somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

~!!এক টুকরো স্বর্গের দেশ বালিতে কয়েকদিন.....!!~

১২ ই জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ৯:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এবারের উইন্টার ভ্যাকেশনে মালয়েশিয়া যাবার কথা ছিলো তবে শেষ মুহুর্তে ডিসিশন ক্যানসেল করে আমরা বেছে নিলাম মর্ত্যের স্বর্গ বা ভূস্বর্গ ইন্দোনেসিয়ার বালিকেই। যেহেতু বালি যেতে কোনো ভিসা লাগেনা কাজেই ভিসা টিসার ঝামেলারও কোনো চিন্তা নেই। এছাড়াও আমাদের আপনার চেয়েও আপন যে জন জাভেদ আঙ্কেলকে বললেই উনি টিকেট থেকে শুরু করে হোটেল, ট্রান্সপোর্ট ট্যুরগাইড সব কিছুর ব্যাবস্থা করে দেবেন নিজের ক্রেডিট কার্ড দিয়েই। কাজেই সোজা ফোন কল আর তারপর প্যাক করাকরি শুরু হলো। আমাদের প্রথম গন্তব্য ঠিক করা হলো নুসা দুয়া বিচের কোনো রিসোর্টে।


আমি অনলাইনে হোটেল বা রিসোর্ট খুঁজতে খুঁজতে নুসা দুয়াতে পেয়ে গেলাম একেবারেই রুপকথার মত মনোমুগ্ধকর এক হোটেলের খোঁজ। কোটইয়ার্ড ম্যারিয়ট, ছবি দেখেই আমি মুগ্ধ কাজেই এখানেই আমাকে থাকতেই হবে। জাভেদ আঙ্কেল সকল ব্যাবস্থা করে দিলেন। ব্যাস, সকল ব্যাবস্থা রেডি কিন্তু ফ্লাইট হিসাবে উনি উপদেশ দিলেন মালিন্দো এয়ার লাইন্সের কথা। এই এয়ার লাইন্স নাকি সস্তা তবে লাস্ট মোমেন্ট বলে কথা, কি আর করা? কিন্তু উনি বললেন তাদের সেবা নাকি বেশ ভালো। যাইহোক উনার মতামত শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে হলো। যদিও এই এয়ারলাইন্স সম্পর্কে যে সব নেগাটিভ কথাগুলি শুনেছি তাই নিয়ে একটু ভয় ভয় ভাবটাও ছিলো। সে যাইহোক নতুন বছরের প্রথম দিনটিতেই আমাদের যাত্রা হলো শুরু....


~আমাদের যাত্রা হলো শুরু ~ ফ্লাইট ছিলো সেই রাত দুপুরে মানে ১২ টা ৫০ শে। এমনিতে আমি যতই বীর সাহসী অকুতভয় হই না কেনো, কিছু কিছু ব্যাপারে আমার অকারনেই ভয় পাবার ব্যাধি আছে। তার মধ্যে যেমন একটা, রাত দুপুরে বদ্ধ প্লেনের জানালা দিয়ে দেখা বাইরের ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। মনে হয় যেন আমি অকূল পাথারে আছি, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলো বলে।:( কিন্তু দিনের বেলা আলোকজ্জ্বল সুনীল আকাশের সাদা সাদা পেঁজা তুলো মেঘের মাঝে পরীর মত উড়ে চলা বা পাখির মত ভেসে যাওয়াতে আমার কোনোই সমস্যা নেই বরং তখন আমি থাকি আনন্দে ঝলমল। যাইহোক কি আর করা। হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরে পৌছে বোর্ডিং পাস টাস পাবার পরে অপেক্ষা সেই ঘুরঘুট্টি আঁধারে ভেসে চলার জন্য। যথাসময়ে প্লেনে উঠলাম এবং খেয়াল করলাম ভীষন সুন্দর সাদা টপস আর গোলাপী কালো ডিজাইনের ইন্দোনেসিয়ান ড্রেস পরা ঝকঝকে তকতকে পরিপাটি এয়ার হোস্টেজদেরকে এবং প্ল্যান করে ফেললাম এই ড্রেস আমাকে কিনতে হবে। :) যদিও ওদের সামনের দিককার উন্মুক্ত পার্ট ডিজাইনটা আমার স্যুইটেবল মনে হয়নি। যাইহোক, সিট বেল্ট টেল্ট বেঁধে বুঁধে বসার কিছুক্ষন পর যখন ফুড দেওয়া হলো। ফুড দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ! ঘ্রানে অর্ধায়নং ভোজনং বলে একটা কথা শুনেছিলাম কিন্তু ঘ্রানে ভোজনং পলায়নং বলে নতুন একখানা প্রবাদ নিজের জন্যই সেদিন আবিষ্কার করলাম। এয়ার হোস্টেজ বললো সেটা নাকি ভেজি বিরিয়ানী! ( ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।) বলে কি! কুকটাকে দেখার বড় ইচ্ছা হলো। এই ইচ্ছা আমার পরবর্তীতে কয়েকবারই হয়েছিলো। সে যাইহোক, ৪ ঘন্টা ঘুরঘুটি আঁধার পাড়ি দিয়ে শাহরুখ খানের সিনেমা রায়ী শেষ করে গিয়ে পৌছালাম মালয়েশিয়া এয়ার পোর্ট। এখানে একটা কথা বলি রায়ি সিনেমা আমার তেমন ভালো লাগেনি কিন্তু ছোটবেলার শাহরুখ চশমার সন্ধানে গান্ধিজীর স্ট্যাচু থেকে গ্লাসহীন চশমা চুরি করে নিয়ে আসে এটা মজা লেগেছিলো খুব খুব।


