somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... শিক্ষকগো শাস্তি লইয়া কিছু কইতে চাই! আমার স্কুলের প্রিন্সিপাল স্যার তার কলিগ-দের কইত, বেত দিয়া পাছায় মারবা। যাতে বাসায় যাইয়া দেখাইতে না পারে।
বাংলায় "পাছা" অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লজ্জাকর বিষয়। লজ্জাকর জায়গায় মারলে বেয়াদব পোলাপান মনে মনে কানবো। অপমানে হিমশিম খাইবো। কিন্তু বাসায় কইতে পারবো না। পুলিশের কাছেও যাইতে পারবো না। যদি যায়, তাইলে পাছা প্রদর্শন হইবো বহুবার। যেমুন: বাসায় বাপ-মা কইবো, দেখি বাবা কই মারছে?
তারপর ধরেন গেলো স্কুলে। কইবো, আপনেরা আমার পোলারে মারছেন। স্যার কইবো, প্রমাণ কই? তখন আবার পাছা দেখাও। এরপর ব্যাপারটা যদি মিমাংশা হয় তাইলে তো হইল-ই। আর যদি না হয়, তা হইলে পুলিশের কাছে যাইয়া জিডি। পুলিশ পাছার একটা ছবি তুলবো। আর মিডিয়ায় জানাজানি হইলে তো, ক্যামেরা লইয়া টিভির পর্দায় ভাইসা উঠবো পাছা।
তাই বুঝেন কি অবস্থাটা দাঁড়াইবো?
১১ ধরনের শাস্তি নিষিদ্ধ কইরা কি লাভটা হইবো জানি না। আপনেগো নিম্নবর্ণিতভাবে শাস্তির নামগুলা কই।
‍"হাত-পা বা কোনো কিছু দিয়ে আঘাত বা বেত্রাঘাত, শিক্ষার্থীর দিকে চক বা ডাস্টারজাতীয় বস্তু ছুড়ে মারা, আছাড় দেওয়া ও চিমটি কাটা, কামড় দেওয়া, চুল টানা বা চুল কেটে দেওয়া, হাতের আঙুলের ফাঁকে পেনসিল চাপা দিয়ে মোচড় দেওয়া, ঘাড় ধাক্কা, কান টানা বা ওঠবস করানো, চেয়ার, টেবিল বা কোনো কিছুর নিচে মাথা দিয়ে দাঁড় করানো বা হাটু গেড়ে দাঁড় করে রাখা, রোদে দাঁড় করে বা শুইয়ে রাখা কিংবা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড় করানো এবং ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে এমন কোনো কাজ করানো, যা শ্রম আইনে নিষিদ্ধ।"
এইখানে এক অদ্ভুদ শাস্তি আছে। যা জীবনকালের এই মুহূর্ত পর্যন্ত শুনি নাই। তা হইল, কামড় দেয়া।
বাপরে বাপ। আমাগো স্যারেরা তাইলে মাঝে মইধ্যে কুত্তার কামটাও কইরা ফালায়। বড়ই লজ্জিত হইলাম এই জাতির অংশ হইয়া। যেই জাতির শিক্ষকেরা তার ছাত্ররে কামড় মারে।
এই শিক্ষানীতিতে বহু আইনের কাহিনী হইতাছে। ওমুক আইন, তমুক আইন। আমার একখান লেখা ছিল। যার শিরোনাম ছিল: শিক্ষানীতিতে শিক্ষকদের নীতির প্রসঙ্গ এসেছে কি?
শিক্ষকগো নীতির প্রসঙ্গ নিয়া বহু কথা চলে।
শিক্ষকগো কু-নজর বড় ভয়ানক। যার দিকে একবার কু-নজর দিয়া চাইবো সেই ছাত্রের খাতাতেও কু-নজর পড়বো। এই কু-নজর সামলানোর ব্যবস্থা কেমনে হইবো?
তবে কু-নজর ছাত্রের জন্য খারাপ। কিন্তু ছাত্রীর জন্য অইত্যন্ত ভালো। ছাত্রী যদি কু-নজরে মিষ্টি হাসে। তাইলে সেই হাসির প্রতিফলন পড়বো খাতার উপর। পরীক্ষার খাতাডা হাইসা উঠবো।
আমার লেখা কোন সমালোচনা না। কোন প্রশ্ন না। কোন উত্তরও না। একটু কনফিউশন মুলক লেখা। শিক্ষকগো নিয়া আমার অনেক ক্ষ্যাপা মনোভাব আছে। আমি এককালে ভাবতাম এনারা জাতির উন্নয়নের কারিগর। মানুষ তৈরী তাগো কাম। শুধু ক্লাসে পড়াইবো। আর চইলা যাইবো। এই বিষয়ে আমি বিশ্বাসী না। একজন ছাত্রের মনেও যদি কল্পনার রেখা টানতে ব্যর্থ হয় কোন শিক্ষক তাইলে বুঝতে হইবো শিক্ষকগো জীবনটাই বৃথা।
আজকে প্রথমআলোতে আনিসুল হক সাহেবের একটা লেখা ছাপছে। তিনি কইতে চাইছেন, মঙ্গলবারও হাসো। আনিসুল হকের লেখা পড়ার আগেই আমি প্রথমআলোর "শ্রেণীকক্ষে ১১ ধরনের শাস্তি দেওয়া যাবে না" নিউজটা পইড়া ফালাইছি। তাই মঙ্গলবার চা-য়ে চুমুক দিতে দিতেই হাইসা উঠলাম। আর কইলাম, আহারে আমার দেশ। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29369904 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29369904 2011-04-26 20:05:05
রণাঙ্গনের অন্যরকম যোদ্ধা
আহত যোদ্ধা। ছেলে যুদ্ধে গেছে কিংবা স্বামী গেছে যুদ্ধে। মনে শংকা। ভয়। হতাশা।নিয়মিত খাওয়া নাই। পানি নাই। আবার মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের মাঝেও দরকার এক টুকরো হাসি। ক্লান্ত যোদ্ধাদের ক্লান্তি দূর করা দরকার। বেতার বাংলা থেকে জাগরণীর গান চলছে। গান শুনে আর কতদিন? দরকার ভিন্ন স্বাদের কিছু। যা এনে দিবে নতুনত্ব কিছু। এমনই নতুনত্ব কিছু করতে গিয়ে বাংলার ইতিহাসে যোগ হলো যুদ্ধের নতুন এক ধারা। পাপেট শো এবং চরমপত্র।

বুকের মধ্যে মুক্তি থাকে

একদিন তারেক মাসুদ জোর করে একজন মানুষকে নিয়ে গেলেন তার এডিটিং ষ্টুডিওতে। সেখানে মুক্তির গান নামে একটি চলচ্চিত্রের কাজ চলছে। তারেক মাসুদ বললেন- তিনি যাতে এর কিছু দৃশ্য দেখেন। দেখলেন- একাত্তরের কৃষক-রাজাকার এবং ইয়াহিয়া। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পুতুল দিয়ে তৈরী হয়েছে এই চরিত্রগুলো। যেখানে কৃষক ইয়াহিয়াকে বলছে- ‘তোমার হস্তরেখায় মরণরেখা স্পষ্ট দেখা যাইতাছে।’ মুক্তিযোদ্ধা পুতুলটি বলছে, “বাংলার ঘরে ঘরে মুক্তিযোদ্ধারা জন্ম নেয়। তারা থাকেন বাঙালীর বুকের মধ্যে।”

এই দৃশ্যগুলো দেখেই কেদে দেন মানুষটি। জড়িয়ে ধরেন তারেক মাসুদকে। তার এই যুদ্ধের গল্প হারিয়ে গেছে ইতিহাস থেকে। ধুলোপড়া স্মৃতি থেকে তারেক মাসুদ বের করে আনলেন অন্যরকম একটি যুদ্ধের গল্প এবং একজন যোদ্ধাকে।
হ্যা। তিনি অত্যন্ত পরিচিত একজন মানুষ। তিনি আমাদের পরিচিতজন মুস্তফা মনোয়ার। পুতুল দিয়ে এক অদ্ভুত যুদ্ধ করেন তিনি। তার যুদ্ধের সময়টা হয় ২৫শে মার্চের আগে। ২৩ মার্চ তিনি যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি তখন পাকিস্তান টেলিভিশনের অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন। অনেক চালাকী ও সাহসের সাথে তিনি সেদিন থেকে টেলিভিশনের সমস্ত অনুষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করেন। তারপর যুদ্ধের সময়কার পুতুল নিয়ে যুদ্ধ।
তিনি যখন শরণার্থী শিবির ঘুরলেন তখণ তার চোখ অশ্রুতে ভিজে গেলো। তিনি অনুধাবন করলেন মানুষ যেন হাসতেই ভুলে গেছে। এই মানুষগুলোকে তো হাসানো দরকার। তিনি অবশ্য ষাটের দশকেই পাপেট শোর জন্য জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।
মুস্তফা মনোয়ারের হাতে ছিল পুতুল। তাই তিনি চাইলেন পাপেট শো করেই মানুষের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু পাপেট বানাতে তো অনেক কিছুর প্রয়োজন! তার তো কিছুই নেই। এরই মধ্যেই অনেকেই তার সঙ্গে যোগ দিলেন। তারেক আলী, সাইদুল আনাম টুটুলসহ আরও অনেকে। তারাও খুব উত্তেজিত। আঠা, কাঠের গুড়া, সুতা, কাপড়, লেইস, রডসহ পুতুল বানানোর সব সরঞ্জাম জোগাড় হলো। এরপর জামা বানানো দরকার। জামাও এক দর্জি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা শুনে সানন্দে বানিয়ে দিলেন। সে সময় সেই দর্জি বলছিল- সারা জীবন বলতে পারবো আমি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধার সহযোগিতা করেছিলাম।
পুতুল তৈরী হলো, জামা-কাপড় তৈরী হলো। এই নিয়ে বারাকপুরে চলে গেলেন তারা। সেখানে শরণার্থী শিবিরে হাজির হলো মুস্তফা মনোয়ার এবং তার দল। কালো পর্দা উঠে গেলো। শরণার্থী শিবিরের অতংক মাখা মুখগুলোতে তখন অবাক হওয়ার ছাপ। এর আগে তারা অস্ত্রের ডামাডোল দেখে অবাক হয়েছিল। এখন দেখছে অন্যরকম কিছু। এগুলোতো পুতুল!! এবং পুতুলগুলো তো কথাও বলছে!! এগুলো কি হচ্ছে!!!! রাজাকার এসে কৃষককে ভয় দেখালো। রাজাকারের পক্ষ নিয়ে খোদ ইয়াহিয়া চলে এলো। তাকে তাড়া করতে মুক্তিযোদ্ধা এলো। মুক্তিযোদ্ধাকে দেখে ইয়াহিয়া আর তার রাজাকার সঙ্গী ভয়ে জড়োসড়। শেষে সবাই মিলে ইয়াহিয়া আর রাজাকারকে ধরে পিটুনী। ঘোষক তখন বলে উঠত- ইয়াহিরে আর কে কে মারতে চায়? উপস্থিত জনতার চিৎকার আর হাসিতে মুখরিত হয়ে উঠত প্রান্তর। শুরু হলো হাসি, প্রাণ খুলে হাসি। চারিদিকে শুধু হাসির শব্দ। হতাশা-আতংক-আহত মুক্তিযোদ্ধা সকলের মুখে তখন হাসি।
মুস্তফা মনোয়ার তখন চোখ বন্ধ করতেন। বুক ভরে নিশ্বাস নিতেন। এই তো চেয়েছিলেন তিনি।
কখনও কখনও গভীর আবেগেও ভাসাতেন তিনি। যেমন-
রাজাকার: কইয়া দাও, মুক্তি কোথায়? ইয়াহিয়া: কিধার মুক্তি হায়? যে কৃষককে তারা এই প্রশ্ন করছিল। সেই কৃষক একটু এগিয়ে আসে। নিজের বুক চাপড়ে বলল, ‘এইখানে, এইখানে থাকে মুক্তি। বুকের মধ্যেই মুক্তি থাকে।’
এ যেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মুস্তফা মনোয়ারের একটি বার্তা। আজীবনের বার্তা। তোমার থাকবে আমাদের অন্তরে। সারাজীবন। চিরকাল। যতকাল বাংলাদেশ থাকবে। ততদিন মুক্তি থাকবে বাংলার প্রতিটি মানুষের বুকের মধ্যখানে।

বান্দার নাম এম আর মুকুল:

যুদ্ধের সময় যার কাছে একটি রেডিও ছিল সেই সেটি নিয়ে বসে থাকতেন। কারণ একটাই, চরমপত্র শুনবেন। চরমপত্র সারা মুক্তিযুদ্ধের মাসে ছিল জনপ্রিয় একটি অনুষ্ঠান।
অথচ চরমপত্র যেন একটি রূপকথার মতো হয়ে গেছে। সকলের মুখে বলতে শুনি- একাত্তরের চরমপত্র ছিল সাধারণ মানুষের আশার বর্তিকা। ৮-১০ মিনিটের টেপ নিয়মিতভাবে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের ট্রান্সমিটার থেকে প্রচারিত হয়েছে। চরমপত্রের জনপ্রিয়তার কারণ একটাই- যিনি পাঠ করতে তার কন্ঠস্বর। এই অনুষ্ঠানে যিনি পাঠ করেছেন তিনি তার স্বাভাবিক কন্ঠ ব্যবহার করেন নাই।
চরমপত্র প্রথম পাঠ হয় ২৫ মে ১৯৭১। সেদিন ছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী।


প্রথমদিনই বলে ওঠেন-
ঢাকা শহর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে ভয়ানক দুঃসংবাদ এসে পৌছেছে। গত ১৭ এবং ১৮ মে তারিখে খোদ ঢাকা শহরের ছ’জায়গায় হ্যান্ড গ্রেনেড ছোড়া হইছে।……….পাকিস্তানী হানাদার সৈন্যদের দখলকৃত ঢাকা নগরীতে মুক্তিফৌজদের এধরনের গেরিলা তৎপরতা সামরিক জান্তার কাছে নিঃসন্দেহে এক ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ বৈকি।
প্রথমদিন শেষ করেছিলেন এইভাবে-
না, না, তোমাকে ভয় দেখাবো না। একবার যখন হানাদারের ভূমিকায় বাংলাদেশের কাদায় পা ডুবিয়েছো- তখন এ পা আর তোমাদের তুলতে হবে না। গাজুরিয়া মাইর চেনো? সেই গাজুরিয়া মাইরের চোটে তোমাগো হগ্গলেরেই কিন্তুক এই ক্যাদার মাইধ্যে হুইত্যা থাকোন লাগবো।

রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যরকম প্রাণ দিতো এই চরমপত্র। যিনি পাঠ করতে তিনি খুব ব্যাঙ্গাত্বক স্বরে এবং রণাঙ্গনের সর্বশেষ খবর পৌছে দিতেন সকলের কাছে।
আজকে বাংলাদেশের ৪০তম বিজয় দিবস। অর্থাৎ বাংলাদেশের বয়স হয়েছে ৪০ বছর। ৪০ বছর আগে এই দিনে কি বলা হয়েছিল চরমপত্রে? চলুন দেখে নেই কিছু অংশ।
কি পোলারে বাঘে খাইল? শ্যাষ। আইজ থাইক্যা বঙ্গাল মুলুকে মছুয়াগো রাজত্ব শ্যাষ। ঠাস্ কইয়্যা একটা আওয়াজ হইল। কি হইলো? কি হইলো? ঢাকা ক্যান্টনম্যান্টে পিয়াজী সা’বে চেয়ার থনে চিত্তর হইয়া পইড়া গেছিল। আট হাজার আষ্টশ’ চুরাশি দিন আগে ১৯৪৭ সালে ১৪ই আগষ্ট তারিখে মুছলমান-মুছলমান ভাই-ভাই কইয়া, করাচী-লাহুর-পিন্ডির মছুয়া মহারাজরা বাঙ্গাল মুলুকে যে রাজত্ব কায়েম করছিল, আইজ তার খতম্ তারাবি হইয়া গেল। বাঙালী পোলাপান বিচ্চুরা দুইশ পয়ষট্টি দিন ধইর্যাে বাঙাল মুলুকের ক্যাদো আর প্যাকের মাইদ্দে world-এর Best পাইটিং ফোর্সগো পাইয়া, আরে বাড়িরে বাড়ি। ভোমা ভোমা সাইজের মছুয়াগুলা ঘঁৎ ঘঁৎ কইরা দম ফ্যালাইলো। “ইরাবতীতে জনম যার ইছামতীতে মরণ”। আতকা আমাগো চক বাজারের ছক্কু মিয়া ফাল্ পাইড়্যা উডলো, ‘ভাইসা’ব’, আমাগো চক বাজারের চৌ-রাস্তার মাইদ্দে পাথর দিয়া একটা সাইনবোর্ড বানামু। হেইডার মাইদ্দে কাউলারে দিয়া লেখাইয়া লমু, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গাল মুলুকে মছুয়া নামে এক কিছিমের মাল আছিল। হেগো চোটপাট বাইড়া যাওনের গতিকে হাজারে হাজারে বাঙালী বিচ্চু হেগো চুটিয়া-মানে কিনা পিপড়ার মতো ডইল্যা শেষ করছিল। এই কিছিমের গেনজামরেই কেতাবের মাইদ্দে লিইখ্যা থুইছে ‘পিপিলিকার পাখা উঠে মরিবার তরে।’ টিক্কা-মালেক্যা গেল তল, পিয়াজ বলে কত জল?

এইভাবে পাঠ করে চলতেন অসাধরণভাবে। মানুষ তখন হাসতো। বলা হয় যুদ্ধের পর দুজন মানুষ বিখ্যাত ছিল। এক ছিলেন বঙ্গবন্ধু আর দ্বিতীয় জন হলেন, এই চরমপত্র পাঠকারী।
মজার বিষয় হলো- ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরই তিনি তার পরিচয় প্রকাশ করেন। সেটাও রস্বাত্বক করে করে।
এলায় কেমন বুঝতাছেন? বিচ্চুগো বাড়ির চোটে হেই পাকিস্তান কেমতে কইর্যার ফাকিস্তান হইয়া গেল? হেইর লাইগ্যা কইছিলাম, কি পোলারে বাঘে খাইল? শ্যাষে। আইজ থাইক্যা বঙ্গাল মুলুকে মছুয়াগো রাজত্ব শ্যাষ। আইজ ১৬ ডিসেম্বর। চরমপত্রের শ্যাষের দিন আপনাগো বান্দার নামটা কইয়া যাই। বান্দার নাম এম আর আখতার মুকুল।

সত্যি কথা বলতে কি, আজ পর্যন্ত রেডিও কিংবা টেলিভিশনে এমন জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়নি। প্রতিদিন গল্পের ছলে দুরূহ রাজনীতি ও রণনীতির ব্যাখ্যা করা ছাড়াও রণাঙ্গনের সর্বশেষ খবরাখবর অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে উপস্থাপন করতেন। এই অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করেছিলেন। তাই ভাষায় ছিল ঢাকাইয়া তথা বাঙ্গাল ভাষার ব্যবহার। এছাড়াও যথেচ্ছভাবে ব্যবহার হয়েছে বিভিন্ন আঞ্চলিকভাষা।

ইতিহাসে এই দুই যোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয়? এম আর আখতার মুকুল তো চলেই গেছেন পৃথিবী ছেড়ে। কিন্তু রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মুখে হাসি ফোটানো কাজে নিয়োজিত এই যোদ্ধাদের ভুলবে এ জাতি। কেউ না কেউ তো মশাল নিয়ে দৌড়াবে। যেই আলোতে দেখা যাবে মুস্তফা মনোয়ার এবং এম আর আখতার মুকুলকে। মুস্তফা মুনোয়ারের সেই পুতুল চরিত্রের মতো আমরা বলব- মুক্তি আমার বুকের মধ্যে। বাংলার ভিন্নরমক এই যোদ্ধাদের প্রতি আমার সালাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29290774 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29290774 2010-12-16 14:31:41
গল্প: ভাঙনের শব্দ শুনি উৎসর্গ: হুট করে আমার লিখা কিছু লাইন তুলে দিয়ে আমাকে মেইল করেন একজন মানুষ। তার পর বিষয়বস্তু “নারী” নিয়ে গল্পের মতো করে কিছু লাইনও লিখে দিলেন। বলল- এই লাইনগুলো দিয়ে সুন্দর একটা গল্প হতে পারে। আমার তোমার লেখায় বিশ্বাস আছে। শুরুটা আমি করে দিলাম। বাকিটা তোমার মত করেই লিখো। সেই মানুষটাকে উৎসর্গ না করে পারলাম না। মানুষটির নাম হলো- ফাতেমা আবেদীন নাজলা।

ঝড় নেমেছে। আমার জানালার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া আম গাছটাকে রাতের ভুত মনে হচ্ছে। তার তীব্র বেগে নড়াচাড়ার আওয়াজ আর সাথে তার পাতার গন্ধ আমার নাকে এসে লাগে। এ তো সবুজের গন্ধ। আশেপাশে দালানের চাপে মাটির গন্ধটা আটকে আছে। আর জানালার গ্রীলের পাশে আটকে আছি রাত জাগা আমি। ছাড়ছি দীর্ঘশ্বাস। আর তা মিশে যাচ্ছে ঝড়ো বাতাসের সাথে। আমি বসে থাকি একা। একদম একা। রাত বাড়ে। রাত গভীর থেকে গভীর হয়। অন্ধকার গাড় হয়। ঝুম ঝুম বৃষ্টির আওয়াজ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আমার মনের ভেতর জমে থাকা হাজারো মেঘের সারিগুলো উন্মাদ হয়ে উঠে। আমার মাথা কাজ করছে না। একটা প্রজেক্ট প্যাপার তৈরি করার কথা। আর আমি তৈরি করছি বৃষ্টির শব্দের গান। কেউ বলে ঝুম ঝুম বৃষ্টি হয় আবার কেউ বলে রিমঝিম। আমার ধারণা বৃষ্টি তাল লয় মেনে ঝরে। গিটারের টিউনিং এর মত কেউ উপরে বসে বৃষ্টি টিউন করছে। যিনি করছেন তিনি পুরুষ না হয়ে যান না। কারণ মাঝে মাঝে যখন ঝড় হয় ব্যান্ডের ড্রামের বিটের মত কড়কড় করে বাজ পড়ে। ওটা কোনো মেয়ের পক্ষে করা সম্ভব না। মেয়েরা আমার কাছে খুব স্নিগ্ধ একটা অবয়ব নিয়ে আসে। ওদের কোনো নিষ্ঠুরতা নেই। মিথ্যা নেই। শুধুই দেবীতুল্য। তাই যখন পত্রিকার পাতা খুলে আমি কোনো হত্যাকারী মায়ের ছবি দেখি , মহিলা ক্যাডার এর ছবি, বা ইডেনের মেয়েদের চুলোচুলির ছবি দেখি আমি চোখ বন্ধ করে পাতা উল্টাই।ওগুলো নেহায়েত মিথ্যা আর বানানো গল্প। ছবি গুলো ফটোশপ দিয়ে করা।
জানালা দিয়ে পানি আসছে , বন্ধ করা দরকার । ইশ এমন কেউ যদি থাক্ত যে আমার এই ছোট খাটো কাজ গুলো করে দিবে। কলম পড়ে গেলে উঠিয়ে দিবে। শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিবে।চুলায় ডিম ভাজি পুড়ে যাবার আগে নামিয়ে নিবে।
জানালা বন্ধ করতে করতেই তার অস্তিত্ব টের পেলাম। আমি তার চুলের ঘ্রাণ পেলাম। নাহ। কারও চুলের ঘ্রাণ আমার পাওয়ার কথা না। একসময় মায়ের চুলের ঘ্রাণ পেতাম। তখন খুব একটা পাত্তা দিতাম না। অনেককেই বলতে শুনতাম- মায়ের গন্ধ, মায়ের আচল। এই ব্যপারগুলার কোন মানে আমি বুঝতাম না। মা-তো মা।তার আবার গন্ধের কি বিষয় আছে!! হয়ত বুঝতে চাইতাম না বলে সৃষ্টিকর্তা আমাকে ভালো মতই বুঝিয়ে দিয়েছেন। মা’র পায়ের শব্দটাও যে কি বিশাল একটা ব্যাপার। তা এখন আমার চাইতে ভালো আর কেউ বলতে পারবে না। আমার মা অবশ্য বলত- বুঝবি বুঝবি, যেদিন থাকবো না সেদিন বুঝবি।আমি তো ভাবতাম, আরে মা আমাকে ছেড়ে কই যাবে? আমাকে ছেড়ে মা কি থাকতে পারবে? ধুর।এও কি সম্ভব?
হ্যা। সম্ভব। এখন বুঝি সম্ভব। এই পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। আমার এই নিরব নিঃসঙ্গ জীবনটার দিকে তাকালে মনে হয় জীবন একটা রাক্ষস। সর্বক্ষণ হা করে আছে আমাকে খাওয়ার জন্য। হয়তো ধীরে ধীরে তার ভেতর নিয়েই যাচ্ছে। তার ধারালো দাতের আঘাতে হয়ত ছিন্ন-ভিন্ন হচ্ছি। কিন্তু টের পাচ্ছি না।
যাইহোক। কথা হচ্ছিল নারী নিয়ে। আমার জীবনেও কিন্তু নারী ছিল। আরে, আপনারা আবার অন্য কিছু ভেবে বসবেন না। আমার মা ছিল। আমার বোন ছিল। এরাও তো নারীর মধ্যেই পড়ে। তাই না? তাহলে অন্য নারীর কি দরকার? পত্রিকায় যখন দেখি হত্যাকারী মায়ের ছবি। তখন কি যে অনুভব হয় তা আপনাদের বলে বোঝাতে পারবো না। আরে এ কি? মা হত্যা করবে তার সন্তানকে? এও কি সম্ভব। আমি তো জানতাম পিতা সন্তানকে হত্যা করতে পারে। মাতাল পিতা- হাতাশাগ্রস্থ পিতা সন্তান মেরে ফেলার ঘটনা শুনেছি অনেক। কিন্তু নিজ গর্ভে ধারণ করা সন্তানকে সুস্থ মস্তিষ্কে কিভাবে একজন মা মেরে ফেলতে পারেন? আরও আছে না? স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের পর অভিমানে অত্যাচারে মা তার দুই সন্তানকে নিয়ে বিষ খেয়ে মরে গেছে। এটা কোন মা করতে পারে? এতোদিন জানতাম পৃথিবীর সমস্ত মন্দ থেকে মা তার সন্তানকে দুরে রাখার চেষ্টা করে। সিকিউরিটি দেয় মা। এতোদিন তো জানতাম, মা একমাত্র সন্তানের জন্য সমস্ত কষ্ট বুকে নিয়ে বেড়াবে কিন্তু মুখ ফুটে একটা কথাও বলবে না। আর এখন দেখি উল্টো। সব হিসেব-নিকেশ যেনো মিছে হয়ে গেলো। পৃথিবীর মানুষ যে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে উঠছে তার প্রমাণ হয়তো এগুলোই।
২.
তারপরও ঐ যে বললাম। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হয় আমার পাশে একজন থাকবে। যার সাথে এই বৃষ্টির মাঝে আমি গল্প করে যেতাম। যাকে আমি কবিতা পড়ে শোনাতাম। আমার কবিতা পড়া দেখে মুগ্ধ হয়ে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। এমনই একজন। সর্বক্ষণ। আমার পাশে। অভিমান করতো। চোখের জলে ভেজে একাকার হতো। আমি চোখের জল মুছে দিতাম। আমি তাকে হাসাতাম। পৃথিবীর সর্বসুখ আমি তার হাতের মুঠোয় এনে দিতাম। এমন অনুভূতি আমার যে দরকার। বন্ধুরা মাঝে মাঝে বলে, বিয়ে করে ফেল। কিন্তু আপনারাই বলেন, যে মানুষটা সম্পর্কের মর্ম বোঝা ভুলে গেছে সে মানুষটার কি বিয়ে করা সম্ভব? সত্যিই বলছি কিন্তু। আমি সম্পর্কের মর্ম বোঝা ভুলে গেছি। পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্কের প্রতি আমার একটা অবিশ্বাস দাড়িয়ে গেছে। মনে হয় এই সম্পর্ক শুধু একটা নাটক মাত্র। এই নাটকে সর্বক্ষণ চলছে অভিনয়। অভিনয় দিয়ে মাতিয়ে রাখছি নিজের আত্বাকে। অনেকটা শিশুর মতো। শিশুকে যেমন আমরা খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাখি। ঠিক সেরকম সম্পর্কটাও সেই খেলনার মতো। আমাদের হাতে সম্পর্ক নামক একটা খেলনা আমাদের সৃষ্টিকর্তা দিয়ে দিয়েছেন। আমরা সেটাকে নিয়ে খেলি। সারাক্ষণ খেলে যাই। খেলতে খেলতে আমরা এই খেলাতে অভ্যস্থ হয়ে যাই। এই অভ্যস্থ হওয়াটাকে অনেকে বলে পরিণতি। অনেকে আবার আপনারা ট্র্যাজেডিও বলতে পারেন। তো, আপনারা তো বুঝতে পারছেন আমি সম্পর্কটাকে কিভাবে দেখি? এধরনের ধ্যান-ধারণার একটা ছেলের কি উচিত বিয়ে করা?
আর তাছাড়া বিয়েটার প্রতিও আমার একটা অসম্মান চলে এসেছে। বিয়ে করে কি হবে? বছরের পর বছর একটা মানুষের সাথে শুধু মানিয়ে চলতে হবে। সংসার টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে হবে। আমার সুখ-শান্তি ভুলে গিয়ে আমাকে টিকিয়ে রাখতে হবে সংসার। ব্যপারটা অনেকটা এরকম না? এখন ধরুন আমি চাইলাম সব অশান্তি সহ্য করেও সংসার করতে; কিন্তু আমার সঙ্গী চাচ্ছে না সহ্য করতে। সে নিস্তার চায়। তখন? তখন কি করা যাবে? জীবনসঙ্গী এসে যদি বলে, আমাকে মুক্তি দাও। তখন কি হবে? কিংবা বলতে পারেন তখন কি করা উচিত?
ভাবছেন এমনটা সমাজে হয় কিনা? হয়। অবশ্যই হয়। বিশ্বাস করুন। এমনটাই হচ্ছে। আপনাদের একটা গল্প বলি আসেন। একটা মেয়ে পড়াশুনার শেষ প্রান্তে। ঠিক সেই মুহূর্তে সে প্রেমে পড়লো একটি ছেলের। ধরে নেই মেয়েটির নাম ঐশি। আর ছেলেটির নাম মুনির।
ঐশি-মুনিরের প্রেমের চাকা ঘোরা শুরু করেছে ট্রেনের চেয়েও দ্রুতবেগে। ঐশি ভেবে নিয়েছে মুনিরকে তার পরিবার মেনে নেবে। কারণ, মুনির তো শিক্ষিত। ভালো বেতনের চাকরী করে। সুতরাং মেনে না নেয়ার তো কোন কারণ নেই। তাই সে চুটিয়ে প্রেম করে যাচ্ছে। তাদের প্রেমের কথাটা সে প্রথম তার মা’কে বলে। মাও চিন্তা করলো, মেয়ে বড় হয়েছে। তারটা সে ভালো মতই বুঝতে শিখেছে। সুতরাং মেয়ের পছন্দটাই মায়ের পছন্দ। কিন্তু বিপত্তিটা বাধে বাবার অমতের পর।
বাবা বলে, ছেলে গ্রামে বড় হয়েছে। এই ছেলে ভালো হবে না। ছেলে ভালো চাকরী করে এটাই বড় না। স্ট্যাটাসটাও বড় বিষয়। ও একটা অশিক্ষিত পরিবারের ছেলে। সেই ছেলের মাথা যে কোন সময় বিগড়ে যেতে পারে। আজ তার আমার মেয়েকে ভালো লেগেছে। কাল সে যখন আরও উপরে উঠবে তার তখন অন্য মেয়েকে ভালো লাগা অস্বাভাবিক কিছু না।
পুরো বাড়িটা তখন নিরবতায় ছেয়ে গেলো। মা-মেয়ে শুধু কাঁদে। ছোট ভাই দেখে। দেখেই যায়। মা অনেক চেষ্টা করে বাবাকে বোঝানোর কিন্তু কোন মতেই বাবা রাজি হয় না। তিনি অটল। মেয়েকে তিনি কোন অশিক্ষিত পরিবারের হাতে তুলে দিতে পারেন না।
একদিন মা রাগে বলেই ফেললেন- তোমার পরিবারও একটা অশিক্ষিত পরিবার ছিল। তাই বলে কি আমি তোমাকে বিয়ে করিনি? তোমার শিক্ষার দিকে তাকিয়েই তো আমি তোমাকে বিয়ে করেছিলাম। আজকে আমার মেয়ে ঠিক একই জায়গায় দাড়িয়ে আছে যেখানে আমি ছিলাম ৩০ বছর আগে। তাহলে কেন ওকে তুমি সাপোর্ট করতে পারছো না?
স্ত্রীর মুখে নিজের পরিবারকে অশিক্ষিত বলতে শুনে কষ্টে চোখ দিয়ে পানিই বের হয়ে গিয়েছিল সেদিন মেয়েটির বাবার।অনেক অভিমান নিয়ে; বুকে অপমান নিয়ে স্ত্রীর সেই কটু কথাটির জবাব তিনি দিলেন মেয়ের সাথে ঐ ছেলেটির বিয়ে দিয়ে। সবাই খুব খশী। মেয়েটিও মানে ঐশিও খুব খুশী। ঐশির মা, ছোট ভাই সবাই খুব খুশী। মেয়েটি সুখে শান্তিতে থাকতে শুরু করলো। একদিন ঐশির মা মেয়েটির জন্য ঘরের সব আসবাবপত্র কিনে পাঠিয়ে দিলেন। ছোটভাইটি নিজ হাতে সব কিছু নিয়ে গেলো। বোনের পুরো ঘরটি নিজ হাতে ঝাড়ু দিয়ে একটা-একটা করে আসবাবপত্রগুলো সেট করে দিলো। বোনতো সেদিন কি খুশী। ভাই তার নিজ হাতে ঘর গুছিয়ে দিচ্ছে। ভালোই চলছিল সব। মেয়ে আসে বাবার বাসায়। সব কিছুই ঠিক ছিল। কিন্তু বাবা কথা বলতো না মেয়ের সাথে। অনেক অভিমান নিয়ে বাবা চুপ করে থাকতেন। এমনকি মেয়ের জামাইয়ের সাথেও তিনি কথা বলেন না।এইতো।বাকি সব ঠিক ছিল। হ্যাপি ফ্যামিলী যাকে বলে।
হঠাৎ একদিন ঐশী তার সব কাপড়-চোপড় নিয়ে চলে আসলো বাবার বাসায়। মা আর ভাই মুচকি মুচকি হাসে। শুরু হলো মান-অভিমানের পালা। মা একটু ভান করে রাগ দেখিয়ে বলল- এই মেয়ে, রাগ করে বাপের বাসায় আসা…..এগুলা আবার কি? যাহ্ স্বামীর ঘরে যা। খবরদার এখানে কোন ঢং করবি না। কিন্তু মেয়ে তো কিছুই বলে না। সপ্তাহ পার হয়ে যায়। ঘটনা কি? জামাই তো আসে না বউকে নিতে। মায়ের মনে একটু খটকা লাগলো।
মা সাহস করে লজ্জা নিয়েই জামাইকে ফোন দিয়ে বলল- বাবা কি হয়েছে তোমাদের? ঐশী এখানে থাকছে। সারাক্ষণ কাদে। কিছু বলেও না।
জামাই তখন হুংকার দিয়ে উঠল। বলল- আপনি কেমন মা? এক সপ্তাহ পরে এসে আমাকে প্রশ্ন করছেন এই বিষয়ে।
জামাইয়ের এই কথা শুনে টলটল করে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল মায়ের। কি বলে? আমার এতো ভালো জামাই আমাকে এইটা কি বলল?
- বাবা তুমি কি বলছ এগুলা?
মেয়ের জামাই আবার হুংকার দিয়ে উঠে। বলে, হ্যা। ঠিকই তো বলেছি। আপনার মেয়ে আমার ঘর থেকে চলে গেছে। সে আমাকে সন্দেহ করে। কোনক্রমেই আপনার মেয়ের সাথে আমি সংসার করবো না।
মা- তো আরও ভড়কে যায়। লাইন কেটে মেয়েকে ধরে কাদে। মেয়েও তখন ভড়কে গিয়ে ছোট ভাইকে ধরে। ছোট ভাই তেমন কিছুই জানে না। সাথে সাথে বোনকে নিয়ে চলে যায় দুলাইভাইয়ের বাসায়। সেদিনই হোচট খেলো ছোট ভাই। যে দুলাভাই তাকে এতো আদর করতো। সব সময় খোজ খবর নিতো। সেই দুলাভাইয়ে এক অন্যরকম চেহারা দেখল সে। অবাক- বিস্ময় হয়ে সে শুধু সেদিন পছন্দের দুলাভাইয়ের গালি খেলো। চিৎকার চেচামেচিতে সে অনেকটা খেই হারিয়ে ফেলছিল। ঠিক কি হচ্ছে। কেন হচ্ছে। বার বার দুলাভাই বলছে, তোর বোনকে নিয়ে যা এখান থেকে। আমি তার সাথে থাকবো না। গো টু হেল উইথ ইউর সিস্টার।
ছোটভাই চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বের হয়ে আসলো। কি করবে সে? বোনকে রেখে নিজ ঘরে ফিরল। দুশ্চিন্তায় মা বারান্দার গ্রিল ধরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। ছেলে ঘরে ঢুকে বলল- মা, আমাদের খারাপ সময় মনে হয় শুরু হলো।
মা যেন আরও দুশ্চিন্তায় মগ্ন। জামাইকে ফোন দেয়। সে কোন ভাবেই মেয়েকে রাখবে না। অবশেষে বাধ্য হয়ে ছেলের মাকে ফোন দিয়ে সব ঘটনা খুলে বলে ঐশির মা। কিন্তু “সন্দেহ করে, সন্দেহ করে” বলে জামাইয়ের মুখের চিৎকার কোন ভাবেই তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না।
মামুনের বাবা-মা গ্রাম থেকে আসলেন। পারিবারিক বৈঠক বসল। কিন্তু মামুন তার পরিবারকে জব্দ করে ফেলল। কারণ পুরো পরিবার মামুনের উপর নির্ভর। মামুন যা বলবে তাই তাদের শুনতে হবে। তারাও একটা নোংরা রাজনীতির অংশ হয়ে ঐশিকে বের করে দিলো ঘর থেকে। তখনও ব্যপারটা কেউ জানে না। আসলে ঠিক কি হচ্ছে? সন্দেহ করে বলে, একটা সংসার টিকানো যাবে না। ঐশি তখনও মুখ খুলছে না। কিন্তু তারপরও একদম নিরাশ হয়নি ঐশি। সে তার কিছু কাপড় নিয়ে বের হয়ে আসলো। তারপর ভাবলো ভালোবাসা দিয়ে নিজের স্বামীর ক্ষোভে ভরা মন সে আবার জয় করবে। কিন্তু না। এমনটা হলো না। একমাস যায়-দুই মাস যায়। কোন ভাবেই স্বামীকে সে ভালোবাসার চাদরে জড়াতে পারে না। উল্টো একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ঐশি দেখলো- ডিভোর্স নোটিশ।
এরপর মুখ খুলল ঐশি।
ঐশি যা বলল:
আমার সাথে সম্পর্কের আগে ওর আরেকটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল। মেয়েটার বিয়ে হয়ে যায়। তারপর আমার সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে মামুনের। আমরা খুব ভালোই ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ আমি দেখলাম মামুনের মোবাইলে একটি মেয়ের ছবি। আমার তখন একটু খটকা লাগলো। এইটা কার ছবি? আমি মামুনকে প্রশ্ন করি। সে বলে- এটা বন্ধুর বউয়ের ছবি। ও নিয়েছিল। তখন মনে ছবি তুলেছে।
পরে বিয়ের ঠিক দুইদিন আগে আমি বৃষ্টির ম্যাসেজ দেখি। তখন তো আমার মাথায় হাত। আমি তাড়াতাড়ি এই বিষয়টি নিয়ে মামুনের সাথে সরাসরি কথা বলি। আমি বলি- তুমি যদি ওর কাছেই ফিরে যেতে চাও তাহলে প্লিজ আমাকে বলে দাও। এখনও সময় আছে।
মামুন তখন বলে- ওর তো বিয়ে হয়ে গেছে। ও আমাকে মাঝে মাঝে ম্যাসেজ পাঠায়। এখানে তো রাগের কিছু্ নেই। এতোদিনের সম্পর্ক ছিল। একটু টান থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। আর এখন বিয়ের দুইদিন আগে তুমি এতো মাথা গরম করো না। আমি তোমার মাথা ছুয়ে বলছি আমি আর ওর সাথে কোন যোগাযোগ করবো না।
আমি মামুনকে বিয়ে করি ঠিকই। কিন্তু সেদিন আমি বিশ্বাস নামক শব্দটা হারিয়ে ফেলি।আমার ভেতর আমি একটা ইনসিকিউরিটি অনুভব করতে শুরু করি। তাই প্রায়ই আমি তার মোবাইল চেক করতাম। কোথায় যায়- কি করে সেই খোজ নিতাম। আমি জানি এটা অন্যায়। এভাবে সন্দেহ করাটা ঠিক না। কিন্তু তারপরও কিছু করার নাই। আমাকে খেয়াল রাখতে হবে। এগুলা নিয়ে আমাদের প্রায়ই ঝগড়া হয়। সবচাইতে আশ্চর্য হই, একদিন ও মোবাইলের মিগ চ্যাটিং বক্স ওপেন করে টয়লেটে যায়। আমি সাথে সাথে মোবাইলটা হাতে নেই। দেখি, ছি! বলতেও লজ্জা হয়। মেয়েদের সাথে কি সব খারাপ খারাপ ব্যপারে কথা বলছে। নোংরা নোংরা ভাবে মেয়েদের শরীর নিয়ে কথা বলছে। আমি সেদিন সমস্ত বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি। বুঝতে পারলাম এটা ওর একটা রোগ। ভাবলাম ডাক্তার দেখাবো। কিন্তু তার আগে আমার ওকে বোঝাতে হবে যে আমি ওকে আর সন্দেহ করি না। আমি সেই চেষ্টাই করতে থাকলাম। ওর মোবাইল ফোন চেক করা বন্ধ করলাম। ও কখন কোথায় কি করে সেই বিষয়েও খোজ খবর নেয়া বন্ধ করলাম। কিন্তু হলো উল্টো। ও প্রতিদিন রাত ১টা-২টায় ঘরে ঢোকে। আর মদ খেয়ে আসে। আমার কাছে লুকানোর জন্য চুপচাপ শুয়ে পড়ে। আমি একদিন এই মদ খাওয়া নিয়ে ধরলাম। বাধ্য হয়েই ধরলাম। সেদিন ও আমাকে যা-তা বলে গালাগাল করল। পরে আমি হুমকি দিলাম। তুমি যদি আর মদ খেয়ে আসো তাহলে কিন্তু আমি তোমার মা-বাবাকে সব কিছু বলে এই ঘর থেকে চলে যাবো। এরপর থেকে দেখলাম, না ভালো হয়ে গেছে। মদ খায় না। সময় মতো বাসাতেও আসে। এরপর একদিন এমনেই আমি মোবাইলটা হাতে নেই। সেদিন আমি পুরই ভেঙে পড়লাম। দেখি পুরো মোবাইল ভরা বৃষ্টির ম্যাসেজ। আমি সাথে সাথেই কাদতে কাদতে বৃষ্টিকে ফোন দিলাম। বৃষ্টি উল্টো আমাকে গালি দিয়ে বলল- তোর জামাই আমার কাছে আসলে আমি কি করবো। পারলে তোর জামাইকে ঠেকা।
সেদিন আমি মামুনের সাথে এই বিষয়টা নিয়ে বসি। এবং বলি, তুমি যদি এগুলা কন্টিনিউ করো তাহলে আমি তোমার সংসার করবো না। চলে যাবো।
মামুন কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বের হয়ে গেলো। আমি অনেক চাচ্ছিলাম মামুন আমাকে একবার সরি বলুক। আমাকে বাধা দিক। কিন্তু দেখি ও ঘর থেকে বের হয়ে চলেই গেছে আর ফিরছে না। আমি তখন মামুনকে ফোন দেই। বলি, কি ব্যপার? কি বললাম তোমাকে? মামুন বলল- যা বলেছ শুনেছি। বলেছ যেহেতু সেহেতু বসে আছ কেন? গো টু হেল।
ঠিক তখনই আমি কাদতে কাদতে বের হয়ে আসি। আমি তোমাদের বলি নাই এগুলা। কারণ, মামুনকে তোমরা এতো পছন্দ করো। ওর এই ভালো মানুষী চেহারার পেছনে যে একটা নোংরা জানোয়ার আছে সেইটা আমি উন্মোচন করতে চাই নাই। কিন্তু আজকে এখন আমি আর কি করবো।
আমি তো তারপরও ওর সংসার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওর পরিবার শুদ্ধ ওকে বাচানোর জন্য আমার সাথে নোংরা রাজনীতি করল। সব দোষ তারা এখন আমার ঘাড়ে দিচ্ছে। এটা কেমন বিচার। ওর মা, ওর বোনও তো একটা মেয়ে। তারা কি মানুষ? আমি তাদের সামনে তার ছেলের পায়ে ধরে মাফ চেয়েছি। বলেছি- তুমি আমাকে মারো। গালি দাও। তারপরও আমাদের সাজানো সংসারটাকে নষ্ট করো না।সে আমাকে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলে- কেন? কই তোমার বাপ? এতো অহংকার তোমার বাপকে নিয়া। তোমার এতো অহংকার এখন কই? বুঝলা এবার? মেয়ে মানুষ হলো মেয়ে মানুষ।
আমি আবার কাদতে কাদতে বললাম। বলো। আরও বলো কিন্তু প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিও না। মামুন আমাকে বলে, তোমার পায়ে পড়ি আমি। আমাকে তুমি মুক্তি দাও।
৩.
প্রিয় পাঠক, কি বুঝলেন? ধরুণ এই গল্পটি আমার চোখের সামনে দেখা। ধরুন আমি এই ঘটনাটির একজন সাক্ষি। ধরুন আমি ঐশির ছোট ভাই। ডিফোর্স হলো। যেই ছোটভাই নিজ হাতে বোনের সংসার সাজিয়ে দিয়ে এসেছিল। সেই ছোটভাই হয়ে আমি নিজ হাতে আমাদের দেয়া সব আসবাবপত্রগুলো খুলে খুলে ঠেলাগাড়িতে উঠিয়েছি। আমি নিজ হাতে যেই শূণ্য ঘরটিকে ভরে দিয়ে এসেছিলাম। সেই ভরা ঘরটিকে আমি শূণ্য করে দিয়ে আসলাম। আমি সেই বাসায় গিয়ে দেখি- বিয়ের একগাদা ছবিগুলো ছিড়ে টুকরো টুকরো করে রাখা হয়েছে। আমি গিয়ে দেখি আমার বোনের প্রাক্তন স্বামী আমার দিকে হুংকার দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকে। আমি জানি এই দৃষ্টি কেন। পরিণত ভাইকে সে ভয় পাচ্ছে। সেই ভয় কাটানোর জন্য সেই আমার দিকে এভাবে তাকায় যাতে আমি ভয় পাই। হারামিটা জানে না এইসব আমি বুঝি। আমাকে আমার বাবা কঠিন নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছে- জানোয়ারগুলোর সামনে নিজেকে জানোয়ার প্রমাণ করবে না। আমরা মানুষ। আর তোমার বোনের ভবিষ্যত আছে। তাই ওখানে কোন বাজে কিছু করবে না।
বাবার অমতে বিয়েটি হওয়ার কারণে বাবা নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। এখন বাবা মেয়ের বিপদে সহযোগিতা করছেন। ছেলের কাছে অনুরোধ করলেন কারণ বৃদ্ধ বয়সে ছেলের ঝোকের মাথায় করে বসা কোন কাজ তিনি সহ্য করতে পারবেন না। এটাই ছেলেকে বোঝানোর উদ্দেশ্য ছিল। ছেলে বুঝেছে। এবং খুব শান্ত মাথায়। ঠান্ডা মাথায় সেদিন বোনের সব কিছু নিয়ে আসলো।

