পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা মুসলমানদের জন্য আত্মহত্যা'মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
১১ ই মে, ২০১০ বিকাল ৪:২২
প্রশ্ন : হিন্দু-মুসলমানের এই বিভেদ ও ঝগড়া এখন এমন তুঙ্গে উঠেছে, তাতে কি মনে হয় না একটা সমঝোতায় পেঁৗছানো একেবারে অসম্ভব! আপনি কি মনে করেন না, অবস্থা এখন এরকম যে পাকিস্তানের জন্ম একেবারে অবশ্যম্ভাবী?
উত্তর: যদি পাকিস্তান সৃষ্টি হিন্দু-মুসলমানের সমস্যার সমাধান হতো তবে আমি তা নিশ্চয়ই সমর্থন করতাম। হিন্দুদেরও একটা অংশ এটা এখন সমর্থন করছে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও অর্ধেক পাঞ্জাব একদিকে, অন্যদিকে অর্ধেক বাংলা যদি চলে যায় তবুও যে বিরাট ভারতভূমি থাকবে তার ওপর আর সাম্প্রদায়িক দাবিদাওয়া থাকবে না। আমরা যদি মুসলিম লীগের কথায় আসি, তাহলে তাদের ভাষায় এই নতুন ভারতবর্ষ হবে প্রকৃতপক্ষে একটি হিন্দু রাষ্ট্র। এটা অবশ্য কোনো স্থিরমনস্ক সিদ্ধান্ত নয়। এটা হবে একটা সামাজিক বাস্তবতার তার্কিক সিদ্ধান্ত। যে দেশে শতকরা ৯০ ভাগ লোক হিন্দু ও যারা আবহমানকাল থেকে নিজেদের নীতি ও আত্দিক বৈশিষ্ট্যে লালিত পালিত, তারা নতুন কোনো পরিবেশ স্বীকার করবে না। যেসব কারণ ভারতের মাটিতে ইসলামের ভিত্তিমূল স্থাপন করেছিল, তা এখন দেশভাগের এই রাজনীতিতে একেবারে অকেজো হয়ে পড়েছে। সাম্প্রদায়িক ঘৃণা এমন আকার ধারণ করেছে যে ইসলাম ধর্ম প্রচার একেবারেই অসম্ভব। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ধর্মকে এক বিরাট আঘাত করেছে। মুসলমানরা কোরআন থেকে বিচ্যুত হয় গেছে। মুসলমানরা যদি কোরআন ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী থেকে শিক্ষা নিত ও ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি তার সঙ্গে সংমিশ্রণ না করত, তবে ইসলাম প্রচারের গতি ব্যাহত হতো না। মোগল সাম্রাজ্যের শেষের দিকে মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ২২ দশমিক ৫ মিলিয়ন বা সোয়া দুই কোটি, যা কিনা এখনকার সংখ্যার অনুপাতে প্রায় ৬৫ শতাংশ। তার পর থেকে মুসলমান জনসংখ্যা বেড়েই চলেছিল। যদি মুসলমান রাজনীতিবিদরা অভদ্র ভাষায় গালাগাল না করতেন (হিন্দুদের প্রতি) ও একশ্রেণীর মানুষ, যারা ব্রিটিশদের তাঁবেদার ছিল, তারা যদি এ দুই ধর্মের বিভেদকে আরো বড় করে না দিত তবে আজ ইসলামের শক্তি আরো বৃদ্ধি পেত।
ইসলামকে আমরা রাজনৈতিক বিভেদ ও ঝগড়ায় প্রাধান্য দিয়েছি অথচ ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নীতিবোধ জাগ্রত করে মানব আত্দার পরিবর্তন। ব্রিটিশ আমলে আমরা ইসলামকে এক নির্দিষ্ট পরিধিতে আবদ্ধ করে রেখেছিলাম ও অন্যান্য ধর্ম যথা_ইহুদি, পার্সি ও হিন্দুদের মতোই আচরণ করতাম। ভারতীয় মুসলমানরা ইসলামকে এক জায়গাতেই থামিয়ে রেখে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে গেল। কতগুলো শাখা অবশ্য ব্রিটিশদেরই সৃষ্টি। ফলে এসব শাখার কোনো গতি বা ইসলামিক মূল্যবোধ রইল না। ইসলামের মূলমন্ত্র ক্রমাগত কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের