গত ৬ই জানুয়ারী আমি প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে যাওয়া আমাকে বগুড়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। দোয়া চেয়ে রাতের বৃষ্টির শব্দ একটি পোষ্ট দেয়। সেখানে আপনাদের ভালোবাসা এবং দোয়া পেয়ে আমি মুগ্ধ। আপনাদের দোয়াতেই আজ আমি ঘরে ফিরে আসলাম। আমি আপনাদের কাছে সত্যিই কৃতজ্ঞ।
-----------------------------------------------------------------------------
আমি ঢাকার ছেলে। আলবত্ আমি ঢাকার ছেলে। তাতে তো কোনো সন্দেহ নাই। আমার গ্রামের বাড়ি কোথায়? ঊাপ-চাচা কোথায় বড় হয়েছে তা দিয়ে আমার কি? আমার জন্ম ঢাকায়, আমি ঢাকায় বড় হয়েছি; এটাই হলো আসল। শুহুরে কংক্রিটের আর জানজটের শহর আমার ঢাকা! ধুলা-বালি, গাড়ির ধোয়ায় সয়ংসম্পূর্ণ আমার ঢাকার বাতাস। সেই বাতাস নিয়ে নিয়েই বড় হয়েছি। শত কিছু হোক। শত ঝামেলার শহর হোক তাতে কি!! ঢাকা শুধু আমার।
এই ঢাকা ছেড়ে বাইরে তেমন যাওয়া হয় না। ঘুরাঘুরির অভ্যাসটা খুব কম। তাও মাঝে মাঝে সুযোগ বুঝে কোপ যে মারি না তাও কিন্তু নয়। এখন পর্যন্ত আমি ঘুরে ফেলেছি, কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন, সিলেট, রাজশাহী আর?? আর আমার গ্রামের বাড়ি রামগঞ্জ; আমার নানুর বাড়ি ফেনী। এসব ছাড়া তেমন আর কোথাও যাইনি।
যাই হোক। আমি একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ভর্তি হওয়ার পর থেকে সব সিনিয়ার ভাই-আপুদের কাছ থেকে শুনতাম আমাদের ইউনিভার্সিটিতে একটাই ইউনিক কোর্স আছে সেটা হচ্ছে, এল.এফ.ই (লাইভ ফিল্ড এক্সপেরিয়েন্স)।
যে কোর্সটি করতে হয় ঢাকা থেকে অদূরে কোনো একটি গ্রামে। সেখানে থাকতে হয় দশদিন। কাজ করতে হয়, মানুষের সাথে কথা বলতে হয়। এই আর কি!
ঠিক তখন থেকেই কোর্সটি করে করবো....কবে সিনিয়র হবো.....এমন প্রতীক্ষায় ছিলাম। প্রতীক্ষার অবসান হলো। সময় হলো এল.এফ.ই করার। গ্রামের মানুষের সাথে কিছু সময় কাটানো। তাদের জীবন বোধ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা, তাদের সুবিধা অসুবিধা সম্পর্কে জানা। এই সব জানার একটা দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটল। ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট হয়ে এবার গত ৫ই জানুয়ারী আমার বগুড়া যাত্রা।
৫ই জানুয়ারী:
বগুড়ার টি.এম.এস.এস একটি এনজিওতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে আমরা বাসে যাবো। ভার্সিটির সামনে গেলাম সকাল ৮টায়। সব ঠিক-ঠাক করে বগুড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা। শরীরটা কয়েকদিন থেকেই ভালো যাচ্ছিল না। তারপরও সাথে ঔষধ-পত্র রেখেছে। ঠান্ডার একটা সমস্যাতো ছিলোই। যাইহোক। বাসে ভ্রমণের সময় খুব একটা সমস্যা হয়নি।
বেলা ২টায় পৌছালাম বগুড়ার ঠেঙ্গামারা গ্রামে টি.এম.এস.এস এনজিওর ৮০ একর বিরাট জায়গায়। অসাধারণ থাকার ব্যবস্থা প্রথমেই আমাদের মুগ্ধ করেছে (আমরা আবার শহুরে ছেলে তো! থাকার ব্যবস্থা নিয়ে একটু ভয় ছিল; সাথে ছিল টয়লেটের ব্যবস্থা নিয়েও)। আমরা প্রায় ৭০ জন ছাত্র-ছাত্রী খুব আনন্দ নিয়ে সেদিন রাত পর্যন্ত কাটালাম। আমার দশ-বারোজন বন্ধু-বান্ধব একটি গাছ তলায় বসে অনেকরাত পর্যন্ত আড্ডা দিলাম। উত্তর বঙ্গের কনকনে ঠান্ডা আমাদের কারো দমাতে পারেনি।