শেষ:
এরপর গল্প আর কি হতে পারে? বাবা চলে গেলো হুট করে। মাও চলে গেলো হুট করে। আমি দেখি একটি পরিবারকে মুখ থুবড়ে পড়তে। খুব সামনে থেকে দেখি সম্পর্কগুলো কিভাবে একে অন্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আমার বোন প্রতিদিন কাদতো। আসবাবপত্রগুলো ধরে ধরে কাদতো। তার স্বপ্ন এভাবে ধ্বসে পড়বে এই বাস্তবতাটা হয়তো সে মেনে নিতে পারেনি। পাগলপ্রায় বোনকে নিয়ে আমারও বিপাকে পড়তে হলো। শেষে মাকে বললাম- ওকে বাইরে পাঠিয়ে দাও। আমি দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। তোমরা আমাকে অসুস্থ বানিয়ে ফেলছ। ছেলের কাছে এমন নিষ্ঠুর আচরণ মা হয়তো আশা করেননি। টাকা পয়সা খরচ করে মেয়েকে পাঠিয়ে দিলেন সুদূর কানাডায়। আমি তার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলাম। কারণ, আমি কেন জানি তাকে মাফ করতে পারছি না। প্রতিটি সম্পর্কের প্রতি আমার এই অনাস্থার পেছনে সর্বত্র আমার কেন জানি তাকেই দায়ি মনে হয়। ও যদি প্রেমটা না করতো। বিয়ের আগে যখন ছেলেটা তার কাছে ধরা খেলো তখন যদি বিয়ে না করতে চাইত। যদি শুরুতেই পরিবারকে ও এই সমস্যাগুলোর কথা জানাতো। যদি সেদিন ও বাড়ি ছেলে বের হয়ে না আসতো। হয়তো। হয়তো এতো সব ভাঙনের মুখোমুখি আমাকে হতে হতো না। এতো পছন্দ করতাম আমার দুলাভাইকে। তার এই নোংরা চেহারাটাই আমি মেনে নিতে পারছি না আজও। তখন আমি ভাবছিলাম আমার বোনই নিজেকে বাচাবার জন্য মিথ্যা বলছে। তাই পরে এক বন্ধুর মাধ্যমে মোবাইল ফোনের সমস্ত রেকর্ড আমি বের করলাম। দেখি আমার বোনের অভিযোগ সঠিক। ঘন্টার পর ঘন্টা বৃষ্টির নম্বরে সে কথা বলেছে। এ সব কিছু আমাকে বিশ্বাস করতে হয়েছে। হয়ত সম্পর্কের প্রতি আস্থাটা ফিরে পেতাম যদি ঐ নোংরা লোকটাকে খুন করতে পারতাম। এতো এতো প্রমাণ হাতের মুঠোয় থাকা স্বত্ত্বেও শুধুমাত্র নিজেকে মানুষ প্রমাণ করার জন্য আমাকে চুপ থাকতে বলা হয়েছে। আমি চুপ থেকেছি।
তাই নিজের পৌরষত্ব নিয়ে নিজের কাছেই মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে। আমি কিছুই করতে পারলাম না। একটা হিজড়া ছাড়া আমি তো কিছুই না। এরপর একবার ভেবেছিলাম ব্যাটাকে একদিন হলেও জেলের ভাত খাওয়াবো। সেটাও হলো না। আব্বুর কড়া কথা। তোমার বোনকে কোর্টে দাড়াতে হবে। নোংরা নোংরা প্রশ্ন করা শুরু করবে তারা। তারাও তো নিজেদের বাচানোর জন্য হাজার হাজার অভিযোগ দাড়া করাবে। আর যদি মিডিয়াতে যায় তাহলে তো আরও শেষ। অনেক হয়েছে। এই বুড়ো বয়সে আমি আর এসব দেখতে পারবো না।
কিন্তু হায়। যাদের দিকে তাকিয়ে চুপ থেকেছি। হিজড়া হয়েছি। তারাই কেউ নেই এই পৃথিবীতে। আমাকে দিয়ে গেছে পাহাড় সমান বোঝা। সর্বত্র নিজের ভেতর এই ক্ষোভ নিয়ে বেড়াচ্ছি। বুকের ভেতরের আগুনটাকে কোন ভাবেই নেভাতে পারছি না। কোন ভাবেই না। সেই আগুনে প্রতিনিয়ত ভস্মিভূত হচ্ছে সম্পর্ক নামক সব কিছু।
তাই আপনারাই বলুন, সম্পর্কগুলোকে আমি বিশ্বাস করি কি করে? যখন কোথাও সম্পর্ক নামক শব্দটা শুনি ঠিক তখন আমি সেখানে ভাঙনের শব্দ শুনি।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29279623 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29279623 2010-11-28 18:59:27
সুন্দরবন থেকে বাঘ যাচ্ছে জাতীয় যাদুঘরে

বাংলাদেশের জাতীয় পশুটির নাম হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এতোদিন চিড়িয়াখানাতে মানুষ যেতো রয়েল বেঙ্গল দেখার আগ্রহ নিয়ে। আর যারা সুন্দর বন যেতেন তারা তো ভাগ্যগুনে মুক্ত বনে বাঘ দেখে আসার সুযোগ পেতেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে- আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের এখন চিড়িয়াখানা থেকে জাতীয় যাদুঘরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। কারণ, বিশ্বের প্রাণীবিদরা ঘোষনা দিয়েছেন- ১২ বছরের মধ্যেই বাঘ শূণ্য হয়ে যাবে এই পৃথিবী।যদি তাদের আবাসভূমি রক্ষায় কোন পদক্ষেপ না গ্রহণ করা না হয় তাহলে নিশ্চিত করেই বলা যায় ২০২২ সালে পৃথিবীতে আর একটি বাঘও থাকছে না। গত রোববার রাশিয়াতে অনুষ্ঠিত “টাইগার সামিট”- এ এই মন্তব্যই করা হয়েছে।

বিশ্ব প্রাণী সংস্থা ফান্ড বলেছে বর্তমানে পৃথিবীতে মাত্র ৩২০০ টি বাঘ বেঁচে আছে। আবাক করার বিষয় হচ্ছে এখন থেকে ১০০ বছর আগে মোট বাঘের সংখ্যাটি ছিল ১ লাখ। এক লাখ থেকে একদম ৩২০০ টি বাঘে নেমে আসাকে অনেকটাই বিস্ময়কর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



আর এই অবস্থার পেছনে দায়ি করা হয়েছে যেনো তেনো ভাবে বনের গাছপালা উজাড় করাকে। এই সামিট থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে ১৩ টি দেশে এই ৩২০০ টি বাঘ অবস্থান করছে। দেশগুলো হচ্ছে,

ভারত- ১২০০-১৬৫০; ইন্দোনেশিয়া- ৪৫০-৭০০; বাংলাদেশ- ৪০০; নেপাল- ৩৫০; রাশিয়া- ৩৫০; ভুটান- ৭০-৮০; চীন- ৪০-৫০; কম্বোডিয়া- ১০-৫০; লোয়াস- ৫০; ভিয়েতনাম- ৩০- এর কিছু কম; বার্মা- ১০০, থাইল্যান্ড- ২৫০-৫০০; মালয়শিয়া- ৩০০-৩৫০।

চীনের প্রতি কড়া ভাবে সকলেই কথা বলছেন। বলা হচ্ছে- চীনে বাঘের হাড়ের ব্যবসা খুব জমজমাট। সেই সাথে বাঘের চামড়াও চীনে অনেক জনপ্রিয়। তাই চীনকে এই ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।



এতো সব দেখলে কিন্তু বলেই দেয়া যায় দ্রুত কোন পদক্ষেপ না নেয়া হলো বাঘ চলে যাচ্ছে জাতীয় যাদুঘরে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29276303 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29276303 2010-11-23 11:05:36
বড় কোন পরিবর্তনই আপনাকে ভালো কিছু এনে দিতে পারে - অং সান সু চি

বার্মার গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সুচি মুক্ত হওয়ার পর প্রথম টেলিভিশন সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিবিসির কাছে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিবিসির ওয়ার্ল্ড এ্যাফেয়ার্স এডিটর জন স্যামসন।

প্রশ্ন: আমি জানি এটা খুব সাধারণ প্রশ্ন হবে, আমি এও জানি যে এই প্রশ্ন এরই মধ্যে আপনাকে অনেকেই করে ফেলেছে। তারপরও বলি, আমরা জানি আপনি ৬/৭ বছর নিজঘরে বন্দি ছিলেন।আপনি আপনার নিজ দেশের মানুষের কাছাকাছি যেতে পারছিলেন না। এখন ঘর থেকে বের হয়ে নিজের মানুষগুলোর কাছাকাছি গিয়ে আপনার ভেতর কেমন অনভূত হচ্ছে?

সু চি: আমি জানি এখন আমাকে কেউ বিশ্বাস করবে না। তবে এটা সত্য যে আমি সব সময় নিজেকে বন্দি মনে করিনি। আমি নিজেকে মুক্ত ভেবেছি। শুধুমাত্র ঘরের মধ্যে বন্দি করে আমাকে কেউ মুক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি। আমি খুব সৌভাগ্যবান যে আমার কাছে বই ছিল। আমি তো নিজ ঘরেই ছিলাম। আমি বিবিসি শুনতে পেতাম। আমি ম্যাগাজিন ও বিভিন্ন পত্রিকা পড়তে পারতাম। আমি গানও শুনতে পেতাম। আমি আমার পুরো বাড়িটিতে ঘুরতে পারতাম। এই বিষয়গুলো তো আপনি জেলে-হাজতে পাবেন না। সুতরাং আমি যে মুক্ত নয় এটা আমি কখনই অনুভব করিনি । বরং আপনি বলতে পারেন যে আমি কিছু জিনিসপত্রের উপর নির্ভর ছিলাম। আগের সাথে বর্তমান সময়টার পার্থক্যটা আমি ঠিক এখনও বুঝতে পারছি না। এতো দ্রুত সবকিছু হয়ে যাচ্ছে যে আমি বুঝেই উঠতে পারছি না কি হচ্ছে।




প্রশ্ন: অনেক অনেক মানুষ আপনাকে দেখতে এসেছেন। সবাই আপনাকে একনজর দেখার জন্য পাগল হয়ে ছুটে আসছে বিভিন্ন জায়গা থেকে। কেউ হাত মেলাতে চাচ্ছে। কেউ আপনাকে একটু ছুতে চাচ্ছে। কখনও কখনও একটু সাবধানতারও প্রয়োজন আছে। আপনি জানেন, এতো কিছুর মাঝে কিছু ঘটে যদি যায়।

সু চি: না না। এখানে সাবধানতার কিছু নেই। বরং এটা খুব আবেগপ্রবণ হওয়ার মতো। আমি গতরাতে বিবিসিকে বলেছিলাম, অনেক মানুষ আমার কাছে আসতে চাবে। আমাকে শুভেচ্ছা জানাবে। তাদের মধ্যে অনেকেই খুব কঠিন সময় পার করেছে। এতো কঠিন সময়ের মাঝেও তারা খুব আনন্দিত। আমি মুক্ত তাই তারা এতো খুশি। এটা আমাকে আবেগপ্রবণ করে দেয়। আমাকে ছুয়ে যায়।

প্রশ্ন: এখন এই পর্ব শেষ। আমরা যদি পেছনে তাকাই তাহলে দেখবো গত ৭ বছর কিংবা তারও আগে আপনার ব্যক্তিগত জীবনে অনেক ত্যাগ আছে।আপনার দুই সন্তান। তারা তাদের মায়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি। বিশেষ করে আপনার স্বামীর বিষয়টি। তিনি অনেক কঠিন সময় পার করেছেন।

সু চি: আমি মনে করি না এখানে খুব একটা ত্যাগের কথা আছে। আমি মনে করি না। কিন্তু কিছু করার ছিল না।আপনি যখন এতোগুলো মানুষের সামনে দাড়িয়ে তখন আপনি সব কি করবেন? আমার বিবেকই বলে দেয় আমার পরিবারের সাথে থাকা সম্ভব নয়।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি কি মনে করেন না যে, আপনি দেশ ছাড়তে পারেননি কিছু শর্তের কারণে। এটা অনেক কঠিন একটা সিদ্ধান্ত ছিল। আপনার স্বামী মৃত্যুর সামনে কিন্তু তারপরও আপনি যাননি।



সু চি: হ্যা। এটা অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু ও জানতো আমি এই ধরনেরই একটা সিদ্ধান্ত নেবো। এবং একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ও আমাকে সাপোর্ট করেছে।

প্রশ্ন: আপনি মুক্ত হওয়ার পর আপনার ছোট ছেলের সাথে কথা বলেছেন।



সু চি: হ্যা। আমি আমার দুই ছেলের সাথেই কথা বলেছি।

প্রশ্ন: ও আচ্ছা। আপনি দুজনের সাথেই কথা বলেছেন। আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই, সেটা হলো- মোবাইল ফোন নিয়ে। মোবাইল ফোন এখন সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। আপনার কেমন লেগেছে যখন এই ছোট্ট বস্তুটি আপনি দেখলেন।

সু চি: সত্যি কথা বলতে কি- আমি একটু অবাকই হয়েছি।আমার বাড়ির গেটেই দেখলাম অনেক মানুষ ছোট্ট একটা বস্তু দিয়ে আমার ছবি তুলছে। এবং আমি খুব অবাক হলাম যে অধিকাংশের হাতেই মোবাইল ফোনটা আছে। এবং আমি প্রথম যখন আমার ছোট ছেলের সাথে ব্যাংকক-এ কথা বলছিলাম তখনই প্রথম আমি এই বস্তুটি ব্যবহার করলাম।

প্রশ্ন: আপনি এর আগে কখনও ব্যবহার করেননি?.

সু চি: না না। আমি দেখেছি। আমার নিরাপত্তাকর্মীদের হাতে দেখেছি। ম্যাগাজিনের বিভিন্ন ছবিতে আমি দেখেছি। কিন্তু কখনও ব্যবহার করা হয়নি।আসলে আমার কাছে খুব অদ্ভুতই লেগেছে। এটা এতো ছোট আর এর কোন মাউথস্পিকার নাই। শুধুমাত্র কানের সাথে লাগিয়ে রাখা আর মুখের কাছাকাছি থাকলেই কথা বলা ও শোনা যাচ্ছে। ব্যপারটা খুবই চমৎকার।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি কি জানতেন এটা দিয়ে ছবিও তোলা যায়?

সু চি: হ্যা আমি জানতাম। কিন্তু আমি খুব অবাক হয়েছি এই দেখে যে এটা অনেকের কাছেই আছে।

প্রশ্ন: এখন আমি একটু আক্রমনাত্বক প্রশ্ন করবো। হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর দিলে আপনার ক্ষতিও হতে পারে। তারপরও করি। আপনি কি চান সামরিক সরকারের পতন হোক?



সু চি: না। আমি চাই না তাদের পতন হোক। আমি এটা দেখতে চাই না যে আমাদের দেশের সেনাবাহিনীর পতন হচ্ছে। আমি দেখতে চাই, আমাদের সেনাবাহিনীরা তাদের দেশপ্রেম দিয়ে অনেক উপরে উঠে আসছে। তাদের মূল কাজটাই তারা খুব সুন্দর মতো করবে।

প্রশ্ন: এবং কি করবে?

সু চি: এবং তারা তাই করবে যা এই দেশের জনগণ চায়। এটাই স্বাভাবিক যে জনগণের মতই থাকতে হবে। জনগণ কি চায়? জনগণ অবশ্যই চায় সুন্দর জীবন। নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা। আমি অনেক মানুষের সাথেই কথা বললাম। তাদের আমি প্রশ্ন করেছি যে, তোমরা সবচাইতে বেশী কি চাও? কেউ কেউ বলেছে- আমি মুক্ত থাকতে চাই। আবার কেউ বলেছে- আমি নিরাপত্তা চাই। কেউ বলেছে- অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা। সুতরাং আমরা দুইটা বিষয়েই একমত হয়েছি। এক. স্বাধীনতা এবং দুই. নিরাপত্তা। এবং আমি মনে করি কোন সমাজে এই দুইটি বিষয়েরই খুব প্রয়োজন। আমাদের বার্মাতেও প্রয়োজন স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা।


প্রশ্ন: কিন্তু এই প্রয়োজনগুলো কি সেনা সরকার পূর্ণ করতে পারবে কিংবা এটা কি সম্ভব?

সু চি: আমি আশা করি আমাদের সেনাবাহিনী পদক্ষেপ নেবে। এবং তারাই প্রমাণ করে দেখাবে যে, আমাদের দেশেও নিরাপত্তা এবং স্বাধীন মতামতের ক্ষেত্র তৈরী করা সম্ভব। আমি তাদেরকে বলবো- তারা জনগণের হাতেই সব ছেড়ে দিক। কি ধরনের নিরাপত্তা এবং কি ধরনের স্বাধীনতার আমাদের বার্মাতে প্রয়োজন এটা জনগণই ঠিক করুক। আমি মনে করি এতে তারাই নায়ক হয়ে যাবে। কেন না? এতে করে তাদের ভেতর আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে। এবং তারাই বার্মাতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক।



প্রশ্ন: অনেক দেশেই এই ধরনের মুহূর্তে বিপ্লব হয়েছে। বার্মা কি ঠিক ঐ জায়গাতেই আছে যেখান থেকে তাদের বিপ্লবের প্রয়োজন আছে?

সু চি: আমি যদিও চাই না যে সেনাবাহিনীর পতন এধরনের কোন বিপ্লবের মাঝে হোক। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের চেষ্টার প্রয়োজন আছে।

প্রশ্ন: চেষ্টা মানে কি ধরনের চেষ্টা?

সু চি: হ্যা। মানে আমি বিপ্লব শব্দটা ব্যবহার করতে চাই না। এটাকে বলতে পারেন, নন ভায়োলেন্ট বিপ্লব।শান্তিপূর্ণ ভাবে বিপ্লব ঘটানো। কারণ, একটা বিরাট পরিবর্তন মানেই হলো বিপ্লব হয়ে যাওয়া। এটা এখন শান্তিপূর্ণভাবেও হতে পারে আবার শান্তিপূর্ণভাবে নাও হতে পারে। কিন্তু আমি চাই একটা শান্তিপূর্ণ বিপ্লব।

প্রশ্ন: যদি আমি বলি আপনার এই শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের ফলাফল আবার গৃহবন্দী হয়ে যাওয়া। তাহলে আপনি বিষয়টি কিভাবে নেবেন?



সু চি: আমি জানি না আপনার কাছে বিপ্লবের মানে কি। তবে আমার কাছে বিপ্লব মানে হলো একটা আমূল পরিবর্তন। অথবা দেখার মতো পরিবর্তন। বিপ্লব মানে হলো চমৎকার অসাধারণ পরিবর্তন। বড় কোন পরিবর্তনই আপনাকে ভালো কিছু এনে দিতে পারে। এটা শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের মধ্যে দিয়েও আসতে পারে।

----------------------------------------------------------
বঙ্গানুবাদ: শেরিফ আল সায়ার
২২ নভেম্বর, ২০১০
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29276100 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29276100 2010-11-22 22:55:45
গল্প: যে গল্পটি লেখা হলো না তবে আমি অনেকদিন ধরেই ধরে গল্প না লিখতে পারার কারণ বের করবার চেষ্টা করছি।একটা সময় ছিল যখন আমার গল্প পড়ে অনেকেই বলত, ‘গল্পে এতো মানসিক চাপ কেন? গল্প তো তাহলে ফুরিয়ে যাবে।’
হয়ত তাই হয়েছে। প্রচন্ড মানসিক চাপ থেকে গল্প লিখতাম বলে এখন আর সেইভাবে গল্প লেখা হচ্ছে না। নতুন নতুন আইডিয়া আসলেও কিভাবে শুরু করবো? গল্পের কাহিনী কি হবে? এসব ভাবতে ভাবতে দুদিন পার হয়ে যায়। ততদিনে লেখার ইচ্ছাটাও বদলে যায়।
এইতো কিছুদিন আগে লিখতে বসেছিলাম জোর করে। জোর করে লিখেছি কিছু। দেখবেন? পড়ে দেখুন লাইনগুলো।
ঝড় নেমেছে। আমার জানালার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া আম গাছটাকে রাতের ভুত মনে হচ্ছে। তার তীব্র বেগে নড়াচাড়ার আওয়াজ আর সাথে তার পাতার গন্ধ আমার নাকে এসে লাগে। এ তো সবুজের গন্ধ। আশেপাশে দালানের চাপে মাটির গন্ধটা আটকে আছে। আর জানালার গ্রীলের পাশে আটকে আছি রাত জাগা আমি। ছাড়ছি দীর্ঘশ্বাস। আর তা মিশে যাচ্ছে ঝড়ো বাতাসের সাথে। আমি বসে থাকি একা। একদম একা। রাত বাড়ে। রাত গভীর থেকে গভীর হয়। অন্ধকার গাড় হয়। ঝুম ঝুম বৃষ্টির আওয়াজ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আমার মনের ভেতর জমে থাকা হাজারো মেঘের সারিগুলো উন্মাদ হয়ে উঠে।

বুঝতেই পারছেন সেদিন প্রচন্ড ঝড় নেমেছিল। প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝে লিখতে বসেছিলাম। এর বেশী আর এগুতে পারিনি। তারপর কিছুক্ষণ গান শুনে ঘুমের দেশে চলে গেছি।
গানটি ছিল-
আমার নিশিথ রাতের বাদল ধারা/এসো হে গোপনে/ আমার সপনলোকের দিশাহারা……
রবীন্দ্রনাথের বৃষ্টির গান ভেতরের ক্লান্তি দূর করে দেয়। মনকে বিষন্নতার হাত থেকে মুক্ত করে তুলতে পারে। আবার অনেক সময় ভালো মনটাকেও বিষন্নতার বেড়াজালে আটকে ফেলতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের গান শুনে প্রেমে পড়া হয়নি এমন বাঙালী পাওয়া দুষ্কর। রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা পড়ে কাঁদেনি এমন বাঙালী পুরুষ পাওয়া গেলেও নারী পাওয়া কঠিন। মনের একদম গহীন থেকে আবেদন আসবে রবীন্দ্রনাথের যে কোন সৃষ্টিতে এটাই রবীন্দ্র’র নিয়তি হয়ে দাড়িয়েছে।
রবীন্দ্রনাথেরই খুব বিখ্যাত একটা উক্তি আছে। “মেয়েদের বুক ফাটলেও মুখ ফুটবে না।” রবীন্দ্র আমলের কথা এগুলো। রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত একটি গল্প আছে। অপ্রকাশিত মানে হলো জীবদ্দশায় গল্পটি তিনি লিখলেও প্রকাশ হয় নি। কেন প্রকাশ হয়নি তা ঘটনাটি শুনলেই বুঝতে পারবেন।
গল্পটির নাম হলো “মুসলমানীর গল্প”। গল্পের নায়িকা কমলা বিয়ের পর বরের সঙ্গে শশুরবাড়ি যাচ্ছিল। পথিমধ্যে হঠাৎ ডাকাতের হামলা হয়। তাকে উদ্ধার করে হবির খাঁ। হবির খা তাকে নিয়ে যায় তার কাকার বাসায়। কিন্তু হিন্দু পরিবার কমলাকে আশ্রয় দেয়নি। যার ফলে হবির খাঁ তাকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দেন। হবির খাঁ মুসলমান। কমলা হিন্দু। মুসলমান পরিবারের মাঝে হিন্দু আচার নিষ্ঠা মেনে চলা অনেক কঠিন। তারপরও হবির খাঁ তাকে নিজ ধর্ম পালনের ব্যবস্থা করে দিলেন। এমনকি কমলার জন্য রান্না-বান্নার ব্যবস্থাও করা হলো তার শাস্ত্রমতো। হবির খাঁ’র মেঝ ছেলে করিম। করিমের সাথে গভীর প্রণয় হলো কমলার। ভালোবাসা হলো তাদের। ভালোবাসা কখনও কোন বাঁধ মানে? তাই ধর্ম’র বাঁধও ভালোবাসা জয় করে নিলো। তাদের বিয়ে হলো। কমলা মুসলমান হয়ে গেলো। নাম হলো- মেহেরজান।
হিন্দু-মুসলমানের এই মানসিক-সামাজিক যুদ্ধ গল্পটিকে করে তুলেছে ঐতিহাসিক। তবে খুব সাধারণ এই গল্পটি অসাধারণ হতে পারতো যদি তা কবিগুরু তার জীবদ্দশায় প্রকাশ করতে পারতেন। তবে তা আর হয়নি। প্রেমের অভিষেক তিনি করেছেন মুসলমান আর হিন্দুর মাঝে। সকল বাধাকে ডিঙিয়ে গেছেন তিনি। অথচ এই গল্পটি প্রকাশ হলো কবি’র মৃত্যুর ৭/৮ বছর পর।
এগুলো আসলে নতুন নয়। এখনও তীব্র প্রেমের ব্যকুল আবেদন আজও পৃথিবীর বুকে অনেকটাই অপ্রকাশিত থেকে যায়।
যাইহোক। এগুলো আজবগুবে কিছু ঘটনা ভাবা ছাড়া আমার কোন উপায় নেই। কারণ গল্প বলতে হবে। তাও আবার প্রেমের গল্প। বহু লেখক হয়তো প্রেমের গল্প লিখে একদম লারেলপ্পা হয়ে গেছেন। তবে আমি লরেলপ্পা হতে চাই না। আমি একটা সাধারণ প্রেমের গল্প লিখতে চাই। মাঝে মাঝে মাথায় সব উদ্ভট আইডিয়া ঘুরে। সকল সিস্টেমকে ভেঙে ফেলে আমি প্রেমের গল্প লিখতে চাই। কিন্তু পাঠক-কূলের হামলার কথা চিন্তা করে আমি লিখতে পারি না। অনেকেই আমাকে নোংরা বলা শুরু করবেন। উদাহরণ দিয়ে বলি, একবার “গন্ধ” নামে একটি গল্প লিখেছিলাম। দৈহিক প্রেমের পরিণতি নিয়ে গল্প। এমনকি আমার প্রথম গল্প “দেহ”। সেটাও গোপন ক্যামায় দৈহিক প্রেমের দৃশ্য নিয়ে একটি গল্প। প্রেম ইদানিং নোংরা সব গুটির মাধ্যম হয়ে গেছে। সবাই প্রেম করে নিছক দেহ’র মজা লুটে নেবার জন্য।
কি? সবাই বললাম দেখে আপনারা রাগ করছেন? জানি রাগ তো করবেনই। সবাই না হলেও ৭০ ভাগ প্রেমিক-প্রেমিকা দৈহিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এটাকে আবার তারা বলে, ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তবে এই প্রকাশ যদি গোপন ক্যামেরায় চলে আসে তবে এর পরিণতি কি দাড়ায়? আসলে আমি দুখিত। অনেকেই বলে, আমার লেখায় মেয়েদের নিয়ে উল্টা-পাল্টা বিষয় নিয়ে লেখা থাকবেই। আমার এক মেয়ে বান্ধবী সব সময় বলে, তোর মেয়েদের প্রতি এতো অসম্মান কেন? আসলে কেউ বোঝে না। এটাকে অসম্মান বলে না। এটাকে বলে কটাক্ষ। মেয়েদের দু-মুখো চরিত্রকে আমি কটাক্ষ করি।
যাইহোক। ইদানিংকার মেয়েদের সেন্স বলে কিছু কাজ করে না। ভালোবাসার গন্ধ পেলেই তারা ছুটে যায়। যেখানে তারা শান্তি পাবে বলে ধারণা করে সেখানেই তারা ছুটে যাবে। এটাই তাদের স্বভাব হয়ে দাড়িয়েছে।

২.
আকাশ সেদিন মেঘলা ছিল। ঐগানটাও শুনছিলাম, আকাশ এতো মেঘলা যেও না তো একলা/ এখনই নামবে অন্ধকার……
কি চমৎকার গান। তাই না? আমি তখন শাহবাগ মোড় থেকে হেটে হেটে আজিজ সুপার মার্কেটের দিকে যাচ্ছি। কি করার? আমার বেকার জীবনের একমাত্র সম্বল এখন আজিজ সুপার মার্কেট। আমার এক শিক্ষক একদিন আজিজে আমাকে দেখে বলেছিলেন, তুমি এখানে? শেষ। তোমার জীবন শেষ।
আমি খুব গর্ব নিয়ে বলি-আমার জীবন শেষ হয়নি। বরং আমি একটি অন্যরকম জীবনের স্বাদ নিতে পারছি। যে জীবনের মানে নেই। যেখানে আছে শুধু বিষ্ময়। নিত্য-নতুন বিষ্ময়। বেকার জীবন মানেই হলো একটি মরুভূমির মতো জীবন। যদিও আমি মনে করি, সেই মরুভূমি দিয়ে প্রত্যেকটি মানুষরই একবার হলেও হাটা উচিত। বেকারত্বটা কি জিনিস তা মানুষ হিসেবে উপলব্ধি করা দরকার। আমার বন্ধুরা আবার এ ক্ষেত্রে অনেক সৌভাগ্যবান। তারা জানে না বেকারত্ব কি জিনিস। পড়াশুনার শেষের সাথে সাথে চাকরী পেয়ে গেছে। কি আর চিন্তা। নাকে তেল দিয়ে ঘুমা। আর সময় পেলে আমাকে পেয়ে কিছু উপদেশ বাণী শোনানো। আর আমার আড়ালে আমাকে নিয়ে হাসাহাসি। আমার ছাত্রজীবনের চাঞ্চল্যময় জীবন নিয়ে হাসাহাসি। কিংবা সমালোচনা। এগুলোই চলে। হয়তো চলে না। মাঝে মাঝে প্রতিবাদ করি তাদের এই স্বভাবের। তখন আবার অন্য কথা। বলবে, ব্যাটা চাকরী না পেয়ে হাতাশায় পাগল হয়ে গেছে।
এগুলো সবই আমাকে হতাশায় ডোবায়। এই সব কিছুর মাঝে আমার সাহিত্য আমাকে প্রাণ দেয়। আমাকে অক্সিজেন দেয়। আমি দাড়িয়ে থাকি স্বপ্ন নিয়ে। আমি বিস্মিত হই। আমি পৃথিবী দেখি। আমি আকাশ দেখি। চাঁদ দেখি। পাখি দেখি। মাঝে মাঝে সমুদ্রের কাছে গিয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শুনি। আমার জীবন। এভাবেই বেকার জীবনটা বহন করতে হচ্ছে। অনেকেই বলে, বেকার জীবন একটা অভিশাপ। আমি বলব, বেকার জীবন যদি অভিশাপের হয় তবে এই অভিশাপের মাঝে সকলকে পড়তে হবে। কারণ, এই অভিশপ্ত জীবন মানুষ চিনতে শেখায়। বন্ধু-শত্রু-আত্মিয়স্বজন সকল কিছু চিন্তে শেখায়। আমাকে দিয়ে অনেকে অনেক কাজ হাসিল করিয়ে নেয় মুলা ঝুলিয়ে। বলে- ‘তোমাকে চাকরী দেবো। কাজ করো আমার জন্য।’ কাজ করে দেই। সকল কিছু-সকল বিপদ উপেক্ষা করে কাজ করে দেই। কিন্তু বেলা শেষে ফলাফল একটাই। বলা হবে- ‘এই মুহূর্তে আমার হাতে সুযোগ নেই তোমাকে দেবার মতো। তবে একদিন হবে। চিন্তা করো না।’
তখন নিজেকে কনডম মনে হয়। আসলে কনডমের চেয়েও নিকৃষ্ট মনে হয়। কনডম যেমন ব্যবহারের পর ফেলে দেয়। ঠিক সেরকম। আমাকে ব্যবহার করা হয়। তাই কনডম ছাড়া নিজেকে আর কিছুই ভাবতে পারি না।
চাকরী না পাওয়ার পেছনে অন্যকে দোষ দেয়াটাও আমার উচিত হচ্ছে না। আমি পড়াশুনাটাও ঠিক মতো করিনি। টেনে-টুনে পাশ করে বের হয়েছি। এই কোন রকমে পাশ দিয়ে চাকরী দিবে কে? তাই নিজের পরিণতিকে মেনে নিয়েছি নিজের ভুলের শাস্তিস্বরুপ। তবে শাস্তি পেয়ে লাভ হচ্ছে কি? চেষ্টাগুলোতে কাজ হচ্ছে কি?
যাইহোক। আমি এগিয়ে যাই আমার শান্তি পাওয়ার জায়গা আজিজ সুপার মার্কেটের দিকে। আমার কথা শুনে আপনারা হয়তো ভাবছেন ওখানে আমার অনেক পরিচিত মানুষ। আসলে সত্য কথাটা হলো ঐখানে তেমন কারও সাথে আমার পরিচয় নাই। আমি যাই, ঘুরে ঘুরে বইয়ের দোকানগুলো দেখি। মাঝে মাঝে দোকানির সাথে কোন একটা বই নিয়ে আলাপ চালাই। কথা বলি। ছোটখাটো আড্ডা হয়ে যায়। তবে এখন আজিজে গিয়ে তেমন একটা আনন্দও পাই না। পানসে হয়ে গেছে। বইয়ের দোকনগুলো বন্ধ করে গড়ে উঠছে কাপড়ের দোকান। বস্ত্র দখল করছে কাগজের স্থান। অনেকটা এমন ভাবেই বলতে ইচ্ছে করছে। উলঙ্গ মানুষের সামনে বই আর কাপড় দিলে তো তারা কাপড়টাকেই আগে নেবে। এটাই স্বাভাবিক।
ঘুরে ঘুরে দেখছি বইগুলো। আমি নোবেল জয়ী লেখক হোসে সারামাগোর “অন্ধত্ব” বইটি খুজছি। পাচ্ছি না। এছাড়াও এবারকার নোবেল জয়ী লেখক মারিও ভার্গাস য়োসার কোন একটা বই। কিন্তু পাচ্ছি না।
বইয়ের সাগরে পড়ার অভ্যাস আছে আপনার? পড়ে দেখবেন। মাথাটা কিভাবে বিগড়ে যায়। দেখবেন- কিনতে গেছেন এক বই কিন্তু ফিরছেন আরেক বই নিয়ে। বইয়ের দোকানে গিয়ে শূণ্য হাতে ফিরেছেন এমন গাধা কিংবা অমানুষ এখনও পৃথিবীতে মনে হয় জন্মায়নি। যদি জন্মায় তাহলে বলতে হবে সৃষ্টিকর্তা ভুল করে তাকে মনুষ্যকূলে পাঠিয়েছেন। তার জন্মানো উচিত ছিল কোন এক শূয়োরের গর্ভে। গায়ে লেগেছে? লাগে নি? তার মানে আপনি বই কিনেই বইয়ের বাজার থেকে ফিরেছেন।
তো, আমি বই খুজছি। যদিও আমি অনুবাদ সাহিত্য খুব একটা পছন্দ করি না। মনে হয়, অনুবাদে সাহিত্যের আসল রসটা পাওয়া সম্ভব না। তারপরও কি করার। এতো বড় মাপের সাহিত্যিকদের ইংরেজী বই পড়তে গেলে তো ইংরেজীতে ধাতস্থ হওয়া লাগবে। আমি তা পারবো না। আমি অনুবাদটাই পড়ি। শেষে পেলাম হোসে সারামাগোর- যীশু খৃষ্টের একান্ত সুসমাচার। কিনে ফেললাম। আরও কিছু দেখছি। একটা বই উল্টালাম। ঠিক ঐ মুহূর্তে একটি মেয়ে ঢুকলো দোকানে। খুব অবহেলার চোখে বই দেখছে। বই মনে হয় তার শত্রু। উল্টাচ্ছে-পাল্টাচ্ছে। খুব সাধারণ বৈশিষ্টের বাঙালীয়ানা মেয়ে। চোখে কাজল দেয় না। কাজল দিলে হয়তো মেয়েটিকে আরও ভালো লাগতো। কপালে টিপ নেই। টিপ পরলে বাঙালী ভাবটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতো চেহারাতে। কিন্তু হাতাশায় ডোবা মেয়েটি বই দেখে হতাশার ভঙ্গিতে। আপনারা হয়তো ভাবছেন, আমি কি করে বুঝলাম মেয়েটা হতাশায় মড়ানো? বুঝে গেছি। মেয়েদের চোখ হলো পৃথিবীর সবচাইতে রহস্যময় বস্তু। এবং সত্যি কথাটা হলো- প্রতিটি মেয়ের চোখে তার দুঃখগুলো একদম ফুটে উঠে। হাজারো রহস্যের মাঝেও সেই হতাশা মাখা চোখটা তারা লুকিয়ে রাখতে পারে না। তাদের ছল ছল করা চোখ পুরুষের অন্তরে সমুদ্রের ঢেউয়ের মত আঘাত করবেই যদি পুরুষরা সেই চোখের দিকে তাকায়। আসতে আসতে মেয়েটি আমার পাশে এসে দাড়ালো। আমার বইটির দিকে একটু উকি দিয়ে দেখলো আমি কি বই কিনলাম। তারপর ঠোটের কোণে মুচকি হাসি। আমি জানি কেন হাসছে। তারপরও প্রশ্ন করেই ফেললাম, আপনি হাসলেন যে?
থতমত খেলো মেয়েটি। বলল- জি, মানে হাসলাম মানে?
হ্যা। হাসলেন তো। আমার বইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন তো আপনি।
মেয়েটি একটু নিজের বিব্রতবোধটা কমিয়ে বলল- আসলে আপনার হাতে অদ্ভুত এই রাইটারের বই দেখে হাসলাম।
- অদ্ভুত কেন হবে? হোসে সারামাগো বিখ্যাত নোবেল জয়ী লেখক।
মেয়েটি এবার অবলীলায় হেসে উঠলো। বলল- ওহ তাই নাকি? কি আশ্চর্য দেখুন। আমি এই লেখকের নামটাই শুনিনি।
হুম। সেটা বলেন। যীশু খৃষ্টের উপর লেখা এই বই অনেক সাড়াজাগানো বই। বুঝলেন।এর ইংরেজী নাম হলো- “দি গসপেল অ্যাকোর্ডিং টু জেসাস ক্রাইস্ট”। এ উপন্যাস সারামাগোকে এনে দেয় পর্তুগিজ লেখক এসোসিয়েশন পুরস্কার। তবে এই উপন্যাসটির বিষয়বস্তু বিতর্কের জন্ম দিলে পর্তুগিজ সরকারের ওপর চাপ আসতে থাকে। ক্যাথলিক চার্চ থেকে বইটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়। এই বিষয়ে সারামাগো দাবি করেন, এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই বিতর্ক সৃষ্টির পর সারামাগো এবং তার স্ত্রীকে লিসবন শহর ছাড়তে বাধ্য করা হয়। বুঝেন তাহলে।
মেয়েটি এবার সব কিছু ভুলে হাসতে থাকে। অনেকটা পাগলটাইপের হাসি। তবে কি মায়বী! কি আকর্ষণীয়! রহস্য ঘেরা। আবেগ জোড়ানো। যেনো ঘন মেঘের গর্জনের মাঝেও সূর্য উকি দেয়। ছলছল চোখে এই বুঝি পানি গড়িয়ে পড়বে। এমন সময় হাসিতে বিলিন হয়ে যায় চোখের পানি। সমুদ্রের ঢেউ যেভাবে আছড়ে পড়ে তীরে। ঠিক সেভাবে সেই শব্দ আমার অন্তরের একদম ভেতরে গিয়ে আচড়ে পড়ছে। আমার ভেতরটা যেনো চুরমার করে দিচ্ছে।
আমি হুট করেই বলে উঠলাম- আপনি হাসছেন কেন?
ওমা কি আশ্চর্য। আমি হাসবো না? আপনি আমাকে জ্ঞান দিচ্ছেন। আপনার কাছে কি আমি জ্ঞান চেয়েছি?
কিছুটা মুচকি হেসে আমি বললাম- আসলে এটা বাঙালীর অভ্যাসের একটি। জ্ঞান বন্টন করা।
এরপর আর মেয়েটি আমার দিকে তাকায়নি। হঠাৎ দেখি বের হয়ে যাচ্ছে।খুব আফসস হলো। আহ। নামটাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি। কি নাম মেয়েটার? যাইহোক। আমি আবার ডুব দেই বইয়ের সাগরে।
বের হই। ভাবলাম আরেকটা দোকানের দিকে যাবো। শংকরের “চৌরঙ্গী” বইটাও কিনতে হবে। বের হতেই হিমেল বাতাসের মতো আমার শরীর-মনে এসে লাগলো এক অসাধারণ হিমেল শব্দ।

তোমার গীতি জাগালো স্মৃতি নয়ন ছলছলিয়া, বাদল শেষে করুণ হেসে যেন চামেলি-কলিয়া ।।

আমার মনটা কেন যেন আনচান হয়ে উঠে উঠলো। কোথা থেকে আসছে গানটার আওয়াজ। পাগলের মতো ছুটতে থাকি। এতো রবীন্দ্রনাথ। শব্দ কাছে আসতে থাকে।
সে বাণী যেন গানেতে লিখা দিতেছে আঁকি সুরের রেখা যে পথ দিয়ে তোমারি, প্রিয়া, চরণ গেল চলিয়া।

দেখি। অবাক হয়ে দেখি।ঠিক আমারই মতো বিস্ময় নিয়ে দাড়িয়ে আছে মেয়েটি। একটি সিডির দোকানে। যেখানে প্রাধান্য পায় রবীন্দ্রনাথ। আবেগ নিয়ে চোখ বন্ধ করে শুনছে গান। ঠোট নাড়ছে। মিন মিন করে মুখ মিলাচ্ছে। সেতারের আওয়াজে একটুখানি চোখ মেলল। সেই ছলছলে চোখ। পানি গড়িয়ে পড়ছে।
আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা
প্রিয় আমার ওগো প্রিয় বড় উতলা আজ
ওরা আমার খেলাতে হার মানবে
আহা। আহা রবীন্দ্রনাথ। তোমার গান শুনে বাঙলার এই নারী চোখ ভেজায়। নিরবতায় তোমার গীত তাকে হারিয়ে ফেলে। জানো তুমি রবীগুরু? ওগো রবীন্দ্রনাথ……………………. আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা বেধেছে আমার প্রিয়া……
আমি কাছে যাই। আমাকে দেখেনি। হারিয়ে আছে। আমার রবীন্দ্রপ্রেমী হারিয়ে আছে। রবীন্দ্রাথ বলেছে- ওরা আমার খেলাতে হার মানবে। আমি হার মেনেছি। ওর প্রেমের কাছে আমিও হার মেনেছি।
অবাক হওয়া-বিষ্ময় হওয়া সব কিছই তো ছিল। মেয়েটি খুব ধীরে আমার দিকে তাকায়। গম্ভীর হয়ে বলে- আপনি এখানেও?
- জ্বি, আমি এখানেও। গান শুনতে এসেছি।
সত্যি? আজকালকার ছেলেরা তো রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনাই ছেড়ে দিয়েছে।
আমি বললাম- আমিও খুব একটা শুনি না। তবে আপনার মুগ্ধ হওয়া দেখে আমি শুনছি।
মেয়েটি একটুও এবার বিব্রত হয় না। সে দোকানিকে বলে আরেকট সিডি চালাতে। বেজে ওঠে,
তুমি মোর পাও নাই পরিচয় ।
তুমি যারে জান সে যে কেহ নয়, কেহ নয় ।।
মালা দাও তারি গলে, শুকায় তা পলে পলে,
আলো তার ভয়ে ভয়ে রয়–
বায়ুপরশন নাহি সয় ।।
এসো এসো দু:খ, জ্বালো শিখা,
দাও ভালে অগ্নিময়ী টিকা ।
মরণ আসুক চুপে পরম প্রকাশরূপে,
সব আবরণ হোক লয়–
ঘুচুক সকল পরাজয় ।।
আমি দাড়িয়ে থাকি। আমিও চোখ বন্ধ করি। হে রবীগুরু। তুমি আমার জীবনে এসেছ কোন এক নারীর বেশ ধরে। আমি জানি। তোমার প্রেমে আমার কাঙাল হতে ইচ্ছে করছে। তোমার পূজা দিতে ইচ্ছে করছে। হে রবীগুরু তোমাকে প্রণাম। প্রণাম। লাবণ্য ছোয়া মেয়েটি। চলে যাচ্ছে। আটকানোর শক্তি নেই। দৌড়ে যাই। দেখি বাদল নেমেছে। কাছে যেতেই শুনি মেয়েটি গুন গুন করে গান গাচ্ছে।
আমার নিশীথরাতের বাদল ধারা এস হে গোপনে
আমার স্বপনলোকে দিশাহারা ।।
ওগো অন্ধকারের অন্তরধন , দাও ঢেকে মোর পরান মন –
আমি চাইনে তপন , চাই নে তারা ।।
আমি থমকে যাই। আর না। গানটা আমার তার কন্ঠেই শুনতে হবে। হবেই। আমার নিশীথরাতের বাদল ধারা। এসো হে গোপনে। আর কিচ্ছু ভালো লাগছে না। বৃষ্টির ঝুম ঝুম শব্দের মাঝে হারিয়ে যায় মেয়েটি। ঘোলাটে আকাশের নিচে আমি দাড়িয়ে একা। ভিজে একাকার।

শেষ:
ঘটনাটা অনেকদিন হলো। এখনও মাঝে মাঝে মনে হলে বুকটা আনচান করে উঠে। মেয়েটির নামটাতো জানা হলো না। রবীন্দ্রপ্রেমী মেয়েটি।লাবণ্যভরা, হতাশাগ্রস্থ চোখ, রহস্যময় পাগল হাসি মাখা মেয়েটি এখন কোথায়? এখনও রাত হলে মাঝে মাঝে আমি গাই, যখন সবাই মগন ঘুমের ঘোরে/ নিয়ো গো/ নিয়ো গো/ আমার ঘুম নিয়ো গো হরণ করে……..