সমুন্নত রাখা। এটা এখন তাদের কাছে এক অপরিচিত বিষয়। অবশ্যই তারা মুসলমান তবে নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো। রাজনৈতিক শক্তির কাছেই ওরা মাথানত করেছে, ইসলামের মূল্যবোধের কাছে নয়। ওরা রাজনীতির ধর্মকে কোরআনের ধর্মের চেয়ে বেশি মূল্য দেয়। পাকিস্তান হচ্ছে একটা মতাদর্শ। এটা ভারতীয় মুসলমানদের সমস্যা উত্তরণের উপায় কি না সেটা তর্কসাপেক্ষ, তবে পাকিস্তান দাবি করা হচ্ছে ইসলামের নামে। ইসলামে কোথাও লেখা নেই, ইসলামবিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে দেশ ভাগ করে ফেলতে হবে। কোরআন বা হাদিসে এ ধরনের নির্দেশ আছে কি? এমন কোনো ইসলামী পণ্ডিত আছেন কি, যিনি স্রষ্টার এই বিরাট পৃথিবী উপরোক্ত কারণে ভাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন? এই মতাদর্শে আমরা যদি দেশ ভাগ করি তবে ইসলাম যে একটি সার্বজনীন ধর্ম তার ভিত্তি কোথায় রইল? ভারতসহ অমুসলমান দেশে এই ক্রমবর্ধমান মুসলমান জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আমরা কী ব্যাখ্যা দেব?
ধর্মের পরিপ্রেক্ষিতে দেশভাগ মুসলিম লীগের এক অদ্ভুত চিন্তা। ওরা এটাকে এক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্তর্গত করতে পারে, তবে কোরাআন বা ইসলামে এর কোনো বিধান বা নির্দেশ নেই। একজন ধার্মিক মুসলমানের আসল লক্ষ্য কী হওয়া উচিত? ইসলামের আলোকে ছড়িয়ে দেওয়া, না নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে দেশ বিভক্ত করা? এই পাকিস্তান দাবি মুসলমানদের কোনো উপকারেই আসবে না। পাকিস্তান সৃষ্টি হলে মুসলমানদের কী উপকার হবে_এ প্রশ্ন এখনো তর্কসাপেক্ষ; তবে এটা নির্ভর করবে কী ধরনের নেতৃত্ব দেশ শাসন করবে তার ওপর। পশ্চিমা চিন্তাধারা ও দর্শন এই সংকটকালকে আরো সংকটময় করে তুলবে। মুসলিম লীগ এখন যে পথে চলছে তাতে আমার স্থির বিশ্বাস যে একদিন পাকিস্তান ও ভারতীয় মুসলমানদের কাছে ইসলাম একটি দুষ্প্রাপ্য বস্তু হয়ে দাঁড়াবে। এটা সংক্ষেপে বললাম, তবে স্রষ্টাই জানেন ভবিষ্যতের গর্ভে কী নিহিত আছে। পাকিস্তান যখনই সৃষ্টি হবে, তখন থেকে শুরু হবে ধর্মীয় সংঘাত। যতদূর আমি দেখতে পাচ্ছি, যাদের হাতে ক্ষমতার লাগামটা থাকবে, তারাই ইসলামের সমূহ ক্ষতি করবে। তাদের যথেচ্ছাচারের জন্য পাকিস্তানের যুব সম্প্রদায় ওদের থেকে একেবারে আলাদা হয়ে যেকোনো আন্দোলনে নেমে পড়তে পারে, যা মোটেই ধর্মভিত্তিক হবে না। আজকাল দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো প্রদেশে যেখানে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, সেখানকার মুসলিম যুবসম্প্রদায় তুলনামুলকভাবে মুসলিম সংখ্যাগুরু প্রদেশের যুবসম্প্রদায় থেকে অধিকতর ধর্মভাবাপন্ন। আপনি দেখবেন, আলেমদের বর্ধিত প্রভাবেও পাকিস্তান ধর্মের ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলবে।
প্রশ্ন: কিন্তু আলেমরা কায়েদে আজমের (এমএ জিন্নাহ) সঙ্গে ছিলেন।
