নোয়াখালী জেলার সঙ্গে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে প্রস্তাবিত ক্রসড্যাম প্রকল্প নিয়ে গত ৪৩ বছর ধরে কেবল আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। বারবার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেও আলোর মুখ দেখছে না দেশের দক্ষিণে সমুদ্রকেন্দ্রিক বাণিজ্য সম্ভাবনার এ প্রকল্পটি। শেষ পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি দুই ভাগে বিভক্ত করে বাস্তবায়ন করা যায় কিনা তা নিয়ে পর্যালোচনা চলছে।
জানা যায়, দেশের সুপ্রাচীন দ্বীপ জনপদ সন্দ্বীপ সুদূর অতীতে নোয়াখালী জেলার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। কিন্তু মেঘনার ভাঙনে জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপটি দূরে সরে গেলে এবং প্রমত্তা মেঘনায় যাতায়াত দুর্গম হয়ে পড়লে নোয়াখালী জেলা থেকে বাদ দিয়ে সন্দ্বীপকে নিকটবর্তী ভূখণ্ড চট্টগ্রাম জেলার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হয়। সপ্তদম শতাব্দীতে যে দ্বীপটির জাহাজ নির্মাণ শিল্প ও লবণ শিল্পের জন্য বিশ্বব্যাপী খ্যাতি ছিল, তা বিচ্ছিন্ন ও দুর্গম জনপদ হয়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় সেসব ঐতিহ্য। পঞ্চদশ শতাব্দীতে যে দ্বীপের আয়তন ছিল সাড়ে ছয়শ’ বর্গমাইল, তা বর্তমানে ১০০ কিলোমিটার আয়তনের দ্বীপে পরিণত হয়েছে। এ দ্বীপে ৪ লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে এবং প্রবাসীদের সম্পদে সন্দ্বীপ অনেক সমৃদ্ধিশালী জনপদ। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে এখানে কোনো শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না। জানা যায়, উনিশ শতকের শুরু থেকে নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ এবং সন্দ্বীপের মধ্যবর্তী স্থানে জেগে ওঠে বিশালাকার চরাঞ্চল যা ‘উড়ির চর’ নামে পরিচিত হয়। পাউবো সূত্র জানায়, দক্ষিণের সমুদ্রবক্ষের ভূমি উদ্ধার, সন্দ্বীপের ভাঙন রোধ এবং দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দ্বীপটিকে যুক্ত করতে ১৯৬৬ সালে সরকার কোম্পানিগঞ্জ থেকে উড়ির চর হয়ে সন্দ্বীপ পর্যন্ত ক্রসড্যাম প্রকল্প গ্রহণ করে। তখন এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫০২ কোটি টাকা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আরও চর জেগে ওঠায় কমতে থাকে প্রকল্প ব্যয়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে নেদারল্যান্ডের একটি বিশেষজ্ঞ দল আবারও সার্ভে করে ভূমি উদ্ধার ও নদী মোহনা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে প্রকল্প প্রস্তাব দেয়। ১৯৭৫ সালে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ড চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ প্রকল্পে ডাচ কারিগরি সহায়তার জন্য ১৯৭৭ সালে আরও একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। প্রশাসনিক সহায়তার জন্য নেদাল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি হয় ১৯৭৯ সালে। তবে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে নোয়াখালী-সন্দ্বীপ ড্যাম বাস্তবায়ন বারবার হুমকির মুখে পড়ে। জানা যায়, ১৯৮২ সালে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে নেদারল্যান্ডের একটি সার্ভে জাহাজ সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর দক্ষিণের সমুদ্রসীমায় সার্ভে করে ভূমি উদ্ধারে ক্রসড্যামের প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ করে। ১৯৮৪ সালে নোয়াখালী সন্দ্বীপ ক্রসড্যামের চূড়ান্ত সার্ভে হয় এবং ১৯৮৭ সালে ডাচদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেয়া হয় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী প্রকল্পটি ১৯৮৮ সালে শুরু হয়ে ১৯৯২ সালে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু যথাসময়ে শুরু না হওয়ায় ’৯০ এর পটপরিবর্তনে থমকে যায় ড্যাম প্রকল্প। জানা যায়, ১৯৯৪ সালে আবার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়। ১৯৯৬ সালে এ প্রকল্পে কিছু গম বরাদ্দ দেয়া হলে উড়ির চরে কাঁচা রাস্তা, বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এর ফলে প্রকল্প ব্যয় আরও কমে যায়। ২০০২ সালে এ প্রকল্পের আবার সমীক্ষা যাচাই হলেও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, সম্প্রতি ‘ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং’ নামক প্রতিষ্ঠান ওই প্রকল্প নিয়ে নতুনভাবে সার্ভে করে। এতে এখনও ১০০ কোটি টাকা ব্যয়েই কোম্পানিগঞ্জ-উড়ির চর সন্দ্বীপ ক্রসড্যাম বাস্তবায়ন সম্ভব বলে সমীক্ষায় বেরিয়ে আসে। তবে প্রতিষ্ঠানটি দুই পর্যায়ে নোয়াখালী সন্দ্বীপ প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে। এতে কোম্পানিগঞ্জের চর ক্লার্ক থেকে উড়ির চর পর্যন্ত ড্যাম বাস্তবায়নে ৩২ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এ অংশে ড্যাম বাস্তবায়ন হলে সৃষ্ট পারিপার্শ্বিক অবস্থার আলোকে উড়ির চর থেকে সন্দ্বীপ অংশে ড্যাম প্রকল্প নেয়া উচিত বলে অভিমত দেয়া হয়। ওই প্রতিষ্ঠানের এ প্রস্তাবনা গত সপ্তাহে পানি উন্নয়ন বোর্ডে জমা হয়েছে। পাউবো প্রকল্পের নতুন প্রস্তাবনার পরিবেশগত দিক যাচাইয়ের পর মন্ত্রণায়ে উপস্থাপন করবে বলে জানিয়েছেন নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ক্রসডড্যামের প্রথম অংশ বাস্তবায়িত হলে ১০ বছরে ১৫ হাজার একর নতুন ভূমি পাওয়া যাবে। নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ড নোয়াখালী সন্দ্বীপ ক্রসড্যাম প্রকল্পের পুরো প্রস্তাবনা তৈরির জন্য এখন কাজ করছে বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সন্দ্বীপের কৃতী সন্তান আবুল কাসেম হায়দার আমার দেশকে বলেন, সন্দ্বীপকে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি থেকে বাঁচাতে নোয়াখালী-সন্দ্বীপ ক্রসড্যাম বাস্তবায়ন জরুরি। এতে সন্দ্বীপে শিল্পকারখানা এবং পর্যটন শিল্পের পুনঃবিকাশ ঘটবে। দেশে সমুদ্রকেন্দ্রিক নতুন বাণিজ্য পথের সূত্রপাত হবে। সন্দ্বীপের এমপি মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, ক্রসড্যাম বাস্তবায়িত হলে পুরো বাংলাদেশ উপকৃত হবে। দেশ বিশাল আয়তনের নতুন ভূমি পাবে।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