বিস্ময় জাগানো সব কিছু নিয়ে আমার গল্প লেখার অভ্যাস আছে। এই রবীন্দ্রপ্রেমী মেয়েটিকে নিয়েও আমার খুব গল্প লিখতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু হয়ে উঠলো না। রবীন্দ্রনাথকে নিজের গল্পের হিরো বানাবার মতো সাহস আমার নাই। একমাত্র রবীন্দ্রনাথের জন্য সেদিন মেয়েটির নাম জানা হলো না। একমাত্র রবীন্দ্রনাথের জন্যই আমার গল্পটি লেখা হলো না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29274979 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29274979 2010-11-20 20:38:26
সমকালের ঈদসংখ্যায় কবিগুরুর শান্তিনিকেতন
রবীন্দ্রনাথ। বাংলার সাথে মিশে আছেন যে মানুষটি। সেই মানুষটির নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রকৃতিকে যিনি নিজের সাথি করে নিয়েছিলেন। বাংলার প্রকৃতিকে যিনি মানুষের অন্তরে জীবন দান করেছিলেন। মানুষকে শুনিয়েছিলেন প্রকৃতিক ভিতরে বাজতে থাকা মিউজিক। সে মিউজিকে মাতাল হয়ে ওঠে সকলে। সেই রবীন্দ্রনাথ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ হাজার-লাখো মানুষের অন্তরে লালিত হন। তিনি আরও জীবন্ত হয়ে থাকেন- তারই নির্মিত শান্তিনিকেতনে। যেই নিকেতনে অপার শান্তি তার নামই তো শান্তিনিকেতন হবে এমনটাই তো স্বাভাবিক। যেখানে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন বহু গুণিজন।আর নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে চলেছেন দেশের জন্য-দশের জন্য। আর সেই সাথে আরও জীবন্ত হয়ে উঠছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এই শান্তিনিকেতন নিয়েই এবারের সমকালের ঈদসংখ্যায় বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষালাভ করা চারজন গুণিশিল্পী তাদের স্মৃতিকথা বলেছেন। তারা সেখানে কিভাবে গেল, কি হলো সেখানে, কিভাবে পড়াশুনা করলেন, সেখানকার পরিবেশ প্রকৃতি এই সব বলেছেন। শান্তিনিকেতনকে যেন তারা আরও জীব্ন্ত করে তুলেছেন। এই চার গুণী রবীন্দ্রশিল্পীবৃন্দরা হলেন- পাপিয়া সরোয়ার, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, লিলি ইসলাম এবং অদিতি মহসিন। চারজন চারধরনের শিরোনামে লিখেছেন তাদের অভিজ্ঞতার কথা।

প্রথমে, সোনার কাঠি ছোঁয়ার মতো শিরোণামে লিখেছেন পাপিয়া সরোয়ার। তিনি তার লেখার শুরুতেই গানই তার ভালোবাসা বলে উল্লেখ করেন। আর সেই ভালোবাসা হলো- রবীন্দ্রসঙ্গীত। পাপিয়া ছোটবেলা থেকেই গানকে ভালোবাসতেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রকৃতির প্রতি একটি আলাদা ভালোবাসা অনুভব করতেন। আর সেই কথা বলতে গিয়ে বলেন,

পারিবারের সব সুন্দর পরিবেশের পাশাপাশি বাইরের প্রকৃতিও ছোটবেলা থেকেই বড় বেশি টানত। সব ঋতুর আলাদা গন্ধ, আলো-অন্ধকার, জোছনাভেজা রাত, মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত- সবই এখনও আমাকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দেয় শহরের এই ইট, কাঠ, হৈচৈয়ের ভেতর থেকেও।

পাপিয়া ছায়ানটে ১৯৬৭ সালে শুরুতে গান শেখা শুরু করেন।কিন্তু পড়াশুনা শেষ না করেই ছয়ানট থেকে চলে আসেন বুলবুল একাডেমীতে।ঠিক ঐ সময় ভারত সরকারের বৃত্তি পান তিনি। প্রথম সেখানে যান ১৯৭৩ সালে । সেখানকার পরিবেশও তাকে মুগ্ধ করে। শান্তিনিকেতনের নাম তিনি বহুবার শুনেছেন। বহু নামকরা শিল্পীদের কথা শুনেছেন যারা শান্তিনিকেতনের শিল্পী। সেই মানুষগুলোর পাশাপাশি চলে যাওয়া তার জন্য ছিল পুরো স্বপ্নের মতো। পাপিয়া সরোয়ার আর গর্বিতবোধ করেন কারণ তিনিই ছিলেন সঙ্গীত ভবনের প্রথম বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। এভাবেই তিনি গল্প করেন তার শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়ে। একে একে বলে চলেন সেখানকার অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে। হোষ্টেল জীবন, সেখানে রান্নাবান্নার কথা।
তার রচনায় সবচাইতে বড় জাগয়া নিয়ে ছিল সেখানকার গুরুজনেরা। তিনি লিখেছেন তাদের আন্তরিকতার কথা। অসুস্থ থাকা অবস্থাতেও তাঁরা ক্লাস নিতেন। তাঁরা সব কিছুকে অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে জানেন। শুধু দায়িত্বপালনের জন্যই দায়িত্ব পালন করতেন না।আর এ কারণেই সঙ্গীত ঢুকে গেছে তার রক্তে। তার অন্তরে। এর সমস্ত সফলতা শুধু তার গুরুজনদের। শান্তিনিকেতন সম্পর্কে- তিনি বলেন,

শান্তিনিকেতনের সুবাদে আমার জীবনের সঙ্গে সঙ্গীত যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সঙ্গীতের সাধনা বলতে কী বোঝায় শান্তিনিকেতনে গিয়ে এ কথা খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে আমার পড়াশুনা শেষ হয় ১৯৭৭ সালে। স্নাতক শ্রেণীতে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হই।

দ্বিতীয় লেখাটি “মোহরদি’কে ঘিরেই আবর্তিত” শিরোনামে জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার। তিনিও একই ভাবে বলেছেন, ছোটবেলা থেকেই শান্তিনিকেতন সম্পর্কে একটা মোহর কথা। সেখানকার পরিবেশ-প্রকৃতির সাথে মিশে গেছে গান। এ সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন,
শান্তিনিকেতনের আকাশ-বাতাস, গাছপালা-প্রকৃতি আর জীবনের সঙ্গে গান এমন সহজভাবে মিশে গেছে যে, তা নাগরিক জীবনের মতো কখনও আরোপিত মনে হয় না। গান গাওয়ার কথা ভাবতে হয় না। গান আপনাআপনি চলে আসে। শান্তিনিকেতনে গান শেখানোর পদ্ধতিও সহজ। পাঠভবনে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পড়াশুনার সঙ্গে সঙ্গে গান শিখতে শিখতেই বেড়ে ওঠে। আমরা যারা সঙ্গীতভবনের গান শিখছি, তারাও সারাদিনই একটা গানের পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছি।

তার লেখার শিরোনাম দেখেই বোঝা যায়, তিনি তার পছন্দের একজন শিক্ষককে কেন্দ্র করেই লিখেছেন লেখাটি। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। সেই কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্গীত ভবনের অধ্যক্ষরুপে শান্তিনিকেতনে আসেন। সেই কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়-ই হলেন, সকলের মোহর’দি।
মোহর’দির রূপের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রেজওয়ানা লিখেছেন,

কী অপূর্ব সুন্দরী! যেন স্বর্গের কাছে মর্ত্য যা চায়, সেই রূপ পবিত্র শুভ কল্যাণী প্রতিমা। সদ্য স্নাত, ভেজা চুল পিঠে ছাড়ানো, সাদা রঙের শাড়ী পরা, প্রসাধনহীন, নিরাভরণ।

এই মোহরদিকে নিয়ে পুরো রচনা জুড়ে আলোচনা করেছেন বন্যা। বাংলাদেশিদের প্রতি মোহরদির ভালোবাসার কথা বলেছেন। তবে ব্যস্ততার জন্য খুব একটা কাছে পাওয়া হতো না মোহরদিকে। কিন্তু নব্বয়ের দশকে মোহর’দি স্বয়ং ডাক পাঠান রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে। তখন খুব কাছ থেকে দেখা হয় গুরু মোহর’দিকে। সকাল থেকে রাত সারাদিন একটি মানুষের সাথে থেকে মুগ্ধ হন বন্যা। তাঁর গুরু মোহর’দিকে নিয়ে বলেন,
নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে, স্নেহে, প্রেমে তিনি আমাকে তৈরি করেছেন আগামীতে পথচলার জন্য। তিনি রবীন্দ্রনাথকে চিনতে শেখান প্রতিটি গানের মধ্যে নিবিড় উপলব্ধি দিয়ে। আমিও এক অলিখিত দায়িত্ব আর অধিকারবোধ অনুভব করি আমার মধ্যে। যেন মোহরদি আমার।রবীন্দ্রনাথকে আগে দেখিনি।গান, কবিতা, গল্প, নাটক, আমার দেশের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আলোছায়ায় স্বপ্ন প্রদোষে তার উপস্থিত ছিল। দূর থেকে তার হৃদয়ে তার উপলব্ধি ক্রমশ নিবিড় হচ্ছিল; কিন্তু দূরত্ব ঘোচেনি। মোহরদির হাত ধরে সে দূরত্ব ঘোচালাম। দূরের মানুষ যেন কাছে এলো। মোহরদি নিয়ে গেলেন সেই চিরচেনা মানুষটির চেনা গল্পের কাছাকাছি। আমার শান্তিনিকেতনের স্মৃতিকথা তাই মোহরদিকে ঘিরে আবর্তিত।

তৃতীয় লেখাটি হলো- ভোরের মহুয়া আর গন্ধরাজ। লিখেছেন “লিলি ইসলাম”। একই ভাবে তার লেখাতেও উঠে এসেছ শৈশব। ছোটবেলা থেকেই শান্তিনিকেতনে পড়বার একটা স্বপ্ন তিনি বুকে লালন করেছেন। ১৯৮১ সালে শান্তিনিকেতনে সঙ্গীত বিভাগে তিনি ভর্তি হন। শান্তিনিকেতন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে লিলি ইসলাম বলেন,

নামের মতই শান্তির শীতল পরশ মাখানো স্থান শান্তিনিকেতন। প্রকৃতির সঙ্গে শান্তিনিকেতনের যে গভীর একটা সম্পর্ক আছে, সেটা ছোটবেলায় লোকমুখে শুনেছি। কিন্তু শান্তিনিকেতনে গিয়ে তা স্বচক্ষে অবলোকন করলাম। যেন প্রকৃতির নিবিড় হাতে গড়ে ওঠা কোন স্বপ্নরাজ্য।সেখান কোন কৃত্রিমতার ছোয়া নেই। সবখানে প্রকৃতির ছোঁয়া।

এই লেখা পড়তে গিয়ে আমরা জানতে পারি, লিলি ইসলাম যে হোষ্টেলে থাকতেন সেই হোষ্টেলে খুন্তি দাস গুপ্ত নামে একজন থাকতেন। যিনি সুচিত্রা সেনের দূর সম্পর্কের আত্বীয় ছিল। এছাড়া, তাদের বান্ধবীদের মধ্যে সবার আগে কে ঘুম থেকে উঠে রেওয়াজ কক্ষে পৌছাতে পারবে এমন প্রতিযোগিতার গল্পও মুগ্ধ করবে সকলকে।
মাঝে মাঝে তারা ঘুরতে যেত অজয় নদীর পাড়ে। সবাই মিলে সাইকেলে চড়ে যেত অজয় নদী ভ্রমনে।মজার ঘটনাটা বর্ণনা ছিল শান্তিনিকেতনের সিনামা হলকে নিয়ে। মাত্র এক টাকায় সিনেমা দেখা যেত। সাঁওতাল পল্লীতে শান্তিনিকেতন অবস্থিত। তাই সাঁওতালরা সিনেমা দেখতে আসতো। তাদের সাথে বিভিন্ন দুষ্টুমী করে তাদের বিরক্ত করতো। আর মজার বিষয় ছিল, যখন বৃষ্টি হতো, তখন মাইকিং করা হত। বলা হত, আপনারা সবাই পা উঠিয়ে বসুন। তার মানে হলো, বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢুকে গেছে। এধরনের আনন্দময় মুহূর্তগুলো বলতে গিয়ে লিলি ইসলাম বলে উঠেন,
….কখনও আমার মধ্যে একঘেয়েমি আসতো না। শান্তিনিকেতনের মধ্যে প্রতিদিনই নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতাম। এ ছিল অন্যরকম অনুভুতি।

গুরুদের কথা বলতে গিয়ে তার লেখাতেও উঠে আসে মোহরদি। গুরু-শির্ষের সম্পর্ক কতটা মধুর হতে পারে তা তিনি শিখেছেন মোহরদির কাছ থেকে।

চতূর্থ লেখাটা লিখেছেন, অদিতি মহসিন। শিরোনাম- প্রকৃতির অনেক কাছাকাছি। ১৯৯২ সালে সমাজবিজ্ঞানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর যখন হঠাৎ শান্তিনিকেতনে বৃত্তি পান অদিতি মহসিন। তখন তিনি চমকে উঠেন। শিল্পের কাছে ছুটে যাওয়ার এক আকুল ইচ্ছা অপরদিকে ভবিষ্যত পরিকল্পনা সব মিলিয়ে অনেকটা সন্দিহান হয়ে পড়েন তিনি। এমন সময় তার বাবা তাকে উৎসাহ দেন। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো অনেক ছেলেমেয়েরাই পড়াশোনা করে, কিন্তু সবাই কি শান্তিনিকেতনে পড়ার সুযোগ পায়? তুমি যেহেতু পেয়েছ এবং এটা যেহেতু সরকারি বৃত্তি, তাই আমি বলি তুমি যাও।
অদিতিও শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে তিনি যান শ্রাবণ মাসে। কিন্তু তখন রাত। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি অভিভূত হয়ে যান।
ঘুম থেকে উঠেই বাইরে দাড়ালাম। তখন মনে হলো শান্তিনিকেতন নিয়ে এতোদিন যেমনটা ঠিক ভেবেছিলাম; মনের মধ্যে ছবি এঁকেছিলাম, ঠিক একই ছবি যেন আমার দু’চোখে দৃশ্যমান হলো। সেই বড় বড় গাছ। গাছের পর গাছ আর গাছ। আর কিছু দেখা যায় না। রাস্তা, বড় বড় মাঠ। তখন বর্ষা। শান্তিনিকেতন তখন আরও বেশি সবুজ। শান্তিনিকেতন বর্ষার এক কথায় অপূর্ব। এমন বর্ষা পৃথিবীর কোথাও খুব কমই দেখেছি। এত অপূর্ব বৃষ্টি। গাছের ওপরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়তে থাকে। ………

এভাবেই প্রকৃতির সৌন্দর্য অদিতিকে মুগ্ধ করে। লিলি ইসলামের মতই অদিতি আরেকটি নদীর কথা উল্লেখ করেন। এ নদীর নাম কোপাই নদী। যে নদীটি নিয়েই কবিগুরু লিখেছিলেন, আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
এই নদীতে তারা সবাই সাইকেলে করে ঘুরতে যেত। তবে নিয়ম অনুযায়ী রাত নটার মধ্যে সকলকে হোষ্টেলে পৌছাতে হতো।
আদিতির লেখাতেও মোহরদিকে পাওয়া যায়। তিনিও বলেন, বাংলাদেশি হওয়ার সুবাদে মোহরদির অনেক আদরে ছিলেন।
প্রকৃতির খেলায় তৈরী হওয়া শান্তিনিকেতন অদিতির মনের গভীরে বিশাল ছাপ ফেলে রেখেছে তা রচনাটি পড়লেই বোঝা যায়। বাংলা ঋতুর খেলা একমাত্র যেন শান্তিনিকেতনেই উপভোগ করা যায়।

শান্তিনিকেতন নিয়ে এই আয়োজন সকলের কাছে কিছুটা হলেও দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো সম্ভব হবে। আমরা যারা শান্তিনিকেতনকে শুধু লোকমুখেই শুনে এসেছি, তাদের কাছে জীবন্ত হয়ে উঠবে প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন।
------------------------------------------------------
সমকালের ঈদ সংখ্যা ২০১০ মূল্য: ১৫০ টাকা
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29234256 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29234256 2010-09-02 22:01:02
সাপ্তাহিক ২০০০ - এর এবারের ঈদ সংখ্যার উপন্যাস রিভিউ: পরম্পরা- আহমাদ মোস্তফা কামাল নদী ভাঙনের মানুষগুলো সবসময় ভাঙনের মধ্যে দিয়েই যায়।সর্বক্ষণ ভাঙনের আশংকা, সেই সাথে উঠে দাঁড়াবার প্রচেষ্টা। আবার ভেঙে পড়া। এ যেন মানুষগুলোর একটা পরম্পরায় পরিণত হয়। এই ভাঙনের গল্প যদি হয় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নিয়ে। তাহলে দেখা যাবে, সর্বক্ষণ সম্পর্কের দোলায় নড়ে চড়ে কখনও ডুবে গিয়ে হঠাৎ উঠি দাড়ায় এই পরিবারগুলো এবং সাথে তাদের সম্পর্কগুলো। সারা জীবনের স্মৃতি-অনুভূতি, পুরন দিনের মিছিলকে খুঁজতে গিয়ে তারা আটকা পড়ে যায় তাদের সম্পর্কে। তখন অভিমান, নিজেদের মাঝে ভুল বোঝাবোঝির ফ্রেমটিতে জমে যায় ধুলো। এমনই সব সম্পর্ক, মধ্যবিত্তের যুদ্ধ, স্বপ্ন পূরণের স্বপ্ন নিয়ে এবারের সাপ্তাহিক ২০০০ -এর ঈদসংখ্যায় আহমাদ মোস্তফা কামাল রচিত উপন্যাস “পরম্পরা”প্রকাশ পেয়েছে।

গল্পের প্রধান চরিত্র মায়োপ্যাথিতে আক্রান্ত বালক তার ছোটবেলার অসংখ্য ফেলে আসা স্মৃতি আওড়ানো শুরু করে। ক্লাস সিক্সের পর তার সুস্থ দেহ ধীরে ধীরে এক ভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্ত হয়। বিছানাকে তার সঙ্গী করে সে বলে চলে তার গল্প। আর তার গল্পে উঠে আসে অসংখ্য চরিত্র। একান্নবর্তী পরিবারে তার জন্ম। তার পরিবারের বর্ণনা দিতে গিয়ে সে বলে,

“বাবার ভাই-বোনের মধ্যে সবচাইতে বড় আমার বড় ফুপু, তারপর আমার বাবা, তার দুই ছেলে – আমি আর ভাইয়া। এরপর মেজচাচা, তার এক মেয়ে, বয়সে সে আমাদের দুজনেরই বড় হলেও ভাইয়া তাকে নাম ধরেই ডাকে- পিঠাপিঠি কিনা – আর আমি ডাকি আপু বলে। এরপর সেজচাচা-ছোটচাচা। অবশ্য ছোটচাচা সবার ছোট নয়, তার পরে আমার আরো দুই ফুপু – মেজফুপু-ছোটফুপুর পর আরেক চাচা। তাকে অবশ্য আমরা অন্য সব চাচার মতো ‘চাচা’ ডাকি না, আহ্লাদ করে ডাকি কাক্কু।ভাইয়ার আবিষ্কার এই ডাক। বুঝতেই পারছেন, কী বিশাল পরিবার!”

গল্পের শুরুতে সে তার দাদুর সঙ্গে অসাধারণ সব বিষয় নিয়ে আলাপচারিতা চালায়। কথা হয়, দেশ ভাগ থেকে শুরু করে একটি শিশুর জন্ম কি করে হয় সেই বিষয়টি নিয়েও।দাদুর প্রতি যে তার অগাধ ভালোবাসা তা- পাঠক উপন্যাসটির শুরুতেই অনুধাবণ করে ফেলতে পারবেন। সমস্ত সম্পর্কের পরিচয় লেখক তার দাদী-নাতীর গল্পের মাধ্যমেই প্রকাশ করতে থাকে ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে উঠে আসে দাদীর ব্যক্তিগত সাংসারিক প্রসঙ্গ। যেমন, নিজের বিয়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলে উঠেন, ঊনচল্লিশ বছরের অম্লমধুর সংসার-জীবন। বিট্রিশ আমলের বিয়ে হওয়া এই দম্পতির মাত্র কুড়ি বছরের মধ্যে ৮ সন্তানের জনক-জননী হয়ে যায়। তবে এতগুলো সন্তান নিয়ে কোন আফসস ছিল না। বরং তাদের মানুষ করে গড়ে তোলার এক যুদ্ধময় সময় পার করে এসেছে দাদু।
দাদুর সাথে গল্পের মাধ্যমে পাঠককে সে উন্মোচন করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কি করে সর্বক্ষণ যুদ্ধ করে চলছে। এগুলো আমরা বুঝতে পারি তখন যখন আমরা দেখতে পাই, বড় ফুপুর বিয়ের দুই মাসের মাথায় হঠাৎ তার রাজপুত্রের মতো স্বামীর মৃত্যু। এরপর দীর্ঘ সময় অবিবাহিত থেকে যায় বড় ফুপু। কিন্তু তার মানসিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি সকলকে বিব্রত করে। তবে এমন ঘটনা হবে অনেক আগেই টের পায় দাদা। এই রাজপুত্রের মতো ছেলের সাথে বিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না তিনি। পরিবারের সকলে এ জন্য কিছুটা মনক্ষুন্নও ছিল। তবে তিনি ছিলেন অটল। কিন্তু পিতৃত্ত সে বাধা মানতে পারেনি। ভবিষ্যত বুঝার ক্ষমতা থাকা দাদা সমস্ত মায়ার বন্ধন ছিড়ে মেয়েকে বিয়ে দিলেন সেই ছেলের কাছে যে কিনা কিছুদিন পরই মারা যাবে। এই ভবিষ্যতবাণি কেউ বিশ্বাস করেনি। তাই তিনি কন্যাদানের সময় কাঁদতে কাঁদতে বলেন,

“আমার মেয়েটাকে আমি হাত-পা বেধে নদীতে ভাসিয়ে দিলাম”।

পিতার ভবিষ্যতবাণি ঠিক হলো। বিয়ের দুই মাসের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়লো মেয়ের জামাই। পিতৃমন সেদিন বুঝতে পেরেছিল আজ তার মেয়ের জামাই মারা যাচ্ছে। তাই তো তিনি সারা বিকেল অস্থির সময় কাটাতে থাকেন।
দাদির কাছে এই সব গল্প শুনে সে প্রশ্ন করে, দাদা কি করে ভবিষ্যত বলতে পারতো?
কিন্তু দাদি তাকে উত্তর দেয় না। ঢুকে যায় গল্পে। তার মেয়ের নতুন জামাই তাদের সবার মন জয় করে ফেলে। কারণ একদিন সে এসে বলে, তার স্বামী একদিনের জন্যও আগের বিয়ে নিয়ে কোন কথা বলেনি।
এ সম্পর্কে লেখকের কিছু ফিলোসফিক্যাল কথা সকলের মনকে নাড়া দিয়ে যাবে। যেমন,

মানুষের করুণ-মর্মান্তিক-বেদনাময় অতীত নিয়ে যত কম কথা যায় ততই ভালো। সবচেয়ে ভালো হয় এ নিয়ে এ কবারেই কোন কথা না বললে। ব্যক্তি-মানুষের ইতিহাস আর জাতীয় ইতিহাস এক জিনিস নয়। জাতীয় জীবনে বা ইতিহাসে যতই করুণ-মর্মন্ত্তদ-বেদনাময়-গ্লানিকর ইতিহাস থাকুক না কেন, সেগুলো নিয়ে কথা বলতে হয়। অনুপুঙ্খ খুটিয়ে বিশ্লেষণ করে ভুলগুলো বের করতে হয়, তারপর ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হয়- যেন এ রকম ভুলের আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। এটাকেই বলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া। কিন্তু ব্যক্তি মানুষের জীবনে এই পদ্ধতি আরোপ করে কোনই লাভ নেই, বরং আছে বিপদ-বিপর্যয়। সময়ের প্রলেপ পড়ে যে বেদনা ও গ্লানি ধুসর হয়ে গেছে, সেই প্রলেপে আচোঁড় কেটে বেদনাগুলো আবার জাগিয়ে তোলার কোনো মানেই হয় না!

রুপকথার গল্পের মতো শুনে যাচ্ছে দাদুর কাছে সব কিছু। পরিবারের বন্ধনটা অবশ্য সে নিজে চোখের সামনে দেখেছে। দাদার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ। এমএ পাশ করা ছেলে গ্রামের গহীন কুষংঙ্কারাচ্ছন্ন পরিবেশে তার জীবন পার করেছে। আবার তিনি নাকি ভবিষ্যত বলে দিতে পারতেন। এ ব্যপারে তার প্রবল আগ্রহ দমিয়ে রাখতে পারে না। কিন্তু কেউ তাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। এটা কি করে সম্ভব?
যাইহোক। চরিত্রের পরিচয় পর্ব চলতে থাকে পুরো উপন্যাস জুড়ে। ফুপুদের গল্প। চাচাদের গল্প। সবার ছোট কাক্কু। যেই কাক্কুর প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা। বইয়ের পোকা কাক্কু যেন তার অনেক উত্তর দিয়ে দিতে পারে। তাকে ভালোবাসার চাদরে যেন তার কাক্কুই জড়িয়ে ধরতে পারে। তাকে যেন সবচাইতে ভালো বুঝতে পারে কাক্কু।যার প্রমাণ আমরা পাই, যখন কাক্কুর তৈরী করা নতুন বাড়িতে তার জন্য আলাদা রুমের ব্যবস্থা রাখে। তাও কি! যেমন তেমন রুম নয়। জানালা দিয়ে নদী দেখা যায়।এই কাক্কুর কাছে সে চির কৃতজ্ঞ। কারণ, বইয়ের নেশায় কাক্কুই তাকে ডুবিয়ে দিয়েছে।
তার আগে আসে মেজচাচার গল্প। তিনি একদম বাউন্ডুলে একটা মানুষ। সংসারের কোন কিছুতেই তার মন নেই। তবে পরিবারের বাচ্চাদের প্রতি তার অসীম স্নেহ। সবাইকে তিনি স্নেহ করেন। তাদের জন্য সাইকেল নিয়ে একটা ঘটনা থেকে বোঝা যায় তার মন কতটা স্নেহময়। তবে এই মেজচাচাই ছিল সবার অবহেলার একজন মানুষ। যার কোন মূল্যই যেন সংসারে নেই। বাউন্ডুলেদের মূল্য আসলে পৃথিবীর কোথাও নেই। কিন্তু এই বাউন্ডুলে স্বভাবের মানুষটি এমন একটি সময় ঘুরে দাঁড়ায় যখন একটি পরিবারের বৃদ্ধা মার মন অসহায় হয়ে যায়। আদরের বড় ছেলের পরিবার থেকে অনেকটা অবহেলা নিয়ে যখন সে ঘর থেকে বের হয়ে আসে তখন বাউন্ডুলে মেজ চাচা হয়ে উঠে গল্পের মূল চরিত্র। একদম জিরো থেকে হিরো যাকে বলে। অথচ বড় ছেলে অর্থাৎ মায়োপ্যাথিতে আক্রান্ত ছেলেটির বাবা একসময় জিরো থেকে হিরো হয় কিন্তু শেষমেষ তিনিই গল্পের জিরো-তে পরিণত হন। একসময়ের টানাটানির সংসার তিনিই একা সামাল দেন। পরে তার বাবা একদিন বলেন, সে এখন টাকার পেছনে ছুটে; কাল থেকে ওর পেছনে টাকা ছুটবে। ঠিকই তারপর দিন থেকে তার ভাগ্য বদলে যেতে থাকে। বিশাল আকৃতির ফ্ল্যাটে তার উঠে। একদম কোটিপতি পর্যায়ে চলে যায় সে।বাবা তো মারা যায়। কিন্তু তারপর মার প্রতি অবহেলার পর ধীরে ধীরে তার ভাগ্যর চাকা যেন বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। একদম জিরোতে নেমে আসেন তিনি। বিরাশ ফ্ল্যাট ছেড়ে তিনি উঠেন ছোট বাসায়। যেখানে মায়ের থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। ঠিক তখন বাউন্ডুলে মেজ চাচা এগিয়ে আসে। মাকে নিয়ে শুরু হয় তার সংগ্রাম। আর সেই মেজচাচার বাসাটি হয়ে উঠে সকলের কেন্দ্রবিন্দু। কারণ একটাই। মা আছে সেখানে।
মায়োপ্যাথি আক্রান্ত ছেলেটি কিন্তু এই ঘটনাগুলো শুধু শুনেই গেছে। মেজচাচার বাড়িতে সবাই যায়। সেই বাসা এখন সকলের কেন্দ্রবিন্দু। মেজচাচা সংসারের হাল ধরলেন। ছোটচাচা -চাচী উঠল সে বাসায়। এমনকি কাক্কু পড়াশুনা শেষ করে হল ছেড়ে চলে আসলো। কিন্তু গল্পের ট্র্যাজেডী এখনও বাকি আছে। হুট করেই মৃত্যুর মুখে পড়ল মেজচাচা। সবাই হতবাক। নিয়ম ভঙ্গ হলো। দাদার পরে দাদু, তারপর তার ফুপু, তারপর বাবা এভাবে মৃত্যুর নিয়ম হওয়া উচিত। কিন্তু কাক্কু একদিন বলেছিল, একমাত্র মানুষরাই নিয়ম ভঙ্গ করে। তাই মেজ চাচা নিয়ম ভঙ্গ করে হুট করে চলে গেলে। এ সব ছেলেটিকে কষ্ট দেয়। অবাক হয় সে। সংসারটা আবার একটা ভাঙনের মুখে পড়ে। তবে সে ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য এবার এগিয়ে আসে কাক্কু।
উপন্যাসের এ পর্যায়ে কাক্কু হয়ে উঠে নায়ক। তবে উপন্যাসের কোন জায়গায় তাকে জিরো দেখানো হয়নি। বরাবরই খুব চুপচাপ, ঝামেলা থেকে দূরে ছিল কাক্কু। কিন্তু নিয়তি তাকে এখন ঝামেলার মধ্যেই ফেলে দিলো। সংসার সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে থাকে সে। মেজচাচার মৃত্যুর পর দেখতে পায় লাখ টাকার ধার করে গেছেন তিনি। আরও বিপাকে পড়ে কাক্কু। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র সে নয়। নিষ্ঠা এবং মনের জোর যে মানুষকে সমস্ত শৃঙ্খল থেকে বের করে আনতে পারে তা আবারও আমরা দেখতে পাই। সেই সাথে তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাই তখন যখন দেখি, ব্যবসার পার্টনারের প্রতারনার মাধ্যমে লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার হাত থেকে কৌশলে ব্যপারটা হেন্ডেল করা দেখে।আর যাদের টাকা ফেরত দিতে পারবে না তাদের কাছে গিয়ে মাফ চেয়ে আসে। পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন কাজ মাফ চাওয়া। আর সেই কাজটাই কাক্কু করতে পেরেছে। এবং পৃথিবীতে মানুষ এখনও মানবতাবোধ নিয়ে বেঁচে আছে তা আমরা বুঝতে পারি যখন দেখি সবাই তাকে মাফ করে দেয়।
তবে গল্পের সবচাইতে আলোড়ন সৃষ্টির মুহূর্তটি হলো, গ্রামে মায়ের জন্য কাক্কুর বাড়ি তৈরি করা। দাদু একটা আব্দার ছিল, একান্নবর্তী পরিবারটিকে আবার জোড়া লাগানোর জন্য একটি বাড়ি দরকার। যে বাড়িতে সকলের শৈশব কেটেছে। সে বাড়িতো নেই। কিন্তু হারানো অনুভূতি সকলেই ফিরে পাবে যখন এমনই এক বাড়িতে তারা জোড়ো হতে পারবে। এবং এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে কাক্কু। মায়ের নামে জমি কিনে এক নিরব নদীর পাড়ে বানিয়ে ফেলে বাড়ি। যদিও শুরুতে সব ভাই-বোনদের মধ্যে একটা সন্দেহ ছিল যে এই বাড়িটি কাক্কু নিজের নামে করিয়ে নিবে নাকি। কিন্তু সকল কিছুর সন্দেহকে তুচ্ছ করে গড়ে তুলে বাড়ি। মায়ের নামে মায়ের জন্য বাড়ি। যদিও মা মাঝখানে ষ্ট্রোক করে বা-পাশ অবশ করে রেখেছে। কিন্তু সে বাড়িতে গিয়ে মা যেন জীবন ফিরে পেলো। উঠে দাড়ালো। আর তা দেখে মায়ের পায়ের নিচে বসে কাক্কুর কান্না মা-র প্রতি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
মেজচাচার মৃত্যুর পর বিধ্বস্ত কাক্কু নিজেকে সামলে উঠে উপন্যাসের নায়কে পরিণত হয়ে গেলো। মানুষ যতই বেদনায় কাতর হয়ে থাকুক না কেন; আপন মানুষের মৃত্যু যতই মানুষকে মুষড়ে দিক না কেন। মানুষ সবসময় জীবনের পক্ষে। মানুষ সবসময় যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখবে। এটাই মানুষের ধর্ম। কারণ, মানুষের কর্মই যে ছুটে চলা। ব্যস্তায় নিজেকে মগ্ন রাখা। কিন্তু গল্পের প্রধান চরিত্র গল্প কথক নিজেই অসহায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সবার কথা বলতে থাকে। বলতে থাকে মানুষের ছুটে চলা নিয়ে।

সবাই ছুটছে আর ছুটছে, কিসের আশায় ছুটছে, কোন গন্তব্যে পৌছানোর জন্য ছুটছে, হয়তো সেটা না জেনেই। ছুটে চলাটাই নিয়ম। বিশ্বজগতের সবকিছুই অবিরাম ছুটে চলছে। পৃথিবী ঘুরছে পৃথিবীর চারপাশে দ্রুতগতিতে, নক্ষত্রগুলো ক্রমশ একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, প্রসারিত হচ্ছে মহাবিশ্ব। সর্বত্রই ছুটে চলার ইঙ্গিত। কেবল আমরই কোন ব্যস্ততা নেই, ছুটে চলার সামর্থ্য নেই। আমারই কেবল অনন্ত অবসর, আমার হাতেই কেবল অফুরন্ত সময়। এই অবসর আর শেষ হয় না।

শুরুতেই বলেছিলাম, ভাঙনের পরিবারগুলো শুধু ভাঙনের মধ্য দিয়েই যায়। হুট করে বড় ফুপু প্রথম ষ্ট্রোকে চলে গেলো ওপারের জগতে। আবার সবাই হতবাক।আবারও যেন সব ছন্নছাড়া হয়ে উঠলো। যেখানে মায়ের দ্বিতীয় ষ্ট্রোকে চলে যাওয়ার কথা সেখানে চলে গেল মেয়ে প্রথম ধাপেই। আবারও যেন নিয়ম ভঙ্গ হলো। এবারও তার যাওয়া হলো না ফুপুর লাশ দেখার জন্য। মেজচাচাকে শেষ মুহূর্তে দেখতে পারেনি। এখন বড় ফুপুকেও দেখতে পারেনি। এ বেদনা সে বুকে বহন করছে। একসময় সে দাদুর সাথে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে। এবং অপারে দাদুও। আশ্চর্যজনকভাবে, শয্যাশায়ী দুজন মানুষ দু-প্রান্তে নিজেদের দেখতে চাইছে। যেই বৃদ্ধা এতদিন পুরো পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তিনিই যেন ধীরে ধীরে নুয়ে পড়া শুরু করেছেন। এই বিন্দুটির জন্যই তো পুরো পরিবার এখনও এক হয়ে থাকে। বিন্দুটি যদি বিলীন হয়ে যায় তবে তো সব শেষ। আবার ভাঙনের মুখ দেখতে হবে পরিবারটিকে। অবশেষে মায়োপ্যাথি আক্রান্ত ছেলেটি আশা করে আরেকটি নিয়ম ভঙ্গের। দাদুর আগে সে যেতে চায়। কিন্তু যাওয়া আর হয়ে উঠে না। মেয়ের মৃত্যুর ৪১ দিন পর বৃত্তের কেন্দ্রটি পাড়ি জমায় অন্ধকার জগতে। এই প্রথম ছেলেটি কেঁদে উঠে। নতুন তৈরী করা বাড়ির পাশে নির্জন নদীটির ধারে শুয়ে থাকে একা তার দাদু। সেই বাড়িতে এখন সব আছে। বাড়ি আছে, নদী আছে। শুধু নেই বাড়িটির কেন্দ্রবিন্দু।

অসাধারণ প্লটের উপর দাড়িয়ে তৈরী হওয়া এ উপন্যাস পড়তে গিয়ে পাঠককে মুগ্ধ হতেই হবে। এই উপন্যাসটিতে যে বিষয়টি সবচাইতে ভিন্ন ধাচের তা হলো, কোন চরিত্রের কোন নাম নেই। সম্পর্কগুলো দিয়ে পাঠককে বুঝে নিতে হবে। যেমন, বাবা-মা, দাদু, দাদা, মেজচাচা, সেজচাচু, কাক্কু, বড়ফুপু, ভাইয়া ইত্যাদি। এমন ধাচের উপন্যাস সচরাচর পড়া হয় না।

তবে উপন্যাসে কিছু বিরক্তি ঘটায়- দাদার অতি সাধক সুলভ আচরণ। ভবিষ্যত বলে দিতে পারা, ছেলের প্রতি তার সেই দোয়া- টাকা এখন থেকে ওর পেছনে ছুটবে। এমনকি মেয়ের প্রথম বিয়ের সময় বলে দিতে পারা- ছেলে বিয়ের কিছু দিনের মধ্যে মারা যাবে। এই বিষয়গুলো তুলে না আনলে হয়তো উপন্যাসটা আরও বাস্তববাদি হয়ে উঠতে পারতো।যদিও আমরা জানি অলৌকিক অনেক কিছুই মানুষ বিশ্বাস করে। তবে এগুলোকে কুষংস্কার নাকি অতি বাস্তব বলা যাবে তা নিয়ে অন্তত আমি কনফিউজ হয়ে পড়েছিলাম। এছাড়া সত্যিই অম্ল-মধুর এই উপন্যাস ব্যতিক্রমধর্মী।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29229503 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29229503 2010-08-25 15:50:03
আত্মহত্যাকে “না” বলুন! বাংলাদেশে দিন দিন আত্মহত্যার হার বেড়েই চলছে। স¤প্রতি একটি পত্রিকায় দেখলাম, শহুরে ১৪ শতাংশ নারী আত্মহত্যার কথা ভাবেন। আর এর অধিকাংশই হলো বিবাহিত। ব্যপারটা খুবই উদ্বেগের। জুরাইনের ফারজানা রিতা তার দুই সন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এই ঘটনা বর্তমানে বলতে গেলে টক-অব-দ্যা-সিটি। প্রতিদিন নিত্য-নতুন তথ্যে পত্রিকাগুলো পাঠকদের চমকে দিচ্ছে। কালের কন্ঠ রিতার ডায়রী থেকে অংশবিশেষ প্রকাশ করছে। তার উপর দিনের পর দিন কিভাবে অত্যাচার হয়েছে তা-ই ফুটে উঠছে লেখায়। তবে এখানে প্রশ্ন হলো, রিতা শশুরবাড়ির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অন্য কোন উপায় অবলম্বন না করে কেন আত্মহত্যাকেই বেছে নিলেন। আর তিনি বেছে নিয়েছেন তা বুঝলাম। কিন্তু রিতার বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলা যায় যে, তিনি তার দু-সন্তানকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। কারণ, নাবালক দুই সন্তান জীবনের মানেটাই তো এখনও বুঝতে শেখে নি। তারা আত্মহত্যা করবার মতো এমন সিদ্ধান্তে যাবে কেন? রিতা তার ডায়রিতে সমাজকে উল্লেখ করে লিখেছে, নিজের চেয়ে বেশী কাউকে ভালোবাসবেন না। কিন্তু রিতা নিজেকে ভালোবাসার প্রমাণ দিয়ে যেতে পারেন নি। এমনকি ডায়েরিতে এও বলেছেন, তিনি তার দুই সন্তানকে অনেক ভালোবাসেন। সেটারও প্রমাণ তিনি দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। আত্মহত্যার পাশাপাশি তিনি হত্যাতেও লিপ্ত হয়েছেন। আর তা হলো তার দু-সন্তানকে হত্যা। এটাও অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে, তিনি আত্মহত্যার পূর্বে তার দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন কিনা। কিন্তু পুলিশ কিংবা আমাদের সমাজ সে বিষয়ে ভাবছেই না। যা ভবিষ্যতে আত্মহত্যার প্রবণতাকে উস্কে দিতে পারে। মানুষ এমন ভাবতে পারে, আত্মহত্যাই সমস্ত সমস্যার সমাধান এবং অন্যকে শাস্তি দেয়ার একটা উপায়। তখন তো সমাজের জন্য তা অবশই মঙ্গলকর নয়। যে কোন সমস্যার মূলে আমাদের পৌছানো উচিত। আমরা মূলে পৌছাই না। তারা আত্মহত্যা করেছেন এবং শশুরবাড়ি দায়ি। সুতরাং শশুরবাড়ি লোকদের শাস্তি। ঘটনা এখানেই শেষ। কিন্তু এমন কয়টা ঘটনা শাস্তি দিয়ে থামানো যাচ্ছে? এই প্রশ্নও তো আসতে পারে। যেতে হবে মানুষের মনের গভীরে। সেখানে কি চলছে? মানুষ কেন আত্মহত্যাকে বেছে নিচ্ছে? ঠিক কখন মানুষ আত্মহত্যার কথা ভাবেন? কিভাবে তাদের কাউন্সিলিং করা যেতে পারে? পরিবারের সদস্যরা কিভাবে তাকে সাপোর্ট করবে? মানুসিক অশান্তিগুলো কি কারণে তৈরী হচ্ছে? সেই কারণগুলো সমাধানের উপায় কি? বর্তমানে পরকিয়ার জন্য শহরে অনেক সংসার ভেঙে যাচ্ছে। একজন মানুষ ঠিক কখন পরকিয়ার আশ্রয় নেয়? পরকিয়া প্রেম থেকে কিভাবে তাকে সরিয়ে আনতে হবে? মানুষ যাতে পরকিয়া প্রেমকে শান্তির আশ্রয়স্থল না ভাবে সে ব্যপারে কি করা যেতে পারে? সমাজের মানুষকে এসকল অবক্ষয়ের হাত থেকে কিভাবে রক্ষা করা যেতে পারে সেটাও বের করতে হবে।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদেরই খুজে বের করতে হবে। সরকারের উচিত হবে, মনোবিজ্ঞানীদের সহায়তা নেয়া। তারা সমাজের এই কালো জায়গাগুলো থেকে বের হওয়ার পথ বের করুক। কারণ, বিগত মাসখানেক ধরে চলছে, হত্যা, আত্মহত্যা। আর ইভটিজিং তো বর্তমানে চরমে পৌছে গেছে। এছাড়াও তো কিছুদিন আগে মায়ের পরকিয়ার কারণে পুত্রকে প্রাণ দিতে হয়েছে। যদিও মা বলছে সে পূত্র হত্যার সাথে জড়িত নয়। কিন্তু তিনি হত্যাকান্ডটির একটি কারণ। এ সবই মানুষের মস্তিষ্কের বিকৃতি। মানুষ অস্থির হয়ে উঠছে। মানুষের অস্থিরতায় ফাঁদে পড়ছে তারা নিজেরাই। যার কারণে হত্যা এমনকি নিজেকে হত্যা করতেও তারা পিছ-পা হচ্ছেন না।

২.
রিতার ডায়েরির ২য় পর্ব পড়ে মনে হয়েছে রিতার অসহায়ত্ব। অসহায় রিতার বাবা নাই; শক্ত ভিত নাই। তাই স্বামির এবং শশুরবাড়ির মানসিক অত্যাচারে সে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। রিতার মতোই বাংলার অসংখ্য পরিবারে অসংখ্য নারীরা রয়েছেন। তাদের গল্প কেউ জানছে না। পরিবারের মান-সম্মান রক্ষার্থে চুপ মেরে আড়ালে কাদছে। তাদের কান্নার শব্দ কেউ পাচ্ছে না। পরিবারের সম্মানের কথাটা এ জন্য বললাম কারণ, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি মেয়ের সংসার ভেঙে যাওয়ার ঘটনা খুব একটা ভালো চোখে কেউ দেখে না। আবার পুলিশের কাছে অভিযোগ দিতে গেলে হাজারো প্রশ্নের সম্মুক্ষিণ হতে হবে। আদালতে নোংরা নোংরা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। আর যদি কোন মতে তা মিডিয়াতে চলে আসে। তাহলে তো কেল্লা ফতে। চোদ্দ পুরুষের ইতিহাস ছাপবে পত্রিকায়। এ সবই আমাদের সামাজিক বাধা। আমাদের মিডিয়াকে বুঝতে হবে, তারা কি অন্যায়ের বিপক্ষে প্রতিবেদন দিচ্ছেন নাকি একটি মানুষের অতিত ইতিহাসের গল্প অন্যকে বলছেন। মানুষকে মটিভেট করা হচ্ছে না। কিংবা সেই মেয়েটির পাশে মিডিয়া পুরোপুরি যাচ্ছে না। তারা থেকে যাচ্ছে মেয়েটির সাথে অতিতে কি হয়েছে শুধু সেই ঘটনার মধ্যেই। কিন্তু মেয়েটির বর্তমান মানসিক অবস্থা কেউ ভেবে দেখে না। যেমন, রিতার কথাই যদি বলি, রিতা ডায়েরি লিখেছেন। সে ডায়েরি প্রকাশ হচ্ছে পত্রিকায়। আমার মতে, একজন মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি এভাবে প্রকাশ হওয়া অনেকটা উলঙ্গ হয়ে যাওয়া। আর তাছাড়া সুইসাইডাল নোট কিংবা ডায়েরি প্রকাশ হলে অনেকের মতে উল্টো প্রতিক্রিয়াও ঘটতে পারে। যেমন, যারা জীবনটাকে অনেকটা সিনেমেটিক ভাবেন কিংবা স্বপ্নের দুনিয়ায় বাস করেন; বাস্তবতার সাথে যাদের দূরত্ব অসীম। তারা এসকল ব্যপারগুলোকে ব্যবহার করতেও উৎসাহিত হবে। এর মানে অনেকটা এরকম দাড়ায়, আমি যদি রোমাঞ্চকর একটি নোট কিংবা ডায়েরির পাতা লিখে ভরাতে পারি তারপর আত্মহত্যা করতে পারি তবে আমাকে অত্যাচারকারী শাস্তি পাবে। আমাদের সমাজে অবশ্যই এ ধরনের মনোভাব গড়তে দেয়া যাবে না। আমার নিজেরও অনেক বন্ধুর কাছে শুনেছি তাদের প্রেমিকারা কিছু থেকে কিছু হলে আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে বসে। এই মনবৃত্তি থেকে সমাজকে বের করে আনতে হবে। আত্মহত্যা যদি আইনগতভাবে অপরাধই হয় তবে তার নোট কিংবা ডায়েরি প্রকাশের তো কোন দরকার নেই। কারণ মৃত ব্যক্তিটিও অপরাধি। আত্মহত্যাকারীর প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টি দেয়াও আমাদের বন্ধ করতে হবে। যাতে করে যারা আত্মহত্যাপ্রবণ মানসিকতা বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা সাবধান হয়ে যায়। আত্মহত্যাই সমাধান নয়। আমাদের মিডিয়াকেও আত্মহত্যাকে “না” বলার প্রচারণা চালাতে হবে। সমাজে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আনতে হবে। এবং সকলকে বুঝতে দিতে হবে, আত্মহত্যাকারী এবং যার কারণে আত্মহত্যার পথ অন্যে বেছে নেয় দু-জনই সমান অপরাধী। সমাজিকভাবে এর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে হবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29204329 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29204329 2010-07-21 00:52:51
কেসলারের ল'অব কোয়েন্সিডেন্ট: বাংলাদেশের বর্তমান নারী এবং সামাজিক অবক্ষয়! কেসলারের ল’অব কোয়েন্সিডেন্ট বলে একটি কথা আছে। এই ল’ যা বলতে চায় তা হলো, পৃথিবীতে কোন একটি জায়গায় একই ঘটনা হঠাৎ করে বার বার ঘটতে থাকে। এই ল’কে অনেকে বলেন, দিস ইজ রেয়ার ল’ অব কোয়েন্সিডেন্ট। অর্থাৎ এই ল’ সচরাচর ঘটতে দেখা যায় না।

বাংলাদেশে বিগত কয়েকদিন যাবত যে এই ল’অব কোয়েন্সিডেন্ট ঘটছে; তা কি কেউ লক্ষ্য করেছেন? একই ঘটনা কিংবা বলতে পারেন একই বিষয়ভিত্তিক ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে। কিছুদিন আগে গুলশানে এক দম্পতিকে গুলি করে হত্যা করেছে দুই ঘাতক। বিষয় ছিল প্রেম! ২৪ মার্চ গুলশানের কালাচাঁদপুরের বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রধারী দুই তরুণ এই দম্পতিকে গুলি করে। নিহত সাদেকুর রহমানের স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় এলাকার বখাটে ছেলে রুবেল। কিন্তু সে প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার অপরাধে নিহত হতে হলো সাদেকুর রহমানকে ও তার স্ত্রীকে।

আবার, চট্টগ্রামে একটি মেয়ে পাখি শিকারীদের পাখি শিকার করতে বারণ করায় নিজেই শিকার হয় গুলির। ঘাতকরা তাকে বলেই গুলিটা করে। তাকে বলা হয়, আয় তাইলে তোরেই শিকার করি। এখানে হয়তো বিষয় প্রেম নয়, তবে এখানে বিষয় হচ্ছে, নারীর উপর হামলা। প্রাণে মেয়েটি বেঁচে গেছে ঠিকই কিন্তু নষ্ট হয়েছে তার অমূল্য একটি চোখ।

থেমে থাকে ঘটনার চক্র। ২৬মার্চ রহস্যজনকভাবে বান্ধবীকে ধারালো চাপাটি দিয়ে আঘাত করলো আশরাফ নামে এক যুবক।। প্রেমিকা ইশিকার পিতার কাছে বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হয় শুধুমাত্র অর্থের কারণে। তাই বান্ধবী এবং বান্ধবীর পরিবারকে জিম্মি করে ২০ লাখ টাকা দাবি করে ছেলেটি। তারপর পুরো পরিবারকে আকষ্মাত হামলা করে আশরাফ।

গতকাল ৬মার্চ ইলোরা নামে এক স্কুল ছাত্রী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। কারণ হচ্ছে, উত্তক্ত করছে বখাটেদের দল।

সর্বশেষ আজকে পত্রিকায় দেখলাম, প্রেমে সাড়া না পেয়ে বখাটেদের দেওয়া আগুন নিয়ে পুকুরে ঝাপ দিয়েও বাচতে পারলো না স্কুল ছাত্রী পিংকি।

এধরনের ঘটনা অনেক আছে। হচ্ছে। যেগুলো মিডিয়া কাভারেজ পাচ্ছে সেগুলো হয়তো আমাদের চোখে আসছে। কিন্তু অন্ধকারে ঘটছে আরও ঘটনা। নারীরা চাঁদে পর্যন্ত চলে গেছে। তাঁরা প্রমাণ করতে পেরেছে তারা পুরুষের সমকক্ষ। কিন্তু তারপরও কোথায় যেনো তারা পিছিয়ে রয়েছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি ৫১ মিনিটে একটি করে মেয়ে ছেলেদের দ্বারা উত্তক্ততার শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে ৩২ ভাগ নারী হচ্ছে স্কুল পড়ুয়া। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে বাংলাদেশের অবস্থা কি করুণ পরিণতিতে পৌছাচ্ছে।

পুরুষরাও যে নানাভাবে প্রতারিত হচ্ছে না তাও কিন্তু নয়। যেমন, ১ এপ্রিল দৈনিক সমকালে দেখলাম, সিলেটে এক স্ত্রীর ত্রিভুজ প্রেমের বলি হলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ইমতিয়াজ হোসেন মন্টু নামে এক ব্যক্তি। স্ত্রীর পরকীয়ায় বাধা হওয়ার কারণে পরিকল্পনা করে তাকে হত্যা করা হলো।

এছাড়াও ২৬মার্চ আশরাফের ঘটনাটির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সামাজিকভাবে ইশিকার পরিবারের তুলনায় আশরাফ অনেক গরীব। এমনকি জমি-জমা বিক্রি করে আশরাফকে লন্ডনেও পাঠায় তার গরীব পিতা। কিন্তু ইশিকার ভালোবাসার টানে সে ফেরত আসে। অবশেষে ভাগ্যের কাছে তার এই পরিণতি।

ঘটনার গভীরতায় যাই থাকুক না কেন! আসল কথা হচ্ছে ধীরে ধীরে মানুষের মনুষত্ববোধ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একবাক্যে বলতে গেলে মানুষগুলো সব জানোয়ার হয়ে যাচ্ছে। যত আইন পরিবর্তন কিংবা যত অধিকার আন্দোলন করি না কেন তাতে কোন লাভ নেই। জানোয়ারদের জন্য আইন বা আন্দোলন করে খুব একটা সুবিধা করতে যাবে না।
ইভটিজিং ছাড়াও এই দেশে যে হারে পরকিয়া প্রেম বেড়েই চলেছে তাতে তো সামাজিক অবক্ষয়ও সর্বনিম্নে পৌছে গেছে। কতগুলো পরিবার এই পরকীয়া প্রেমের শিকার হচ্ছে তা পরিসংখ্যান দেখলে হয়তো রীতিমত ভড়কে যেতে হবে।

