সারা-রাত বৃষ্টি হওয়ার কারণে কাঁচা রাস্তা কাদা হয়ে গেছে। রফিকের মোটরসাইকেলের চাকা কিছুক্ষণ পর পর কাদায় আটকে যাচ্ছে। কিছুতেই এগুতে পারছে না। শেষমেষ কোনো উপায়ান্তু না দেখে রফিক তার পরণের জুতা খুলে মোটরসাইকেল থেকে নেমে তাকে ঠেলে ঠেলে চলতে শুরু করলো।
কর্দমক্ত অবস্থায় রফিক চেয়ারম্যানের বাড়ি গিয়ে পৌছাল। তাকে দেখেই চেয়ারম্যান বলে উঠল, কি রে হারামজাদা, তোরে মোটরসাইকেল কিনে দিছি কি দেরী কইরা আসনের লাইগা।
রফিক হতাশা নিয়া বলে, চাচা কেমনে আমু। রাস্তাঘাট পেকে ভইরা গেছে। আমনেরে কেমনে নিমু আমি তো হেই চিন্তাই করতাছি।
তাদের দুজনের কথপকথনের মধ্যেই উপস্থিত হলো রফিকের সাঙ্গপাঙ্গরা। তারা রওনা দিলো বদরপুর স্কুলের দিকে। কাদায় ভরা রাস্তা দিয়ে তারা যাচ্ছে। তবে মটরযানটি স্টার্ট দেয়া হয়নি। কাচা রাস্তায় চেয়ারম্যান বসে আছে মোটরসাইকেলে আর রফিক দু’হাতে হ্যান্ডেল ধরে টেনে টেনে হাটছে। আর চারপাশে ঘিরে হাটছে মিঠু, আসাদ, মতি ও দুলাল।
বদরপুর স্কুলে পুরস্কার বিতরনী শেষ হয়েছে। আপ্যায়নের জন্য হেড-মাষ্টার তার কক্ষে চেয়ারম্যানকে নিয়ে গেছেন। চেয়ারম্যান বসে আছেন হেড-মাষ্টার আ: সালামের চেয়ারে। ঠিক সামনেই দাড়িয়ে আছেন সালাম মাষ্টার।
কি মাষ্টার সাহেব, আপনার বিশেষ অতিথি দেখি আইজকা অনুপস্থিত? রাস্তায় রাস্তায় মুক্তিযুদ্ধের এতো বড় বড় কথা কইয়া বেড়ায় আর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অনুষ্ঠানে তিনি অনুপস্থিত!! ঘটনা কি?
সালাম মাষ্টার চুপচাপ দাড়িয়ে ছিলেন। কিছু বলছেন না। তাকে এই প্রশ্নটি করা হবে সেটা তিনি জানতেন কিন্তু এর উত্তর তিনি কিভাবে দিবেন সেটা তিনি ঠিক করেননি। তারপরও বলে উঠলেন, জ্বি, উনি যে আসবেন না সেটা তো গতকল্যই জানিয়ে দিয়েছেন।
তাই নাকি? তো কারণটা কি বলেছেন?
সালাম মাষ্টার চুপ করে ছিলেন। চেয়ারম্যান সরবতের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বলছেন, তিনি যে আমার জন্য আসে নাই সে আমি বুঝতে পারছি। আমি খালি হুবুহু সেই বাক্যটি শুনতে চাই যেটা তিনি ব্যবহার করেছেন।
বাদ দেন না চেয়ারম্যান সাব। আসে নাই ব্যাস আসে নাই। কি দরকার আর এগুলো নিয়া কথা বাড়ানোর?
