ বলতে পারবো।
সুবর্ণরেখা: আপনার ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ একটি অসাধারণ কিশোর কবিতার বই। কিশোরদের জন্য এখন লিখছেন না কেন?
আল মাহমুদ: লিখি তো! মাঝে মধ্যে এখনও লিখি। এটা লিখতে আমার খুব ভালো লাগে। এই কবিতাগুলো লিখে আমি অতিদূর পাঠকের কাছে পৌঁছেছি। আমি অবশ্য কিশোর কবিতা বলে লিখি না, বাংলা কবিতা বলে লিখি। এটা আমাদের ভাষায় সুকুমার রায় লিখেছেন। অসাধারণ তাঁর লেখা। সেগুলো কিন্তু ছড়াটড়া নয়। সেসবের মধ্যে আধুনিক কবিতার কাজ আছে। আধুনিক কবিতার কাজ হচ্ছে ধ্বনি তরঙ্গ। সুকুমার রায়ের কবিতায় ধ্বনি তরঙ্গ আছে।
সুবর্ণরেখা: আপনার সা¤প্রতিক কবিতা ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাই।
আল মাহমুদ: আমার সা¤প্রতিক কবিতা ভাবনা হচ্ছে, বাংলা কবিতার এখন যে দশা হয়েছে; আট লাইনে এসে কবিতা দাঁড়াচ্ছে, আর এগোতে পারছে না- এ থেকে মুক্তি। তাছাড়া এই যে ‘তুমি’ কবিতার বিষয়, এই তুমির একটা ব্যাখ্যা থাকতে হবে। তুমি কে? তুমি কোথায় বাস করো? তোমার অবস্থান? শুধু তুমি বললেই তো প্রেমের কবিতা সিদ্ধ হয় না! এজন্য কবিতা লেখা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। কেউ মনে রাখছে না।
সুবর্ণরেখা: আপনাকে ৭২ তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা। আপনি শতায়ু হোন। এতণ সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
আল মাহমুদ: ধন্যবাদ।






নব্বইয়ের তিন কবির প্রতিক্রিয়া


মজনু শাহ
যখন প্রলয়, যখন অন্ধত্ব

সত্য যে, কবি আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ যখন প্রকাশিত হলো, সেটা একটা দিক-নির্ণয়ী ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজকের বাংলা কবিতার প্রেক্ষিতেও ঐ কাব্যের জন্য তিনি সর্বাধিক নন্দিত হন। পাঠক তাঁকে অল্পকিছু কবিতা দিয়েই চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন সেদিন। তারপর অনেক কবিতাই লিখেছেন তিনি, অনেক রকম, কিন্তু সোনালী কাবিনের সাফল্যকে পেরিয়ে যাবার মতো কবিতা আমরা আর তাঁর কাছ থেকে পাইনি।
সোনালী কাবিন কোলকাতা থেকে যখন মিনিবুক আকারে মুদ্রিত হলো, শোনা যায়, কোনো কোনো পাঠিকা তাদের ব্লাউজের ভেতর রেখে, মাঝে মাঝে বের করে পড়তো! সত্য মিথ্যা কতকিছুই তো ঘটে। কিছু সত্যকে ফ্যান্টাসির মতো মনে হয়।

২.
কিন্তু তারপর?
ভালো কবিতা তারপরও তিনি লিখেছেন, সেটা হাতেগোনা। অজস্র কবিতার ভেতর দিয়ে পাঠককে নিয়ে গেলেন, কিন্তু তেমন রসোত্তীর্ণ কবিতা আর কি তিনি লিখতে পেরেছেন? কবিতায় আধুনিক চিন্তার যে পরিসর, তার ভেতর তিনি বেড়ে উঠতে দিয়েছেন নিজেকে, নির্বিচারে। আধুনিক মনের সৃষ্টিশীলতা, আজ তো আমরা ফিরে দেখছি যে, তা কত বড় একটা বদ্ধতা, কত বড় একটা ফাঁদের বিষয়।
আধুনিকতার মধ্যে যে খণ্ডবাদী মানসিকতা কাজ করে, তা আজ স্পষ্ট। কোজ এন্ডেড আখ্যানের মধ্যে খানিকটা প্রেম, কাম, খানিকটা ইতিহাস-ঐতিহ্যের চূর্ণ মিশিয়ে যা দাঁড়ায়, যা দাঁড়াচ্ছে আল মাহমুদের কবিতায়, তা কবিতার ভঙ্গি করে মাত্র। বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, সেসব কবিতা নয়। যৌনতা নিয়ে বেশ হাঁসফাঁস ল করা যায় তাঁর কবিতার এখানে-সেখানে। সেটাকে উত্তীর্ণ কিছু মনে হয় না, মনে হয় এত বয়সে এসে ভীমরতি ধরল! কিছু যৌন চটকানি পেলে গড়পড়তা পাঠক আঁঠার মতো লেগে পড়বে তাতে, এতে আর সন্দেহ কী! সেকারণেই এখনো অনেককে আহা উহু করতে শুনি।
আজ তরুণদের লেখার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তা তরুণ বলতে কী বোঝেন তিনি? বিটিভির একটা অনুষ্ঠানে ‘আল মাহমুদের কবি’ নামে অদ্ভুত হাস্যকর জিনিস পরিবেশিত হতে দেখি। অথর্বদের যতই প্রশংসা করা হোক না কেন- তারা যে অথর্বই থাকে শেষপর্যন্ত, এটুকু যদি তিনি নিজের কাব্যবিবেচনা দিয়ে না বোঝেন, কিম্বা বুঝেও, না-বোঝার ভান করে কিছু তরুণ স্তাবকদের দিনের পর দিন মূল্যায়ন করতে থাকেন নিজের আত্মতৃপ্তির জন্যে- সেটা তবে একটা জাতীয় কাব্যিক-ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি আন্তরিকভাবে চাইলে, আমরা কিছু তরুণের এমন কিছু কাব্যগ্রন্থের খোঁজ দিতে পারি, যা তাঁর (বোধ করি) ধারণা পরিবর্তনে সহায়ক হবে। এই কাব্যগ্রন্থগুলো, গত ২০/২৫ বছরে প্রকাশিত হয়েছে, যা গদগদ আবেগের নয়, শুধু ‘আমি-তুমি’র কিশে নয়।

৩.
আল মাহমুদ যে আজ তরুণদের ভালো কবিতা খুঁজে পাচ্ছেন না, তার কারণ শুধু বার্ধক্য নয়, তিনি আসলে মিডিয়া আর আত্মপ্রতিষ্ঠার চক্করের মধ্যে পড়েছেন। বা এমন হতে পারে, তিনি সত্যটাই বলেছেন, কেননা স্তাবকদল আর পত্রিকার সম্পাদক ছাড়া অন্যদের সংস্পর্শ তিনি তো পাচ্ছেন না!
অথবা, বাংলা কবিতা আধুনিক যুগ পেরিয়ে পোস্টমর্ডান যুগে প্রবেশ করে নতুন আর অভিনব হয়ে উঠছে ক্রমে, সেই ভাষা, সেই পরিবর্তিত মননের নাগাল পাচ্ছেন না তিনি। সেটা পাবার সম্ভাবনাও দেখছি না, কেননা পুরোনো এক ধরনের কাব্যচিন্তা ও ভালত্বের মধ্যে তিনি আটকে পড়েছেন। নতুনে অবগাহন করা তাঁর পে বোধকরি আমৃত্যু দুঃসাধ্যই থেকে যাবে।