একদম যদি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে যাই তাহলে ব্লগে না আলোচনা করাটাও আমার পারিবারিক বাধা। আমার মতো আরও কত পরিবার আছে যারা মান-সম্মানের ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। ভেতরে আগুন জলে কিন্তু মুখে মিষ্টি হাসি। সে আগুনের ধোয়াও কেউ অনুভব করতে পারে না। পরিবারের একটাই কথা, সাংবাদিক আসবে...নানান ধরনের প্রশ্ন করবে....আদালতে যেতে হবে.....উকিলের বিছরি বিছরি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে..... অন্যকে উলঙ্গ করতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিত্বকেও উলঙ্গ করতে হবে.... এই চাপে সহ্য করতে হবে.... পাল্টা মিথ্যা অভিযোগের জবাব দিতে হবে..... এতো সব আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের দারা হবে না।

আমার পরিবারের মতো এই মতামত হয়তো বাংলাদেশের হাজার পরিবারের। কত মা, কত বাবা, কত ভাই দেখছে একটি মেয়ের স্বপ্ন ধ্বংসের করুণ চিত্র তা হয়তো রয়ে যাবে সব সময় অন্ধকারে।
তাই সুপ্রিয় ব্লগারবন্ধুদের বলতে চাই, এক কালো ব্যাধি আকড়ে ধরছে আমাদের সমাজকে। প্রতিদিনের চিত্র বলছে সে কথা। সন্ত্রাস কিংবা চাঁদাবাজ কিংবা ছাত্রলীগ তান্ডব কিংবা রাজাকার ইস্যূ সব কিছুর উর্ধে এই সমাজ। সমাজের ভেতরে কুরে কুরে নোংরা কীট খেয়ে ফেলছে অনেকগুলো পরিবারকে। রক্ষা করতে হবে......না হলে, সেই কেসলারের ল’অব কোয়েন্সিডেন্ট ঘটতেই থাকবে। রেয়ার কেস স্ট্যাডিতে থেকে যাবে বাংলাদেশের নাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29130562 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29130562 2010-04-07 14:07:49
নিঃসঙ্গ থাকা দু'জন লেখকের গল্প রুমের দরজা বন্ধ। আমার রুমের বাইরে আমার বাবা-মা-বোন। কি করছে কে জানে। আমি কি করছি তারাও তো জানে না। রুমের ভেতর অন্ধকারে ছেলের হতাশা-দুঃখ ঘেরা মন তাদের বোঝার সাধ্যে নেই হয়তো। কিংবা আছে। বোঝে। প্রশ্ন করে না। আমার ভাবনার আশপাশ দিয়ে যেতে হয়তো তাদেরও ইচ্ছে হয়। কিন্তু গম্ভীর ছেলের কাছে হয়তো প্রশ্ন করবার সাহস পায় না।
মাঝে মাঝে এসব কথা মাথায় ঘুরপাক খায়। আর ভাবি, পৃথিবীর এই যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিজের পরাজিত দেহটিকে কতদিন আর বয়ে বেড়াতে হবে। আবার মাঝে মাঝে মনে হয়, যুদ্ধ কি আদও করছি? নাকি যুদ্ধে যাওয়ার আগেই ভয়বহতা চিন্তা করে হতাশায় ভুগছি। কখনও মাথায় আসে এ পৃথিবীর মানুষগুলো যান্ত্রিক হয়ে যেভাবে মন নামক অংশটাকেও যান্ত্রিক করে তুলেছে তাতে তো মন দিয়ে ভাববারও সময় হাতে নেই। আমরা মানুষ? নাকি যন্ত্র? তাও মাঝে মাঝে প্রশ্ন হয়ে দাড়ায়। অবশ্য অন্যের কথা বলবার অধিকার তো আমার নেই। তাই নিজের কথা বলাই ভালো। বলবো, আমি কি মানুষ নাকি কোন যন্ত্র? নিজেকে প্রশ্ন করি। হাজারো প্রশ্ন যখন ঘুরপাক খায় তখন নিজের ভেতর শূণ্যতা ছাড়া আর কিছুই অনুভব করতে পারি না। এমনকি অনুভব করতে গিয়ে অস্থির হয়ে যখন চারিপাশে তাকাই, তখনও দেখি চারিপাশ ফাঁকা। হয়তো এমন ফাঁকা জায়গায় আমি দাড়িয়ে আছি। কাউকে খুঁজছি কিনা তাও বুঝতে পারি না। হয়তো খুঁজে। কেউ হয়তো পাশে ছিলও বটে। হয়তো আমার জটিলতায় সেই কাছের মানুষের থাকাটাতেও আমি অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। তাকেও মাঝে মাঝে হয়তো আমার কাছে একটা প্রশ্নবোধক মনে হতো। সেই প্রশ্নবোধক চিহ্নের সামনে গেলে আমি আরও জটিলতায় পড়তে থাকতাম। হয়তো কিছুই অনুভব করতাম না।
জীবনের এ অবস্থানে দাড়িয়ে কে কি করে তাও জানি না। মাঝে মাঝে ওরহ্যান পামুকের কাছে ফিরে যাই। তাঁর লেখার ফাঁদে পড়ে নিজের ফাঁদে পড়াটাকে ভুলে থাকবার চেষ্টা করি। চেষ্টা করি উঠে দাড়াতে। সেখানে আমার দুঃখ ঢেলে দিতে পারি না। বরং আরও দুঃখে কেপে উঠি। পামুক খুব একা থাকতে পছন্দ করতেন। একা থাকাটা তার কাছে ক্ষুধার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। সারাদিনের একটি সময় একা থাকতে না পারলে ক্ষুধার্ত মানুষের মতো তিনি হাহাকার করে উঠতেন। তবে এ ক্ষুধা সাহিত্যের জন্য নয়। এ ক্ষুধা নিজের চিন্তা ভাবনা নিয়ে একা থাকার ক্ষুধা। পামুক হয়তো নিজের চিন্তার সাথে কথা বলতেন। তাই একা থাকার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন। নিজের বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলোকে তিনি সেই একা সময়ে সাজাতেন হয়তো। হয়তো চিন্তাগুলোকে তিনি প্রশ্ন করতেন কে কোথায় যেতে চায়। কিভাবে থাকতে চায়। তারপর সেভাবে তাদের সাজাতেন। সেই ভাবনাগুলোই গল্প হয়ে যায়। উপন্যাস হয়ে যায়। কন্ঠস্বর হয়ে যায়। ভাবনাগুলোর এই খেলা হয়তো পামুক পছন্দ করতেন। কারও কল্পনা যখন মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যায় তখন কল্পনা জীবন লাভ করে। যে কোন লেখকের জন্য এ পাওয়া আকাশ ছোয়া। এই সৃষ্টিশীল প্রতিভার জন্যই হয়তো বলা হয়, প্রতিভা বিধাতার দান। মানুষ মরে যাবে। তার দেহ মিশে যাবে এ মাটিতে কিন্তু তার প্রতিভা অমরত্ব পাবে। প্রতিভার কখনও মৃত্যু নেই। তাইতো লেখকদের মানুষ ভিন্ন চোখে দেখে। মানুষ হিসেবে কিংবা বলতে হয় আপন মানুষ হিসেবে লেখকদের অনেকেই পছন্দ করে না। কারণ আছে। ব্যাখ্যাটা ঠিক মতো দিতে পারবো কিনা জানা নেই। তারপরও চেষ্টা করা যাক। ধরুন, কোন লেখক তার লেখায় একজন নারীর উলঙ্গ অবস্থানের কথা বর্ণনা করলেন। সেই লেখা যদি লেখকের মা পড়েন তখন বিষয়টা কেমন হবে। মাতৃঅনুভুতি কি সেই দৃশ্য মনে করতে পারবেন? তার ছেলে লিখেছে এমন বিষয়ে, মা তখন কত কি ভেবে বসবেন ছেলে সম্পর্কে। ব্যাপারটা অনেকটা এমনই। যেমন, ওরহার পামুকের পিতাও একজন লেখক ছিলেন। কিন্তু কখনও তিনি তার পিতার কোন লেখা পড়েননি। অরহান পামুকের নোবেল ভাষণের বিষয় ছিল, আমার বাবার স্যুটকেস। সেখানে বাবার স্যুটকেসে রাখা বাবার সব অদেখা লেখার বর্ণনা তিনি বলেছেন। তিনি হাজার চেষ্টা করেও বাবার স্যুটকেসটি খুলতে পারেননি। কারণ, বাবাকে তিনি বাবা হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন। লেখক হিসেবে নয়।
আমার লেখা অনেকটা ওরহান পামুক কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। আমি কেন জানি অদৃশ্যভাবে এই লেখকের ভাবনার সাথে নিজের ভাবনার একটা বিশদ মিল খুজে পাই। তাই হয়তো ঘুরে ফিরে তার কাছেই যেতে হয়।
আরেকজন মানুষ আছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। পদ্মানদীর মাঝি দিয়ে যার সাথে পরিচয়। এরপর কত কি পড়লাম। বাংলা সাহিত্যের এই বিশদ সহিত্যজ্ঞানীকে মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় দেখার। কিন্তু বাস্তবতা তো আর তা না। পুতুলনাচের ইতিকথার যাদবের মৃত্যুর পর সেই অসাধারণ উক্তি। লেখক পাঠকের হৃদয়কে চির করে যখন কোন কথা বলে বসেন। পাঠককে যখন মাতাল করে তুলেন মৃত লেখক তখন যেনো জীবিত হয়ে উঠে লেখক স্বয়ং। তাই যাদববের মৃত্যুর পর মানিক যখন উল্লেখ করলেন, সত্যি-মিথ্যায় জড়ানো জগৎ। মিথ্যারও মহত্ব আছে। হাজার হাজার মানুষকে পাগল করিয়া দিতে পারে মিথ্যার মোহ। চিরকালের জন্য সত্য হইয়াও থাকিতে পারে মিথ্যা।
এসময় মনে হচ্ছিল, মানিক আমার কানের কাছে এসে বলছে এসব। বলছে, চিরকাল সত্য হইয়াও থাকিতে পারে মিথ্যা। তখন মনটা উদগ্রিব হয়ে উঠে। চিৎকার করে বলতে চায়, মানিক তুমি কি করে ভাবলে এ কথা। মানুষের জীবনের মহত্ত্বকে তুমি বুঝলে কিভাবে?
হঠাৎ মানিকের পুত্রের একটি সাক্ষাতকার হাতে পাই। মনটা নেচে ওঠে। এ যে মানিকের উত্তরসূরি। এ যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ে ছেলে। তারই রক্ত। সুকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বলে তার বাবার কথা। মনটা বলে ওঠে। কিভাবে লিখতেন মানিক। সে সময়ে বর্ণনা কিছু পাবো কি সুকান্তের কাছে?
সুকান্ত বলে, কখনও বাবাকে দেখেছি ওই ঘরের সামনের ছোট্ট বারান্দায় বসে প্রশস্ত মাঠটির দিকে প্রসারিত দৃষ্টিতে একান্ত চিন্তা মগ্ন, হয়তো মানসপটে অঙ্করিত হচ্ছে ইতিকথার পরের কথা, আরোগ্য, তেইশ বছর আগে পর, হলুদ নদীর সবুজ বন - এর মতো উপন্যাস বা বিচার, উপায়, কালোবাজারের প্রেমের দর, আর না কান্নার মতো গল্প।
মনটা উত্তর পায় না। এ মন উত্তর চায়, পুতুলনাচের ইতিকথার উপন্যাস কিভাবে গল্প থেকে উপন্যাস হয়ে ওঠে। কিংবা পদ্মপাড়ের মানুষগুলোকে নিয়ে কি ভেবে হঠাৎ লেখক লেখা শুরু করলেন। তবে লেখকের একটি শুরু থাকে। যখন একজন মানুষ লেখক হয়ে ওঠেন তখন তার শুরুটা জানবার আগ্রহ সকলেরই মাঝেই আছে। যেমন, সুকান্তকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কবে প্রথম বুঝলেন, যদি মনে করতে পারেন, আপনার বাবা একজন প্রখ্যাত লেখক?
উত্তরে সুকান্ত খুব ভালো উত্তর দিতে পারবে না এও স্বাভাবিক। তারপরও সুকান্ত বলেন, স্তুূপাকারে কাগজপত্রের ভিড়, নানান বইপত্র চারপাশে, কলম হাতে একজন মানুষ লেখার টেবিলে সর্বোপরি ইতস্তত ছাপার অক্ষরে লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। এভাবেই বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি উনি লেখক। আর কাগজপত্রের অক্ষরে মাঝে মাঝেই নাম দেখতে পেলে বিখ্যাত বা প্রখ্যাত মনে তো হবেই।
এসব কথা মানিকের সন্তানের মুখে আসবে তাই স্বাভাবিক। হয়তো লেখক হয়ে উঠার গল্প জানতে পারবে মানিকের বাবা। সে সম্পর্কে সুকান্ত বলেছে, আমার ঠাকুরদা (মানিকের পিতা) ছিলেন যথেষ্ট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ এবং অনেকাংশে সংস্কারমুক্ত। বাবার প্রয়াণের দু’বছর পর তিনি প্রয়াত হন। ইতিমধ্যেই তিনি প্রত্যক্ষ করেন একই ঘরের ক্যানভাসের পার্টিশনের ওপাশে কৃতীপুত্রের অকাল প্রয়াণের প্রস্তুতি।
হ্যা। অকাল প্রয়াণ। মানিক অকালে ঝরে গিয়েছিলেন। ২৬ বছর বয়স থেকে মানিক মৃগি রোগী ছিলেন। অধিক সাহিত্য সাধনার ফলেই মানিকের এ রোগ। সুকান্ত বলে, তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ তিন উপন্যাস, দিবারাত্রির কাব্য, পদ্মানদীর মাঝি এবং পুতুলনাচের ইতিকথা এ সময়ের মধ্যেই বেড়ে উঠেছে।
বোঝা যায় মানিকের শক্তি। দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাহিত্য সাধনায় ছিলেন অবিচল। তার রোগের কথা বলতে গিয়ে সুকান্ত বলেন, এই রোগের আক্রমণে তাঁকে প্রায়ই দেখেছি রক্তাক্ত হতে। হয়ত বাবা তাঁর লেখার টেবিলে, মা এবং আমরা ভাইবোনেরা পাশের ঘরে। হঠাৎ গোঙানীর আওয়াজ- মা দিদিরা ছুটে গিয়ে বাবার মুখে গামছা গুজে দিচ্ছেন। যদিও ইতিমধ্যে প্রবল খিঁচুনিতে মুখের ভিতর রক্তপাত ঘটে গিয়েছে। এমনও হয়েছে, পড়ে গিয়ে মাথা ফেটেছে। ফলে দিনের পর দিন বাবার অসুস্থতা, রক্তাক্ত হওয়ার দৃশ্য, কখনও বা মদ্যপানে ঝিমিয়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রতক্ষ করার ফলে কিছুটা মানসিক প্রস্তুতি হয়ত ছিল আমার।
এভাবেই মানিক মৃত্যুর কোলে ধীরে ধীরে ঢলে পড়েন। কিন্তু নিজের লেখায় কখনও মানিককে অসুস্থ মনে হয়নি। পাঠকের কাছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও অমর। এখনও অবিচল।
নিঃস্বঙ্গ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যকে স্বয়ং সম্পূর্ণ করে গেছেন। অপর দিকে অরহান পামুক নিঃসঙ্গ থেকেও এখনও পৃথিবীর সাহিত্যকে উজ্জল করে চলেছেন। এমনই হয় হয়তো। নিঃসঙ্গতা মানুষকে কিছু দিয়ে যায়। দান করে অমরত্ব। অথচ বুকের ভেতর পুতে রাখা হাজারও হতাশা রয়ে যায় অপ্রকাশিত।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29119830 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29119830 2010-03-19 23:34:56
রম্যরচনা: প্রসঙ্গ-তৈল পদার্থ কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, পানির অপর নাম কি? উত্তরটা সকলেরই জানা। উত্তরে অবশ্যই আসবে “জীবন”। পানি ছাড়া এ পৃথিবী এক মুহূর্ত কল্পনা করা যায় না। মাটির তলদেশের পানি, পুকুরের পানি, নদীর পানি, সমুদ্রের পানি। সব স্তরের পানি এ পৃথিবীকে টিকিয়ে রেখেছে তা নিঃসন্দেহে বলে দেয়া যায়। আমি যদি বলি, সমুদ্রের পানি মানুষ ব্যবহার করতে পারে না। তাই সমুদ্র এ পৃথিবীতে না থাকলেও চলে। সমুদ্র এ পৃথিবীতে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশী করে। বন্যা হয়, জলোচ্ছাস হয়, সুনামী হয়। এমনও ধারনা করা হয়, একদিন আমাদের এই ছোট্ট বাংলাদেশও নাকি চলে যাবে সমুদ্রের তলদেশে। তারপরও যে যাই বলুক। পানির অপর নাম জীবন।
এবার আসি ভিন্ন প্রসঙ্গে। মানে, অন্য একটি জরুরী বিষয়ে। বিষয় হচ্ছে, তৈল। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সবচাইতে প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে “তেল”। যে নারীর কেশ সুন্দর। তাকে প্রথমেই প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি তেল ব্যবহার করেন? যে নারীর রান্না ভালো, তাকেও প্রশ্ন করা হয়, আপনি কোন সয়াবিন তেল দিয়ে রান্না করেন? তার মানে কি দাঁড়ালো? তেল ছাড়া নারীর কেশ বলেন আর রান্না বলেন, দুইটাই কিন্তু অসম্ভব। আবার যদি অন্যদিকে তাকাই! যেমন- ধরুন, গাড়ী। গাড়ী কি তেল ছাড়া চলবে? যতই সি.এস.জি চালিত হোক না কেন! তেল ছাড়া গাড়ী কোন গাধাই চালাবে না। সব বাহন, উড়োজাহাজ বলেন আর জাহাজ বলেন। তাও তেল। ঘোড়ার গাড়ী (ঘোড়ার গাড়ীর চাকাতে তেল দিতে হয়) থেকে বর্তমান প্রযুক্তির সব কিছু তেল ছাড়া চলবে?
এই জরুরী তেলও অনেক অশান্তির সৃষ্টি করে। ২০০১-এ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেন, ‘এটা অনেকটা স্পষ্ট যে আমার দেশ, বিদেশী তেলের উপর নির্ভর করে। বেশীরভাগ তেল আমাকে আমদানি করতে হয় বাইরের দেশ থেকে। যা অনেক সমস্যার সৃষ্টি করে।’ এই বক্তব্যের পরের গল্পটা সকলেরই জানা। ইরাকে প্রচুর তেল সম্পদ আছে। আর সেই তেল ভান্ডার দখল করতে ঝরেছে তেলের চেয়েও অধিক রক্ত। সুতরাং তেলের জন্য যুদ্ধ পর্যন্ত এ পৃথিবীতে হয়ে গেলো। এতো গেলো, তেলের গল্প। এবার আসি ভিন্ন ধরনের তেলের গল্পে। তেল যে শুধু পানির মতই তৈল পদার্থ তা কিন্তু নয়। অদৃশ্য তেলও আছে এ পৃথিবীতে। সেটা হলো, কথার তেল। কথা দিয়ে মানুষের মনকে জয় করতে পারাটাই হলো কথার তেল। অধিক আনুগত্য প্রকাশ করাটাকেও বলে তেলবাজি। এধরনের তেল আছে বহুপ্রকার। তেলকে ঠিক কি বলে সংজ্ঞায়িত করা যাবে তা আমার জানা নেই রে ভাই। তবে, কিছু মহান মানুষের উক্তি তুলে ধরতে পারি। যেমন, জ্যান পাওল নামে এক মার্কিন তেল কম্পানির প্রতিষ্ঠাতা বলেছেন, ‘জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সূত্র হলো, ঘুম থেকে ভোর বেলা জেগে ওঠা, প্রচুর কাজ করা, এবং অন্যকে তেল দিতে পারা।’
শুধু এই মার্কিন তেল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতাই নয়। একজন মার্কিন সিনেটর বলেছেন, তেল হচ্ছে তলোয়ারের চেয়ে শক্তিশালী।
অর্থাৎ সকল বাধাকে ডিঙ্গিয়ে যেতে পারে তেলমারা কথামালার বৃষ্টি ঝরিয়ে। প্রদীপে তেল না দিলে যেমন আলো জ্বলে ওঠে না ঠিক তেমনি তেল না দিতে জানলে আমাদের জীবনের সাফল্যও ধরা দেয় না। এই যে দেখুন, আমাদের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের। দলপ্রধানকে খুশী করতে, তাদের ভাষণে থাকে অধিকমাত্রায় তেল। উদাহরণও দেয়া যায়। নাম উল্লেখ না করেই উদাহরণ দেই। কিছুদিন আগে টিভিতে সংসদের আলোচনা দেখছিলাম। এক সাংসদকে স্পিকার সাহেব সময় বরাদ্দ করলেন সাত মিনিট। সাংসদ ফ্লোর পেয়ে, দলের প্রতিষ্ঠাতা, দলের প্রধানের গুনকীর্তনে মেতে উঠলেন। হঠাৎ স্পিকার সাহেব বললেন, আপনার সময় শেষ মাননীয় সংসদ সদস্য। বলেই, মাইক অফ।
কি বুঝলেন? ঐ সংসদ সদস্য সংসদে গেছেন কেনো? তার এলাকার মানুষের দূর্দশার কথা সকলের সামনে তুলে ধরতে। এবং দেশের ইস্যূ নিয়ে কথা বলতে। কিন্তু তিনি কি তা করলেন? করলেন না। তিনি তাঁর দল এবং দলের প্রধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেন তৈল মার্কা কথা দিয়ে। যে তৈল পরবর্তী নির্বাচনেও কাজে আসবে। এলাকার মানুষ যাক জাহান্নামে তাতে ওনার কিচ্ছু আসে যায় না। ওনার দরকার দলের প্রধানের কাছে আশ্রয়। আর তা কি এমনি এমনি পাওয়া সম্ভব? অবশ্যই না। তেল দিতে হবে। মিথ্যা প্রশংসা করতে হবে। ভুল হলেও বলতে জানতে হবে, আপনি যা করেছে তাই সঠিক।
এসব তৈলবাজে দেশটা ভরে গেছে। হানাদার গেছে। সৈরশাসক গেছে কিন্তু তৈলবাজগুলা রয়ে গেছে। যুগে যুগে তা বেড়েই চলেছে। সমাজের কোন স্তর বাদ আছে তৈলবাজ থেকে? রাজনীতি, সাহিত্য, শিক্ষা... সব জায়গায় তৈলবাজদের পদার্পণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তো এদের বিচরণ ব্যাপক আকারে। শিক্ষার্থীদের তো রীতিমত প্রতিযোগিতা চলছে শিক্ষক পটানো নিয়ে। যে বেশী তেল দিতে পারবে তার ফলাফলও তত ভালো হবে। নিজের অল্প বয়স্ক অভিজ্ঞতা দিয়েই দেখি মেধাবীদের এই তৈলবাজ প্রবণতাটা একটু বেশী। ভালোর উপর ভালো ফলাফল চায় তারা। গাছের সবচেয়ে উঁচুর ফলটাও যে তাদের চাই। এরাই তো একদিন সচিব হবে। এরাই তো একদিন দেশের সর্বোচ্চ জায়গায় নিজেদের নিয়ে যাবে। তখনও তৈলবাজ অভিজ্ঞতা দিয়ে এই দেশটাকে বিক্রি করবে। কারণ, এরা যে একদিন নিজেকে বিক্রি করেছে! দেশ বিক্রি করতে এদের খুব একটা সমস্যা হবার কথা না।
তাই তো বলতে চাই, এদের রুখো। এই তৈলবাজদের বিরুদ্ধে দাঁড়াও। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে কে? আছে কেউ? কেউ বিপ্লব করবে? বাঙালী বিপ্লব করতে ভুলে গেছে। আমাদের মধ্যে তো আর ফিদ্রেল কেস্ট্রো, চে গুয়াভারা নেই। বিপ্লব করবে কে?
তারপরও গুটি কয়েক মানুষ আছে তৈলহীন। তাদের মাঝে তেল নেই। অন্যকে তেল দিয়ে সাফল্য অর্জন করবারও ইচ্ছে নেই তাদের। তারা জীবনকে অনুভব করে। তারা জীবনকে ভোগ করবার জন্য কাঁদে না। উপভোগ আর ভোগ দুটির মধ্যে যে বিস্তর ফারাক আছে তা তৈলবাজরা বুঝে না এবং যারা তেল খায় তারাও বুঝে না। তারা নিজের প্রশংসা শুনে এবং বলে অভ্যস্থ। তাদের বিরুদ্ধে কেউ সোচ্চার হলে, তৈলবাজরা পিছে লাগে। এই জীবন উপভোগ করবার মানুষগুলো স্বপ্ন নিয়েই বেঁচে থাকে। তাদের কাছে স্বপ্নগুলো আকাশের তারার মতো। যে তারাকে কখনও স্পর্শ করা যাবে না কিন্তু তারাকে লক্ষ্য করে পথের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই সন্ধানেই তারা সন্তুষ্ট থাকে। তারা ভালোবাসে মানুষ, পাখির কিচিরমিচির। তারা ভালোবাসে সকালের সূর্য উঠা, ভালোবাসে শেষ বিকেলের সূর্যের ডুবে যাওয়া। ভালোবাসে বৃষ্টি। ভালোবাসে পৃথিবীর সমস্ত ভালোকে। এমন ভালোবাসা কি আমাদের মাঝে আসবে? নাকি তেলবাজিতে কাটিয়ে দিতে হবে দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর; এমনকি সারাটা জীবন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29106831 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29106831 2010-02-27 21:33:54
বৃষ্টি আসিলো....মন উদাসি করিল.....
বৃষ্টি আসিল। মনটাকে নাচাইয়া তুলিলো। অফিসে বসিয়া গান শুনি। বৃষ্টির গান শুনিয়া যাইতে থাকি। রাস্তায় পানি জমিয়াছে নির্ঘাত। রাস্তায় জ্যাম লেগেছে নির্ঘাত। তবে জানিতে মন চায়, আমার প্রাণের বই মেলাটা এই বৃষ্টির মাঝে কি অবস্থায় রইয়াছে। ....

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29104709 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29104709 2010-02-24 18:11:19
মাননীয় মডারেটরকে আমার অনুরোধ‍! মূল পোষ্টের লিংক: Click This Link

আমি আন্তরিকভাবে অনুরোধ করছি পোষ্টটি স্টিকি করবার জন্য। এবং সকল ব্লগারকে অনুরোধ করছি এই ছেলেটাকে যে যেভাবে পারেন সহযোগিতা করুন। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29103981 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29103981 2010-02-23 16:46:06
জরুরীভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন বি নেগেটিভ (B negative ) জরুরীভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন। বি নেগেটিভ (B negative )। সকলকে অনুরোধ করা হলো। কারো রক্তের গ্রুপ মিলে গেলে যোগাযোগ করার জন্য।
যোগাযোগ: পারভেজ
মুঠোফোন: ০১৫৫-৩৪১-৬৩০৮, ০১৭১৬-৪৫১-৬৮৫]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29098183 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29098183 2010-02-15 11:55:44
এক টুকরো স্বপ্নের কথা ঐ হইলো আমার প্রথম লেখা। এবং সেই সাথে ছাপা কাগজে নিজের লেখা এবং তার পাশে আমার নাম দেখা।
সেই ছোটদের কাগজের সম্পাদক ছিলেন, বিশিষ্ট ছড়াকার লুৎফুর রহমান রিটন।
এবার আসি মূল বিষয়ে। এই বছরের বই মেলা শুরু হওয়ার আগে থেকেই অনেক চেষ্টা করছিলাম একটি বই বের করবার। কিন্তু পাবলিশারদের দ্বারে গেলে প্রথম প্রশ্ন থাকে, কয় কপি বিক্রি হবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন থাকে, বই যদি না চলে তবে কি করবেন?
আসলে, নতুন লেখকদের এই ধরনের বিড়ম্বনায় পড়াটাই স্বাভাবিক। তবে প্রকাশকরা তো ব্যবসার দিকটা দেখবেন। এটাও খুব স্বাভাবিক। তাই নিরাশ হইনি। বরং ভাবলাম, আরও কিছু সময় নেয়া যাক। বয়সও বা কত!
তারপরও একজন মানুষের উদ্যোগে কিছু লেখককে একটি জায়গায় আনার প্রয়াস করা হলো।নতুন লেখক। যাদের সাধ্য নেই বই বের করবার। প্রকাশককে রিস্কে ফেলে বই বের করবার মতো সাহস খুব কম লেখকেরই আছে। এমন কিছু লেখককে সুযোগ দিলো পালকি প্রকাশনী। নিজের সাধ্যের মধ্যে রেখে ১০ জন লেখককে একটি জায়গায় এনে দাঁড় করালেন। ১০ জন তরুণকে প্রেমের উপন্যাস জমা দেয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। সেই আমন্ত্রণে সাড়াও দিলাম। হঠাৎ আজ বিকেলে আমার মুঠোফোনে একটি ম্যাসেজ। যেখানে লেখা,
মোড়ক উন্মোচন হবে আগামীকাল (১৪-০২-২০১০), বিকেল ৫.৩০ টায়। মোড়ক উন্মোচন করবেন বিশিষ্ট ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন। বইটি পাওয়া যাবে ৪৫০ নম্বর (প্রতিভা প্রকাশ) স্টলে।
-----------------------------------------------------
অবাক হয়ে চেয়ে থাকি। জীবনের অনেক ঘটনা কাকতালীয় কিছু মুহূর্তের সৃষ্টি করে। তেমনি একটি হলো লুৎফুর রহমান রিটন ভাই আমার প্রকাশিত প্রথম বইয়ের মড়োক উন্মোচন করবেন। আজব এই দুনিয়া। যদিও প্রথম আলো ব্লগের উদ্যোগে "নির্বর্ষ শ্রাবণ" উপন্যাসে নিজেকে সংযুক্ত করতে পেরেছি। গতকাল সেই বইটিও প্রকাশ হয়েছে। বলতে গেলে, নির্বর্ষ শ্রাবণ বই মেলায় প্রকাশিত হওয়া আমার প্রথম বই।
কিন্তু সেখানে লিখেছি শুধুমাত্র একটি পর্ব। তবে আগামীকাল "১০ তরুণের প্রেমের উপন্যাস" বইটিতে আমার লেখা উপন্যাস থাকছে। "জীবন একটি মুখোশ" আমার লেখা প্রিন্টে প্রকাশিত হতে যাওয়া প্রথম উপন্যাস। এই বইটিতে মোট দশটি উপন্যাস আছে। আছে ১০ জন নতুন লেখকের স্বপ্ন। আছে অনেক ভাবনা। ১০ তরুণের স্বপ্নের সাথে আপনার একাত্ম হবেন এমনটাই আমরা আশা করি। এরা অধিকাংশই ঢাকা থেকে অনেক দূরে। একজন কি দুইজন হবেন ঢাকাবাসী। বাংলার বিভিন্ন জায়গা থেকে এই লেখকবৃন্দ জানিয়েছেন তাদের অন্তরের কথা। নিজের কল্পণার মাধুর্য তারা তুলে ধরতে চেয়েছেন। হোক তা অন্যের অপছন্দ। তাও তো জানা হলো, নিজের ভুলগুলো। আবার অন্য বেশে হয়তো আসা হবে। হয়তো ১ বছর পর। কিংবা ১০ বছর পর। হয়তো আসাও হবে না। তারপরও তো রয়ে যাওয়া হবে আপনাদের কিছু মানুষের বুক শেল্ফের কোণায়। এও বা কম কি?
আমি বলতে পারি। সম্মিলিতভাবে এবার আমার দুটি বই বের হচ্ছে। তাই আমি অনেক খুশি। নির্বর্ষ শ্রাবণ এবং ১০ তরুণের প্রেমের উপন্যাস। এই দুইটি উপন্যাসকে আমি চিরকাল বলবো, দুটি উপন্যাসই আমাদের উপন্যাস। আমার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসে আমরা ছিলাম। শুধু আমি ছিলাম না।
আপনাদের সকলকে অনুরোধ জানালাম, আমাদের সাথে একাত্ম প্রকাশ করার। আমাদের মোড়ক উন্মোচনে আসার আমন্ত্রণ জানালাম। সেই সাথে বইটি কেনারও অনুরোধ রইলো।
-------------------------------------------------------------
বইটিতে যাদের উপন্যাস আছে তাদের নাম এবং উপন্যাসের নামসহ দেয়া হলো।

১.জীবন একটি মুখোশ : শেরিফ আল সায়ার
২.এবং অসমাপ্ত : কাদের বাবু
৩.মুখের মিছিল : মাহামুদুন্নবী শুভ
৪.অসমাপ্ত প্রেম : এম এস সালেকিন
৫.প্রজাপতির পাখায় লেগেছে খুন : অনন্ত হৃদয়
৬.তোমাকে ঘৃণা করি : মশিউর রহমান দুর্জয়
৭.চোখের আলোয় : নার্গিস মাহবুবা কাজল
৮.যখন : নঈমুল কাদের অয়ন
৯.মেঘের আড়ালে জোছনা : আফতাব আহমাদ বকুল
১০.কিংবা অথবা এবং : পান্থ বিহোস
------------------


মোড়ক উন্মোচন হবে আগামীকাল (১৪-০২-২০১০), বিকেল ৫.৩০ টায়। মোড়ক উন্মোচন করবেন বিশিষ্ট ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন। বইটি পাওয়া যাবে ৪৫০ নম্বর (প্রতিভা প্রকাশ) স্টলে বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ২২৪ মূল্য ২৫০ টাকা]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29097232 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29097232 2010-02-14 01:39:19
সামইনকে শুভেচ্ছা এবং আমার কিছু "মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখা" ব্লগে একটা সময় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর লেখা হতো। এখনও যে হয় না তাও কিন্ত না। তবে তথ্যের ঘাটতি অনেকটাই চোখে পড়ে। অমি রহমান পিয়াল ভাইয়ের নিয়মিত তথ্যবহুল পোষ্ট আমাকে নাড়া দিতো। আইরিন আপুর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পোষ্টও ছিল তথ্যবহুল।
আমি নিজেও মুক্তিযুদ্ধের পোষ্ট দিতাম। পড়াশুনা করতাম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। নিজেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণায়ও নিয়জিত করার ইচ্ছে আছে বহু দিনের। বেঁচে থাকলে হয়তো একদিন কাজটা করেও ফেলবো। কারণ আমি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে চাই এবং জানাতে চাই।
আমার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু পোষ্ট আছে। তার মধ্যে একটি পোষ্ট অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শামীমা বিনতে রহমানের লেখা "বীভৎস যৌন নির্যাতন, কিন্তু এড়িয়ে গেছেন সবাই " আমি টাইপ করে দিয়েছিলাম। যেই পোষ্টেও এখনও আমি মন্তব্য পাই। যেটা আমাকে অবাক করে। অবাক করে এই জন্য যে, ব্লগে একটি অপরিচিত ব্লগার হলেও মানুষ ঠিকই ভালো এবং তথ্যবহুল লেখাটির সন্ধান করে নেয়। সে জন্য নিজেকে সান্তনা দিতে পারি এই বলে যে, অন্তত ভালো কিছু করতে পারলাম।
একটা সময় রাজাকার নিয়ে ব্লগের সবাই সোচ্চার ছিল। ধীরে ধীরে তা যেন নইয়ে পড়েছে। রাজাকারদের বিচারের দাবি আমি ভেবেছিলাম ব্লগাররা অত্যন্ত জোরালো করে এগিয়ে নেবে। কিন্তু চোখের সামনে দেখলাম সেই উদ্যোগকে দূর্বল হয়ে যেতে। যদি বর্তমান অবস্থাটা আমার জানা নেই।
আরেকটি দাবি আমি অনেক আগেই করেছিলাম, তা হলো, বাংলা ব্লগগুলো একত্র হয়ে জনসচেতনতামূলক কিংবা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যূগুলো নিয়ে কাজ করা। সামইন আমার দৃষ্টিতে বর্তমানে বাংলাদেশের সেরা ব্লগ। সেখান থেকে উদ্যোগ আসা উচিত। কিন্তু ব্লগের কিছু ব্লগার অন্য ব্লগ সাইটগুলোর বিরুদ্ধে যেভাবে কূৎসা রটনায় লেগে থাকে তাদের বিরুদ্ধে সামইনের কোন উদ্যোগে চোখে পড়ে না। মনে হয়, দেশের মতো ব্লগ সাইটাগুলোও বিভক্ত হয়ে রয়েছে। আর কিছু চাটুকারদের মতো কিছু ব্লগার তৈলবাজি করে সামইন কর্তৃপক্ষকে উৎসাহ দিচ্ছে। কিন্তু বিষয় হলো, ব্লগগুলো যদি ঐক্যে পৌছাতে পারতো তবে অনেক কঠিন কাজকে সহজে সম্ভবে রুপান্তরিত করা যেত। কিন্তু তা হয়ে উঠে না। অথচ সবাই কিন্তু পরিবর্তনের কথা বলেন। সবাই সচেতনতার কথা বলে পোষ্টও দেন। আসলে পরিবর্তনটা আমরা কেউই করিনি।
সামইনকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানো হয়নি।
আমি সামইনকে বলতে চাই, আমাকে ব্লগ অনেক কিছুই দিয়েছে। নিজের লেখার মানকে উন্নত করার সুযোগ দিয়েছে। ব্লগারদের সরাসরি মন্তব্যে নিজের লেখার অবস্থান জানতে পারি। নিজের দর্পণ হিসেবে পেয়েছি ব্লগকে। আর লিখতে লিখতে হঠাৎ দেখলাম, প্রথমআলো ব্লগে একটি গল্প লিখে পেয়ে গেলাম বিশেষ পুরুষ্কার আবার ছেপেও গেলো প্রথমআলো সাহিত্য পাতায়। এসবাই কাকতালিয় নয়। হয়েছে। সত্যি সত্যি আমার জীবনে ঘটেছে।
সামইনকে ধন্যবাদ। এবং জন্মদিনের শুভেচ্ছা। সেই সাথে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।
------------------------------------------------
সাথে এই বিজয়ের দিনে আমার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিছু লেখা শেয়ার করলাম।
১. বীভৎস যৌন নির্যাতন, কিন্তু এড়িয়ে গেছেন সবাই

২. ৭১ - এর সাহসী "মা"

৩. কিশোরটি যে কারণে খুন করেছিল কুখ্যাত গভর্নর মোনায়েম খানকে

৪. যুদ্ধশিশুদের আমরা দেশ থেকে নির্বাসন দিয়েছি; ইতিহাস থেকে নয়!

৫. গণধর্ষণ যুদ্ধাপরাধ, তবুও আজ অবধী বিচার নেই

৬. একাত্তরের শব্দসৈনিকদের স্বীকৃতি দেয়া হোক।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29060213 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29060213 2009-12-16 22:46:41
ইউটিউবে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বাংলাদেশের প্রত্ন-তত্ত্বের এই বিশাল ভান্ডার নিয়ে গবেষণারও কমতি নেই। সম্প্রতি ডিজিটাল যুগে বিশ্বের কাছে ইউটিউবের মাধ্যমে প্রত্ন-তত্ত্বকে তুলে ধরার প্রয়াস শুরে হয়েছে। তবে তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে। এখন পর্যন্ত ২৮টি ভিডিও আপলোড করা হয়েছে ইউটিউবে। এই কাজটি করছেন একজন প্রকৌশলী। তিনি, প্রফেসার মোহাম্মদ আনোয়ার। তবে মজার বিষয় হলো, তিনি কোন পেশাদার ফটোগ্রাফার কিংবা ভিডিওচিত্র নির্মাতা নন। নিতান্ত শখের বসে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে। আর খুজে ফিরছেন দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য। তিনি ভিডিও এবং এডিটিং কাজটিও নিজে করেন। এর পেছনে দেন তথ্যমূলক বর্ণনা। সমস্ত ঘষা-মাজা শেষে তুলে দেন পৃথিবীর সবচাইতে বেশী ব্যবহৃত ভিডিও আর্কাইভ ইউটিউবে।
যেখানে আছে, বাংলাদেশের ২৮ টি স্থানের উপর নির্মিত ভিডিওচিত্র এবং ইতিহাসমূলক বর্ণনা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, আহসান মঞ্জিল, বালিয়াটির জমিদার প্রাসাদ, চাপাই-নবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ, পুরান ঢাকার হোসনে দালান, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ইত্যাদি। এর সাথে আছে লালনের উপর একটি তথ্যচিত্র। কয়েকজন লালন সাধকের গানও তিনি তুলে এনেছেন তার ক্যামেরায়।
মোহাম্মদ আনোয়ারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, দেশের থেকে বাইরের দেশের মানুষরাই খুব বেশী আগ্রহ নিয়ে তার তথ্যমূলক ভিডিওচিত্র দেখছেন। একটি পরিসংখ্যান দেখিয়ে তিনি বলেন, ইসরাইল, চিলি, ব্রাজিল, সাইপ্রাস, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান থেকে তার ভিডিওচিত্র দেখছে। তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের একজন ছাত্র বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের উপর গবেষনা করতে গিয়ে তাঁর ইউটিউবের ভিডিও থেকে সাহায্য নেয়। এবং তাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। প্রাচীন ঐতিহ্যের কোন বিষয়ের উপর বাইরের দেশগুলোর আগ্রহ বেশী এই প্রসঙ্গে প্রফেসার আনোয়ার বলেন, বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত আহসান মঞ্জিলের উপর নির্মিত ভিডিওচিত্রের উপর সবচাইতে বেশী হিট পড়ে। এবং এর সংখ্যা পাকিস্তানে সবচাইতে বেশী। সেই সাথে আধ্যাতিক বাউল লালনের উপর নির্মিত ভিডিওটিরও প্রায় দুইহাজারের অধিক হিট পড়ছে বলেও তিনি জানান।
তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কাজটি করার পেছনে তিনি জানান, শুরুটা শখের বশে হলেও এখন রিতিমত নেশায় পরিণত হয়েছে। আমরা যে দেশে বাস করি সে দেশটার সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য যে কতটা স্বয়ং সম্পূর্ণ তা আমি কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারি। আর তাই আমার কৌতুহলটাও ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। আমি যখন প্রাচীন মসজিদগুলোর নকশার দিকে ভালো মতো লক্ষ্য করি তখন দেখি এগুলো হিন্দু কারিগর দিয়ে করানো। অথচ বর্তমানে কি আমরা কখনও কল্পনা করতে পারি, আমাদের মসজিদ তৈরী করবে একজন হিন্দু মানুষ? কিন্তু আদিকালে তা হয়েছে। এ সব বিষয়গুলো আমাকে ভাবায় এবং আগ্রহটাকেও আরো বাড়িয়ে দেয়।
এইসব বিষয়গুলো তিনি তাঁর ভিডিওচিত্রে তুলে না ধরলেও বলেছেন অবলীলায়। বর্তমানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের প্রকৌশল বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রফেসার আনোয়ার। তিনি সকলের কাছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরবার আমন্ত্রণ জানান। ব্যক্তিগত উদ্যোগ হলেও সরকারের উচিত নিজস্ব উদ্যোগে প্রত্ন-তত্ত্ব নিয়ে কাজ করা। প্রফেসার আনোয়ারের ভিডিওচিত্র দেখতে হলে আপনাকে এই http://www.youtube.com/user/iamanwer লিংকে ঢুকতে হবে।
শুরুতেই বলেছি, আমাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্যে স্বয়ং-সম্পূর্ণ। এ দেশের মাটিতেই আমাদের শিকড়। মাটির প্রয়োজন মৃত্যুর পরও ফুরায় না। দেশের মাটির সন্ধান আর এর ইতিহাস ঐতিহ্য না জানলে আমাদের স্বত্তার পরিচয়টাও একদিন হারিয়ে যাবে।
----------------------------
লিংকটি আবারও দিয়ে দিলাম,
http://www.youtube.com/user/iamanwer


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29054056 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29054056 2009-12-05 21:17:31
কেন লিখি? এই ‘কেন লিখি’ নিয়ে অনেক কথাবর্তা হয়ে গেছে মানুষের মধ্যে। অধিকাংশ গল্পকার কিংবা সাহিত্যিকদের এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে বহুবার। কেন লিখেন? এই প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় অনেকে বহুভাবেই দিয়ে গেছেন। আসলে, সমাজের বিভিন্ন বাস্তবতায় আমরা সন্ধিহান হয়ে পড়ি। বিভিন্ন ধরনের জটিলতায় আমরা আটকে আর্তনাদ করতে থাকি। তখন তা প্রকাশের কোনো জায়গা আমরা পাই না। তাই মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়া হয় লেখা। এই লেখাই অনেক মানুষের জীবনে প্রশান্তি হয়ে দেখা দেয়।
তবে লেখালিখি নিয়ে বলতে গিয়ে বাংলার শক্তিধর লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, লেখা ছাড়া অন্য কোন উপায়েই যে সব কথা বলা যায় না, তাই সেই কথাগুলো জানাবার জন্যই আমি লিখি।
কথাটি কিন্তু অনেকাংশে যথার্থ। মানিকের উপন্যাসগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি সমাজের বহু অসংগতি তুলে এনেছেন অসাধারণ ভঙিমায়। যেমন, মানিক পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসের মাধ্যমে পদ্মা পাড়ের মানুষগুলো জীবনচিত্র তুলে এনেছেন। এমন উপন্যাস বাঙলা সাহিত্যে না থাকলে হয়তো পাঠককুলের তা জানার সুযোগই হতো না। কখনও কোনদিন পদ্মার ভয়াল জীবনযাত্রা অনুভব করানো যেত না সহজে। কিন্তু উপন্যাস তৈরী হওয়ার পর সেখানকার চরিত্রগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল সবার কাছে। চোখের সামনে ভেসে উঠেছে পদ্মা নদী। চোখের সামনে ভেসে উঠেছে জেলে পল্লীর চিত্র। তাই মানিকের ক্ষেত্রে অনেকটাই “কেন লিখেন?” প্রশ্নের উত্তর যথার্থ ভাবে দিতে পেরেছেন বলেই আমার মনে হয়। আর মানিক বলেছেন আরও কিছু। যেমন, আমার লেখাকে আশ্রয় করে সে (পাঠকদের উদ্দেশ্য করে) কতগুলো মানসিক অভিজ্ঞতা লাভ করে। আমি লিখে পাইয়ে না দিলে বেচারি যা কোনদিন পেত না। কিন্তু এই কারণে লেখকের অভিমান হওয়া আমার কাছে হাস্যকর ঠেকে। পাওয়ার জন্য অন্যে যত না ব্যাকুল, পাইয়ে দেওয়ার জন্য লেখকের ব্যাকুলতা তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি। মানিক লেখকদের নিছক কলম-পোষা মজুর বলে উল্লেখ করেছেন। কলম দিয়ে যারা লিখে চলেন তারা তো কলম পোষা মজুরই হবে। এটাই স্বাভাবিক।

অনেকে আবার সাহিত্যের প্রতি এতই আকৃষ্ট হয়ে যান যে তিনি খাতা কলম নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টিতে নেমে পড়েন। যেমন, নোবেল বিজয়ী লেখক, অরহ্যান পামুক তার “পরোক্ষ লেখক” প্রবন্ধে বার বার সাহিত্যকে তিনি সাহিত্য-ডোজ হিসেবে আখ্যা করেছেন। এই কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ডায়াবেটিস রোগীদের প্রতিদিন একটি করে ইঞ্জিকশন নেওয়ার দরকার পড়ে, তখন অধিকাংশ লোকের মতোই, তাদের জন্য আমার খারাপ বোধ হতো। আমি এমনকি তাদেরকে অর্ধমৃত বলে ভাবতাম। সাহিত্যের প্রতি আমার নির্ভরতা অবশ্যই আমাকে একইভাবে অর্ধমৃত করে। আমি যখন তরুণ লেখক ছিলাম, আমি অনুভব করতাম অন্যেরা আমাকে “ বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ” মনে করতো এবং আমাকে অর্ধমৃত বলে সাব্যস্ত করতো। অথবা সম্ভবত সঠিক কথাটা হচ্ছে “ অর্ধভূত ”। আমি এমন চিন্তাও লালন করছি যে, আমি পূর্ণ মৃত এবং সাহিত্য দিয়ে আমার মরদেহে জীবন ফিরিয়ে আনার জন্য শ্বাস নিতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। আমার জন্যে, সাহিত্য হচ্ছে ওষুধ।
অর্থাৎ সাহিত্যের দ্বারা পামুক এতই আসক্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে, প্রতিদিন তাঁর সাহিত্যচর্চা না করলে তিনি অসুস্থ অনুভব করতেন। আর এজন্য তিনি লিখতে বসতেন। পামুক অন্যসব লেখকদের থেকে অনেকটা আলাদা আমার কাছে এই জন্য যে তিনি খুব একা থাকতে সবচাইতে বেশী পছন্দ করতেন। তার নোবেল ভাষণে তিনি বার বার বলেছেন, তিনি একা থেকেছেন বলেই তিনি লিখতে পেরেছেন।
যাইহোক। এই পামুকও “কেন লিখি?” নিয়ে অনেক কথাই বলেছেন। একবার পামুকের মা তাঁকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কাদের জন্য লিখছ?
এই প্রশ্ন পামুককে একটুও বিচলিত করেনি। কারণ তিনি জানতেন, মা এই প্রশ্ন করছেন কারণ তিনি জানতে চাচ্ছেন, নিজের জীবিকার জন্য তুমি কি পরিকল্পনা করছ?
নোবেল জয়ী এই লেখক বার বার ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন সাহিত্য নিয়ে তার ভাবনা। মানুষের অন্তরের গভীরের কথাগুলোকে। মানুষের লেখক সত্ত্বা নিয়ে। কেন লিখি এই প্রশ্ন একবার ঘুরিয়ে এক সাক্ষাতকারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কোথায় লিখেন?
উত্তরে পামুক বলে ওঠে, আমি সব সময় ভেবেছি যে, যেখানে আপনি ঘুমান কিংবা যেখানে সঙ্গীর সাথে সময় কাটান সে জায়গা থেকে আপনার লেখার স্থানটা হবে বিচ্ছিন্ন। গার্হস্থ্য অনুষ্ঠানাদি ও দৈনন্দিনতা কোনো-না-কোনো ভাবে কল্পনাকে হত্যা করে। তারা আমার মধ্যকার শক্তিটাকে হত্যা করে। ঘরের পোষমানা দৈনিক রুটিন অন্য পৃথিবীর আকাক্সক্ষা, যার পরিচালনার জন্য প্রয়োজন কল্পনা, তাকে শেষ করে দেয়। সেজন্যে বহু বছর থেকে লেখার জন্য আমি আমার বাড়ির বাইরে একটা অফিস বা ছোট্ট জায়গা নিয়েছি। আমার সব সময় আলাদা আলাদা ফ্ল্যাট ছিলো। কিন্তু একবার আমাকে আমেরিকায় কিছু সময় কাটাতে হয়েছিল যখন আমার সাবেক স্ত্রী কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছিলেন। বিবাহিত ছাত্রদের জন্য নির্ধারিত একটি এ্যাপার্টমেন্টে আমরা থাকতাম যেখানে আলাদা কোন জায়গা ছিল না। সুতরাং যেখানে লেখা সেখানেই ঘুমানো। চারদিকের উপকরণ সব সময় পারিবারিক জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমার মেজাজ বিগড়ে যেত। ভোরে আমি আমার স্ত্রীকে “ গুডবাই ” জানিয়ে বেরিয়ে পড়তাম যেন কেউ কাজে বেরুচ্ছে। বাড়ি ত্যাগ করে হাঁটতাম কয়েকটা ব্লক ঘিরে, তারপর ফিরে আসতাম এমনভাবে যেন কোনো ব্যক্তি তার অফিস এসে পৌছলো। দশ বছর আগে বসফরাসের ওপারে পুরণো নগরীতে আমি একটি ফ্ল্যাট খুঁজে পাই। এটা, সম্ভবত, ইস্তাম্বুলের সর্বোৎকৃষ্ট দৃশ্য। আমি যেখানে বাস করতাম সেখানে থেকে এটা পচিশ মিনিটের পথ। এখানে বইয়ে ভর্তি এবং আমার ডেস্ক থেকে দৃশ্যটা দেখা যায়। এখানে আমি প্রত্যেকদিন গড়ে দশ ঘন্টা কাটাই।

পামুক এভাবেই বর্ণনা দিয়ে সাক্ষাতকার যিনি নিচ্ছিলেন তাকে বিষ্ময়ে ভাসিয়ে দেন। বিষ্ময়ে আত্মহারা হয়ে সাক্ষাতকার গ্রহণকারী প্রশ্ন করে বসেন, দশ ঘন্টা?
পামুকের লেখা-লিখি নিয়ে আরেকটি উক্তি দিয়ে “কেন লিখি?” প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, লেখকরা লেখেন তাদের আদর্শ পাঠকের জন্য। তাদের প্রিয়ভাজনদের জন্যে, তাদের নিজেদের জন্যে অথবা কারও জন্যে নয়। এসবই সত্যি। কিন্তু এটাও সত্যি যে, আজকের লেখকরা লেখেন তাদের জন্যেও যারা তাদের বই পড়েন। এর থেকে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি যে, আজকের লেখকরা ক্রমেই তাদের নিজ জাতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্যে (যারা তাদের বই পড়ে না) লিখছেন কম, বেশি লিখছেন বিশ্ব জুড়ে যারা পড়েন সেই সংখ্যালঘিষ্ঠ সাহিত্যিক পাঠকদের জন্য।
এবার বর্তমান প্রজন্মের একজন লেখকের এই “কেন লিখি?” ভাবনা তুলে ধরা যাক। আহমাদ মোস্তফা কামাল তাঁর ধ্যানের জগৎ জ্ঞানের জগৎ প্রবন্ধে অনেকটা প্রশ্ন করেই বলেছেন, একজন লেখককে কেনই-বা এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়? সৃজনশীলতার অন্যান্য শাখায় যাঁরা কাজ করেন তাঁদেরকে তো এত প্রশ্ন করা হয় না! অসাধারণ সৃজনশীল কোন চিত্রকরকে সচারাচর প্রশ্ন করা হয় না যে, তিনি আঁকেন কেন?
কথাটি কিন্তু সত্যিই। সৃজনশীল অন্য শাখায় যারা কাজ করছেন তাদের কিন্তু এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না। যেমন, একজন সুরকারকে কিন্তু প্রশ্ন করা হয় না, আমি সুর করছেন কেন? তাহলে একজন লেখককেই কেন এই প্রশ্ন করা হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর আহমাদ মোস্তফা কামাল নিজেই দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, সম্ভবত অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে লেখালিখির সম্বন্ধে মানুষের কৌতুহল বেশি- একটি কবিতা বা গল্প বা উপন্যাস হয়তো পাঠককে বিস্মিত করে। পাঠকরা ঐসব লেখায় কোনো-না-কোনো ভাবে নিজেদের খুঁজে পেয়ে অবাক হয়ে ভাবেন, তার অপরিচিত এই লেখকটি কীভাবে তার কথাটিই লিখলেন!