সাথে সাথেই হুংকার দিয়ে দাড়িয়ে গেলেন চেয়ারম্যান। আর বলতে শুরু করলেন, তোমার বেশী সাহস বাড়ছে মাষ্টার। তোমারে যে প্রশ্ন করছি সেই প্রশ্নের উত্তর দাও। এতো কথা পেচাইতে আমি তোমারে বলি নাই।
মাষ্টার তখন মাটিতে দিকে তাকিয়ে বলল, জ্বি উনি বলেছেন, যে অনুষ্ঠানে রাজাকার অতিথি হয়ে আসবে সে অনুষ্ঠানে আমি যাবো না। কারণ, আমি যদি সেখানে যাই তাহলে আমার ছেলের আত্মা কষ্ট পাবে।
এগুলো শোনার পর চেয়ারম্যান কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন। তার সামনে হরেক রকমের খাবার এবং অর্ধেক খাওয়া সরবতের গ্লাস। এগুলো কিছুই আর তিনি স্পর্শ করেননি। উঠে চলে আসলেন সেখান থেকে।
২.
স্বন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। প্রকৃতিকে অন্ধকার কিছুক্ষণ পর জড়িয়ে ধরবে। রফিক চেয়ারম্যানের সাথে সারাদিন ছিল। এখন এই শেষ বেলায় সে তার ঘরে ফিরছে। তার মোটরসাইকেলটা চেয়ারম্যানের বাড়িতে রেখে এসেছে। রাস্তায় যে পরিমাণ কাদা জমেছে তাতে হেটেই যাওয়াই ভালো।
বাড়ি যাওয়ার পথে মোনায়েম মাষ্টারের বাড়ি পড়লো। তার খুব ইচ্ছে হলো মাষ্টারের সাথে দেখা করার। মোনায়েম মাষ্টার তারও শিক্ষক এবং খুব পছন্দের শিক্ষক। মাষ্টারের বাড়ির সামনে এসে রফিক দাড়ালো।
-স্যার কি বাড়িতে আছেন?
-আছি। কে, রফিক?
-জ্বি স্যার। আসসালুমুআলাইকুম।
সালামের উত্তর দিতে দিতে মাষ্টার তার দরজা খুললেন বললেন, আয়, ভিতরে আয়।
- স্যার কি ভালো আছেন?
- আছি বাবা। এই বয়সে আর থাকা। একা একা জীবন। বড় বিরক্তিকর। তো বাবা, তোমার কি খবর?
- আমি স্যার ভালোই আছি। চেয়ারম্যানের সাথে থাকি। ওনার দয়ায় বাইচা আছি।
মাষ্টার যেনো বিমর্ষ হয়ে উঠলেন। একটি দীর্ঘশ্বাস দিয়ে রফিকের দিকে তাকালেন। এই সেই ছেলে যে তার ছাত্রদের মধ্যে সবচাইতে সৎ ছিল। তিনি বলে উঠলেন, রফিক, তুই আমার ছাত্রদের মধ্যে সব চাইতে সৎ এবং ভালো ছাত্র ছিলি। তোদের আমি সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার উপদেশ দিয়েছিলাম। সবসময় বলেছিলাম, ভালো কে ভালো আর মন্দকে মন্দ বলে স্বীকার করতে। কিন্তু এখন দেখি আমার সব শিক্ষা সব উপদেশ ব্যর্থ। তোরা কেউ তা পালন করস নাই। ওই ভন্ড দেশদ্রোহীটার সাথে তোরা উঠা বসা করস। দেখলে বড় কষ্ট হয়।
কথাগুলো বলার সময় মাষ্টারের গলার স্বর কাঁপছিল। আর রফিক সব মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো শুনছিল। কিছুক্ষণ পর রফিক বলল, স্যার, আপনের শিক্ষা দিয়া তো জীবন চলে নাই। ইন্টার পাশ করলাম আর বাপটাও মইরা গেলো। আপনে তো সব দেখছেন। কি কষ্টে আমাগো দিন গেছে। জমি যা ছিল সব বেইচা দিয়া সৌদি যাওয়া পরামর্শ সবাই দিলো। তাই করলাম। মানুষ বিশ্বাস কইরা ধরলাম আদম বেপারী। হালার পুতেরা আমার সব টাকা মাইরা খাইলো। সৌদি আর যাওয়া....