তারপর খাওয়া-দাওয়া শেষ করে রাত ১১টার দিকে গেলাম ঘুমাতে। ঠান্ডাটা কতটা ভয়াবহ অনুভব করলাম ঠিক তখন। নাক দিয়ে সমানে পানি পড়ছে। একসময়ে নাক বন্ধও হয়ে গেল। হঠাৎ রাত ২টার পর শুরু হলো শ্বাস কষ্ট। সারাদিনের পরিশ্রমে চোখে ছিলো প্রচন্ড ঘুম। কিন্তু শ্বাস কষ্টের কারণে ঘুমটা আর হলো না। একটা সময় শুয়ে থাকতেও কষ্ট হচ্ছিল। তারপর বাধ্য হয়ে উঠে বসলাম। আমার রুমে আমার বাকি তিন বন্ধু তখন নাক ডাকার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আর আমি ঘুমভরা চোখে শ্বাসকষ্ট বুকে নিয়ে চেয়ারে বসে কাটালাম। আস্তে আস্তে ভোর হলো। সকাল হওয়াটাও দেখলাম।
৬ই জানুয়ারী:
সকাল সাড়ে সাতটায় সবাই নাস্তার টেবিলে গেলাম। নাস্তা খেয়ে এবার গ্র“পে গ্র“পে গ্রামে যাওয়ার পালা (পাচ জন মিলে একটা গ্র“প হয়ে এবং প্রতি দুইটি গ্র“পকে একটি গ্রামে কাজ করতে পাঠানো হয় আবার সেই গ্রামকে দুই ভাগে ভাগ করে দুই গ্র“পকে দেয়া হয়)। আমাদের গ্রুপটি পেলো গোকুল নামে একটি গ্রাম। আমরা দুই গ্র“প মিলে টেম্পুতে করে সেই গ্রামে গেলাম। নামলাম ঠিক বেহুলার বাসরঘরের সামনে। যে জায়গাটি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে সেখানেই পড়লো আমার স্পট। তবে গ্রামটাকে যখন ভাগ করে দুটি গ্রপকে দেয়া হলো (একটি গ্রামকে উত্তর পাড়া এবং দক্ষিণ পাড়ায় ভাগ করা হয়) তখন তা পড়লো অন্য গ্র“পের এরিয়ার মধ্যে। মনটা তখনই খারাপ হয়ে গেলো। তারপর আমরা পাচজন মিলে দক্ষিণ পাড়ায় ঘুরা শুরু করলাম। আমাদের প্রথমদিনের কাজ ছিলো পুরো গ্রামটা একবার ঘুরা। তারপর গ্রাম ভাগ করে দেয়ার পর নিজ পাড়ায় আবার ঘুরে ঘুরে সেখানকার মানুষের সাথে কথা বলা। যেমন: কেমন আছেন? কি করছেন? আমরা এই গ্রামে একটা কাজে আসছি, আপনাদের সহযোগিতা দরকার ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর গ্রামের একজন মানুষকে দিয়ে মাটিতে পুরো গ্রামের একটি ম্যাপ আঁকা এবং পাড়ার একটা ম্যাপ আঁকানো। সেই মানুষটি আবার বৃদ্ধ হতে হলে ভালো। তিনি ম্যাপ আঁকবেন। তারপর সেই ম্যাপে আমরা বিভিন্ন জায়গাগুলোকে রঙের গুড়ো দিয়ে ইন্ডিকেট করা। আমরা ভাগ্য ভালো যে এমন একজন মানুষ পেলাম যার বয়স ৭২ বছর। তার আন্তরিকতা এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সামনে একটি গল্প বলার ইচ্ছা আছে।
যাই হোক। বেলা দুইটা পর্যন্ত আমরা কাজ করলাম। তারপর তাড়াহুড়া করে চলে আসলাম আমাদের থাকার জায়গায়। কারণ, ঐ যে মাটিতে ম্যাপ আঁকলাম! সেটার ছবি তুলে নিয়ে এসে বড় আর্ট পেপারে সেটার আঁকতে হবে নিজেদের এবং একটি প্রেসেন্টেশান দিতে হবে স্বন্ধ্যা ছয়টায়। সুতরাং সময় খুব কম। তাড়াহুড়া।
আমার শরীর খুব একটা ভালো কিন্তু সকাল থেকেই নয়। দুপুর থেকেই জ্বর জ্বর লাগছিল। আর শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। তবে কাজের চাপে ভুলে থেকেছিলাম। বিকেলে প্রেসেন্টশান রেডি করার সময় থেকে অবস্থাটার আরও অবনতি হচ্ছিল। তারপরও আমি দমিনি। কারণ কাজ থেকে আমি সরে গেলে আমার বন্ধুদের সমস্যা হয়ে যাবে। খুব ভালো মতই কাজ শেষ হলো। প্রেসেন্টেশান শুরু হলো। তখন আমার শ্বাস কষ্ট বাড়ছিল। কিন্তু চুপ করে বসে ছিলাম।
