somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কাঠপেন্সিলে আঁকা বিড়াল

০৬ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১২:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একজনকে উপহার দেব বলে হুমায়ূনের বেশ কয়েকটা বই এবার বইমেলা থেকে কিনলাম। প্যাকেট করার আগে ভাবলাম একবার উল্টে-পাল্টে দেখি লোকটা কেন এত জনপ্রিয়, এখনো। উপন্যাস পড়ার সময় নেই, তাই ছোট ছোট লেখার সংকলন 'কাঠপেন্সিল' খুললাম। তিনি বলেছেন এটা নাকি আত্মজীবনীধর্মী, তাই কৌতূহলী হলাম। এক লেখায় দেখলাম সমালোচকদের নামে বিদ্রূপ। মনটা খারাপ হলো। ভাবলাম বরং বিজ্ঞানের লেখাটা পড়ি। এখানেও একটু আত্মগরিমা আছে - দেশ থেকে তিনি নাকি কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও অন্বিত বিষয়ে শূন্য জ্ঞান নিয়ে গিয়েছিলেন, ওখানে এক সেমেস্টারেই সেটা কভার করে ১০০ তে ১০০ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। নর্থ ডাকোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কেমন আমার জানা নেই।

হুমায়ূন, আমার জানা মতে, এইচ,এস,সি,তে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছিলেন। স্বীকৃত মেধাবী। বহুদিন আগে তাঁর 'নন্দিত নরকে' পড়েছিলাম। সেই সময়ে বইটিতে বেশ কিছু বানান আর ভাষাগত ভুল দেখে একটু খটকা লেগেছিল। আমার ধারণা ছিল মেধা তালিকায় ঢুকতে হলে অন্তত বাংলাতে ভালো জ্ঞান দরকার। তবে এখন একটা ছক দাঁড়িয়ে গেছে। 'কাঠপেন্সিলেও' অসংখ্য বানান ভুল চোখে পড়ল, তবে এগুলোর জন্য আমি এখন বরং তাঁর প্রকাশককেই দোষ দেব। তরুণদের হাতে ভাষা আন্দোলনের মাসে বই মেলাতে সঠিক বাংলাতে ছাপা বই পৌঁছে দেয়া তাঁদের দায়িত্ব।

হুমায়ূন কোয়ান্টাম রসায়নের ওপরে একটা বই লিখেছিলেন। সেটা নিয়ে একটা গল্প আছে, যা এ বইতে নেই। হুমায়ূনের খ্যাতি প্রতিপত্তি ও অর্থের ক্রমবৃদ্ধি দেখে তাঁর সহকর্মীরা নাকি ঈর্ষাণ্বিত হয়ে পড়েছিলেন। হুমায়ূন এক বছর স্যাব্বাটিকাল ছুটি নিয়ে মনের আনন্দে বেশ কিছু লেখালেখি করেন, তবে দায়িত্ব অনুসারে এই সংক্ষিপ্ত পাঠ্যবইটিও সম্পূর্ণ করেন। কিন্তু বইটি নিয়ে বিভাগীয় কমিটির সভায় নাকি অনেক বিরূপ মন্তব্য হয়। হুমায়ূন এর পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরী থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন।

আমি কোয়ান্টাম রসায়ন বইটি পড়ার সুযোগ পাই নি, পেলেও পড়ে হয়তো বুঝতাম না, কারণ এটা আমার বিষয় নয়। ভাবলাম 'কাঠপেন্সিলের' লেখাটি হয়তো বুঝতে পারব, এটা তো আম-জনতার জন্য লেখা, আর কোয়ান্টাম বলবিদ্যা সম্বন্ধে আমার কিছু অতিরিক্ত আগ্রহও আছে ছেলেবেলা থেকে।

প্রথম ধাক্কা নামকরণে। 'শ্রোডিনজারের বিড়াল'। এটা আবার কে? ঐ জার্মান বিজ্ঞানীর নাম তো 'শ্র্যোডিঙ্গার'। আচ্ছা, ঠিক আছে, জার্মান উম্লাউট বা বিকৃত স্বর বাংলাতে আমদানি করার দরকার নেই, য-ফলা বাদ। কিন্তু জার্মান গ কি করে বাংলায় জ হয়ে গেল? ইতালিয়ানে ওটা জ বটে, কিন্তু হুমায়ূনের ইহুদী শিক্ষক নিশ্চয়ই ক্লাসে সঠিক উচ্চারণই করেছিলেন। হুমায়ুন কি ক্লাস না করে বাড়ীতে পড়ালেখা করেছেন? তাহলে আরো ক্রেডিট। কিন্তু ঢাকাতেও ছাত্রদের তাই শিখিয়েছেন?

