আমার স্বপ্নের শহর নোয়াখালী। আরও নির্দিষ্ট করে যদি বলি তাহলে নোয়াখালীর ‘মাইজদী শহর’। আমার জন্মস্থান নয় কিন্তু এ শহর আমার কাছে তার চেয়েও বেশি কিছু। তাই ১০ বছর আগে এই শহর ছেড়ে এলেও এখনও সুযোগ পেলেই বন্ধু মনিরের বাসায় গিয়ে উঠি। কিছুদিন আগে এরকম একবার বাসে চেপে বসলাম মাইজদীর উদ্দেশ্যে। বাসে টুকটাক হাল্কা পড়ার অভ্যাস আছে। ব্যাগ ভর্তি বই ছিল। তবু নিয়তি বা খারাপ নিয়তি যাই বলি আমি বের করলাম উন্মাদ। বাসে আমার পাশের সিটটি তখন পর্যন্ত খালি। সামনে আরও দুটির মত কাউন্টার আছে।
সুতরাং সিটটি খালি যাবেই এমন ভাবতে পারছিলাম না।
আমি ক্লাস নাইনে থাকতে শার্লক হোমস রচনাসমগ্র্ পড়ে শেষ করেছিলাম। তারপর থেকেই শয়নে স্বপনে খালি শার্লক হোমস বিরাজ করত। ঘরে বাইরে শুধু রহস্যের সন্ধান করতাম। কিন্তু হায় একী দেশ! নব্য শার্লক হোমসের জন্য কোথাও কোন রহস্য নেই! এরপর আমিও বড় হয়েছি আরো...
কিশোর থেকে যুবক হয়েছি। অনার্স পড়াকালীন সময় বুকশেল্ফ থেকে হোমস্ কে আবার বুকে টেনে নিলাম। আবার একনিঃশ্বাসে শেষ করলাম কোনান ডয়েলের অমর সৃষ্টি... আমার বিচারে এই পৃথিবীর সেরা শিল্পকর্মের একটি। কারণ যতোবারই এই বই একজন রহস্যপ্রেমী পড়বে ততোবারই সে নতুন করে মজা পাবে যেমনটি আমিও পেয়েছি। তবে শেষবার পড়ে আর রহস্য সন্ধানে প্রবৃত্ত হইনি যেমনটি স্কুল জীবনে হয়েছিলাম। এবার আবিষ্কার করলাম আরো একটি অসাধারণ জিনিস তা হল মানুষ পর্যবেক্ষণ। কোন অপরিচিত লোককে দেখে তার সম্পর্কে সঠিক অনুমান করে অন্যকে বা তাকেই চমকে দেয়া।
বলা দরকার আমার এ চর্চা আজো থামেনি। আমি কোন অপরিচিত মানুষ দেখলেই নানান রকম অনুমান করি... অনুমান গুলো কতোটা চমক জাগানিয়া বা সঠিক হয় তার নমুনা আমার পাশের সিটের সহযাত্রী যে একটু পরেই বাসে উঠে আমার পাশে বসবে।
আমার সহযাত্রী আমির উঠেছিল যাত্রাবাড়ী থেকে। সে যেখান থেকে উঠেছে সেখানে আমার বাসটির কোন কাউন্টার ছিল বলে আমার মনে হয় না। তাহলে সে উঠল কীভাবে?
নিয়তির লিখন সে আমার পাশের সিটে বসবে এবং বসল...
আমি ‘উন্মাদে’ উন্মনা... পাশের লোকটিকে পর্যবেক্ষণের সময় আমার নেই। কিন্তু...
-আন্নে কী টিকিট কাইটছেননি?
-আপনাার কী মনে হয় টিকেট না কেটে উঠছি?
-আঁই অবশ্য কাডি ন’... (আমি টিকেট কাটি নাই) আন্নে বোকামী কইচ্ছেন... আন্নে দিছেন ২০০ টেঁআ আর আঁই দিমু ১২০ টেঁআ! বুইজ্জেন বাংলাদেশে সব সিস্টম আছে... সিস্টম জাইনতে অয়!
