somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুপারি-বন্দনা

১৫ ই আগস্ট, ২০১০ দুপুর ১২:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর কবিতায় লিখেছেন 'পান সুপারি। পান সুপারি। এইখানেতে শঙ্কা ভারি।'
কারো কারো অজানা থাকতে পারে, বাংলা ভাষায় সুপারি শব্দটি বিদেশী ভাষার দান। সুপারি এক সময় ভারতের সোপর বা সুর্পারক বা শূর্পরিক বন্দর হয়ে বিদেশে যেত। আরবীয় বণিকদের ধারণা ছিল এটা সোপর বা সুর্পরক বন্দরের ধারে কাছেরই ফল। এ কারণে তারা সুপারির নাম দেয় সোপারা। তাদের দেয়া এ নাম বিবর্তিত হয়ে মধ্যযুগেই সুপারিতে এসে ঠেকেছে। সুপুরি বানানভেদ।
ইতিহাসবিদরা বলেন, ভারতের বহিঃবাণিজ্যের প্রাচীন প্রমাণ হচ্ছে 'সুপারি' শব্দটি। পশ্চিম ভারতের সূর্পারক বন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যে গুবাক বা গুয়া রফতানি হতো, তার নামকরণের অর্থ হয়েছিল 'সোপারা' বন্দর থেকে রফতানি করা ফল।
সুপারির বৈজ্ঞানিক নাম আরিকা ক্যাটেচু। এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে সুপারি জন্মে। পানের সঙ্গে খাওয়া হয় বলে ভুলবশত ইংরেজিতে এটা নাম হয়ে গেছে বেটেল নাট। অথচ পান গাছে মোটেও বাদাম ধরে না।
শুকনো, কর্তিত, পানিতে গাজানো আর সতেজ অবস্থায় এটা বাজারে বিক্রি হয়। সুপারি পাকলে এটার খোলসের রঙ হলুদ বা কমলা রঙের হয়ে যায়। তখন এটার ভেতরের শাস হয়ে যায় কাঠের মতো শক্ত। এ শুকনো সুপারি জাঁতি নামের একটি যন্ত্র দিয়ে কাটা হয়। এটা বাংলাদেশের কিছু কিছু এলাকায় 'সরতা' নামে পরিচিত হলেও শব্দটি বাংলা নয়, হিন্দি। এটা মারাঠিতে আদাকিত্তা, মালয়ালম ও তামিলে পাককুভেত্তি, কানাড়িতে আদেকি কাত্তারি, তেলেগুতে আদাকাত্তেরা, গুজরাটিতে সুরি ও সিংহলিজে গিরায়া নামে পরিচিত।
নেপালিরা আমাদের মতোই সুপারি বলে। আবার এটা অসমে গুয়া, বার্মিজে কুরআ, মালদ্বীপে ফুবাহ, হিন্দিতে সুপারি, ইন্দোনেশিয়ায় পিনাং, জাভায় জেমবি, কম্বোডিয়ায় লুয়ুস, খেমারে কগ, উড়িয়ায় গুয়া, তাইওয়ানে বিনলেঙ, থাইল্যান্ডে মাক, উর্দুতে চালিয়া, ভিয়েতনামে কাউ নামে পরিচিত।
সুপারি হালকা ধাঁচের উত্তেজক। পানের সঙ্গে চিবানোর পর শরীর খানিকটা গরম হয়। সুপারিতে রয়েছে ট্যানিন, গ্যালিক এসিড, ওয়েল গাম, টারপিনকোল, লিগনিন, খনিজ লবণসহ তিন ধরনের অ্যালকালিও -- আরিকোলিন, আরিকেইন ও গুভাসিন। আয়ুর্বেদিক ও চীনা ভৈষজ ওষুধে সুপারি ব্যবহৃত হয়। পানি শোধনেও সুপারির ব্যবহার রয়েছে। টুথ পাউডারের একটি উপাদান হচ্ছে সুপারিচূর্ণ।