চঞ্চল আশরাফ
চর্বিত-চর্বণ বলতে আমরা যা বুঝি, তিনি তা-ই করে যাচ্ছেন

সুবর্ণরেখার গত সংখ্যায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটিতে আল মাহমুদ বলেছেন, ‘আমাদের কবিতা এই সময়ে এসে একটা দিশেহারা অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে’। আমি বলতে চাই, আমাদের প্রতিষ্ঠিত কবিরা মূর্খ-পরিবেষ্টিত থাকতেই ভালোবাসেন এবং তাদের মূর্খতা দিয়েই সমকালীন কবিতার বিচার করেন। সমকালীন কবিতা নিয়ে তাঁর এমন মন্তব্য আসলে তাঁর সমস্যা নয়, তাঁর আশপাশে যারা লিখে বেড়াচ্ছেন, তাদের সমস্যা। এতে আরও মনে হয়, সমকালীন কবিদের খোঁজ তিনি রাখেন না। আমাদের সাহিত্যিকদের মধ্যে একটা রেওয়াজ দাঁড়িয়েছে যে, প্রতিষ্ঠিত কবিরা পরবর্তী কবিদের উপোর চোখে দেখেন, আল মাহমুদও এর ঊর্ধ্বে উঠতে ব্যর্থ হয়েছেন। যদিও আল মাহমুদ কেন, কোনো কবির কোনো উক্তিই শেষপর্যন্ত সাহিত্যের কাজে আসে না। তিনি নিজেকে একজন কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন, এটাই তাঁর জন্য যথেষ্ট নয় কি? এটা নিয়ে চুপচাপ থাকাই ছিল সঙ্গত। অবশ্য তাঁর কবিতা পড়ে তাঁকে যথেষ্ট শিতি মনে হয় না।
তিনি অভিযোগ করেছেন সমকালীন কবিতায় কেবল ‘তুমি’ ‘আমি’ লেখা হচ্ছে। এেেত্র সত্য হলো যে, তিনি নিজেই তাঁর সময়ে ‘আমি-তুমি’ নিয়ে বেশি লিখেছেন। হয়তো এই ‘তুমি’কে তিনি আধ্যাত্মিক বলে দাবি করবেন। বলা বহুল্য নয় যে, আধ্যাত্মিকতা বাংলা কবিতার একটা বহুল ব্যবহৃত ও বাতিল বিষয় হয়ে গেছে।
আঙ্গিক নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। কিন্তু সত্য হলো, তাঁর কবিতা পড়ে মনে হয় না তিনি আঙ্গিক নিয়ে সচেতন। তাঁর সময়ে, তিনিই আঙ্গিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অসচেতন ছিলেন, তাঁর কবিতা তা-ই প্রমাণ করে। চর্বিত-চর্বণ বলতে আমরা যা বুঝি, তিনি তা-ই করে যাচ্ছেন। আঙ্গিক নিয়ে বরং তাঁর সময়ে সৈয়দ শামসুল হক ভালো কিছু কাজ করেছেন।
আধুনিক কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের ধারণা খুব অস্বচ্ছ, তাঁর কবিতাও এই অস্বচ্ছতার প্রমাণ দেয়। তিনি আসলে আধুনিক কবিতা লেখেননি। তিনি লিখেছেন, বাঙালি মধ্যবিত্তের আধা আধ্যাত্মিক ও আধা রোমান্টিক- এক ধরনের ভাবালুতা সর্বস্ব কবিতা। শুরুতে সেগুলোয় একটা মার্কসবাদী কোটিং ছিল। তাঁর শব্দ-রুচিও আধুনিক মনস্ক নয়। তিনি অনেক লোকজ শব্দ ব্যবহার করেছেন, তবে লোকজ শব্দের ব্যবহার প্রমাণ করে না যে তিনি আধুনিক। যদিও লোকজ শব্দ দিয়ে অনেকের পে আধুনিক কবিতা লেখা সম্ভব হয়েছে। তাঁর কবিতা সরল, কিন্তু আধুনিক কবিতার লণ এটা নয়। তাঁর কবিতার আখ্যানধর্মিতা বেশ উপভোগ্য কিন্তু আধুনিকতার পরিচয় এটা নয়। আধুনিকতার বহুল ব্যবহৃত সংজ্ঞা হলো, বিপর্যয়কারী বহুমুখী চিন্তার জটিল প্রকাশ। তাঁর কবিতায় যে চিন্তা এবং জীবন সম্পর্কে যে ধারণা আমরা পাই তা এই সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। তাঁর লিখিত ‘সোনালী কাবিন’ বিখ্যাত একটি কবিতা সংকলন। এই বইটিতে কবির যে দৃষ্টিভঙ্গি তা অনেকটা প্রথাগত। মার্কসবাদী একটা কোটিং এতে আছে, অথচ ভোগবাদী চিন্তায় যে তিনি একেবারে কম্পমান, তা প্রতিটি কবিতায়ই টের পাওয়া যায়। কিন্তু মার্কসবাদী চিন্তার সঙ্গে ভোগবাদিতার বিরোধ আছে। আল মাহমুদের এধরনের কবিতা প্রমাণ করে চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি স্বচ্ছ নন, বরং স্ববিরোধিতায় ভরে আছে তাঁর রচনারাশি।
তিনি বলেছেন, ‘কবিতা যেন একটা চরে আটকে গেছে’। আমি বলতে চাই, গত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে বাংলা কবিতা যে গতিময়তা অর্জন করেছে, তা এখনও আছে; এমনটি পঞ্চাশে তো নয়ই, ষাটের দশকেও ঘটেনি। অধিকন্তু এখনকার কবিরা আঙ্গিক সচেতন, দেশ-কাল সচেতন। তারা যেমন গ্রহণ করতে পারেন, তেমনি বর্জন করতেও পারেন।
তিনি বলেছেন, ‘বক্তব্য না থাকলে তো আঙ্গিক দাঁড়ায় না, এ কারণেই বাংলা কবিতার এই দুর্গতি’, এটা আসলে সমকালীন কবিতা সম্পর্কে তাঁর ধারণাহীনতারই পরিচয় বহন করেছে। আমি তাঁকে সমকালীন কবিতা ভালো করে পড়ে দেখার অনুরোধ করছি।
সবশেষে তিনি বলেছেন, ‘বাংলা কবিতার এখন যে দশা হয়েছে, আট লাইনে এসে কবিতা দাঁড়াচ্ছে, আর এগুতে পারছে না’- অর্থাৎ তরুণ কবিরা দীর্ঘ কবিতা লিখছেন না বা লিখতে পারছেন না- তাঁর এমন মন্তব্যও আপত্তিকর। আগেই বলেছি তাঁর আশপাশে যারা আছে, তারা অশিতি, পশ্চাৎপদ এবং বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের কবি। তাদের আট/দশ লাইনের জিকির-মার্কা কবিতা পড়ে মনে হতে পারে এখনকার কবিতা আট/দশ লাইনের বেশি হতে পারে না। তাঁর পাশে-থাকা কবিদের সনেটগুলোও তো আট-দশ লাইনের! বাস্তবতা হলো, আমাদের সময়ের কবিরা দীর্ঘ কবিতা যেমন লিখছেন, তেমনি ক্ষুদ্র কবিতাও লিখছেন। দীর্ঘ কবিতা থেকে ক্ষুদ্র কবিতা লেখা কম বাহাদুরীর ব্যাপার নয়। কেবল দীর্ঘ কবিতাই ভালো জিনিস- এমনটা ভাবা বোকামি, কারণ এতে থাকতে পারে বাচালতা, যা ক্ষুদ্রকবিতায় সচরাচর থাকে না। ক্ষুদ্র কবিতা কবির পরিমিতি বোধের পরিচয়ও বহন করে। অবশ্য আমাদের এখনকার কবিরা দীর্ঘ কবিতায়ও সেই পরিমিতিবোধ দেখাতে সম হয়েছেন। নিজের সময়ের প্রতি পপাতবশত আমি এসব-কথা বলছি না, এটা বাস্তবতা। এও বলতে পারি, এই উক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিজের সময়ের কাছে আমার পরাজয়ের আনন্দ।