একজন লেখককে লিখতে হলে অনেক সাধনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। চাইলেই গল্প লেখা যায় না। চাইলেই কবিতা বা উপন্যাস লেখা যায় না। এই লেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আর এই অপেক্ষাটাও অনেক লেখক উপভোগ করেন। ভালোবাসার প্রহরের জন্য যেমন অপেক্ষা মানুষ করে। মানসিক শান্তি লাভ যে লেখার মধ্যে দিয়েও আসতে পারে তা শুধু অপেক্ষা দিয়েই বোঝা যায়। অনেকে এই অপেক্ষাটাকে অনুভব করতে পারেন বলেও লেখেন। অথবা অনেকে সৃষ্টির মধ্যে আনন্দ পান। সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যে লেখা-লেখি এক আজব রহস্য ঘেরা কাজ। যে সৃষ্টি একজন লেখককে হাজারো যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দান করে। তাই তারা লেখেন। অনেক লেখকই কিন্তু বলেছেন, তারা তাদের জীবনকে অর্থময় করে তুলবার জন্যই লেখালেখি করেন।
তাই আহমাদ মোস্তফা কামালের উক্ত প্রবন্ধের শেষ কটি লাইন দিয়েই লেখাটি শেষ করলাম।
জীবনের অর্থহীনতা ভুলে থাকা অথবা জীবনকে অর্থময় করে তোলার জন্য চেষ্টার তৃপ্তিই মানুষকে দৈনন্দিন কাজগুলোর বাইরে নিয়ে আসে। আর এজন্যই হয়তো সে লেখালেখি করে, গান গায়, সুর তৈরী করে, নাটক-সিনামা বানায়, ছবি আঁকে, কিংবা রাজনীতি করে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29047476 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29047476 2009-11-21 21:31:52
মায়ের ডায়েরী থেকে- পর্ব ১ আমার মা আমাকে নিয়ে আমার জন্মদিনে একটি লেখা দিয়েছিল। আমি সেটা আপনাদের সাথে শেয়ারও করেছিলাম। একটি কথা তখন বলিনি। সেটা হলো, আমার মা দীর্ঘ ৩৭ বছরের চাকুরী জীবন শেষ করে গত ৩ বছর অবসর সময় কাটান। তখন থেকেই জীবনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তিনি লিখছেন। অনেকবার দেখতে চাইলেও তিনি দেননি। তবে কিছুদিন আগে অনেক লেখা আমার হাতে তুলে দিয়েছেন পড়ার জন্য। তখনই ভাবলাম ওনার জীবনের ঘটনা কিংবা অভিজ্ঞতাগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। তবে বিপাকে পড়ি সব কিছু নিয়ে। বিচ্ছিন্নভাবে লেখাগুলোকে একসাথে সাজানো অনেক কঠিন ব্যপার। তাই একটি ধারাবাহিকতায় আনা অনেক কঠিন কাজ। তারপরও চেষ্টা করছি। আজকে প্রথম একটি লেখা দিলাম। এটাও বিচ্ছিন্ন লেখাগুলোর একটি অংশ। আমার কাছে এই লেখাটির গুরুত্ব পেয়েছে অন্যগুলোর চেয়ে। এর পেছনের কারণটা আমার মনে হয় আপনাদের না বললেও চলবে। যদি লেখাটি পড়েন। মায়ের ডায়েরী শীরোনামে ধীরে ধীরে আমি সমস্ত লেখা প্রকাশ করবো। আর আপনারা আমাকে সাপোর্ট করবেন এমনটাই আশা করি।
----------------------------------------------------

১৯৬৮ সালের কথা। আমি তখন ১০ম শ্রেনীর ছাত্রী। আমরা তখন চাঁদপুর রেলওয়ে কোর্য়াটারে থাকি। আমি চাঁদপুরের নামকরা স্কুল “ লেডি প্রতিমা গার্লস স্কুলে ” পড়ি। ঢাকা শহরের ভিকারুননিসা স্কুলে আমার মেয়ে পড়েছে। তখন আমার মেয়ের পড়াশুনা দেখে মনে হতো, আমার সেই স্কুলের কথা। একদম সব নিয়ম-কানুন একই। তখনকার সময়েও সেই স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হতে হতো। আজো ভাবি, একটি মফস্বল শহরে এতো ভালো একটা স্কুল ছিল!!
লেখাপড়ায় বরাবর আমি ভালোই ছিলাম। বিজ্ঞান বিভাগে পড়েছি। বাসায় প্রচুর পড়াশুনা করতে হয়। হঠাৎ একদিন শুনলাম আমার আব্বা সিলেট তেলিয়াপাড়া ষ্টেশনে বদলি হয়ে গেছেন। খুব চিন্তায় পড়লাম। ঘরে সৎমা। সবসময় পড়া নিয়ে নানারকম ঝগড়া-ঝামেলাতে পড়ে থাকতে হয়। সব সময় আব্বার সাথে চিৎকার-চেচামেচি করে। আর বলে, ও মেয়ে মানুষ, কেনো ওর পেছন এতো টাকা পয়সা খরচ করো?
এখন আব্বা চলে যাওয়ার পর ওনার সুযোগটা আরও বেড়ে গেলো। উনি আমার স্কুলের সময় হলেই বিছানায় শুয়ে শুয়ে রান্না-বান্নার তাগিদ দেয়। ছোট ভাই-বোনদের দেখাশোনা করতে বলে। যেন আমি স্কুলে আমি স্কুলে যেতে না পারি।
কি করবো? কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কান্না ছাড়া কি করার আছে আমার! এদিকে বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলোর ক্লাস মিস করলে কিছুই বুঝতে পারবো না তাও জানি।
এদিকে একদিন স্কুলে গিয়ে শুনি বাংলার দিদিমণি(ম্যাডামদের আমরা দিদিমণি বলতাম) আবৃত্তিতে আমার নাম দিয়েছে। ওটা ছিল আন্তঃজেলা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। আমি ভালো আবৃত্তি করতে পারতাম। দিদিমণির সাথে দেখা করলে উনি একটি কবিতার বই আমার হাতে দিয়ে বলে, এতোদিন আসনি কেন? নাম তো অনেক আগেই দিয়েছি। আজ সন্ধ্যায় মহিলা কলেজে যাবে। তাড়াতাড়ি পড়ে নাও।
বাসায় এসে ছোট মাকে বললাম। আব্বা এখানে নাই। তাই ছোট মার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। উনি বললেন, আমি জানি না।
খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। কি করি!
অবশেষে ছোটভাইটিকে নিয়ে চলে গেলাম। আবৃত্তি প্রতিযোগিতা শেষ হতে রাত ১০টা বেজে গেলো। বের হয়ে দেখি আমার লজিং স্যার দাড়িয়ে আছেন। বললেন, করেছ কি? এতরাত! এমনিতেই তোমার মা তোমার পিছে লেগে থাকে। এখন এ কথা তোমার বাবাকে বললে বুঝতে পারতাছ কি হবে?
বাসায় ফেরার পথে ভাবলাম কাজটা ঠিক হয় নাই। না গেলেই ভালো হতো। শুধু শুধু ঝামেলা বাড়ালাম। আসলে কবিতা পড়তে খুব ভালো লাগে। তাই লোভটা সামলাতে পারিনি। দুরু দুরু বুকে বাসায় আসি।
আব্বা লোক পাঠিয়েছে মাসিক খরচের টাকা দিয়ে। পরে শুনলাম, আমার বিরুদ্ধে ঐ লোকটার কাছে একগাদা নালিশ দিয়েছে আমার সৎ মা।
ভয়ে আতঙ্কে আমি অস্থির। আসলে সব সময় একটা ভয় আমার মাঝে থাকতো। সেটা হলো, এই বুঝি আমার পড়াশুনাটা বন্ধ করে দেয়া হয়। এই ঘটনার পর ভয়টা আরও বেড়ে গেলো। এবং আমার ভয়টাই সত্য হলো। আমার এক চাচা চাঁদপুর ওয়্যারলেসে চাকরী করতেন। নাম জাফর। সেই জাফর চাচা একদিন এসে বললেন, চল, তোদেরকে বাড়িতে নিয়ে যেতে বলেছে।
আমি আর আমার মেঝবোন থাকতাম সৎমায়ের সাথে। আমার আপন মা থাকতো গ্রামের বাড়িতে। আমার মায়ের ঘরে আমরা চারবোন। ছেলে হয়নি বিধায় আমার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। সেই ঘরে চারটি ছেলে হয়েছে। আমার ছোটমা এই চার ছেলের অহংকারে আমাদের উপর নানাভাবে অত্যাচার করতেন।
যাইহোক। জাফর চাচা আমাদের গ্রামের বাড়িতে পৌছে দিলেন। পড়াশুনা আমার বন্ধ। কি করবো? আমার মা ভাগ্যের কাছে পরাজিত একজন মহিলা। দুঃখের সীমা নেই। আবার এইভাবে আমাদের পড়াশুনা বন্ধ করে দেয়া হলো। তিনি চুপ হয়ে শুধু কাঁদতেন। এদিকে আমাদের খাওয়া খরচও বন্ধ হয়ে গেলো। দোকান থেকে চাল-কেরোসিন বাকিতে এনে সব চালানো হচ্ছে। বাড়ীর আনাচে কানাচে থেকে শাক-সবজি নিয়ে রান্না হচ্ছে। আর এ সব কিছুর জন্য দায়ী ছিলাম আমি। তাই মায়ের সামনে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতো। আড়ালে আমিও কাঁদি। শাক তুলতে গিয়ে বাগানে বসে বসে কাঁদি। আর আল্লার কাছে সমাধান চাই।
কি করবো বুঝতে পারি না। এত কষ্ট করলাম। এত যন্ত্রণা সহ্য করলাম তবুও পড়া ছাড়ি নাই। আমি এ বুঝেই পড়াশুনার প্রতি সিরিয়াস ছিলাম, কারণ আমি জানতাম, এই সৎ মায়ের যন্ত্রণা থেকে একমাত্র মুক্তির উপায় হচ্ছে পড়াশুনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ কি হলো! আর কয়টা মাস পরেই এস.এস.সি পরীক্ষা। আমার বাবা ছোটবেলা থেকে লেখা-পড়া করিয়েছে কঠিন শাসনের মধ্যে। আমাকে ডাক্তারী পড়াবে। এই স্বপ্নের কথা আব্বা আমাকে বহুবার বলেছেন। আর আমি মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম আমি ডাক্তার হবো।
কিন্তু আজ সব শেষ হয়ে গেলো। আমাকে বোধহয় কামলা-বদলা ধরে বিয়ে দিয়ে দেয়া হবে। এই ভয় আমার মধ্যে আরও জেঁকে বসলো। ঘুমাতে পারতাম না ভয়ে।
এদিকে খবর পেলাম, আমার ছোটমা চাঁদপুর থেকে সিলেট চলে গেছে। এখন তো আরও চিন্তার বিষয়। আমার স্কুল চাঁদপুর। সবাই চলে গেছে সিলেট। তাহলে আমার পড়াশুনা সত্যি সত্যি বন্ধ!
আমার বড় চাচার ঘরটা খালি পড়ে ছিল। উনারা সবাই লাকসাম থাকে। সেই ঘরের দরজা বন্ধ করে আমি কাঁদতাম। আমার আম্মা কাজের মাঝেও যদি দেখতো আমি ঐ ঘরে ঢুকে বন্ধ করেছি, সাথে সাথে চিৎকার করে দরজা ধাক্কা-ধাক্কি শুরু করে দিতো। বোধহয় ভয় পেতো। যদি আত্মহত্যা করি!
কিন্তু না আমি তা করবো না। মনে মনে ভাবতাম, বাড়িতে বসেই পড়াশুনা করে পরীক্ষা দিবো। তবে সমস্যা হলো আমার বিষয় বিজ্ঞান। তাই কোন কুল-কিনারা পাই না।
একদিন বড় চাচার ঘরে শুয়ে শুয়ে কাঁদছি। হঠাৎ মনে হলো, চাচাতো আমাকে অনেক আদর করেন। আরও বেশী করেন কারণ আমি বংশের প্রথম মেয়ে যে কিনা লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহী। বছরের প্রথম দিকে চাঁদপুর গিয়েছিল। আমার লেখাপড়া কেমন চলছে খোঁজখবর নিতে। আমার স্কুলের টিচারের সাথেও তিনি কথা বলে এসেছিলেন। আমার টিচার বলেছিল, ও ফার্স্ট ডিভিশানে পাস করবে। এই কথা শুনে আমার চাচা মহা খুশী।
তাই এগুলো যখন মাথায় আসলো। তখন মনে হলো, চাচাকে জানালে কেমন হয়?
কথাটা মাথায় আসাতে সাথে সাথে একটা চিঠি লিখে ফেলি। লিখে আবার ভাবছি, আব্বা যদি রাগ হয়? যদি বলে, আমার নামে নালিশ করেছিস? তোর এতো বড় সাহস?
পরে ভাবলাম যা আছে কপালে। আমি জানাবই। একটা রিস্ক তো নিতেই হবে।
চিঠিতো লিখলাম। কিন্তু খাম কোথায় পাবো? পয়সাই তো নাই যে খাম কিনবো! অবশেষে অনেক চিন্তা ভাবনা করে চিঠিটা “ বেয়ারিং ” পাঠালাম। (বেয়ারিং মানে হলো স্ট্যাম্প ছাড়া চিঠি)

আল্লাহর রহমতে পরের মাসেই আমার বড় চাচা এসে আমাদের দুইবোনকে সিলেট নিয়ে গেল।
পরে জেনেছি আমার বড় চাচা আমার আব্বাকে অনেক বকাবকি করেছেন, আমার পড়াশুনা বন্ধ করে দেয়ার কারণে। এবং রাজি করিয়েছেন, যেন আমার পরীক্ষার ব্যবস্থা যেন করা হয়।
এরপর আমাকে ব্রাক্ষ্মন-বাড়িয়ার গার্লস স্কুলে ভর্তি করা হয়। আব্বা নিজে গিয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসলেন। হোস্টেলে থেকে যাতে নিশ্চিতভাবে পরীক্ষা দিতে পারি সেই ব্যবস্থাও করে দিলেন।
সেই স্কুল থেকেই আমি মেট্রিক পাস করি।
এরপর এক জীবন যুদ্ধে নেমে পড়ি। চাকরী, বিয়ে, সংসার।
ঐ একটি চিঠি আমার জীবনের পুরো মড়টাই ঘুরিয়ে দিলো। ঐ একটি চিঠি আমার চলার পথকে প্রশস্ত করে দিয়েছিল। অস্বিকার করা যাবে না, আমার বড় চাচার তড়িৎ পদক্ষেপটির কথা।
সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমাত সেইদিন এই একটা সিদ্ধান্ত আমার মাথায় যদি না আসতো তবে হয়তো আমার জীবনটা অন্যরকম হতো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29041277 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29041277 2009-11-10 20:20:34
আমার জন্মদিন এবং মায়ের উপহার

আমার মা একটা কথা প্রায়ই বলে। তবে জন্মদিনের দিন কথাটা বেশী বলে। কথাটা হলো, আজ শুধু তোর জন্মদিন না। আজ আমারও জন্মদিন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আজ শুধু তুই না আজ পৃথিবীতে আমারও মা হয়ে জন্ম হয়েছে। এই হচ্ছে আমার মা। আমার সব জন্মদিনগুলোতে বন্ধুদের সাথে একটা দীর্ঘ সময় আমি কাটাই। সকালে বের হই আর রাতে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরি। তখন ঘুমে চোখটা ভেঙে আসে। খেতেও পারিনা। পরদিন সকালে উঠে খুব অপরাধবোধ হয়। যে মা আমাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসলো। দশটা মাস যিনি কষ্ট করে আমাকে গর্ভে ধারণ করলেন তার সাথে রাতের খাবারটা পর্যন্ত খেতে পারলাম না। তাই বলে কি মা কষ্ট পেয়েছেন? হয়তো পায়নি। হয়তো পেয়েছেও। ছেলের ফূর্তির কথা ভেবে হয়তো বলেনি। আজ স্বন্ধ্যায় আমার মা আমাকে প্রশ্ন করেছিল, জন্মদিনের উপহার হিসেবে কি চাও? বললাম,বন্ধুদের খাওয়ানোর জন্য টাকা। মা হয়তো তাতেও কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু বলেনি। হঠাৎ রাত ১০টার কিছু পর আমার হাতে কয়েকটি কাগজের টুকরো দিয়ে বললেন, এই নাম জন্মদিনের উপহার। বলে চলে গেলেন। আবার রাত ১২ পর এসে প্রশ্নও করলেন, লেখা পছন্দ হয়েছে। অবেগ কিংবা অনুভূতি কিছুই দেখাতে পারিনি। কারণ তখন আমার কানে ফোন। বন্ধুদের উইশ এক্সসেপ্ট করছি। আজব আমি। সব বুঝি। সব টের পাই। তাও কেন জানি পারি না। তাই জন্মদিনের পরের দিন সকালে অপরাধবোধ নিয়ে নিজেকে নিজেই বলি, যে মা আমাকে পৃথিবী দেখালো সে মায়ের জন্য আমি কিছুই করতে পারলাম না। আমার মায়ের লেখাটা আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। হয়তো আমাকে নিয়ে মায়ের লেখাটা অতিরঞ্জিত। কিন্তু বিশ্বাস করুন মায়ের লেখা। সেটা সন্তানকে নিয়ে। সব মায়ের কাছে তার সন্তানই সেরা। আমার মাও তো ব্যতিক্রম নয়। আমার মায়ের কাছেও আমিই সেরা। যদি সেরাদের কাছে যাওয়ারও বিন্দু মাত্র যোগ্যতা আমার নেই। শুধু মা'কেই বলতে পারি, মা আমাকে পৃথিবীর সৌন্দর্য তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি দোয়া করো, তোমার এই ছেলে যেনো পৃথিবীর নির্মমতার সময় তোমার আশ্রয় পায়। তোমাকে ধন্যবাদ মা।
----------------------------------------------

৬ নভেম্বর। আজ আমার ছোট্ট ছেলেটার জন্মদিন। দেখতে দেখতে আমার ছোট বাবুটার ২৬ বছর হয়ে গেলো। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় ও এখনো ছোট। এইতো সেদিনের কথা। ওর বাবার তখন পাকশীতে পোষ্টীং। ইতিমধ্যে আমার শরীর খুবই অসুস্থ। ডাক্তার বলেছে, শরীরে হেমোগ্লোবিন খুবই কম। প্রতিমাসে চেক-আপে গেলেই নানানরকম ওষধ দিচ্ছে। তবুও বাড়ছে না। আমি তখন ডাঃ লৎফুন্নাহারের অধিনে। মগবাজারে ওয়্যারলেস এর উল্টোদিকের গলিতে উনার ক্লিনিক। উনি আমাকে খুবই আদর করে যতেœর সাথে চেকআপ করতেন। আমার বড় ছেলের বয়স তখন ৯ বছর কিন্তু আমার মেয়ের বয়স দুই। তাড়াতাড়ি বাচ্চা নেয়ার জন্য আমার শরীর খুবই দূর্বল হয়ে পড়েছে। তার উপর চাকরী করি। প্রতিদিন ফার্মগেট থেকে টঙ্গী জার্নি!
যাইহোক। ৫ নভেম্বর রাতে ওর বাবা সব ওষুধ পত্র কিনে দিয়ে রাতের ট্রেনে চলে গেলেন। কিন্তু শরীর ভালো লাগছে না। সারারাত ঘুমও হলো না। আমার ছোট বোনটা সারা-রাত আমাকে পাহারা দিলো। ভোরবেলা উঠেই আমার ভাইটাকে আমি ক্লিনিকে চলে গেলাম। কিন্তু আমার বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিল। স্যালাইন চলছে হঠাৎ আমার ডাক্তার বললো, বাচ্চাটা খুবই সমস্যায় আছে। নড়াচড়া করছে না। শুনেই আমি কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম। আল্লাকে ডাকতে থাকলাম। আল্লাহ আমার সন্তানটা যাতে সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে পৃথিবীতে আসে। আমার কান্নায় আমার মা-ভাই-বোন সবাই অস্থির হয়ে গেলো। সবাই দোয়া দুরুদ পড়তে লাগলো। স্বন্ধ্যার আগে ডাক্তার বলল, সিজার করতে হবে। তাই অন্য হাসপাতালে নিতে হবে। এজন্য অ্যাম্বুল্যান্স কল করা হয়েছে। অ্যাম্বুল্যান্স আসছে।
আল্লাহর কি রহমত। অ্যাম্বুল্যান্স আসার আগেই আমার সন্তান পৃথিবীতে চলে আসলো।
আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শোকর। আমার সন্তার সুস্থ স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে আসতে পেরেছে।
সেই দিনটি আমি আজও ভুলতে পারিনাই। এখনও ঐ ঘটনা আমার সমস্ত অনুভূতিকে অবশ করে দেয়। কি যে কষ্টের ছিল ৬ই নভেম্বর।
দুইদিন পর আমার সোনামনিকে নিয়ে বাসায় আসলাম। সবাই খুব আনন্দিত। ওর বাবাও আসল ঢাকায়। সবার মাঝে মিষ্টি বিলি হলো। তখন আমরা তেজগা রেওয়ে কলোনীতে থাকি। তাই আসে-পাশের বাসাগুলোতেও মিষ্টি বিতরন হলো। কিন্তু ৭/৮ দিন পর আমার জন্ডিস ধরা পড়লো। বাচ্চারও জন্ডিস। সবাই আবারও বিমর্ষ হলে গেলো। আসলে আমাকে আগের মাসে রক্ত দেয়া হলেছিল এক ব্যাগ। সেই জন্যই হয়তো জন্ডিস।
চিকিৎসা চলতে থাকলো। কিন্তু আমার ছুটি শেষ। আমাকে জয়েন করতে হলো অফিসে। ঐটুকু ছেলেকে ঘরে রেখে আমাকে ছুটতে হয়েছে জীবিকার জন্য। যখন ওকে বাসায় রেখে যেতাম তখন কষ্টে আমার বুকটা ফেটে যেতো। কেনো জানি না, ও জন্মের পর থেকে আমার মায়াটাও বেড়ে গিয়েছিল। খুব নরম হয়ে গিয়েছিলাম।
ভোরে উঠে ওকে তেল মালিশ করে জামাকাপড় পরিয়ে আমার মা আর বোনের কাছে ওকে রেখে যেতাম। আর যাওয়ার আগে একশ-একটা সতর্কবাণী শুনাতাম।
এরপর আকীকা হলো। নাম রাখা হলো, শেরিফ আল সায়ার। ডাক নাম সায়ার। কিন্তু আমার মনটা খচখচ করতে থাকলো। বড় ছেলের নাম চমক। সবাই চমকে যেতো নামটা শুনে। তাই আমার পিচ্চিটারও এমন চমকানো রাখতে হবে। ভাবতে ভাবতে সময় যায়। হঠাৎ সিন্ধান্ত নেই আমার পিচ্চির নাম হবে সুনাম। কল্পনা করি ওকে ছোট থেকেই বলবো, বাবা নামের গুন রাখতে হবে। জীবনেও কেউ যেনো দুর্নাম করার সুযোগ না পায়। চোখের সামনে মনের সামনে একটাই আশা-কল্পনা ঝুলিয়ে আমি। করলামও তাই। আজও আমি বলি, সব সময় ভালো থাকার।
ছোটবেলা থেকেই ও একটু মা ঘেষা। সারাদিন সবার সাথে থাকলেও আমি অফিস থেকে আসলেই ও আর কাউকে চিন্তো না। সারাদিন দেখা যেতো ওর বোনের সাথে ও খেলছে, ঝগড়া করছে কিন্তু যখনই আমাকে সামনে পেতো তখন শুধু আমার সাথেই থাকবে। আমার কোলেই থাকবে। আমার মেয়ে ওর চেয়ে দুই বছরের বড়। ওরও আমার কোলে থাকার বয়স। কিন্তু বোনকে সে কিছুতেই আমার কাছে আসতে দিতো না। সে-ই শুধু থাকবে আমার কোলে।
ধীরে ধীরে যখন ও বড় হতে থাকলো তখন একটা বিষয় খুব মজার ছিল। সেটা হলো, সারাদিনের বাসায় ঘটে যাওয়া সব খবর বলতো। আর সবার নামে বানিয়ে বানিয়ে নালিশ দিতো। আবার কোন জায়গায় যদি আমরা বেড়াতে যেতাম বাসায় এসে ও সব কিছুর বর্ণনা দিতে পারতো। আমরা সবাই খুব হাসাহাসি করতাম ওর এই স্বভাব নিয়ে। ইচ্ছে মতো নিজের মতো করে গল্প জুড়ে দিতে ও ওস্তাদ ছিল।
এখন যখন দেখি ও গল্প লিখে। আবার বিভিন্ন পত্রিকায় ওর লেখা ছাপে তখন আমার মনে পড়ে ওর সেই ছোট্ট বেলার দিনগুলোর কথা।
যখন মাত্র সাড়ে চার বছরে ওকে স্কুলে ভর্তি করানো হলো। তখন আমার মন খুব খারাপ। আমি চাইনি ওকে স্কুলে ভর্তি করতে। আমার অতটুকুন বাচ্চা ছেলেটা কি বুঝবে পড়াশুনার! আমি রাগও হয়েছিলাম ওর বাবার উপর। আমি ভেবেছিলাম ওর স্কুলে গিয়ে এডজাস্ট হতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু দেখলাম উল্টা। প্রতিদিন স্কুলে যেতো। আর আমি অফিস থেকে আসলেই ওর স্কুলের গল্প শুনতে হতো। একঘন্টা লাগতোই ওর গল্প শুনতে। এতো সুন্দর করে গল্পগুলো বলতো! রসালো করে। বেশীরভাগ সময় অভিনয় করিয়ে দেখাতো। তখন ভাবতাম হয়তো আমার ছেলে অভিনয় শিল্পী হবে। কিন্তু তা না হয়ে ও যাচ্ছে গল্পকারদের দলে। এসবই আমাকে ভালো লাগায়। আমার ছেলের ধীরে ধীরে আমার সামনে বড় হয়ে উঠছে। এখন ও বড় হয়েছে। পড়াশুনার প্রেসার বেড়েছে। এখন কি আর মায়ের জন্য গল্প আছে!
এই হচ্ছে আমার ছোট ছেলে। ও! ওর আরেকটা মজার বিষয় হলো ওর মধ্যে একটা মুরুব্বীয়ানা স্বভাব আছে। একদম ছোটবেলা থেকেই। এই স্বভাব এখনও। এখনও ওর বড় ভাই-বোনকে ও বুদ্ধি দিয়ে পরামর্শ দিয়ে মাতাব্বরি করে। তবে আরেকটা বিষয় হলো সবাই আবার সেটাকে এক্সসেপ্টও করে। একটা সময় ছিল যখন ও কিছু বললেই অন্য ভাই-বোনরা ক্ষেপে যেতো। বলতো তুমি ছোট-মানুষ এতো কথা বলো কেন? কিন্তু এখন আর সেটা নেই। এখন সবাই ওর মতামতকে প্রাধান্য দেয়। ওর একটা বিষয় আমাকে খুব ভালো লাগে সেটা হলো, আমার বড় ছেলে কিংবা আমার মেয়ের উপর আমি কোন বিষয়ে একটু বেশী রাগ করলাম। তখন ও ওদের পক্ষ নিয়ে আমাকে বকা দেয়। তখন রাগ হলেও পরে ভালোও লাগে। এগুলো আমি প্রায়ই হাসতে হাসতে বলি, বাবা তোর তো পৃথিবীতে আসতে দেরী হয়ে গেছে।
সুনামের আমার কাছে সবচাইতে বড় সেটা হলো, ছোট থাকতে থেকেই আমি দেখেছি ও কারও বাধা মানে না। যে কোন কাজ ওর কাছে সঠিক মনে হয়ে ও করতেই থাকবেই। সেখানে হাজারও বাধা থাকলে তা থেকে দূরে সরবে না। অটল থাকবে নিজের সিদ্ধান্তে। যদিও অনেকক্ষেত্রে এই স্বভাব ভালো না।
আর এ নিয়েই আমার পরিবার। আমার তিন সন্তান আমার পৃথিবী। আর সুনাম আমার পৃথিবীর একটি অংশ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29038441 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29038441 2009-11-06 00:39:10
গল্প: ফ্রেম আব্বু দুষ্টুমী করে বলেছিল, কেন? তোমার গাধা ছেলেটা কি যৌতুক পাচ্ছে না?
মা অভিমানী স্বরে বলে, যৌতুক? আমার ছেলেকে পড়াশুনা করিয়েছি কি যৌতুক নেবার জন্য?
আব্বু হাসতে হাসতে বলতো, আরে তুমি এতো ক্ষেপ কেন? এখন হচ্ছে আধুনিক যুগ। আর তাছাড়া শিক্ষিত সমাজের যৌতুক প্রথা হয় যথেষ্ট মার্জিত। যেমন, আমাদের সময় চেয়ে নেয়া হতো। বলত, খাট দিতে হবে, সোকেইজ দিতে হবে, আলমারী দিতে হবে, মোটরসাইকেল দিতে হবে। কিন্তু আমাদের মার্জিত সমাজে বলবে, কিচ্ছু দেয়া লাগবে না। শুধু ঘরটা একটু সাজিয়ে দিবেন। যদিও বা অনেকে মুখ ফুটে কিছুই বলে না। কিন্তু মনে মনে ঠিকই ওত পেতে থাকে যৌতুক পাবার জন্য। না দিলেই বেজার।
আব্বু বলতো আর হাসতো। আব্বুর এই এক স্বভাব। কিছু থেকে কিছু হলেমই খোঁচানো মার্কা কথা বলবে।
যাইহোক। ৪০ বছরের সংসার জীবনে মা'র এসব বোঝা হয়ে গেছে। নিজের স্বামীকে তিনি ভালো মতই চিনেন। স্বামীর সাথে সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই তিনি অভিমানে মুখ ভার করে রাখেন। আর বলেন, আমার সারাটা জীবন কুরে কুরে খাচ্ছে লোকটা। আর জ্বালাতন ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে মনটা চায় কোথাও চলে যাই।
আব্বু তখন চুপ করেই শুনতো। চেচামেচির মাত্রা অতিরিক্ত হলে দিব্বি এক ঘুমে দিন কাবার।
তবে মজার বিষয় হলো, আমাদের ছোটকাল থেকে শুনতে হয়েছে, তোরা বড় হয়ে তোর বাবার মতো হবি। সৎ। ন্যায়বান মানুষ। সরল। পৃথিবীর জঞ্জাল থেকে তোরা দূরে থেকে শান্তির জীবন পার করবি।
আমি এখন চিস্তা করি। স্বামীর প্রতি হাজারো অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মা চাইতেন আমরা যেন বাবার মতই হই।
আমরা বাবার মতো হয়েছি কি মা'র মতো হয়েছি তাও জানা নেই। তবে আমার অন্য ভাই বোন বলে, আমি মা ঘেষা ছেলে। যাকে বলা চলে মা নেউটা।
তো, সেই মা নেউটা ছেলেটার বিয়ে হচ্ছে। এতে যে মা'র খুশীটা আকাশচুম্বী তা আমি বুঝি। বউমার জন্য তার সব কিছুতে ভিন্নতা থাকতেই হবে। শাড়ী-গয়না থেকে সব কিছু। আমার ঘরটাও সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল। নতুন খাট, নতুন আলমারি, নতুন টেবিল চেয়ার। বাদ ছিল শুধু ড্রেসিং টেবিল। এতো বড় প্রয়োজনীয় একটি জিনিস যে কিভাবে নজরের আড়ালে চলে গেলো তা মাও চিন্তা করে!
আমার বিয়ের দিন সকালে আমার ঘরে চলে আসলো মায়ের ড্রেসিং টেবিল। অসাধারণ এই ড্রিসিং টেবিল বাবা সুন্দর বনের থেকে কাঠ আনিয়ে বানিয়ে দিয়েছিল। বাবার আঁকা ডিজাইন। বাবার কাছে এই কাঠের গল্প বহুবার শুনেছি। মা-বাবার ২৫ তম বিবাহ বার্ষিকীতে বাবা এই ড্রেসিং টেবিলটি উপহার হিসেবে দিয়েছিল।
উপহারটা কেন ড্রেসিং টেবিল সেটারও একটা গল্প আছে। বাবা বলতো গল্পটা।
যেদিন আমাদের বিয়ে হলো সেদিন আমি মনে মনে মহা বিব্রতকর অবস্থায় আছি। ঘরে আমার খাট নেই, চেয়ার-টেবিল কিচ্ছু নেই। আমি মাটিতে বিছানা পেতে শুই। আসলে এসব কেনার দরকারও হয়নি। একা একা ব্যাচেলার জীবন। সেখানে এতো সব কেনারও বা কি দরকার। কিন্তু যখন হুট করে তোর মা’র সঙ্গে আমার বিয়েটা হয়েই গেলো তখন আমি লজ্জার সাগরে। আহারে! না জানি মেয়েটা কি ভাববে। ফকির একটা ছেলের কাছে বিয়ে বসছে। মজার বিষয় হলো, তোর মা আমার ঘরে আসলো। একটা অগুছালো ঘর। কিচ্ছু নেই ঘরে। সেখানে আসলো। আমি রাতে প্রশ্ন করলাম, তুমি কিচ্ছু চিন্তা করো না। আমি ধীরে ধীরে সব কিনে দেবো। তোর মা লাজুক হাসি দিয়ে বলল, শুরুতেই কিন্তু একটা ড্রেসিং টেবিল কিনবেন। শুনেই আমি আশ্চর্যের হাসি দিয়ে বসলাম। হায়রে! মেয়ে মানুষ!! নিজেকে প্রতিদিন দেখতেই হবে তাদের।
আমরা বাবার এ গল্প খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। বাবা গল্পের শেষে বলতো, সেদিন সকালেই আমি ড্রেসিং টেবিল কিনে আনি। তবে মনে মনে চিন্তা করি, আমি আমার বউয়ের জন্য পৃথিবীর সব চাইতে ভিন্নগোছের ড্রেসিং টেবিল বানিয়ে দেবো। আর তাই এতো বছর শুধু সন্ধান করছিলাম ভিন্নতাটা কি হতে পারে! কি করে ড্রেসিং টেবিল কিনে দিলে সবাই ভাববে সেটা ভিন্ন গোছের। আর তখনই বের করলাম সুন্দরবনের কাঠ দিয়ে। আমি সুন্দরবন থেকে কাঠ আনালাম। আর এই ড্রেসিং টেবিল বানালাম। আমি তোর মাকে বললাম, পৃথিবীর অন্যতম বন সুন্দরবনের কাঠ দিয়ে তৈরী এটি। বুঝলা! নাক দিয়ে শুকে দেখো, বাঘের গন্ধ পাবা। হা হা হা

যাইহোক। আমি মনে হয় আমার গল্প থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। কথা হচ্ছিল সেজুতীকে নিয়ে। সেজুতীর সাথে আমার বিয়ের দিনই সুন্দরবনের কাঠ দিয়ে তৈরী ড্রেসিং টেবিল আমার রুমে ঢুকলো। যেই ড্রেসিং টেবিলটি আমার একমাত্র বোনটাও কখনও দখর করতে পারেনি। সেটি এখন সেজুতীর দখলে চলে আসবে। সেই অভিমানী কথাটা আমার বোন বলতে একদমই ভুলেনি। সে সাথে সাথে মাকে খোঁচা মেরে বলেছে, ও! তাহলে আমার কোন মূল্য নেই তোমাদের কাছে? এতো বছর ধরে চাইলাম তুমি দিলে না আর এখন বউ না চাইতেই দিয়ে দিলে। ভালো ভালো।
মা তখন মুচকি মুচকি হাসছিল।

২.
সেজুতীর সাথে বিয়ের পরদিন থেকেই মা একটু গম্ভীর হয়ে গেলো। মাকে আমি আড়ালে গিয়ে প্রশ্ন করলাম। মা তুমি কি কোনো কারণে আমার উপর রাগ?
মা বলল, কই? নাতো...
- তাহলে মুখটা এমন করে রাখছো কেন?
মা গম্ভীরভাবে বলল, আসলে ব্যাপারটা আমার কেমন যেনো লাগছে। আমার ছেলের বউ। তাও মনে হচ্ছে সব কিছু আমার হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, কি যে বলো মা। আর তাছাড়া তো তোমার বয়সও হয়েছে। ফসকে গেলে গেলো। তাতেও বা কি!
আসল বিষয়টা কিন্তু আমি ঠিকই ধরতে পারছিলাম। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় মায়ের একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি আটা ছিল। ঐ ছবিটা সেজুতী খুলে ফেলেছিল। আমি সেজুতীকে কিছুই বলিনি। ভেবেছিলাম, ওকে বললে ওর মধ্যে শাশুড়ীর প্রতি রাগ জন্মাবে। আর তাছাড়া ছবিটা খুললেই বা কি! মা’র ছবি সরালে কিই বা হবে!
কিন্তু যখন মা আমাদের রুমে ঢুকে প্রশ্ন করলো, আয়নার ছবিটা কোথায়?
সেজুতী তখন ড্রয়ার থেকে ছবিটা বের করতে করতে বলল, মা, আয়নায় কেউ কি ছবি লাগায়? আমার কাছে ব্যাপারটা গেয়ো গেয়ো মনে হয়েছে। তাই খুলে ফেলেছি।
মা'র মুখটা তখনই গম্ভীর হয়ে গেলো।
এটাতো একদিনের ঘটনা। আরও বহু গল্প আছে।
মা’র জন্য বাবার কেনা সখের ড্রেসিং টেবিল আমার রুমে স্থানান্তরিত হলেও মা একবারও ভাবেনি এটার উপর থেকে মা’র কর্তৃত্ব হারাবে। সত্যটা হলো, কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলল। মা আর ওটা ব্যবহার করতে পারেনা।
হুটহাট কিছু কিনে ফেলার ক্ষমতা আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের নেই। তাই মাকে সান্তনা দিলাম, মা তোমাকে সামনের মাসেই একটা ড্রেসিং টেবিল কিনে দেবো।
বাবা উদাস হয়ে বলল, সামনের মাস! যেই মানুষ একদিনও নিজেকে দেখা ছাড়া থাকতে পারেনা সে একমাসেরও বেশী সময় নিজেকে না দেখে থাকবে!
মা একদিন আপুকে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, আমার স্বামীর কত্ত ভালোবাসা ওটাতে।

এসবই আমার আর সেজুতীর আড়ালে হয়। আমার কানে যাতে না আসে সে ব্যপারে আমার পরিবারের সবাই খুবই সচেতন। কিন্তু আমি বুঝতে পারি। এ বাড়ীর সকলের চেহারা দেখলেই আমি বুঝে ফেলি কে কি ভাবছে আর কি বলতে চায়। জন্মের পর থেকে এই মানুষগুলোর সাথেই তো থাকছি। বুঝবো না!
বিরোধের জন্ম ছিল ড্রেসিং টেবিল। এরপর বহু পানি গড়িয়েছে। ঘরের সকল ছবির ফ্রেমগুলোও দখল করেছে সেজুতী। সেখানে কোন কোনটাতে আমাদের বিয়ের ছবি। কোনটাতে সেজুতী একা। কোনটাতে সেজুতী আর আমি কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ছবি।
মা শুধু একদিনই প্রশ্ন করলেন যখন দেখলেন তার প্রবাসী বড় ছেলের ছবির ফ্রেমটাও দখল হয়ে গেলো। মা সাথে সাথেই বলল, হাসানের ছবিটা সরালে কেন?
সেজুতীর সহজ উত্তর। আরে মা, ভাইয়াকে এই ছবিতে একটুও ভালো লাগছে না। তারচেয়ে আমি ভাইয়াকে বলবো, যাতে সুন্দর দেখে একটা ছবি তুলে পাঠায়। আমরা তখন সেটাকে বড় করে ফ্রেম বন্দি করবো।
সোনালী একটি ফ্রেমে মায়ের সুন্দর একটা ছবি ছিল। যুবতী বয়সের ছবি। সবাই দেখে বলত, সুবর্ণা মোস্তফার মতো লাগছে। মা তখন খুব খুশী হয়ে যেতো। সেই ফ্রেমের ছবিটাও সেজুতী সরিয়ে ফেলেছে। এর কারণ হিসেবে সে বলেছে, মার এই ছবিটা কেমন যেনো ঘোলাটে। তাই সরিয়ে ফেলেছি।
সোনালী সেই ফ্রেমে আমার বউ তার কলেজ জীবনের একটা ছবি লাগিয়েছে। খুব সুন্দর লাগছে ওকে।

