১ম পর্ব: আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি!
২য় পর্ব: কুড়ি বছর পর যখন দেখা হলো!
দুটি পর্ব এর আগে প্রকাশিত হয়েছে। এবার তারই একটি ধারাবাহিকতা।
অবশ্যই তৃতীয় পর্ব নয়!
---------------------------------------------------------------------------------
কুড়ি বছর পর দেখা হলো মুনিয়ার সাথে।
শাহেদের আজ সারাটা সময় যাচ্ছে অস্থিরতায়। বড্ড অস্থিরতা!! এমন অস্থিরতা তাকে কাগজ-কলম নিতে শিখিয়েছে। যখন মনটা অসহায় হয়ে যায়, যখন নিঃসঙ্গতা কুরে কুরে খায়; তখন কাগজ-কলম নিয়ে গল্প-কবিতা লেখা ছাড়া আর বিকল্প কিছু খুঁজে পায় না শাহেদ।
তাই হয়তো অনেকেই বলে, একজন লেখক চিরজীবন নিঃসঙ্গতায় কাটিয়ে দেন। তার মনের হাজার বেদনার সুর কখনও হয়তো কেউ বুঝে উঠতে পারে না। কারণ, লেখক তা বুঝতে দেয়ও না।
আজ স্বন্ধ্যায় যখন অন্ধকার নেমে আসছিল ঠিক তখন মুনিয়া চলে গেলো। বয়স্ক, বাস্তবতায় হাবুডুবু খাওয়া এক ভিন্ন মুনিয়াকে আজ সে দেখলো দীর্ঘ কুড়ি বছর পর। ওর মাঝে কোনো অনুভূতি দেখা যায় নি; মানে বিশেষ কোনো অনুভূতি। যা শুধু শাহেদের জন্যই। কিন্তু একদিন; জীবনানন্দের কবিতার ভাষায়,
তোমার দুচোখ দিয়ে একদিন কতবার চেয়েছ আমারে।
আলো-অন্ধকারে
তোমার পায়ের শব্দ কতবার শুনিয়াছি আমি!
সব....সব যেনো কবিতা। সব কিছু যেনো জীবনানন্দের ঠিক করে দেয়া।
কেনো এমন হয়! একি শুধু তার সাথেই! নাকি হয় সকলের সাথে!!
অব্যক্ত শব্দমালা শাহেদ লেখে তার কাগজে। যেখানে বেজে ওঠে হৃদয়ের বেদনার সুর। শব্দমালারা কেঁদে ওঠে।
রাত গভীর হয়। নিঃসঙ্গ শাহেদ লিখে যায়.... লিখে যায়।
মুনিয়া তো জানে না, শাহেদ ঘুমোয় না কতরাত।
স্বপ্নে বিভর একসময়ের মুনিয়া যখন স্বপ্নের কথা বলত। তখন শাহেদ বলত, লাইফ ইজ নট সো ইজি। লাইফ ইজ ক্রিটিক্যল।
মুনিয়া বলে উঠতো- কচুর ক্রিটিক্যাল। তুমি সাথে থাকলে সব জলে ভেসে যাবে।
আজ দু'জন দু-মেরুর। কেউ নেই কারো সাথে। তবু জীবন যায়। কেটে যায়। কেটে তো গেলো কুড়ি-কুড়ি বছর।
মুনিয়ার স্বপ্ন এখন জীবন বাস্তবতায় বয়ে যায়। সময়তো ঠিকই চলে যায়।
সারাদিনের কোলাহল পার করে অফিস করে শাহেদ ঘরে ফেরে। সারাদিনের চিল্লাচিল্লি, হৈচৈ সব শেষে শাহেদ ঘরে ঢোকে। ক্লান্ত দেহ হেলে পড়ে। হয়তো চলে যায় কোনো এক ঘুমের দেশে। তারপরও বেদনায় ক্ষত এই হৃদয় ঘুমেও যেনো হানা দেয়। আবার কবিতা; আবার জীবনানন্দ।
কারণ, যোদ্ধার মতো-আর সেনাপতির মতন
জীবন যদিও চলে- কোলাহল ক'রে চলে মন
যদিও সিন্ধুর মতো দল বেঁধে জীবনের সাথে,
সবুজ বনের মতো উত্তরের বাতাসের হাতে
যদিও বীণার মতো বেজে ওঠে হৃদয়ের বন
একবার-দুইবার-জীবনের অধীর আঘাতে-
তবু প্রেম-তবু তারে ছিঁড়ে ফেঁড়ে গিয়েছে কখন!