উত্তর: সম্রাট আকবরের সঙ্গেও অনেক আলেম ছিল। ওরা একটা নতুন ধর্মও আবিষ্কার করল। ব্যক্তিগত কারো সম্পর্কে আলোচনা না-ই বা করলাম। আমাদের ইতিহাসে আলেমদের কর্মকাণ্ডের খতিয়ান ভরা। সর্বযুগে তারা ইসলামের অপমান ও মর্যাদাহানি করেছে। তবে তাদের মধ্যে দু-চারজন অবশ্য ব্যতিক্রম। এই এক হাজার বছরের মুসলমানের ইতিহাসে কতজন সম্মানিত ব্যক্তির নাম ওরা উচ্চারণ করেছে? ইমাম হাম্বল ও ইবনে তাইমিয়া সম্পর্কে কোনো উচ্চবাচ্য ওরা করেনি। ভারতবর্ষেও আমরা শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও তাঁর পরিবার ছাড়া আর কারো কথা মনে করতে পারি না। উলেমা সানির সৎসাহস সম্পর্কে আমরা অবগত এবং সেই উলেমাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল রাজদরবারের সঙ্গে যুক্ত অন্য উলেমাদের নালিশ ও উসকানির পরিপ্রেক্ষিতে। সে উলেমারা এখন কোথায়? ওদের এখন কি কেউ সম্মান দেখায়?
প্রশ্ন: মাওলানা, বলুন তো যদি পাকিস্তান সৃষ্টি হয় তবে তাতে দোষের কী আছে? ইসলামকে তো ব্যবহার করা হচ্ছে সম্প্রদায়ের ঐক্য রক্ষার কাজে।
উত্তর: যে কাজের বা কারণের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করা হচ্ছে তা ইসলামের মানদণ্ডে মোটেই সঠিক নয়। জামালের যুদ্ধে (হজরত আলী ও হজরত আয়েশার যুদ্ধ) তলোয়ারের আগায় কোরআন ঝুলিয়ে যুদ্ধ করা হয়েছিল। এটা কি ঠিক হয়েছিল? কারবালা যুদ্ধে যারা আমাদের নবীর পরিবারবর্গকে হত্যা করল, সেসব মুসলমানও আমাদের নবীর সঙ্গী বা সাহাবা বলে দাবি করে। এটা কি উচিত বলে মনে হয়? হাজ্জাজ নামে সেনানায়ক ছিলেন, তিনি তো মক্কার পবিত্র মসজিদ আক্রমণ করেছিলেন। এটা কি উচিত বলে গণ্য করা হবে? কোনো পবিত্র বাণী অসৎ চিন্তা বা কর্মকে সঠিকতার নীতির আওতায় আনতে পারে না। যদি পাকিস্তান সৃষ্টি মুসলমানদের জন্য সঠিক হতো তবে আমি অবশ্যই তা সমর্থন করতাম। কিন্তু এই দাবির মধ্যে আমি অন্তর্নিহিত বিপদ দেখতে পাচ্ছি। আমি আশা করি না মানুষ আমাকে সমর্থন করবে, কিন্তু আমিও আমার বিবেকের বিরুদ্ধে যেতে পারি না। মানুষ সাধারণত জোরজবরদস্তি বা অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষার কাছে নতিস্বীকার করে। মুসলমানরা এখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি কথাও শোনার পক্ষপাতী নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত এরা এটা হাতে পায় ও ভোগ করতে পারে। আজকের মুসলমানরা সাদাকে কালো বলতে রাজি আছে, কিন্তু পাকিস্তান দাবি ছাড়বে না। এই দাবি বন্ধ করার উপায় হচ্ছে_হয় ব্রিটিশ সরকারের তা মেনে না নেওয়া অথবা মি. জিন্নাহকে অন্য প্রস্তাবে রাজি করানো। (কংগ্রেস) ওয়ার্কিং কমিটির অন্য সহকর্মীদের কাছ থেকে জানলাম, ভারত বিভাগ মোটামুটি নিশ্চিত। কিন্তু আমি সাবধান করে দিচ্ছি, এই দেশভাগ অশুভ ও অমঙ্গল শুধু ভারতের জন্য নয়, পাকিস্তানও সমভাবে এর ভাগীদার হবে। বিভাগটা হচ্ছে ধর্মের জনসংখ্যার সংখ্যাগুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে, কোনো প্রাকৃতিক সীমারেখা যথা_পাহাড়, মরুভূমি, নদী এদের ওপর ভিত্তি করে নয়। সীমারেখা একটা টানতেই হবে তবে ওটা কতদিন স্থায়ী হবে বলা কঠিন।
