somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দাগ

২৮ শে জানুয়ারি, ২০১১ রাত ১০:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



(এ মিনি-গল্পটি বোধ হয় তিন বছর আগে লেখা, শৈশবের শেষে পরিনত বয়সে আমার কাহিনী রচনার প্রথম অপচেষ্টা। এক ব্লগে দিয়ে পরে আবার মুছে ফেলেছিলাম। আজ হার্ড ডিস্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে আবার পেলাম। এই হাড়-কাঁপানো শীতের শেষে বাতাসটা আবার একটু উষ্ণতা পাওয়ায় মনে হলো এভাবে একে ত্যাগ করা উচিত হয় নি। যতই অকিঞ্চিতকর হোক, অন্তর্জালের এক কোনায় ঠাঁই পেতে পারে। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলে ক্ষতি নেই, আমি নিজে মাঝে-মধ্যে খুঁজে পেলেই চলবে।)



দাগ


সেই যে-বার ঢাকায় সাংঘাতিক বন্যা হয়েছিল, আমাদের স্বামীবাগের বাসাটার ফ্লোর ভেসে গিয়েছিল এক হাত পানির নিচে, আর আমরা কিছুদিনের জন্য উঠেছিলাম র‌্যাংকিন স্ট্রীটের বিরাট সরকারী বাড়ীটিতে, যার এক পাশে থাকতেন এক বিখ্যাত ডাক্তার, আর অন্য পাশে কে থাকতেন, তার নাম আমি কখনো জানি নি। রোজ স্কুল থেকে ফিরে আমি আর আমার বোনেরা বাড়ীটার বিরাট মাঠে ফুটবল খেলতাম। আমি তখন বারো, ক্লাস সেভেন । আমার পরের বোন নওরীন তিন বছরের ছোট, অন্যরা আরো। কিন্তু তাতে কি, জাগতিক বিষয়ে তারা সবাই ছিল আমার চাইতে অনেক জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান।

কয়েকদিন পর আমাদের খেলার নতুন সাথী হিসাবে এলো এক মেয়ে, সেই অন্য দিকের বাড়ীর । আমার চাইতে বোধ হয় দু-এক বছরের ছোট। সে সালোয়ার কামিজ পড়ত, তাই আমার ফ্রকপরা খেলার বোনদের চেয়ে একটু বড় মনে হতো। কিন্তু রোজ দেখতাম একই পোশাক। সে বয়সেই বুঝে ফেলেছিলাম মেয়েটার কিছুটা আর্থিক অসাচ্ছন্দ রয়েছে। সারাদিন আমাদের মাঠেই তাকে দেখতাম। মেয়েটা কখনো আমার দিকে সরাসরি তাকাতো না, কিন্তু আমরা দু'জন যখন বল ধরতে খুব কাছাকাছি চলে আসতাম, তখন দেখতাম তার গৌর ধারালো মুখটা লাল হয়ে উঠেছে, আর হাসিফোটা ঠোঁট দুটোর ফাঁকে উজ্জ্বল একসারি মিহি দাঁত ঝলক দিচ্ছে।

একদিন হন্যের মত মাঠে কিছু খুঁজতে দেখে জানতে চেয়েছিলাম। বলেছিল: "ক্লিপ হারিয়েছে।" বুঝেছিলাম না পেলে মার খেতে হবে। তাই এক ফাঁকে বোনের কৌটো থেকে এনে দিলাম অমনি আরেক ক্লিপ। কিন্তু ও নিল না।
: লাগবে না, আমার আনেক আছে। নওরীন রাগ করবে।