তেমনি ছিঁড়িতে পারে প্রেম শুধু! - অঘ্রাণের রাতে
হাওয়া এসে যেমন পাতার বুক চলে গেছে ছিড়ে!
পুরণো প্রেম জেগে ওঠে। মুনিয়ার সাথে সকল স্মৃতিরা তাকে ঠোকর মারে। ঘুমাতে পারে না সে। দৌড়ে চলে যেতে ইচ্ছে হয় তার কাছে। দম বন্ধ হয়ে আসে। অন্ধকার রাত তার গলা চিপে ধরে। চিৎকার করে ওঠে তার মন। কিন্তু ধ্বনিত হয় না সে আওয়াজ পৃথিবীর বাতাসে। সব আর্তনাদেরা বন্দী হয় টেবিলে রাখা কাগজে।
মুনিয়াতো জানে না। শাহেদের দূর্বল লেখণী মালা শুধু তার জন্য গাঁথা হয়। জানা হলো না মুনিয়ার। আবার হবে কি দেখা!!....না হয় আবার কুড়ি বছর পর!!
মৃত্যু হলে সাদা কাপড়ে মোড়ানো শাহেদকে দেখতে আসবে ও!
এমন ভাবনায় আবার চলে আসে জীবনানন্দ।
জানি আমি, খুজিবে না আজিকে আমারে
তুমি আর; নক্ষত্রের পারে
যদি আমি চলে যাই,
পৃথিবীর ধুলো কাঁকরে হারাই
যদি আমি-
আমারে খুঁজিতে তবু আসিবে না আজ;
উফ! খেয়ে ফেলছে সব কিছু। খেয়ে ফেলছে ভালোবাসা... প্রেম! সব কিছু। কষ্টরা উত্তাল হয়ে উঠে এ রাতে। এমন হাহাকার থেকে মুক্তি খুজার জন্যই তো বিকল্প কতো কিছু করেছে। ভালোবাসার অভিনয়....প্রেমের অভিনয়.....মিথ্যে....মিথ্যে অনুভূতি দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে পবিত্র আত্মা।
তোমারে নিয়েছে ডেকে কোনদিকে জানি নি তা- হয়েছে মলিন
চক্ষু এই- ছিড়ে গেছি-ফেঁড়ে গেছি-পৃথিবীর পথে হেঁটে হেঁটে
কত দিন-রাত্রি গেছে কেটে!
কত দেহ এল, গেলো- হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে
দিয়াছি ফিরায়ে সব-সমুদ্রের জলে দেহ ধুয়ে
নক্ষত্রের তলে
বসে আছি- সমুদ্রের জলে
দেহ ধুয়ে নিয়া
তুমি কি আসিবে কাছে প্রিয়া!
মুনিয়া কি আসবে?
কত্তদিনের অপেক্ষা!! একদিন আসবে মুনিয়া। বসবে পাশে হাত ধরে। বলবে, নিঃসঙ্গতার হলো ছুটি। এসেছি। পাশে থাকবো। চিরকাল।
হলো না। বাস্তবতার বুলি নিয়ে কুড়ি বছর পর মুনিয়া এলো শেষ বিকেলে। ঘুমিয়ে থাকা অবশিষ্ট সব প্রেম আজ আবার জেগে উঠৈলো।
কেনো মুনিয়া! কেনো তোমার চোখে আমার জন্য কষ্ট নেই! মানুষ কি বদলায় এত সহজে!!