সাখাওয়াত টিপু
একজন কবির পতন

আল মাহমুদের প্রকাশিত সাক্ষাৎকার একটা স্থুল-সাক্ষাৎকার। পড়িয়া দেখিলাম, যিনি প্রশ্ন করিতেছেন আর যিনি উত্তর দিতেছেন, দু’জনের মধ্যে যেভাবে যুক্তি-তর্ক হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হয় নাই। প্রশ্নের মধ্যে ভক্তি চলে না। আর উত্তরদাতার মধ্যে অভক্তি চলে না। সাক্ষাৎকারের একটা উদ্দেশ্য থাকে। যুক্তিপূর্ণ তর্ক থাকে। এই সাক্ষাৎকারে তাহা নাই। ইহা বড় সমস্যা বটে। প্রশ্নগুলা এভাবে করিলে দেখা মিলিবে, কে প্রশ্ন করিতেছেন, কীভাবে প্রশ্ন করিতেছেন- তাহার সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। উত্তরদাতা কী উত্তর দিতেছেন, কীভাবে উত্তর দিতেছেন, তাঁহারও রাজনীতি আছে। তবে সাক্ষাৎকারে ভক্তিরই প্রতিফলন ঘটিয়াছে। প্রশ্নকর্তার স্তুতি আর উত্তরদাতার অভক্তি দুই-ই সমভাবে দৃশ্যমান। কারণ প্রশ্নের সঙ্গে উত্তরের যোগাযোগ না থাকিলে তাহা কিছু অকাট মন্তব্য বলিয়া বিবেচিত হয়। কেননা যুক্তিহীন যে কোনো মন্তব্যই ফেটিসভাষা।
আল মাহমুদ বলিয়াছেন, ‘কবিতা এই সময়ে এসে একটা দিশেহারা অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে’। উত্তরে কহিব, কবিতা কখনো দিশেহারা হয় না। কারণ কবি যখন নিজেই দিশেহারা হন তখন তাঁহার কাছে সবকিছুই দিশেহারা মনে হয়। প্রশ্ন হইতেছে, ‘এই সময়’ বলিতে আমরা কী বুঝিব? হালের কবিতা? হালের সাহিত্য? হালের চিন্তা? তাহার মানে সমসাময়িক সমাজ-বাস্তবতা, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থনৈতিক চিন্তার কায়-কারবার। আল মাহমুদের অভিযোগ, ‘কবিতায় সমসাময়িক বিষয়বস্তুর প্রতিফলন নেই’। এবেলায় কথা হইল, চিন্তার কখনো বন্ধ্যাত্ব ঘটে না। ইহা মনোজগতের চলমান রূপ। ফলে যখন বলা হয়, কবিতার দিশেহারা অবস্থা তখন আসলে কবিতা দিশেহারা হয় না। হয় যিনি চিন্তা করেন বা চিন্তাকে কবিতাকারে যথাযথভাবে প্রকাশ করিতে পারেন না তাঁহার দিশেহারা অবস্থা। চিন্তা বলিতে আমরা ভাব ও ভাষাকে বোঝাইতেছি।
তথাকথিত আধুনিকতা এখন নানা প্রশ্নের সম্মুখীন। কারণ বাংলা ভাষা যদি বাংলা ভাষা আকারে বিকাশ লাভ করিত, তাহার ফল দাঁড়াইতো বিকাশমান ভাষার পর্যায়ে। ভাষার হাল-হকিকত পরখ করিলেই তাহা স্পষ্ট হয়। তথাকথিত আধুনিকতার পিছনে একটা ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করিয়াছে। কী তাহার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি? কারণ ব্রিটিশ শাসনের ফলে বাংলায় যে ‘শুদ্ধ মধ্যবিত্ত’ তৈয়ার হইয়াছিল তাহা শিক্ষাগতভাবে অনুকার সৃষ্টিরই কারখানা ছিল। বিকাশমান মধ্যশ্রেণীর পশ্চিমের স্তবগান গাওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তাই ছিল না। ফলে এই শুদ্ধ মধ্যবিত্তের হাতে যে সাহিত্য সৃষ্টি হইয়াছে তাহা ব্রিটিশ শাসনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাষার ফলাফল। কারণ বাংলা বাংলার মতো হয় নাই, হইয়াছে ব্রিটিশের ধাঁচে আধুনিক। বাঙালি বাবুয়ানা সাহেবদের ভাষা বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক জমিনে কী অর্থ ফলাইয়াছে তাহা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাইতেছে। তাহার দায় বহন করিবে কে বা কাহারা?
কবিতায় ‘আমি’ ‘তুমি’ প্রয়োগের বিষয়ে আল মাহমুদের কথা একঅর্থে ঠিক। কারণ তিনি নিজেই আমি-তুমির প্যারাডক্সে হাবুডুবু খাইতেছেন। তাঁহার একটা কবিতার বহির নাম তুমি তৃষ্ণা আমি পিপাসার জল- এইখানে নতুন কী আছে? তুমি তৃষ্ণা আমি পিপাসার জল বহিতে কোনো নতুনত্ব নাই। আছে শুধু কিছু বাক্য বা শব্দের প্রলাপ।
আরেকটু বিশদ করিলে হয়, আল মাহমুদ তাঁহার সোনালী কাবিনকে পরকালের লেখা দিয়া অতিক্রম করিতে পারেন নাই। ইহা একজন কবির জন্য পতন। তাঁহার কবিতার ভাষায় যে দেহ মিলে, তাহা মেদবহুল। কখনো কখনো লালায়িত পুরুষ। কারণ ভোগ পুরুষ নিয়ন্ত্রিত হইলে ফসলের বণ্টন অসম হইতে বাধ্য। এইখানে নারী পণ্য আকারে হাজির হয়। সোনালী কাবিনে শুধু ব্যক্তির তথাকথিত ভোগের আকাক্সাই প্রকাশিত। প্রচলিত সমাজের ধারণা- কার্ল মার্কসের চিন্তাপ্রসূত আল মাহমুদের সোনালী কাবিনের সৃষ্টি। এইকথা সর্বঅঙ্গে সত্য নহে। কারণ মার্কসের চিন্তার যে ব্যাপ্তি, যে সামাজিক মালিকানা বা পুঁজির কথা বলা হইয়াছে, তাহা এই বহিতে নাই। ইহা এক ধরনের উপর চালাকি। কথায় কহে- চকচক করিলে সোনা হয় না। সোনা হতে হইলে বস্তুগত ও ভাবগত গুণাগুণ প্রয়োজন। তদুপরি আল মাহমুদের রাজনৈতিক সুবিধাবাদই ইহার উদাহরণ।
আমি-তুমির রাজনীতি এই তিরিশের আধুনিকতারই অবয়ী রূপ। কেননা পুঁজিবাদী সমাজকাঠামো তথাকথিত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বিকাশমান ধারার চালচুলা ইহার ভিতরে বিদ্যমান। সা¤প্রতিক কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের মতো তরল কথাবার্তা অনেকেই বলিয়াছেন। তাহা এখন দোকানীর দরশন। আর কবিতা তো জাহাজ নহে যে চরে আটকা পড়িবে। সা¤প্রতিক কবিতার আকার সম্পর্কে আল মাহমুদের যে বক্তব্য তাহাতে মনে হয় তাঁহার পাঠের ঘাটতি রহিয়াছে। সেই কারণেই তিনি মনে করিতেছেন আট লাইনের কবিতা খারাপ। থাই-সনেটও তো আট লাইনে লেখা হয়। এইরকম স্থুল বিচার আসলেই সাহিত্য সমালোচনার কোনো সত্য হাজির করে না। হালের কবিতার আঙ্গিক নিয়া তিনি কিছু প্রশ্ন তুলিয়াছেন। যাহা তাঁহার অজানা। হালের কবিতার পাঠ থাকিলে তিনি ইহা বলিতে পারেন না। চিন্তার ফসল হইল ভাব বা ভাষা। চিন্তার যখন বিকাশ ঘটে তখন ভাষা আপন আঙ্গিকেই দাঁড়াইয়া যায়। দাঁড়ানো মানে দাঁড়ানোই, শোয়া নহে। সমাজের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দেয়া। কেননা মানুষ ভাব বা ভাষা দিয়া সমাজকে বদলাইতে পারে। আঙ্গিক হইতেছে ভাষার পরিবর্তন। চিন্তার পরিবর্তনের ফলে তাহা ভাষায় প্রতিফলিত হয়।
আল মাহমুদের কবিতায় নতুনত্ব কী আছে? তিরিশি আধুনিকতা বাদ দিলে আল মাহমুদের কবিতায় আর কী থাকে, তাহা তিনিই ভালো বলিতে পারিবেন। তাঁহার কবিতায় গ্রাম ও শহর দুই-ই আছে। একদম ঠিক কথা। একটা সমাজে বসবাস করিলে তাহার যদি গ্রাম থাকে, শহরও থাকিবে। কিন্তু প্রশ্ন হইতেছে, গ্রাম শহরকে গ্রাস করে কি-না, কিংবা শহর গ্রামকে গ্রাস করে কি-না? গোলকায়নের যুগে গ্রাম শহরে যায় না, শহর গ্রামে গিয়া হাজির হয়। এই উপলব্ধি হয়তো আল মাহমুদের নজর এড়াইয়া গেছে। ফলে তিনি লোকবলের গমনাগমন দিয়া আরবানিটির বিচার করিয়াছেন। ইহা বড় মুশকিল বটে।
শেষনাগাদ কহিব- কবি আল মাহমুদকে পরিচয় করাইয়া দিবার কিছু নাই। এই তর্ক তোলার উদ্দেশ্য- একজন কবিকে খাটো করার জন্য নহে। এক অগ্রজ কবির ভাবনারে নতুন ভাব দিয়া দেখা। কেননা ঔপনিবেশিক শাসনচক্রের ফল তথাকথিত আধুনিক বিচার আমরা কম দেখি নাই। মতা ও ভাষার অবয়ও দেখিয়াছি বিস্তর। তাইলে মীমাংসা কোন পথে? সাফ সাফ কথা- মানসিক মুক্তি ঘটিলে ভাষার মুক্তি ঘটিবে। কালো হরফ কালোই থাকিবে। সাদা চিন্তার আধুনিক বরফ গলিয়া গলিয়া পড়িবে একদিন না একদিন।


