অভিশপ্ত (৩য় পর্ব)
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১ম পর্ব: Click This Link
২য় পর্ব: Click This Link
এই চিঠিটি পাবার কিছুদিন পরই হানাদার বাহিনী বদরপুর গ্রামে ঢোকে।
রাসেল ঠিক বলেছিল, ওরা ভয়ঙ্কর। আসলেই ওরা ভয়ঙ্কর। মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে যুবকদের ধরে এনে তারা হত্যা করেছে। যুবতীদের ইজ্জত হরণ করেছে।
এ গ্রামে তাদের সর্ব ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে আবুল কাশেম। সেই দেশদ্রোহী আবুল কাশেম আজ এই গ্রামের একজন সম্মানিত চেয়াম্যান। যা তাকে বেদনায় ভাসায়। লজ্জা দেয় ।
তার ছেলের শেষ চিঠি তিনি পেয়েছিলেন সেপ্টেবরের শেষ দিকে। সেখানে লেখা,
বাবা,
এই নিয়ে পাঁচটা অপারেশান করেছি। গেরিলা কায়দায় বাংলার সন্তানরা তাদের পরাস্ত করছে। তবে বাবা, গ্রামে গ্রামে যে তান্ডব লিলা আমি দেখেছি তা যদি তোমাকে বলি তুমি বুঝবে না। গ্রামের পর গ্রাম..... প্রান্তরের পর প্রান্তর শুধু রক্ত আর রক্ত। মুসলমানীত্ব রক্ষায় নাকি এই রক্তের বন্যা বাবা! কি হাস্যকর তাই না বাবা? আমাদের দেশের কিছু সন্তান তাদের সহায়তা করছে এই বলে যে তারা নাকি ইসলাম রক্ষা করছে। ইসলাম জানতাম শান্তির ধর্ম। ইসলামে কি বাবা এইভাবে রক্ত দিয়ে খেলতে বলেছে? ইসলামে কি নারীদের দেহ লুটে খেতে বলেছে। কি অদ্ভুদ তারা। তারা ভুলে গেছে, ইসলামে এও বলেছে নিজের মাতৃভুমির রক্ষার কথা। তা তারা ভুলে গেছে। ভুলে গিয়ে নেমেছে লাশের খেলায়। প্রথম প্রথম লাশ দেখতে ভয়ে আঁতকে উঠতাম। কিন্তু এখন এতো লাশ দেখেছে এই চোখ যে লাশ এখন আর কোনো বিষয় না।
তবুও চিন্তা করো না বাবা। এই দেশ স্বাধীন হবেই। এই দেশের দামাল ছেলেদের রক্ত আল্লাহ বৃথা যেতে দেবে না। আমার সাথে খলিল, নাজিম, জাবের শহীদ হয়েছে। ওদের রক্ত বৃথা যাবে না বাবা।
এই দেশ স্বাধীন হবেই। তবে বাবা, একটি স্বাধীন দেশেও যে আমাদের গড়তে হবে। তার জন্যও আমাদের লড়তে হবে। বাংলার ইতিহাসে হয়তো অনেক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু বাবা, বাংলার ইতিহাসে ৭১-থাকবে রক্তাক্ত একাত্তর হয়ে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই একাত্তরকে স্বরণ করবে। কিন্তু তারা অনুভব করতে পারবে না কি ভয়াবহ রক্ত বন্যা হয়েছে। এই রক্তাক্ত একাত্তর লাল অক্ষরে শুধু লেখাই থাকবে বাংলার ইতিহাসে।
আমি জানি না, একটি স্বাধীন দেশের পূর্ণ স্বাদ আমরা গ্রহণ করতে পারবো কিনা!
ভালো থেকো।
ইতি
রাসেল
এটিই ছিল ছেলে শেষ চিঠি। রাসেল যেনো বুঝতে পেরেছিল এ জাতি স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারবে না।
মোনায়েম মাষ্টারের ছেলের চিঠি আর আসে নি। দেশ স্বাধীন হলো কিন্তু তার ছেলে ফেরেনি। তিনি কখনও এ নিয়ে দুঃখও পাননি। কারণ তার ছেলে এই দেশকে বাচাতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে। তার ছেলে তার গর্ব। কিন্তু যখন আবুল কাশেমের মতো লোক এ দেশে বুক উচিয়ে চলে তখন তার দুঃখ হয়। তখন খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি শুধু একটিই প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহ, আমাদের যে ছেলেগুলা প্রাণ দিয়া গেছে তাদের রক্তের কি কোনো মূল্য নেই!
ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠেন মোনায়েম মাষ্টার। ছেলের চিঠিগুলো পড়লে তিনি ভেতরে ভেতরে একটি লড়ার প্রেরণা পান। আজও পেলেন। তার ভিতরে জেগে ওঠে একটি নতুন বিপ্লবের স্বপ্ন। তার ছেলে একটি স্বাধীন দেশ পাওয়ার জন্য বিপ্লব করেছেন। আর তিনি করবেন সেই স্বাধীনতা রক্ষা করার বিপ্লব।
৩.
চেয়ারম্যান সাহেবের আজও ঘুম ভালো হয়নি। ঘুমিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু সেই স্বপ্নটি দেখে তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন। এই স্বপ্ন তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তাকে শান্তি দিচ্ছে না। শুধু যে স্বপ্ন তা কিন্তু না। আরেকজন মানুষ তাকে শান্তি দিচ্ছে না। মানুষটা হচ্ছে মোনায়েম মাষ্টার। এই মাষ্টার তাকে বরাবরই অপমান করে এসেছে।
যুদ্ধের পর পর এই মাষ্টার তাকে গ্রাম ছাড়া করেছিল। জুতোর মালা দিয়ে পুরো গ্রাম তাকে চক্কর খাইয়েছে। এসব তিনি ভুলে যাননি। তার সব মনে আছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তিনি গ্রামে বীরের বেশে ঢোকেন। বহু কষ্টে গ্রামের মানুষের সহানুভূতি তিনি আদায় করেছেন। আস্তে আস্তে গ্রামের ক্ষমতাশালী লোকে তিনি পরিণত হয়েছেন। কিন্তু তারপরও মাষ্টারের কোনো ক্ষতি তিনি করেননি। করেননি কারনও আছে। লোকমুখে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, দেখছো, কাশেম মিয়া কতো ভালা মানুষ। মাষ্টার কাশেম মিয়ারে কত্ত অপমান করলো তাও সে মাষ্টাররে কিছু কয় নাই।
নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তাকে হিমশিম খেতে হয়েছে। এই গ্রামের মানুষ বড় নিরীহ। এটা কাশেম মিয়া জানে। তাই তাদের হৃদয়ে জায়গা পেতে তাকে খুব একটা বেগ পেতে হয় নি। প্রথমে তিনি গরীবদের অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন। তারপর গ্রামে মাদ্রাসা, স্কুল দিলেন। বেকারদের একটা কিছু করার ব্যবস্থা করে দিলেন। ব্যস তার জায়গা সকলের অন্তরে হয়ে গেলো।
কিছু কিছু মানুষ ছাড়া এই গ্রামের সকলে তাকে পছন্দ করে। কিন্তু তারপরও মাষ্টারের স্পর্ধা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। তিনি ঠিক করলে এবার মাষ্টাররে কিছু একটা করতে হবে।
সকাল হয়েছে। চারদিকে ফুটফুটে আলো। মিষ্টি রোদও উঠেছে। বাইরের উঠানে চেয়ারে বসে আছেন চেয়ারম্যান। পাশে রফিক।
- রফিক, মাষ্টারের হালচাল আমার ভালো লাগতাছে না।
- বাদ দেন চাচা। মুরুব্বী মানুষ। একটু ভুল করছেই। থাক।
- হ। ভুল করছে ভালো কথা। তো, আমিও তো একজন মুরুব্বি নাকি?
- জ্বে জ্বে। আমাগো এই পুরা গেরামে তো আপনেরা দুজনই মুরুব্বি আছেন। যাগোরে আমরা সম্মান করি।
- এহন একজন মুরুব্বী ভুল করছে। তাহলে আরেকজন মুরুব্বীরও তো উচিত ভুল করা। নাকি?
রফিক একটু অবাক হয়। প্রশ্নও করে, মানে কিছু বুঝলাম না চাচা।
- মানি বুঝলি না? মানি হইলো আমিও একটা ভুল করুম মাষ্টারের ঘরে আগুন জ্বালাইয়া দিয়া। তয় এই ভুলটা গেরামের কেউ জানবার পারবো না।
রফিক বিস্ময় নিয়ে বলে ওঠে, কি কন চাচা?
