অমিতাভ-রেখা। বলিউডের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রোমান্টিক জুটি। রূপালি পর্দায় এই জুটির সোনালি দিন পেরিয়ে গেছে বহু আগেই। কিন্তু এদের জুটির সেই চিরকালীন আবেদন আজও এতোটুকু মলিন হয়নি। যদিও ১৯৮২ সালের সুপার ডুপার হিট ছবি “সিলসিলা”র পর থেকে কোনো ছবিতেই আর একসঙ্গে দেখা যায়নি এই জুটিকে, তবুও সিলসিলা ছবিতে দর্শকরা তাদের দুজনের যে সম্পর্কের রসায়ন দেখেছেন, তা যে আসলে দুজনের মধ্যেকার গভীর এক বাস্তব প্রেমেরই প্রতিফলন, কড়া মেক আপ আর সেলুলয়েডের ফিতাও তা লুকোতে পারে নি তাদের অসংখ্য ভক্তের দৃষ্টি থেকে। সত্যি আর কল্পনা মিশিয়ে তাদের রোমান্স আর ভালোবাসার গল্প বারবার শিরোনাম হয়েছে সিনে পত্রিকাগুলোতে। আর আশির দশকে ফিল্মী অঙ্গনের সবচাইতে বড়ো গসিপ ছিলো বলিউড দুনিয়ার রাজা-রাণী অমিতাভ আর রেখার প্রণয়োপাখ্যান। অমিতাভ এবং রেখার সম্পর্কের বিষয়টি ঘিরে আজবধি মানুষজন বিশ্বাস করে যে, রূপালী পর্দার এই দুই বিখ্যাতজনের মাঝে কিছু-না-কিছু না থেকেই পারে না। কখনোই পাদপ্রদীপের আলোয় না আসা সেই প্রেম কাহিনী আজও রহস্য থেকে গেছে অসংখ্য ভক্তদের মনে।
পুরনো পত্রিকা আর ওয়েবসাইট ঘেঁটে সাম্প্রতিক একটা ঘটনার কথা বলেই শুরু করা যাক। দীর্ঘকাল বাদে সম্প্রতি এক মাহেন্দ্রযোগ ঘটেছিলো ৫৪তম ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে। আরো একবার মুখোমুখি হয়ে গেলেন রেখা আর অমিতাভ। দুজনের সাক্ষাতে যেন জ্বলে উঠল বহু আগের সেই ছাইচাপা আগুন। বহুদিন বাদে আবারো মিডিয়ায় উঠে এলো গরম খবর। খবর কিছুই না, সামাজিক শুভেচ্ছা বিনিময় করতে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে অমিতজীর বাড়ি গিয়েছিলেন রেখা। পরনে ঝলমলে শাড়ি। কিন্তু শাড়ির ঔজ্জ্বল্য ছাপিয়ে অভ্যাগতদের নজর কেড়ে নিলো কপালের ওপরে গভীর করে টানা উজ্জ্বল রক্তিম সিঁদূর। চিরসবুজ রেখাকে নিজের সামনে দেখামাত্র অবাঞ্ছিত বিড়ম্বনা এড়াতে নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন অমিতাভ। কী আর করবেন রেখা। আলিঙ্গন আর চুম্বনে আশীর্বাদ করলেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনকে। অভিষেকের কপোলে এঁকে দিলেন স্নেহচুম্বন। আর কোলাকুলি করলেন অমিতাভেরর পাশের আসনে বসে থাকা শাহরুখের সাথে। এরপর শুভেচ্ছা জানাতে অমিতাভের দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই বিনাবাক্যে নীরবে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন অমিতাভ। এসব দেখে শুনে নিরসনের পরিবর্তে আরো ঘনীভূত হয় রহস্যজাল। অমিতাভ উপস্থিত থাকবেন বলেই কী রেখার কপালে সিঁদূর? গোপনে কাউকে ইতোমধ্যেই বিয়ে করে ফেলেছেন রেখা? নাকি বহু আগে অমিতাভের সাথেই গোপনে বিয়ে হয়েছিলো তার? তিনি কি এখনও নিজেকে অমিতাভের স্ত্রী মনে করেন?