~কুয়ালালামপুর মালয়েশিয়া এয়ারপোর্টে আড়াই ঘন্টা~ কোনো কাজ ছাড়া আমি চুপচাপ কোথাও বসে থাকতে পারিনা। আবার কোথাও গিয়ে মোবাইলে চোখ ডুবিয়ে রাখতেও আমার ভালো লাগে না কাজেই এই আড়াই ঘন্টা কি করবো ভেবেই আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম কিন্তু ঝকঝকে সুন্দর এই এয়ারপোর্টের সুশোভিত বিপনীবিতানগুলি ঘুরে ঘুরে এবং অসাধারণ আইসকফি আর পেস্ট্রি আস্বাদনে প্রাণ জুড়ালো! ফের মালিন্দো করে বালির উদ্দেশ্যে যাত্রা এবং আবারও ভয়ংকর জঘন্য টাইপ রান্নার ভেজি স্প্যাগেটির গন্ধেই তাহা আমি প্রত্যাখান করিয়া দিলাম এবং জানালায় চোখ রেখে দেখলাম নীচে সুনীল সমুদ্রের পাড় জুড়ে এক আশ্চর্য্য সুন্দর সর্পীলাকৃতির রেইনবো বিচ। বিচের গোলাপী পিচ রং বালির ধার ঘেষে সবজেটে পান্না রং আর ফিরোজা নীল, গাঢ় নীলের লেয়ার লেয়ার জলরাশি যেন সাগরের তীরেও এক রংধনুমালা নিয়ে আছড়ে পড়েছে।


~বালির মাটিতে পা দিয়ে প্রথম প্রহর~ বালি ডেনপাসার এয়ারপোর্টে যখন পৌছালাম তখন দুপুর ১২ টা।এখানে বলে রাখি
ডেনপাসার বালির রাজধানীও ।এয়ারপোর্টে নেমেই অপরুপ সুন্দর সব স্টাচু দর্শনে মন ভরালো। কিন্তু মন ভরাবার আরও বাকী ছিলো। আমরা এয়ার্পোর্টের ট্রান্সপোর্টের গাড়ি করে হোটেলে উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবার পথে চারিদিকের এক ঝকঝকে পরিবেশে মুগ্ধ হলাম। প্রতিটা গাছের পাতা যেন কেউ কেবলি হোস পাইপে ধুয়ে দিয়ে গেছে। উজ্জ্বল রং এর ফুলগুলি সব আলো ছড়াচ্ছিলো। আর দু কদম ফেলতে না ফেলতেই শুধুই অপরুপ কারুকার্য্যমন্ডিত ভাস্কার্য্য। হোটেল পর্যন্ত পুরো রাস্তায় নাক ঠেকিয়ে রাখলাম গাড়ির কাঁচে। যত দেখি যেন পলক পড়ে না।


~কোর্টইয়ার্ড বাই ম্যারিয়ট~ পুরো ভ্যাকেশনই কাঁটিয়ে দেওয়া যায় যে রিসোর্টে~ রিসোর্টে পৌছুতেই অপূর্ব সোনালী সজ্জায় সজ্জিত এক বালিনীজ মেয়ে গেটের কাছে তার অপূর্ব সৌন্দর্য্য নিয়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী নাচের মাধ্যমে আমাদেরকে স্বাগত জানালো। তার আগে অবশ্য বিশাল এক গার্ড ডগ দিয়ে আমাদের গাড়ির আনাচে কানাচে সার্চ করা হয়েছিলো নিরাপত্তার সুবিধার্থে। নৃত্যের পরে আপ্যায়ন করা হলো শরীর জুড়িয়ে যাওয়া ছোট ছোট মাটির গ্লাসে করে দেওয়া আইস লেমন পানীয়ে। অতঃপর সুসজ্জিত রুম আমাদের সকল ক্লান্তি কাটিয়ে দিলো।


একটু রেস্ট নিয়ে গোসল এবং খাওয়া সেরে আমি হেঁটে হেঁটে রিসোর্টের চারিপাশ ঘুরে দেখলাম এবং মুগ্ধ হলাম এবং মুগ্ধ হলাম! মনে হলো কোথাও আর যাবার নেই এখানেই কাটিয়ে দেওয়া যায় পুরো ভ্যাকেশন।


~নুসাদুয়া বিচ~ বিকেলে রিসোর্টের নিজেদের গাড়িতেই নিয়ে গেলো নুসাদুয়া বিচে। সুনীল জলরাশির শেষ প্রান্তে আছড়ে পড়া শ্বেত শুভ্র ঊর্মিমালা। নয়ন জুড়িয়ে যায়। তীরে আছড়ে পড়া ঢেউগুলো দিয়ে নীল সবুজ গোলাপী রঙে মেশানো এক অপূর্ব রৈখিক জলরাশির মিলনমেলা, মন ভরিয়ে যায়। কিছু পরে এলো সুর্য্য ডোবার পালা। আমরা হাঁটতে হাঁটতে এলাম লাইট ফেসটিভ্যাল পার্কে। সেখান থেকে বালি কালেকশন সুবিশাল উদ্যান শপিংমল এরিয়ায় কাঁটালাম কিছুক্ষন। একজন গায়ক অপূর্ব মোহনীয় সূরে গান গেয়ে চলেছিলো। ট্যুরিস্টরা অনেকেই তাকে রিকুয়েস্ট করছিলো গান গাইতে। আমরা কাঁঠের বেঞ্চে বসে ছিলাম। কিছু পরে সামনের মলগুলো ঘুরে দেখলাম। পানি, চিপস, বিস্কিট আর চুলের কিছু মন মাতানো হেয়ার ক্লিপ কিনে হট পিজাতে খেলাম রাতের খাবার। এই এতটুকু শপিং এই আমাদের লক্ষ্য লক্ষ্য কোটি কোটি শেষ হয়ে গেলো! এই লক্ষ্য এবং কোটি প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। আমি তো শেষ পর্যন্তও হিসাব করতে পারিনি। এদের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ বেশ ভালো। তবে শুনেছি রাজনৈতিক সংকটে নাকি ব্যাংক কয়েকবার রুপিয়ার মান কমিয়ে দেয় । এছাড়া বেশ বছর কয়েক আগে এখানে বেশ কয়েকবার মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। তাই একটা টপস কিনতে হয় এক থেকে দেড় লাখ রুপিয়ায় আর একটা চুলের ক্লিপ তিরিশ/ চল্লিশ হাজার টাকায়! ২ বোতল পানির দাম ১০ হাজার! তার মানে এই বালির মাটিতে পা দিলেই আমরা সবাই কোটি কোটি কোটি পতি হয়ে যাই! সে যাইহোক খুব খুব ক্লান্ত থাকায় লক্ষ কোটি টাকা পয়সা খরচ করে রুমে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম সেদিন......
এই গেলো প্রথমদিনের বালি ভ্রমনের কিচ্ছা কাহিনী। ইন্দোনেশিয়া অন্য সব প্রদেশ গুলোর মধ্যে সবচাইতে ক্ষুদ্র প্রদেশ হচ্ছে বালি। কিন্তু এখানে রয়েছে নীল সবুজে মেশানো এক অপুর্ব জলরাশি সমৃদ্ধ সমুদ্রতট বা বালুকাবেলা, মোহনীয় পর্বতমালা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মন্ডিত পর্যটকদের জন্য দর্শনীয় স্থান, অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর মন্দির, স্মৃতিস্তম্ভ, সাফারি পার্ক, আর্ট মিউসিয়াম ইত্যাদি ইত্যাদি ও ইত্যাদি যা দেখবার, ঘুরবার ও মন মাতাবার জন্য পরদিনের অপেক্ষায় রইলাম।







