একজনকে উপহার দেব বলে হুমায়ূনের বেশ কয়েকটা বই এবার বইমেলা থেকে কিনলাম। প্যাকেট করার আগে ভাবলাম একবার উল্টে-পাল্টে দেখি লোকটা কেন এত জনপ্রিয়, এখনো। উপন্যাস পড়ার সময় নেই, তাই ছোট ছোট লেখার সংকলন 'কাঠপেন্সিল' খুললাম। তিনি বলেছেন এটা নাকি আত্মজীবনীধর্মী, তাই কৌতূহলী হলাম। এক লেখায় দেখলাম সমালোচকদের নামে বিদ্রূপ। মনটা খারাপ হলো। ভাবলাম বরং বিজ্ঞানের লেখাটা পড়ি। এখানেও একটু আত্মগরিমা আছে - দেশ থেকে তিনি নাকি কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও অন্বিত বিষয়ে শূন্য জ্ঞান নিয়ে গিয়েছিলেন, ওখানে এক সেমেস্টারেই সেটা কভার করে ১০০ তে ১০০ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। নর্থ ডাকোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কেমন আমার জানা নেই।
হুমায়ূন, আমার জানা মতে, এইচ,এস,সি,তে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছিলেন। স্বীকৃত মেধাবী। বহুদিন আগে তাঁর 'নন্দিত নরকে' পড়েছিলাম। সেই সময়ে বইটিতে বেশ কিছু বানান আর ভাষাগত ভুল দেখে একটু খটকা লেগেছিল। আমার ধারণা ছিল মেধা তালিকায় ঢুকতে হলে অন্তত বাংলাতে ভালো জ্ঞান দরকার। তবে এখন একটা ছক দাঁড়িয়ে গেছে। 'কাঠপেন্সিলেও' অসংখ্য বানান ভুল চোখে পড়ল, তবে এগুলোর জন্য আমি এখন বরং তাঁর প্রকাশককেই দোষ দেব। তরুণদের হাতে ভাষা আন্দোলনের মাসে বই মেলাতে সঠিক বাংলাতে ছাপা বই পৌঁছে দেয়া তাঁদের দায়িত্ব।
হুমায়ূন কোয়ান্টাম রসায়নের ওপরে একটা বই লিখেছিলেন। সেটা নিয়ে একটা গল্প আছে, যা এ বইতে নেই। হুমায়ূনের খ্যাতি প্রতিপত্তি ও অর্থের ক্রমবৃদ্ধি দেখে তাঁর সহকর্মীরা নাকি ঈর্ষাণ্বিত হয়ে পড়েছিলেন। হুমায়ূন এক বছর স্যাব্বাটিকাল ছুটি নিয়ে মনের আনন্দে বেশ কিছু লেখালেখি করেন, তবে দায়িত্ব অনুসারে এই সংক্ষিপ্ত পাঠ্যবইটিও সম্পূর্ণ করেন। কিন্তু বইটি নিয়ে বিভাগীয় কমিটির সভায় নাকি অনেক বিরূপ মন্তব্য হয়। হুমায়ূন এর পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরী থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন।
আমি কোয়ান্টাম রসায়ন বইটি পড়ার সুযোগ পাই নি, পেলেও পড়ে হয়তো বুঝতাম না, কারণ এটা আমার বিষয় নয়। ভাবলাম 'কাঠপেন্সিলের' লেখাটি হয়তো বুঝতে পারব, এটা তো আম-জনতার জন্য লেখা, আর কোয়ান্টাম বলবিদ্যা সম্বন্ধে আমার কিছু অতিরিক্ত আগ্রহও আছে ছেলেবেলা থেকে।
প্রথম ধাক্কা নামকরণে। 'শ্রোডিনজারের বিড়াল'। এটা আবার কে? ঐ জার্মান বিজ্ঞানীর নাম তো 'শ্র্যোডিঙ্গার'। আচ্ছা, ঠিক আছে, জার্মান উম্লাউট বা বিকৃত স্বর বাংলাতে আমদানি করার দরকার নেই, য-ফলা বাদ। কিন্তু জার্মান গ কি করে বাংলায় জ হয়ে গেল? ইতালিয়ানে ওটা জ বটে, কিন্তু হুমায়ূনের ইহুদী শিক্ষক নিশ্চয়ই ক্লাসে সঠিক উচ্চারণই করেছিলেন। হুমায়ুন কি ক্লাস না করে বাড়ীতে পড়ালেখা করেছেন? তাহলে আরো ক্রেডিট। কিন্তু ঢাকাতেও ছাত্রদের তাই শিখিয়েছেন?
