ছোটবেলা থেকে লেখাপড়া করে আসছি একটা চাকরি পাওয়ার আশায়। চাকরি পেলেই মিটে যাবে পেটের খিদে। কখনও কেউ ভাবতে শিখায়নি- জ্ঞানার্জনের জন্য লেখাপড়া করতে হয়। নিম্নমধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে হয়ত এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িছে আমাদের সমাজে। শিক্ষার বিনিময়ে চাকরি। চাকরির বিনিময়ে পেট ভরানো। তাই পেট ভরাতে একটা চাকরির জন্য বন্ধুর হাত ধরে গিয়েছিলাম এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে। যাওয়া-আসার ফাঁকে ধনাঢ্য ব্যক্তির সাথে চলত সাহিত্য নিয়ে কথাবার্তা। সাহিত্যের স সম্পর্কেও তাঁর ধারণা ছিল না। অথচ তিনি অন্যকে বড় অংকের টাকা দিয়ে নিজের নামে একটা বই লিখিয়ে সাহিত্যিক নামে নিজের পরিচয়টাকে জাহির করতেন। লেখালেখির হাত আমারও ছিল ছোটবেলা থেকে। সেই সুযোগটা গ্রহণ করলেন তিনি। আমার ছিল পেটের খিদে। তাঁর ছিল নামের খিদে। ব্যাস, টাকার বিনিময়ে লেখা শুরু করলাম অন্যের নামে। একটা..দুটো..তিনটা.. এভাবে দেশের জাতীয় পত্রিকাগুলোতে লেখা যেতে লাগল দিনের পর দিন। পত্রিকাতে আমার যখন লেখা প্রকাশ হত ওনার নামে, তখন যে কষ্ট লাগত না- তা না। সে কষ্টটা ভুলে যেতাম চকচকে পাঁচশ টাকার নোটের গন্ধে।
প্রবন্ধ লেখা থেকে হাত দিলাম বই লেখার কাজে। গবেষণাধর্মী বই। প্রচণ্ড কাজে ডুবে থাকতে হত আমাকে। দিন-মাস-বছর পেরিয়ে লিখলাম একাধিক বই। বিভিন্ন সভা-সমিতি-সংগঠন লেখালেখির জন্যে তাঁকে বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত করতে লাগল। প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলো নানা ধরনের সাক্ষাতকার অনুষ্ঠান প্রচার করতে লাগল। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি বিখ্যাত হয়ে গেলেন। বলাই বাহুল্য, সভা-সমিতির বক্তব্য পর্যন্ত আমাকেই লিখে দিতে হত। সাক্ষাতকারে কী বলবেন তাও আমাকে শিখিয়ে দিতে হত।
বয়স তখন অল্প। একা আমি। বাবার সরকারি চাকরির টাকাতে তখন ভালই চলছে সংসার। কাঁচা টাকার লোভ আমাকে পেয়ে বসল। ভবিষ্যৎ না ভেবেই লিখে যেতে লাগলাম। দিন পেরোতে লাগল শীতের দিনের মত। একদিন হুট করে ভালবাসার মানুষকে ঘরে নিয়ে এলাম। চোখ খুলে বাইরের জগতটাকে দেখতে গিয়ে হোঁচট খেলাম। চারদিকে আলকাতরা রঙ অন্ধকার। ঠকছি আমি প্রতিনিয়ত। ঠকাচ্ছি আমি আমাকে।
দিন দিন তারকা খ্যাতি পেতে লাগলেন তিনি। অথচ নেপথ্যের এই মানুষটি বরাবরই রয়ে গেল অবহেলিত। চারদিকের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবার কারণে মাত্র চার হাজার টাকার মাসিক বেতনে মেধার এই বেশ্যাবৃত্তি আমাকে করতে হত। রাতের বালিশে মুখ গুঁজে কান্না ছাড়া আর কোন পথ নেই। বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। চাকরির বয়স অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। আপন মানুষদের