হ্যা। আমার সেই বন্ধু মা’ হারার বেদনায় সবসময় কাতর। তবে এই বৃষ্টি কিংবা হাসপাতালে না নিতে পারার ঘটনাটি তাকে যতটা না প্রচন্ড ভাবায় তার চেয়েও বেশী ভাবায় তার জন্ম তারিখ ঘটিত বিষয়টি।
তার জন্ম তারিখ জুনের ৬। এই "ছয়" নিয়েই তার যতো সমস্যা। শুধু যে ছয় নিয়েই তার সমস্যা তাও কিন্তু না। তার সমস্যাটা বৃষ্টি নিয়েও। বৃষ্টি হলেই যেনো সে বিমর্ষ হয়ে পড়ে। একদম বিমর্ষ। যেনো পাগল হয়ে যায়। পাগলের মতো প্রলাপ বকতে শুরু করে। ঐ বৃষ্টিকে সে বলে, আমার মায়ে কান্না। সবসময়ই বলে, আমার মায়ের কান্না দেখিনি। দেখলে হয়তো, বৃষ্টির মতোই হতো।
আশ্চর্য! যে বৃষ্টি মানুষের কবিত্বকে জাগিয়ে তুলতে পারে সে বৃষ্টিকেই তার বেদনাদায়ক মনে হয়।
এতো গেলো একটি গল্প। তারই অরেকটি গল্প হলো, তার প্রেমের গল্প। সে একবার এক মেয়ের প্রেমে পড়ে। এই মোবাইলের যুগে মেয়ে পটানো খুব কঠিন একটা কাজ না। আমরাও বন্ধু-বান্ধব মিলে ঐ মেয়ের সাথে তার প্রেম করিয়ে দেয়ার এক আপ্রাণ চেষ্টা চালাই। মোবাইল নম্বর জোগাড়ও করে দেই। কিন্তু শালার পাগলটা ফোন দিতেই ভয় পায়। যাইহোক, দীর্ঘদিন মোবাইল নম্বরটি পকেটে নিয়ে ঘুরবার পর কি মনে করে সে একদিন ফোন দিলো।
ব্যাস! কেল্লা ফতে! যা হয় আর কি! পূর্ণ উদ্যোমে চলল ফোনালাপ। দিন কি আর রাত কি! শুধু কথা আর কথা। কথা যেনো শেষ-ই হতে চায় না। হলে একই রুমের সব বন্ধুরা তাকে কিছু বলেও না। কারণ শান্ত-শিষ্ট ছেলে এখন প্রেমে পড়েছে। এই ছেলের প্রেমকে সাকসেস পর্যায়ে নিতে সকলেরই তো সহযোগিতা দরকার। তাই না!
এতো গেলো প্রেম শুরু হবার ঘটনা। প্রেম যখন শুরু হয়ে গেলো তখন বন্ধু আমার যেনো দেহে প্রাণ ফিরে পাইলো। প্রেমের সাগরে ভাসছে আমার বন্ধু। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখি বিমর্ষ হয়ে সে বসে রয়েছে টি.এস.সিতে। তাকে প্রশ্ন করলাম, কি রে দোস্ত। বৃষ্টিতো আজকে নাই। তা তুই এতো বিমর্ষ কেন?
আমার বন্ধুটি তখন সেই তার অহেতুক কুসংস্কার নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো। সেই তার ছয় নিয়ে সমস্যা। তারপর বলল, দোস্ত জানিস রুমির (আমার বন্ধু যেই মেয়েটির সাথে প্রেম করতো তার নাম ছিল রুমি।) জন্মদিন ফেব্রুয়ারী "ছয়"।
এই বুঝলাম ওর সমস্যার কারণ। আমারও গেলো মেজাজটা বিগড়ে। শালার এইটা একটা কথা হলো! বললাম, তো শালা তোর "ছয়" নম্বরের ভুতটা এখনও গেলো না। তোকে তো "ছয়" নম্বর জুতা দিয়ে পেটানো উচিত।
আমার বন্ধু বলল, দেখিস, তুই মজা করিস! তুই জানিস না। এই "ছয়" আমাকে নিঃসঙ্গ করেছে। এই "ছয়" নামক নম্বরটা আমার সব কিছু নিয়ে গেছে। এখন রুমিকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসি। ওকে ছাড়া কিছু আমি ভাবতেই পারি না। এবং এই ভালোবাসার পরিমাণ আমার দিন দিন বাড়ছেই। দেখিস, একদিন কোনো এক "ছয়" আমার রুমিকে নিয়ে যাবে আমার কাছ থেকে। দেখিস।
এই সব বলতে বলতেই সে কেঁদে দেয়। আমিও হতভম্ব। আরে বলে কি! আমিও বললাম, কি বলিস। এটা একটা কথা হলো।
সে তখনও কাঁদছে। তারপর বলল, দেখিস। আমার ভালোবাসা যেদিন পূর্ণ হবে ঠিক তখন হঠাৎ এই বৃষ্টির মতো আমার সব কিছু ঐ "ছয়" নিয়ে যাবে। "ছয়" আমার জীবনের ধ্বংস। আর কিছুই নয়। রুমিও "ছয়"। রুমি আমাকে ফাঁকা করে দিবে। রুমিও যে "ছয়"! আর সেই অজানা "ছয়"-এর কাছে পরাজিত হবে আমার সব কিছু। আমার সমস্ত স্মৃতি হারিয়ে যাবে অন্য একটি "ছয়" এর কাছে।
শান্তনা দেবার ভাষা আমার নাই। কিভাবে দিবো। এই "ছয়" সংক্রান্ত ভূত আমার তাড়াবার ক্ষমতা নাই। তাই চুপ করে ছিলাম। কিছুই বলি নাই। তারপরও মাঝে মাঝে ভাবি। আসলেই কি এসব মানুষের জীবনের কোনো প্রভাব ফেলে! কোনো সংখ্যা কিংবা কোনো বিশেষ কিছু জন্ম-মৃত্যুর কোনো প্রভাব কি ফেলতে পারে!