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে দেখা গেছে, চার হাজারেরও বেশি বছর আগে সুপারি ঘোড়ার গাড়ির চাকায় ব্যবহৃত হতো। তবে পৃথিবীর কোন দেশে প্রথম সুপারির প্রচলন হয়েছিল, সে ব্যাপারে প্রামাণ্য কোনো তথ্য আমাদের হাতে নেই। ধারণা করা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম সুপারির প্রচলন ঘটে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন সাহিত্যে সুপারির উল্লেখ রয়েছে। তামিল চিরায়ত সাহিত্য 'শিলাপাদিকরম'-এ নায়িকা কিভাবে তার প্রেমিককে পান-সুপারি দিয়ে আপ্যায়িত করছেন, তার বর্ণনা রয়েছে। আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে সুপারির নানা গুণের কথা বলা হয়েছে। তবে পঞ্চম শতকে গুপ্ত যুগ থেকে যে ভারতীয় উপমহাদেশে সুপারি চিবানোর রেওয়াজ বেড়ে যায়, তার প্রমাণ রয়েছে।
১১ শতকের পান্ডুলিপি 'মানসোল্লাসে' রাজকীয় পরিবারের আটটি আনন্দ বা ভোগের একটি হিসেবে সুপারি চিবানোর কথা উল্লেখ রয়েছে। আর ১৩ শতকে পরিব্রাজক মার্কো পোলো ও ১৪ শতকে ইবনে বতুতা তাদের লেখায় বর্ণনা করেছেন, সুপারি কিভাবে দিল্লি সালতানাতের রাজকীয় খাবারের অপরিহার্য অংশ হয়ে যায়। সুপারি নিয়ে ট্যাং ও ল্যাং নামের দুই চীনা রাজপুত্রের আকর্ষণীয় উপাখ্যানও রয়েছে। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, ভিয়েতনাম পর্যন্ত পান ও সুপারি ভালোবাসা ও বিয়ের প্রতীক। ভারতে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সুপারির উপস্থিতি অপরিহার্য। ভিয়েতনামেও একই রীতি অনুসরণ করা হয়।
বৈদিক যুগেরও আগে হরপ্পা সভ্যতার সুপারি চিবানোর রেওয়াজ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। মধ্যযুগের স্পেনিশ অভিনেত্রী আলেভেরো ডি মেনডেনা তার ভ্রমণ কাহিনীতে সলোমন দ্বীপপুঞ্জের লোকজনের পান ও সুপারি চিবানোর সরেস বর্ণনা দিয়েছেন।
তাইওয়ানের রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে নারীরা সুপারি বেচেন। আটসাট পোশাকের কারণে তারা 'হট চায়না গার্ল' বা 'ইরোটিক বিচেস' নামে পরিচিত। স্থানীয় ভাষায় বলা হয় 'বিনলাং জিশি' বা সুপারি সুন্দরী। তাইওয়ানিরা পান না খেলেও সুপারি চিবাতে ওস্তাদ। এটাকে তাদের জাতীয় বিনোদনও বলা যায়। ২০ শতাংশ তাইওয়ানি সুপারি চিবোয়। অবশ্য তারা প্রক্রিয়াজাত সুপারি চিবোয়। পরিসংখানে দেখা গেছে, বছরে তিনশো কোটি ডলারের সুপারি বেচাকেনা হয় দেশটিতে।
লন্ডনের কুয়িন মেরি ইউনিভার্সিটির মেডিসিন ও দন্ত বিভাগের ডাক্তাররা তাদের এক গবেষণায় দাবি করেছেন, বিশ্বের ১০ শতাংশ লোক সুপারি চিবায়।
পৃথিবীতে এক হাজার প্রজাতির সুপারি রয়েছে। তবে সব প্রজাতির সুপারি খাওয়া যায় না। বিশ্বে বিষাক্ত সুপারিও রয়েছে।
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×