পাকিস্তান সৃষ্টির কল্পনা একটা ঘৃণা থেকে জন্ম নিয়েছে এবং যতদিন ঘৃণা বেঁচে থাকবে, ততদিনই এর অস্তিত্ব। এই ঘৃণা ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ককে গ্রাস করে ফেলবে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বন্ধুত্ব হওয়া বা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব নয়, যদি না এ দুটি দেশ আকস্মিক কোনো বিপদের মধ্যে পড়ে। দেশভাগের এই রাজনীতি এ দুটি দেশের মধ্যে এক বিরাট প্রাচীর তৈরি করবে। পাকিস্তানের পক্ষে ভারতের সব মুসলমানকে সেখানে স্থান দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ তার ভূমিস্বল্পতা। পক্ষান্তরে হিন্দুদেরও পশ্চিম পাকিস্তানে বাস করা সম্ভব নয়। ওদের ওখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। এর প্রতিক্রিয়া ভারতেও দেখা যাবে এবং ভারতীয় মুসলমানদের জন্য তিনটি পথ খোলা থাকবে_
(১) তারা তখন লুট ও নারকীয় অত্যাচারের শিকার হয়ে পাকিস্তানে চলে যাবে, কিন্তু পাকিস্তান কতজনকে জায়গা দিতে পারবে?
২) তারা হত্যা বা অন্যান্য অত্যাচারের কবলে পড়বে। মুসলমানদের এক বিরাট অংশকে এই অগি্নপরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে, যতদিন না দেশভাগের এই তিক্ত স্মৃতি মুছে যায়।
৩) দারিদ্র্য, লুণ্ঠন ও রাজনৈতিক হতাশার শিকার হয়ে বহু মুসলমান ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করতে পারে।
মুসলিম লীগের বিশিষ্ট মুসলমানরা পাকিস্তানে চলে যাবে। ধনী মুসলমানরা পাকিস্তানের শিল্প-কলকারখানা ও ব্যবসা দখল করে পাকিস্তানের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ কব্জা করে ফেলবে। কিন্তু তিন কোটি মুসলমান ভারতে পড়ে থাকবে। তাদের জন্য পাকিস্তান কী রেখেছে? হিন্দু ও শিখদের পাকিস্তান থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর ওদের অবস্থা আরো সাংঘাতিক আকার ধারণ করবে। পাকিস্তান তখন নিজেও বহু সমস্যায় জর্জরিত হবে। সবচেয়ে বড় ভয়, বাইরের শক্তি পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। এবং কালক্রমে এই নিয়ন্ত্রণ কঠিন রজ্জু হয়ে পাকিস্তানকে বাঁধবে। ভারতের অবশ্য এ সমস্যা নেই। তার ভয় শুধু পাকিস্তানের শত্রুতা। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মি. জিন্নাহর দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ। তিনি জানেন না, বাংলাদেশ বাইরের কোনো নেতৃত্ব মেনে নেয় না। আজ কিংবা কাল তারা সে নেতৃত্ব অস্বীকার করবে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ফজলুল হক জিন্নাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তাঁকে মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার করা হলো। সোহরাওয়ার্দীও যে জিন্নাহকে খুব সম্মানের চোখে দেখতেন, সেটাও বলা যায় না। মুসলিম লীগ কেন, কংগ্রেসের ইতিহাসই দেখা যাক। সুভাষ চন্দ্র বসুর বিদ্রোহের কথা সবাই জানেন। গান্ধিজি সুভাষ বসুর কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হওয়ায় অত্যন্ত নাখোশ ছিলেন ও তাঁকে সরানোর জন্য রাজকোটে আমরণ অনশন শুরু করলেন। সুভাষ বসু গাঁধির বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন এবং নিজেকে কংগ্রেস থেকে সরিয়ে নিলেন। বাংলাদেশের পরিবেশ এমনই যে বাঙালিরা বাইরের নেতৃত্ব অপছন্দ করে এবং তখনই বিদ্রোহ করে, যখন দেখে যে তাদের অধিকার বা সুযোগ-সুবিধা বিশেষভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা আছে।