"ওয়েভ ফংশন কিভাবে কোলাপ্স করে তা বুঝতে পারছি'" । সেরেছে, এ দাবি ডিরাক, ফাইন্ম্যান, সালাম, উইটেন কেউ করার সাহস রাখেন নি। বোকার তিন হাসির মত ব্যাপার কি ?
হুমায়ূন গ্রুপ থিওরি, নন-কমিউটেটিভ বীজগণিতের নাম ঢুকিয়েছেন। বাচ্চাদের ভয় পাওয়ানো যায় বটে। আসলে গ্রুপ থিওরি লাগে না, প্রতিসাম্যের ব্যাপার না এলে। আর সাদামাটা ম্যাট্রিক্সই হলো এই বিষয়ের জন্য প্রয়োজনীয় 'নন-কমিউটেটিভ বীজগণিত'
হুমায়ূন এক নিঃশ্বাসে ফটো-ইলেক্ট্রিক এফেক্ট ও বিকিরণের কথা মিশিয়ে বলেছেন। দুটো ভিন্ন প্রক্রিয়া, প্রথমটিতে আছে ফোটনের কণা রূপ, দ্বিতীয়টিতে তার শক্তির বিচ্ছিন্ন স্তর।
সব চেয়ে আজব দাবি হলো - পারমাণবিক বোমা বানাতে নাকি কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার হয়েছে। না, নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানের কিছু পরীক্ষালব্ধ জ্ঞান আর আইন্সটাইনের বিখ্যাত E=mc^2, সূত্রই এজন্য যথেষ্ট ছিল। সেকালে ফিশনের কোন কোয়ান্টাম তত্ত্ব ছিল না। এখনো আসলে নেই, যদিও এ বিষয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে। এগুলো তাত্ত্বিক কাজ, বোমা বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় নয়।
wignerএর বান্ধবীর প্রসংগে একেবারে অসীমসংখ্যক পর্যবেক্ষকের আমদানি অবান্তর। এটা ঠিক যে, একজন নিজেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে না। কিন্তু ক খ-কে এবং খ ক-কে করতে পারে ( "দুজনে মুখোমুখি, গভীর দুখে দুখী")।
Sky Survey Projectএর উদ্দেশ্য অন্য গ্রহে প্রাণ খোঁজা নয়, শুধু আকাশের তারা ও অন্যান্য বস্তুর নিখুঁত মানচিত্র তৈরি। SETI একটা বাচ্চাদের কম্পিউটার ব্যস্ত রাখার পরিকল্পনা মাত্র।
হুমায়ূন 'এন্থ্রপিক প্রিন্সিপল' কথাটি এড়িয়ে গেছেন। তার বদলে Intelligent Design ব্যবহার করেছেন। এখানে একটা দার্শনিক অসততা আছে। আমরা অসংখ্য সম্ভাব্য বিশ্বের একটিতে আছি। তার মানে এই নয় যে প্রাণহীন অন্যগুলো কোথাও নেই, বা কখনো আগে হয় নি। যে ব্যক্তি লটারিতে কোটি টাকা পায়, সে কি ভাবে বিধাতা আমার জন্যই লটারিটা করেছিলেন?
সেই বিখ্যাত অর্ধমৃত বিড়াল প্রসঙ্গে আসি। এটা এখন প্রায় সবাই মেনে নেন ( পেনরোজ জাতীয় কেউ কেউ ছাড়া), যে চেতনার সাথে বাস্তব বাছাইয়ের যোগাযোগ নেই। ব্যাপারটা হলো স্কেলের। ক্ষুদ্র পারমাণবিক স্কেলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মিশ্রন অর্থবহ, অর্থাৎ একটা সিস্টেমে দুরকম কণার মিশ্রণ থাকতে পারে, কিন্তু একটা বিড়ালে যতগুলো পরমাণু আছে, সেই স্কেলে গেলে অসংখ্য ওয়েভ ফাংশনের কাটাকুটি হয়ে, হয় একটা জীবিত, নয় একটা সায়ানাইড খাওয়া মৃত বিড়াল থাকবে, মিশ্রণ নয়। পর্যবেক্ষক থাকুক আর নাই থাকুক।
হাইজেনবার্গ কখনোই বোরের ছাত্র ছিলেন না, যদিও অল্প কিছু দিন তিনি কোপেনহাগেনে কাটিয়েছেন। হিটলার পারমাণবিক বোমা বানাবার চেষ্টা করছিলেন, এ অভিযোগ বুশ-ব্লেয়ারের ইরাক তত্ত্বের মত সঠিক।
হুমায়ূন অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক। তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে লিখুন, এটা আমরা সবাই চাই। তবে একটু সতর্কতা আর হোম ওয়ার্ক দরকার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