সেকেন্ড ডে ইন বালি- ভেবেছিলাম খুব ভোরে উঠে আমাদের অপূর্ব সুন্দর রিসোর্টের উদ্যান ঘুরে দেখবো। এমন এক স্বর্গীয় উদ্যানে মর্নিং ওয়াক ভাবাই যায় না। কিন্তু বিঁধি বাম। এত ক্লান্তির পরে এমন ঘুম ঘুমিয়েছি যে চিরদিনের ভোরের পাখি আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো অন্যেরাই। কি আর করা তখন বাজে সকাল ৮টা । তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে ব্রেকফাস্টের উদ্দেশ্যে বের হলাম। চারিদিকে রোদ্র ঝলমল সোনালী দিন, গাছের পাতায় রোদের ঝিলিমিলি। বিশাল সুনীল স্যুইমিং পুলের ধার ঘেষে টেবিল চেয়ার পেতে সকলে প্রাতঃরাশ সারছে। আমি মুগ্ধ মুগ্ধ এবং মুগ্ধ! রাশি রাশি খানা পিনা। সবচেয়ে আশ্চর্য্য যেটা শুধু ব্রেকফাস্টের উদ্দেশ্যেই বানানো হাজার হাজার খানা নয়, স্বাদে ও গন্ধে এবং পরিবেশনাতেও তারা মন মাতানো, চোখ জুড়ানো। এত এত খাবারের কথা বললে মনে হয় দিন ফুরিয়ে যাবে।


ব্রেকফাস্টের পর আমরা আমাদের রিসোর্টের ট্রান্সপোর্ট থেকেই সারাদিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে ফেললাম। অন্য কোথাও থেকে গাড়ি নিলে আরও ২/৩ লাখ কমে পাওয়া যেত হয়তো কিন্তু নিরাপত্তা ও বিলাসের কথা ভেবে আমরা সেটাই নিয়ে ফেললাম। প্রথম দিনে ১০ ঘন্টার জন্য তারা চাইলো ১০ লাখ। সেটাকে টেনে টুনে পরদিন থেকে সাত লাখ করা হয়েছিলো। তবে গাড়ি, সার্ভিস, গাইড এবং ড্রাইভার ছিলো এক্সসেলেন্টো! :)


আমাদের ড্রাইভার কাম গাইডের নাম ছিলো কেটুট। আমি প্রথমে তাকে কেতক( কেতক কেতকী ভেবেছিলাম আর কি) তারপর কেটুক আরও নানা কিছু বানাবার পর বুঝলাম তার নাম কেটুট। এটা নাকি ওদের ছোট ছেলেদের নাম। যাইহোক নামের প্রসঙ্গ নিয়ে তাদের আছে বিশাল ইতিহাস। যাইহোক তো কেটুট আমাদেরকে নিয়ে চললো বাতওয়ান ভিলেজে-


~বাতুওয়ান ভিলেজে বাতুওয়ান মন্দির~ মন্দিরে ঢোকার আগে ওদের নারী পুরুষ নির্বিশেষে ওদের ড্রেস সিরং পরতে হয়। এটা এক ধরনের লুঙ্গি টাইপ পোষাক যা আমাদের দেশের রাঙ্গামাটি চিটাগংএও পরতে দেখেছি। যাইহোক ওরা একটা হাতে উঠে আসা যে কোনো সিরং দিতে চাচ্ছিলো আমাকে আমি নিজে বেঁছে নিলাম আমার ড্রেসের সাথে ম্যাচ করে। যাইহোক মন্দিরে ঢুকে অপূর্ব শৈল্পিক কারুকার্য্যে চোখ জুড়িয়ে গেলো।


~মড আর্ট গ্যালারী~ মন্দির থেকে ফেরার পথে ড্রাইভার আমাদেরকে নিয়ে গেলো এক অপরুপ আর্ট শপে। সেখানে কাঁঠের মূর্তীগুলির শৈল্পিক কারুকার্য্যময় সৌন্দর্য্য মনে গেঁথে যাবার মত। কিন্তু আকাশ ছোঁয়া দাম আর লাখ লাখ কোটি দামের কারণে সেসব ছোঁয়াই আমাদের দুসাধ্য ছিলো তবুও আমি জিদ ধরলাম আমার লাগবেই লাগবে বালিনিজদের এই সব হাতের কাজগুলি অন্তত দুটি হলেও। শেষে লাখ লাখ কোটি কোটি দিয়ে আমার সঙ্গীসাথীদের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে দুটি কাঁঠের মূর্তী বগলদাবা করে গাড়িতে উঠলাম।