যত দিন জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী জীবিত আছেন তত দিন পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রতি তাদের বিশ্বাস থাকবে। কিন্তু ওঁরা যখন থাকবেন না তখন যেকোনো ছোট ছোট ঘটনায় ওদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠবে। আমি মনে করি, পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে বহু দিন একসঙ্গে থাকা মোটেই সম্ভব নয়। এই দুই ভূখণ্ডে ধর্ম ছাড়া আর কোনো বাঁধন নেই। আমরা মুসলমান_এই মর্মে কোথাও স্থায়ী রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে ওঠেনি। আরব দেশগুলো আমাদের সামনে এক ধর্ম, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ভাষা_সবই এক। কিন্তু তাদের সরকার ভিন্ন ভিন্নভাবে গঠিত এবং প্রায়ই এরা ঝগড়া-কলহ ও শত্রুতার মধ্যেই আছে। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা, নিয়ম-কানুন, আচার-ব্যবহার ও জীবনপ্রবাহ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে একেবারে আলাদা। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাক্কালে এখন ওদের মনে যে উষ্ণতা আছে, তা পরে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে এবং বিরোধ ও প্রতিবাদ দানা বেঁধে উঠবে। তখন বাইরের শক্তিগুলো এতে ইন্ধন জোগাবে ও একসঙ্গে এই দুই খণ্ড আলাদা হয়ে যাবে। পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাওয়ার পর যাই ঘটুক না কেন, অন্য প্রদেশগুলো পারস্পরিক বিরোধ ও ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে পুরো পশ্চিম পাকিস্তানকে রণক্ষেত্রে পরিণত করবে। পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিজেদের আলাদা আলাদা জাতি বলে ঘোষণা করবে। এই যখন অবস্থা হবে, তখন পুরো ব্যাপারটা বাইরের শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তখন পাকিস্তান বলকান বা আরব রাজ্যের মতো খণ্ড খণ্ড হয়ে যাবে। এ সময় হয়তো আমরা নিজেদের প্রশ্ন করব_কী পেলাম আর কী হারিয়েছি।
আসল বিষয় হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নতি, ধর্ম নয়। মুসলমান ব্যবসায়ীদের মধ্যে সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার মনোভাব সম্বন্ধে আমি যথেষ্ট সন্দিহান। পৃষ্ঠপোষকতা ও বিশেষ বিশেষ সরকারি সুবিধায়ই ওরা অভ্যস্ত। এখন ভারতের এই নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্তিকে তারা ভয়ের দৃষ্টিতে দেখছে। নিজেদের ভয়টাকে ঢেকে রাখার জন্য তারা দ্বিজাতিতত্ত্বের ব্যাপারে সোচ্চার এবং একটা মুসলিম রাষ্ট্র চায়, যেখানে তারা সম্পূর্ণ অর্থনীতিটাকে কব্জা করতে পারে ও সেখানে অন্যান্য প্রতিযোগীর প্রবেশ নিষিদ্ধ। দেখা যাক, কত দিন এই বঞ্চনাকে ওরা বাঁচিয়ে রাখতে পারে। আমি মনে করি, দেশ ভাগ হওয়ার পর পাকিস্তান কী কী সমস্যায় জর্জরিত হবে:
১) অযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব সামরিক শাসন ডেকে আনবে, যা নাকি অনেক মুসলমান রাষ্ট্রে ঘটেছে।
২) প্রচুর বৈদেশিক ঋণের বোঝা।
৩) প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না থাকায় সংঘর্ষ অনিবার্য।
৪) অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং বিভিন্ন এলাকা বা প্রদেশের মধ্যে অন্তর্বিরোধ।
৫) নতুন ধনী এবং শিল্পপতিদের দ্বারা জাতীয় সম্পত্তি লুট ও আত্দসাত।
৬। অসন্তোষের উৎপত্তি, ধর্ম থেকে যুব সম্প্রদায়ের বিচ্যুতি এবং পাকিস্তান মূলমন্ত্রে ধস নামা।
৭) নব্য ধনীদের শোষণ থেকে একটা শ্রেণীসংগ্রামের আশঙ্কা।
৮) পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।
এ অবস্থায় পাকিস্তানের স্থায়িত্ব খুবই একটা চাপের মুখে পড়বে ও কোনো মুসলিম রাষ্ট্র থেকে কার্যকরী সাহায্য পাওয়া যাবে না। অন্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষ সাহায্য পাওয়া যেতে পারে, তবে পাকিস্তানের মূলমন্ত্র ও রাষ্ট্রকে এর জন্য প্রচুর মূল্য দিতে হবে।
(চলবে)
ভাষান্তর: শফিক আহমেদ
Click This Link
বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
দোয়েল_পাখি বলেছেন:
"যতদূর আমি দেখতে পাচ্ছি, যাদের হাতে ক্ষমতার লাগামটা থাকবে, তারাই ইসলামের সমূহ ক্ষতি করবে।""""কিন্তু আমি সাবধান করে দিচ্ছি, এই দেশভাগ অশুভ ও অমঙ্গল শুধু ভারতের জন্য নয়, পাকিস্তানও সমভাবে এর ভাগীদার হবে।""
"""আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মি. জিন্নাহর দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ। তিনি জানেন না, বাংলাদেশ বাইরের কোনো নেতৃত্ব মেনে নেয় না। আজ কিংবা কাল তারা সে নেতৃত্ব অস্বীকার করবে।""
""আসল বিষয় হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নতি, ধর্ম নয়। ""
ধন্যবাদ । মাওলানা আবুল কালাম আজাদ সম্পকে জানতে খুব ইচ্ছা করতেছে । +++++++
স্পেলবাইন্ডার বলেছেন:
কি অসামান্য রাজনৈতিক দূরদর্শীতা!!!
জাতি জানতে চায় বলেছেন:
উনি ভারতীয় মুসলমান হিসেবে এই কথাই বলতেই পারেন! তবে এটা উনার রাজনৈতিক জীবনের শেষের দিকের কথা কিনা সন্দেহ আছে! আর উনার দৃষ্টিভঙ্গিই যে ঠিক সেটাই বা কিভাবে বুঝলেন! বিশেষ আমরা পূর্ব বাংলার বঞ্চিত মানুষদের যখন বঙ্গভঙ্গ রদ দেখতে হয়েছিলো, আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও চাকুরীতে সুযোগ-সুবিধার বিরুদ্ধে স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সহ ঠাকুরসহ উচ্চ বর্ণের ও প্রভাবশালী হিন্দুদের চরম বিরোধীতা দেখতে হয়েছিলো, তখন এই আজাদ সাহেবরা কি করছিলেন??!! আজকে ভারত ও পাকিস্তানের অঙ্গ রাজ্যগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যায়, আমাদের জন্য এক থাকাটা কত বড় বোকামী হত!এইরকম ভাজাকার মার্কা পোস্ট দেয়ার কি মানে?! নাকি কোন ফরমায়েশি পোস্ট??!!