এ পর্যন্ত শুনে আমি সহযাত্রীর দিকে না তাকিয়ে যথারীতি শার্লক হোমস্ হবার চেষ্টা করলাম...
১/ যুবকটি বেশি কথা বলে
২/ যুবকটি শিক্ষিত নয়
৩/ তার বাড়ী নোয়াখালী
৩ নাম্বার সিদ্ধান্তটি নিতে শার্লক হোমস হবার কোন প্রয়োজন ছিল না কিন্তু হোমসের নিয়ম অনুযায়ী খুঁটিনাটি কোন কিছুই হেলাফেলা করা যাবে না !
মনে মনে আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম সারাটা পথ আমাকে এই বাচালের বকবক সহ্য করতে হবে। তাই বাচালদের এড়ানোর একমাত্র পথ ‘তাদের কথার জবাব না দেয়া ’ অনুসরণ করার চেষ্টা করলাম। আমি বেশ শিক্ষিত ভাব নিয়ে তার কথার জবাব না দিয়ে আবার উন্মাদ পড়ার দিকে মনোযোগ দিলাম। কিন্তু...
-আম্নের আতে কী? (আপনার হাতে কী)
-কী মানে?
-মানি কী পইড়তেছেন? উন্মাদ নি?
আমার মনে হল আমি যেন আকাশ থেকে থুক্কু ধপ করে বাস থেকে পড়ে গেলাম! এ ব্যক্তি উন্মাদও চিনে? তাহলে আমার শার্লক হোমস সেন্স কী ...
-আঁই উন্মাদের বিরাট ভক্ত
(অ্যাঁ এ বেটা উন্মাদও পড়ে? দেখি তো বদ্ধ উন্মাদ না কী আবদ্ধ উন্মাদ)
- আপনি উন্মাদ পড়েছেন?
- ওমা অিয়ান কিয়া কন? হুনেন হইত্যে তিনমাসে আঁই একবার ঢাকা যাই। যে মেসে আঁই উডি হে মেসের শরীফ ভাই নিয়মিত উন্মাদ কিনে। আঁই যাই তিন সংখ্যা একত্তরে (একসাথে) সাবাড় করি!
- আপনি পড়ালেখা করেছেন কতদূর?
- মেট্টিক হাশ কইচ্ছি টানিটুনি...
- উন্মাদে কার লেখা আপনার বেশি ভাল লাগে?
- অনেক খান
- কার লেখা?
- আরে অনেক খান আছে না অনেক খান...
- ওহ্ আচ্ছা অনিক খান!
- আর কার লেখা ভাল লাগে?
- ডাইরেক্টর আহোশান হাবীব এর কেীতক আর কার্টুনও বালা লাগে...
- কিন্তু উনি তো উন্মাদের ডিরেক্টর নন সম্পাদক
- এক্কই কতা... যে সম্পাদক হেই ডাইরেক্টর
- আচ্ছা কোনটা ওনার আঁকা কার্টুন বুঝেন কীভাবে? ওনার কার্টুনে তো ওনার নাম থাকে না।
- বেকুব মনে কইচ্ছেন নি? কার্টুনের শ্যাষে সিকনিচার দ্যান ন’?
(এরপর আমি মনে মনে কানে ধরি! জীবনে আর কোনদিন শার্লক হোমস পর্যবেক্ষণ প্রয়োগ করিব না!)
কিছুক্ষণ বিরতির পর...
- আইচ্ছা আন্নে কীয়ারেন? উন্মাদ লই এতকিছু জি¹াইলেন আন্নেও উন্মাদের কেউ নি?
- না না ... আমি টুকটাক লিখি পত্রিকার ফান ম্যাগাজিনে
- কেইচ্ছা লেখা?
- এই রম্য গল্প, রম্য, অণুকাব্য এই টাইপ
- আন্নেও অনেক খান অইতে চান নি?
- জ্বি ভাই আমিও অনেক খান হইতে চাই! এত বড় অনেক খান যে ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেলেও প্রতিখান হবে এক এক খান ‘অনেক খান’!
(মনে মনে বলি শার্লক হোমস তোর কপালে গুল্লি মারি!)
-----------------------------

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