~কার্মা স্যুভেনিয়র শপ~ এরপরে ড্রাইভার আমাদেরকে নিয়ে গেলো যেখানে সেই শপটিকে মোটামুটি আমাদের দেশের আড়ং বলা যায়। জামা কাপড় থেকে শুরু করে নানা রকম হস্তশিল্প, জ্যুয়েলারী রয়েছে সেখানে। সেখান থেকে আমি নিয়ে নিলাম টপাটপ কয়েকটি সিরং এবং টপস এছাড়াও বালীনিজদের তৈরী নানা রকম জ্যুয়েলারী, ডেকোরেশনের ছোট্ট থালা প্লেট, ক্যাপ এসব....আমি ছাড়া অন্য সকলেই আমার এই শপিং বাতিকে মহা বিরক্ত হচ্ছিলো কিন্তু তাতে চোখ এবং মন দেবার সময় ছিলো না আমার। :)


~উবুড সিটি~ চললাম আমরা উবুড সিটির পথে। চারিদিকে মনোমুগ্ধকর ঘরবাড়ি, গাছ পালা। অবাক হয়ে দেখি আর ভাবি এ দেশের ৯৯% মানুষই কি শিল্পী আর সৃষ্টিশীল কাজেই জড়িত? প্রতিটা বাড়ি, দেওয়াল, গেট, বাড়ির পাশের এক টুকরো জায়গা সবই নানা রকম মূর্তী শোভিত। মাইলের পর মাইল বড় বড় মূর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর্ট ফ্রাক্টরী বা শপগুলো। আমরা রিসোর্ট নিয়েছিলাম নুসা দুয়া শান্ত শিষ্ট এলাকায় কিন্তু উবুড বেশ ক্রাউডি এবং পর্যটকে ভরা রাস্তা। সেই সময়টা লাঞ্চ টাইম থাকায়। রোডসাইড খাবারের দোকানগুলো গিজ গিজ করছিলো পর্যটকে। আমাদের গাড়ি মাংকি ফরেস্টে পার্ক করে ড্রাইভার বললো আমাদেরকেও লাঞ্চ সেরে নিতে।
আমরা হেঁটে হেঁটে উবুডের রাস্তা ধরে আবিষ্কার করে চললাম সেখানকার জীবনযাত্রা। খুব গরম পড়েছিলো সেদিন। আমি এসিওয়ালা কোনো খানাশপ খুঁজছিলাম কিন্তু পাওয়াই যাচ্ছিলোনা সবই খোলা মেলা হাওয়া খেলানো রেস্তোরা। শেষ মেষ তেমনই এক রেস্তোরায়, বার্গার, পিজ্জা এসব দিয়েই লাঞ্চ সারা হলো এবং সেই পিজ্জা বার্গার শপে বসেই আমি দেখলাম এক কাপড়ের দোকানে ঝুলানো মনোমুগ্ধকর টপস আমি খাওয়া ছেড়ে সেদিকে দৌড় দিলাম এবং ২লাখ টাকা দিয়ে ২টা টপস কিনে আনলাম। :) এরপর সবাই নাকি মাংকি ফরেস্টে ঢুকবে। এটা শুনে আমার আক্কেল গুড়ুম আমি সোজা বলে দিলাম তোমাদের ইচ্ছা হলে যাও আমি এখানেই এই নৈস্বর্গিক সৌন্দর্য্যে হাওয়া খাবো। সেখানে আমি রয়ে গেলাম।


আমি এক দিকে কাঁঠের বেঞ্চে বসে প্রথমে কুমীরটাকে আঁকার ট্রাই করলাম তারপর ব্যার্থ হয়ে সারাদিনের দিনপঞ্জী লেখায় মন দিলাম।

~ মোহনীয় কেচাক ডান্স~ মাংকি টেম্পল থেকে ওরা সবাই ফেরার পর ড্রাইভার বললো আমাদেরকে নিয়ে যাবে উলুয়াটু মন্দিরে সেখানে সূর্যাস্তের পর দেখবো আমরা তাদের ঐতিহ্যবাহী মোহনীয় নৃত্য কেচাক ডান্স। এই নাচের কথা আমি আগেই শুনেছি কাজেই নাচের চাইতেও ওদের সেই অপরূপ সাজসজ্জার প্রতি ছিলো আমার মহা কৌতুহল কাজেই সোৎসাহে গাড়িতে চেপে বসলাম। এই কেচাক ডান্সের জন্য টিকেট লাগে। এবং টিকেট কাটার সাথে সাথে দুইজন বালিনিজ গার্ল তাদের অপরুপ সাজসজ্জায় আমাদের সাথে ছবি তোলার জন্য রেডি ছিলো।


আমি তো লাফ দিয়ে একের পর এক ছবি তুললাম তবে এর উদ্দেশ্য যে আরও কিছু তা পরে বুঝলাম। যাইহোক তারা আমাদেরকে এই নাচের ইতিহাস ও গল্প বিষয়ক একটি লিফলেট দিলো। সারি সারি চেয়ার দিয়ে সাজানো গ্যালারীতে শুরু হলো আমাদের অপেক্ষা। যথাসময়ে নাচ শুরু হলো। অবাক হয়ে দেখলাম এক বিশাল দলের লোকজন চেক চেক সাদা কালো সিরং পরে কেচ কেচ কেচ কেচ করে শব্দ করছে এটাই নাকি ঐ নাচের মিউজিক। তারা সবে গোল হয়ে বসলো শুরু হলো একে একে সীতা, রাম, লক্ষণের ইতিহাস।হুনুমান দেবতার আবির্ভাব হলো। সব চেয়ে মন মাতানো নাচটাই ছিলো অগ্নিদেবের আগুনের উপর দিয়ে তান্ডব নৃত্য। এমনকি সে মাঝে মাঝে আগুন তুলে খেয়েও ফেলে! সে যাইহোক শো শেষে আমি দৌড়ে গিয়ে অগ্নিদেবের সাথে ছবি তুললাম। তাকে বললাম তার পারফরমেন্সে আমি তার প্রেমে পড়ে গেছি। এইভাবে কাউকে আগুন দিয়ে পোড়াতে হলে আমি তাকে স্মরণ করিবোক! :) :) :)

যাইহোক সব শেষে ফেরার পালা। বের হবার গেটের ধারেই ক্ষুদে পসারীদের মেলা । তারা নানা রকম মালা, দুল চুড়ি, ক্যাপ বিক্রির জন্য আমাদেরকে ছেকে ধরেছিলো। কিন্তু সব ছাপিয়ে আমি ওই কেচাক ডান্সের মুকুট দেখে মহা মুগ্ধ! সাথে সাথে লুফে নিলাম সেই মনো মুগ্ধকর কেচাক নৃত্যের মুকুট। এবার এগিয়ে আসলো একজন সেই প্রবেশ দ্বারে আমরা যে বালিনীজ নৃত্য সজ্জায় সজ্জিত মেয়েদের সাথে ছবি তুলেছিলাম সেই ছবি প্লেটে করে স্টান্ড সহ ছাপিয়ে এনেছেন তারা। কিনতে হবে ১ লক্ষ্য আশি হাজার টাকা দিয়ে। কি আর করা! শখের তোলা মাত্র আশি টাকা আর এই আজব রাজার দেশে শখের তোলা এক লক্ষ আশি হবে এ আর নতুন কি!