আমি এবং আঁধার বলেছেন:
@জাতি জানতে চায়- আবুল কালাম আজাদ সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে? তার লেখার একটা পয়েন্টের ডিফেন্ডেও কিছু বলতে পারবেন? খালি আজাইরা ত্যানা পেঁচানো! মনে রাখা ভালো, বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কিন্তু ভারতবিভাগ হয়নি, হয়েছে হিন্দু, মুসলিম আর শিখ সিভিলিয়ানদের মধ্যে কোপাকুপি করে। যেকোনো ঠাণ্ডা মাথার লোকেরই বোঝার কথা যে এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মুসলিমদেরই। আপনি পারলে মাওলানার যুক্তিগুলো কাউন্টার করেন, আমরা কিছু গেয়ান লাভ করি।@লেখক- অসাধারণ পোস্ট। প্রিয়তে।
হায় ঈশ্বর! বলেছেন:
প্রিয়তে ..আপনার একটা পোস্টের কমেন্টের ব্যাপারে আমি অভিযোগ করেছিলাম . কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম পোস্ট তাই সরিয়ে ফেলেছে
দাসত্ব বলেছেন:
বাহ বাহ কালাম আজাদ সাহেব মুসলিমদেরকে রক্ষা করে গেসেন!!!!ওনার বেদবাক্য দিয়ে... ফালতু...
মনে হয় যেন অবিভক্ত ভারত থাকলে মুসলিমরা স্বর্গসুখে থাকতো...
আমরাতো স্বাধীন- তাও কেন এত দুর্দশা!... চুরির স্বভাব থাকলে হবে কিভাবে? কালাম সাহেব তো নেহরুর কেবিনেটে চেয়ার পাইসেন... দালালী করতে আর কত লাগে...
কলকাতার বাবুরা যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির বিরোধীতা করসিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথ সহ তখন কালাম আজাদের কোন বাবা পয়সা দিসিলো? সবতো দিসিলো ধনবাড়ীর নবাব আলী চৌধুরী আর নবাব সলিমু্ল্লাহ...
যাক এতদিনে স্বাধীন বাংলার পতাকা ধারী (!) অখন্ড ভারতপ্রেমীদের লেজ বের হইতেসে...!!! ক্ল্যাপ ক্ল্যাপ...
১টা দালাল হইসে মহাজ্ঞানী.... কালাম আজাদকে

লেখক বলেছেন: অাপনার জ্ঞানের সীমা দেেখে আমি মুগ্ধ
অনর্থ বলেছেন:
দাসু বাবু, মুল টপিক নিয়া আপনার সাথে এখন তর্কে যাব না। এই মুহুর্তে এতটা ধৈর্য নাই (ভোর সাড়ে ৫টা বাজে)। কিন্তু আপনার এই উপরের কমেন্টটা নিয়ে দুইটা কথা বলি। মনোযোগ দিয়ে শুনেন।১) ছোটবেলা থেকে একটা গল্প শুনতেসি। সত্য হওয়ার চান্সই বেশি। আজকের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কুমিল্লা বা সিলেট কোথাও একটা হওয়ার কথা ছিল। সাকার বাপ ফকা হঠাৎ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হইল পদাধিকার বলে কারন প্রেসিডেন্ট সাত দিনের বিদেশ সফরে গেসিল। উনি রাতারাতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজেক্ট তার হোম টাউনে ট্রান্সফার করে দিলেন। তো কি প্রমানিত হইল? চট্টগ্রামবাসির প্রতি তার বিশাল ভালবাসা বা কুমিল্লাবাসির প্রতি দুশমনি? এই লোকই ৭১ সালে চিটাগাংয়ের কসাই ছিল। তো চিটাগাংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপনে যেমন কিছু প্রমানিত হয় না, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করা দিয়ে কিছুই প্রমানিত হয় না।