[নব্বইয়ের তিন কবির প্রতিক্রিয়া গ্রন্থনে সফেদ ফরাজী]






]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28814999 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28814999 2008-06-29 16:54:21
বাঁক অবিশ্বাসের দিকে বেঁকে গেছে যত সুর, তরঙ্গনিশান- !
রিক্ত ইশারা, তীরের-বেশে গুপ্ত ইতিহাসের পাতায়
এঁকে যায় তারই ছাপচিত্র কিছু-

যাকে তোমরা প্রেম বলো; ছদ্মবেশী পৃথিবীতে দ্বিধাহীন
কী করে যে পাবে তাকে, করুণামিশ্রিত সরাইখানার গলিতে
যখন নিজের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে নিজেরই ছায়া
আশ্চর্য সব খরস্রোতা মুখোশের উৎসবে, দীপ হয়ে
সুরা হয়ে- পানপাত্রে ভাসমান মুখচ্ছবিকে সঙ্গ দিয়ে চুপচাপ
অচেনা কবরফলকের গায়ে মিশে যাওয়া ভোর যেন;

তবু উড়ন্ত বেদনার ঠোঁটে চুমু খেয়ে,
খুব গোপনে বেড়ে উঠছে যে বিশ্বাসের গাছ
তার কাছে কে বেশি ভয়ঙ্কর আজ?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28808570 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28808570 2008-06-11 19:23:21
নিউইর্য়কে আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ২০০৮ জল তাহলে থেমে নেই। গড়িয়েছে অনেক দূর। গড়াতে গড়াতে ছড়িয়েও পড়ছে দিকে দিকে। হ্যাঁ গো হ্যাঁ সত্যি, সত্যি। আজ আর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা কেবল বাংলাদেশ বা পশ্চিমবাংলার সীমারেখার ভেতরই আবদ্ধ থাকছে না। ছড়িয়ে পড়ছে দেশে দেশে। আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে।
নিউইয়র্কে অভিবাসী বাঙালিদের প্রাণকেন্দ্র জ্যাকসন হাইটস-এর রুজভেল্ট এভিনিউ ও ৭৪ স্টিটের কোণায় অবস্থিত ‘মুক্তধারা’ নামে একটি বইয়ের দোকান। যার স্বত্বাধিকারী বিশ্বজিৎ সাহা। হ্যাঁ, বাংলাদেশের ‘মুক্তধারা’র স্বত্বাধিকারী সদ্য প্রয়াত চিত্তরঞ্জন সাহার নিকটাত্মীয় সে, মানে সম্পর্কে ভাগিনা। তার প্রচেষ্টায়ই নিউইয়র্কে প্রথম বাংলা বইয়ের দোকান ‘মুক্তধারা’ প্রতিষ্ঠা, জাতিসংঘের সামনে অস্থায়ী শহীদ মিনার বানিয়ে একুশের প্রথম প্রহরে পুষ্পার্পণ, এবং মুক্তধারার আয়োজনেই বাংলা বইমেলার আয়োজন সম্ভব হয়েছে।
১৯৯২ সালে নিউইয়র্কে একুশে ফেব্র“য়ারি পালনের পরই বাংলা বইমেলা শুরু হয়। যদিও এর আগে বিচ্ছিন্নভাবে একুশে ফেব্র“য়ারি পালন হয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে বৃহৎ কলেবরে এটাই প্রথম। এরপর ১৯৯৩-এ জাতিসংঘের সামনে অস্থায়ী শহীদ মিনার বানিয়ে পুষ্পার্পণের মধ্য দিয়ে একুশের প্রথম প্রহর পালন করে বাঙালির চেতনা মঞ্চ ও মুক্তধারা। এরপর অদ্যাবধি প্রতিবছরই সেটি পালিত হয়ে আসছে।
আগামী ২৭ জুন উদ্বোধন হয়ে ২৮ ও ২৯ জুন পর্যন্ত চলবে নিউইর্য়কে আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ২০০৮। এতে থাকবে সেমিনার, বইমেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাংলা গান-সিনেমার সিডি-ডিভিডি ও বিভিন্ন সাজসরঞ্জামের দোকান এবং প্রিয় লেখকদের সঙ্গে আড্ডার আয়োজন। এবার মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবের উদ্বোধন করবেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ও সুচিত্রা ভট্টাচার্য।
এর আগে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তকে দিয়ে শুরু করে শহীদ কাদরী, ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, পূবরী বসু, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, হুমায়ুন আহমেদ, সৈয়দ মোহাম্মদউল্লাহ, দিলারা হাশেম, ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ড. হুমায়ুন আজাদ, জয় গোস্বামী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, রাবেয়া খাতুন, ড. আব্দুর নূর, আনিসুল হক, গোলাম মুরশিদ, ড. আনিসুজ্জামান, সমরেশ মজুমদার পর্যন্ত সবাই নিউইয়র্ক বইমেলার উদ্বোধন করেছেন।
এই উৎসব নিউইয়র্কের অভিবাসী বাঙালিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যেখানেই যে থাকুক, যত ব্যবস্তায়, এই উৎসবে আসা চাই-ই চাই। কেননা সবার সঙ্গে দেখা হওয়া, প্রিয় বইগুলো সংগ্রহ, প্রিয় লেখকদের সঙ্গে সামনাসামনি আড্ডা দেওয়া, বাংলা গান, সেমিনার শোনার এ যে এক বিরাট সুযোগ। প্রবাসে ভিনভাষী পরিমণ্ডলেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা থেমে নেই জেনে আমাদেরও ভালো লাগে। সাধুবাদ নিউইয়র্কে অবস্থানরত বাঙালিদের প্রতি। সাধুবাদ।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28806861 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28806861 2008-06-06 17:42:05
কবি শহীদ কাদরীর ৫টি নির্বাচিত কবিতা [শহীদ কাদরী সেই বিরলপ্রজ কবি, যিনি দীর্ঘকাল যাবৎ স্বদেশ থেকে দূরে মার্কিন মুলুকে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে রয়েছেন। এ যাবৎ তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সবেমাত্র তিনটি। এগুলো হলো- উত্তরাধিকার (১৯৬৭), তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা (১৯৭৪) এবং কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই (১৯৭৮)। এ তিনটি কাব্যগ্রন্থের বাইরে তাঁর আর কোনো গ্রন্থের সন্ধান এখন পর্যন্ত আমরা পাইনি। দীর্ঘ দীর্ঘদিন যাবত তাঁর কোনো নতুন কবিতাও চোখে পড়েনি। হয়তো তিনি লেখালেখি ছেড়েই দিয়েছেন, নয়তো প্রকাশ করছেন না। কিন্তু তিনটি কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি যে আধুনিক মনন, বিশিষ্ট শিল্পবোধ এবং কাব্যভঙ্গির প্রকাশে যে গভীর জীবনবোধ, অন্তর্গত বিষাদ ও বৈরাগ্যের যোগ ঘটিয়েছেন তা অবশ্যই তাঁকে বাংলা কবিতার ময়দানে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে। স. ফ ]


