লিখাটি পড়ার আগেই কিছু শর্ত বলে নেই।
যারা নিজেকে ভালো ছাত্র মনে করেন তারা এই লিখা অবশ্যই পড়বেন না।কারণ একজন সাধারন ছাত্র কখনই ভালো ছাত্র সম্পর্কে লিখতে পারে না।এবং এটা আমার একান্তই ব্যাক্তিগত মতামত। কাউকে ছোট করার জন্য নয়।
এবার তাহলে আসল কথায় আসি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে একটা কথা প্রচলিত আছে। "পৃথিবীতে তিনটি জিনিস জিজ্ঞেস করতে নেই। ১)মেয়েদের বয়স,২)ছেলেদের বেতন ৩) ফিজিক্সের ছাত্রদের GPA!!!!”
কোনরকম ভাবে পাশ করতে পারাটাই এখানে বিশাল ব্যাপার হিসেবে ধরা হয়।কারন পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে বেছে বেছে শুধুমাত্র ফিজিক্সেই সব খারাপ ছাত্ররা ভর্তি হয়।এই ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হওয়া মাত্র সব ছাত্র পড়াশোনা বাদ দিয়ে দেয়,সারা বছর ঘুরাঘুরি করে ইত্যাদি ইত্যাদি।এই কারনে ছাত্ররা খারাপ করে।খুব সত্য কথা।তারমানে দাঁড়ালো এই যে অন্য বিভাগে সব ভালো ছাত্র ভর্তি হয় এবং তারাই শুধু পড়াশোনা করে।
এখন ছোটবেলা থেকে শুরু করা যাক।
ক্লাশ নাইনে যখন বিজ্ঞান, মানবিক এবং বাণিজ্য এই তিন বিভাগে ছাত্ররা ভর্তি হয় তখন কথিত(!) ভালো ছাত্ররা বিজ্ঞান নেয়। যারা গণিতে একটু কাঁচা তার মানবিক নেয় আর স্মার্ট স্টুডেন্টরা নেয় বাণিজ়্য। আর এখান থেকেই শুরু হয় যত বিড়ম্বনা।
বিজ্ঞানের ছাত্রদের শুরু হয় পদার্থ, রসায়ন,জীব-বিজ্ঞান,উচ্চতর গণিত ইত্যাদি হাস্যকর এবং পুরো অর্থহীন সব বিষয় গুলো আত্তস্থ করার চেষ্টা।প্রাইভেট টিঊটর, ল্যাব করা সেটা আবার ফ্রেশ খাতায় লিখা ইত্যাদি।সারা বছর চলিত ভাষায় বলতে গেলে দৌঁড়ের উপর থাকা।এভাবে মাধ্যমিক তারপর উচ্চমাধ্যমিক। এই পর্যন্ত আসার পর অনেকেই বুঝতে পারে তারা কত বোকামী করেছে! এত পরিশ্রম করে আসার পর তারা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হত যায় তখন সেই পুরাতন কথা "সিট সংকট"। পরম সৌভাগ্যবানেরা ডাক্তারী অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভার্তি হয়। এরপর ঢাবি।বাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা আর নাই বললাম। সবশেষে কোথাও যখন হয় না তখন প্রাইভেট ভার্সিটি নামক সার্কাসে ভর্তি হয়। তাহলে কথিত ভালো ছাত্ররা পর্যায়ক্রমে যায় বিজ্ঞান—ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ারিং---ঢাবি---রাবি/চবি/শাবিপ্রবি/খুবি-----। আমার মনে হয় না খুব বেশি মানুষ আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করবে।
ঢাবির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে ফিরে আসি। এখানে যেসব শিক্ষক আছেন তারা অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত এবং যোগ্যতা সম্পন্ন এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। যেহেতু তারা সবাই অনেক বেশি জানেন তাই তারা প্রত্যেক ছাত্রকে নিউটন বা আইন্সটাইন বানাতে চান।তাদের উদ্দেশ্য অত্যন্ত মহৎ কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু এতে কিছু সমস্যা আছে।