এবার আসি এই "ছয়" সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা সমস্যার কথায়। যে "ছয়" নিয়ে আমার বন্ধুর এতো সমস্যা। সেই বন্ধুর সাথে প্রায় এক বছর পর দেখা হলো। তাকে প্রশ্ন করলাম, কি রে খবর কি! "ছয়" নম্বর ভূত কি এখনও আছে।
আমার বন্ধুর মিষ্টি হাসি। একদম লাজুক হাসি। ভাবলাম, শালার মাথা থেকে ভূতটা মনে হয় গেছে। তারপর কথায় কথায় আর তার প্রেমিকার কথা জিজ্ঞেস করা হয় নি। সাবলিলভাবে আমরা আমাদের পূরণো স্মৃতিগুলোর গল্প করে অনেকগুলো সময় পার করেছি।
কিছুদিন আগে অন্য এক বন্ধুর সাথে ওর ব্যাপারে কথা হচ্ছিল। তখন তার কাছে শুনলাম, ঐ মেয়েটার সাথে তার কোনো যোগাযোগ নাই। মানে প্রেম ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ "ছয়" সংক্রান্ত ঝামেলা তার সাথে সূট করেনি।
সেদিনই ওর সাথে দেখা করি। প্রশ্ন করি, মেয়েটির সাথে কি হয়েছিল?
আবারও তার মিষ্টি হাসি। আসলে মিষ্টি হাসি বললেও ভূল হবে। বলতে হবে রহস্যময় হাসি। হাসতে হাসতে বলছে, বললে তো বিশ্বাস করবি না। লাইফ আমার ছক্কা দিয়ে ভরা। তোকে তো বলেই ছিলাম। এগুলো তো তুই কখনই মানতি না। তাই তোকে বলতেও চাই না। বললে, এই "ছয়" সংক্রান্ত ভয় হয়তো তোকেও পেয়ে বসবে।
ওর কথা শুনে আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তারপরও ওকে বলি, ব্যাপারটা ক্লিয়ার কর।
তারপর সে বলল, আমি যেমনটি বলেছিলাম। ঠিক তেমনই ঘটেছে।
ছয়। দোস্ত ছয়। এই ছয় আমাকে ছাড়ে না। এই ছয় আমাকে পৃথিবীতে এনেছে। এই ছয় আমার মাকে নিয়েছে। এই ছয় আমাকে ভালোবাসা দিয়েছে। আর এই ছয় আমার ভালোবাসা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ছিনিয়ে নিয়েছে বললে হয়তো ভুল হবে। ছয় মধুর অনুভূতি পেয়ে পূরণো ছয়কে ভুলে গেছে।
তারপর আমার বন্ধু কিছুক্ষণ থেমে থাকলো। আবার বলল, রুমি হঠাৎ কেনো জানি অন্য একটি ছেলের প্রেমে পড়ে যায়। কেনো পড়ে যায় তাও জানি না। কিভাবে কোথা থেকে কি হলো কিছুই আমার জানা নাই। শুধু সম্পর্ক হয়েছে এতুটুকুই জানি। পরে শুনলাম, ঐ ছেলের জন্মদিন নাকি, মে মাসের "ছয়" তারিখ। এবং যেদিন শুনলাম সেদিনটিও ছিল "ছয়" ।
তখন দোস্ত ছক্কা খেলাম।
গেলারিতে ছক্কার মাতম দেখে হয়তো বিধাতা হাসে। তবে এসব ছক্কা খেয়ে যে আমি হারিয়ে যাচ্ছি। আমি নিজের মৃত্যু সামনে থেকে দেখছি। তা হয়তো বিধাতা ভাবে না। এখন আমার ধারণা কি জানিস!! কোনো এক বৃষ্টি ভেজা দিনে আমি মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়বো। মৃত্যু আমাকে যেদিন হত্যা করবে সেই দিনটিও থাকবে কোনো এক মাসের "ছয়" তারিখ।
অবাক হওয়া ছাড়া আমার আর কিই বা বলার আছে। চুপ করে শুনলাম। মাঝে মাঝে সব কিছুকে কুসংস্কার ভেবে উড়িয়ে দেয়াটাও ঠিক না। এই যে দেখুন, আমি গল্পটি লিখছি আজকে ছয় তারিখ। আবার হঠাৎ বৃষ্টিও আসলো। তাহলে? ছয় সংক্রান্ত জটিলতা আসলেই কি সত্য কিছু!!! তাই তো গল্পটি ছয় সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মে, ২০০৯ ভোর ৫:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