সঙ্গতি
(অমিয় চক্রবর্তী, শ্রদ্ধাস্পদেষু)

বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা
মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ,
কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা
ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ

প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না...

একাকী পথিক ফিরে যাবে তার ঘরে
শূন্য হাঁড়ির গহ্বরে অবিরত
শাদা ভাত ঠিক উঠবেই ফুটে তারাপুঞ্জের মতো,
পুরোনো গানের বিস্মৃত-কথা ফিরবে তোমার স্বরে

প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না...

ব্যারাকে-ব্যারাকে থামবে কুচকাওয়াজ
ক্ষুধার্ত বাঘ পেয়ে যাবে নীলগাই,
গ্রামান্তরের বাতাস আনবে স্বাদু আওয়াজ
মেয়েলি গানের- তোমরা দু'জন একঘরে পাবে ঠাঁই

প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না...

-(কাব্যগ্রন্থ : কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)



কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না

একটি মাছের অবসান ঘটে চিকন বটিতে,
রাত্রির উঠোনে তার আঁশ জ্যোৎস্নার মতো
হেলায়-ফেলায় পড়ে থাকে
কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না,
কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না;

কবরের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে প্রবেশ করে প্রথম বসন্তের হাওয়া,
মৃতের চোখের কোটরের মধ্যে লাল ঠোঁট নিঃশব্দে ডুবিয়ে বসে আছে
একটা সবুজ টিয়ে,
ফুটপাতে শুয়ে থাকা ন্যাংটো ভিখিরির নাভিমূলে
হীরার কৌটোর মতো টলটল করছে শিশির
এবং পাখির প্রস্রাব;
সরল গ্রাম্যজন খরগোশ শিকার করে নিপুণ ফিরে আসে
পত্নীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে, চুল্লির লাল তাপে
একটি নরম শিশু খরগোশের মাংস দেখে আহ্লাদে লাফায়
সব রাঙা ঘাস স্মৃতির বাইরে পড়ে থাকে
বৃষ্টি ফিরিয়ে আনে তার
প্রথম সহজ রঙ হেলায়-ফেলায়

কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না,
কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না \

-(কাব্যগ্রন্থ : কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)



স্মৃতি : কৈশোরিক

অদৃশ্য ফিতে থেকে ঝুলছে রঙিন বেলুন
রাত্রির নীলাভ আসঙ্গে আর স্বপ্নের ওপর
যেন তার নৌকা- দোলা; সোনার ঘণ্টার ধ্বনি
ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত শহরের! আমি ফিরলাম
ঝর্ণার মতো সেই গ্রীষ্ম দিনগুলোর ভেতর
যেখানে শীৎকার, মত্ততা আর বেলফুলে গাঁথা
জন্মরাত্রির উৎসবের আলো; দীর্ঘ দুপুর ভরে
অপেমান ঘোড়ার ভৌতিক পিঠের মতো রাস্তাগুলো,
গলা পিচে তরল বুদ্বুদে ছলছল নত্ররাজি,
তার ওপর কোমল পায়ের ছাপ, -চলে গেছি
শব্দহীন ঠাকুর মার ঝুলির ভেতর।
দেয়ালে ছায়ার নাচ
সোনালি মাছের। ফিরে দাঁড়ালাম সেই
গাঢ়, লাল মেঝেয়, ভয়-পাওয়া রাত্রিগুলোয়
যেখানে অসতর্ক স্পর্শে গড়িয়ে পড়লো কাঁচের
সচ্ছল আধার, আর সহোদরার কান্নাকে চিরে
শূন্যে, কয়েকটা বর্ণের ঝলক
নিঃশব্দে ফিকে হল; আমি ফিরে দাঁড়ালাম সেই
মুহূর্তটির ওপর, সেই ঠাণ্ডা করুণ মরা মেঝেয় \

-(কাব্যগ্রন্থ : উত্তরাধিকার)



মাংস, মাংস, মাংস...

আমাকে রাঙাতে পারে তেমন গোলাপ
কখনও দেখি না। তবে কাকে, কখন, কোথায়
ধরা দেবো? একমাত্র গোধূলি বেলায়
সবকিছু বীরাঙ্গনার মতন রাঙা হয়ে যায়।
শৈশবও ছিলো না লাল। তবে জানি,
দেখেছিও, ছুরির উজ্জ্বলতা থেকে ঝরে পড়ে বিন্দু বিন্দু লাল ফোঁটা

তবে হাত রাখবো ছুরির বাঁটে? সবুজ সতেজ-
রূপালি রেকাবে রাখা পানের নিপুণ কোনো খিলি নয়,
মাংস, মাংস, মাংস... মাংসের ভেতরে শুধু
দৃঢ়মুখ সার্জনের রূঢ়তম হাতের মতন
খুঁজে নিতে হবে সব জীবনের রাঙা দিনগুলি ...

- (কাব্যগ্রন্থ: তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)



বাংলা কবিতার ধারা

কে যেন চিৎকার করছে প্রাণপণে `গোলাপ! গোলাপ!'
ঠোঁট থেকে গড়িয়ে পড়ছে তার সুমসৃণ লালা,
`প্রেম, প্রেম' বলে এক চশমা-পরা চিকণ যুবক
সাইকেল-রিকশায় চেপে মাঝরাতে ফিরছে বাড়ীতে,
`নীলিমা, নিসর্গ, নারী'- সম্মিলিত মুখের ফেনায়
পরস্পর বদলে নিলো স্থানকাল, দিবস শর্বরী হলো
সফেদ পদ্মের মতো সূর্য উঠলো ফুটে গোধূরির রাঙা হ্রদে
এবং স্বপ্নের অভ্যন্তরে কবিদের নিঃসঙ্গ করুণ গণ্ডদেশে
মহিলার মতো ছদ্মবেশে জাঁদরেল নপুংসক এক
ছুড়ে মারলো সুতীক্ষ্ণ চুম্বন।

- (কাব্যগ্রন্থ: তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28804237 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28804237 2008-05-29 17:45:58
কবি মাসুদ খান: আপনাকে শুভেচ্ছা
জন্মদিনে আমরা সবাই তাঁকে শুভেচ্ছা পাঠাচ্ছি সুদূর কানাডায়।

`দূরে তার দেশ কাঁপা কাঁপা রূপকাহিনীর মতো কাঁপে
আমার বন্ধু নদীর কিনারে থাকে..........................'