ফার্স্ট ইয়ারে যে ১৪০ জন ভর্তি হয় তাদের সবাই এখানে নিঊটন হত আসে নাই।অধিকাংশ এসেছে পড়া শেষ করে ভালো একটা চাকুরী করার জন্য। ভালো চাকুরী পেতে গেলে ভালো GPA থাকা চাই। কিন্তু ফিজিক্সে পড়লে ভালো GPA তোলা মোটামুটি আসম্ভব।কারণ আমাদের বলা হয় আমরা খাতায় কিছু লিখি না, আর লিখতে পারি না তাই তারা নাম্বার দিতে পারেননা,লিখতে পারিনা কারন আমরা পড়ি না। আমি তাদের সাথে একমত।
তাহলে এবার অন্য কথা লিখি।
সৌভাগ্যবশত আমি এমন এক হলে থাকি যেখানে বাংলা, ইতিহাস,পালি উর্দু থাকে শুরু করে BBA ,IBA এমনকি চারুকলার ছাত্রও থাকে। তাদের সবার সাথে কম বেশি পরিচয় আছে।হলে থাকলে এটা স্বভাবিক এটা যারা হলে থাকেন বা থেকেছেন তারা সবাই জানেন।সুতরাং ঢাবির কলা ভবনের ছাত্ররা কতটুকু পড়ে বা কি করে সে সম্পর্কে আমার বেশ ভালো ধারনাই আছে। তারা শনি থেকে বৃহস্পতি সকাল ৮ টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ক্লাশ করে না ল্যাব করার প্রশ্নই আসে না। আবার সেই অ্যানালগ যুগের মত হাতে লিখে জমা দিতে হয় ল্যাব রিপোর্ট। আমাদের শিক্ষকরা প্রিন্ট কপি পছন্দ করেন না। তারা এই ল্যাব রিপর্ট আদৌ পড়েন কিনা আমার জানা নাই।
আর কলা ভবনের ছাত্রদের ক্লাশ থাকে দিনে ১/২ সর্বোচ্চ ৩। পরীক্ষার আগে শিক্ষকরা তাদের কিছু প্রশ্ন দিয়ে দেয় সেটাও তারা পড়তে পারেন না পরিক্ষার আগের দিন তারা সেটা থেকেও কমিয়ে নিয়ে আসে। কারন প্রথম বারে শিক্ষক হয়তো বেশি প্রশ্ন দিয়ে দেয়! পরিক্ষার আগের দিন ঘুমাতে যাবার আগে প্রচুর টেনশান নিয়ে তারা পড়ে পরের দিন খারাপ পরিক্ষা দিয়ে আসে কিন্তু তাদের GPA 3.5 এর উপরে!
আচ্ছা তাদের কথা বাদ। আমার অনেক বন্ধু অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তাদের কথা আনুযায়ী তাদে শিক্ষকরা তাদের ডেকে নিয়ে নিয়ে নাম্বার দেয়।তাদের জিপিএ অনেক ভালো। তারা সবাই ঢাবিতে চান্স না পেয়ে অন্য জায়গায় ভর্তি হয়েছে। আমি তাদের বলি বন্ধু তুমি অনেক ভালো মানুষ তাই ঈশ্বর তোমার মঙ্গলের জন্য এখানে ভর্তি হয়ে দেয় নাই!
আমার এক বন্ধু সার্কাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।কোন এক ইঞ্জিনিয়ারিংএ। তার সাথে কথা হচ্ছিলো। তাদের A+ ৯০ তে। সে ৯৪ পেয়ে ফিজিক্সে A+ পেয়েছে। অথচ আমি আমার পুরো আনার্স লাইফে ৮০ পাই নাই। ওহ সরি আমি ভুলে গিয়েছিলামা আমি খারাপ ছাত্র। তাই আমি ওকে বলেছি বন্ধু তুই আমাকে আমাকে ফিজিক্স বুঝিয়ে দে।
এরকম বলতে থাকলে শেষ হবে না। সার্কাস বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বাদ দিলাম তারা এত এত টাকা দিয়ে পড়ে তাদের কি নাম্বার কম দেয়া যায়? আমাদের শিক্ষকরাই তাদের নাম্বার দেয়!টাকা কথা বলে।
তবে সবাই যে একইরকম তা কিন্তু বলছি না। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ভালো ছাত্র আছে কলা ভবনে তাদের যতটুকু দরকার তারা সেটা অবশ্যই করে।এর চেয়ে বেশী পড়ার দরকার নাই তাদের। কারন এখানে সবার উদ্দেশ্য একই থাকে না। কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারি না ফিজিক্সে ভর্তি হওয়ার পর সবাই এক যোগে খারাপ হয়ে যায় কি ভাবে? ক্লাশে অবশ্য শিক্ষকরা বলেই দেয় তোমরা পরিক্ষায় পাস করতে পারবা না, এবং পরিক্ষার হলে প্রশ্ন পেয়ে যখন ছাত্ররা দিশেহারা তখন শিক্ষকের আনন্দ দেখে অবাকই লাগে। ছাত্ররা কিছু পারছে না এতেই যেন তাদের সার্থকতা!