৩.
সেজুতী। সেজুতী ইসলাম। মা-বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে। ওর কোন ভাই বোন নেই। ও একাই রাজত্ব করেছে ওর পরিবারে। নিজের যত চাহিদা যত আবদার তা সে একাই করেছে। আশেপাশে কেউ আবদার করেনি। অসম্ভব জেদী, ইমোশনাল মেয়ে সেজুতী। ওর পৃথিবীটা ওর কাছে একদম রঙিন। পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে ও দেখে ওর মতো করে। কারও ভাবনা কিংবা কারো বাস্তবতা ওর কাছে মূল্যহীন। সেজুতীর কাছে তার নিজস্ব ভাবনাটাই সবচাইতে বড়। ও ভাবে ও যা করছে তা সঠিক। সেজুতী তার ভুবনকে সাজাতে চায় স্বপ্নের মতো করে। সেজুতী ভাবে, স্বপ্ন দেখেছিলাম আমার জামাই আমাকে প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা সময় দিয়ে যাবে। সুতরাং জামাইকে সেটাই দিতে হবে। তা না হলে ভাবতে হবে আমার জামাই আমাকে ভালোবাসে না। এটা সেজুতী বিশ্বাসও করে। ও চায় ওর জামাই পৃথিবীর সমস্ত সুখ-দুঃখ শুধু ওর সাথেই ভাগাভাগি করবে। ওখানে আর কারও অধিকার থাকতে পারে না। ও চায় শুধু সুখ আর সুখ। যেখানে কোন দুঃখ দেখলেই ও আতকে ওঠে। ও ভাবে এই বুঝি সব ভেঙে পড়লো। এই বুঝি ওর অধিকার ছুটি নিলো।
সেজুতীর বর্ননা দিলাম। সেজুতী এমনই। আমাকে সবসময় ও আকড়ে ধরে থাকতে চায়। আর ও সব কিছু করতে চায় ওর মতো করে। সেখানে বাধা আসলেই ও ভাববে অন্যকিছু। নতুন করে অন্য এক বিশৃঙ্খল ভাবনায় আবার নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে।
এই যে মায়ের ড্রেসিং টেবিলের আয়না থেকে মায়ের ছবি সরিয়ে ফেলা আমি জানি এটা ও এতো কিছু ভেবে করেনি। ওর কাছে ভালো লাগেনি তাই সরিয়ে ফেলেছে। হয়তো মা ভেবেছে ঘরের সব কিছুতে নিজের দখলদারিত্ব দেখানোর জন্যই সেজুতীর এই কান্ড। কিন্তু আমিতো জানি ও এতো সাত-পাচ চিন্তা করেনি।
আবার ঘরের সকল ছবির ফ্রেমগুলো দখল করা। এগুলোও ওর কাছে বড় কিছু না। নিজের মা-বাবার ঘরে ও নিজের মতো করে সব কিছু করবার অধিকার ছিল। বলার মতো কেউ ছিল না। ঘরের একার অধিপত্ব ও ভোগ করে এসেছে।
কিন্তু এখানে প্রতিপদে চিন্তা করতে হয় অনেক কিছু। এখানে চিন্তা করতে হয়, ঘরের আরও দুই সন্তানের কথা। বড় ছেলে ও তার পরিবার। মেঝ মেয়ে ও তার পরিবার। সবাই এই ঘরে না থাকলেও এই ঘরে সবার অধিকার আছে। ঠিক যেমনটা সেজুতীরও আছে। সবাই এই ঘরের ঠিক ততটাই পরিবর্তন করতে পারবে যতটা সেজুতী পারবে। তবে সকল পরিবর্তনই হতে হয় কথাবর্তা বলে। সবার ইচ্ছার দিকে। সবার মতামতের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু সেজুতীর তো আর সে বালাই নেই। ও ভাবে যেহেতু এ ঘরে শুধু ওর বিচরণ তাই এই ঘরের সমস্ত ক্ষমতা ওর দখলেই থাকবে।
তবে একটি কথা হলো। অদৃশ্যভাবে এ ঘরের সমস্ত ক্ষমতা আমাদের মা-বাবার হাতে। আমরা কখনও কেউ কোনদিন তাঁদের মতামতের বাইরে কথা বলিনি।
তাই যখনই আমার মা-বাবা দেখছে চোখের সামনে তাদের তোয়াক্কা না করে ঘরের ছোট বউ ঘরে একটার পর একটা পরিবর্তন আনছে ঠিক তখন তাদের মাঝে কালো মেঘের সঞ্চার হচ্ছে।
এ অভিযোগ আমার বোন এসেও আমাকে করে গেছে। বলেছে,তুই কিছু বলছিস না?
আমি বললাম, ঠিক এভাবেই ও বড় হয়েছে। ওর পরিসরটাকে ওর ভাবনাগুলোকে আমি কিভাবে হত্যা করবো? আর ওতো পর ভেবে করছে না। ও এটাকে ওর সংসার মনে করছে তাই করছে।
আমার বোন চুপ হয়ে ছিল। কিছু বলেনি।
আমি বলেছি, একজন মানুষের এতোদিনের স্বপ্ন তুমি চাইলে একদিনেই ভেঙে দিতে পারো না। ওকে সময় দাও। আস্তে আস্তে নিজেকে এ্যাডজাস্ট করে নিবে।
সেজুতীকে যে একদমই আমি কিছু বলিনি তাও কিন্তু না। ওকে বলেছি, তুমি শুধু শুধু কেনো ছবিগুলো সরাচ্ছ? মা মনে কষ্টে পাচ্ছে না?
সেজুতীর আবার সহজ উত্তর, এতো সিম্পল একটি বিষয় নিয়ে মা মন খারাপ করবে? এটা কি বললে?
আমি বললাম, সংসারে মন কষাকষির শুরুটা হয় সিম্পল বিষয় নিয়েই। এই সিম্পল বিষয়গুলোই ধীরে ধীরে বড় হতে থাকবে। তখন? তখন কি করবে?
সেজুতী কিছুটা হয়তো বুঝেছিল। বুঝতে পেরেছিল বলেই আমাকে বলল, মার জন্য আমি কালকেই সুন্দর দেখে একটা ফ্রেম কিনে আনবো। তারপর আমাদের ঘরে মার যুবতী বয়সের ছবিটা ঝুলাবো।
এই বলে মিষ্টি হাসিও দিয়েছিল সেজুতী। সেই হাসিতে কোন রহস্য নেই। সরল হাসি।
পরদিন সকালে আমি যখন অফিসে চলে গেলাম। তখন আমার মোবাইলে সেজুতী ফোন দিলো। বলল, আমি একটু মার্কেটে যাচ্ছি। মায়ের জন্য ফ্রেম কিনতে।
আমি নির্বিঘ্নে কাজ করছি। অফিসের বসের একগাদা আবদার পালন করে চলেছি।
হঠা অফিস ছুটির কিছুক্ষণ আগে আমার মোবাইলে ফোন আসলো। ফোনটা দিলো মা। বলল, বাবা, কিছুক্ষণ আগে বাসার নাম্বারে ফোন এসেছে। সেজুতী নাকি এক্সিডেন্ট করেছে।
এরপর আর কিছু শুনিনি। হাসপাতালের সাদা চাদর মোড়ানো বিছানায় আমার সেজুতী রক্তাক্ত।
আমার লক্ষী সরল বউ সেজুতীর রিক্সা একটি বাস নাকি শূণ্যে তুলে দিয়েছিল।
আহ। কি ব্যাথা। কি যন্ত্রণাটা পাচ্ছে সেজুতী।
একটি অপরিচিত লোক আমার পাশে এসে দাড়ালো। আমার হাতে কাগজে মোড়ানো একটি ব্যাগ তুলে দিতে দিতে বলল, আমি তখন রাস্তার ওপারেই ছিলাম। আমার সামনেই ঘটনাটা ঘটেছে। মানুষজনের ভিড়ের মাঝে ওনার ব্যাগট্যাগ কিছুই পাইনি। শুধু হাতে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছিল এই ব্যাগটি। জ্ঞান সাথে সাথে গেছে। হঠাৎ জ্ঞান আসলো আর ধীরে ধীরে আপনাদের বাসার নাম্বারটা দিলো।
আমি লোকটিকে থ্যাংস বলে বিদায় দিলাম। আমি আমার মা, আমার বাবা, আমার বোন সবাই তখন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছি ব্যান্ডেজে মোড়ানো সেজুতীর দিকে।
আমরা এখনও সেজুতীর মা-বাবাকে খবর দেইনি। বাবা বলল, কি বলবো ওনাদের? ওনাদের একমাত্র মেয়েকে আমরা সামলাতে পারলাম না।
বলতে বলতে বাবা কেঁদে দিলো। আমার মা একদম নিশ্চুপ। আমি হাসপাতালের বারান্দায় গিয়ে দাড়ালাম। হাতে আমার ব্যাগ। আমার মা আমার পিছু পিছু। আমার মা আমার পাশে এসে দাড়িয়ে আকাশে দিকে তাকিয়ে বলল, আমার সব কিছু আমি সেজুতীকে দিয়ে দেবো। তারপরও ওকে বল, ওর যাতে কিছু না হয়। ওকে বল ভালো হয়ে যেতে। ওকে বল......
মার নিস্তব্ধতা ভেঙে এক আর্তনাদ শুরু হলো। আমি তখন মাকে জড়িয়ে ধরে আছি। আর তখন আমার হাতে কাগজে মোড়ানো ব্যাগে একটি ফ্রেম। শূণ্যে উঠে যাওয়া রিক্সাটা যখন ভূমিতে এসে পড়লো তখন সেজুতী দুমড়ে-মুচড়ে গেলেও ফ্রেমটি আছে একদম অক্ষত।
পরদিন সকালে আমি বাসায় যাই। রাতেই মাকে পাঠিয়ে দিয়েছি বাসায়।
বাসায় গিয়ে দেখি নতুন ফ্রেমটি মা’র ঘরের দেয়ালে ঝুলানো। আর ছবির ভেতর ফ্রেম বন্দি আমার সেজুতী।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29034859 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29034859 2009-10-30 21:59:52
পুনর্জন্মের স্বপ্ন দেখতে চায় টেশিস! গত ১০ অক্টোবর বিভিন্ন দৈনিক এবং সেই সাথে মিডিয়াগুলোতে এসেছে দেশের একমাত্র সরকারী টেলিফোন সেট তৈরী প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থাকে আবারও চালু করা হচ্ছে। প্রযুক্তির ভারে নুয়ে পড়া মৃত প্রায় এই প্রতিষ্ঠান আবারও চলে এসেছে আলোচনায়। দীর্ঘ সময় অবেহলায় পড়ে থাকা টেশিসকে দাড় করানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলেও সংবাদ মাধ্যমগুলোকে জানানো হয়। বলা হয়, টেশিস খুব শিঘ্রয় নিজস্ব ল্যান্ডফোন সেট উৎপাদনে যাচ্ছে। এবং সেই সাথে প্রয়োজনীয় সকল যন্ত্রাংশও কমলাপুর রেলষ্টেনে এসে পৌছেছে। এও বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে আগামী জানুয়ারীর মধ্যে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহবান করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোবাইলের ব্যাটারী, চার্জারও তৈরী করবে এ প্রতিষ্ঠানটি। সংবাদ মাধ্যমগুলো নিশ্চিত করে বলেছে, প্রথম দফায় ৮ হাজার ৮০ টি ল্যান্ডফোন সেট তৈরী করার প্রস্তুতিও নিচ্ছে টেশিস।
এ ধরনের সংবাদ অবশ্যই আশার বাণি। আমাদের দেশের সর্ববৃহৎ একমাত্র টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান “টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস)”। বিগত সকল আমলেই এই প্রতিষ্ঠানটি অযতেœ পড়ে ছিল। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে যে সরকার ক্ষমতায় বসেছেন সে সরকারের পক্ষ থেকে এ পদক্ষেপ অবশ্যই প্রসংশাযোগ্য।
তবে এ প্রতিষ্ঠানটির কেন এ হাল হলো? এবং কি-ই বা এর ইতিহাস। এ সব বিষয় নিয়েই আমার অনুসন্ধান।

পেছনে ফেরা:
১৯৫৩ সালে পশ্চিম পাকিস্তান সরকার দেশটির টেলিযোগাযোগের উন্নতির স্বার্থে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ এবং টেলিফোন সেট সংযোজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য হাজরা/ হারিপুরে একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। সেই প্রতিষ্ঠানটি কম সময়ের মধ্যেই অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপ নেয়। এরপরই পকিস্তান সরকার আরেকটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তবে তা পূর্ব পাকিস্তানে। এ উদ্যোগের পেছনে কারণগুলো হলো-
১. পূর্ব পাকিস্তানকে টেলিযোগাযোগে স্বয়ং সম্পূর্ণ করে গড়ে তোলা।
২. কর্মসংস্থান গড়ে তোলা।
৩. আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া।
৪. পশ্চিম পকিস্তান থেকে টেলিযোগযোগের সরংজাম আনতে প্রচুর খরচ হতো। সেই খরচ কমানোও ছিল প্রধান লক্ষ।

এ সকল কারণ দর্শিয়ে পাকিস্তান তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয় একটি বিল পেশ করে সরকার বরাবর যা সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণযোগ্য হয়। পর্ববর্তীতে জার্মানীর সিমেন্স কোম্পানী সকল ধরনের টেকনিকেল সহযোগিতা করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। পাকিস্তান তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রানালয় জার্মানির সিমেন্স কোম্পনির সাথে চুক্তি সাক্ষর করে। চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, দেশীয় সকল ধরনের সহযোগীতা সরকার কর্তৃক প্রদাণ করা হবে। এবং কারগরী সহযোগীতা সেই সাথে দক্ষ জনবল তৈরীতে প্রশিক্ষন দেবে জার্মানীয় কোম্পানী সিমেন্স। চুক্তিটি সাক্ষরিত হয়, ২৭/০৩/১৯৬৭।
প্রতিষ্ঠানটির নাম দেয়া হয়, টেলিফোন ইন্ডান্ট্রিজ করপরাশান লিমিটেড(টি আই সি)। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রথম পর্বের লক্ষ নির্ধারণ হয়, ১৯৭২ সালের মধ্যে সারা দেশে এক্সচেঞ্জ তৈরীর মাধ্যমে ২০ হাজার টেলিফোন লাইন দেয়া হবে এবং ৩০ হাজার টেলিফোন সেট তৈরী করা হবে। এ লক্ষ নিয়েই যাত্রা শুরু টেলিফোন ইন্ডান্ট্রিজ করপরাশান লিমিটেড। এর ভিত্তি-প্রস্থর স্থাপন করা হয় গাজিপুরের টঙ্গিতে, ২৮ মার্চ ১৯৬৭।
১৯৬৯ সালেই টেলিফোন ইন্ডান্ট্রিজ করপরাশান লিমিটেড তাদের প্রথম পর্বের কাজ শুরু করে দেয়। জার্মান থেকে দক্ষ প্রকৌশলীরা এসে এ দেশের দক্ষ জনবল তৈরীতে কাজ করতে থাকে। এবং সেই সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বহু দক্ষ প্রকৌশলীকেও এ প্রতিষ্ঠানে সুযোগ করে দেয় সরকার। শুরুতে ৫০০ জন কমকর্তা-কর্মচারী নিয়ে যাত্রা শুরু করে টি আই সি। পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে তা ৯০০ তে গিয়ে ঠেকে। জনবল নিয়োগে প্রসংশযোগ্য পদক্ষেপটি ছিল ১০০ জন মহিলা জনবল নিয়োগ। সেই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের মত একটি দেশে মহিলা জনশক্তি নিয়োগের জন্য অনুরোধ জানায় জার্মান কোম্পানী সিমেন্স। এছাড়াও নিয়োগকৃত অনেককেই বিদেশে প্রশিক্ষনের জন্য পাঠানো হয়। টি আই সি ১৯৭০ সালে পুরো উৎপাদনে চলে যায়। এবং পূর্ব পাকিস্তানে যাত্রা শুরু হয় সেসময়কার অত্যন্ত অত্যাধুনিক সুইচিং সিস্টেম ই.এম.ডি ব্যবহার করে এক্সচেঞ্জ তৈরী। সেই সাথে প্রযুক্তির হাতছানি পেল পূর্ব পাকিস্তান।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধের পর টেলিফোন ইন্ডান্ট্রিজ করপরাশান লিমিটেড নাম পাল্টিয়ে রাখা হয়, টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস)।

স্বাধীনতার পর:
স্বাধীনতার পরের গল্পটা খুবই সুন্দর। বাংলাদেশের অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপ নেয় টেশিস। সারা দেশে এক্সচেঞ্জ সংযোজন এবং টেলিফোন সেট তৈরীতে এগিয়ে চলে প্রতিষ্ঠানটি। ৩৭ বছরের হিসাবে দেখা যায়, টেলিযোগাযোগ ক্ষেত্রে তিন লাখ লাইন ইউনিট ইএমডি সুইচিং যন্ত্রপাতি এবং ৬ লাখ টেলিফোন সেট উৎপাদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়াও টেলিফোন সেটতো আছেই। এ সকল সফলতা থেকে বিটিটিবির প্রায় ৯শ কোটি টাকা আয় করে যার মধ্যে ৫শ কোটি টাকার অধিক সরকারের কোষাগারে জমা পড়ে। দক্ষ জনবল এবং মেধাসম্পন্ন প্রকৌশলীরা এ দেশীয় প্রতিষ্ঠানে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আর দেশ এগিয়ে চলছিল। সারা দেশে যত এনালগ একচেঞ্জ রয়েছে প্রায় সব’টিই টেশিসের তৈরী। তবে ভুল সিন্ধান্তের কারণে ধ্বস নামে টেলিফোন শিল্প সংস্থায়। একসময়ের প্রাণ চঞ্চল প্রতিষ্ঠানের সকল মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হয়ে পড়ে কর্মহীন।

ধ্বস নামার কারণ:
সমস্ত কারিগরী দক্ষতা সত্ত্বেও ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকার বিদেশ থেকে ডিজিটাল এক্সচেঞ্জ এবং টেলিফোন সেট আমদানি শুরু করে। অথচ বিগত সময়গুলোতে দেশীয় চাহিদা টেশিসই মিটিয়ে আসছিল। যদিও টেশিসকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য সকল ধরনের দাফতরিক কাজ সম্পন্ন হয়েছিল ১৯৮০ সালে। ১৯৮০ সালের ১৭ই মার্চ, ২৪ সেপ্টম্বর ও ৩০ আগষ্ট অনুষ্ঠিত এনইসি সভায় টেশিসকে আধুনিকায়ন করে ডিজিটাল ইলেক্সট্রনিক সুইচিং যন্ত্রপাতি উৎপাদনের সিন্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু এসব কিছু কোনো এক অজানা কারণে ভাটা পড়ে। এবং ঠিক তখন এরশাদ সরকার জাপান থেকে ডিজিটাল এক্সচেঞ্জ এবং টেলিফোন সেট আমদানি করার অনুমতি দেন। ঠিক তখনই অন্ধকার যুগ শুরু হয় টেশিসে। প্রাণচঞ্চল এ প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে একটি ধ্বংস্বস্তুপের দিকে এগিয়ে চলে। জার্মান কোম্পানি সিমেন্স ধীরে ধীরে তাদের গুটিয়ে নিতে শুরু করে। তারপরও ১৯৯১ তে দেখা যায়, জুলাই মাসে তৎকালিন প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকের সভায় ডিজিটাল প্রযুক্তি সহকারে টেশিসকে আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর প্রেক্ষিতে বিটিএ্যান্ডটি এবং এলকাটেল কোম্পানি একে আধুনিকায়ন ছাড়াই ক্যাবল সরবারহের প্রস্তাব করে এবং জার্মানির সিমেন্স কোম্পানি ও বেলজিয়ামের আতিয়া কোম্পানি যৌথউদ্যোগে টেশিসকে আধুনিকায়ন সহ চট্রগ্রামে ডিজিটাল এক্সচেঞ্জ স্থাপনের জন্য দরপত্রে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু বিভিন্ন আমলাাতন্ত্রিক জটিলতায় পড়ে তাও ভেস্তে যায়। ১৯৯২ সালে আবারও উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু সেই উদ্যোগও অদৃশ্য মহলের তৎপরতায় বন্ধ হয়ে যায়। এতকিছুর পরও কার্ডফোন উৎপাদন করে টেশিসকে বাচিয়ে রাখার একটি প্রচেষ্টা করা হয়। কিন্তু মোবাইল ফোনের বিস্তার লাভ থমকে দিয়েছে এই পদক্ষেপটিকেও। ধীরে ধীরে মৃত একটি প্রতিষ্ঠানে রুপ নেয়া শুরু করে দেশের একমাত্র বৃহৎ টেলিফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস)। এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের বহু শ্রমিক - কর্মকর্তাকে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ছাটাই করা হয়। কোনো উদ্যোগ না নিয়ে কেনো এই ছাটাই তাও এখন অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। জানা গেছে, ২০৯ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরগ্রহণের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সেই নোটিশ যারা অমান্য করেছেন তাদের মধ্যে ৪২ জনকে ছাটাই করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ যেনো মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠানকে জোর করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া। এ সকল ছাটাইকৃত শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের চাকরী ফেরত পাওয়ার জন্যও বর্তমান সরকারের কাছে তদবির চালাচ্ছে বলে খবর আছে।
বর্তমান অবস্থা:
শুরুতেই উল্লেখ করেছি, টেশিসকে আবারও দাড় করানোর চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং মিডিয়াগুলোতে খবর আসছে টেশিসকে নিয়ে। তবে আসল বিষয় হলো, টেশিস চীন থেকে ৮ হাজারের কিছু বেশী টেলিফোন সেট আমদানী করছে নিছক ব্যবসা করার জন্য। চীনের সেট তারা এদেশে এনে বিক্রি করবে। তাছাড়া তেমন কোনো বিশেষ কিছু নয়। তবে হ্যা, মন্ত্রীমহদয় এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য এ বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়ার পর থেকে টেশিস অনেকগুলো উদ্যোগ নেবার কথা ভাবছে। তার মধ্যে হলো, ফোনের চার্জার, ব্যাটারীর চার্জার, ডিজিটাল মিটার। বিশেষ ভাবনার মধ্যে আছে, মোবাইল ফোন সেট উৎপাদন করা। তার জন্য দক্ষ জনবল এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করতে অনেক সময় লাগবে। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে টেন্ডার চাওয়া হয়েছে। বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানি যাচাই-বাচাই করে যদি কাজ করতে আগ্রহী হয় তবেই শুধু টেশিসের আশার আলো জ্বলবার সম্ভাবনা আছে। তা না হলে টেশিস সেই অন্ধাকারেই থেকে যাবে।
বিশেষজ্ঞ মতামত:
দেশের অন্যতম বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের প্রকৌশলী বিভাগের পরিচালক প্রফেসার মোহাম্মাদ আনোয়ার টেশিস সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘বর্তমান বিটিসিএল থেকে রেহাই না পাওয়া পর্যন্ত টেশিসকে তুলে দাঁড় করানো অনেকটা অসম্ভব।’ এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘টেশিসের কাজটা পাইয়ে দেয় বিটিসিএল। সুতরাং সে ক্ষেত্রে বিটিসিএল কোন ভাবেই টেশিসকে সহযোগিতা করছে বলে মনে হচ্ছে না। বরং বিটিসিএলের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিপাকে পড়েছে টেশিসের মতো সম্ভাবনাময় একটি প্রতিষ্ঠান।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘টেশিসকে প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলার কাজটা করা উচিত ছিল শুরু থেকেই কিন্তু কোন সরকার তা করেনি। এতে করে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রযুক্তির অনেক বাইরে চলে গিয়েছে। একে যদি দাঁড় করানো উদ্যোগ নেয় হয় তবে তা হবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের ব্যপার। কারণ, শুধুমাত্র বিল্ডিংটাই কাজে আসবে বাকি সব কিছুতে আনতে হবে পরিবর্তন। এমনকি বর্তমান যেই শ্রমিকরা আছেন তাদের প্রশিক্ষণেরও প্রশ্ন আসবে। আর ভেতরের সমস্ত যন্ত্রপাতি বাতিল করে নতুন করে সমস্ত কিছু সংযোজন করতে হবে। তবে এতবড় উদ্যোগের জন্য সরকারকে আবেগ দিয়ে চিন্তা করতে হবে। দেশীয় এ প্রতিষ্ঠানকে ঢালাওভাবে সাজানোর বিষয় নিয়ে বৃহৎ উদ্যোগই পারে টেশিসকে রক্ষা করতে।’ প্রফেসার আনোয়ার আরও বলেন, ‘যেহেতু টেশিসের মূল কাজ উৎপাদন সে ক্ষেত্রে এটি দেশীয় একটি শিল্প। তাই এই প্রতিষ্ঠানকে বিটিসিএল থেকে আলাদা করে সম্পূর্ণ বেসরকারীকরণ অথবা শিল্প মন্ত্রনালয়ের হাতে ছেড়ে দেয়া।’ তারপরও টেশিসকে দাড় করাতে গেলে কারিগরী দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলার ব্যপারে প্রশ্ন করলে প্রফেসার আনোয়ার বলেন, ‘যদিও সরকার কখন কোন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে কারিগরী সহযোগিতা চাবে না। তারপরও যদি সরকার আন্তরিক হয় তবে আমরা টেশিসকে কারিগরী প্রশিক্ষণ দিতে সদা প্রস্তুত আছি। আমাদের সেই পরিমাণ দক্ষ জনবল আছে।’ প্রফেসার আনোয়ার এও উল্লেখ করেন, ‘তারপরও এই প্রতিষ্ঠানকে কারিগরী দিক শুধু নয়; ব্যবসার আঙ্গীকেও চিন্তা করতে হবে। এজন্য সরকারের উচিত হবে, করিগরী, আইনি, ব্যবসার দিকগুলো বিবেচনা করে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠনের। তাদের সূদুর প্রসারী পরিকল্পনার প্রতি সরকার পূর্ণ আস্থা এনে কাজে নামলে মনে হয় কিছুটা হলেও টেলিযোগাযোগের এই ক্ষাতটি রক্ষা করা যাবে।’

মজার বিষয় হচ্ছে, বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগের বাজার দখল করে নিচ্ছে। অথচ দেশীয় সম্পদ টেশিস সরকারের অনিহা আর অবহেলায় সকলের আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে। একে কোনো ভাবেই যেনো তুলে দাড় করানো কথা ভাবছে না সরকার। হঠাৎ হঠাৎ ছোট খাটো কিছু পদক্ষেপ আশার আলো দেখালেও তা ভেস্তে যাচ্ছে বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে। টেশিসকে যখন চালু করা হয় তখন তা ছিল এ্যানালগ প্রযুক্তিতে তৈরী। বর্তমান আমাদের বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখছে ডিজিটাল বাংলাদেশে রুপান্তরিত হওয়ার। তাই টেশিসের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী-শ্রমিকরা আশায় বুক বাঁধছেন যে, সেই ডিজিটাল বাংলাদেশের ছোঁয়া তাঁদেরও লাগবে। তারা সর্বক্ষন অপেক্ষা করছে তাদের প্রিয় এই প্রতিষ্ঠানের আবার চালু হওয়ার। তারা অপেক্ষা করতে চায়। তারা অপেক্ষা করতে চায় আরেকটি পুনর্জন্মের।
-------------------------------------------------------------------------
লেখাটি গত ২২ অক্টোবর ২০০৯ ইং - এ দৈনিক সমকালে ইষৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ পেয়েছে]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29031043 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29031043 2009-10-24 11:38:59
কাব্যধারায় ভিন্নতা সৃষ্টিকারী কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়‍ কমরেড, আজ নতুন নবযুগ আনবে না? কুয়াশাকঠিন বাসর যে সম্মুখে। লাল উল্কিতে পরস্পরকে চেনা - দলে টানো হতবুদ্ধি ত্রিশঙ্কুকে, কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না?

লাইনগুলো পদাতিক কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা “সমকালের গান” থেকে নেয়া। এই কবিতা দিয়ে যিনি প্রবেশ করেছিলেন বাংলা কবিতায় তিনি যে বিপ্লবী কবি তা নিঃসন্দেহে বলে দেয়া যায়। বাংলা কবিতার জগতে সুভাষ মুখোপাধ্যায় অনেকটা চমক দেখিয়েই প্রবেশ করেছিলেন। ‘চমক’ শব্দটি ব্যবহার এই জন্যে যে তিনি বাংলা কবিতার প্রথম কবি যিনি প্রেমের কবিতা দিয়ে কাব্য অঙ্গনে প্রবেশ করেননি। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অভিনবত্ব ছিল ঐখানেই। রাজনৈতিক সচেতন সুভাষ রাজনৈতিক কবিতা দিয়েই ঢুকে গিয়েছিলেন কাব্য জগতে। শুরু থেকেই ছিলেন বিপ্লবী। মার্কসীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ সুভাষ মুখোপাধ্যায় শুরুতেই প্রকাশ করে দিয়েছেন তাঁর চিন্তা চেতনার দর্শন। রাজনীতি, সমাজ, দেশ কিংবা ইতিহাস নিয়ে কি ভাবেন তাও সরাসরি প্রকাশ করে দিয়েছেন কবি সুভাষ।
সর্বপ্রথম সুভাষ রাজনীতিকে নিয়ে এসেছিলেন বাংলা কবিতায়। বাংলা কবিতাকে তিনি দেখিয়েছেন এক নতুন দিগন্ত। মাত্র ২১ বছর বয়সে আক্রমণাত্মক কবিতা লিখে তিনি মন কেড়েছেন তৎসময়ের বিখ্যাত কবিদেরও। তরুণতম কবি হিসেবে প্রবেশ করে তাক লাগানোর মত কবিতা নিয়ে যখন “পদাতিক” কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ হয় তখন কবি বুদ্ধদেব বসু তাঁকে নিয়ে লিখে ফেলেন একটি লিখা। যাঁর শুরুতেই তিনি লিখেন,

দশ বছর আগে বাংলার তরুণতম কবি ছিলাম আমি। কিন্তু ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ বেরোবার পর থেকে সে সম্মান হলো বিষ্ণু দে-র ভোগ্য, যতদিন না সমর সেন দেখা দিলেন তাঁর ‘কয়েকটি কবিতা’ নিয়ে। স¤প্রতি এই ঈর্ষিতব্য আসন সমর সেনেরও বেদখল হয়েছে, বাংলার তরুণতম কবি এখন সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

তাঁর কাব্য জীবনকে স্বাগতম জানিয়ে এভাবেই বুদ্ধদেব বসু আলোচনা চালিয়েছিলেন। পদাতিকের সার্থকতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করার শুরুতেই তিনি বলেছেন,
...তাঁর সম্বন্ধে সবচেয়ে বড়ো কথা এই যে মাত্র কয়েকটি কবিতা লিখে তিনি নিঃসংশয়ে প্রমাণ করেছেন যে তিনি শক্তিমান ; যে-কোনো আদর্শেই না বিচার করি, মন দিয়ে পড়লে তাঁর কাব্যের সার্থকতা স্বীকার করতেই হয়।
এই ব্যতিক্রম কাব্য সৃষ্টিকারী কবি ১২ ফেব্রুয়ারী ১৯১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্ম গ্রহণ করেন। তরুণ বয়েস থেকেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী। সেই দর্শন থেকেই তার কবি হয়ে ওঠা। ফ্যাসিবাদের উত্থান সেই সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক সংকট যে মহনতি মানুষগুলোর উপর প্রভাব ফেলে তা তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন। আর বুঝতে পেরেছিলেন বলেই নতুন কিছুর প্রত্যাশায় এবং একটি নতুন পৃথিবী সৃষ্টির লক্ষ্যেই সমকালিন বাস্তবতায় চমকসৃষ্টিকারী কাব্য রচিত হয়েছে তাঁর পদাতিকে। এই গ্রন্থের অন্তর্গত একটি কবিতা হচ্ছে মে দিনের কবিতা। এ কবিতায় তিনি নতুন প্রজন্মকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। নতুন প্রজন্মকে রোমান্টিকতা পরিহার করে সমাজের বাস্তবতা দেখে যাওয়া আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কবিতাটির শুরুতেই উল্লেখ করেছেন,

প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা, চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।

ফুল দিয়ে তিনি বিলাসবহুল জীবনকে বুঝিয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, ফুল দিয়ে নিজের তুচ্ছ আবেগ দেখানোর সময় আর নেই। এবং সেই সাথে বিলাসী জীবনটাকে তিনি পরিহারও করতে বলেছেন। পৃথিবী যেভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে বিলাসী জীবনের দিকে না ঝুঁকে বাস্তবমুখর জীবন মোকাবেলা করবার শক্তি অর্জন করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
কবিতা দিয়েই তিনি রাজনীতির দর্শনগুলো তুলে ধরেছেন অন্যের কাছে। কখনই তিনি কবিতার সাথে রাজনীতিকে আলাদা করে দেখেননি। তাঁর লেখাগুলো পড়লে একটি লাভ আছে। তা হচ্ছে, তাঁর লেখায় সে সময়কার অনেক চিত্র ফুটে ওঠে। যদিও লেখক কিংবা কবিদের কাজ হচ্ছে সময়কে ধরে রাখা। রাজনীতিও কবিতার বাইরে নয় এই ধারণাটা সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তাঁর লেখা “কবিতার বোঝাপড়া” শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন,

‘মানুষ’ বলতেই একটা বিশেষ মানুষ আমার মনের মাঝখানে ভেসে ওঠে....যখন কবিতা লেখা হয়, নিরাকার নির্গুন মানুষে কাজ হয় না। কবিতার জন্য চাই গুণধর মানুষ। সে মানুষ এমন হবে যাকে ধরা-ছোঁয়া যাবে....আমি যেমন পাঁচ ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে দেখি, তেমনি অন্যের পাঁচ ইন্দ্রিয়কে প্রত্যক্ষভাবেই দেখাতে চাই। কবিতার জগতে সব কিছুরই হয় গড়ন নয় স্বাদ, হয় রং নয় গন্ধ, আছে- সব কিছুরই ধরা-ছোঁয়া যায় বলেই পৃথিবী শুধু পৃথিবী নয়, পৃথিবী ধরণী। ... জীবনের ডালে কবি নাড়া বাঁধে।
(চতুরঙ্গ, মাঘ ১৩৬৩, ৩৪৭ পৃষ্ঠা)

সুতরাং পৃথিবীর কোনো ঘটনাই কবিতার বাইরে নয়। আর কবিতাও পৃথিবীর বাইরে নয়। তাই কবিতায় পৃথিবীর কথা থাকতে হবে। আর পৃথিবীর কথা বলতে গেলেই বলতে হবে রাজনীতির কথা। বলতে হবে বুর্জুয়াদের অন্যায় শাসনের কথা। বলতে হবে খেটে খাওয়া মানুষের কথা। পৃথিবীর হানাহানিতে মানুষ দিশেহারা হয়ে ঘুরে ফেরে। সেই মানুষগুলোকে দেখাতে হবে স্বপ্ন। উদ্দিপ্ত করতে হবে নতুন পৃৃথিবীতে সৃষ্টির। নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখাতে হবে। আর তা খুব ভালো ভাবেই করে গেছেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তাই তিনি রাজনীতিও ছাড়েননি ও কবিতাও ছাড়েননি।

শুরু থেকেই আমি কবির পদাতিক কাব্যগ্রন্থ নিয়ে কথা বলছি। ঘটনাটি হয়তো অনেকের বিরক্তির উদ্রেক ঘটাতে পারে। তবে সত্যি কথা বলতে, পদাতিক বাংলা কবিতাকে নিয়ে গেছে অনেক দূর। পদাতিকের সফলতার পথ ধরে সে সময়কার বহু কবি এর পরপরই লিখতে শুরু করেছিলেন রাজনৈতিক কবিতা। সুতরাং সুভাষ বাংলা কবিতাকে দিয়ে গেছেন বৈপ্লবীক রূপ।
কবিতার পাশাপাশি সুভাষ রচিত বহু ছড়াও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এখানে মজার বিষয়টি হচ্ছে, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছড়া লেখা শুরু করেন যখন তাঁর বয়স ষাট পার হয়েছে। ভাবতেই অবাক লাগে। যে কবি এতো অল্প বয়সে রাজনৈতিক কবিতা লিখে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সেই কবি ছড়া লিখতে বসলেন জীবনের শেষ প্রান্তে। কবির বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো ছিটানো ছড়গুলো নিয়ে যখন বই বের করবার সিদ্ধান্ত হলো তখন ১৯৬৯ সাল। সেই উদ্যোগের সফলতা আসে ১৯৮০ সালে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম ছড়ার বই “মিউ-এর জন্য ছড়ানো ছিটানো”। পদাতিক যেমন আলোড়ন সৃষ্টি করলো ঠিক সেভাবেই মিউ এর জন্য ছড়ানো ছিটানোও ছড়া জগতে উন্মোচন করলো আরেকটি নতুন দিগন্ত। ছন্দের এক আশ্চর্যের খেলা দেখলো পাঠকরা। এর পর টানা বের হলো আরও তিনটি ছড়ার বই। যার মধ্যে একটি হচ্ছে, যুক্তাক্ষর বর্জিত। তবে ছড়াতেও তিনি বিদ্রোহভাব বর্জন করতে পারেননি। যেমন, তাঁর পারুলের বোন ছড়াটি পড়লেই বোঝা যায়।

অন্ধকার পিছিয়ে যায় দেয়াল ভাঙে বাধার সাতটি ভাই পাহারা দেয় পারুল, বোন আমার- দেখি তো কে তোমায় পায় বেড়ি পরায় আবার? শুয়ে শুয়ে দিন গুনছে পারুল বোন আমার। সোনার ধানের সিংহাসনে কবে বসবে রাখাল কবে সুখের বান ডাকবে কবে হবে সকাল!

অসাধারণ এই ছড়াটির কিছু অংশ তুলে ধরলাম কবির বিদ্রোহ কিংবা বুর্জুয়াদের শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার কন্ঠটিকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যই। তাঁর ছড়া সম্পর্কে আরও কিছু উল্লেখ করা জরুরী বলে মনে করি। তবে তা আমার মতো তুচ্ছ ব্যক্তির মতামত দিয়ে নয়। তার ছড়া নিয়ে অধুনালুপ্ত মাসিক পত্রিকা সারস্বত প্রকাশ- এর (সম্পাদক: অমরেন্দ্র চক্রবর্তী ও দিলীপকুমার গুপ্ত) প্রথমবর্ষের সপ্তম সংখ্যায় ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা’ শীর্ষক রচনায় সেই ১৯৬৮ সালেই হিমানী বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন,
তাঁর দুই যুগের রচনাতেই আরেকটি প্রকরণের অনায়াস ও ব্যক্তিমন্ডিত নৈপুণ্য আমাদের মুগ্ধ করে - সেটি ছড়া। লৌকিক ছাড়ার চালে প্রয়োজিত তাঁর আপাত হালকা রাজনৈতিক ছড়াগুলি- কিন্তু অনুভূতির তীব্রতা, বিশ্বাসের গভীরতা, প্রচন্ড ও অন্তরঙ্গ উত্তাপ এই আপাত ছেলেমানুষি ছড়াগুলোকে বয়স্ক পাঠকেরও মনোমুগ্ধকর করে তোলে। অন্নদাশঙ্করের রাজনৈতিক ছড়ার চেয়েও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ছড়ার লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা অনেক বেশি। আর ছড়ার ভঙ্গিটি যুগপৎ লৌকিক ও শিক্ষিত, বিদগ্ধ ও অনুভূতিময়, কৌতুকে ভরা- পরিচ্ছন্ন, অনায়াস ও সংযত।

সকলের কাছে এভাবেই গৃহিত হয়েছেন সুভাষ বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা কাব্য জগতে তিনি যে এক প্রবাদ পুরুষ তা নিশ্চয় এখন আর কারও বোধের বাহিরে নয়। তিনি যে বাংলা কাব্যকে সেই চল্লিশ শতকেও শাসন করতে সক্ষম হয়েছেন তাও নিশ্চয় এখন প্রমাণিত।
সুভাষ মুখোপাধ্যায় নিজের পান্ডুলীপি সংরক্ষণে অনেক অসচেতন ছিলেন। তার বিভিন্ন ছিন্ন পত্রে কিংবা ভক্তদের দেয়া বিভিন্ন বইগুলোতে সাক্ষর দেয়ার সময় তিনি ছড়া জুড়ে দিতেন। সেইগুলোকে নানা ভাবে একত্র করবার এক ক্ষুদ্র চেষ্টা করছিলেন তাঁর অনুরাগীরা। তিনিও তালিকা নির্মাণে সহযোগিতা করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তার স্বাস্থেরও অবনতি হতে থাকে। এক পর্যায়ে তালিকাও প্রস্তুত। কবি তখন উৎসর্গ পত্রটি লিখলেন এবং বললেন, এ বইয়ের জন্য একটা ভূমিকা থাকা জরুরী, লিখে রাখব কাল সকালে, খুব ছোট করে।
ভূমিকাটি তাঁর আর লেখা হলো না। পরদিন সকালেই তিনি অসুস্থ হয়ে গেলেন। নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। আর তাঁর ফেরা হয়নি। ৮ জুলাই (২০০৩) ভোরে তার জীবন অবসান হয়। সেই সাথে অবসান হয় এক কিংবদন্তির পথ চলা। সুভাষ মুখোপাধ্যায় জীবনে বহু সংগ্রাম করেছেন। কমিউনিসম রাজনীতি করার জন্য তাকে কারাভোগও করতে হয়। ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলে আড়াই বছর তাকে কারাবাস করতে হয়। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি লেগে ছিলেন লেখালেখির জগতের সাথে এবং রাজনীতির সাথে। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট কবি সুভাষ ১৯৫২ সালে চটকল শ্রমিকদের সংগঠিত করবার এক চেষ্টা করতে শুরু করেন। শক্তিশালী কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় শুধু কবিতা কিংবা ছড়া নয়; গদ্য রচনাতেও গৌরব অর্জন করেছিলেন। তাঁর কর্মকৃতি স্বরুপ সাহিত্য আকাদেমি পুরষ্কার (১৯৬৪), আফ্রো-এশীয় লোটাস পুরস্কার (১৯৭৭), আনন্দ পুরস্কার (১৯৯১) সহ আর বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29029209 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29029209 2009-10-20 22:04:15
গল্প: "সময়" শুরুতে খুব কষ্ট পেতাম। ভাবতাম, যে মানুষটির জীবিত থাকার সম্ভাবনা নাই সে মানুষটি অন্যের কাছে কতটা অবহেলার পাত্র হয়ে যায়। সেই অবহেলাটা আমার মনের একদম গভীরে গিয়ে আঘাত দিতো। যখন ওয়ার্ডের লাইটগুলো বন্ধ হয়ে যেতো আমি তখন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতাম। এই অবহেলা শুরুতে কষ্ট দিলেও এখন খুব হাসি পায়। মনে মনে বলি, আরে প্রতিটা মানুষই তো আ পেষেন্ট ফর ডেথ। এটা মনে হয় সবাই ভুলে যায়। রোগীদের দিকে সবাই যেভাবে করুণার দৃষ্টিতে তাকায় তাতে মনে হয় মৃত্যু যেনো শুধু এই মানুষগুলোর জন্যই; তাদের যেনো মৃত্যু বলে কিছু নেই। তারা ভুলে ভাবেও না যে, হয়তো এই রোগীটার আগেও তার মৃত্যু হতে পারে। এই তো সেদিন, আমার পাশের বেডে একটা ছেলে ছিল। তারও ক্যান্সার। ধীরে ধীরে সে মৃত্যুর দিকেই এগুচ্ছে। সেই ছেলেটির নাম ছিল সবুজ। সবুজকে ওর চাচা সেদিন দেখতে আসলো। সে কি কান্না লোকটার। বার বার শুধু বলছিল, কেন তুই আমাগো ছাইরা এত সকাল চইলা যাবি। দূর্বল সবুজ চুপচাপ শুনছিল। সবুজের কোন বিকার ছিল না। তো, সেই লোকটি হাসপাতালের সিড়ি দিয়ে নামার সময় হঠাৎ বুকে ব্যাথা হয়। সাথে সাথে অজ্ঞানও হয়ে যায়। পরে দৌড়া-দৌড়া করে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ডিউটি ডাক্তারের কাছে। দেখা গেলো লোকটির পাল্স পাওয়া যাচ্ছে না। তার কিছুক্ষণপর বলা হয়, উনি মারা গেছেন। সবুজ সংবাদটি শোনার পর মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে আমাকে বলছিল, দেখছেন রাশেদ ভাই, এহন কে কারে ছাইরা গেলো।
কি অদ্ভুদ মানুষের মৃত্যু! মৃত্যু হয়তো এমনই হয়। আকষ্মাত হামলে পড়ে। কখন কিভাবে কোথায় আসবে তাও কারও জানা নেই।
তবে মৃত্যু ব্যপারটার সাথে আমার পরিচয় অনেক পুরাণ। একে আমি দেখতে দেখতে অভ্যস্থ হয়ে গেছি। মৃত্যুর আক্রমণে আমি ভয় নামক বস্তুটাকেও হারিয়ে ফেলেছি।
শুরুতেই এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন আমার বাবা। বাবা। শব্দটা কেমন যেনো! তাই না? বাবা মানেই যেনো কোন ভয়! অনেক বাধা। বাবা মানে বট গাছ। জীবনের নিশ্চিত নিরাপত্তা। বাবা মানে পৃথিবীর সমস্ত বাধাকে ডিঙিয়ে পাড়ি দেওয়ার প্রেরণা। বাবা মানেই বুকে বল।
আর আমি সেই বাবা নামক বটগাছটাকে ভেঙে যেতে দেখেছি। এক ভয়ঙ্কর সত্ত্বাকে আমি দেখেছি জীবনের কাছে পরাজিত হতে। এক শক্তিশালী সাহসী মানুষকে আমি দেখেছি তিলে তিলে মৃত্যুর কাছে পরাজিত হতে। বাবার কথা মনে হলে, একটা চাপা অপরাধবোধ জেগে ওঠে।
বাবাকে আমি প্রচন্ড ভয় পেতাম। বাবা যখন হাসপাতালের বেডে শরীর এলিয়ে শুয়ে থাকতো। তখন আমাকে পাশে পেলেই বলত, এই ছাগল, দাড়িয়ে আছিস কেন? আমার পাশে বস। ভয়ের কারণে বাবার থেকে একটু দূরে দূরে থাকাটা আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। বাবা কাছে ডাকলে আমার বুকটা ধক ধক করা শুরু করতো। তাই বাবার পাশে বসতেও আমার অস্তস্থি লাগত। তারপরও বাবা বলেছে তাই বসতে হবে। তাই একটু বসতাম। বাবা তখন আমার হাতটা তার ঠোটের সাথে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতো। আর বাবার গরম নিশ্বাসটা আমার হাতে এসে লাগতো ব্যপারটা আমার মোটেও ভালো লাগতো না। তারপরও বসে থাকতাম। উঠে গেলে বাবা যদি রাগ করে!
একদিন ঠিক একই ভাবে বাবা আমাকে কাছে ডাকলেন। আমার হাত বাবার ঠোটের সাথে লাগানো। আমি তখন অস্বস্তি নিয়েই বসে আছি। হঠাৎ অনুভব করলাম, বাবার নিশ্বাস আমার হাতে এসে পড়ছে না। আমি সাথে সাথে তাকালাম বাবার দিকে। দেখি, বাবা চোখ বন্ধ করে মরার মতো ঘুমাচ্ছে। অপেক্ষা করলাম, বাবার নিশ্বাস আমার হাতে এসে লাগবে। কিন্তু না। লাগছে না। চিৎকার করে নার্সকে ডাকি। নার্সকে বলি, দেখেন বাবা কেমন মরার মতো ঘুমাচ্ছে। নার্স পালস চেক করে বলল, মরার মতো ঘুমাচ্ছে না বাবা। উনি একদমই ঘুমিয়ে গেছেন।
সেদিন থেকে বাবার সামনে সেই অস্বস্তিবোধের জন্য অপরাধবোধ হয়। পিতা একমাত্র সন্তানের হাত ধরে বসে মৃত্যুর সাথে লড়তে চাইতো। মৃত্যুকে বলতে চাইতো, দেখ আমাকে নিলেও আমি আমার রক্ত রেখে যাচ্ছি। আমি পরাজিত হবো।
অথচ আমি নালায়েক সন্তান বাবার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে পারলাম না। বাবা আমার হাত ধরেই মৃত্যুর কাছে পরাজিত হলো। এই প্রথম দেখলাম মৃত্যু।
স্বামীর মৃত্যুর খবর তার স্ত্রীকে দিতে হবে। একমাত্র সন্তান হিসেবে আমার এই বিরাট দায়িত্বটা নিতে হয়েছিল। এই দায়িত্বটা যখন আমি কাধে নেই তখন আমার বয়স ছিল ১৬। আমি দায়িত্ব পালন করি। বাবাকে কবরে নিজ হাতে শোয়ানোর মতো আরেকটি দায়িত্ব পালন করি। বাবাকে একাকী একটি মাটির ঘরে রেখে তার উপরে বাশের ছাউনি দেয়া থেকে শুরু করে তার উপরে মাটি চাপা দেয়ার মতও অস্বাভাবিক কাজটা করি। হ্যা। অস্বাভাবিক। আমার কাছে অস্বাভাবিক। আমার বাবা! আমার বাবাকে আমি মাটি চাপা দিয়েছি। আজও চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় সে দৃশ্য। আজও। আজও দেখি সাদা কাপড়ের ভিতর বাবার নিথর চিমসে যাওয়া দেহ।
এই ছিল মৃত্যুর সাথে আমার প্রথম পরিচয়।
দ্বিতীয় পরিচয়টাও খুব বেশী সময় নেয়নি। যখন আমার মা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তখনও আমি আমার মায়ের পাশে। আমার মা আমার দিকে তাকিয়ে অসহায় হয়ে বলেছিল, বাবা তুই এতো অভাগা কেন?
মায়ের প্রশ্ন শুনে আমি তখন হেসে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, কারণ তোমরা। তোমরাই আমাকে অভাগা করে দিয়েছ। মা চুপচাপ হয়ে চোখের পানি ঝরিয়েছিল। একদিন মা আমাকে বলল, তুই বলেছিলি তোর বাবা নাকি তোর হাত ধরে চলে গিয়েছিল।
আমি তখন মাথা নাড়াই। মা আবার বলে, তোর হাতটা একটু দিবি?
আমি বললাম কেন?
- তোর হাতটা একটু শুকে দেখি তোর বাবার নিশ্বাসের গন্ধটা পাওয়া যায় নাকি!
হায়রে বাঙালী নারী। মৃত্যুর সামনে দাড়িয়েও স্বামীকে ভুলতে পারে না। হাতটা মার নাকের সামনে বাড়িয়ে দেই। মাও ঠিক বাবার মতই আমার হাত জড়িয়ে ধরে বসে ছিল। মা'র কমল স্পর্শে আমি আবেগের কাছে হারতে বসেছিলাম। চোখ দিয়ে পানি অবারিত ধারায় ঝরা শুরু করলো। মা মিষ্টি মুখ করে আমার হাতকে ধরে রাখল। আর হঠাৎই অনুভব করলাম বাবার মত মাও একি কাজটা করল। স্বামীর নিশ্বাসের গন্ধ খোজার জন্য মাও পাড়ি জমালেন অন্ধকার জগতে।