মাসুদ ভাই, যেখানেই থাকেন, ভালো থাকবেন।

আপনার কাছ থেকে বাংলা কবিতা অনেক কিছু আশা করে।

ভালো থাকবেন, ভালো লিখবেন, এই প্রত্যাশায়-

শুভেচ্ছা............................শুভেচ্ছা.................ভালোবাসা...........ভালোবাসা..................ভালোবাসা.....................ভালোবাসা........................ভালোবাসা...............ভা.......................লো....


-সফেদ ফরাজী]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28804217 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28804217 2008-05-29 17:16:58
`কবিদের ক্রিকেট' ম্যাচের ছবিসেশন-২
গত ২ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠে `কবিদের ক্রিকেট' নামে একটি প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এক টিমের নাম কাহ্নপা, অন্যপক্ষের নাম লুইপা রাখা হয়েছিল। এই ছবিটি লুইপা দলের।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28803448 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28803448 2008-05-27 18:18:25
`কবিদের ক্রিকেট' ম্যাচের ফটোসেশন
গত ২ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠে `কবিদের ক্রিকেট' নামে একটি প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এক টিমের নাম কাহ্নপা, অন্যপক্ষের নাম লুইপা রাখা হয়েছিল। এই ছবিটি কাহ্নপা দলের।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28803444 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28803444 2008-05-27 18:09:27
বৃত্তবন্দি নজরুল ও কিছু প্রশ্ন কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে কিছু লেখার আগে যে সত্য কথাটি বলে নেওয়া প্রয়োজন, তা হলো- ব্যক্তিগতভাবে আমি যে ধরনের কবিতা পড়ে আনন্দ পাই বা ঋদ্ধ হই, নজরুল সে ধারার মধ্যে পড়েন না। তাই বলে যে এই কবির প্রতিভাকে খাটো করে দেখতে হবে বা প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করতে হবে, তা কিন্তু নয়। কেননা বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম যে বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে বর্তমান আছেন, তা ম্লান হতে আরও অনেকদিন লাগবে বলেই মনে হয়। বাঙালি মধ্যবিত্ত, আরও স্পষ্ট করে বললে মধ্যবিত্ত মুসলমানের কাছে কাজী নজরুলের যে আসন, তা অনেক দৃঢ় ও বস্তৃত। এর কারণ অবশ্য অনেকটাই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির ফল। সাম্প্রদায়িকতার বিচারেই একদা তাঁকে `জাতীয় কবি' হিসেবে স্বীকৃত দেওয়া হয় এবং এখনো তা বর্তমান।
তখনকার পাকিস্তানি কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিরা একজন `জাতীয় কবি'র প্রয়োজন অনুভব করছিলেন। ফলশ্রুতিতে তারা ইকবালকে `জাতীয় কবি' করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা সফল হয়নি। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষরা ইকবালকে জাতীয় কবি বলে গ্রহণ করছিল না। কেননা তাদের মাতৃভাষা বাংলা এবং ভাষার প্রতি আছে সীমাহীন অহংকার। ফলে বাংলাভাষী মুসলমানদের খাঁটি মুসলমান ও খাঁটি পাকিস্তানি বানানোর জন্য খোঁজ পড়ল একজন মুসলমান বাঙালি কবির। তখন পাওয়া গেল কাজী নজরুল ইসলামকে। নজরুল মুসলমান, এবং তাঁর লেখায় ইসলাম ও মুসলমানকে নিয়ে অনেক গান ও কবিতা আছে; কিন্তু সে সঙ্গে তিনি পৌত্তলিক হিন্দুদের দেবদেবী নিয়েও প্রচুর কবিতা ও গান লিখেছেন, আরবি-ফারসি শব্দের পাশাপাশি যে তাঁর লেখায় ব্যবহার করেছেন প্রচুর সংস্কৃত শব্দ, দ্বিজাতিতত্ত্বকে স্বীকার করার বদলে হিন্দু ও মুসলমানকে যে তিনি একই বৃন্তের দুটি কুসুম রূপে দেখেছেন- এসব বিষয় তো খুবই বিব্রতকর। এরকম বিব্রতকর অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য পাকিস্তানবাদের রক্ষাকারীরা নজরুলের লেখা থেকে হিন্দুয়ানি উপাদান বাদ দিয়ে, সংস্কৃত শব্দ ছাঁটাই করে তাকে মুসলমানিকরণের যে প্রচেষ্টা নিয়েছিল তা হাস্যকর ঠেকে। এরপর পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হলেও কিন্তু নজরুলকে ছাড়া হয়নি। তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশী জাতীয় কবি। অথচ নজরুল নিছকই বাংলা ও বাঙালির কবি হয়ে থাকতে চাননি। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নজরুল ঘোষণা করেছিলেন, `আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। সুন্দরের ধ্যান, তার স্তবগানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম। যে কুলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই আমি জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি।'
জাতীয় কবি, মুসলমানের কবি বা হিন্দুর কবি, বিদ্রোহী কবি, নবজাগরণের কবি, সর্বহারার কবি, সাম্যবাদের কবি- এমন বহু উপাধিতে নজরুলকে বৃত্তবন্দি করার যে প্রবণতা তা যেমন হাস্যকর, তেমনি ভীতিপ্রদ। কেননা নজরুলকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই হোক আর ব্যক্তি কিংবা সমষ্টিগতভাবেই হোক বৃত্তবন্দিকরণের পেছনে যে অভিপ্রায় লুকিয়ে থাকে, তাতে কায়েমী কোনো স্বার্থসিদ্ধির যোগ থেকে যায়। একজন প্রকৃত কবি এই বৃত্তবন্দির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বোধ করি মনে-প্রাণে আমৃত্যু চেষ্টা করে যান।