শেষ হলো রাত দশটায়। তারপর খাওয়াদাওয়া শেষে সিড়ি বেয়ে রুমে যাওয়ার সময় আমার শরীরের জোর আর পাচ্ছিলাম না। আমার শ্বাসের আওয়াজে আমার বন্ধুরা হকচকিয়ে গেলো। সবাই একটা দৌড়া দৌড়ি লাগিয়ে দিলো। স্যাররা তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছিল। আমি তখনও বাইরে দাড়িয়ে অনুভব করছি নিজের সাথে নিজের বিভৎসতা। আমার চোখে শুধু তখন লাল- কনিকা দেখতে পাচ্ছি। আমি বুঝতে পারছি আমার জীবন প্রদীপ হয়তো নিভে যাবে কিছুক্ষণ পরই। কারণ ঢাকা থেকে অদূরে হাসপাতালে আমাকে বাঁচাবার উপাদান আছে কিনা তা নিয়েই আমার সন্দেহ। আমি দাড়িয়ে আছি। এতো রাতে কোনো রিক্সা নেই। অন্ধকার রাস্তা ফাঁকা। হেটেই হাসপাতালে যাওয়া যায়। তবে আমার অবস্থা হাটার মতো নয়। হঠাৎ শুধু দেখলাম একটা টেম্পু থামলো। আমাকে ধরে আমার বন্ধুরা সেখানে উঠাচ্ছে। হাসপাতালের সামনে নামতেই আমার এক বন্ধু দৌড়ে ঢুকলো হাসপাতালে। আমি তখন পুরোই হাঁটার শক্তি হারালাম। তারপরও আস্তে আস্তে শুধু একটু বেঁচে থাকার চেষ্টায় আমি পা চালালাম। তারপর তেমন কিছুই নয়। অক্সিজেটের পাইপ ঢুকানো হলো নাকে। দশমিনিট অপেক্ষা। নাহ তাতেও আমার শ্বাসের তেজ কমছে না। ডাক্তার ভয়ে ভয়ে বলছে রোগীর অবস্থা ভালো না। আমি চোখ বন্ধ করে শুনছি, আমার স্যার বলছেন, ঠিক হবে তো?
ডাক্তার বলছে, নেবুলাইজার দাও। দেখো। হয়তো কাজে দিবে।
তাড়াতাড়ি দেয়া হলো নেবুলাইজার। আমার নাকে আবার বসানো হলো প্লাস্টিকে মাস্ক। সেখান দিয়ে নাকে নিয়ে ঢুকানো হচ্ছে গ্যাস। রোগীকে বাঁচানোর একটা আপ্রাণ চেষ্টা। আমি তখন শুধু ভাবছি, আমার মা’র কথা। আমি হাসপাতালে শুনলে এটা তিনি সহ্য করতে পারবেন না। আর মৃত্যু চিন্তা। আমি যদি মরে যাই! নিজের ভালো-খারাপ কাজের হিসেবই নিতে শুরু করলাম। সৃষ্টিকর্তার শাস্তির ভয়ে আমি ভাবছি অনেককিছু। তারপর ধীরে ধীরে একটি স্বাভাবিক হয়ে ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল বুকের উপর একটা ওজন মাত্র নেমে গেলো। আর বুকের মাঝখানে একটা ছিদ্র হয়ে আছে। এতো শান্তি এতো শান্তি মনে হয় আমি কখনও পাইনি। মহান আল্লাহ অন্তত শেষ মূহুর্তে হলেও তার কথা মনে করায় হয়তো এইবার আমাকে বাচিয়ে দিলেন।
৬ই জানুয়ারী একটি বিভৎস রাত। হয়তো সেদিন মৃত্যু হতে পারতো। মৃত্যুকে সেদিন কাছ থেকে অনুভব করেছি। জীবনের এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম। মানসিকভাবে কেমন লেগেছে তা বলাটা খুব কঠিন। তারপরও আমার বন্ধুদের দোয়া এবং তাদের উদ্যোগে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সেই সাথে আমার ব্লগের বন্ধুদের দোয়ায় আমি সুস্থ আছি মুটামুটি।
ডাক্তার আজকে রিলিজের সময় বলেছে, যদি আর দশমিনিট লেইট হতো একটা অঘটন ঘটে যেতো। আমি তখন বললাম, ডাক্তার সাহেব ঢাকার বাইরে এতো উন্নত এবং ভালো মানের একটি হাসপাতাল না থাকলে হয়তো আমার সাথে অঘটন হয়ে যেতো।
শেষ কথা: আজ ৮ জানুয়ারী। আমি এখন ঢাকায় খানিক সুস্থই বলা চলে। তারপরও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। জীবন-মৃত্যুর মাঝখান থেকে ফিরেও আমার সেই কোর্স এল.এফ.ই আর করা হলো না। আমার টিচাররা রিস্ক নিতে চাননা। তাই ফিরে আসলাম ঢাকা। ৬ই জানুয়ারী রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত ছিলাম হাসপাতালে।
ফিরে আসলাম আমার শহর ঢাকায়। আমার শহর ঢাকায়। অন্য শহরকে যাতে ভালোবাসতে না পারি তাই হয়তো ঢাকাই হয়তো সে ব্যবস্থা করে আমাকে পাঠালো বগুড়া। আর আমি ফিরে আসলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