এখন যখন চাকুরীর জন্য যাই বেশীর ভাগ যায়গায় এ্যাপ্লাই করা যায় না জিপিএ এর কারনে।অথচ অন্যরা ঠিকই সব জায়গায় আবেদন করতে পারছে।ওহ সরি আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমরা ফিজিক্সে সবাই গরু গাধা ভর্তি হই যারা প্রত্যেকে এক একটা আস্ত অথর্ব।
বিজ্ঞানের ছাত্রদের বিড়ম্বনার শেষ এখানেই নয়। বাংলাদেশে বিসিএস নামে একটা চাকুরী আছে। তুমি বিজ্ঞানের ছাত্র হও আর মানবিকের সবার পরিক্ষা একই।যারা বিজ্ঞানের ছাত্র তারা অনার্সের চার বছর অন্য কিছু পড়ার তেমন সুযোগ পায় না। কিন্তু আমি নিজে দেখেছি অন্য অনুষদের ছাত্ররা ২য়/৩য় বর্ষ থেকে বিসিএস এর পড়া শুরু করে।বলতে হাস্যকর লাগে একজন ডাক্তার ও যদি সরকারী চাকুরী পেতে চায় তাহলে তাকে বাবরের জন্মসাল হনলুলু কোথায় আর সুদানের প্রেসিডেন্টের নাম জানতে হয়! আরে বাবা সারা জীবন এত পড়াশোনা করে শেষে এসে আবার সেই পানিপথের যুদ্ধ নিয়ে পড়তে হয় তাহলে কোয়ান্টম মেকানিক্স পড়ার কি দরকার?এত এত ক্লাশ করার কি দরকার?এর চেয়ে মানবিকের কোন বিষয় নিয়ে পড়লে এই ধরনের চাকুরীর পড়া পড়া যেত।ভালো চাকুরী করা যেত।যত্তোসব।
ফিজিক্স অন্য বিশ্ববিদ্যালেও আছে সেখানকার ছাত্র সবাই খুব ভালো কারন তাদের অনেক জিপিএ।আমাদের শিক্ষকদের অনুরোধ তারা আমাদের নাম্বার দেয় না ঠিক আছে, তারা যেন অন্য ছাত্রদের আমাদের সাথে পরিক্ষা নেয়ের ব্যবস্থা করে। দয়া করে তারা যেন আমাদের হলে এসে কিছুদিন থাকে আর নিজে চোখে দেখে অন্য বিভাগের ছাত্ররা পড়ে কতটুকু উদ্ধার করছে!
এবার একটা তথ্য দেই।২০০১ সালে উচ্চমাধ্যমিকে পাশ করে শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৩% ভাগ ছিলো বিজ্ঞানের ২০১১ সালে সেটা এসে দাঁড়িয়েছে ২১%!! এবং ভবিষ্যতে সেটা আরো কমবে বলে ধারনা করে হচ্ছে। কমার একটা খুব সাধারন এবং নগন্য কারন আমি নিজে। আমি আমার সন্তানদের বিজ্ঞানে পড়তে কখনই উৎসাহিত করবো না। কারন এই দেশে বিজ্ঞানের কোন দাম নাই। স্যানিটারী ল্যাট্রিন নিয়ে এই দেশে যত অর্থ ব্যায় হয় তার কতটুকু বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য ব্যায় হয় আমি জানি না।কিন্তু এই বিজ্ঞানে মনোযোগ না দিলে যে উন্নতি সম্ভাব নয় সেটা আমাদের কর্তারা জানেন না।আর এসব বলেও লাভ নাই।
তাই আসুন আমরা বিজ্ঞান বিভাগে না পড়ি।ঢাবির ফিজেক্সে না পড়ি। কারন এখানে ভর্তি হওয়া মাত্র আপনার সব মেধা ভ্যানিস হয়ে যাবে! তাই শুধু শুধু এত কষ্ট করে কি লাভ?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