"ওয়েভ ফংশন কিভাবে কোলাপ্স করে তা বুঝতে পারছি'" । সেরেছে, এ দাবি ডিরাক, ফাইন্ম্যান, সালাম, উইটেন কেউ করার সাহস রাখেন নি। বোকার তিন হাসির মত ব্যাপার কি ?

হুমায়ূন গ্রুপ থিওরি, নন-কমিউটেটিভ বীজগণিতের নাম ঢুকিয়েছেন। বাচ্চাদের ভয় পাওয়ানো যায় বটে। আসলে গ্রুপ থিওরি লাগে না, প্রতিসাম্যের ব্যাপার না এলে। আর সাদামাটা ম্যাট্রিক্সই হলো এই বিষয়ের জন্য প্রয়োজনীয় 'নন-কমিউটেটিভ বীজগণিত' ;)

হুমায়ূন এক নিঃশ্বাসে ফটো-ইলেক্ট্রিক এফেক্ট ও বিকিরণের কথা মিশিয়ে বলেছেন। দুটো ভিন্ন প্রক্রিয়া, প্রথমটিতে আছে ফোটনের কণা রূপ, দ্বিতীয়টিতে তার শক্তির বিচ্ছিন্ন স্তর।

সব চেয়ে আজব দাবি হলো - পারমাণবিক বোমা বানাতে নাকি কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার হয়েছে। না, নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানের কিছু পরীক্ষালব্ধ জ্ঞান আর আইন্সটাইনের বিখ্যাত E=mc^2, সূত্রই এজন্য যথেষ্ট ছিল। সেকালে ফিশনের কোন কোয়ান্টাম তত্ত্ব ছিল না। এখনো আসলে নেই, যদিও এ বিষয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে। এগুলো তাত্ত্বিক কাজ, বোমা বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় নয়।

wignerএর বান্ধবীর প্রসংগে একেবারে অসীমসংখ্যক পর্যবেক্ষকের আমদানি অবান্তর। এটা ঠিক যে, একজন নিজেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে না। কিন্তু ক খ-কে এবং খ ক-কে করতে পারে ( "দুজনে মুখোমুখি, গভীর দুখে দুখী")।

Sky Survey Projectএর উদ্দেশ্য অন্য গ্রহে প্রাণ খোঁজা নয়, শুধু আকাশের তারা ও অন্যান্য বস্তুর নিখুঁত মানচিত্র তৈরি। SETI একটা বাচ্চাদের কম্পিউটার ব্যস্ত রাখার পরিকল্পনা মাত্র।

হুমায়ূন 'এন্থ্রপিক প্রিন্সিপল' কথাটি এড়িয়ে গেছেন। তার বদলে Intelligent Design ব্যবহার করেছেন। এখানে একটা দার্শনিক অসততা আছে। আমরা অসংখ্য সম্ভাব্য বিশ্বের একটিতে আছি। তার মানে এই নয় যে প্রাণহীন অন্যগুলো কোথাও নেই, বা কখনো আগে হয় নি। যে ব্যক্তি লটারিতে কোটি টাকা পায়, সে কি ভাবে বিধাতা আমার জন্যই লটারিটা করেছিলেন?

সেই বিখ্যাত অর্ধমৃত বিড়াল প্রসঙ্গে আসি। এটা এখন প্রায় সবাই মেনে নেন ( পেনরোজ জাতীয় কেউ কেউ ছাড়া), যে চেতনার সাথে বাস্তব বাছাইয়ের যোগাযোগ নেই। ব্যাপারটা হলো স্কেলের। ক্ষুদ্র পারমাণবিক স্কেলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মিশ্রন অর্থবহ, অর্থাৎ একটা সিস্টেমে দুরকম কণার মিশ্রণ থাকতে পারে, কিন্তু একটা বিড়ালে যতগুলো পরমাণু আছে, সেই স্কেলে গেলে অসংখ্য ওয়েভ ফাংশনের কাটাকুটি হয়ে, হয় একটা জীবিত, নয় একটা সায়ানাইড খাওয়া মৃত বিড়াল থাকবে, মিশ্রণ নয়। পর্যবেক্ষক থাকুক আর নাই থাকুক।

হাইজেনবার্গ কখনোই বোরের ছাত্র ছিলেন না, যদিও অল্প কিছু দিন তিনি কোপেনহাগেনে কাটিয়েছেন। হিটলার পারমাণবিক বোমা বানাবার চেষ্টা করছিলেন, এ অভিযোগ বুশ-ব্লেয়ারের ইরাক তত্ত্বের মত সঠিক।

হুমায়ূন অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক। তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে লিখুন, এটা আমরা সবাই চাই। তবে একটু সতর্কতা আর হোম ওয়ার্ক দরকার।

১২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×