কি যে কষ্টের দিন গেছে। এমনও দিন গেছে আমরা মা-পুতে দুই দিন না খাইয়া ছিলাম। এরুম বিপদের দিনে যদি চেয়ারম্যান আমার দিকে না চাইতো তাইলে আমি এতোদিনে শেষ হইয়া যাইতাম। ওনার লগে থাকি। ট্যাকা পাই প্যাট চালাই। উনার কারণে পেটে ভাত যায়। এইডাই এখন আমার জন্য বড়। উনি মানুষ কেমন আর আগে কি ছিলেন তা দিয়া আমি কি করুম।
শোন রফিক, ভন্ড লোকেরা স্বার্থ বোঝে। তার স্বার্থ যতোদিন আছে সে ততোদিন তোরে সাথে রাখবো। যেদিন তার স্বার্থ ফুরাইয়া যাইবো সেদিন তোরে সে ছুইড়া ফালায়া দিবো।
একটা কথা মনে রাখবি। দেশ হইলো মা’র মতো। যে একদিন এই মারে বেচার চেষ্টা করছে সেখানে তোর মতো রফিক তার কাছে কিছুই না।
রফিক বিদায় নিলো মাষ্টারের কাছ থেকে। রওনা দিলো তার বাড়ির দিকে। তখন প্রকৃতি পুরো অন্ধকার।
রফিককে বিদায় দিয়ে মোনায়েম মাষ্টার তার শোবার ঘরে ঢুকলেন। দুকামরার এই নড়বড়ে ঘরটিতে তিনি একা থাকেন। তার স্ত্রী বহু আগে মারা যান। একটিমাত্র পুত্র সন্তানের বয়স তখন ছিল ৪ বছর। সেই ছেলেকে তিনি একাই কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। এই ছেলে আর স্কুলে শিক্ষকতা নিয়েই ছিল তার জগত।
এক সময় তিনি বদরপুর স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে যান। সেই সময়টি ছিল ১৯৭১। সেই উত্তাল সময়টিতেই তিনি হেডমাষ্টার হন। আর তখন তার ছেলে মো: রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বদরপুরে রাসেলই ছিল একমাত্র ছেলে যে কিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছিল।
তো, রাসেল সেই উত্তাল দিনগুলোতে বাবাকে নিয়মিত চিঠি লিখতো। যার বেশীরভাগই ছিল সেই সময়কার রাজনৈতিক অবস্থা বিশেষ করে ঢাকার রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে। বলা যায়, ছেলের মুক্তমণা চিন্তায় তিনি মুগ্ধ ছিলেন। ছেলের দেশপ্রেমে তিনি গর্ববোধ করতেন। রাসেলের প্রতিটি চিঠি তিনি এখনও স্ব-যতেœ রেখে দিয়েছেন। প্রায়ই তিনি এগুলো বের করে পড়েন। আজও তার ইচ্ছে হলো পড়তে। এই চিঠিগুলো পড়লে বৃদ্ধ মাষ্টারের মধ্যে আবারও লড়াই করার প্রেরণা জেগে ওঠে। যেমন, যুদ্ধের আগে একটি চিঠিতে সে লিখেছিল,
বাবা,
আশা করি তুমি ভালো আছো। আমিও খুব ভালো আছি। একটি নতুন দেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে কেউ কি কখনো খারাপ থাকতে পারে বাবা!