(এই এক ছবিতেই হৃদয় ভেঙ্গেছিল রেখার)
সুযোগ পেলেই অভিনেতা-অভিনেত্রীকে জুটি বানিয়ে কল্পনার জাল ছড়িয়ে দেয়া রূপালি জগতে নতুন কোনো বিষয় নয়। অমিতাভের কাজ পর্যালোচনা করলে দেখা গেছে, খ্যাতির মধ্যগগনে অবস্থানকালীন পত্রিকা কাভারেজ পেতে কখনোই মিডিয়ার শরণাপন্ন হননি তিনি। মিডিয়াই বরং নিজস্ব প্রণোদনায় নানা সময়ে তাকে নিয়ে ছেপেছে ইতং বিতং মুখরোচক নানান কাহিনী।
খ্যাতির আলোয় তখন ঝলমল করছেন রেখা। “খুবসুরত” ছবিতে রেখার কাজ দেখে প্রশংসার ঝড় বইলো চারদিক। অমনি তার নাম হয়ে গেলো লেডি অমিতাভ বচ্চন। মিডিয়া ছুটে গেলো তার কাছে। কোথায় শিখলেন এমন দুর্দান্ত অভিনয়? জবাবে নিজের অভিনয় প্রতিভার পুরো ক্রেডিটটুকু অমিতাভকে দিয়ে দিলেন রেখা। যা কিছু শিক্ষা, সব তারই দান। এই কথা কানে যেতে বিষম চটে গেলেন অমিতাভ। জানালেন, আমি কিছু জানি না। আমি বলতে পারবো না কেন রেখা আমাকে তার অভিনয়ের ক্রেডিট দিচ্ছেন। তাকে আমি কখনোই কিছু শেখাইনি। শিক্ষাদীক্ষার ফয়সালা যাই হোক, সত্তর-আশির ম্রিয়মান দশকে বলিউডের ইন্ডাস্ট্রিকে চাঙ্গা করে তুলতে সবচাইতে সফল অভিযানের সর্বাগ্রে ছিলেন এই জুটি। বলিউড চলচ্চিত্রের গৎবাঁধা নিষ্প্রাণ অভিনয়ের যুগে অকষ্মাৎ প্রাণের হিল্লোল তুলেছিলো এই জুটির সপ্রাণ সতেজ সজীব আবির্ভাব। “দো আনজানে” থেকেই তাদের সেই জনচিত্ত জয়ের শুরু। এরপর একে একে এসেছে “আলাপ”, “ঈমান ধরম”, “খুন পাসিনা”, “গঙ্গা কি সুগন্ধ”, “মুকাদ্দার কি সিকান্দার”, “মি. নটবর লাল”, “সুহাগ”, “রাম বলরাম” এবং সর্বশেষ “সিলসিলা”। “সিলসিলা” তাদের সর্বশেষ চমক। এর পরই ভেঙ্গে গেলো জুটি। আরে সেই সাথে মন ভাঙ্গলো অসংখ্য প্রযোজক, পরিচালক আর ল সিনেমামোদী দর্শকের। সিলিসিলা নিয়ে আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠলেও বক্স অফিস হিট করতে ব্যর্থ হলো ছবিটি। ব্যবসা বাড়াতে নাকি এক ধরনের প্রোপাগান্ডাও চালানো হয়েছিলো যে, ছবিটা অমিতাভ রেখার বাস্তব জীবনের প্রেম অবলম্বনেই বানানো হয়েছে। এমনকি উত্সাহী একজন তো লিখেই ফেললো আস্তো এক বই। তাতে রেখার উদ্ধৃতিতে বলা হলো, অমিতাভের বউ জয়া তাকে ডিনারে ডেকেছিলেন। সেখানে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, অমিতাভকে তিনি কোনোদিনই ছেড়ে যাবেন না। তাতে রেখার যা খুশি তাই সে করতে পারে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সিলসিলা ছবিতেও এর অবিকল একটি দৃশ্য রয়েছে, যেখানে রেখাকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করেন জয়া। তারপর তার কাছে জানতে চান, কী চাও তুমি...? বিশেষ এই গ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে আরো ঘটনা। চাংকি পান্ডের মা ছিলেন হেমা এবং রেখার “কমন” বন্ধু। এমনি সময় একদিন বিয়ে হয়ে গেলো হেমা আর ধর্মেন্দ্রের। খবর শুনে খুশিতে বাগবাগ হয়ে চাংকি পান্ডের মায়ের কাছে ছুটে গেলেন রেখা। চাংকির মা রেখার কাছে এতো খুশির কারণ জানতে চাইলে রেখা বলেন, ওর বিয়েটা হয়ে গেলে আমার জন্যেও কোনো না কোনো রাস্তা এবার খুলে যাবে নিশ্চয়ই! যদিও এসব গল্পের ভিত্তি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র বা দলিল কোথাও পাওয়া যায় নি। মিডিয়া তার নিজের গরজেই বাজার গরম রেখেছে অমিতাভ-রেখার মুখরোচক গল্প ছাপিয়ে। ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে ড. হরিবংশ রাই বচ্চনের কাছে এক চিঠিতে অজিত রায় নামের এক হিন্দিভাষী লেখক একবার এসব গল্পের উত্স সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এসব গল্পকে স্রেফ গুজব বলেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কুলি ছবির শ্যুটিং চলাকালীন সময়ে মারাত্মক আহত হয়ে ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি হলেন অমিতাভ। শুনে তত্ণাত্ সেখানে ছুটে গেলেন রেখা। সারাণ বসে থাকলেন পাশে, যদি রক্তের প্রয়োজন হয়, রক্ত দেবেন। কিন্তু অমিতাভের স্ত্রী জয়া এসে এসব দেখে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে হাসপাতাল থেকে বের করে দিলেন তাকে। শুধু তাই নয়, রীতিমতো বারণ করে দিলেন, অমিতাভকে দেখতে আর কখনো যেন রেখা হাসপাতালে না আসেন।
এভাবেই গড়িয়ে চলছিলো সময়। সময়ের চক্রে মিডিয়ার তৈরি করা এসব উত্তেজনা স্বাভাবিকভাবেই ঝিমিয়ে এলো প্রায়। এরি মধ্যে ৮৬-৮৮ সালের দিকে ঘটলো আরেক নতুন ঘটনা, পত্রিকায় ছাপা হলো, উঠতি নায়িকা শ্রীদেবীর সঙ্গে তুমুল প্রেমে লটরপটর করছেন কলকাতার “দাদা” মিঠুন চক্রবর্তী। শ্রীদেবীর গুরু হিসেবে রেখাজীর নামও চলে এলো পত্রিকায়। কেননা, তাকে তিনি শিখিয়েছেন যোগব্যায়াম। “আখেরি রাস্তা” ছবিতে শ্রীদেবীর হয়ে ডাবিং করেছেন রেখা। এটাও নাকি কেবল অমিতাভেরই খাতিরে। গুঞ্জনের আরো পাখা গজালো। শোনা গেলো শ্রীদেবী আর রেখা নাকি নিয়মিত মিলিত হচ্ছেন মিঠুন আর অমিতাভের সঙ্গে, দুজনেরই এক “কমন” বন্ধুর নির্জন বাংলোতে। যদিও এমন গরম খবর বিনাশুল্কে বাজারজাত করা হলেও বরাবরের মতো এবারও খবরের উত্স সম্পর্কে পাওয়া গেলো না কোনো সদুত্তর।
এদিকে হঠাত্ করেই দেশের মানুষ জানলো, মুকেশ আগরওয়াল নামে এক শিল্পপতিকে বিয়ে করে ফেলেছেন রেখা। এর কিছুদিনের ভেতর হঠাত্ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই আত্মহত্যা করলেন মুকেশ। বন্ধনহীন রেখা “খুন ভারি মাঙ্গ” ছবির মাধ্যমে আবারো ব্যস্ত হয়ে গেলেন ফিল্মি ক্যারিয়ারে। মুকেশের সাথে রেখার বিয়ে এবং তত্পরবর্তী আত্মহত্যার ঘটনায় চাপা পড়ে গেলো অমিতাভ-রেখার প্রেমকাহিনী। হয়ে পড়লো সুদূর অতীত। জনতা আবার ভাবতে এবং বিশ্বাস করতে শুরু করলো, ঘটনাটা মূলত তখনই ঘটেছিলো যখন তারা দুজন কাজ করতেন একসাথেই। এই সময় চলচ্চিত্র থেকে বছর পাঁচেকের জন্য সরে দাঁড়ান বিগ বি। ব্যস্ত হয়ে পড়লেন এবিসিএল নিয়ে। এমনি সময় জনপ্রিয় টিভি শো রঁদেভ্যুতে তাকে এনে দর্শকের সামনে হাজির করলেন সিমি গারওয়াল। জানতে চাইলেন রেখার সঙ্গে