যৌথ ফ্যামিলিতে হই হুল্লোর আছে , আদর সোহাগ নেই । হাতে গুনা নয়টি ভাইবোন আমরা । আদরের পরিমানটা তাই কম । মা-চাচী সারাদিন রান্না বান্নায় ব্যস্ত থাকত । আব্বা বাড়ি আসত মাসেক পরপর ।
বৈশাখে আব্বা লিচু নিয়ে বাড়ি অসলে আমার অনান্য ভাইবোন থেকে এক আধটা বেশি পড়ত । আদর বলতে এটুকুই । আব্বা বাড়ি আসতে প্রতিবারই কিছু না কিছু নিয়ে আসত । আম্মা মাঝে মধ্যে ডিম সেদ্ধ করে লুকিয়ে খাওয়াতেন আমাকে।
আমার জ্বরাজ্বরি লেগেই থাকত । থেকে থেকে খুক খুক কাশতাম সারাদিন ।পাট-কাঠির ছোট্ট দূর্বল ছেলেটি বলে আব্বা আমাকে একটু আদর করতেন । সব সময় দেখতাম মাস কিভাবে চলবে এ হিসাব নিয়ে মার সাথে চিন্তিত তিনি । চাচা ছিল এসব ব্যাপারে বেখেয়াল । ঠান্ডায় জমে য্ওায়া কফে গর গর করে নি:শ্বাস নিতাম । আব্বার কোলে একটু বসতে পারা যেন ছিল রাজ্য জ্বয় করা ।
আম্মা কবিরাজি বনাজি নানা চিকিৎসা দিতেন আমকে । বেটে বেটে গাছের রস-মূল খ্ওায়াতেন । কখনো কখনো হাপিত্যাশ দেখেছি ডাক্তার খানায় নিয়ে যাওয়ার ...
আব্বা বলত পড়াশোনাটা নাকি আমাকে দিয়ে হবে । ঘরে বসে পড়তে ভালই লাগত আমার , তবে সবচেয়ে বেশি ভাল লাগত মিয়া বাড়ির জেঠাদের ঘরে গিয়ে চুরি করে টিভি দেখতে । জেঠি ঘার ধরে ঘর থেকে বের করে দিতেন । তবু বারাবর যেতাম , টিভি দেখার সে কি শখ ! একদিন সন্ধ্যায় মিয়া বাড়ি থেকে ফেরার পর আমার গা কাটা দিয়ে জ্বর আসে । আব্বা তখন বাড়ি ।আমার এমন জ্বর দেখে অস্হির হয়ে যান তিনি । সারা দিন কোলে ধরে রাখেন , দুকান থেকে ঔষধ কিনে এনে খাওয়ান । এই প্রথম আমি ডাক্তারের ঔষধ খেলাম ।
এদিকে আব্বার ছুটি শেষ । আমাকে জ্বর অবস্হায় রেখে অফিসের পথ ধরেন তিনি। মুখ গোমরা করে বসে থাকি আমি । আব্বা যাওয়ার সময় শরীরটা কেমন লাগছে জানতে চান আমি জবাব দেইনা ।
আব্বার হঠাৎ প্ওায়া আদরটা ভুলতে পারিনা। দিনটা খুব কষ্টে কাটে । পরদিন আচমকা খবর আসে আব্বা একসিডেন্ট করে হাসপাতালে । আম্মা শুনে রাস্তার দিকে দৌড় দেয় । ভাবি বোরখাটা পইরা লওনা , চাচা হাকায় আর আম্মার পেছনে দৌড়ায় । আমিও তাদের পিছু নেই ।
আমাকে এমন জ্বরে রেখে বাড়ি ছেড়ে আসলেও আব্বা আসলে মনটাকে মানাতে পারেননি । চিটাংরোড নেমে অফিসে না গিয়ে আবার বাড়ির দিকে রওনা দেন । দ্রুত বাস ধরতে গিয়েই এ হাল হয় আব্বার । আমার জন্য আব্বার আজ এ অবস্হা । আমি মাতা নিচু করে , আব্বার কেবিনের দিকে যাই । ইস আব্বার ডান পাটা বুঝি গেল ।
আমাকে দেখে ক্লানÍ হেসে বলল তোর না জ্বর তুই বাইরে আসছছ কা ? আমি আব্বার পাশে বসি । আব্বা আমার মাথায় হাত রাখে ... শরীরটা এখন কেমন লাগছেরে মিতু জিঙ্গাসা করে । আমি আব্বার হাতটা আমার হাতে জড়িয়ে ধরি । আব্বা ... আব্বা , আপনি...আব্বা...
বাবা ছেলের চোখ থেকে বারি ঝরে টপাটপ পড়ছে দুটি হাতের উপর । দু হাতের সেতু বন্দনে সে পানি মিশে একাকার ... যেন তৈরি করছে দু:খ জয়ের কাহিনীকাব্য !
এ গল্পটি ১৫-৬-১১ বুধবার দৈনিক যুগান্তরে (১৭ পাতা , বাবা দিবস সংখ্যা ) প্রকাশিত , সংস্করন-১
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুন, ২০১১ রাত ১:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


