বাংলাদেশ কি এখনো একটি স্বাধীন দেশ? এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে।
১/১১ পরবর্তীকালে বিদেশী দূতাবাসগুলি যেভাবে এদেশের রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে পড়ে, তখনই অনেকের সন্দেহ হয় যে বাংলাদেশের ভবিষ্যত সম্ভবত তাঁরাই নির্ধারণ করে দেবেন, এবং যেহেতু একটি নির্বাচনের দরকার হবে আপাত বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য, সেই নির্বাচনে অর্ধস্বচ্ছ ব্যালট বক্স ব্যবহার করলেও ফলাফল হবে পরিকল্পিত। বিএনপির বুদ্ধিমান অংশটি ব্যাপারটি বুঝে ফেলেছিলেন এবং নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই ৩০% এরও বেশি জনপ্রিয়তার রায় পেয়েও বন্টনের ম্যাজিকে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি আসন পায় এই প্রধান দল। একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দুর্নীতিহীন নির্বাচনেও আওয়ামী জোটই জিতে যেত পূর্বেকার সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে, কিন্তু আসন সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নিশ্চিত করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল সংবিধান পরিবর্তনের জন্য। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, যাঁরা ম্যাজিকের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা প্রচুর সেফটি মার্জিন নিয়ে কাজ করেছেন, যার ফলে তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি আসন লাভে আওয়ামীদের জন্য একটি ওভারকিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের আগে ও পরে আমেরিকান ও ভারতীয় দূত এতবার শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেন যে, এই নির্বাচনের ফলাফলে এই দুই দেশের অবদান নিয়ে কারো মনে কোন সন্দেহ থাকা উচিত নয়। তবু পরে উপদেষ্টাদের কেউ কেউ শেখ হাসিনাকে আমেরিকা সম্বন্ধে সাবধান থাকার পরামর্শ দিলে হাসিনা তাঁদের বলেন যে, আমেরিকা পাশে না থাকলে জেতা কঠিন হতো, তিনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। বস্তুত বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ দিন দিন নগ্ন হয়ে এলেও অনুগৃহীতরা প্রথমে কৃতজ্ঞতায় আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা দেখান। এটাই নিয়ম। যাঁরা লাভবান হন তাঁদের বেশির ভাগের বুদ্ধির দীপ্তি ইতিহাস বিশ্লেষণের অনুকূল নয়। পরে এক সময়ের এই সব বন্ধুরাই অনুগ্রহবঞ্চিত হয়ে মারা পড়েন। কিবরিয়া বা সাদেক সাহেবরা এক সময় সেই দেশের পরম বন্ধু ছিলেন। সাইফুর ছিলেন। এখন হয়তো মাল মুহিত। শেষোক্তের ভাগ্যে কি ঘটে দেখা যাক। শেখ হাসিনাও কথা না শুনলে ডিস্পোজেবল।
আমেরিকা মধ্য প্রাচ্যে ইস্রাইলকে অকুন্ঠ সমর্থন দান করে, ইস্রাইল যা-ই করুক না কেন। এই উপমহাদেশে একদা পাকিস্তান কিছুটা ফেভারড নেশন ছিল, কারণ সে সময়ে ভারত আমেরিকার শত্রু রাশিয়ার পরম বন্ধু ছিল। পাকিস্তানে বামপন্থীদের তখন করুণ অবস্থা। পরে যেহেতু রাশিয়ার সাথে চীনের বিরোধ দেখা যায়, পাকিস্তান আমেরিকার অনুমতি নিয়ে চীনের সাথে বন্ধুত্ব করে, কারণ চীন ছিল ভারতের বৈরী। কাশ্মীরের একাংশ পাকিস্তান চীনকে দিয়ে দেয়।
এখন সমীকরণ বিভিন্ন কারণে পাল্টেছে। প্রথমত রাশিয়া এখন আর কোন পরাশক্তি নয়। চীন আর ভারতের বৈরিতা এখন তত প্রকট নয়। উত্তর পূর্বের যে অংশ ভারত চীনের কাছে হারিয়েছে তা ভারত মোটামুটি মেনে নিয়েছে। চীনের সাথে আমেরিকারও কোন শত্রুতা নেই।ঐতিহাসিকভাবে এখনো চীন পাকিস্তানের বন্ধু রাষ্ট্র হলেও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ক্ষমতার চাইতে চীনের কাছে বাণিজ্যিক আগ্রাসনই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমেরিকার ব্যবসা, একাডেমিয়া, মিডিয়া, রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় ইহুদী লবী দ্বারা। পাকিস্তানে ইহুদী বিরোধী সন্ত্রাসী সংগঠন গড়ে ওঠাতে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের বন্ধুত্ব এখন শুধু কাগজে কলমে। এছাড়া আমেরিকায় এখন সংখ্যালঘু ইহুদী প্রভাবের মত ভারতীয় প্রভাবও তৈরী হয়েছে। আমেরিকার স্বাস্থ্যখাতে ও টেকনিকাল/বিজ্ঞানী খাতে ভারতীয়রা ইহুদীদের মতই জনসংখ্যার সাথে অনানুপাতিক বিশাল প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব বলয় সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে। আমেরিকার কাছে এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইস্রাইল যা, এই উপমহাদেশে ভারত তা।