ফেরার পথে আমরা সবাই ম্যাকডোনাল্ডে রাতের খাবার খেয়ে ফিরে এলাম....
বালির তৃয় দিনঃ
~আমাদের সেদিনের প্ল্যান ছিলো কিন্তামানি মাউন্ট বাটুর দর্শন~ সমুদ্র থেকেও আমার পাহাড় বেশি প্রিয়। কিন্তু এই পাহাড় তার বুকে আগ্নেয়গিরি নিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে বছরের পর বছর। হ্যাঁ এটি একটি পুরনো ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি।এর নিচে রয়েছে লেক বাটু যা বালির সবচাইতে বড় প্রাকৃতিক হ্রদ। তো শুরু হলো আমাদের যাত্রা। যথারীতি কোর্টইয়ার্ড ম্যারিয়টের রাজকীয় ব্রেকফাস্ট বা ব্রাঞ্চ সেরে আমরা চললাম কিনতামানির পথে। পথে যেতে যেতে আবার সেই পলক না পড়া বিশাল সব মন ভরানো প্রাণ জুড়ানো স্ট্যাচু। আমাদের ড্রাইভারকে ধরে আমরা রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ছবি তুললাম সেসবের কিছু কিছু। পথের ধারেই পটারী ফ্যাক্টরী। শৈল্পিক এসব চিত্রে সত্যই অবাক হতে হয়।


আড়াই ঘন্টা পথ পরিক্রমায় আমরা পৌছালাম কিনতামানি মাউন্ট বাটুর বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির পদপ্রান্তে। আমাদের ড্রাইভার সেখানে এক বিশাল রেস্টুরেন্টে গাড়ি পার্ক করিয়ে দিলো। বললো এ ছাড়া নাকি গাড়ি পার্ক করার জায়গা নাই! আমরা ব্রাঞ্চ করে এসেছি এখন খাবো কি করে! তবুও ড্রাইভারের জ্বালায় এখানে কিছু মিছু অর্ডার দিতে হলো এবং যথারীতি না শেষ করেই উঠতে হলো। তবে খাবার খেতে না পারলেও মাউন্ট বাটুরের অপরূপ সৌন্দর্য্যে প্রাণ জুড়িয়ে গেলো।
বাটুরের পাশেই বয়ে চলা সুনির্মল লেক প্রাণ ভরিয়ে দিলো। সেখানে কিছু স্যুভেনিয়র শপ ছিলো। আমি সুযোগ বুঝে ঝপাঝপ কয়েকটা হস্তগত করলাম।


~লুয়াক কফি গার্ডেন~ফেরার পথে কিছুক্ষনের জন্য একটি লেকের ধারে দাঁড়াতে গিয়ে বাঁধলো বিপত্তি। এক ঝাঁক ক্ষুদে পসারী আমাদেরকে ছেকে ধরলো। তাদের হস্তশিল্পগুলি না কিনে আমাদেরকে আসতেই দেবেনা। যাইহোক কোনো রকমে তাদের থেকে পরিত্রান পেয়ে আমরা ছুটলাম বিশ্ব বিখ্যাত কফি লুয়াক প্লান্টেশন গার্ডেনে ।


একটা দারুন স্মার্ট মেয়ে বর্ননা করছিলো কি ভাবে আদা, তুলশী নানা রকম হারবালে কফি তৈরী করে তারা এবং কফি বিন কেমন দেখতে হেন তেন। এরপর দেখি খাঁচার মাঝে বিড়ালের মত দেখতে কিছু প্রাণী। এরাও নাকি কফি বানায় মানে সিভেট নামের এই প্রানীর হাগু থেকে নাকি হয় কপি লুয়াক ( copy luwak)। সিভেটকে কফি ফল খেতে দেয়া হয়। খেয়ে দেয়ে কফি বীজ হজম করতে পারে না এরা। তাই আস্ত বীজগুলো হাগুর পরে বেরিয়ে আসে এসবই ধুয়ে মুছে কপি লুয়াক পাওয়া যায়। এটা নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কফি।

এককাপ কফির দাম নাকি পাঁচ/ছয় হাজার টাকা। তাও নাকি এখানে একটু দাম কম কারণ এই কফি এই দেশে জন্মায়।
যাইহোক সেই স্মার্ট মেয়েটা আমাদেরকে ছোট ছোট কাপে চা-কফি এনে দিলো। ভ্যানিলা, ডার্ক চকলেট, আদা চা, লেমন গ্রাস চা, জিনসেং কফি। সবগুলো টেস্ট করে আমরা নিলাম হার্বাল, লেমন গ্রাস আে জিনসেং কফি। তাদের আসল বিশ্বখ্যাত কফি লুয়াক দিলো না সেটা নাকি দেওয়াই যাবেনা । খেতে গেলে নাকি সেই ৫/৬ হাজার খরচ করতে হবে। কাজ নাই তো! মনে মনে বললাম, এই বিশ্বখ্যাত আসল কফি লুয়াক ফ্রিতে দিলেও চাইনা। মাফ চাই।