আমার যে হলো না বদলে যাওয়া। সেই তুমি; এখনও একি আছো। সেই পুরো মুনিয়ার বেশে আমার হৃদয়ে।
তোমার অভাব ভুলাতে পারে নি কেউ। কোনো প্রেম; কোনো ভালোবাসার শব্দ মৃত্যু ঘটাতে পারেনি তোমার দেয়া ভালোবাসা।
সকল ক্ষুধার আগে তোমার ক্ষুধায় ভরে মন!
সকল শক্তির আগে প্রেম তুমি, তোমার আসন
সকল স্থলের পরে, সকল জলের পরে' আছে!
যেইখানে কিছু নাই সেখানেও ছায়া পড়িয়াছে
হে প্রেম, তোমার!- যেইখানে শব্দ নাই তুমি আলোড়ন
তুলিয়াছ!- অঙ্কুরের মতো তুমি- যাহা ঝরিয়াছে
আবার ফুটাও তারে!- তুমি ঢেউ-হাওয়ার মতন!
আগুনের মত তুমি আসিয়াছ অন্তরের কাছে!
কুড়ি বছর পর আগুন হয়ে মুনিয়া জালাচ্ছে। এতোদিন যে জ্বলেনি তাও তো নয়! তবে আজ কুড়ি বছরের বদলে যাওয়া মুনিয়া আরও কাঁদাচ্ছে।
আহ্! প্রেম! বড্ড চাহিদা তার!
এতো বছরেও শাহেদের প্রেম কি টিকে রইবো মুনিয়ার কাছে!
পাগল শাহেদ। প্রেমের নাড়াচাড়া বুঝে না। প্রেমের যে মৃত্যু হয়েছে। তা আজ শাহেদ বুঝতে পেরেছে। ও কি ভেবেছে মুনিয়ার প্রেম থাকবে শাহেদের জন্য! এবসার্ট। এটা কখনও হয়! শাহেদের প্রেমের কবর দেয়া হয়েছে কবেই।
অন্ধকার গভীর হয়। গভীর থেকে গভীর। নিস্তব্ধতা ও নিঃসঙ্গতা দুটোই অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায়। হামলে পড়ে শাহেদের উপর। শাহেদ চেয়ারে বসে; নিদ্রাহীন শাহেদ কাগজ-কলম নিয়ে লিখবে কিছু। লেখা আসে না! কি হলো হঠাৎ!! কি হলো? লেখা কই? ভাবনারা কেনো ধরা দেয় না আজ কাগজে?
হাত চালায়। কলমকে ঘুরপাক খাওয়ায়। চলে যায় আবার জীবনানন্দের কবিতায়। লেখে তার কবিতা.....জীবনানন্দই যেনো বাজিয়েছে তার বেদনার সুর। তাই সে বাজায়..........সে লিখে,
একদিন- একরাত প্রেমেরে পেয়েছি তবু কাছে!
আকাশ চলেছে- তার আগে আগে প্রেম চলিয়াছে!
সকলের ঘুম আছে- ঘুমের মতন মৃত্যু বুকে
সকলের; নক্ষত্রও ঝরে যায় মনের অসুখে-
প্রেমের পায়ের শব্দ তবুও আকাশে বেঁচে আছে!
সকল ভুলের মাঝে যায় নাই কেউ ভুলে-চুকে
হে প্রেম তোমারে!- মৃতেরা আবার জাগিয়াছে!-
যে ব্যথা মুছিতে এসে পৃথিবীর মানুষের মুখে
আরো ব্যথা- বিহবলতা তুমি এসে দিয়ে গেলে তারে -
ওগো প্রেম, সেই সব ভুলে গিয়ে কে ঘুমাতে পারে!
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



