ব্রিটিশ শাসনামলে বাঙ্গালীদের একটা বড় অংশের ইংরেজির প্রতি বাড়তি আকর্ষণ জেগেছিল। তখন তাদের এই মেকি আচরণকে ডাকা হত ইংরেজিয়ানা নামে। তারপর ব্রিটিশ বিতাড়িত হয়ে এল পাকিস্থান। এরাও বাঙ্গালির মায়ের ভাষার দাবিকে অগ্রাহ্য করে উর্দুকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইল। বাঙ্গালীদের মধ্যে অনেকেই আবার তখন তাদেরকে সাধুবাদ জানিয়েছিল।এদের কথা কবি আবদুল হাকিম বলে গেছেন,- ‘যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবানী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’
এদেশের সন্তানরা একসময় ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন অথচ আমরা অনেকেই কথায় কথায় বিদেশী ভাষা ব্যাবহার করে তথাকথিত আধুনিক হতে চাই। এ অধুনিকতাও ও যে ঠিকমত হয় তা কিন্তু নয়, এখানেও থেকে যায় সমস্যা । ওই যে গোড়ায় গলদ থাকলে যা হয় আরকি। একবার এক ইংরেজিবোদ্ধা বড় ভাই আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন, ‘এই তোমার প্রোনাউনক্রিয়েশন(pronounciation) ওরং (Wrong) হচ্ছে,শুদ্ধ করে পড়।’ আমার এই বড় ভাইতো তবু স্বঘোষিত ইংরেজিবোদ্ধা কিন্তু দেশে অনেক সুপ্রতিষ্ঠিত ইংরেজিবোদ্ধা আছেন যারা কোন বিষয়ের উদাহরণ টানতে গিয়ে হরহামেশাই suppose ; ধরো কিংবা Example স্বরুপ উদাহরণ; টাইপের বানী ব্যাবহার ফেলবেন। বাংলা কবিতায় সনেটের প্রবর্তক মধুকবি মাইকেল মধুসুধন ও চেয়েছিলেন ইংরেজ হতে। প্রথম অবস্থায তিনি বাঙলা ও বাঙ্গালিকে অবজ্ঞা করে ইংরেজিতে কাব্য লেখা শুরু করেন।পরে ইংরেজি ভাষায় মনের ব্যাকুলতা প্রকাশ করতে না পেরে ফিরে আসেন বাংলায়। লেখেন ‘হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন’..নিজেকে পরিচয় দেন যশোরের বাঙ্গাল বলে। বাংলা সাহিত্যেও আরেক খ্যাতিমান লেখক বঙ্কিমচন্দ্রও প্রথম উপন্যাস লিখেছিলেন ইংরেজীতে, পরে মনের ক্ষুধা মেটাতে বাংলায় লিখতে শুরু করেন। এই বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করে গেছেন নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শরৎচন্দ্র, মানিক, তারাশঙ্করের মত সাহিত্য দিকপাল। আজ বাংলা যেখানে বিশ্বে অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃত সেখানে বাংলা নিয়ে কেন আমাদের এই হীনমন্যতা? আজ আমাদের নবীন প্রজন্ম , যারা তথাকথিত ইয়ো কিংবা ডিজুস জেনারেশন কালচারের মোহে অন্ধ তারা কি আসলেই জানে কোন দিকে ছুটছে তারা? দোষকি আমাদের বাংলা মা ও ভাষার নাকি অন্য কোথাও? বন্ধু বউ নিয়ে মমতাজের বাড়ির সামনে দিয়ে গেলে তার বুক যেমন একেবারে ফাইট্টা যায়, আর আমাদের বুকটাও ফাইট্টা যায় যখন দেখি এদেশের কোন সন্তান বাংলায় কথা বলতে পারে না। বলতে পারে না বললে হয়তো ভুল বলা হবে, কারণ তারা বলার চেষ্টা করে না। বাংলায় কথা বললে যদি মান ইজ্জতে ঘাটতি দেখা দেয়!
যখন কেউ জোর করে ইংরেজি বলতে চায, তখন তার জন্য খুব মায়া হয়, আহা বেচারা নিজেকে জাতে উঠানোর জন্য কত বড় রিস্কটাই না নিল। আবার কারো কারো ইংরেজি উচ্চারণ শুনলে তো মুখে পাথরচাপা দিয়েও হাসি আটকে রাখা যায় না। যার নিজের মাতৃভাষা শুদ্ধভাবে চর্চার এতটুকু আগ্রহ নেই তার কাছে বিদেশী ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ আশা করা নেহায়েই অন্যায় এটা নিশ্চয়ই সবাই বুঝবেন।
সত্যিই আমাদের রক্ত দিয়ে কেনা বাংলা ভাষাটা শুদ্ধভাবে চর্চার প্রতি আজ কারও যেন এতটুকু আগ্রহ নেই।ভাষা ব্যাবহারের নিয়ম কানুন বিধি ব্যাবস্থা থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগের ব্যাপারে কারো নেই কোন সচেতনতা। আমাদের বাংলা অভিধান থাকলেও এটা মেনে চলছে কয়জন? প্রমান চাইলে হাতের কাছের কোন জাতীয় দৈনিকের পাতা উল্টিয়ে দেখুন। প্রত্যেকটি পত্রিকার আছে নিজস্ব বানানরীতি আবার একই বানান বিভিন্ন পত্রিকা করছে বিভিন্নভাবে - ফেব্রুয়ারি/ফেব্রুয়ারী, ঈদুল আযহা/ঈদুল আজহা...তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর।এসবের কারণে শুদ্ধ ভাষা চর্চা নিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ছে বই কমছে না।
(হাত ব্যাথার কারণে সাময়িকভাবে স্থগিত। চলবে...)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