~হোলি স্প্রিং~ এই হোলি স্প্রিং এ দেশ বিদেশ থেকে মানুষ আসে শাওয়ার নিতে। আমরা যখন সেখানে পৌছালাম সেটি ছিলো বৃষ্টিস্নাত পড়ন্ত দুপুর। চারিদিক ঝকঝকে তকতকে এবং অজস্র কারুকার্য্যমন্ডিত পাথরের মূর্তী। হোলি স্প্রিং কারু খচিত মন্দিরগুলিও মন ভরিয়ে দেয়। অনেকেই ঝর্না থেকে ঝরে পড়া পানিতে গোসল করছিলো, প্রার্থনা করছিলো।




সেই মোহনীয় পবিত্র দৃশ্য হৃদয়ে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। এই হোলি স্প্রিং এর পাশেই রয়েছে সুবিশাল হান্ডিক্রাফটস মার্কেট। নানা রকম চোখ জুড়ানো শিল্পকর্মে হৃদয় ভরে নিয়ে আমরা জীমবারান বিচের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।


~জীমবারান বীচ~ জীমবারান বীচে পৌছালাম যখন বিকালের সমুদ্র বিলাসে তখন গা ভাসাবার বেলা। হিমেল বাতাসে চারিদিক উন্মাতাল। বীচের বালুকা বেলায় চেয়ার টেবিল পেতে বসে আছে হাজারও পর্যটক। হালকা নাস্তা করছে, চা কফি ওয়াইন খাচ্ছে। কেউ কেউ বীচের পানিতে পা ভিজাচ্ছে । সবারই প্রতীক্ষা সূর্যাস্তের জন্য। একসময় দিকচক্রবাল আলো করে সূর্য্য অস্ত গেলো। বীচের সাথেই মনোহর মঞ্চে নেমে আসলো পরীদের মত বরমা ড্যান্সাররা। তাদের নাচ দেখতে দেখতেই চলে এলো ফিস গ্রীল, ফিস ফ্রাই সাথে বেতের ঝুড়িতে কলাপাতা বিছিয়ে সাদা ধপধপে ভাত আর শাকের ভর্তা। নানা রকম সস আর সালাদ। লবস্টার গ্রীল আর রেড স্ন্যাপার ফ্রাই অর্ডার দেওয়া হয়েছিলো। সেসব এ্যকুরিয়ামে কাঁচা সাজানোই থাকে অর্ডার দিলে সেখান থেকেই ভেঁজে দেওয়া হয়।


ফিস গ্রীল, যুই ফুলের মত স্টিমড রাইস আর নানা রকম মসলা মাখানো শাকের ভর্তা দিয়ে ডিনার সেরে ফিরবার পথে আকাশ আলো করে আতশবাজী উড়ছিলো। গানের দল মাঝে মাঝেই গান গেয়ে ঘুরছিলো। সে এক সমুদ্র বিলাসী সন্ধ্যা পিছে ফেলে আমরা ফিরে গেলাম আমাদের রিসোর্টে সেদিনের মত.....


চতুর্থ দিন বা ফোর্থ ডে ইন বালি


~মোহনীয় রোড স্ট্যাচু~ সেদিনের মেইন প্ল্যান ছিলো উলানদানু ফ্লোটিং টেম্পল। কিন্তু উলান দানু যাবার পথেই থমকে দাঁড়ালাম। বালীতে দেখা আমার হাজার হাজার সুদৃশ্য স্ট্যাচুগুলির মাঝে সব চাইতে মুগ্ধ করা স্টাচুটার সামনে। এই সুবিশাল সৌন্দর্য্য ক্যামেরায় বন্দী করা যায় না, যায় না দুচোখের স্মৃতিতেও বুঝি আটকানো। তাই তো যে দিকেই তাকাই সেদিকেই রহস্য যেন ফুরায় না। সুবিশাল যুদ্ধ প্রান্তরে বিশালদেহী ছুটন্ত ঘোড়াগুলি। দুটি তেজস্বিনী ঘোড়ার মাথার উপরে দুই পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বীর যোদ্ধা। মুখোমুখি রথে ধনূর্বাণ হাতে আরেক অকুতোভয় সাহসী যোদ্ধা। মুগ্ধ করে দেয়। এই স্টাচুর পিছে ধর্মীয় ইতিহাস আছে দেব দেবী রাম লক্ষন সীতা রাবন জড়িত কিছু একটা। এই ইতিহাস তখনও আমি জানতাম না। Sang Satria Sejati, Gatotkaca | Patung Kuda বালিনিজ ভাষায় সকল ইতিহাস, তাই আমি বুঝিনি সে গল্প। আমাদের ড্রাইভার কাম গাইডও তেমন কিছু বলতে পারলো না তবে বাসায় ফিরে আমি অনেক কষ্টে এই স্টাচুর কিছু ইতিহাস পেলাম। এই স্টাচু গাতোকতাকে রি প্রেজেন্ট করে। ষে ছিলো একজন সাহসী এবং শক্তিশালী নাইট। বিমার ছেলে আর পঞ্চপান্ডবদের একজন। উড়্ন্ত দেবতা বা ফ্লাইং নাইট হিসাবে পরিচিত ছিলো। যার কাজ ছিলো আকাশ পথে পান্ডুয়া রাজধানীকে নিরাপত্তা ও রক্ষা দান করা। এই স্টাচু রিপ্রেজেন্ট করছে যুদ্ধক্ষেত্র পান্ডুয়া। গাতকতা ও রাজপুত্র কর্নের এই যুদ্ধে যার ঘোড়াগাড়ি চালক ছিলো সালিয়া কুরুয়া। গাতকতা নিজের জীবন উৎসর্গ করে কর্নের প্রানঘাতী অস্ত্রের কাছে। যে অস্ত্র একবারই ব্যবহার করা যেত অর্জুনকে বাচাতে। মহাভারতের নানা কাহিনীর ইতিহাস নিয়ে এখানে রয়েছে নানা রকম নাটক, নাচ বা স্থাপত্য শিল্প। তবে এই সুবিশাল সৌন্দর্য্যমন্ডিত স্টাচুটি শুধু সৌন্দর্য্যের জন্য নয় তাদের বিশ্বাস এয়ারপোর্টের আগত ও বহির্গত মানুষদের প্রটেকশনের জন্য এই মূর্তী বা মূর্তীর পিছে রক্ষাকারী দেব দেবীগণ ভূমিকা রাখে।