কয়েকদিন পরেই মায়ের কাছে ডাক পড়ল, পাশে দুই বোন, বড় এবং আমার পরেরটিও। সবাই বেশ গম্ভীর। ব্যাপারটা খুবই অস্বভাবিক। জানলাম মেয়েটা হিন্দু, অনাথ, আছে আশ্রিতা হিসাবে আত্মীয়দের বাড়িতে।
"যদি বেশি বন্ধুত্ব করিস, ভবিষ্যতে তোকে ফাঁদে ফেলতে পারে।" আমার বয়স বারো, প্রচলিত অর্থে ভালো ছেলে। প্রাথমিক জৈবিক কাজটি সম্বন্ধেও কোনো ধারণা ছিল না তখনো। আমার মাথায় সমস্যাটা মোটেই ঢুকলো না, কিন্তু অপমানিত বোধ করলাম। নিজের জন্য নয়, ওর জন্য। সারাদিন মনটা একটা বিষণ্ণতায় ছেয়ে রইল। পরদিন থেকে সে মেয়েকে আর কখনো আমাদের মাঠে দেখিনি । লক্ষ করলাম আমার খেলার আকর্ষণও অনেক কমে গেছে।

কিছুদিন পরে আমরা সেখান থেকে চলে এলাম। কিন্তু কি আশ্চর্‍্য - সেই প্রায়-শিশু বয়সেই আমার মনে এই অল্প ক'দিন দেখা মেয়েটি তৈরি করে ফেলেছিল এক অদ্ভুত কল্পজগত, যেখানে জ্যামিতির এক্সট্রার কঠিন নিগড় থেকে নিষ্কৃতি পেতাম স্তব্ধ মাঝরাতের গভীরে। মেয়েটার মুখ নরম হতে হতে মিলিয়ে যেত অন্তর্বৃত্ত, পরিবৃত্তের নিটোল একীভবনে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমাদের বাড়ীতে আসত ছোটবোনের কলেজের বান্ধবী । ভালো ছাত্রী, সুন্দরী, সাংঘাতিক স্মার্ট, এবং বাবা বিখ্যাত অধ্যাপক। আমার কাছে মাঝে মাঝে ক্যালকুলাস বুঝতে আসত। সেই মেয়েটির সাথে তার কোনো মিলই ছিল না।অনেক হিসেব-নিকেশ করার পরে মনে হলো, বৌ হিসাবে মন্দ হবে না। একদিন পড়ার ফাঁকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, "আমাকে মানুষ হিসাবে কেমন মনে হয়?" ভ্রুকুটি করে চলে গেল, এমন ভাব দেখিয়ে যেন আমার কাছ থেকে এটা আশা করেনি। আমি বিদেশ যাওয়ার আগেই আমাদের বিয়ে হয়ে গেল।

সেই হিম-শীতল দেশে আমার বৌ খুব শীগগিরই একটা জমাট গরম আড্ডার মধ্যমণিতে পরিনত হলো। সপ্তাহান্তে এর বাড়ী, ওর বাড়ী। ও ভালো গায়, তাই আনেক চাহিদা ; গর্ব হলো বেশ। সবাই আমাদেরকে বলতো সুখী দম্পতি। বোধ হয় ছিলামও তাই। তবু অন্তরঙ্গ মুহূর্তে আমি যখন তাকে জড়িয়ে ধরতাম, অন্ধকারের মধ্যে তার চুলের রাশির ভেতরে কোন অলৌকিক প্রক্রিয়ায় মুখের আদলটা বদলে যেত হঠাৎ। আমি থমকে যেতাম। ও বলতো : কি হলো ?
: কিছু না। মনে হলো একটা পোকা বসেছে।
ও সুখের আবেশে হাসতো। আমি ভাবতাম, আমি কি মিথ্যা বলছি ? ইউক্লিডের লজিকের ভিত্তিও এমন সব স্বতঃসিদ্ধ যা মোটেই পরিষ্কার নয়, শুধুই কল্পনা।

যখন আমাদের দুই বাচ্চা বিদেশ চলে গেল পড়তে, ভেবেছিলাম একা হয়ে পড়ব। কিন্তু জীবনের এই পর্যায়ে শুধুই ব্যস্ততা ; আমার অফিসের কাজ নিয়ে, মেহরীনের নানা সমাজ সেবায়, নারী সংগঠনে, পত্রিকায় বিবৃতিতে।
সব কিছু যখন ছকে বাঁধা, তখন আবার সে এলো।

