মুক্তিযুদ্ধের পটভুমিকায় লেখা একটি গল্প। সমস্ত চরিত্রই কাল্পনিক । পড়ে আপনারা মন্তব্য করবেন আশা করি।
ঘরটি ঘুটঘুটে অন্ধকার। আলো-বাতাস ভেতরে ঢোকার কোন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। গুমোট এক পরিস্থিতি। কখন দিন হয় কখন রাত হয় বোঝার কোন উপায় নেই। ঘরটি স্যাতস্যাতে, ভেজা। মেঝেটি সবসময় ভেজা থাকে। হয়ত রক্তের জন্য। হয়তো বা চোখের জল। হয়তো রক্ত আর চোখের জলে একাকার হয়েছে মেঝেটি। এসব কিছুই বুঝতে পারে না রুবা। দিনের পর দিন সে একই ভাবে পড়ে আছে। হয়তো সপ্তাহ, হয়তো বা মাস। সময় কিভাবে আসছে, কিভাবে যাচ্ছে এই ঘরটিতে বন্দি হবার পর থেকে বোঝার কোন উপায় নেই। এখানে শুধু রুবা একা নয়। কমপক্ষে আরও পনেরো-বিশ জন তো আছে। এক এক করে তাদের এ ঘরে বন্দি হতে হয়েছে। পাক সেনারা এক এক করে তাদের ছুড়ে ফেলে গেছে। তাদের অপরাধ তাদের পেট ফুলে উঠেছে। তাদের উপভোগ করবার আর কোন কিছুই অবশিষ্ট নাই। পাপের বীজ থেকে চারা গজিয়ে উঠছে তাদের শরীরের অভ্যন্তরে। রুবার চোখ থেকে অনবরত পানি পড়ছে। কিন্তু এত পানি আসে কোথা থেকে? এই যে এত গুলো নারী কন্ঠ সেই কবে থেকে গঙিয়ে গঙিয়ে কেঁেদই চলেছে কিন্তু কই পানি তো শেষ হয় না। তবে কি পানির বদলে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে? শরীরের অবশিষ্ট বিশুদ্ধ রক্ত কি তবে চোখ দিয়ে পড়ছে?
কান্নার জোরও যেন সে হারিয়ে ফেলেছিল। তার পাশেই একটি মেয়ে পড়ে আছে। একদম চুপচাপ থাকে সে। হঠাৎ হঠাৎ সে হেসে উঠে আর চিৎকার করে বলে- “ইসলাম রক্ষা, তোদের ধর্মে কি নারী দেহ লুটে ইসলাম রক্ষা করতে বলেছে?এই বেশ্যাগুলা কাঁদবি না।” কিছুক্ষণ আগেও মেয়েটি এগুলো বলছিল। এই কথাগুলো শুনলেই রুবার মন আশংকায় ভরে যায়। তার পরিচয় কি তবে একজন বেশ্যা। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা নয়। নতুন বিয়ে করে সুখেই তো চলছিল তার সংসার। তার স্বামী আসাদ একজন সাংবাদিক। কত সুখের স্মৃতি মনে পড়ে যায় রুবার। বিয়ে হলো, ঘর গোছানো শুরু হলো। তার শাশুড়ি বিয়ের প্রথম দিনই বলল- হে গো মা, এ সংসার এখন তোমার। আমার যুগ তো শেষ। এখন তোমার সংসার তুমি কি করে সাজাবে তা তুমিই ঠিক করো। কথাগুলো সে শুনছিল আর আনন্দে তার মন ভরে যাচ্ছিল। কত কি শুনেছিল শাশুড়ি সম্পর্কে। শাশুড়িরা এমন হয়, ওমন হয়। সারাক্ষণ খেটর খেটর করে। ছেলেদের প্রতি অতিরিক্ত আদিক্ষেতা দেখায়। কিন্তু কই তার শাশুড়ি তো ওমন নয়। সব দায়িত্ব সেচ্ছায় সপে দিয়েছে রুবার হাতে। তার শাশুড়ি একদিন বলছিল- “বউমা, তোমাকে আমি অন্যদের মতো বলবো না যে তুমি আমার মেয়ে। সেই অহেতুক অনধিকার চর্চা আমি করবো না। তুমি আমার ছেলের বউ আর এই পরিচয়টাই আমার কাছে সবচাইতে বড়।” মাথায় ঘোমটা দিয়ে শুনছিল সে। আর ভাবছিল কি বাস্তবধর্মী কথা রে বাবা! এই সব বাস্তবধর্মী স্বভাবের জন্য তার শাশুড়ি আসমা আক্তার তার কাছে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ত্ব। আর স্বামী আসাদ? সে তো স্বামী ছিল না। ছিল বন্ধু। সারাদিন পরিশ্রম করে ঢুকেই রুবার সাথে গল্প জুড়ে দিত। ‘ রুবা আজকে আমি বঙ্গবন্ধুর ইন্টারভিউ নিয়েছি। আমার মত একজন জুনিয়ার সাংবাদিক তাঁর মত নেতার কাছাকাছি যেতে পেরেছি।’ মিটিমিটি হাসতো রুবা। কি পাগল মানুষটা। রুবার এখনও মনে পড়ে, ৭ই মার্চ গভীর রাতে আসাদ ঘরে ফিরেছিল। মা তখন ঘুমিয়েছিলেন। ঘরে ঢুকেই আসাদ ‘মা,মা’ করে চিৎকার করতে থাকে। আসমা আক্তার কাঁচা ঘুম থেকে আশংকা ভরা চোখে উঠে আসেন। কি হয়েছে রে বাবা? আসাদ চিৎকার বলে- এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঝেছো মা? বঙ্গবন্ধু ইন্ডাইরেক্টলি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। বুঝতে পারো মা? বুঝতে পারো.... আমরা স্বাধীন হবো। আমাদের নিজেদের একটি দেশ হবে!
কি উত্তেজনা ভরা কন্ঠে কথাগুলো বলছিল আসাদ। আজও রুবার গা শিউরে ওঠে।
সেই মানুষটি ২১শে মার্চ অফিসের কাজে চট্টগ্রামে চলে গেল। কেমন যেন ভয় ভয় লাগছিল রুবার। যাওয়ার আগে আসাদ তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল- রুবা, আমি খুব ছোট থাকতেই আমার বাবা মারা যান। আমার মা আমাকে অনেক কষ্টে মানুষ করেছেন। অনেক অসহায় পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি হয়েছেন। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েন নি। কারণ সেদিনগুলোতে যদি তিনি ভেঙে পড়তেন তাহলে আমার আপন অস্তিত্ব বলে কিছুই থাকতো না। আজ আমি যা তা ওনার জন্যই। তুমি মা’কে দেখে রেখো। দেশের যা পরিস্থিতি। যে কোন সময়ে কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ভেঙে পড়বে না।
এসব কথা রুবার মনে পড়ে। ২৫শে মার্চ ঢাকায় অপারেশান সার্চ লাইট চলল। কই সে তো ভেঙে পড়েনি। দৌড়চ্ছে, দৌড়চ্ছে। প্রাণ রক্ষার তাগিদে ছুটেছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়েছে কি? হয়নি। শাশুড়িকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো। তাকে তুলে আনা হলো ক্যাম্পে। খাদ্য হতে হলো নরপশুগুলোর। প্রথম প্রথম প্রাণ ভিক্ষে চেয়েছে, তারপর দেহ ভিক্ষে চেয়েছে। লাভ হয়নি। এক বিছানা থেকে আরেক বিছানায় ফেলে দেহের অংশগুলোকে নোংরা করে দিয়েছে তারা।
হঠাৎ একদিন রুবা আবিস্কার করলো তার শরীরের অভ্যন্তরে আরেকটি প্রাণের অস্তিত্ব। কিন্তু আশ্চর্য! যে প্রাণের অস্তিত্ব পেলে একজন নারীর খুশি হওয়ার কথা কিন্তু সে তো খুশি হতে পারে নি। আশংকায় তার মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। এ পৃথিবীতে এই নিষ্পাপ প্রাণটির পরিচয় কি হবে? সে যখন প্রশ্ন করবে- আমার বাবা কে? তখন কি বলবে রুবা? আর আসাদ? আসাদ কি তাকে গ্রহণ করবে? এই নোংরা শরীরটা কি আসাদ কাছে টেনে নিবে? ঘিন্নায় শেষ হয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল তার। ফুপিয়ে ফুপিয়ে সে এবার কাঁদতে