শুধু এই স্থাপত্য শিল্পটি নয় আরও অবাক করা দৃশ্য, এই স্টাচুর বিশাল রাজপথের ঠিক মধ্যখানে বিশাল প্রান্তরের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো যা সম্প্রীতি, পারস্পারিক সন্মান ও সৌজন্যবোধের প্রতীক। সেটি একটি মসজিদ, মন্দির এবং গীর্জা । এই মূর্তীর সামনেই গলাগলি করে দাঁড়িয়ে আছে তারা।একই প্রান্তরে একই কাতারে এই তিন ধর্মের উপসনালয় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বন্ধুর মত যেন হাত ধরাধরি করে।



~উলানদানু ফ্লোটিং টেম্পল~ যাইহোক দীর্ঘ আড়াই ঘন্টা পাড়ি দিয়ে পৌছালাম উলানদানু টেম্পলে। পথে বজ্রবৃষ্টি দেখে চিন্তায় পড়েছিলাম তবে আমরা যখন পৌছুলাম তখন বৃষ্টি ধরে গেছে। ঝিরঝির শীতল পানির ছাট হিম ধরিয়ে দেয় গায়ে। একজন ছাতাওয়ালী আমাদেরকে টাকার বিনিময়ে ছাতা ভাড়া দিলো। কিন্তু রংধনু সাতরঙ্গের সেই ছাতা যেন উলানদানু মন্দিরের রংধনু রঙ্গের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেলো। অপরূপ সৌন্দর্যের দ্বীপ এই বালিতে রয়েছে অসংখ্য মন্দির। পুরা ইন্দোনেশিয়ায় বালীই একমাত্র স্থান যেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। বেশ কিছু মন্দির রয়েছে এখানে যা পর্যটকদের অবশ্য দর্শনীয়। যেমন- উলুন দানু, তামান আয়ুন, উলুওয়াতু ওয়াটার মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দির।


উলানদানু মন্দিরটির আশপাশ জুড়ে রয়েছে বাগান ও হংসমিথুন সদৃশ বোটে করে নৌ ভ্রমন করা যায়। সুনীল জলরাশির মাঝে সুউচ্চ মন্দিরের সৌন্দর্য্য প্রান ভরিয়ে দেয়। এর পাশেই রয়েছে খাবারের দোকানগুলি। আমরা সেখানে বিকালের নাস্তা খেলাম। এরপর তাদের হস্তশিল্প মার্কেটে ঢুকে আমি আর সহজে বের হতে পারলাম না। যখন বের হলাম সাথে ছিলো সিরং, টপস, ক্যাপ,চুড়ি, মালা, ব্রেসলেট, ফ্রিজ ম্যাগনেট,ব্যাগ, বেল্ট ও নানা রকম জিনিসপাতি তবে সবচেয়ে আনন্দ হলো যা কিনে তা হলো কেচাক ড্যান্স ডল। একটা নেবো নাকি দুইটা নাকি তিনটা করে করে শেষে ৪টা ডল নিয়ে নিলাম। ওহ আরেকটা কথা। কেচাক ডান্স ডলের মতই কেচাক ড্যান্সের মুকুটগুলি কিনেও আমি কম আনন্দিত হইনি।



এরপর ফিরে এলাম ফের নুসা দুয়া বালি কালেকশনে। এক গাঁদা হাবিজাবি কিনে ব্যাগ বোঝাই করে রুমে ফিরলাম আমরা।

বালিতে পঞ্চম দিন


~স্যুইমিং পুল~হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে পড়তে চাইনি বলে এই রিসোর্টের মনোমুগ্ধকর স্যুইমিং পুলে ঘন্টার পর ঘন্টা ডুবে থাকার ইচ্ছাটা এই কদিন দমন করেছিলাম। কিন্তু যাবার সময় ঘনিয়ে আসছিলো তাই লাস্ট দুদিন আর স্যুইমিং পুলে না নেমে পারলাম না। আগেই বলেছি স্বর্গীয় উদ্যানের মত সাজানো এই রিসোর্টটি। স্যুইমিং এ বসেই পাওয়া যায় নানা রকম পানীয়। চারিদিকে লাইফ গার্ডের সতর্ক অবস্থান ও যে কোনো রকম সাহায্যের আয়োজন সত্যিই অবাক করে। আসলে শুধু এই হোটেলটিতেই নয় পুরো বালীর সকল মানুষের সৌহার্দ্যপূর্ন আচরণ আর হাসিমুখ মনে রাখবার মত।


~কুটা বীচ ও কুটা স্কোয়ার~পুরো সকালটাই বলতে গেলে স্যুইমিং এ কাটিয়ে আমরা গেলাম কুটা বীচ। কুটা বিচ এখানকার দীর্ঘ বালুকাময় সমুদ্র সৈকত। এই বিচ কখনো ঘুমায় না যত রাত বাড়ে এই বিচ ও আশেপাশের দোকান পাট মানুষজন তত জেগে ওঠে। সারা বিকেল বিচে কাটিয়ে আমরা বের হলাম কুটা স্কোয়ারের উদ্দেশ্যে । এ মাথা থেকে ও মাথা হেঁটে হেঁটে চষে বেড়িয়েছি। পুরো শহর আনন্দে ঝলমল। তাজা মাছের গ্রীল, চিকেন, বীফ থেকে শুরু করে নানা রকম খাবারের পসরা। ম্যাক ডোনাল্ড, বার্গার কিং এর মত শপগুলোও রমারমা আগমনী বার্তা জানা্চ্ছে। বড় বড় শপিং মলগুলোর আলোকিত সজ্জা আমাকে হাত ছানিতে ডাকছিলো। আমি পারফিউম, দুল আর কিছু শো পিস কিনে চরম শপিং বিদ্বেষী আমার সঙ্গী সাথীদের বিরক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে ঘুরে ঘুরে তাদেরকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সেদিনের মত শপিং এ ক্ষ্যান্ত দিলাম।


