কেনো যেনো এই ভূতটাকে সর্বজনে পছন্দ করেনা। যাইহোক ভুতের নামটা বলি। সে ভুতের নাম, আবৃত্তি নেশা ভুত। সেই ক্লাস থ্রী ফোরে পড়তে নিরুপমা দিদিমনি যে ছন্দ তাল ও লয় মিলিয়ে ছড়া, কবিতা আবৃত্তি শিখিয়েছিলো। তখন থেকেই সে ভুত মাথার অন্যান্য ভুতগুলোর সাথে ঠেলেঠুলে জায়গা করে নিয়ে হাত পা ছড়িয়ে বেশ আরাম করে বসল।
এসব বকাঝকা খেয়ে কি আর কারো কোনোকিছুতে উৎসাহ থাকে? আহা তখন যদি মাকে অল ইজ ওয়েল ম্যুভিটা দেখাতে পারতাম! যদি পারতাম মাল্টিপল ইন্টেলিজেন্সের ব্যাপারটা বুঝাতে।
যাইহোক, কারো বকাঝকায় দমে যাবো? হাহ্ সেই পাত্রী নহি আমি।
কাজেই ভুতটাকে ঘাড়ে বয়ে নিয়ে চললাম। স্কুলের গন্ডি পেরুতে না পেরুতেই রঙ্গীন চোখে যখন দুনিয়া দেখা শুরু তখনই একদিন হঠাৎ দেখা পেলাম এক ভূত সম্রাটের। আমার মাথার ভূতটার যোগ্য জুড়ি। সেই আমাকে শিখিয়েছিলো এ ভুতকে কিভাবে সুশীল করে তুলতে হয়। কিভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে ঘষেমেজে সবার সামনে উপস্থাপনযোগ্য করতে হবে। সত্যিকারে সুশীল সভ্য, মার্জিত সুন্দর করে তুলতে পারলে কার সাধ্য আছে এ ভুত কে অবহেলা করে?
কলেজের বর্ষবরন অনুষ্ঠানে যথারিতী আমি পন্ডিৎ হাজির হলাম। এবার নিরুপমা দিদিমনির জায়গায় আমার গুরুর আসনে বসে গেলেন আরেক দাদাভাই। ধরা যাক তার নাম নিরুপম। সত্যি নামটা আর বললাম না , কবিতার বই টই লিখে তিনি ইদানীং শুনেছি বেশ নাম করেছেন, একটা মহিলা কলেজের বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক তিনি এখন। বাব্বাহ! শেষে আবার তার নাম নেওয়ায় গলা কাটতে আসেন আমার।
যাইহোক, নিরুপম সাহেব কথাবার্তা চলনে বলনে যতই গুরুগম্ভীর হোক না কেনো? তখন তো আর কোনো মহিলা কলেজের অধ্যাপক হননি তাই মহোৎসাহে আবৃত্তিপ্রেমী আমাকে পেয়ে গাম্ভীর্য্যপনা বাদ দিয়ে শেখাতে লাগলেন আবৃত্তি কাহারে বলে। তিনি তখন বাংলা সাহিত্যে অনার্স আর আমি কেলব উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষ।আমাদের কলেজটা ছিলো বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ তিনি আবার সংস্কৃতি পরিষদের হেন তেন কিছু একটা ছিলেন। তার সিলেকশন ছাড়া কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন সম্ভব না।
তো সেদিন সকালে গেলাম রিহার্সেল রুমে। বিশাল বড় হলরুমটার এক কোনায় চলছে সঙ্গীত আরেক কোনায় কৌতুক, আরো সব কি কি নানা রকম আয়োজন। লীনা আপু আমাকে হলরুমের আরেক কোনায় সেই আবৃত্তি সম্রাটের কাছে নিয়ে গিয়ে দাঁড়া করালেন। মোটা ফ্রেমের চশমা। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, কবি কবি ভাব কবিতার অভাব( কেনো যেন ছোটবেলায় শোনা এই কথাটাই মাথায় আসে আমার কবি কবি ভাবের কাউকে দেখলেই
যাই হোক আমার পালা আসতে আমি মিন মিন করে শুরু করলাম , থাকবোনাকো বদ্ধ ঘরে , দেখবো এবার জগৎটাকে।
দু লাইন পড়তেই তিমি আমাকে থামিয়ে দিলেন,