২.
নজরুল যে অসাধারণ সৃজন-প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তা অনস্বীকার্য। তিনি তাৎণিক যে কোনো বিষয়ে কলম ধরতে পারতেন। বলা যায়, নজরুলের কবিতার জগতটি হলো তাৎণিক অনুভূত, অস্থিরতার জগৎ, কোলাহলের জগৎ। কবিতার যে নৈঃশব্দ্যের জগৎ নির্মাণে আধুনিক কবিরা কাজ করেন, নজরুল সেই পথে বেশিদূর যাননি। নজরুলের কাব্যজগতটি বেশিরভাগই দৃশ্যমান, অপ্রকাশের ভার বেশি বইতে যেন তিনি নারাজ। তাই তিনি কবিতায় প্রায়শ রাগী-বিপ্লবী বাক্যবর্ষণ করেছেন; আবার অন্তর বেদনায় ব্যথাতুর কিছু মিহি মসৃণ বাক্যও রচনা করেছেন। নজরুলের রচনার কিছু সমস্যা বুদ্ধদেব বসু চিহ্নিত করেছেন এভাবে- `অদম্য স্বতঃস্ফূর্ততা নজরুলের রচনার প্রধান গুণ- এবং প্রধান দোষ। যা কিছু তিনি লিখেছেন, লিখেছেন দ্রুতবেগে; ভাবতে, বুঝতে, সংশোধন করতে থামেননি, কোথায় থামতে হবে দিশে পাননি। ...এ ক্ষমতা চমকপ্রদ, কিন্তু নির্ভরযোগ্য নয়।' (কালের পুতুল)।
নজরুলের কবিতার চেয়ে তাঁর গানগুলোর আবেদন ও শক্তিমত্তা অনেক বেশিই বলে সবাই স্বীকার করেন। নজরুল প্রতিভার এক বিশিষ্ট প্রকাশ তাঁর গানেই। গানগুলোতে নজরুল যেন অনেক বেশি সংবেদনশীল, পরিমিতিবোধ সম্পন্ন। এ বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর অভিমত- `নজরুলের সমস্ত গানের মধ্যে যেগুলো ভালো সেগুলো সযত্নে বাছাই করে নিয়ে একটি বই বের করলে সেটাই হবে নজরুল প্রতিভার শ্রেষ্ঠ পরিচয়, সেখানে আমরা যাঁর দেখা পাবো তিনি সত্যিকার কবি, তাঁর মন সংবেদনশীল আবেগপূর্ণ, উদ্দীপনাপূর্ণ। `বিদ্রোহী কবি', `সাম্যবাদী কবি', কিংবা `সর্বহারার কবি' হিসেবে মহাকাল তাকে মনে রাখবে কিনা জানি না, কিন্তু কালের কণ্ঠে গানের মালা তিনি পরিয়েছেন, সে-মালা ছোট কিন্তু অক্ষয়।' (কালের পুতুল)।
কাজী নজরুল ইসলামের অধিকাংশ কবিতা সময়ের প্রয়োজনে রচিত। শাশ্বতকালের পথে কতদূর তা যেতে পারবে? ব্যক্তি মানুষের যে নীরব মনোজগৎ, যেখানে ব্যক্তিমন একা হতে চায়, সেইখানে নজরুলের কবিতা ঠিক কতটুকু পৌঁছতে পারে? জীবনানন্দ দাশ কিংবা তার পরবর্তী কবিদের সঙ্গে মহাকালের প্রেক্ষিতে নজরুলের কবিতা কতদূর টিকে থাকতে পারবে? আবার গণজাগরণ, গণআন্দোলন-গণসংগ্রাম বা ব্যক্তিজীবনের উদ্দাম-উদ্দীপনাময় পরিস্থিতির প্রয়োজনে নজরুলের কবিতার যে অগ্রণী ভূমিকার কথা আমরা শুনে শুনে এতদূর এসেছি, আর কতদিন তা আবেদন রাখতে পারবে? -এসব প্রশ্নও ভাবনার বিষয়।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28802628 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28802628 2008-05-25 17:21:25
হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর গল্প
আমি চোখ মুদি আর দেখতে পাই পাখির একটা ঝাঁক। দৃশ্যটা থাকে এক মুহূর্ত কিংবা তারও কম। আমি জানিই না যে-কতগুলো পাখি আমি দেখেছিলাম। তারা কি ছিল কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যায়, না কি অনির্দিষ্ট? সমস্যাটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রশ্নটা। ঈশ্বর যদি থেকে থাকেন, তাহলে এই সংখ্যা নিশ্চয়ই সুনির্দিষ্ট, কারণ আমি কতগুলো পাখি দেখেছি তা ঈশ্বরের জানা। ঈশ্বর যদি না-থেকে থাকেন, তবে ওই সংখ্যা অনির্দিষ্ট, কারণ কেউ তাদের গুণতে পারেনি। এই মামলাটাই ধরা যাক, দশটির চেয়ে কম পাখি আমি দেখেছিলাম (ধরে নেয়া যাক), আর একটির চাইতে বেশি; কিন্তু আমি তো দেখিনি নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন অথবা দুটি পাখি। আমি শুধু দেখেছি এক থেকে দশের মধ্যে কোনো-একটি সংখ্যা। কিন্তু সে নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ ইত্যাদি নয়। সেই সংখ্যা, একটি পূর্ণরাশি হিশেবে, ধারণার অগোচর; অর্থাৎ প্রমাণিত হলো, ঈশ্বর আছেন।

অনুবাদ: মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28799415 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28799415 2008-05-18 17:16:02
মা : শুভেচ্ছা
মা দিবসে আমার মাসহ সকল মায়ের প্রতি শুভেচ্ছা, ভালোবাসা....]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28796603 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28796603 2008-05-11 16:44:17
`আমারেও ডাকেনি কি কেউ এসে জ্যোৎস্নায়' `সারারাত দখিনা বাতাসে
আকাশের চাঁদের আলোয়
এক ঘাইহরিণীর ডাক শুনি-
কাহারে সে ডাকে!
...............................
কোথাও অনেক বনে- যেইখানে জ্যোৎস্না নাই আর
পুরুষ-হরিণ সব শুনিতেছে শব্দ তার;
.................................................
জীবনের কোনো এক বিস্ময়ের রাতে
আমারেও ডাকেনি কি কেউ এসে জ্যোৎস্নায়- দখিনা বাতাসে
ওই ঘাইহরিণীর মতো?
................................................
বসন্তের জ্যোৎস্নায় ওই মৃত মৃগদের মতো
আমরা সবাই।'
(ক্যাম্পে : জীবনানন্দ দাশ)