~আর্ট মার্কেট~ কুটা স্কোয়ারের আর্ট মার্কেটের কথা ভোলা যায় না। কি নেই এখানে!! এমনিতেই হস্তশিল্পের দারুন পরিচায়ক বালীনিজরা। তাদের কারুকার্য্যের বিশাল বিশাল নিদর্শন ছড়িয়ে আছে সারা দেশ জুড়েই। তবুও এই আর্ট মার্কেটগুলোতেও দেখার ও কারো সংগ্রহের শখ থাকলে তা অতি সহজেই পেয়ে যাবার জন্য এই আর্ট মার্কেটগুলি অতুলনীয়। এখানে বিশাল বড় এ্যকুরিয়ামে ছোট ছোট মাছের মাঝে হাত ডুবালেই তারা ঝাক বেঁধে ছেকে ধরে ও হাতের ডেড সেলগুলি খেয়ে ফেলে। যাই হোক মাছ দিয়ে আমার হাত খাওয়াবার কোনো সাধ নেই আমার যদিও, তবে অনেকেই এই কাজে দারুন মজা পাচ্ছিলো।

ফেরার সময় আমরা ফের গেলাম ম্যাকডোনাল্ডে। বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ আর কোক হলেই আমাদের রাতের ডিনার চলে যায় আর তাছাড়া সারাদিন ঘুরাঘুরিতে চিপস বাদাম আর বিস্কিটের সাধ্যে আমাদের তেমন খিধেও ছিলো না। রাত প্রায় ১১ টায় হোটেলে ফিরলাম আমরা রাতের মনোমুগ্ধকর কুটার আলোকজ্জ্বল নগরী পরিভ্রমন করে।








ষষ্ঠ ও শেষ দিন ইন বালি
~ এক টুকরো স্বর্গীয় উদ্যানের কোর্টইয়ার্ড বাই ম্যারিয়ট~ শেষমেষ এলো ফিরে যাবার বেলা।স্যুইমিং আর ব্রেকফাস্ট শেষে। আমরা পুরো হোটেল ট্যুরের আয়োজন করলাম। এই হোটেলের মনোহর সৌন্দর্য্যের কথা আগেই বলেছি এখন শুধু ছবি তোলার পালা। আমাদের রিসোর্টর্টি ছিলো কোর্টইয়ার্ড বাই ম্যারিয়ট। এখানে রয়েছে অপূর্ব সুন্দর সজীব সবুজ ঘাস আর ভাস্কর্য্যের উদ্যান, গল্ফ মাঠ, স্যুইমিং পুল, নিজেদের বিচ এরিয়া, বিচ রেস্টুরেন্ট, ফ্রি ট্রান্সপোর্ট টু বিচ আরও আরও নানা সুবিধাবলী। যতটুকু পেরেছি ছবি তুলে রাখার চেষ্টা করেছি আমি। যদিও আমার এহেন কার্য্যকলাপে আমার সঙ্গী সাথীরা বড়ই বিরক্ত ছিলো। আমি তাতে নো পাত্তা....


~ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা ~ শেষ মেষ আকাশপথে দীর্ঘ পরিভ্রমন শেষে পা রাখলাম দেশের মাটিতে। তখন রাত ১২ টা। বুক ভরে শ্বাস টেনে নিলাম। চোখে নিয়ে ভ্রমনের স্মৃতি, বুকে নিয়ে রাশি রাশি ভালোলাগাময়তা তবুও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে গেয়ে ওঠে প্রাণ.....ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা.......অস্ফুটে চুপি চুপি নিজেকেই বললাম, সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি......
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ১১:৪২
৮৬টি মন্তব্য ৯১টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তুমিও কি শুনতে পাও?

লিখেছেন শাহরিয়ার কবীর, ১৭ ই জানুয়ারি, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:২১


পরম নারী মূর্তির
অগ্নি-পরীক্ষার আরেক পরীক্ষার প্রতিচ্ছবি
মায়াবীনী তোমার মধ্যে কি এমন পবিত্র মায়া
তা হয়তো আমি জানি না !
কিন্তুু কি যেন এক সুর বাজে
দিশেহারা এ হৃদয়ের মাঝে।
তুমিও কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

এক চিলতে আকাশ

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ১৭ ই জানুয়ারি, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:৩৬


পারবে না কেউ—কেড়ে নিতে তোমায়
এ মায়াবী বাঁধন ছিঁড়ে,
ওগো মায়াবতী!
হৃদয়ের গহীনে থেকে—শব্দ এনে
বেঁধেছি তোমায় কবিতার ফ্রেমে
অক্ষত অবিকৃত
চিরন্তন শাশ্বত বন্ধন সে!

চাইলেই পারবে কি?
... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাইতুল্লাহর মুসাফির (পর্ব-৮)

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৭ ই জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ৮:৩১



কালো পাথরের মায়ার টানে
হজরে আসওয়াদ। কালো পাথর। পবিত্র বাইতুল্লাহর পূর্ব কোনে বসানো জান্নাতি পাথরখন্ড। এই পাথরের প্রতি মানুষের হৃদয়ের ভালবাসা। প্রানপন কসরত এ্ই পাথর ছুঁয়ে দেখার। চুমু খাওয়ার পবিত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

আশঙ্কা

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ১৮ ই জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ৩:১৫

ভয় হয় বুঝি মেঘ কেটে যায়
এই বুঝি টুপ করে চলে আসে ভালোবাসা
সুখের দমকা হাওয়া এই বুঝি খেলে যায় পালে
অথৈ সাগরে অসুখের ডিঙা যায় এই ডুবে;
ভয় হয় সুখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বুঝলাম না দেশে এত মানুষ থাকতেে শামীম ওসমান আপনাকে বেছে নিল কেন ?

লিখেছেন :):):)(:(:(:হাসু মামা, ১৮ ই জানুয়ারি, ২০১৮ সকাল ৮:৫৭


না না মনের ভিতর এরকম একটা প্রশ্ন জাগাই সম্ভব।আর সেটা শুধু আমারই না বরং আরো সচেতন অনেকে মানুষেরি কাছে
প্রশ্ন জাগতে পারে বা জাগাতাই স্বাভাবিক।দেশে আরো কত গণ্যমাণ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×