সুতরাং উপমহাদেশের সব দেশকে ভারতের অনুগত থাকতে হবে, এটাই আমেরিকার ইচ্ছা। পাকিস্তানকে সাইজ করতে আরো সময় লাগবে। কিন্তু বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান হলেও এবং এখানে বেশ কঠোর কিছু ইস্রাইল ও ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট বিদ্যমান থাকলেও তা ম্যানেজ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কোন দলকে নির্বাচনে সাহায্য করলে আমেরিকা এই প্রতিদান আশা করে যে নির্বাচিত সরকার তাদের বন্ধু ভারতের কথা মেনে চলবে, তাদের স্বার্থকে গুরুত্ব দেবে।
কিন্তু আসলে রাজনৈতিক নেতারা দেশ চালায় না, এ দায়িত্ব প্রশাসনের। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল সরকারী প্রশাসনের সর্বত্র (সচিব, বিচারক, পুলিশ ইত্যাদি) ভারতপন্থীদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে যত সরকারী গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ হয়েছে, তার তালিকা নিয়ে বসলে যে কেউ দেখতে পাবেন একটা প্যাটার্ন্। এমন কি প্রধান মন্ত্রীর সচিবালয়েও তাদের এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে তিনি এখন আসলে এই ভারতপন্থীদের হাতে বন্দী; নিজের ইচ্ছায় কারো সাথে দেখা করারও সুযোগ পান না, নিজ দলের এম পিরাও দিনের পর দিন হতাশ হয়ে চলে যান, যদি তাঁদের ভারতপ্রিয়তায় কোন সন্দেহ থাকে।
ট্রাঞ্জিটের জন্য পয়সা নেয়া অসভ্যতা; ফেলানীদের লাশ নিয়ে মিডিয়া বাড়াবাড়ি করলে খবর আছে, ভারতের গিফট ফেন্সিডিল ও জাল টাকার স্রোত আটকাবার ব্যবস্থা করা যাবে না। আমাদের সস্তা ভালো ব্যটারী বা সাবান সেখানে পাঠানো যাবে না, উন্নত নাটকের টিভি চ্যানেল প্রচার করা হবে না। আমাদের ছিটমহলের সাথে যোগাযোগ সীমিত রাখা হয়েছে। গ্যাস, কয়লা সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছে, নিজের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও পারিবেশিক স্বার্থ জলাঞ্জলী দিয়ে। নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার কোন খবর নেই।
মুশকিল হয়ে গেল একটি। সংবিধানে বিসমিল্লাহ রেখে দেওয়া। সঙ্গে সঙ্গে মনমোহনের সতর্কবানী - "বাংলাদেশ একটা কিছু ঘটে যেতে পারে"। শেখ হাসিনা আসলেই বিশ্বাস করেন তাঁর পূর্ব পুরুষ পীর ছিলেন, তিনি বাঘ না মাছের পিঠে চড়ে এদেশে ইসলাম প্রচার করতে এসেছিলেন। হাসিনা নিয়মিত নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন। এর আগের বার হিন্দু ( বৌদ্ধ খৃস্টান নামে মাত্র) পরিষদকে বলেছিলেন - "আপনারা মন স্থির করে দেখেন, আপনাদের আনুগত্য আসলে কোন দেশের প্রতি"। এবারে সেই সুরে কথা বলার সাহস নেই। তবু তিনি কখনোই নিজেকে সেকিউলার ভাবেন না। তিনি বিসমিল্লাহ ও ইসলাম ছাড়বেন না। এ জন্য কি মূল্য দিতে হবে সেটাই প্রশ্ন।
দীপুমনি বলেছেন - "ভারত এত বড় প্রতিবেশী, আমাদেরকে অবশ্যই তার সাথে বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। বহুকাল আগে ভারতীয় রাজারা ইংরেজ আমলে উপলব্ধি করেছিলেন যে, যেখানে যুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনা নেই, সেখানে যে-কোন শর্তে মিত্রতাই ভালো। সবাই "বশ্যতামূলক মিত্রতার" কাগজে সই করে নিজেদের "রাজা", "নবাব' উপাধি বজায় রেখেছিলেন।
'প্রধান মন্ত্রী' উপাধিটাও থেকে যাবে। হিন্দু পরিষদের নেতা এক অসাধারণ সুন্দরী মহিলার স্বামী রাষ্ট্রদূত নিমচন্দ্র ভৌমিকের নেপালে অনৈতিক কাজের কোন জবাবদিহিতা চাওয়া হবে না কোন দিন, বিপ্লব সরকারকে কোন শাস্তি দেয়া হবে না, হয় তো পরিমল নামের দানবটিকেও জামিন দিয়ে ভারতে পার করে দেয়া হবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০১১ দুপুর ২:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