২) আবুল কালাম আজাদ নেহরুর দালালি করে ক্যাবিনেটে জায়গা পাইসিলেন? ডুবাইসে আমারে! নেহরু জাস্ট লাকি ছিল যে গান্ধি তাকে পছন্দ করসিল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য। সেই সময়ের রাজনীতিতে নেহরু, আজাদ আর বল্লভভাইয়ের অবস্থান ছিল সমান। জাস্ট লাস্ট মোমেন্টের সিদ্ধান্তে গান্ধি নেহরুকে প্রধানমন্ত্রি বানান। এক পর্যায়ে উনি জিন্নাহকে বানাতে চাইসিলেন। আজাদের ক্যাবিনেটে জায়গা পাইতে দালালি করতে হয় না বরং উনি একটু ঘাড় ত্যাড়ামি বা পলিটিক্স করলে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রি হইতে পারতেন।
দাসত্ব বলেছেন:
আরে বেটা উন্মাদ... তোমার কেলানো দাঁত ই বলে দেয় মগজের বহর কতটুকু... সাকার বাপ ফকার ঐ ঘটনা তোমার কাস থেকে জানতে হবে..? বেআক্কেল.. কিসের সাথে কি ? স্যার সৈয়দ আহমেদ যখন আলীগড় ইউনিভার্সিটি করতেসিলো তখন কোথায় ছিলো "মুসলিম দুর্দশা বেদনার্ত কালাজাদ" ?
ঢাকা ইউনিভার্সিটি করার সময় কোথায় ছিলো কালাজাদ?
বংগভংগ নিয়া কলকাতার বাবুদের ফালাফালির সময় কোথায় ছিলো মুসলিম হিতৈষী কালাজাদ?!
কথা পরিষ্কার করে বলবা? কোন পতাকা ভালো লাগে ?
লাল-সবুজ না কমলা-সবুজ ? ধান্ধাবাজী এত সোজা স্বাধীনতার নাম ভাঙায়া ? কি কও অখন্ড বাংলা হয়া যাই অখন্ড ভারতের প্রদেশ হয়া , নাকি ?
লেজতো বের হইতেসে... আরো বাইর করো ?
চোখ দিয়া দেখো না খাও?
আমি কই বলসি কালাজাদ নেহরুর দালালী করসে... হারামীর বাচ্চাতো কংগ্রেসের দালালি কইরা কেবিনেটে ঢুকসে..।
তোমারে কইসে...সে চাইলে প্রধানমন্ত্রী হইতে পারতো !!!!
ইতিহাস কারে শিখাও চান্দু ?
ইতিহাসের ২ টা পাতিল ভাইঙা দেখাইসি অলরেডী ২ টা.. ভালো কইরা ই জানি তুমি ঐ গুলা পড়সো.. ছুপা মাইনাস দিয়া ফুটসে কয়েকটা চোর...
ধোয়া যখন উঠালা... কালাজাদের দালালী নিয়া পোস্ট আসবে...
ইতিহাসের আরেক ঠোলা পাতিল ভাঙা হবে... তোমাকে রসগোল্লার অগ্রীম আমন্ত্রন....
বিপরীত স্রোত বলেছেন:
একেই বলে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, সেসময়ের মুসলমান নেতাদের যার খুবই অভাব ছিল।
বিপরীত স্রোত বলেছেন:
এ নিয়ে মুক্তমনা ব্লগে চমৎকার একটা পোষ্ট পড়েছিলাম ব্লগারদের পড়ার জন্য আমন্ত্রণ রইল জিন্না না নেহেরু? ভারত ভাগের জন্যে কে দায়ী?
আমিরনী বলেছেন:
Who disagreed with cabinet mission proposal? Not Muslim league Congress,So Judge,Who is liable for partition of India? Click This Link
Click This Link
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...















একেই বলে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, সেসময়ের মুসলমান নেতাদের যার খুবই অভাব ছিল।