যাইহোক অনেক কষ্টে আত্নসম্বরন করেছিলাম সেদিন। তারপর মোটা ফ্রেম
বর্তমানের সেই অধ্যাপক সাহেব সন্চয়িতা খুলে বের করে দিলেন রবিঠাকুরের এক অমর কবিতা। কবিতার নাম আবার অনন্ত প্রেম। বললেন "শুনো কবিতা আবৃত্তির প্রথম শর্ত কবিতাটা মুখস্থ করে ফেলতে হবে। কাল মুখস্থ করে আসবে। "আমি ভাবছিলাম হায়রে মা যদি আমাকে এই কবিতা জোরে জোরে আওড়াতে দেখেন তাইলে তো আমার প্রেম ছুটাই দেবেন (সেই ছেলেবেলার ভুত ছুটানোর হূমকি তো ভুলিনি) । যাইহোক আমি তাকে কিছু বললাম না তবে ফিরে আসার সময় লীনা আপুকে বললাম "আপু মা দেবেনা এটা পড়তে।"
লীনা আপু নির্ভয় দিলেন আর মাকে ঠিক ঠাক ম্যানাজ করে ফেললেন।
শুরু হলো প্রথম শর্ত কবিতাটা মুখস্থ করা। আবৃত্তি করতে হলে প্রথমেই কবিতাটাকে মুখস্থ করে ফেলতে হবে।মুখস্থ করলে আত্নবিশ্বাস জন্ম নেয়। স্বতঃসস্ফূর্ত আবেগ তৈরী হয়। লাইনের পর লাইন আবেগ সহ দ্বীধাহীন বলে যাওয়া যায়। মুখস্থ না থাকলে আবৃত্তির সময় বার বার বই দেখতে হয়।মোনোযোগ নষ্ট হয়।আবেগ নষ্ট হয়। বই না থাকলে আবৃত্তিও করা যায়না।
২য় শর্ত কবি সম্পর্কে জানা। কবিতাটি কোন কবির লেখা । তার জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে জানাটাও বিশেষ প্রয়োজন আছে। এসব জানা থাকলে সহজে বোঝা যায় কবি কি রকম প্রেক্ষাপটে কি ধরনের পরিবেশে কবিতাটি লিখতে পারেন। তখন কবিতায় আবেগ ঢেলে দেওয়া বা আবৃত্তির সময় কবিতার পাত্রপাত্রীর সাথে মিশে যাওয়া যাওয়ায় আবৃত্তি সহজ হয়।
তৃয় শর্ত কবিতাটির অন্তর্নিহিত অর্থ বা ভাব বোঝা। যেমন সংকল্প কবিতাটি ছিলো শিশুতোষ। এখানে কবি বুঝিয়েছেন শিশু আবদ্ধ হয়ে থাকতে চায়না।বিশ্বজগতের পরিচয় পেতে চায়। কিন্তু পক্ষান্তরে "অনন্ত প্রেম" খাঁটি প্রেমের কবিতা। শেষাংশে কিছুটা হতাশা ও দুঃখের সূর। তবুও প্রেমাবেগই এখানে মুখ্য।
অনন্ত প্রেম
তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি
শত রূপে শত বার
জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয়
গাঁথিয়াছে গীতহার,
কত রূপ ধরে পরেছ গলায়,
নিয়েছ সে উপহার
জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।
যত শুনি সেই অতীত কাহিনী,
প্রাচীন প্রেমের ব্যথা,
অতি পুরাতন বিরহমিলনকথা,
অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে
দেখা দেয় অবশেষে
কালের তিমিররজনী ভেদিয়া
তোমারি মুরতি এসে,
চিরস্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে।
আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি
যুগল প্রেমের স্রোতে
অনাদিকালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা
কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে,
মিলনমধুর লাজে—
পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে।
আজি সেই চিরদিবসের প্রেম
অবসান লভিয়াছে
রাশি রাশি হয়ে তোমার পায়ের কাছে।
নিখিলের সুখ, নিখিলের দুখ,
নিখিল প্রাণের প্রীতি,
