চোখ দুটো যেনো এখনও প্রতিক্ষার প্রহর গুনে। কোন আশ্বাস তাকে ভোলাতে পারেনা। কোন মুক্তিযোদ্ধার কথা শুনলেই অপলক চেয়ে থাকেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বামী হারিয়ে দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে মানসিক রোগী হয়ে আছেন পঞ্চাষোর্ধ তৈয়বা খাতুন। মাতৃস্নেহ বঞ্চিত তাঁর তিনটি শিশু সন্তানকেই কেড়ে নিয়েছে অযত্ন, অবহেলা আর অপুষ্টি। স্বাধীনতার এত বছর পরও তাঁর কপালে জুটেনি একটু সরকারি সাহায্যও। চলমান নোয়াখালীর মুখোমুখি হলে নিচু গলায় বললেন, চাইরগা ভাত হাইনা খাইতাম, হাইল্লে কিছু করিয়েন (চারটা ভাত পাই না খেতে, পারলে কিছু করবেন)। তাঁর চিকিৎসা ও আশ্রয়ের জন্য আত্মীয় স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের দাবি সরকারের সুদৃষ্টির।
৭১’র এপ্রিল চারিদিকে বাজছে যুদ্ধের দামামা। পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা নোয়াখালীতে নির্যাতন চালাচ্ছিলো নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর। নিজ মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার স্বপ্ন নিয়ে ইপিআর সদস্য মফিজ উল্যা সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২৮ এপ্রিল চৌমুহনীর করিমপুর রোডে জাহেদি হোটেলের সামনে হাত গ্রেনেড নিয়ে ওৎ পেতে ছিলেন, ফেনী থেকে খান সেনারা চৌমুহনীতে আসার পথে শত্র“র ওপর হামলা করবেন বলে। কিন্তু বিধি বাম, খবর পেয়ে স্বাধীনতা বিরোধী চক্র গোপনে ধরিয়ে দেয় তাঁকে। পাক সেনারা বেগমগঞ্জ কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পে ধরে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতনের পর নির্মমভাবে হত্য করে মুক্তিপাগল মফিজকে। এক নিকট আত্মীয় অতি গোপনে লাশ টেনে হেঁছড়ে নিয়ে পার্শ্ববর্তী বর্তমান বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের ভিতরে কোনমতে দাফন করেছিলেন সেই বীর সেনানীকে।
এ হৃদয়বিদারক খবরটি শোনার পরই শহীদ মফিজের যুবতী স্ত্রী তৈয়বা খাতুন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। কিছু দিনের মাথায় অপুষ্টির শিকার হয়ে চোখের সামনেই মারা যায় একমাত্র শিশুপুত্র। জীবিত দুই কন্যা শিশুও মায়ের স্নেহবঞ্চিত হতে থাকে। স্বামীর বাড়ি কিংবা বাবার বাড়ি কারোই স্বচ্ছলতা ছিলোনা। তারপরও উপজেলার মীরওয়ারিশপুর গ্রামে বাবার সংসারে দুই শিশুকন্যা নিয়ে ঠাঁই হয় হতভাগ্য তৈয়বা খাতুনের। পাগল ঘয়ে ঘুরে বেড়াতেন পথে প্রান্তরে। এক মামা খুঁজে খুঁজে ধরে আনতেন। শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো তাঁকে (তৈয়বা)। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে মায়ের পাগল সুলভ আচরণে, অপুষ্টি, অবহেলায় মারা যায় দুটি মেয়েও। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম উঠেছে শহীদ মফিজের। অথচ তার কবরটির আজ কোন চিহ্ন নেই। কেউ স্মরণও করেনা তাকে।
গত মঙ্গলবার দুপুরে বেগমগঞ্জের মীরওয়ারীশ পুর গ্রামে তৈয়বার বাবার বাড়ি গিয়ে দেখা যায় এখনো মানসিক ভারসম্যহীনভাবেই বেঁচে আছেন তৈয়বা খাতুন। মা তাহেরা খাতুন (৭২) মেয়ের (তৈয়বা) সেবা শশ্র“ষা করছেন। প্রবাসী ভাই ও আত্মীয় স্বজনের সাহায্যে চিকিৎসা চলছে এখনও। বাবার বাড়ির অন্যান্য লোকজনও সযোগিতার হাত বাড়ায় তাঁর প্রতি। তবে তাঁকে নিয়ে বৃদ্ধ মায়ের কষ্টের যেনো শেষ নেই। মা মারা গেলে তাঁকে দেখার আর কেউ থাকবে না। তাই সরকারি উদ্যোগে কিছু করার দাবি করলেন বাড়ির লোকজন।
স্বামীর কথা জিজ্ঞেস করতেই চুপসে গেলেন। চোখের কোনে মুহুর্তেই যেন জলের বন্যা বয়ে গেলো। মানসিক ভারসাম্যহীন হলেও স্বামীর প্রসঙ্গে জানালেন, সকালে গোসল করে বাড়ি থেকে বের হয়। সন্ধ্যায় আছম্বিত (আচমকা) খবর পাই পাঞ্জাবীরা তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। তখন মাথা ঘুরে পড়ে যাই। তখন থেকেই অসুস্থ। ছেলে মেয়েগুলোও মরে গেছে চোখের সামনে।
স্বামী হত্যার বিচার চান কিনা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, বিচার- তো চাইতো। কিন্তু কে করবে বিচার। পাকিস্তানীরা চলে গেছে কিন্তু যারা (রাজাকার) আমার স্বামীকে ধরিয়ে দিয়েছে তারাতো এ মাটিতেই আছে।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হিসাবে সরকারের তরফ থেকে কোন সহযোগিতা পান কিনা জানতে চাইলে বললেন, ৩৮ বছরে কোন সরকারি সাহায্যের দেখা পাননি। চিকিৎসার প্রচুর খরচ। কিভাবে সামনের দিনগুলোতে খরছ চালাবে তা নিয়েই যত চিন্তা।
বাড়িতে উপস্থিত সংস্কৃতিকর্মী ও ক্রীড়া সংগঠক মীর্জা মহিউদ্দিন ফারুক ক্ষোভের সাথে বলেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যেখানে ব্যাপকভাবে কাজ করছে সেখানে একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের এমন করুণ অবস্থা সত্যিই দুঃখজনক। উন্নত চিকিৎসা হয়তো স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিতে পারে তৈয়বা খাতুনকে, যা বাকি জীবনে তাকে শান্তিতে রাখবে। সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপ আন্তরিক হলে এটি সম্ভব বলে মুক্তিযোদ্ধাদের দাবী করেন।
এখন দেখার বিষয় সরকার আদৌ মুক্তিযুদ্ধে বেগমগঞ্জে প্রথম শহীদ মফিজের অসুস্থ স্ত্রীর পাশে দাঁড়ায় কিনা।
http://www.chalomannoakhali.com/news/677/
http://www.youtube.com/watch?v=Xlxx_P9mr-E

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

