পুরো ঘটনাটি নানুর কাছ থেকে শোনা।
তোমার আব্বু তখন পাকশিতে বদলি। রেলওয়ের চাকরি, বুঝো না! রেলওয়ের চাকরি মানেই বদলির চাকরী। সন্ধ্যা বেলা তোমার আম্মুরে নিয়া আমি আর তোমার মামা হাসপাতালে নিয়া গেলাম। তোমার মামা তখন মাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ে। ও কি কিছু বোঝে! সাহসও পাই না। ভয় আমি অস্থির। না জানি আমার মাইয়াটার কিছু হইয়া যায়। তারপরও সাহস কইরা হাসপাতালে নিয়া গেলাম। যাইহোক, রাত আট-টার দিকে তুমি আসলা। কিন্তু একটা নার্স বাইর হইয়া বলে, ছেলে হইছে কিন্তু তার পাল্স পাওয়া যাইতাছে না। নিশ্চুপ শিশুটি। কোনো নড়া চড়া করতাছে না। আমি বইসাই কাইন্দা দিলাম। আরেক নার্স বের হইয়া কয়, হয়তো শিশুটি মৃত। আমি তখন হাউমাউ করে কান্দা শুরু করলাম।
তোমার মামা হুট করে সেখান থেকে আমারে একা রাইখা চইলা গেলো। কই গেলো সেটা তো পরে ও আইসা কইলো। আইছিল ১ ঘন্টা পরে। আইসা কয়, দুলাভাইরে খবরটা জানাইতে ফোন দিতে গেছিলাম।
- ওমা, কি খবর জানাইতে?
-কইছি, আপনের একটা ছেলে হইছে, কিন্তু তার কোনো সাড়াশব্দ নাই। ডাক্তাররা বলছে, শিশুটি হয়তো মৃত।
- তো, তোর দুলাভাই, কি কইলো?
- কিছুক্ষণ চুপ করে আছিল। তারপর কইলো, আমার ছেলে পৃথিবীকে তার কোন আওয়াজ না শুনিয়েই চলে যাবে?
আমি শুইনা অস্থির। হায় আল্লাহ কি করলি তুই?
- কেন? কি হইছে?
- ছেলে বেচে আছে। দশমিনিট পর ক্যাঁচ কইরা চিল্লাইয়া উঠছে।
এগুলো বলতে বলতে নানু কেঁদে ফেলতেন। তারপর আবারও বলতে শুরু করতেন, যখন শুনছি, তুই হয়তো বাচবি না। তখন আল্লাহর কাছে হাত পাইতা দোয়া করছি। তোর মামা, যখন শুনলো, তুই বেচে আছিস। তখন দৌড়াইয়া নফল নামায পড়তে গেছে। আমার পোলাডা তার বোনরে কতো ভালোবাসতো। তারপর নানুর এক দীর্ঘশ্বাস।
আমার মামা তার পরের বছর একটি সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান। আমার নানু এই গল্পটি বলতেন তার একমাত্র পুত্র সন্তানকে মনে করার জন্য। স্মৃতি বড় যন্ত্রণাদায়ক।
আজ এই জন্মদিনে মনে পড়ছে এই দুজন মানুষের কথা। আমার মামা আর নানু। আমার জন্মের সময় যে আশংকার মুহূর্ত যেই দুজন মানুষ সরাসরি দেখেছেন। যাদের দোয়ায় আমি আজ জীবীত। সেই দুজন মানুষ আজ পৃথিবীতে নেই।
আজ আমার জন্মদিন। আমাকে উইশ করে রাতের বৃষ্টির শব্দ এবং মিলটন ভাই পোষ্ট দিয়েছেন। তাঁদের দুজনের প্রতি কৃতজ্ঞতা। যারা আমাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।
সবার কাছে একটাই অনুরোধ, আপনার দোয়া করবেন যাতে আমি আমার আওয়াজ পৃথিবীতে প্রতিটি প্রান্তে পৌছে দিতে পারি। আমার বাবার সেই বাক্য, আমার ছেলে পৃথিবীকে তার কোন আওয়াজ না শুনিয়েই চলে যাবে?
তারপরও জানিনা আমার আব্বুর সেই কাঙ্খিত আওয়াজ তার ছেলে পৃথিবীকে শোনাতে পারবে কিনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