একটি প্রেমের মাঝারে মিশেছে
সকল প্রেমের স্মৃতি—
সকল কালের সকল কবির গীতি।
৪র্থ শর্ত কবিতার শব্দার্থগুলো বুঝতে হবে।
যেমন-
অনাদিকাল - অনন্তকাল
অনিবার- অশেষ/ চলমান
নিখিল- সৌরমন্ডলী
৫ম শর্ত- শব্দের শুদ্ধ উচ্চারন জেনে নেওয়া
যেন- যেনো
মুগ্ধ- মুগ্ধো
অতীত-অতীত্
৬ষ্ঠ শর্ত-কবিতার রস, কন্ঠস্বর
অনন্ত প্রেম কবিতাটিতে মূলত প্রেমাবেগ প্রকাশ পেয়েছে। এখানে
প্রেমিক বা প্রেমিকার প্রেমিক হৃদয়ের অভিব্যাক্তি প্রকাশিত হয়েছে।কাজেই কবিতাটি আবৃত্তির সময় কন্ঠস্বরে আবেগ ব্যাকুলতা ও আকুলতা যেমন আনতে হবে তেমনি কন্ঠস্বর নমনীয় ও উচ্চারনের গতী মধ্যমলয়ের হতে হবে।
৭ম শর্ত-স্বরাঘাত
আবৃত্তির সময় কন্ঠস্বরের বিভিন্নস্থানে ঝোঁক পড়ে তাকে স্বরাঘাত বলে।যেমন
র্থাকবো নাকো র্বদ্ধ ঘরে,
র্দেখবো এবার র্জগৎ টাকে।
রেফগুলো স্বরাঘাত ।
৮ম-শর্ত যতি, বিরামচিহ্ন,অর্থপূর্ণ বিরতি কবিতাটির যেখানে কমা(,) সেখানে 'এক' শব্দটি উচ্চারন করতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময় থামতে হবে। যেখানে দাঁড়ি (।)সেখানে এক সেকেন্ড থামতে হবে। দুই দাঁড়ির (!!)জায়গায় এক দুই উচ্চারন করার সময়টুকু থামতে হবে। হাইফেন এ থামার দরকার নেই। সেমিকোলোনে(
৯ম শর্ত-হাত-পা- মাথা বা শরীর নাড়ানো চলবেনা[/sbআবৃত্তি আসলে কন্ঠস্বরের খেলা, এটা তো আর অভিনয় নয়। কবিতার ভাব রস ব্যাখ্যা সব কন্ঠস্বরে সুন্দরভাবে ফুঁটিয়ে তুলতে হবে।অতি হাত পা মাথা নাড়ার বদভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।
১০ম শর্ত- মাইক্রোফোনে আবৃত্তি নাকি খালি গলায় মাইক্রোফোনে আবৃত্তি হলে মাইক্রোফোনটি উচু করে মুখ কাছে নিয়ে দাঁড়াতে হবে।মুখ থেকে কোনাকুনি রাখতে হবে মাইক্রোফোনটি। মাইক্রোফোনে আবৃত্তি করতে হলে চিৎকার করে আবৃত্তির দরকার নেই।মাইক্রোফোন আবৃত্তি নিজেই শক্তিশালী করে তোলে।
১১তম শর্ত- আবৃত্তির পোষাক আবৃত্তি র পোষাক হতে হবে রুচিশীল ও মার্জিত। শাড়ী বা সালোয়ার কামিজ, পান্জাবী ফতুয়াই বাংলা কবিতা আবৃত্তি তে উপযুক্ত। মেয়েদের পরিপাটী সাজ প্রযোজ্য। উদ্ভট ও উৎকট সাজে কোনোমতেই আবৃত্তি চলবেনা।
১২তম ও শেষ শর্ত- উপরের সবগুলো তত্ব মেনে কবিতা আবৃত্তি করলেই শুধু চলবেনা, সবগুলো তত্বের সমন্বয়ে কবিতার ভাবার্থ হৃদয়ে ধারন করে , যথার্থ আবেগের মাধ্যমে সুন্দর মার্জিত শৈল্পিক উপায়ে কবিতা আবৃত্তি করতে পারলেই তা হবে সকলের হৃদয়গ্রাহী। তাইতো একজনের আবৃত্তি থেকে অন্যের আবৃত্তি হয় আলাদা।
যাক এত শত শিক্ষার পর এখন যদি কেউ কবিতা আবৃত্তি করতে চায় তার আবৃত্তি কি আর ভালো না হয়ে পারে?
শুধু কবিতাগুলো আর আবৃত্তিশিক্ষা টুকুই রয়ে গেছে।।
নীচে অনন্ত প্রেম সহ কয়েকটা প্রিয় কবিতার আবৃত্তি ...
http://www.youtube.com/watch?v=znjZNIz1ijU
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০১০ সকাল ১১:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


