বর্ষার মাস। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। গভীর রাতে বৃষ্টি হলে ঘুম ভালো হয়। কারণ, আবহাওয়াটা খুব ঠান্ডা থাকে। কিন্তু বদরপুর গ্রামের চেয়ারম্যান, আবুল কাশেমের ঘুম ভালো হচ্ছে না। তিনি ঘুমালেই আজে বাজে স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নের ধরণ প্রচন্ড ভয়ানক। তিনি দেখেন, এক বৃদ্ধ লোক সাদা রঙের পায়জামা-পানজাবী পরা। চেহারাটা ঠিক মতো দেখা যায় না। দেখতে পারার কথাও না। কারণ, বৃদ্ধ লোকটি একটি কাপড় দিয়ে মুখটি বেধে রেখেছেন। লোকটি মসজিদের দরজার সামনে দাড়িয়ে তাকে বলেন, অই কুত্তা! দাও আছে তোর কাছে? থাকলে...দাও নে....তারপর নিজের গলায় নিজে কোপ মার....মর্ কুত্তা....মর
যা দেখলেই তিনি প্রচন্ড ভয় পাওয়া শুরু করেন। তার শরীর কাঁপতে থাকে, শরীর ঘামে ভিজে যায়। শুধু এতোটুকুই দেখলে হতো। কিন্তু স্বপ্নটি ওখানেই শেষ হয় না। তিনি আরও দেখেন, সেই মসজিদটি থেকে হাজার হাজার উলঙ্গ নারী বের হয়ে ছুটতে থাকে তার দিকে। তিনি তা দেখে দৌড়াতে থাকেন আর সেই বৃদ্ধ চিৎকার করে হাসতে থাকেন। ঠিক তখনই তার ঘুম ভেঙে যায়। পানির তেষ্টায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। প্রচন্ড ভয়ে তিনি কাপতে থাকেন। অনেক সময় পর্যন্ত সেই বৃদ্ধের হাসি তার কানে বাজতে থাকে।
বেশ কয়েক রাত ধরেই তিনি এই স্বপ্নটি নিয়ে বিচলিত। আজও মধ্যরাতে এই একই স্বপ্ন তিনি দেখলেন। আর সাথে সাথে ঘুম ভেঙে গেলো।
বাইরে গভীর অন্ধকার। বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দে নিস্তব্ধ রাত যেনো কথা বলছে। অসাধারণ এই রাতে বারান্দার ই.জি চেয়ারে বসে আছেন চেয়ারম্যান আবুল কাশেম।
চারটি শোবার ঘর, দুটি বারান্দার দোতালার বিশাল বাড়িটিতে তিনি একা থাকেন। একাত্তর এর যুদ্ধে তার আঠারো বয়সি মেয়ে মারা গিয়েছিল। এই একমাত্র কন্যাটিকে তিনি প্রচন্ড ভালোবাসতেন। সেই মেয়েকে হারিয়ে তিনি এক প্রকার বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তারপরও এই একাকিত্ব ঘোচানোর জন্য তিনি যুদ্ধের পর আরেকটি বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সেই স্ত্রী সন্তান প্রসবের সময় মারা যায়। সেই সন্তানটি বেচে ছিল। কিন্তু তাকে তিনি গ্রহণ করেননি। এই ঘটনাটি ৭৩-এর দিকে। প্রায় ৩৭ বছর বলতে গেলে তিনি নিঃসঙ্গতা নিয়েই পার করে দিয়েছেন। তবে এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁর অনেক একা একা লাগে। মেয়ের কথা খুব মনে পড়ে। মনে হয়, এই নিঃসঙ্গ সময়ে যদি তাঁর মেয়েটি পাশে থাকতো!!
হঠাৎ কাশেম সাহেবের মনে পড়ে কাল বদরপুর স্কুলে যেতে হবে। সেখানের একটা পুরুস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তিনি। স্কুলটিতে একটি রচনা প্রতিযোগিতা হয়েছিল। বিষয়: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সেই অনুষ্ঠানে তাকে একটা বক্তব্য দিতে হবে। তারপর বিজয়ী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে পুরস্কার তুলে দিতে হবে।
যাইহোক। তিনি বারান্দা থেকে উঠে এসে বেডরুমে ঢুকেন। চেয়ারে হেলান দিয়ে তিনি আমন্ত্রণ পত্রটি দেখতে থাকেন। খাম খুলে পত্রটি বের করেন এবং পড়েন। আর সাথে সাথেই তার মেজাজটা বিগড়ে যায়। স্বপ্ন নিয়ে ভয়ের সমস্ত ভাবনাগুলো যেনো হাওয়াতেই মিলিয়েই যায়। কারণ, এই অনুষ্ঠানে একজন বিশেষ অতিথি আছেন। যার নাম মোনায়েম মাষ্টার। ৭১-এর সময় তিনি ছিলেন এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তাঁর ছেলে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। এই কারণেই তাকে স্মৃতিচারণ করবার জন্য বিশেষ অতিথি করা হয়েছে। কিন্তু এই লোকটিকে তিনি একদম সহ্য করতে পারেন না। চেয়ারম্যান ইলেকশানের সময় এই মাষ্টার তার নামে যতসব উল্টা পাল্ট কথা বলে বেড়িয়েছে। মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে বলেছে, তোমরা এই কাশেমরে ভোট দিবা না.....ও হইলো রাজাকার......
ভোটে জয় পাওয়ার জন্য তাকে অনেক কাঠ-ঘোর পার করতে হয়েছিল। ডিসি অফিসে বার বার ধরনা দিতে হয়েছে। এমনকি দলের হাইকমান্ডকে খুশী রাখতে তার হিমশিম অবস্থা ছিল। অনেক কষ্টে পরে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
আবুল কাশেম কাগজ কলম নিলেন কালকের জন্য একটা স্পিচ লেখার জন্য।
চলবে.........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