- ওই হারামজাদা, আমি কি জাপানি ভাষায় কথা কইছি।
- না...মানি...উনি বুইরা মানুষ...থাক চাচা.....
- ওই কুত্তার বাচ্চা। আমারে তুই কি বুঝাস? সোজা কথা বুঝস না? ওর ঘরে আগুন জ্বালা। ওর মাষ্টারী ঐ আগুনের সাথে দাউ দাউ কইরা জলবো। ওর লাশও যাতে মানুষে না পায়। আমি খালি ওর ছাই চাই ছাই।
রফিকের সারা শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। মাষ্টার তার পছন্দের একজন মানুষ। সেই মানুষটার উপর হামলা সে কি করে করবে! মাষ্টার মানে শিক্ষক। তার কাছেই পড়াশুনা করেছে রফিক। এই পৃথিবীকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে এই মানুষটিই। মা-বাবা একটি মানব সন্তানকে ভুমিস্ট করে মাত্র। কিন্তু সেই মানব শিশুটির মধ্যে প্রাণ দেন তার শিক্ষক। মোনায়েম মাষ্টার সেই মানুষ। যে কিনা তার দেহে প্রাণ দিয়েছে। আর সেই মানুষটির উপর আঘাত সে কি করে করবে!!
চেয়ারম্যান একবার যার পেছনে লাগে তাকে সর্ব-শান্ত না করে ছাড়ে না। এটা রফিক জানে। কুতুব উদ্দিনের সাথে তার কি হয়েছিল তা রফিক ভুলে যায়নি। কুতুব উদ্দিন তার প্রতিদ্বন্দী প্রার্থী ছিল। সেই কুতুব উদ্দিনকে তিনি প্রার্থীতা প্রত্যাহারের জন্য বলেছিলেন কিন্তু সে তা করেনি। বিনিময়ে কুতুব উদ্দিনের মেয়েকে উঠিয়ে আনা হলো। যদিও তার ইজ্জতে কোনো হাত দেয়া হয়নি। গ্রামবাসী জানে কুতুব উদ্দিনের মেয়ে তার প্রেমীকার সাথে পালিয়েছে। তা জানবেই না বা কেনো। কুতুব উদ্দিনের সাথে সারারাত গ্রামের পর গ্রাম কাশেমও তার সাথে ছিল। গ্রামের মানুষের কাছে নিজের সততা, নিজের পরউপকারিতা প্রমাণের জন্য তিনি এ কাজটা করেছেন। যাকে বলে এক ঢিলে দুই পাখি। গ্রামের মানুষও বলে, দে হ, কাশেম মিয়া কত্ত ভালো লোক। ভোটে বিপক্ষে হইলেও কুতুব সাহেবের বিপদে তিনি সাথে ছিলেন।
এসব ঘটনা রফিক ভোলে নি। সব ভিতরকার চাল। রাজনৈতিক চাল। সেই রাতেই কাশেম তার কালো পাজেরো জীপের ভিতরে ঠান্ডা মাথায় কুতুব উদ্দিনকে বলেন, আপনের হাতে এখনও সময় আছে। কি করবেন!
কুতুব উদ্দিন নির্বাক হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। কাশেমের সমস্ত প্রস্তাব মেনে নেয় সে রাতেই। পরদিনই মেয়েকে তিনি পেয়ে যান। এবং সব অপমান কাঁধে নিয়ে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন। চেয়ারম্যান ভোটে কাশেম বলতে গেলে ফাঁকা মাঠেই গোল দেন। সেই কুতুব উদ্দিন লজ্জায় অপমানে গ্রাম ছাড়ে যখন গ্রামে রটে তার কলেজ পড়ুয়া মেয়ে চরিত্রহীন।
সব মনে আছে রফিকের। নোংরা রাজনৈতিক চাল সে চোখের সামনেই দেখেছে। সে দেখেছে চেয়ারম্যান কি করে ঠান্ডা মাথায় মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেয়।
আজ তিনি মোনায়েম মাষ্টারকে হত্যার পরিকল্পনা করা শুরু করেছেন। রফিক ভেবে পায় না সে কি করবে। তার পিতার সমান শ্রদ্ধা সে যে মানুষটিকে করে এসেছে সে মানুষটিকে কোনো আঘাত সে করতে পারবে না। আবার আঘাত না করলে সে জানে তার নিজের অবধারিত মৃত্যুর কথা।
চলবে.......
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।