ক্যাম্পে কবিতাটি যতবারই পড়ি, সমূহ প্রশ্ন ডানা মেলে উড়তে থাকে চিন্তার আকাশে-বাতাসে। চাঁদের আলোয় এক ঘাইহরিণীর ডাক- কাহারে সে ডাকে? কেন ডাকে? নিজে ঘাই হয়ে (শিকারকে ফাঁদে ফেলার জন্য সজাতীয়ের ঘাই বা টোপ দেওয়া হয়) শিকারীর জালে অন্যকেও বন্দি করাতেই কি ঘাইহরিণীর এত ডাকাডাকি- কোন সে শিকারী- সে কি নিষ্ঠুর- সে কি উন্মাদ প্রেমিক-হন্তারক- না চাঁদের আলোয় জ্যোৎস্নায় চঞ্চল হরিণী-মন প্রেমিকের প্রেমাস্পদের সান্নিধ্য লাভে ব্যাকুল হয়ে ওঠে? না এই ডাকাডাকির মাঝে লুকিয়ে আছে কোনো ছলনা, মিথ্যাচার? এ যজ্ঞে কে তবে দায়ী? ঘাইহরিণী, না জ্যোৎস্না-দখিনা বাতাস-চঞ্চলমন, নাকি ওই শিকারী, সমাজযন্ত্র?
আবার দেখা যায়, কোথাও অনেক বনে- যেখানে জ্যোৎস্না নেই, ওইখান থেকে পুরুষ-হরিণ তার কাঙ্ক্ষিত ঘাইহরিণের ডাক শুনছে। এবং ছুটে যাচ্ছে তার দিকে! মানে ওই জ্যোৎস্নাস্নাত ঘাইহরিণীর দিকে। তাহলে যেখানে জ্যোৎস্না নেই, সেইখানেই কি পুরুষ-হরিণেরা থাকে? পুরুষ-হরিণদের জন্য কি কোনো ব্যক্তিগত জ্যোৎস্না নেই? জ্যোৎস্নার মায়াময় বিভ্রম ও ছলনা শুধু! তবু কেন জ্যোৎস্নায় লালসা- আকাঙ্ক্ষা-সাধ-প্রেম স্বপ্ন স্ফুট হয়ে ওঠে?
অন্যত্র দেখি, কবিকেও ডেকেছিল কেউ এমনিভাবেই, ওই ঘাইহরিণীর মতো, জ্যোৎস্নায়- দখিনা বাতাসে। যে ডেকেছিল, সে কে? কেনই-বা ঘাইহরিণীর মতো? সত্যিই কি তেমন কোনো নারী ডেকেছিল তাঁকে, গোপনে বসন্তরাত্রিতে জ্যোৎস্নায় প্রেমের উৎসবে? আর কবিও চিতার চোখের ভয়- চমকের কথা সব পিছে ফেলে ধরা দিতে চেয়েছিলেন, সেই ঘাইহরিণীর মতো কেউ একজনকে। হয়তো ধরা দিতে পারেননি তিনি। তাই বুকের প্রেম মৃত মৃগদের মতো ধুলোয় রক্তে মিশে গেছে। প্রেমের সাহস- সাধ-স্বপ্ন নিয়ে ব্যথা, ঘৃণা-মৃত্যু পেয়ে তবু কবি বেঁচে থাকেন মৃত মৃগদের মতো।
এখানে `ঘাইহরিণী' রূপকের আড়ালে লুকিয়ে আছে কি জীবনের কোনো এক গূঢ় বিস্ময় জড়ানো ক্ষত, যে ক্ষতের কোনো সেবা হয় না, শুশ্রূষা হয় না, কেবলি বয়ে বেড়ানো ছাড়া। কবিকে সেই কেউ একজন ডেকেছিল জীবনের কোনো এক `বিস্ময়ের রাতে'। তা-ও আবার জ্যোৎস্নায়! জ্যোৎস্নায় কি তবে বিস্ময়? জীবনে কি বিস্ময় অপরিহার্য? কোনো এক ক্ষত? যে ক্ষতের যে বিস্ময়ের ঘোরে কবি ঘাইহরিণীর ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে মৃত মৃগীদের যন্ত্রণার মাঝে নিজের অন্তর্বেদনাকে প্রকাশিত হতে দেখেছেন।
প্রতিটি জীবনেই কি তবে এরকম বিস্ময়ের রাত আসে? আর ওই রাতে ঘাইহরিণীর মতো কেউ একজন ডেকে যায়- জ্যোৎস্নায়- দখিনা বাতাসে। কেন সে ডাকে? জ্যোৎস্নায়ই বা কেন? তার কাছে ধরা দিতে চাইলেই কি ধরা দেওয়া যায়? না তার কাছে গেলে আর তাকে পাওয়া হয় না, বন্দি হয়ে পড়তে হয় অন্য কোনো এক শিকারীর জালে। যে শিকারের জাল ছেড়ে আর বের হওয়া যায় না কোনোদিনই।
তবু নিরন্তর এই যে ডাকাডাকি, ইশারা-সংকেত, এই যে কারো কাছে গিয়ে ধরা দিতে চাওয়ার বাসনা, না পাওয়ার বেদনা- এই নিয়েই তো চলছে জগত-সংসার, মানুষের জীবন- ওই মৃত মৃগদের মতো! তারপরও জ্যোৎস্না এলেই প্রেমমন উত্তাল হয়ে ওঠে, সমস্ত ডরভয় পেছনে ফেলে ছুটে যায় ঘরবাহিরে, বনে, কাঙ্ক্ষিত কারো সান্নিধ্য লাভের আশায়। হয়তো কেউ পায় তাকে, কেউ পায় না। যে পায় না, যার পাওয়া হয়ে ওঠে না, হয়তো তার মনঘরেই চুপিসারে ঢুকে যায় কোনো এক বিস্ময়, বিমূর্ত ও আশ্চর্য ক্ষত। যাকে তাড়ানো যায় না কখনো। কেননা সেই ক্ষতটিকে আমরা নিজের অজান্তেই মৃত মায়ের মুখের মতো আগলে রাখি সারাজীবন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28776965 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28776965 2008-03-06 17:49:20
বেদনা মন্দিরের দিকে বড়জোর একটা দীর্ঘশ্বাস, একা একা ঘুরে ফিরে
নিজের ছায়ার কাছে নিজেই হাস্যস্পদ হয়ে ওঠে

করুণাঘেরা দেবমন্দিরের ভেতর এত এত মিথ্যাচার
এত এত ভ্রম ও অহং নিয়ে চলছে জগতযন্ত্র
আর একটা নীল বোবাঘড়ি, সময়সংকেতহীন;
যেন জড়িয়ে দিচ্ছে সাপলুডো-জাল

পথে-প্রান্তরে, চিন্তার ডালে ডালে
কত কত চোখ, কত কোলাহল, কত স্তব্ধতা
কে জানে, কে আসলে কোলাহল, কে যে স্তব্ধতা ?
কার ভেতর যে উড়ছে
একটা কাল সাপের ফণা,
পাশাপাশি একটা উন্মাদের হাসি
রক্তাক্ত অথচ উজ্জ্বল
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28763826 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28763826 2008-01-24 15:51:18
উন্মাদ পিয়ানোর কম্পন কেন যে অদৃশ্য ডানা নিয়ে তবু উড়ে আসে উন্মাদ গান
ঘুমের দেশ হতে নবজাগ্রত ডালিম ফুলের মতো
সংকেতময়, আততায়ীর নিঃশব্দ চোখ, যেন
আরও হিম করে দেয় ঘুমহীন রাত্রির বাতাস !

রক্তের ভেতর রৌদ্রের বীজাণু অহর্নিশ কেঁদে চলে
স্তব্ধতার মন্দিরের দিকে

আজন্মকাল, হলুদ জ্যোৎস্না ভেবে ঝরাপাতার প্রার্থনা
কুয়াশার রাক্ষুসী দাঁতের নিচে-- আঘাতে আঘাতে
খসে পড়ছে কেবলি ক্ষুধা ও কামনাকাতর ডানা...

২.
গাছ বড় হলে ছোট হয়ে যায় পথ-- মাটির তলায়
লুকোনো মার্বেল পাথরের মতো তার দীর্ঘশ্বাসগুলো
বাতাসে ভেসে ভেসে কোনো এক স্তব্ধ জানালার পাশে
শব্দহীন, ঝরে-- কিছু পাতা-- কিছু গান
ভেসে যায় কেবল আরও দূরে অন্য এক গানের খোঁজে...

৩.
আমাকে অন্ধ করে কোথায় চলে যায় সে।
রৌদ্র, ঝিল্লীর থেকে সারি সারি চিতাগ্নি এসে
চোখ পুড়ে যায় শুধু; উজ্জীবিত ডানায়
যতো নিরর কোলাহল, পিছু ফেলে
ভীত সিংহের চিন্তার ভেতর বসে থাকি।
এখানে অগ্নিচু দানবের মতো সমস্ত পাড়া কাঁপিয়ে
রক্তয়ী বার্তা আসে কেবলি রক্তয়;

কোথাও অকস্মাৎ উড়ে যায় সবুজ বসন্ত
আর আমি ছিন্ন পালকের ফাঁদে আটকা পড়ে যাই।

মরজীবনের পাতা ছেড়ে কোনো একদিন
অবিনাশী আয়নার ভেতর দিয়ে উড়াল দেবো আমিও!
৪.
উন্মাদ পিয়ানোর মতো তুমি বেজে ওঠেছিলে
মৃদু কম্পনে, যতো পথ জেগেছিল পথের বিপরীতে
আমি তাদের গোধূলির সাথে চলে যেতে দেখেছি একদা

মৃত লণ্ঠনের নিচে যে পথে ঝরে পড়ে রিক্ত হলাহল
গোপন উল্কি, ডানাভাঙা পোকাদের গান
এখন সেইপথে নিষ্কাশিত হচ্ছে আমার কঙ্কাল...


৫.
যেনো কোথাও বর্শিতে ঝুলে আছে মৎস্যপ্রাণ
শাদা, পালকের আড়ালে কিছু ঢেউ
কিছু উন্মাতাল পথের চোখ নড়বড়ে বিশ্বাসের মতো
দোল খায়, প্রাচীন ঘণ্টাধ্বনির দিকে

নিভৃতে টুপটাপ ঝরে পড়ে কালের দীর্ঘশ্বাস--
মৃদুমন্দ টের পাই, অর্ধেক জীবন নিয়ে
যখন সবুজ সুতো চলে যায় দূরের নগরে
হাড়ের ভেতর সেই বর্শি বিষটান দিয়ে চলে...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28757729 http://www.somewhereinblog.net/blog/safedblog/28757729 2008-01-07 22:52:20