শুরু করলো। হঠাৎ পাশের নিশ্চুপ মেয়েটি আবার চিৎকার করে উঠলো। বলল- ওই, কাদোস কেন্? খবরদার কাঁদবি না। রুবার এখন একটু রাগ হলো। সে ভারি কন্ঠে বলল- কাঁদলে আপনার কি? তারপর মেয়েটি অনেক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠে- “বোন, কেঁদে কোন লাভ নেই। আমাদের চোখের পানি আমাদেরই দরকার। পেটের সন্তানের জন্য কাঁদারতো কেউ থাকবে না। তখন তাদের জন্য শুধু আমাদেরই কাঁদতে হবে। মানুষ আমাদের কান্না, আমাদের সন্তানের কান্না শুনতে পাবে না। হয়তো আমরাই শুনতে দিবো না।” এতদিন নিশ্চুপ পড়ে থাকা মেয়েটি এবার চিৎকার করে কেঁদে ওঠে।
হঠাৎ ধুম্ ধুম্ গুলির আওয়াজ শুনতে পায় তারা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা উলঙ্গ মেয়েগুলো এবার বসে পড়লো। কেউ একজন বলে উঠলো- “মুক্তিবাহিনী!!” অনেকক্ষণ গুলির আওয়াজ হলো। হঠাৎ চারিদিক নিঃশব্দ। তাদের নাকে হালকা বারুদের গন্ধ। অন্ধকার বদ্ধ ঘরে বসে তারা কিছু বুঝতে পারছিল না। হঠাৎ ঘরটির দরজায় ধাক্কা পড়লো। প্রথমে আস্তে তারপর জোরে। দরজা খুলে গেল। এক ঝাঁক আলো অন্ধকার ভেদ করে ঢুকে গেল ভেতরে। লুঙ্গি পরা অস্ত্র হাতে একটি ছেলে তাদের দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিল। রুবা শুনলো সে তার সতীর্থদের বলছে- এই তোদের গামছা আর গায়ের শার্ট খুলে দে।
২.
সময়টি পার হয়ে এসেছে ৩৭বছর আগে। রুবা এখন বয়সের ভারে নজু। ইলেকট্রিসিটি নেই। এই অন্ধকার তাকে নিয়ে গিয়েছিল সেই অন্ধকার ঘরটিতে। সেদিন সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল। একটি হাসপাতালে দু’মাস কাটিয়েছে। সন্তান প্রসব করেছে। কিন্তু সেই সন্তানটির কোন খোঁজ আজ তার জানা নেই। আসাদ আর ফেরেনি। হয়তো শহীদ হয়েছে। রুবা আরেকটি বিয়ে করেছে। প্রতিষ্ঠিত প্রকৌশলী। নিজের জীবনকে গড়ে তোলার তাগিদে অতীতকে মাটি চাপা দিতে হয়েছে রুবার। মাঝে মাঝে তার সেই নিষ্পাপ শিশুটির কথা মনে পড়ে। কেমন আছে সে? বেঁচে আছে তো? পরকালে যখন সেই শিশুটি তাকে প্রশ্ন করবে- মা, আমাকে একা ফেলে চলে এলে কেন? তখন, তখন সে কি জবাব দিবে? গা শিউরে ওঠে রুবার। আজ মনে পড়ে তার আসাদ ও শাশুড়ি আসমা আক্তারের কথা। আসাদ বলেছিল- “অসহায়ত্বের কাছে আমার মা আমার জন্য হার মানে নি।” আসাদ কি ভবিষ্যত দেখতে পেয়েছিল? তাই আগে থেকেই স্ত্রীকে সাবধান করে দিয়ে গেছে। কিন্তু সে সাবধানতায় তো কোন কাজ হয়নি। অসহায়ত্বের কাছে রুবা হার মেনেছে। আর তাই নিষ্পাপ শিশুটিকে ছুড়ে ফেলে এসেছিল।
তার পাশে পড়ে থাকা সেই মেয়েটির কথাও মনে পড়ে যায়। সে বলেছিল- আমাদের কান্না আমরাই হয়তো কাউকে শুনতে দিবো না। সত্যিই তো। রুবাতো শুনতে দেয় নি। আরামে আয়েশে কাটিয়ে দিয়েছে ৩৭টি বছর। তার সেই অসহায়ত্ব, তার সেই কান্নার শব্দ, তার সেই নোংরা শরীর কি তবে সে রেখে এসেছে ঐ অন্ধকার ঘরটিতে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