হ্যা বাবা হ্যা.....আমরা একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। যে দেশ হবে আমাদের। আমরা খুব শিঘ্রই একটি স্বাধীন দেশের জন্য আন্দোলন করবো। আর সেই অপেক্ষাতেই আছি বাবা। অপেক্ষা করছি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের। খুব বেশী দেরী নেই সেই ভাষণের।
আমাকে নিয়ে কোনো চিন্তা করো না বাবা। তোমার ছেলে তোমাকে একটি নতুন দেশ দেবে বাবা। অপেক্ষা করো সেই দিনটির জন্য। যেই দিনটির সূর্য উঠবে আমাদের জন্য। যেই দিনটির নতুন সকাল হবে আমাদের জন্য। যেই সকাল হবে একটি স্বাধীন দেশের সকাল। প্রতিটি মুহূর্ত হবে স্বাধীন। অন্য কোনো শক্তির কাছে আর মাথা নত নয় বাবা। আর কেউ আমাদের দমাইয়া রাখতে পারবে না।
ভালো থেকো।
ইতি
রাসেল
এ ধরনের উত্তেজনায় ভরা চিঠি প্রায়ই রাসেল লিখতো। ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ তিনি শুনতে পাননি। কারণ, তার ট্রানজিস্টারটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর বাজারে আবুল কাশেম তার লোকজন দিয়ে সমস্ত দোকান বন্ধ করে দিয়েছিল। কেউ যাতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে না পারে সেই ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি শুনতে পান বেতারে এই ভাষণ শোনানোর কথা থাকলেও শোনানো হয়নি। কিন্তু পরদিন সকালে সেই ভাষণ পূনপ্রচার হলেও কেউ জানতো না।
যাইহোক, ১৫ই মার্চ রাসেলের চিঠি আসলো। খুব সংক্ষিপ্ত চিঠি।
বাবা,
বলেছিলাম না একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন আমরা দেখছি। বঙ্গবন্ধু আমাদের নিরাশ করেননি। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন। তবে খুব ইন্ডইরেক্টলী। মনে রেখো বাবা, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
ইতি
রাসেল
প্রতিটি দিন তিনি রাসেলের এ ধরনের চিঠির অপেক্ষায় থাকতেন। ছেলেই তাকে দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ করেছে। তিনিই প্রথম মানুষ যিনি বদরপুর স্কুলে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলার লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে ছিলেন। এই জন্য তাকে হেড-মাষ্টার পদ থেকে বহিস্কার করা হয়। কিন্তু এতে তিনি মোটেই নিরাশ হননি।
তারপর ২৫ শে মার্চ হামলা হলো ঢাকায়। ছেলের জন্য তিনি পাগল হয়ে উঠলেন। একমাত্র ছেলের অবস্থা তিনি জানতে পারছেন না।
দুমাস অপেক্ষার পর রাসেলের চিঠি আসলো। সেটা জুনের শুরুর দিকে ছিল।
বাবা,
তুমি কেমন আছো আমি জানি না। আমি এও জানি না আমার সেই সবুজ শ্যামল নিরীহ মানুষের গ্রামটিতে ঐ হায়নারা ঢুকেছে কিনা।
ভয়ঙ্কর বাবা। ওরা প্রচন্ড ভয়ঙ্কর। ওরা মানুষ না বাবা। যেভাবে ওরা ঘুমন্ত ঢাকার উপর কাপুরুষের মতো হামলা চালালো তা নিজ চোখে না দেখলে বুঝতে পারবে না ওই মুহূর্তটা কি পরিমাণ ভয়ানক ছিল!
তোমার দোয়ায় আমি বেচে গেছি বাবা। আমি এতোদিন বোর্ডারে ট্রেনিং এ ছিলাম। তাই কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি। আজ থেকে আমাদের অপারেশান শুরু হবে।
বাবা, আমি জানি না আমি বেচে থাকবো কি মরে যাবো। যদি বেচে থাকি তাহলে চিঠি পাবে। আর যদি মরে যাই তাহলে আর চিঠি পাবে না। তবে বাবা, দু মাসের বেশী আমার চিঠির জন্য অপেক্ষা করো না। কিন্তু বাবা, অপেক্ষা করো একটি নতুন দেশের। যে দেশের নাম হবে বাংলাদেশ।
ইতি
রাসেল
চলবে.......
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