ভেতরে বড় চাকুরে কেউ নেই- যে ডেকে নিয়ে একটা চাকরি দেবে আমাকে। তাছাড়া আমিতো লেখালেখি ছাড়া আর কিছুই পারি না। লেখক নামধারী লোকটি আমার সামনে অন্যকোন পথ খোলা নেই দেখে রীতিমত ঠকিয়ে যেতে লাগলেন প্রতিনিয়ত। ব্যবহার হয়ে গেল তাঁর রুক্ষ। ভেতরে ভেতরে আমি দগ্ধ হতে লাগলাম। ক্ষয়ে যেতে লাগলাম ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের মত। মাস্টার্স পাশ করে প্রতিদিন কনভেন্সের এক’শ টাকার জন্যে তাঁর সাথে ঘুরে বেড়াতাম অফিসিয়াল ফাইলপত্র নিয়ে। যদি কোনদিন তার কাছে পাঁচশ টাকার নোট থাকত তাহলে সেদিন ভাংতি নেই- এই অজুহাতে আমাকে টাকা দিতেন না। কোনদিন পঞ্চাশ টাকা থাকলে তাই-ই হাতে ধরিয়ে দিতেন। অথচ প্রতিদিনের ওই একশ টাকার জন্য আমি সারাদিন আল্লাহকে ডাকতাম। আবার একশ টাকার একটা নোট হাত পেতে নিতে নিজেকে ভিক্ষারীর চেয়ে অধম মনে হত। নিজেকে নিজে ধিক্কার দিয়ে বলতাম- এর জন্যেই কি আমি এম.এস.এস পাশ করেছি!
দিন দিন নানা ধরনের প্রবঞ্চনার শিকার হতে লাগলাম আমি। বারবার লোকজনের সামনে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য আমারই লেখা বই নিয়ে আমাকে বলত
আমার মত লিখতে শেখ, তুমিতো বাংলা, অংক, ভূগোল কিছুই জান না। আমি পাথরের মূর্তির মত নির্জীব থাকতাম। আমার পেছনে তখন দেয়াল। আমার ঘরে তখন আমার সন্তান। তার দুধ, বউয়ের চাওয়া আমাকে পূরণ করতে হয়। ততদিনে বাবা চলে এসেছেন পেনশানে। দুইবোনের লেখাপড়ার খরচ আর সংসার খরচ বাবা একা চালাতে পারতেন না। তাই মুখে কিছু না বললেও তাঁরা যে আমার কাছে কিছু চাইতেন, তা আমি বুঝতাম। না, আমি সবার চাহিদা পূরণ করতে না পেরে দিন দিন শ্মশানের মত সহস্রবার আমার মৃত লাশকে আমি পুড়িয়েছি। বিবেকের সূঁচাল দংশনে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে না দেখা অন্তর। তারপরও অনুগত ভৃত্যের মত আমি তার সব চাহিদা পূরণ করে গেছি। বিষলক্ষার ছুরিতে জখম হয়েছি আমি, আমার সমস্ত সত্তা।
একদিন নূরের আলো হয়ে এক দেবদূত আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। হাত ধরে নিয়ে এলেন স্বর্গের পবিত্র ভূমিতে। চারদিকে শুধু আলো আর আলো। আমার পেটে খিদে নেই। স্বপ্নচোখের অবাধ সাঁতার। প্রসস্ত বুকের পাটা। চোখমুখের সেই মলিনত্ম ম্লান হয়ে গেছে। না, এ বর্ণনা মিথ্যে নয়, সত্যি। সত্যি-ই আমি এসে দাঁড়ালাম আলোতে। আমি এখন আলোর মানুষ। আলোকিত মানুষ।
প্রদীপের নীচে থাকে অন্ধকার। সেই অন্ধকারের বাসিন্দা আমার মত অনেকেই। শুধু খিদের জন্য তারা মেধার বেশ্যাবৃত্তি করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। টাকাঅলারা কিনে নিচ্ছে সাহিত্যকে। সাহিত্য হয়ে উঠছে পণ্য। দুদিন পর আমার দেবদূত, আমার স্বর্গভূমি, আমার সত্তা, আমার আলো আবার সেই অন্ধকারেই নিমজ্জিত হল।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