এভাবেই আমাকে একা করে সবাই চলে গেলো। আর আমি অসহায় হয়ে দেখেছি। সব দেখেছি। তাই বললাম আপনাদের, আমার সাথে মৃত্যুর একটা পুরাণ সম্পর্ক আছে।
এখন সেই মৃত্যুর মুখোমুখি আমি স্বয়ং। তাই মৃত্যুকে চুপিচুপি বলি, আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমি তোমাকে ভয় পাই না। নিজের মৃত্যুর চেয়েও বড় কষ্টকর আপন মানুষের মৃত্যু। আর আমি তা সহ্য করেছি। সেই ব্যথা আমি বুকে বহন করে চলেছি অনেকগুলো বছর। আর তাছাড়া তো আমি আমার মৃত্যু দেখবো না। আমিতো শুধু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি মাত্র।
২.
হাসপাতাল করিডোর ভরা মানুষ। তারা নাকি আমাকে দেখতে এসেছে। ওহ। আপনাদের তো বলা হয়নি। আমি এখন এ শহরের অত্যন্ত জনপ্রিয় মানুষ। শহরের অলিতে গলিতে আমার পোষ্টার। টিভিতে আমাকে নিয়ে একটা নিউজও হয়েছে। অনেগুলো পত্রিকাতেও আমার ছবির সাথে কলাম লেখা হয়। এমনকি একজন জনপ্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্বও আমাকে নিয়ে কলাম লিখেছে।
না না। আপনারা আবার ভাববেন না আমি মহা কোন কাজ করে ফেলেছি। আমি নগন্য মানুষ আর কিই বা করতে পারি। শরীরে একটা রোগ বাধিয়ে আমি মানুষের সাহায্য চাইছি। সব জায়গায় একই সুর। একজন ক্যান্সার রোগীকে সাহায্যর জন্য এগিয়ে আসুন। অথবা, একজন এতিম অসহায় ছেলেকে জীবন দান করুন। এধরনের বহু লাইন ব্যবহার হচ্ছে। একজন দরিদ্রর ছেলের পাশে এখন দেশবাসী দাড়িয়েছে। কারণ হচ্ছে, আমি এতিম। আমার কেউ নাই। বাবা নাই। মা নাই। ভাই-বোনও নাই। এ পৃথিবীতে অবশিষ্ট মানুষগুলোর কাছেই আমার জীবন নির্ভর। তাই আমি অসহায়। তবে এ জনতার কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য সাহায্য করছে। আমি অপরিচিত একজন মানুষ। তাও সাহায্য আসছে। ব্যপারটা কেমন না! এদেশের মানুষতো আসলে খারাপ না। দলে দলে এগিয়ে আসে।
আমার জন্য নাকি কনসার্ট আয়োজন করা হচ্ছে। যদিও ছোট খাটো অনেক কনসার্ট হয়েছে। তবে এবারেরটা নাকি অনেক বিরাটাকারের কনসার্ট। আশা করা হচ্ছে, এই কনসার্টেই নাকি ১৫ লাখ টাকা আসবে। বড় বড় ব্যন্ড দলগুলো এতে অংশগ্রহণ করবে। একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেল এই অনুষ্ঠান লাইভ দেখাবে। টিভি চ্যানেলের নাকি এই অনুষ্ঠানের জন্য অনেক স্পন্সর জোগাড় করে ফেলেছে। বাহ কি মজার ব্যপার। কতগুলো মানুষের আমার জন্য অনেকগুলো পয়সা কামাতে পারবে। আবার টিভি চ্যানেলটি এই কনসার্টের প্রচারণার জন্য বিজ্ঞাপন সংস্থার সাথেও যোগাযোগ করছে। ঢাকা শহরের সর্ব বৃহৎ কনসার্ট বলে কথা। সেই কনসার্টে সুযোগ পাওয়ার জন্য ছোট ছোট অজনপ্রিয় ব্যন্ডদলগুলোও নাকি লবিং চালাচ্ছে।
যাইহোক। এতো ভিড় ভাট্টা ঠেলে একটা ছেলে আমার দিতে এগিয়ে আসলো। আমার বেডের পাশে এসে দাড়ালো। ছেলেটি দেখতে কেমন যানি উদ্ভট। চুলগুলো দুপাট দিয়ে ছোট আর সামনের মাঝখান বরাবর খাড়া করা। ছেলেটির চুলের দিকে তাকানো মাত্র আমার মুরগীর পাছার কথা মনে করিয়ে দিল। একদম যেনো মুরগীর পাছা। তো, ছেলেটি এগিয়ে এসে খুব বিনয় নিয়ে বলল, বস ভালো আছেন?
আমি একটু বিব্রতবোধ করলাম। আরে! আমার মতো এক হতদরিদ্র অসহায় ছেলেকে কেন ও বস বলছে। আমি চুপ করে মাথাটা নাড়লাম। ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল, ভাইয়া, আসলে আমি আপনার কাছে একটা রিকোয়েস্ট নিয়ে এসেছিলাম। আপনি কিন্তু না বলতে পারবেন না। আগামীকাল ঢাকায় আপনার জন্য ফান্ড রেইস করার জন্য একটা কনসার্ট আয়োজন করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় অনেক জনপ্রিয় ব্যন্ড দলগুলো আসবে। হাজার হাজার মানুষের সমাগম হবে। আমি সেই কনসার্টে অংশ নিতে চাই। আমাদের বন্ধুদের একটা ব্যন্ড দল আছে। আপনি বললে ওরা মানা করতে পারবে না। প্লিজ আপনি যদি একটু বলে দিতেন......
কথাগুলো যখন বলছিল তখন আমার প্রচন্ড হাসি পাচ্ছিল। হাসিটা আমি চাপা দিয়ে রেখেছিল। আহা! কি অনুনয়। আজ আমার হাতে কত্ত ক্ষমতা। একটা কনসার্ট হচ্ছে সেখানে কত মানুষের ক্যারিয়ারও নির্ভর করছে। ব্যপারটা ভাবতেই ভালো লাগে। আমি তাহলে এখন অনেক ক্ষমতাধর মানুষ। সেই ক্ষমতার দম্ভে আমি বলি, আসলে আমার কিছুই করার নাই। আমি যতটুকু জানি সব কিছু ফাইনাল হয়ে গেছে।
ছেলেটি মোটেও নিরাশ না। সে আবার বলে, না ভাইয়া। ফাইনাল হলেও বা কি! আপনি বললে ওরা দিতে বাধ্য।
আমি চুপ থেকে বললাম, আপনার নাম কি?
ছেলেটি সাথে সাথে যেনো জীবন ফিরে পেলো। ভাইয়া, আমার নাম দিয়ে কাজ নেই। আপনি শুধু বলবেন, রকিং মিউজিককে যাতে পারফর্ম করতে দেয়।
আমি শুধু মাথা নাড়লাম।
ও চলে গেলো। তার কিছুক্ষণ পর একগাদা সাংবাদিক এসে ভিড় জমালো। তাদের একটাই প্রশ্ন, আপনার কি অনুভুতি? আপনাকে ঘিরে এভাবে জনগন মাঠে নেমেছে। আপনি কি মনে করেন? তারা কেন করছে? বলা হচ্ছে এই ফান্ড থেকে টাকা আসবে ১০ লাখেরও উপর। আর সাথে সাথেই আপনাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হবে। আপনার কি মনে হয়? আপনি কি সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারবেন? আর দেশবাসীর জন্য আপনি কি কিছু বলতে চান?
যখন এতো প্রশ্নের মুখে আমি জর্জরিত তখন আমি চোখটা বন্ধ করে শুনছিলাম ওদের কথা। কারণ, শরীরে আর জোর নেই। শরীরটা দিনকে দিন নিস্তেজ হয়ে আসছে। প্রতিদিন রাতে পেটে একটা প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয়। পরদিন সকাল অবদি তা থাকে। শুরুতে বিকট চিৎকার দিতাম। কিন্তু ব্যথাটার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। ওকে আমি সহ্য করতে পারি। ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা এমনিতেই বিধাতা আমাকে দিয়েছেন। বুকেও মাঝে মাঝে প্রচন্ড ব্যথা হয়। তবে আজকে আমার সর্ব শরীরে ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে, কেউ মনে হয় আমার সব কিছুকে ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে। বুকের একটা নতুন অনুভুতিও সৃষ্টি হচ্ছে। কেমন যানি, চিন চিন ব্যথা। মনে হচ্ছে, বুকে অনেক বড় একটু কিছু আটকে আছে। আর পায়ের আঙুলগুলোও মনে হচ্ছে নাই নাই। আমার জীর্ণ শরীরটা যেনো আমার কাছেই অপরিচিত। এতো অপরিচিত যে সেদিন টয়লেটের ঘোলা আয়নায় নিজেকে দেখে আমি নিজেই ভড়কে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল ওপারে আমি না অন্য একজন মানুষ।
যাইহোক। সেই সব সাংবাদিকদের আমি শুধু একটু বাক্য বলেই বিদায় দিয়েছি। বলেছি, আমি সমস্ত দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ।

সন্ধ্যা হয়েছে। জানালা দিয়ে একটা ঠান্ডা বাতাস বইছে। ঐ বাতাসটা ওয়ার্ডের সব অসুস্থ গন্ধটাকে যেনো সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে। আর ঠিক এমন সময় এক দম্পতি আমার সামনে দাড়িয়ে। সাথে আমার বন্ধু সাবের। সাবের বলল, রাশেদ মিনু তোর সাথে দেখা করতে এসেছে। আমি জানি মিনু এসেছে। মিনু আমাকে বলেছিল, তুমি মৃত্যুর আগে একবার হলেও আমাকে দেখবে।
মৃত্যুর ঠিক আগেই আমি দাড়িয়ে আছি। আর মিনু আসবে এটাই স্বাভাবিক।
ওদের দেখে আমি একটু উঠে বসবার চেষ্টা করি। পারি না। শরীরে শক্তি নাই যে। মিনুর পাশে দাড়িয়ে থাকা লোকটি বলে, থাক থাক আপনি শুয়ে রেস্ট নেন।
আমি হেসে দেই। বলি, আরে ভাই, আমার কাছে রেস্ট নেওয়া মানেই হলো একটু উঠে বসতে পারা। ঐটাই হয়ে উঠছে না। সারাদিন এই পিঠ বিছানায় লেগে থাকে। এই পিটটা বিছানার কাছে ঋণি হয়ে গেছে। এই পিটটা সে কত্তদিন ধরে আকড়ে রাখছে।
মিনু তখন প্রথম কথা বলে উঠলো, এসব দার্শনিক কথার রোগ যায় নি এখনও?
এই প্রথম আমি মিনুর চোখের দিকে তাকাই।
সুখ। শুধু সুখে ভরা ওর চোখের অংশ।
বেশকিছুক্ষণ এরপর নিরবতার মধ্যে দিয়েই যায়। তারপর লোকটি আমার কাছে আসে। এসে আমার হাত ধরে। তারপর বলে, মিনুর কাছে শুনেছি আপনি অনেক ব্যক্তিত্ববোধ পরায়ণ মানুষ। সহজে কারও সাহায্য সহযোগিতা নেন না। তারপরও আপনি কিছু মনে না করলে আপনাকে কিছু সাহায্য করতে চাই।
আমিও বলি, আমি মনে করবো কেন? আমার চিকিৎসার জন্য এখন ৬০ লাখ টাকার দরকার। এতো টাকার কাছে আমার ব্যক্তিত্ব পরাজিত। আমার সব কিছুই হেরে গেছে।
সাথে সাথে লোকটি আমার হাতে একটা চেক ধরিয়ে দেয়। আমি আর কি বলব! বললাম, থ্যাংস।
তারপর কিছু সময় আবার নিরবতা। হঠাৎ লোকটি বলে, এবার তাহলে আমরা যাই। বলেই লোকটি আমার হাতে আবার তার হাত ধরলো। মনে হয়, সে খুব কষ্টে আছে। খুব আবেগ নিয়ে সে বার বার আমার হাত ধরছে।
আর মিনু পাশে চুপচাপ দাড়িয়ে। কোন কথা নেই। লোকটি বিদায় নিয়ে হেটে চলে যাচ্ছে। মিনু তখনও দাড়িয়ে। ওর চোখে বিষন্নতার ছাপ। আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তখন মিনুর দিকে তাকিয়ে বলি, যাও মিনু। হি ইজ ভেরী নাইস ম্যান। আমার ওকে খুব পছন্দ হয়েছে।
বলার সাথে সাথে মিনু চলে গেলো। কিছুই বলল না।
ঠিক সেই আগের মতো। যেভাবে আজ থেকে ৫ বছর আগে চলে গিয়েছিল। আমার মতো উদাসীন, অপদার্থ একটা অহসায় ছেলেকে ফেলে ও চলে গিয়েছিল অনেক দূরে।
ঘটনাটা বলা যাক।
আমি খুব একটা পদের ছেলে ছিলাম না। সারাদিন আড্ডাবাজি। ঘুরাঘুরি। এসব করেই দিন যেতো। পড়াশুনাতেও ওতো মনোযোগ নেই। সেই অপদার্থ একটা ছেলের সাথেই মিনুর প্রেম হয়। প্রেম চলে। ঘাত সংঘাত সব পেরিয়ে প্রেম চলে। কত্ত কত্ত স্মৃতি। সে বিষয়ে আর কথা বাড়ানোর দরকার নেই। মিনুকে সেভাবে সময় দেয়া হতো না। সারাদিনের ভবঘুরে জীবন শেষে যখন ঘরে ফিরতাম তখন এ শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙে যেতো। তাই মোবাইল নামক যন্ত্রটাকেও কানের কাছে ধরে রাখতে এ শরীর সায় দিতো না। সারাদিন ভবঘুরে বলার পর আবার আপনারা ভাববেন না আমি একদমই বখাটে। তা কিন্তু না। আমি কিন্তু নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করতাম। কারণ মাসটাতো আমাকে চলতে হবে। তাই না?
একদিন এ সময় নিয়ে মিনুর সাথে প্রচন্ড ঝগড়া বেধে যায়। এ ঝগড়ায় সময় নিয়ে দরকষাকষি শুরু হয়। কারণ প্রেম তো সময় ছাড়া চলতে পারে না।
ঝগড়াটার স্থায়িত্ব চলে পরদিন পর্যন্ত। আর সরাসরি মিনু আমাকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলে। কারণ জানতে চাইলে বলে ওঠে, তোমার এমন কি আছে যে আমি তোমার সাথে থাকবো?
প্রশ্নটা আমাকে বিভ্রন্ত করে।
তারপর মিনু আবার বলে, না তোমার টাকা আছে.........না তোমার কোন কাজ তোমাকে জনপ্রিয়তা এনে দিতে পারবে..... কি আছে তোমার? একমাত্র ছিল সময়.....সেটাও তুমি আমাকে দাও না।
পৃথিবীর সমস্ত দুখ যেনো আমার উপর এসে পড়লো। আমার সেদিন কিছুই বলার ছিল না। কারণ সত্যটাতো কষ্টকর হবেই। সুতরাং কষ্টটাই আমার প্রাপ্য। কথাটা মেনে নিলাম। আর মিনুকে মুক্তি দিলাম।
৩.
রাতের আকাশে আজ পূর্ণিমার খেলা। অসাধারণ চাঁদ সারা অন্ধকারটাকে মায়াবী আলো ছেয়ে রেখেছে। জানালার পাশেই আমার খাটটা হওয়ায় সে আলোর ছটা আমার শরীরে। অপূর্ব দৃশ্য। আর আজ ব্যথাগুলোও মনে হচ্ছে নেই। মনে হচ্ছে, পূর্ণিমার আলোয় গোসল করে আমার ব্যথাগুলো চলে গিয়েছে। একটু আগে গতকালের কন্সার্ট আয়োজন কমিটি এসেছিল। তারা বলল, সমস্ত টিকিট সেল হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্পন্সর থেকে আর টিকিটের টাকা মিলিয়ে জোগাড় হয়েছে ৯ লাখের কাছাকাছি। আর আগামীকাল কিছু কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কন্সার্টে আমাকে অর্থ সাহায্যের কথা ঘোষনা করবেন। কারণ তারা প্র“ভ করতে চায় যে তারা শুধু ব্যবসায় করে না তারা মানুষের পাশেও দাড়ায়। আমি চুপচাপ তাদের কথা শুনলাম। হঠাৎ সকালে আসা সেই মুরগী চুল আলা ছেলেটার কথা মনে হলো। আমি তাদের বললাম, একটা ছেলে এসেছিল। নতুন ব্যন্ড দল। কালকের অনুষ্ঠানে পারফর্ম করতে চায়। ওদের ব্যন্ডের নাম, রকিং মিউজিক। ওদের কি কোন সুযোগ দেয়া যায়। কমিটির বেটে করে একজন লোক আছেন। তিনি সাথে সাথেই বললেন, অবশ্যই। আপনি বলেছেন আর আমরা রাখবো না! এটা কি বলেন।
আমি হেসে বললাম, জ্বি থ্যাংস। তারপর ওনারা চলে গেলেন।
এখন আমি পূর্ণিমা এনজয় করছি। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কাল আমার জন্য এতো আয়োজন। কাল ঢাকা শহরের মূল কেন্দ্র থাকবো আমি। আমাকে ঘিরে কালকে শহরে মেলা হবে। ঢাকার খেলা হবে। বিকট আওয়াজে গান বাজবে। নতুন প্রজন্মের উচ্ছৃঙ্খল ছেলে-মেয়েরা উদ্যাম নৃত্য দিবে। সবাই দেখবে। কেউ কেউ চুপিচুপি নৃত্যের সাথে মেয়েদের স্তন নড়াচড়ার ছবি তুলবে। তা আর বিভিন্ন ইন্টারনেট সাইটে চলে যাবে। কাল ব্যবসায়ীরা আমাকে অনুদান দিবে। তারা ভরা মজলিশে বলে প্রডাক্ট মার্কেটিং করবে। কাল কমিটির লোকজন লাখ টাকার হিসেব কষতে বসে একে অন্যের সাথে ঝগড়াতেও লিপ্ত হবে। আমার জন্য অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হবে।
আর এ সব কিছুর জন্য হচ্ছে আমি। আমি। কত জনপ্রিয় আমি। একদিনের জন্য ঢাকা শহর ব্যস্ত থাকবে আমার জন্য। আহ। কি আনন্দ আমার। এটাইতো জীবন। আমার জীবনের মূল্য নির্ধারণ হয়েছে ৬০ লাখ। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন উপায়ে এসেছে ৩০ লাখ। কালকেই আমি বিমানে চড়বো। পৃথিবীর বিখ্যাত হাসপাতালে যাবো। বাহ। কি অসাধারণ আমার জীবন। আমাকে বাচানোর জন্য কত্ত মানুষের কত্ত চেষ্টা।
চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। ভেতরকার সব কথা কেন যানি মুখ দিয়ে অনবরত বের হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি আমার চারপাশে অনেক মানুষ এখন জটলা পেকেছে। আমি অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পাচ্ছি। অনুভব করছি আমাকে জোরে জোরে ঝাকানো হচ্ছে। আমি নড়ছি। আমি শরীরের সমস্ত অংশ যেনো খুলে যাচ্ছে। আমি এখনও বলছি, মিনু। আমার এখন সব আছে। আমার টাকা আছে, আমার জনপ্রিয়তা আছে; এখন সব আছে আমার। সব কিছু। খালি সময় নেই। শুধু সময় নেই। সময় চলে গেলো। টাকা না থাকলেও আসে। জনপ্রিয়তা না থাকলেও আসে। কিন্তু সময়? সময় কি ফেরত আসে মিনু? সময়... হাতে সময় নেই.....একদম সময় নেই....

গল্পের শেষ: এভাবেই রাশেদ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। সে রাতেই রাশেদের মৃত্যু হলো। ওকে ঘিরে আয়োজিত কনসার্ট বন্ধ হলো না। কনসার্ট হলো। শুরুর আগে শুধু ১ মিনিট ওর জন্য নিরবতা পালন হলো। তারপর গান শুরু হলো। আর সবাই তখন রাশেদকে ভুলে গেলো। মনে রাখবেই বা কেন! সময়তো কাউকে কারও কাছে ধরে রাখতে পারে না। রাশেদকে যেই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সাহায্য করবে বলেছিল তারাও তাদের মার্কের্টি বন্ধ করেনি। তারাও সাহায্যের ঘোষনা দিয়েছে তবে নতুন কোন রাশেদের জন্য।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29021697 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29021697 2009-10-07 02:41:11
শিক্ষা: শিক্ষানীতিতে শিক্ষকদের নীতির প্রসঙ্গটি আনা হয়েছে কি? শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। এই মেরুদন্ডকে সোজা এবং শক্ত করার প্রয়াস চলছে যুগ যুগ ধরেই। তবে যুগ যুগ বললেও ভুল হবে। বলতে হবে, স্বাধীনতার পর থেকে এই শিক্ষাখাত নিয়ে কাজ চলছে। বিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামতকে অবলম্বন করে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কাজ করছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। গত ২৫ সেপ্টম্বর প্রথমআলো শিরোনাম করেছে আমাদের শিক্ষানীতি নিয়ে। নবগঠিত শিক্ষানীতিই এসেছে মূল প্রসঙ্গে। আবার দৈনিক সমকালের মুক্তমঞ্চ পাতায়াও দেখলাম একজন গবেষক আলোচনা করেছেন শিক্ষানীতি ও উন্নয়ন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।
আমি একজন ছাত্র। অতসব শিক্ষানীতি বিষয়ক কঠিন কথামালায় নিজেকে আটকাতে চাই না। আমি এও বলতে চাই না, আমি যা বুঝি তাই সর্বোত্তম। তবে আমার কিছু বলার আছে। কারণ আমার বলার অধিকার আছে।
আমি ভঙিতা না করে সরাসরি প্রসঙ্গে ঢুকে যাই। আমি শিক্ষানীতি নিয়ে ভিন্ন দুটি পত্রিকায় কলামগুলো পড়ে দেখলাম আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করার লক্ষে বিবিধ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সেই পরিকল্পনার কথার সাথে বিশিষ্ট শিক্ষক মোহাম্মদ কায়কোবাদ প্রথমআলোর খোলা কলম পাতায় গত ২৫সেপ্টম্বর কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন। এবং সরকারের এই পদক্ষেপকে প্রসংশিত করেছেন। তাই ওনার কিছু কথা দিয়েই আমি আমার পয়েন্টে ঢুকে যাই। কায়কোবাদ স্যার বলেছেন,
আমাদের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষা কীভাবে আমাদের জীবনধারাকে উন্নত করতে পারে, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে দেশবাসী কীভাবে মুক্তি পেতে পারে, পৃথিবীতে আমরা একটি গর্বিত জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারব তা এই দলিলের একাধিক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা যে দেশ-কালের সীমানা ছড়িয়ে মানবতার, সভ্যতার, সমাজের বিকাশে ভূমিকা রাখবে, জ্ঞান সৃষ্টি এবং সত্যানুসন্ধানে মানুষকে উৎসাহিত করবে তা পরিষ্কারভাবে কোথায়ও উচ্চারিত হয়নি। কিন্তু সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবদের শিক্ষানীতিতে এসব কথা থাকতেই হবে, আমরা যতই সমস্যাজর্জরিত থাকি না কেন।
শেষের দিকের লাইনগুলো আমাকে মর্মাহত করেছে। শিক্ষানীতির কোথাও মানবতার কথা উচ্চারিত হয়নি। হয়তো নীতিপ্রনয়ণকারীরা বলবেন, শিক্ষাই তো মানবতার সৃষ্টি করে। যদি তাই হয়, তবে তো আর আমাদের পৃথিবীতে এতো শিক্ষিত মানুষগুলো হানাহানিতে মেতে উঠতো না। মানবতার কথা না হয় শিক্ষানীতিতে উঠে আসেনি। কিন্তু তারপরও এই মানবতা কিংবা মনুষত্ববোধ কিন্তু একজন শিক্ষকই তার শিক্ষার্থীদের মাঝে জগিয়ে তুলতে পারেন। তার জন্য নীতিতে আলাদাভাবে স্থানের দরকার নেই। যদি শিক্ষকবৃন্দ শিক্ষার্থীদের মন জয় করে তারা তাদের মনের অভ্যন্তরে অধিপত্য বিস্তার করতে পারেন। একজন সুশিক্ষক অবশ্যই তা পারেন। তাই আমার প্রশ্ন মাননীয় নীতিপ্রণেতাদের কাছে, আপনাদের শিক্ষানীতিতে কি শিক্ষকদের নীতির কথা উঠে এসেছে? আপনাদের নীতিতে কি বলা হয়েছে, সুস্থ-স্বাভাবিক, প্রাণোজ্জল মানসিকতার মানুষগুলোকে দেশগড়ার কারিগর হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে? শ্রেনীকক্ষে শিক্ষার্থীদের সাথে অশালিন ব্যবহার করা মানুষগুলোকে শিক্ষকের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার কথা কি বলা হয়েছে? নীতিকে আছে, যে শিক্ষক নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর শিক্ষার্থীদের মন জয় করতে সক্ষম না হয়ে বিষয়ের উপর ভয় ঢুকিয়ে দেয় সেসকল শিক্ষকদের বিশেষ মানসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে?
যদি না থাকে তাহলে আমি বলবো, আপনাদের নীতি ঐ নীতিই থেকে যাবে। যে জাতির মনের পরিবর্তন হবে না সে জাতির শিক্ষার আধুনিকায়ন করে কোনো লাভ নেই।
আমি বিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের বলতে চাই, একটু স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বেক বেঞ্চ শিক্ষার্থীদের গিয়ে প্রশ্ন করুন তারা কেনো পড়াশুনার প্রতি এতো অবহেলা করে। কেনো তারা নির্দিষ্ট বিষয়গুলোর প্রতি অনিহা প্রকাশ করে। দেখবেন নির্ভয়ে তারা কেউ না কেউ কোনো এক শিক্ষকের চড়াও হওয়ার কথা আপনাদের বলবে।
আমি নিজেও স্কুলে পড়াকালীন সময়ে দেখেছি, ভালো ছাত্র এবং খারাপ ছাত্র দুভাগে ছাত্রদের ভাগ করে আগেই ছাত্রদের মনের গহীনে পৌছে দেয়া হয় তুমি খারাপ ছাত্র, তুমি দূর্বল ছাত্র। তাই তোমাকে থাকতে হবে আলাদা। তার সমস্ত আত্মবিশ্বাসকে তখনই ভেঙে চুড়ে ফেলা হয়। কিন্তু আপনারাই বলুন এই কাজটি কি ঠিক?
এই অবহেলার দৃষ্টি তৈরী করে হতাশা। একজন শিক্ষার্থীর আত্মসম্মানবোধকে সম্পূর্ণরুপে হত্যা করা হয়। এই ক্ষতি অপূরনীয়।
কিন্তু একজন শিক্ষকের কাছে তার সকল শিক্ষার্থী সমান হওয়া উচিত। ভালো-খারাপ বলে ক্লাসের মধ্যে ডিসক্রিমিনেশান না করে দূর্বল শিক্ষার্থীদের কিভাবে আগ্রহ ফিরিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে চেষ্টা করা উচিত। তুমি চেষ্টাই করো না তাই তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না এই বলে ডাস্টবিনে ছুড়ে না ফেলে চেষ্টা করানোর জন্য দরকার হলে মানসিক কেন্দ্র তৈরী করা উচিত। ভয় নয় শিক্ষক ভালোবেসে তার বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরী করবেন এমনটাই তো আধুনিক শিক্ষার নিয়ম হওয়া উচিত। আমার নিজেরও পরিচিত অনেক শিক্ষক আছেন, যাঁরা দূর্বল শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা দিতে নারাজ। শিক্ষকদের নীতির এই জায়গাটি কি শিক্ষানীতিতে আসবে? তা আমার জানা নেই।
আবার দেখলাম, ঝড়ে পড়া ছাত্রদের জীবিকার কথা নাকি শিক্ষানীতিতে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ছাত্ররা কেনো ঝড়ে পড়ছে সে বিষয়ে কি কোনো গবেষণা চলছে? অথবা ঝড়ে পড়া ছাত্রদের কীভাবে আবার পড়াশুনায় ফিরিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে কি কোনো পদক্ষেপ শিক্ষানীতিতে উঠে এসেছে?
সর্বশেষে বলতে চাই, একজন মানব সন্তানকে পৃথিবীতে জন্ম দেয় পিতা-মাতা। কিন্তু সেই মানব সন্তানটির দেহে প্রাণের সঞ্চার করেন একজন শিক্ষক। আমাদের সমাজের সবচাইতে সম্মানিত ব্যক্তিরা হচ্ছেন আমাদের শিক্ষকবৃন্দ। কিন্তু কিছু কিছু অপ্রশিক্ষিত এবং কূরুচিপূর্ণ (কূরুচিপূর্ণ বলার কারণ হলো, একটি বিষয় নিয়ে আমার কথা বলতে ঘিন্না হয় তা হলো আমাদের অনেক শিক্ষকের দ্বারা আমাদের ছাত্রিরা যৌন হয়রানির শিকার হন। ) শিক্ষকরা তাদের আক্রমনাত্মক ব্যবহার দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনকে বিষিয়ে তুলে। যে শিক্ষকের কাছ থেকে আমরা ব্যবহার শিখবো, সৌজন্যবোধ শিখবো। সেই শিক্ষকদের কাছ থেকে যদি আমরা পাই দূর্ব্যবহার, অপমানসূচক কথা যা আমার মানবসত্ত্বাটাকে ধ্বংস করে দেবে তেমন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অবশ্যই নীতিতে কিছু থাকতেই হবে। অন্যথায় শিক্ষানীতে শুধু শিক্ষাই আছে। মানবতা কিংবা ব্যক্তিত্ববোধ গড়ে উঠবে না। এ জাতির সন্তাদের মাঝে আসবে না ভালোবাসা আসবে না দেশপ্রেম। তাই সংশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি এই ছাত্রেই আকূল আবেদন, শিক্ষানীতিতে শিক্ষকদের নীতির প্রসঙ্গটিও নিয়ে আসা হোক।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29015731 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/29015731 2009-09-26 00:08:03
গল্প: "অপেক্ষা" আজ আমার ভাজতির জন্মদিন। একমাত্র ভাজতি। আমার ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে। তাঁর একটা ছেলেও আছে বটে। ছেলের বয়স ১০ বছর। ছেলের নাম শুভ্র। আর যার আজ জন্মদিন তার নাম নীলু। আসলে ওর নাম রাখা হয়েছিল নীল।
ভাইয়ার আকাশ খুব পছন্দ। সেই ছোট্ট বেলা থেকেই আমরা জানি। ভাইয়ার আকাশের প্রতি একটা দুর্বলতা আছে। অসম্ভব দূর্বলতা। সেই দূর্বলতার মাত্রা অতিরিক্ত। আমার ভাবি নাম নিলিমা। মনে হয় নাম শুনেই ভাইয়া পটে গিয়েছিল। ব্যপারটা হয়তো সেরকমই। তা আমি জানি না। তবে ভাইয়াদের প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে একটা কেক কেনা হয়। সেখানে ভাইয়া লিখেছিল, ইউ আর মাই স্কাই।
ভাইয়ার একটু লেখালিখির অভ্যাসও ছিল। সেখানেও আকাশ বিষয়টা থাকতই। আকাশ যেনো ভাইয়ার খুব কাছের কিছু। আর সেই আকাশপ্রিতির কারণেই তাদের প্রথম মেয়ের নাম দেয়া হয়েছিল নীল। কারণ, নীল রঙের সাথে আকাশের একটা মিল আছে। কারণ, আকাশের রঙ নীল। তো, সেই নীল ধীরে ধীরে আমাদের কাছে হয়ে গেলো নীলু। সেই নীলুর আজ ১৫ বছর হবে। তার জন্য আজ কেক আনা হয়েছে। নীল রঙের একটা শাড়ীও কিনেছে ভাবি। ভাবি বলে, আমার মেয়েটার তো এখন শাড়ী পরার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তাই শাড়ীই কিনলাম।
যখন ঘরের মানুষরা নীলুর জন্মদিনের কেক কাটার ব্যবস্থা করছে তখন শুভ্র খুব চুপচাপ হয়ে বারান্দায় বসে আছে। ওর মনে কোনো প্রশ্ন নাই। তবে ও জানে, ওর মতো জন্মদিন পালন এ ঘরে হয় না। শুভ্রর জন্মদিনে ঘর ভরতি মানুষ থাকে। কাছের অনেক আত্মীয়রা আসে। শুভ্রর জন্য উপহার আনে। এক বিশাল আয়োজন হয় তার জন্মদিনে। কিন্তু নীলুর জন্মদিনে তা হয় না। ঘর সেদিন এক অদ্ভুত নিরবতার মধ্যে থাকে। ঘরের প্রতিটা মানুষের মধ্যে একটা হাহাকার থাকে। সবার মাঝে আনন্দ কিন্তু তারপরও সবার মুখ খুব ভার। তবে জন্মদিন পালনে কারও কোনো বাধা নেই। ঘরের সবাই ভাইয়ার রুমে ভিড় করে। সবাই ভাবির পাশে থাকে। ভাবির ব্যস্ততায় সহযোগিতা করে। বিশেষ করে আমার বোনটা। ননদ-ভাবির সম্পর্ক নাকি অনেকটা সাপ-বেজির সম্পর্ক। তবে আমার বোনের সাথে কোনোদিন ভাবির কোনো মনোমালিণ্য দেখিনি। তারা সবসময় বন্ধুর মতো। কেউ কারও সাথে তেমন একটা খারাপ ব্যবহার করতেও দেখিনি। আমার সেই বোনও ভাবির সাথে রুম সাজানোর কাজে ব্যস্ত থাকে।
এই যে এতো আয়োজন! কার জন্য। নীলুর জন্য তো! সেই নীলুর কথাই কিন্তু তেমন বলা হলো না ।
নীলু। আমাদের ঘরের প্রথম সন্তান। প্রথম সন্তান বলতে এই ঘরের প্রদীপ। একটা নিশ্চুপ হয়ে যাওয়ার ঘরকে ও আলোকিত করেছিল। আমার মা-বাবার নিঃসঙ্গ জীবনকে আনন্দময় করে নীলু এ ঘরে এসেছিল। সে কি আনন্দ ছিল সেদিন। এমনই একটি দিনে নীলু জন্মেছিল।
ভাবির সাথে আমি বাজি ধরে বলেছিলাম, দেখো ভাবি, তোমার মেয়ে হবে।
ভাবি মুখ গম্ভীর করে বলেছিল, নাহ, আমার ছেলে হবে। আমি ছেলে চাই।
ভাইয়া আবার ভাবিকে ধমক দিয়ে বলল, ছেলে মানে!! যা হবে তাই হবে। আমার সন্তান হবে এটাই আমার কাছে বড়।
আমি আর ভাবি হেসে দিতাম। ভাইয়া সব বিষয় কেমন সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলে।
ভাইয়াকে তখনই বলেছিলাম, ভাইয়া, তোমার ছেলে হোক আর মেয়ে হোক নামটা ঠিক করেছে তো? নিশ্চয়ই নামটা আকাশের সাথে মেশানো।
ভাইয়া একটু লজ্জা পেতো। তারপর বলতো, আমার মেয়ের নাম হবে নীল।
ভাবি তখনই হেসে দিতো। বলতো, দেখো অবস্থা। এই বলল সন্তান হলো আসল। আবার এই বলে, আমার মেয়ে হবে। কিন্তু আমার যদি ছেলে হয়?
তারপর তিনজনই হেসে দিতাম।
পরিবারের সবাই যখন মেয়ে হবে ধরেই নিয়েছিল। তখন আমার একমাত্র বোনটা ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে বলল, ভাইয়া যদি তোর মেয়ে হয় তবে কি তুই ওকে আমার চেয়ে বেশী ভালোবাসবি?
আমরা তখন আবারও হেসে দিতাম। একি কি ছেলেমানুষি টাইপ কথাবার্তা।
মেয়ে হওয়া নিয়ে আমরা সবাই তখন এমনই সময় কাটাতাম।
ঠিক তার কিছুদিন পর ভাবিকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। ভাবির পেইন উঠলো। অপারেশান থিয়েটারে ভাবিকে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা সবাই তখন বাইরে বসে আছি। ভাইয়া তখন গভীর নিরবতায়। একদম চুপচাপ হয়ে এক কোণে বসে আছে।
অপারেশান থিয়েটার থেকে নার্স বের হলো। বের হয়েই হাসি মুখে বলল, মেয়ে হয়েছে।
আমাদের সে কি আনন্দ!
আমাদের ঘরের প্রথম সন্তান। পৃথিবীর সমস্ত কিছু যেনো ওকেই আমরা উজাড় করে দিলাম। আমাদের সময় যেনো ওর কাছে আটকে গেলো। আগে আমরা একবার ঘর থেকে বের হলে আর ফেরার নাম ছিল না। আর যেই নীলু আসলো। ঠিক তখন আমরা যেনো ঘর থেকে বের হওয়াই ভুলে গেলাম। নীলুকে ঘিরে আমাদের পৃথিবী তৈরী হলো। ভাবি নীলুর মা। কিন্তু দেখা যেতো নীলুকে ভাবি সহজে কোলেই নিতে পারতো না।
আম্মু মাঝে মাঝে বলতো, তোরা সবসময় বাচ্চাটাকে কোলে কোলে রাখিস। মা-টার কাছেও একটু দে। মার সাথেও তো বাচ্চাটার একটা আত্মীক সম্পর্ক থাকা লাগবে।
ভাবি তখন অভিমান করতো আম্মুর উপর। আর বলত, এটা কি বলেন আম্মা। আমার মেয়ে সারাদিন আপনাদের কাছে থাকে এটাতো আমার মেয়ের সৌভাগ্য। এমন পরিবারের মধ্যে ও বেড়ে উঠছে। আর তাছাড়া এতো মায়ের কাছে থাকলে ও বড্ড মা নেউটা হবে। দরকার নেই। মা ছাড়াই তো ওকে লড়তে হবে।
যতকিছুই হোক। আমরা আছি নীলুকে নিয়ে। যদিও ওর নাম নীল। কিন্তু এখন আর ও নীল নেই। ও হয়ে গেছে নীলু। ভাইয়ার নীল আকাশে নীলু যেনো এক উজ্জল নক্ষত্র।
এই মেয়েটি যেনো এক বিচ্ছিন্ন পরিবারকে আবার একত্র করলো। সবার মধ্যের একটা বাচ্চা সত্তাটাকে ও জাগিয়ে তুলল।
হ্যা। নীলু। নীলু আমাকে যেদিন চাচ্চু বলে ডাকলো তখন আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল। ইচ্ছে করছিল পৃথিবীর সমস্ত কিছু আমি নীলুর হাতে তুলে দেই। ইচ্ছে হচ্ছিল নীলুর জন্য পৃথিবীর সমস্ত সুখ সামনে নিয়ে আসি।
সেই নীলু আমাদের মাঝেই বড় হতে চলল। স্কুলে ভর্তি হলো। আর সেদিন ও কি খুশী। বার বার আমাকে প্রশ্ন করতো, চাচ্চু স্কুলে কি হয়?
প্রশ্নটার উত্তর আমিও বার বার দেই। আমাদের সেই মুখস্ত বুলি। মা.. পড়াশুনা করলে অনেক বড় হওয়া যায়। পড়াশুনা করে যে গাড়ী-ঘোড়ায় চড়ে সে।
নীলু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলতো, চাচ্চু, আব্বু কি তাহলে পড়াশুনা করেনি?
আমিও বলতাম, অবশ্যই করেছে।
নীলু অবাক হয়ে বলত, তাহলে আব্বুর গাড়ী আর ঘোড়া কই?
আমি হাসতাম। হায়রে পাগলীটা বলল কি! ঠিকই তো! পড়াশুনা করলে তো সবার গাড়ী হয় না তবে এই ভুল প্রবাদ কেনো যুগ যুগ ধরে মানুষ বলে আসছে।
যাইহোক। নীলুর স্কুল যাত্রা শুরু হলো। আমাদের তখন নতুন চাকরী শুরু হলো। নীলুকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া। নিয়ে আসা। একটা লম্বা রুটিন বানানো হলো। কে কোন দিন নেবে। কে কোনদিন নিয়ে আসবে। সপ্তাহ ব্যাপি রুটিন।
সেই রুটিনে চলল নীলুর দায়িত্ব পালন করবার সময়।
চলতে থাকলো নীলুর স্কুল জীবন। দেখতে দেখতে দুই বছরও চলে গেলো।
তারপর হঠাৎ একদিন স্কুলে নীলুকে আনতে গিয়ে দেখলো নীলু নেই।

২.
কেনো নেই? কিংবা কোথায় নীলু?
পাঠক আপনারা নিশ্চয়ই এমন প্রশ্নের মাঝে পড়ে গেছেন। গল্পটির মাঝে হঠাৎ বলে ফেললাম, তারপর হঠাৎ একদিন স্কুলে নীলুকে আনতে গিয়ে দেখলো নীলু নেই।
ঠিক আমাদের জীবনেও ঘটনাটি হঠাৎ ঘটলো। কোথায় নীলু?
এমন প্রশ্নও আমরা খুজে বেড়াচ্ছি দীর্ঘ আট বছর ধরে। যতধরণের পদ্ধতি আছে সমস্ত কিছু করে আমরা নীলুকে খুজে বেড়াচ্ছি।
হ্যা। এখনও বেড়াচ্ছি। এখনও আমরা নীলুকে খুজি।
এখনও আমরা আমাদের পুরানো রুটিন অনুযায়ী সকালে নীলুর স্কুলে যাই। আবার দুপুরে নীলুকে আনার সময় যাওয়া হয়। সবার মাঝে একটাই স্বপ্ন। কোনো একদিন আমরা গিয়ে দেখবো নীলু দাড়িয়ে আছে। অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
সেই নীলুরই আজ জন্মদিন। ওর ভাই শুভ্র এসবই দেখে। কখনও কিছু বলে না। চুপচাপ দেখে। দেখে, ওর মা কেক কাটছে। সবাই হ্যাপি বার্থডে টু নীলু বলছে। সবাই কেক কেটে খাচ্ছে। সবার চোখে জল। সব কিছুই হচ্ছে যার জন্য। সেই মানুষটি অনুপস্থিত। এমন একটা বেদনার জন্মদিন ও ছোট্টবেলা থেকেই দেখছে। এমন উদ্ভট জন্মদিন ও দেখতে দেখতে বড় হয়েছে কিন্তু কখনও কিছু বলেনি। ও শুধু দেখে চুপচাপ হয়ে। বোনের জন্মদিনের কেক খায়।
শুধু একদিন আমাকে প্রশ্ন করেছিল, চাচ্চু আপু কিভাবে হারিয়েছিল?
সেদিন ছেলেটাকে আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি। কিভাবে হারিয়েছিল তা তো আমারও জানা নেই। এমন উত্তর এই বাচ্চা ছেলেটা সবসময় খুজে বেড়াবে। কিন্তু পাবে না।
ভাইয়া একদিন বলেছিল, নীলুর সমস্ত কিছু এ বাড়ি থেকে মুছে ফেলো। আমার ছেলেটা দিন দিন হাতাশাগ্রস্থ হয়ে যাবে। ভাবি সেদিন অভিমানে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল। কাদতে কাদতে বলছিল, আমরা মেয়ে হারিয়ে গেছে এখনও মরেনি। আর তোমরা আমার মেয়েটাকে মেরে ফেলতে চাও?
ভাইয়া ভাবিকে সান্তনা দিতে গেলে ভাবি আবারও চিৎকার করে ওঠে। বলে, যখন ও আমার পেটে ছিল তখন তো খুব মেয়ে মেয়ে বলে তোমরা চিৎকার করলে আর এখন তোমরা ওকে এভাবে ভুলতে চাও।
এরপর ভাইয়ার আর কিছুই বলার থাকে না। একজন মায়ের সন্তান হারাবার বেদনা শুধু সেই মা বলতে পারবে। তার অনুভূতি কারও বোঝার ক্ষমতা নেই।
কিন্তু আমরা বুঝি। আমাদের যে শিশুটি ঘরে আবদ্ধ করতে পেরেছিল। যে শিশুটি তাকে ঘিরে আমাদের মাঝে তৈরী করতে পেরেছিল একটি পৃথিবী সেই শিশুটিতো আর আমাদের মাঝে নেই। আমরা যেনো আবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। শুভ্র আর যাই হোক আমাদেরতো নীলুর মতো করে পৃথিবী দিতে পারেনি। সব কিছুই নীলু হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে হারিয়ে গেছে।
নীলু ঘুমাতো ওর দাদুর সাথে। ভাবি কখনও এ বিষয়ে আপত্তি ছিল না। প্রতি রাতে আমাকে রুম থেকে ডেকে বলতো, শাহেদ একটু দেখতো নীলু ঘুমিয়েছে কিনা। নাকি আম্মাকে জালাচ্ছে।
দীর্ঘ আট বছরে ভাবি পাল্টায়নি। এখনও রাতে ভাবি আসে। আগে বলে ফেলতো, নীলু ঘুমিয়েছে কিনা দেখার জন্য। কিন্তু এখন আর বলে না। এখন আমার রুমের পাশে ভাবি ঘুরাঘুরি করে। হয়তো এই কথাটিই বলতে আসে। কিন্তু পারে না। পরিস্থিতি মেনে নিয়েছে। তারপরও অভ্যাসটা থেকে বের হতে পারেনি। ঘুম থেকে উঠে চলে আসে আমাকে বলার জন্য। এসে হয়তো মনে হয়, নীলু তো নেই।
তবে একদিন খুব অস্থির হয়ে আমার রুমে ভাবি ঢোকে। তারপর বলে, শাহেদ জানো আজ আমি কি স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম এক হুজুর আমাকে বলছে, নীল ফিরে আসবে। আর সেই দিনটা হবে প্রচন্ড মেঘলা দিন। বৃষ্টি হবে ঝুমঝুম করে। সেই বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে নীলু আসবে। তবে সেদিন আমাদের শুভ্রর বিয়ের দিন থাকবে। মানে বুঝেছ তো, নীলু ফিরে আসবে তার ভাইয়ের বিয়ের দিন।
এই কথাগুলো বলতে বলতে ভাবি কেঁদে দেয়।
হয়তো নীলু ফিরে আসবে। তবে তা হবে অলৌকিক। অলৌকিক কিছু হলেই নীলু ফিরে আসতে পারে। যদি অলৌকিক কিছু হয়ও তাও বা ক্ষতি কি! সেটা তো আমাদের পরিবারটার জন্যই মঙ্গলকর। একজন মানুষ নিখোঁজ। ব্যপারটা যে কতবড় ভয়ানক তা কাউকে বোঝানো যায় না। মৃত্যু আমরা কেউই মেনে নিতে পারি না। তারপরও আমি মেনে নেই। কারণ সেই মানুষটার মরদেহ চোখের সামনে দেখতে পাই। কিন্তু একজন মানুষ। যে কিনা বেঁচে আছে কি মরে আছে তাও জানি না। এতো ছোট্ট একটা শিশু। যার বয়স মাত্র ছিল সাত বছর। সেই শিশুটির নিখোঁজ হওয়াটা কিভাবে মেনে নেয়া যায়। কি করা উচিত? অপেক্ষা? নাকি মরে গেছে এই ভেবে নেয়া।

যাইহোক। গল্পটার কোনো শেষ দিতে পারছি না। কারণ এখনও শুভ্রর বিয়ের বয়স হয়নি। সে জন্য তো আমাদের অপেক্ষা করতে হবে অনেক গুলো বছর। আমার বাসার সবাই বিশ্বাস করে, নীলু আসবে শুভ্রর বিয়ের দিন। আমার ভাইয়াও। যে কিনা এসব স্বপ্নে-টপ্নে এমনকি পীর-ফকিরে বিশ্বাসী না। সেও বিশ্বাস করে নীলু আসবে। মেঘলা দিনে। ঝুমঝুম বৃষ্টির দিনে। তাই একটি পরিবার অপেক্ষা করছে সেইদিনটির জন্যই। নীলু ফিরবে। ঘরটাকে ও আবার জাগিয়ে তুলবে। একটি মৃত ঘরকে ও আবার জীবিত করে তুলবে।