নিউ মার্কেটের কাছে রাস্তায় হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে ধাক্কা খেলাম। একজন বিশ্রী গাল দিল, অন্যজন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বোধ হয় ভাবল, আমি প্রবীণ নিরীহ ভদ্রলোক। সঙ্গিনীকে ধমক দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। তখন খেয়াল করলাম - গার্মেন্টসের আঠারো-ঊনিশের দুই মেয়ে । কিন্তু এ কি! সেই মুখ, সেই চোখ, সেই আলতো হাসি, চল্লিশ বছর আগে শেষ দেখা।
"সরি আংকেল, কিছু মনে করবেন না।" কোন গ্রাম্যতা নেই ভাষায়, বোধ হলো কিছুটা শিক্ষিত।

আমি বাড়ী এসে আনেক পুরোনো বইগুলো ঘেটে বের করলাম ক্লাস সেভেনের সেই জ্যামিতি বই, যেখানে তার একটা ছবি এঁকে রেখেছিলাম। অবিকল।

এক মাস পরে আশুলিয়ায় গিয়েছিলাম এক জমির দাম দিতে। ফেরার পথে ফ্যান্টাসী কিংডমের কাছে আবার তার দেখা পেলাম।
: এখানে কি ?
: ও, আংকেল, আপনি!
আমাকে দেখে খুশীই মনে হলো। "আমি আগের কাজ ছেড়ে দিয়েছি। এখানে আরেক জায়গায় কাজ পেয়েছি।"
: কোথায় যাচছ? সরি , 'তুমি' করে বললাম।
মেয়েটা হাসল। "তবে কি 'আপনি' বলবেন? আমি কতো ছোট ! এমনি হাঁটছি, আজ ছুটি।"
মাথায় ভূত চাপল। "ফ্যান্টাসি কিংডমে যাবে?"
মেয়েটা আবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো। কয়েক সেকেন্ড পরে বলল, ছোট বাচ্চার মত। "ঠিক আছে।”

কয়েক ঘন্টা আমার সেখানে কাটল। আমার খুব মজা লাগছিল তার আনন্দ দেখে। এক সময় খেতে খেতে প্রশ্ন করলাম: "তোমার কোন ছেলে বন্ধু নেই, কারো সঙ্গে বিয়ের বোঝাপড়া?"
হঠাৎ সে থমকে গেল। তারপর বলল: "আছে, কিন্তু ও একটা টিভি চায়, আমার সৎমা বাবাকে দিতে মানা করেছে।"

আমরা যখন বেরিয়ে এলাম, ও বাসস্টপে যাওয়ার উদ্যোগ নিল। তারপর আমার দিকে চোখ মেলে তাকাল, যেন কিছু বুঝতে চায়। "আচ্ছা, আংকেল, আপনার কোন মেয়ে কি বিদেশে?"
: ঠিক ধরেছ । আমি হাসলাম। পকেট থেকে ওয়ালেট বের করলাম।
: কিছু মনে করো না। টিভির দামটা আমি দিয়ে দেই।
ও সাপ দেখার মতো চমকে উঠল। তারপর সামলে নিয়ে হেসে বলল: "আমি একটু মজা করছিলাম। আসলে আমার বিয়ে হয়ে গেছে। থ্যাংকিউ , আংকেল, আপনার সাথে দেখা না হলে এখানে ঢোকা হতো না।"

ও চলে গেল। আমি গাড়ীটা ঘুরিয়ে বাড়ী এলাম। মেহরীনকে একটু বিরক্ত দেখলাম।
: এতো দেরি করলে যে ? দাগ মৌজা সব বুঝে নিয়েছ ?
: হুঁ, কিন্তু এসব ব্যাপারে কখনো নিশ্চিন্ত হওয়া যায় ? পঞ্চাশ বছর পরে হয়তো এক দাবীদার এসে হাজির হবে ।
মেহরীন হাসলো। "ভয় নেই। অতদিন আর বাঁচতে হবে না। যাও হাতমুখ ধুয়ে এসো।"

০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×