তার কথিত রোমান্স সম্পর্কে। সরাসরি অনুষ্ঠানে অমিতাভ জানালেন, শুধু রেখা কেন, তার ইতোপূর্বেকার সমস্ত সহঅভিনেত্রী, পারভিন ববি থেকে শুরু করে জিনাত আমান পর্যন্ত, সবাইকে জড়িয়েই গুজব ছড়ানো হয়েছে বহুবার। তার কথায় সায় দিয়ে গেলেন স্ত্রী জয়া। পরবর্তীতে তার এই বক্তব্য নিয়ে এক পত্রিকায় লিখলেন সিমি, ওর কোনো কথাই বিশ্বাস করেনি জনতা। কিন্তু আমার মনে হয় সত্যি কথাই বলেছেন তিনি। ল্যণীয় একটা ব্যাপার হচ্ছে, অমিতাভ-রেখার রহস্য উপাখ্যান এতোই আকর্ষণীয় মনে হয়েছে মানুষের কাছে, তারা নিজেরাই এটা বিশ্বাস করতে চায়। আর তাতে আরো ইন্ধন জুগিয়েছে দুজনের সর্বশেষ ছবি- সিলসিলা। নিরীহ মানুষের সরল প্রশ্ন, কিছুই যদি নাই থাকবে, তো সিলসিলা ছবির পর আর কোনো ছবিতে ওরা একসাথে কাজ করেননি কেন? এক সময় এমন গুজবও শোনা গিয়েছিলো, অভিষেক নাকি রাম গোপাল ভার্মার “ভূত” ছবিতে কাজ করতে নারাজ হয়েছিলেন স্রেফ এই অজুহাতে যে রেখাও আছেন ওই ছবিতে। অনেক বছর পার হওয়ার পরও সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বিভিন্ন সময়ে দার্শনিকতার আশ্রয় নিয়েছেন রেখা। স্পষ্ট ভাষায় কখনোই জানাননি আসলেই কী ছিলো তাদের ঘটনাটা। সিমি গারওয়ালের টিভি শোতে হাজির হয়ে রেখা একবার বলেছিলেন, অমিতাভ হচ্ছেন সেই আদর্শ মানুষ যাকে আমি অনুসরণ করে যেতে চাই। তার এ বক্তব্যের সমর্থনে উপযোগী কয়েক লাইন কবিতাও শুনিয়ে দেন তিনি এ সময়। ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে এসে আওড়ালেন, “তুম রাজে ওয়াফা কিয়া জানো”। এদিকে যেসব মানুষ চিরকাল বিশ্বাস করে এসেছে এই গুঞ্জন, তাদের বিশ্বাসের প্রতিটা খুঁটিকে আরো শক্ত গাঁথুনি দিয়েছে টুকরো টাকরা এসব ঘটনা। তাদের প্রশ্ন, ঘটনা যদি এমনও হয়ে থাকে যে, অমিতাভকে একপাকিভাবেই ভালোবেসেছেন রেখা, তারপরও, ৭০ দশকের শেষ এবং ৮০ দশকের শুরুতে প্রকৃতই রেখার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি। যদিও পরিণতবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে আনেন দুজনই।
অমিতাভ আর রেখার এই রহস্যময় প্রণয়োপাখ্যান এতোই গাঢ় যে, সিলসিলার পর অনেকেই এই জুটিকে নিয়ে ছবি নির্মাণ করার চেষ্টা করেছে কিন্তু সফল হয়নি। এমন কি এই প্রক্রিয়াটা অব্যাহত রয়েছে আজও। সিনেবাজারে জোর গুঞ্জন, কারিশম্যাটিক অমিতাভ আর লাস্যময়ী রেখাকে জুটি করে স্বপ্নের ছবিটি বানানোর দৌড়ে এই মুহূর্তে সবচাইতে এগিয়ে আছেন বলিউডের খ্যাতিমান নির্মাতা সঞ্জয় লীলা বানসালি। যদিও ২০০৬ সালে দেয়া তার এই ঘোষণার পর কেটে গেছে তিন তিনটি বছর। কোনো অগ্রগতি হয়নি পরিস্থিতির। কে জানে হয়তো অন্য কেউই নির্মাণ করে ফেলবে স্বপ্নীল জুটির এই ছবিটি। সে যাই হোক অমিতাভ আর রেখাকে নিয়ে আজও মানুষের যে আগ্রহ, তাদেরকে নিয়ে ছবি বানালে দেশের মানুষ যে হুমড়ি খেয়ে হলে ঢলে পড়বে, একথা বলার অপো রাখে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