-------------------------------------------------------------
অপেক্ষা নামে আমার আরও একটি গল্প আছে। একই নামে দুটি গল্প। ব্যপারটা হয়তো মানাচ্ছে না। কিন্তু তারপরও এই গল্পের জন্য অন্য কোন নাম মাথায় আসছে না। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/28999755 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/28999755 2009-08-26 01:02:50
বড়গল্প: "বন্দুক" - ২য় পর্ব ও শেষ পর্ব Click This Link
---------------------------------------------------------
আব্বু সবাই এখানে এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে কেনো?
জহির মেয়ের প্রশ্ন করে তাকে। অদ্ভুত প্রশ্ন নয় কিন্তু। শহরের থাকা মানুষগুলো এতো তাড়িতাড়ি ঘুমায় না। যেই সময়টায় গ্রামের মানুষ ঘুমাতে যায় সে সময়ে শহরে মাত্র রাত হওয়া শুরু করে। ঘরে ফেরা মানুষগুলোর কেউ কেউ বিনোদনে মেতে ওঠে। কেউ কেউ পরিবারকে সময় দেয়। এভাবেই সময় যায় তাদের। ঘড়িতে যখন ১২টা। অধিকাংশ শহুরে মানুষের ঠিক তখনই চোখে ঘুম আসে। তাও কেউ কেউ বিছানায় যায় কেউ বা আরও রাত অবধি জেগে থাকে।
জহিরের তো রাত ৩টার আগে ঘুমই আসে না। কিসব ভেবে ভেবে সে সময় পার করে। কখনও কখনও তার স্ত্রীকে নিয়ে বারান্দায় সময় কাটায়। কখনও কখনও গল্পের বই পড়ে। অথবা টিভি দেখে। তবে তার একমাত্র মেয়ে সুকন্যা রাত ১২টার মধ্যেই বিছানায় চলে যায়। শহরে রাত ১২ খুব একটা বেশী রাত নয়। তারপরও এইখানে স্বন্ধ্যা ৮ টার মধ্যে সকলের বিছানায় চলে যাওয়াটা সুকন্যাও মানতে পারছে না।
আর তাই তার এ প্রশ্ন। প্রশ্ন শুনে জহির খুব একটা বিভ্রান্ত হয় না। উত্তরটা সে সাবলীলভাবেই দেয়, মামুনী, সবাই সারাদিন মাঠে কাজ করে। কত্ত পরিশ্রম করে। ঘরে ফিরে ওরা অনেক টায়ার্ড থাকে। আর তাছাড়া সকালে উঠেই খুব ভোরে ওদের আবার মাঠে কাজ করতে চলে যেতে হবে। তাই ওরা তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। আর তুমিতো দেখছই শহরের মতো ওদের কি এতো বিনোদনের কাজ আছে! নেই। তাই তো ঘুমিয়ে যায়।
সুকন্যা তার আহলাদি চেহারার কোনো পরিবর্তন করে না। জহিরের একমাত্র মেয়ে সুকন্যা। বিয়ের তিন বছর পর এই মেয়ে হয়েছিল। ওর বয়স এখন ৯ বছর। গ্রামে ঘুরতে এসেছে বাবার সাথে। সারাদিন সে এদিক-সেদিক ছুটে বেড়ায়। সে কখনও গ্রাম দেখেনি। গ্রাম না দেখাটা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা জহির বুঝতে পারে যখন সুকন্যা পুকুর দেখার পর জহিরকে প্রশ্ন করে, বাবা বাবা কত্ত বড় বাট্টাব।
জহির হেসে দেয়। কিছুক্ষণ পর তার হাসিও পায়। আহারে! আমার মেয়েটা পুকুরও বুঝি কখনও দেখেনি। ওকে যখন বলা হয়, মা এইটা তো পুকুর। তখন সে আরও অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, পুকুর! পুকুরে কি হয়?
ওকে পুরো ব্যাপারটা বোঝানো হয়।
গ্রামে এসেই সে গোয়াল ঘর, পুকুর, ধান ক্ষেতে ঘুরে ঘুরে দেখছে। ওকে ঘোরানো দায়িত্বটা নিয়েছে রবি কাকুর ছোট মেয়ে রিতা। রিতার বয়স ১৯ বছর। কলেজে পড়ে। গ্রামে থাকে দেখলে বোঝাই যায় না। একদম পরিপাটি মেয়েটি। যথেষ্ট স্মার্ট। এগুলো বলতে হয় শিক্ষিত পরিবারের শিক্ষার ব্যপার। রবিউল গ্রামে থাকলেও সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাস করা ছেলে। সে ইতিহাস বিষয়ে পড়াশুনা করেছে। রবিউলের স্ত্রীও শিক্ষিত একজন মহিলা। রবিউলের স্ত্রীর গ্রামে থাকা নিয়ে জহির একটু অবাক হয়। কারণটা হলো, রবিউল ইতিহাস বিভাগের ছাত্র। ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা করে খুব একটা উন্নতি করা যায় কিনা সে বিষয়ে জহিরের যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে, রবিউলের স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে মাষ্টার্স করা। তাও আবার ফার্স্ট ক্লাস করা শিক্ষার্থী। সেই মেধাবী একজন মহিলা কি করে গ্রামে বাস করছে তাই নিয়ে জহিরের আগ্রহের শেষ নেই। তারপরও দুইজনই তো শিক্ষিত। সেই শিক্ষিত মানুষ দুইটি গ্রামের কলেজে শিক্ষকতা করছেন। এবং খুব সাধারণ জীবন-যাপন করছেন ব্যাপারটা একদিক থেকে ভালো হলেও মনে অনেক প্রশ্নও জাগে।
জহিরকে আজ তার রবি কাকু এসব বিষয় খোলাসা করে বলেছে। ভেতরকার অনেক অজানা তথ্য আজ জহির জেনেছে। সব জেনেছে। কেনো তিনি গ্রামেই থাকেন। কেনো তিনি শহুরে জীবন ছেড়ে এই গ্রামকে বেছে নিয়েছেন থাকবার জন্য। বাপ-দাদার ভিটায় কেনো তিনি পাহারাদার হয়ে বসে আছেন। এই সব কিছু আজ জহিরকে খোলাসা করেছে। এবং খোলাসা করেই রবিউল তার হাতে একটি বন্দুক তুলে দেয়। অসম্ভব ধরনের বন্দুক। অত্যন্ত পুরণো এ বন্দুক সে তুলে দেয় জহিরের হাতে। জহিরের তখন হাত কাঁপতে থাকে।
জহির তখন থেকেই মগ্ন সেসব ভাবনায়। রবিউলের সেই সব কথা। তাকে আতংকগ্রস্থ করে তুলছে। যখন ভয়টা তাকে জাবড়ে ধরেছে ঠিক তখনই তার মেয়ে সুকন্যা তাকে প্রশ্ন করেছে, আব্বু সবাই এখানে এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে কেনো?
সাথে সাথেই জহিরের বুকটা ধক্ করে ওঠে। তার মেয়ে। একমাত্র মেয়ের না জানি কোনো ক্ষতি হয়। এ গ্রামের অভিশাপ না জানি তার মেয়ে ছুতে আসে।
যাহোক। তার আগে রবিউলের বক্তব্যগুলো তুলে ধরা উচিত।



রবিউলের বক্তব্য ও তাদের কথোপকথন:

তোমাকে এর চেয়ে আর বেশী প্রমাণ দেখাতে পারবো না বাবা। এই গ্রামে জমিদার ছিল আমাদেরই পূর্বসূরি। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। এখন তোমাকে কিছু বিষয় তুলে ধরলেই কিন্তু তুমি বুঝতে পারবে। বলতে হবে, তুমি তোমার হিসাবটা মেলাতে পারবে।
প্রথমেই বলো, তোমার বাবা তোমাদের কয়বার গ্রামে এনেছিল।
জহির- বাবা এর আগে মাত্র একবার এনেছিল। তাও দাদার মৃত্যুর পর। আর আমরা এসেছিলাম বাবা মারা যাওয়ার পর। বাবাকে মাটি দিতে।
রবি- তোমার বাবাকে তো ঢাকাতেই মাটি দেওয়াটা উচিত ছিল। কারণ তোমার মা যখন মারা যান তখন তোমরা গ্রামেই মাটি দিতে চেয়েছিলে কিন্তু তিনি দেননি। তাই তোমার মায়ের পাশেই তোমার বাবার মাটি দেওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তুমি দাওনি কেনো?
জহির- কারণ বাবা মৃত্যুর ঠিক আগে আমাকে বলেছিল, আমাকে গ্রামে মাটি দিস। গ্রামের মাটির সাথে মিশতে চাই।
রবি- নাও ইউ আর ইন রাইট পয়েন্ট। তোমার বাবা গ্রামের মাটিতে কেনো হঠাৎ মিশতে চাইলো। যে গ্রামে সে সহজে আসতই না সে গ্রামে কেনো সে মিশতে চাইলো? কারণটা খুব সিম্পল। তোমার বাবা সব কিছু জানতো।
যাইহোক। এবার আসি আসল কথাটাতে। জমিদাররা অনেক অত্যাচার করতো তা তো আর নতুন করে কিছু বলার নাই। তো সেই যে তোমাকে বললাম কিছুক্ষণ আগে, অত্যাচারগুলো কি বিলীন হয়ে গেছে। হাজার মানুষের কান্না হাজার মানুষের রক্ত কি একদম হারিয়ে গেছে? নাহ। হারায়নি। এখনও কান পাতলে তাদের আর্তনাদ শোনা যায়। এখনও তাদের অভিশাপ আমাদের বংশটাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
আমাদের বংশের প্রতিটি পরিবারের একটি করে সন্তান বিকলাঙ্গ হয়। অন্তত একটি শিশুর ক্ষতি হয়। এগুলো হচ্ছে প্রকৃতীর প্রতিবাদ। আমার কোনো দোষ নেই। আমার সন্তানের কোনো দোষ নেই। তারপরও সেই অভিশাপ থেকে আমার কোনো রক্ষা নেই। কারণ, জমিদাররা নির্দোষ মানুষের উপর অত্যাচার করেছে। আর এখন আমাদের মতো নির্দোষ মানুষগুলোর উপর অত্যাচার করে প্রকৃতি। আমাদের প্রতিটি পরিবারের মধ্যে সেই অভিশাপ ঢুকে গেছে। তোমার দাদা যখন মারা যায় তখন কিন্তু তুমি খুব ছোট। তোমার কিন্তু একটা বোন ছিল তা কি তোমার মনে আছে।

জহির তখন মাথা নাড়ায়।

তোমার সেই বোন কিন্তু তখন মারা যায়। হঠাৎ পুকুরে তোমার বোনের লাশ পাওয়া যায়। ঠিক সেদিনই তোমার মা তোমাকে নিয়ে ঢাকা চলে যায়। তাই তোমার পরিবারটাও কিন্তু অভিশাপের বাইরে নয়। আমি তোমার বাবার চাচাতো ভাই। আমাদের কিন্তু আর কেউ অবশিষ্ট নেই। আমারও একটা বোন ছিল। তার যখন ২১ বছর তখন তার বিয়ে ঠিক হয়। সেও কিন্তু ঢাকাতেই পড়াশুনা করতো। তোমার চাচির বন্ধু ছিল। তোমার চাচি আর আমার বোন রাশিদা একই হলে থাকতো। ঈদের ছুটিতে আমরা সবাই গ্রামে আসলাম ঈদ করতে। তোমার চাচিও তখন রাশিদার বান্ধবি হওয়ার সুবাদে আমাদের সাথে গ্রামে আসলো। তোমার বাবা যেমন ভয়ে তোমাকে গ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। আমার বাবা কিন্তু আবার তেমন নয়। তিনি অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। তুমি জানো কিনা জানি না। আমার বাবা কিন্তু অনেক শিক্ষিত একজন মানুষ ছিলেন। ঢাকায় তিনি একটি বিদেশী কোম্পানীতে গবেষক ছিলেন। অভিশাপ ব্যপারটা ওনার কাছে একদম কুসংস্কার মনে হতো। তাই আমরা গ্রামে দেদারসে ঘুরতে পারতাম। যাইহোক, রাশিদা ঈদে আসলো ওর বান্ধবীকে নিয়ে। আমিও আসলাম। ঈদের রাতে আকাশে অসাধারণ পূর্ণিমা ছিল। সেই রাতেই আমি তোমার চাচিকে বলেছিলাম, আমাকে বিয়ে করবে? অসাধারণ মায়াময় সে রাতে আমি রাশিদা আর তোমার চাচি মিতু পুকুর ঘাটে বসে গল্প করছিলাম। রাশিদা তখন একটি গান গাচ্ছিল।
গান যখন শেষ হলো রাশিদা বলল, ভাইয়া, এতো সুন্দর একটা দৃশ্য। এতো সুন্দর। দেখ। দেখ চাঁদের আলোটা পুকুরে পড়েছে। সারা পুকুরটা কি অসাধারণ হয়ে গেছে। পুকুর থেকে আলোটা রিফ্লেক্ট করে চারিপাশকে আরো আলোকিত করে তুলেছে। প্রকৃতি এতো সুন্দর কেনো রে ভাইয়া। এতো সুন্দর একটা দৃশ্য দেখে মরে যাওয়াটাই ভালো। আবার শহরে সেই ধোয়াটে দৃশ্য দেখার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।
ব্যস। রাশেদার কথা প্রকৃতি শুনে ফেলল। অশ্চর্য হলেও সত্য সাথে সাথে রাশিদা নিশ্চুপ হয়ে গেলো। আমি আর মিতু ভেবেছিলাম রাশিদা আমাদের ভয় দেখানোর জন্য অভিনয় করছে। কিন্তু না। অভিনয় নয়। মৃত্যু। সত্যিই ওর মৃত্যু হলো। এতো সুন্দর একটা দৃশ্যের মাঝখানেই ও মরতে চেয়েছে। প্রকৃতি ওর আবেদনে সাড়া দিয়েছে। চাঁদের অপরুপ দৃশ্যের মাঝে মৃত্যু হলো আমার অদুরে বোনটার।
ঠিক সেদিন থেকেই আমি সব বিশ্বাস করি। ঠিক সেদিন থেকেই আমার বাবা আর এটাকে কুসংস্কার ভাবে না। তবে তিনি ভিতু নন। তিনি এর পর থেকে আর গ্রামের বাইরে বের হননি। আর মিতু?
মিতু অত্যন্ত শক্ত মনের মেয়ে। ও চলে গেলো পড়াশুনা শেষ করতে। এবং যাওয়ার আগে আমাকে বলে গেলো, আমি আসবো। এখানে আসবো। বউ হয়ে। যে প্রকৃতি তোমাদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে সে প্রকৃতির বিরুদ্ধে আমি বিদ্রোহ করবো। আমিও তোমাদের সাথে লড়বো। এই অভিশাপ নামক হাওয়াকে আমিও দেখতে চাই। আমি সরাসরি তাদের সাথে কথা বলতে চাই।
মিতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে মাষ্টার্স করা মেয়ে। সেই মেয়ে আমার সাথে এই গ্রামে পড়ে আছে। তার ঘনিষ্ট বান্ধবীর হত্যার বিদ্রোহ করার জন্য। আমাকে কতটুকু ভালোবাসে তা জানি না। তবে আমরা সংসার করছি। আমরা অপেক্ষা করছি আরেকটি হত্যার। প্রকৃতি আমাদের পরিবারে ঢুকবে হত্যা করতে। সেই অপেক্ষায় আছি। এখনও আমাদের ঘায়েল করতে পারেনি। আমাদের মেয়ে যথেষ্ঠ সাহসী। তাকে আমরা সেভাবেই বড় করে তুলেছি।
আরেকটা ব্যাপারকি। আমাদের বংশে অভিশাপটা এসে পড়ে মেয়েদের উপর। হয়তো মেয়েদের উপর অত্যাচারটা বেশী আকারে হয়েছিল। প্রকৃতি শুধু বেছে বেছে মেয়েদেরই নিয়ে যায়। আমার বোন। তোমার বোন। এমনকি তোমার একজন ফুফুও কিন্তু ছিলেন। তাকেও প্রকৃতির নির্মমতার শিকার হতে হয়েছিল। তোমার ফুফু চলে যাওয়াটা আরও হৃদয়বিদাড়ক। বলতে হবে আরও ভয়ানক।
তোমার ফুফুর নাম ছিল কোহিনুর। কোহিনুরের যখন ১৭ বছর তখন হঠাৎ তার ঘুমের মধ্যে হাটাচলার রোগ দেখা দিলো। তাকে নিয়ে ডাক্তার দেখানো হলো। তখনতো আর ডাক্তার এতো অত্যাধুনিক ছিল না। তিনি বার বার বলতেন ঘুমের সমস্যা। আবার বলতেন কোনো বিষয় নিয়ে হয়তো তিনি টেনশান করেন। গ্রামের সবাই বলতো, নিশি ডাকে। আমরা এসব বিশ্বাস করতাম না। তুমি তো এতোটুকু বোঝ আমরা কিন্তু যথেষ্ট শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে উঠেছি। যুগ যুগ থেকেই আমাদের পরিবার শিক্ষিত। সংস্কারমনা। যাইহোক। একদিন হঠাৎ কোহিনুরকে পুকুরঘাটে ভোর বেলা আবিষ্কার করা হলো তাও আবার উলঙ্গ অবস্থায়। তারপর থেকে তাকে রাতে বেধে রাখা হলো। রাত হলেই তাকে বেধে রাখা হয়। দুইদিন এভাবেই পার হলো। তৃতীয়দিন সে গম্ভীর হয়ে বলল, আমাকে বেধে রাখছো? আজকে বুঝবা ঠেলা। পরদিন সকালে দেখা গেলো, যেই রশি দিয়ে তাকে বেধে রাখা হয়েছিল সেই রশিতে সে ফাস দিয়ে মরে রয়েছে।
এই হলো ঘটনা। এর চেয়ে বেশী আর কি বা প্রমাণ থাকতে পারে আমার জানা নাই জহির। ভয়ানক সব ঘটনায় আমি আটকে আছি। আমি এখানে পড়ে রয়েছি বিদ্রোহের জন্য। আমিও বলতে চাই, যারা অন্যায় করেছে তো করেছে....এখন আমরা কি করেছি.....আমরা কেনো এর ভাগিদার হবো.....আমার বংশের মানুষগুলোকে কেনো এভাবে ধরে ধরে হত্যা করা হচ্ছে। আমি যে তোমাকে বললাম, যুগে যুগে অভিশাপের ধরন পাল্টাচ্ছে, একটা সময় ছিল যখন জমিদার বংশধরদের ভিক্ষুকে পরিণত হতে হয়েছে। তাদের অর্থ সংকটে পড়তে হয়েছে। তারপর কেউ হয়তো এর বিপক্ষে বিদ্রোহ করেছে। আমাদের মতো কেউ। তাই আবার আমরা আমাদের সচ্ছলতা ফিরে পেয়েছি। তারপর শুরু হয়েছিল বিকলাঙ্গ হওয়ার পালা। দেখা যেতো প্রতি পরিবারে একজন করে বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম নিচ্ছে। যেমন, আমার দাদার ছোট বোন মানসিকভাবে প্রতিবন্দি ছিলেন। তার একটি পাও ছিল না। জন্মই হয়েছিল পা বিহীন।
এরপর শুরু হলো অকষ্মাত মৃত্যু। অজানা কারণে হত্যা। তাই ঐ অজানা মৃত্যুর বিরুদ্ধে আমি বিদ্রোহ করেছি। এভাবে একের পর এক আক্রমণের বিরুদ্ধে আমরা লড়তে থাকবো। হয়তো একদিন প্রকৃতি ক্ষান্ত হবে। হয়তো একদিন প্রকৃতির হাতে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অবশিষ্ট আর কিছুই থাকবে না। সেই স্বপ্নই দেখছি।
আর তুমি বলেছিলে না, জমিদারের অবশিষ্ট আর কিছুই কি নেই! আছে। একটা জিনিস অবশিষ্ট আছে। সেটা যুগ যুগ ধরে বহন করছি আমরা। তোমার বাবা বয়সের দিক থেকে সবার বড় ছিল। তাই তিনি তা পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সে জিনিসটি রাখেননি। তার ধারণা ছিল, এই জিনিসটি দিয়েই প্রকৃতি আমাদের পয়েন্ট করতে পারে। জিনিসটি হচ্ছে, একটি বন্দুক। এই বন্দুক যুগ যুগ ধরে আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের শেষ স্মৃতি হিসেবে রেখে দিচ্ছি। আজ আমি তা তোমাকে দিয়ে দেবো। তুমি আমার মেয়ের চাইতে বড়। সুতরাং বয়সের দিক থেকে তুমি তা রক্ষার দ্বায়িত্ব পাবে। কিন্তু তুমিও যদি তোমার বাবার মতো ভয়ে এটাকে রাখতে না চাও তাহলে নিও না। আমার মেয়ে যদি বেচে থাকে তাহলে সেই সেটা ধারণ করবে। তবে হয়তো হবে না। তাকে মরতে হবে। কারণ, মেয়েদের উপর অভিশাপটা এসে পড়ে। তাদেরই হামলা করে। তাই আমি অপেক্ষা করছি আমার মেয়ের মৃত্যু দেখার জন্য। তবে দেখার বিষয়, আমি তো বিদ্রোহ করেছি অজানা কারণে মৃত্যুর বিরুদ্ধে। তাই এখন প্রকৃতি কি তার ধরন পরিবর্তন করবে নাকি! সেটাই দেখার বিষয়।

জহির ও বন্দুক:

গল্পের শুরুটা করেছিলাম এই বন্দুক দিয়ে। বলেছিলাম, একটি বন্দুক। তার ভিতর তিনটি বুলেট। চকচকে কালচে রঙের বন্দুক। পুরণ সেকেলে টাইপ।
সেই বন্দুক হাতে নিয়ে জহির কতকি ভেবে যায়। রাত হয়েছে। মেয়ে তাকে একটি প্রশ্ন করেছিল। বলেছিল, আব্বু সবাই এখানে এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে কেনো?
সেই উত্তরটাও দেয়া হয়েছিল। তারপর মেয়ে বাবার নিস্তব্ধতা দেখে চলে গেছে।
হয়তো সুকন্যা জহিরকে আরও প্রশ্ন করেছিল। হয়তো সুকন্যা তার বাবার হাতে বন্দুকটি দেখে প্রশ্নও করেছিল, বাবা এটা কি?
কিন্তু জহির শোনে নি। সে শুধু ভাবছে তার রবি কাকুর কথাগুলো। রবি কাকু বিদ্রোহ করেছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। পুর্বসূরিদের অপরাধের শাস্তি যখন তাদের উপর পড়ছে তখন রবি কাকু একাই লড়ছেন। জহিরের বাবা লড়েনি। তিনি ভিতু। অথচ সাহসের সাথে এই গ্রামের মাটিতে তিনি শুয়েছেন। কান পেতে শুনছেন মানুষের কান্না। হয়তো তাই হবে। হয়তো সেই অভিশাপটা তিনি মাথা নত করে নিয়েছেন। হয়তো বা ভয়টাকে মৃত্যুর পর পেয়ে কি হবে তাই তিনি গ্রামেই ঘুমাতে চেয়েছেন।
এইসবই জহির ভেবে যায়। তবে জহিরের মনটা আতংকে ডুকরে ওঠে। যখন তার মনে পড়ে রবি কাকুর সেই কথা। মেয়েদের উপরই আক্রমণ হচ্ছে। মেয়েদেরই ক্ষতি হচ্ছে। মেয়েরাই অভিশাপের শিকার হচ্ছে। দৌড়ে যায় জহির। মেয়ের পাশে যায়। মেয়েকে পাশে সে চুপ করে শুয়ে থাকে। আর মনে মনে বলে, আমরা কালকেই ঢাকা চলে যাবো মামুনি। তোমার কিচ্ছুই আমি হতে দিবো না।

পরদিন সকালে:
সকল গুজগাজ শেষ। কিছুক্ষণ পরই তারা ঢাকায় রওনা হবে। রবি কাকুও এসেছে। তিনিও সাজেস করেছেন, চলে যাওয়ার। এই অতংকের মধ্যে থাকার কোনো মানে হয় না।
জহিরকে বলেছেন, তুমি চাইলে বন্দুকটাও আমাকে দিয়ে যেতে পারো।
জহির দেয় নি। তবে রবি কাকুকে সে বলেছে, আপনার সাথে আমিও যুদ্ধে নামবো। তবে তার আগে আমাকে আগে একটু গুছিয়ে উঠতে দিন।
রবিউল সাথে সাথে জহিরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে, আই এম টায়ার্ড মাই সান। আই এম টায়ার্ড। বিভৎস কিছুর আপেক্ষা আর ভালো লাগছে না। আর না........
জহির এবার কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যায়। তারপর রবিউলকে বলে, কাকু, বন্দুকের গুলিগুলা শেষ করে দেই? গুলি চালিয়ে বন্দুকটাকে ফাঁকা করি। যাতে কোনো বিপদ না ঘটে।
রবিউল নিজেই জহিরের হাত থেকে বন্দুকটা নেয়। তারপর আকাশের দিকে তাক করে তিনবার ট্রিগার চাপে। এতো পুরো বন্দুক অথচ মনে হচ্ছে না। সবলীলভাবে সে বন্দুক থেকে গুলি ছুটে গেলো। পাশেই সুকন্যা ছিল। সুকন্যা কানে হাত দিয়ে দাড়িয়ে থাকলেও সে খুব মজা পেয়েছে। বার বার সে বলছে, আব্বু আবার গুলি করো। আবার গুলি করো। প্লিজ আব্বু...প্লিজ।
গ্রাম ছাড়ছে জহির ও তার পরিবার। জহির বলেই গেছে, এ গ্রামে সে আবার ফিরে আসবে। রবি কাকুর সাথে বিদ্রোহে অংশ নেবে। তার উত্তরসূরিদের রক্ষা করতে সে নিজেকে বিলিয়ে দেবে। যখন ট্রেনটা ছাড়লো তখন জহির মনে মনে বিড়বিড় করে বলছে, আমি আসছি বদরপুর। আমি আসছি তোমার কাছে আবার। লড়বো। অভিশাপের বাতাসের সাথে লড়বো। আমি আসছি......
টেনটা ছাড়ার পর থেকে সুকন্যা জহিরকে পাগল করে তুলেছে। তার সেই বায়না শেষই হচ্ছে না। সে বার বার বলছে, আব্বু প্লিজ আবার গুলি করো.....আবার গুলি করো।
বন্দুকটার জন্য রবিউল একটা আলাদা বক্স দিয়েছে। সেই বক্সে বন্দুকটার সাথে কিছু কাগজ পত্রও আছে। ডিপার্টমেন্ট অফ হোমমিনিষ্ট্রি থেকে কাগজগুলো নেয়া। এক কথায় বন্দুকে লাইসেন্স। রাস্তাঘাটে যাতে কোনো সমস্যা না হয় তাই কাগজগুলো দিয়ে দিয়েছে সে।
মেয়ের আবদারে অতিষ্ট হয়ে জহির বন্দুকটা বের করে। আর বলে, মা ভেতরে আর কোনো বুলেট নেই। এখন ট্রিগার চাপলেও গুলি বের হবে না। শুধু শুধু জালাতন করিস না।
সুকন্যা বিশ্বাস করতে চায় না। ট্রেনের ঝিক ঝিক আওয়াজে সুকন্যা বলে ওঠে, মিথ্যা কথা। আছে। বুলেট আছে। তুমি বাইরে গুলি করো।
জহির মেয়ের কথা রাখে। বাইরে বন্দুক তাক করে ট্রিগার চাপে।
তারপর বলে, দেখেছিস? বুলেট নেই।
সুকন্যার মনটা খারাপ হয়ে যায়। তারপর সে চুপ করে বসে থাকে। আবার সে তার বাবার কাছে আসে। আব্বু গুলি কেনো নেই?
মেয়ের মনটাকে ভালো করার জন্য জহির তার মেয়ের সাথে একটা খেলা খেলবে বলে ঠিক করে। হাসতে হাসতে বলে, আবার কথা বলিস। আর এইটা নিয়ে কথা বলবি তো তোকে গুলি করবো।
সুকন্যা হাসে। হাসে আর বলে, কই কই করো করো। এই ভাবে কিছুক্ষণ যায়। তারপর বন্দুকের নলটা সুকন্যার পেট বরাবর রেখে জহির বলে, করবো করবো গুলি?
সুকন্যা আরও মজা পায়। বন্দুকের নল নিজ হাতে ধরে বলে, করো করো।
ট্রিগারটা চাপও দেয় জহির।
ট্রেনের আওয়াজের সাথে আরেকটি আওয়াজ মিশে যায়। লাফ দিয়ে ওঠে সুকন্যার মা। জহির একটা ধাক্কা অনুভব করে। তিনটি বুলেট ছিল। তিনবার গুলি চালানো হয়েছিল। তিনটি বুলেট ফাকা আকাশে ছোড়া হয়েছিল। চতুর্থবার ট্রিগার চাপা হয়েছিল তখন বুলেট ছিল না। তবে এখন কেনো ধাক্কা খেলো জহির?
সুকন্যার মা চিৎকার দিয়ে ওঠে। জহির চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে। বন্দুকের নলটা তখনও সুকন্যার দিকে।
সুকন্যার চোখ লাল হয়ে উঠেছে। বাবার দিকে তাকিয়ে সুকন্যা আবার তার বাবাকে প্রশ্ন করলো, বাবা আমাকে সত্যি সত্যি গুলি করলে?
জহির উ™£ান্ত হয়ে যায়। এদিক সেদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। পাগল হয়ে ওঠে জহির। আমার মেয়েকে আমি গুলি করেছি? আমি?
জহিরকে শান্ত করা হয়। সুকন্যার মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে। একটি ষ্টেশানে ট্রেন থামিয়ে তাদের সদর হাসপাতালে নেয়া হলো। জহির তখনও চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। কি দেখছে? হয়তো কিছুই দেখছে না।
সুকন্যার মার জ্ঞান ফেরেনি। সুকন্যার রক্তাক্ত শরীর মর্গবিহীন হাসপাতালের ফ্লোরে পড়ে রয়েছে।
জহির মিনমিনিয়ে বলছে, রবি কাকু। তুমি জয়ী হয়েছো। তোমার বিদ্রোহ সফল হয়েছে। অভিশাপ আসার পেটার্ন পরিবর্তন হয়েছে। অজানা কারণে মৃত্যু বন্ধ হয়েছে। এখন শুরু হয়েছে পিতার হাতে কন্যার মৃত্যু।
----------------------------------------------------------------------
গল্পটা মনে হয় অনেক বেশী বড় হয়ে গেলো। সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/28982799 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/28982799 2009-07-24 00:58:32
বড়গল্প: "বন্দুক" - ১ম পর্ব ছবিটির সাথে গল্পের নামকরণের কোনো মিল নেই। তা কিন্তু নিঃসন্দেহে বলে দেয়া যায়। তবে বিশ্বাস করুন গল্পের মিল আছে। ফুটে উঠবে। আশা রাখি শেষ পর্বে ফুটে উঠবে।
----------------------------------------------------------------------------
একটি বন্দুক। তার ভিতর তিনটি বুলেট। চকচকে কালচে রঙের বন্দুক। পুরণ সেকেলে টাইপ। এই সব বন্দুক রাজার আমলে ছিল হয়তো। জহিরদের পরিবারের কেউ রাজা বাদশা ছিল কি না তা তো আর সে জানে না। তবে বংশক্রমে তা চলে এসেছে।
এই বন্দুক অবিস্কার সে কিছুদিন আগেই করেছে। আবিস্কারের ঘটনাটা বলা যাক।
জহির তার গ্রামের বাড়ি খুব একটা যায় না। বাবা মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তো আরও যাওয়া হয় না। এই কিছুদিন আগে সে বেড়াতে গিয়েছিল। গ্রামে আপন বলতে তেমন কেউই নেই জাহিরের। শুধুমাত্র আছে এক চাচা। তাও সেই চাচার সাথে তাদের খুব একটা ঘনিষ্ঠতা নেই। তারপরও শহুরে ছেলে তার বউ বাচ্চা নিয়ে গ্রামে এসেছে তাই সেই চাচার আপ্যায়নের কোনো শেষ নেই। সেই চাচাকে জহির ডাকে রবি কাকু বলে। ওনার নাম আসলে রবিউল। সেই রবিউল হয়ে গেছে রবি। যা হোক। তো, সে চাচা একদিন জহিরকে বলছিলেন, আমাদের বংশধররা রাজা বাদশার বংশধর আছিল বুঝলা বাবা।
জহির তখন মাথা নাড়ায়। আর একটু অবাক হয়েই বলে, তাই নাকি চাচা? বাবার কাছে তো কখনও শুনিনি।
- আরে, আমরা তো আর সেই ব্যাপরটা নিয়া ঘাটাই না। বুঝলা। আমাদের মধ্যে কেউই কিন্তু চায় না, নিজেদের রাজা বাদশার বংশধর ব্যপারটা নিয়া গৌরব করতে।
জহির আবার আবাক হয়। এ আবার কেমন কথা! রাজা-বাদশার বংশধর হওয়া তো গৌরবের ব্যাপার। মানুষকে গৌরব করে বলাও যায়। এ কথাগুলো রবি কাকুকে বলে জহির।
রবি কাকুও ধমক দিয়ে বলেন, কি যে বলো তোমরা। রাজা বাদশারা তাদের প্রজাদের উপর যে পরিমাণ অত্যাচার করতো! সেই অত্যাচারের কথা লুকুচুরি করেও ইতিহাসে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। নিজেকে ঐ অত্যাচারি বংশের লোক মনে হলেই তো ঘিন্না করে।
জহির এরপর হেসে ওঠে। কাকু, অত্যাচার যে করেছে সে খারাপ। তবে এ কথা তো সত্য যে মানুষই তাদের সেই ক্ষমতায় বসিয়েছে। আর মানুষতো তাদের মানতও। সুতরাং তাদের কর্মে আমরা কেনো অপরাধী হবো।
রবিউল এবার একটু চুপ যান। তিনি আসতে আসতে হাটেন আর কথা বাড়ান।
জহির এবার ঘটনাটা একটু ডিটেইলে যায়। বলে, রবি কাকু, তার আগে আমার একটা প্রশ্নের জবাব দেন। আপনি বলছেন, আমরা রাজা-বাদশার বংশধর। তাহলে রাজপ্রাসাদ কোথায়। রাজপ্রসাদ তো নেই। তাহলে কিসের উপর ভিত্তি করে আপনি একথা বলছেন।
- কথাটা তুমি বাবা ভুল বলো নাই। তবে সত্যি কথা বলতে কি, রাজাবাদশাও আসলে বলা চলে না। বলা চলে, আমাদের পূর্বসূরিরা ছিল জমিদার। অঢেল জমির মালিক ছিল তারা। লোকমুখে কিন্তু এখনও অনেকে এই কথা বলেন, এই গ্রামের অধিকাংশ জমি আমাদেরই ছিল। আর রাজপ্রাসাদ আসলে যে কোথায় তা আমরাও জানি না। হয়তো মানুষের অভিশাপে সমস্ত কিছু কালগর্ভে হারিয়ে গেছে। তবে এটা আমি নিশ্চিত যে আমার পূর্বসূরি রাজাবাদশা মানে জমিদার ছিল।
জহির এবার একটু ভাবনায় মগ্ন হয়। শহুরে পরিবেশে অত্যাধুনিক পরিবারের ছেলে সে। তার বাবা একজন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন। নামকরা সরকারি কর্মকর্তা। সেই পরিবারের ছেলের গ্রাম বাংলার ইতিহাস তেমন একটা না জানাটাই স্বাভাবিক। যা জানে তা বই-পুস্তক থেকে। তার বাবাও খুব একটা গ্রাম নিয়ে কথা বলতো না।
আর তাছাড়া জমিদার কিংবা রাজারা একসময় প্রজাদের উপর অত্যাচার করতো তা সকলেই জানে।
তাই জহির এবার মনে মনে ভাবে, হয়তো বাবা এই কারণেই খুব একটা গ্রাম ঘেষা ছিল না। গ্রামে আসলে হয়তো সেই অতিত তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। তাই হয়তো বাবা গ্রামকে এড়িয়ে চলতো। তারপরও মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাবা বলতো, ইস আমার গ্রাম বদরপুর। কত্ত সুন্দর সবুজে ঘেরা। গ্রামের মানুষ কত্ত আবেগী। এই আবেগী মানুষ এই স্বার্থে ঘেরা শহরে পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার।
গ্রামের কেউ যদি কখনও তাদের বাড়ি আসতো তবেই তার বাবা ব্যস্ত হয়ে যেতো তাকে অপ্যায়ন করার কাজে। গ্রামের অনেকেই প্রায়ই তাদের বাসায় যেতো। আর তখনই তিনি অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহার দিয়ে তাদের সকলকে মুগ্ধ করে দিতেন। গ্রামের লোকটি যে পর্যায়েরই হোক না কেনো! হোক না সে কৃষক! তাতে কি! তার আসল পরিচয় সে বদরপুরের লোক। ব্যাপারটা অনেকটা এমনই।
এসব ভাবতে গিয়েই জহিরের মনে একটু খটকা লাগে। সে ভাবে, যে লোকটা সব সময় গ্রাম থেকে দূরে দূরে থেকেছে সে কেন শুধু শুধু গ্রামের লোক পেলে এতো অস্থির হয়ে উঠতো।
এই উত্তেজনাটা জহির চাপিয়ে রাখতে পারলো না। সে তার রবি কাকুকে প্রশ্ন করে, কাকু, তা না হয় বুঝলাম যে আমরা জমিদার বংশের লোক। কিন্তু তারপরও একটা চিহ্ন তো থাকবে। এমন কিছুই কি অবশিষ্ট নেই?
রবিউল এবার হাসে। রহস্যে ঘেরা একটি হাসি। জহির তার মানেও বুঝতে পারে না।
তারা তো হাটছিল। হঠাৎ রবিউল থেমে যায়। থেমে যাওয়ার পর বলে, এ জায়গাটার নাম জানো জহির?
জহির না সূচক মাথা নাড়ে। আর তাছাড়া সে এই ব্যাপারে কোনো আগ্রহও দেখায় না। সে মগ্ন আছে তার চিন্তায়। সে মগ্ন আছে জমিদারিত্ব নিয়ে। জমিদারদের বংশধর। এতো আর ছেলেখেলা ব্যাপার নয়। অনেক বড় একটা বিষয়। শতবছরের ইতিহাস তার বংশেই ঘটেছে! এই বিষয়টা নিয়ে সে খুবই উত্তেজিত। আগ্রহ-কৌতুহল।
রবিউল আবার তাকে বলে, কি বাবা, আগ্রহ পেলে না। তাই তো?
জহির এবার চুপ করে থাকে।
রবিউল বলে, এই জায়গাটার নাম হচ্ছে নর্তক হাট। আর নর্তক শব্দটা কোথা থেকে এসেছে বুঝেছো তো? এসেছে নর্তকী থেকে।
এইবার জহির একটু আগ্রহ পেলো। নর্তকী। জমিদারদের আয়েশের অন্যতম উপাদান নর্তকী। এই নর্তকীদের নিয়ে ইতিহাসে অনেক গুজব আছে। আসলে গুজবও বলা যায় না। বলা যায়, ইতিহাসে তাদের সাথে রাজা কিংবা জমিদারদের সাথে অবৈধ সম্পর্কের অনেক প্রমাণও আছে।
যা হোক। রবিউলকে জহির প্রশ্ন করে, এই নর্তক নাম দেয়ার কারণ কি।
রবিউল আবার হাসে। বলে, তুমিই তো প্রমাণ চাইলে। অবশিষ্ট কিছু। এই যে। নর্তক। এটাই তো প্রমাণ। কি মনে হয় তোমার?
জহির চুপ করে থাকে। প্রমাণ কি করে হলো। প্রশ্নও করে সে।
এরপর রবিউল তাকে ইতিহাসের পাতায় ঢোকায়।
- শোনো বাবা। এই জায়গায় নর্তকীদের বাড়ি ছিল। এই জায়গা থেকে জমিদার বাড়িতে নর্তকীদের নিয়ে যাওয়া হতো। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, এই বাড়ির মানুষ জন্মসূত্রেই নর্তকী। তার মা নর্তকী। তাই তো কন্যা সন্তানটাও নর্তকী। মজার ব্যাপার হচ্ছে, রাজমহলের ভিতরে অর্থাৎ জমিদারের স্ত্রীর পুত্র সন্তান হওয়া অনেকটা বাধ্যতামূলক ছিল। না হলে, দ্বিতীয় বিয়ে। ঠিক তেমনি নর্তকীদের গর্ভে কন্যা সন্তান হওয়াটা অনেকটা বাধ্যতামূলক ছিল। তা না হলে প্রাণ যাবে। বংশক্রমে নর্তকী তৈরী করতে হবে। তা না হলে রাজা বাদশার আয়েশের উপাদান আবার জোগাড় করবে কি করে। তাদের অত্যাচারের বর্ণনা শুনলে তুমি শিউরে উঠবে। যেমন, একবার এক জমিদারের ছেলের খায়েশ হলো, মায়ের গর্ভে কি করে সন্তান থাকে তা সে নিজ চোখে দেখবে। জমিদারের পূত্র বলে কথা। বলেছে মাত্রই তাকে দেখাতে হবে। জমিদারও নির্দেশ দিলো, গর্ভবতী মহিলাকে নিয়ে আসা হোক। পেয়াদারা লেগে গেলো পুরো গ্রামে গর্ভবতী মহিলা খোজার তালে। এক ঘন্টার মধ্যে নিয়ে আসা হলো গর্ভবতী মহিলা। জমিদারের ছেলের সামনে সেই মহিলার পেট তলোয়ার দিয়ে কাটা হলো। কেটে দেখা হলো গর্ভাবস্থায় এক শিশুর অবস্থান কেমন হয়।
চিন্তা করতে পারো? কতটা ভয়াবহ? একটা মানুষের পেট জীবন্ত অবস্থায় কেটে ফেলা হলো। একটি নির্দোষ মানুষকে হত্যা করাতো হলোই সাথে সেই শিশুটি হত্যা হলো যে কিনা এই পৃথিবী দেখতেই পেলো না। আর সেই হত্যা কেনো হলো? এক মাত্র তাদের কৌতুহল মেটানোর জন্য। সেই রক্তের ছিটা যে তাদের গায়ে লেগেছে সেই রক্তের অভিশাপ কি আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায় না?
রবিউল যেনো খুব ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছে। এই ভয়াবহ বিষয়টা বলার সময় সে রীতিমত কাঁপছিল।
যাইহোক, রবিউল আবার বলতে শুরু করলো, জমিদারদের নর্তকীদের বিষয়টা ছিল আরও ভয়াবহ। এই জমিদারদের নর্তকীদের ভোগ করতো তারাই। হয়তো, সেই নর্তকীর পেটে জমিদারেরই সন্তান। আবার সেই সন্তানকে হয়তো সে নিজেই ভোগ করছে। বৃদ্ধ জমিদার হয়তো নিজ কন্যার সাথেই বিছানায় শুয়েছে। অথবা জমিদারের অবৈধ কন্যা সন্তান নর্তকী হয়েছে। আর জমিদারের দায়িত্ব পেয়েছে জমিদারের বৈধ ছেলে। সেই ছেলেও হয়তো নিজের বোনের সাথে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে।
পাপ। একের পর এক পাপ তারা করে বেড়িয়েছে। ভয়াবহ পাপ। সেই পাপ কি এ প্রকৃতি ভুলে গেছে ভেবেছো? না ভুলে নি। প্রকৃতি এখনও ভুলেনি। এখনও নির্যাতিত প্রজাদের কান্না বাতাসে পাওয়া যায়। তোমাকে কি সাধেই বলেছি, অভিশাপ সব কিছু ধ্বংস করে গেছে। আর এই নর্তক হাটটা কিন্তু নর্তকীদের উত্তরসূরিদেরই করা। তারা এখন এই গ্রামের সব চাইতে প্রতিষ্ঠিত বংশ। তাদের যাতাকলেই এখন গ্রাম পিষ্ঠ। নর্তক ঘরের লোকজন শহরে- বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তার মানেটা এখন বুঝতে পারছো? প্রকৃতি ওদের সম্ভ্রম দিয়েছে আর আমাদের মাটিতে মিশিয়েছে। এগুলোই হচ্ছে প্রমাণ। বুঝলা বাবা। এর চেয়ে আর বড় প্রমাণ কি চাও?
জহির এবার চুপ করে থাকে। অবাক হয়ে মুখটা হা করে উ™£ান্তের মত চিন্তায় মগ্ন হয়ে যায়। জহির মানতে পারে না এ অত্যাচারের কথা। নির্মম ওরা। একটি মানুষের পেট কেটে দেয় একমাত্র কৌতুহল মেটানোর জন্য। কি অদ্ভদ এ পৃথিবী। কি নির্মম!!

চলবে......

[পরবর্তী পর্বই শেষ পর্ব। কথা দিচ্ছি। বন্দুকের আসল গল্পটা শেষ পর্বেই বলবো।]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/28981743 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/28981743 2009-07-22 00:23:10
গল্প: "গার্লফ্রেন্ড" বেশ কয়েকবছর ধরে ঢাকা শহর জুড়ে একধরনের বন্ধু একটু বেড়ে যাচ্ছে। সে সকল বন্ধুদের আবার ইংরেজী শব্দ দিয়ে সম্মধন করা হয়। ইদানিং সে সকল বন্ধুগণদের সংখ্যা ঢাকা পেরিয়ে সারা বাংলাদেশেই বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে এই বন্ধুরা অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাদের জন্য ঢাকা শহরে চলাফেরা করা ভার হয়ে উঠছে। তারা যেনো এখন ঢাকা শহরের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। অবশ্য একটা সত্যি কথা হচ্ছে, তারা এখন সকলের সুখ দুঃখের সাথি হয়ে উঠেছে। যাদের এই বিশেষ বন্ধু থাকে না। বিশেষ করে ছেলেদের কথাই বলছি। তারাই যেনো ব্যাকডেটেট। যাই হোক। এতো প্যাচাল না করে সেই বন্ধুদের কথাই বলি।
বাংলায় ওরা মেয়ে বন্ধু। তবে মেয়ে বন্ধু মানে শুধুই বন্ধু। তবে যদি তা ইংলিশে প্রনাউন্স করা হয়। তবেই কিন্তু হয়ে গেলো বিশেষ বন্ধু। মানে গার্লফ্রেন্ড। গার্লফ্রেন্ড মানে একটু বিশেষ আহলাদি বন্ধু। এক্সট্রা একটু সম্পর্ক। কথায় কথায় বেবি সম্বধণ। যেমন, ফোন করেই তারা বলবে, বেবি তুমি কি খেয়েছো?
আর ওপাশ থেকে ছেলেটি, হ্যা বেবি, আমি তো খেয়েছি। তুমি কি খেয়েছো?
এভাবে আহলাদি ভঙিতে গার্লফ্রেন্ড চালিয়ে যায় তাদের কথা। তবে এই লেখায় একটা অবিচার করছি। সেটা হচ্ছে, আমি গার্লফ্রেন্ডকে নিয়েই কেনো বলছি। এখানে তো বয়ফ্রেন্ডের কথাও আশা উচিত। তাই অনেকে হয়তো বলেই ফেলবেন, বেটা পুরুষশাসিত সমাজের দালাল.....শুধু মেয়েদের নামেই গীবত গাস।
আসলে সত্যিকথা বলতে কি, আমি কিন্তু কারও গীবত গাওয়ার জন্য গল্প লিখতে বসিনি। আমি বসেছি, এই গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে গল্প লিখতে। তাই বয়ফ্রেন্ডের নাম আনার খুব প্রয়োজন আনার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
এই সম্পর্কটার সরাসরি নাম হচ্ছে প্রেম। এক সময় শুনেছি, প্রেমিক নাকি প্রেমিকার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করতো দেখা করার। তারপর দেখা হতো মিনিট পাচেক এর জন্য। তারপর চিঠি চালাচালি। চিঠির মাধ্যমে প্রেম। দীর্ঘসময় পর প্রেম হতো। আবার তারও দীর্ঘসময় পর হতো প্রেমের বিয়ে। তাই প্রেমের বিয়ে হতে দেখলেই সকলে বলতো, যাক ওদের প্রেম সফল।
এই বিষয়টা নিয়েই একটা খোচা মারার দরকার আছে। প্রেম করে বিয়ে করলেই যেনো প্রেম সফল। এ যেনো তিনঘন্টার কোনো সিনামা। পুরো সিনামা জুড়ে প্রেমকে জয় করার এক যুদ্ধ চলতে থাকে। তারপর শেষে এসে প্রেম সফল। তারপর বড় পর্দায় বড় বড় করে লেখা উঠবে “সমাপ্ত” । এবার আপনারাই বলুন। বাস্তব জীবনটা কি এমন?
বাস্তব জীবনে কি বিয়ে করা মাত্রই সকল কিছুর সমাপ্ত হয়। মানে, বিয়ে মানেই কি প্রেমের সমাপ্তি?
আপনাদের কথা জানি না। তবে আমার মতে, প্রেমের আসল অধ্যায়টাই শুরু হয় বিয়ের পর। মৃত্যুর শেষ পর্যন্ত যখন দেখা যাবে তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করেছে ঠিক তখনই দীর্ঘনিশ্বাস নিয়ে বলা যাকে, ইয়েস.....এটাই প্রেম। এটাই জীবন। অসাধারণ জীবনের অধ্যায় সমাপ্ত। আর সেই সাথে তাদের প্রেমটাও সার্থক।
যাইহোক, ওসব কথা বাদ দিয়ে আসল কথায় আসি। আমার এই এক সমস্যা। কিছু নিয়ে যখন লিখতে বসি তখন নিজের মূল ভাবনা ছিটকে অন্য ভাবনায় চলে যাই। বিশ্বাস করুন আমি কিন্তু গল্প লিখতেই বসেছিলাম। তবে এখনও কিন্তু শুরুই করতে পারছি না। এখনও অন্য প্যাচাল পেকে যাচ্ছি।
প্রেম বিষয়ক কথা বলতে গেলেই গার্লফ্রেন্ড আসবে। আমার এক বন্ধু আছে, কথায় কথায় বলবে, মাই গার্লফ্রেন্ড ইজ.....
মানে সব কথায় ওর গার্লফ্রেন্ডের প্রসঙ্গ টানতেই হবে। আবার সুন্দরী মেয়ে দেখলেই বলতে, ওয়াও শি ইজ হট। বাট মাই জিএফ ইজ মোর হট।
ওহ। গার্লফ্রেন্ডের একটা শর্ট টার্ম আছে। সেটা হচ্ছে, জিএফ। তো, এই জিএফ গোষ্ঠীর আগোচরে তাদের বিএফরা যে অন্য মেয়েকে চোখ দিয়ে চুষে দেখে এমনটা কিন্তু কেউই বলতে পারবে না।
একটু স্মার্ট হ্যান্ডসাম ছেলে-মেয়ে একসাথে হাত ধরে ঘুরে বেড়াবে। রাস্তায় এই দৃশ্য এখন খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। দেশের জনগণ তা দেখবে আর মুচকি মুচকি হাসবে তাদের কান্ড দেখে এটাও খুব সাধারণ। তারা ড্যাট করার জন্য এখন ব্যবসায়িক সমাজ বিবিধ হাইফাই ফাস্টফুড ক্যাফেও গড়ে তুলছেন। তাদের ঘিরেই কিন্তু এখনকার ঢাকা অত্যন্ত রমরমা। এখানে ড্যাট বলে একটা ইংলিখ শব্দ আমি ব্যবহার করেছি। এর বাংলাটা ঠিক আমরও জানা নাই। যাইহোক, আবার ধরেন, একটা মেয়ে আর ছেলেকে একসাথে সি.এন.জি ভাড়া করতে গেলেও একটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। যেমন, আমার এক বন্ধু সে তার গার্লফেন্ডকে নিয়ে ঘুরতে বের হওয়ার আগে ভাড়ার জন্য আলাদা বাজেট করতে হয়। কারণ, আমাদের শহরের সিএনজির ড্রাইভাররা অতি চালাক হয়ে উঠেছে। তারা সম্পর্কের মাপকাঠি বুঝে গেছে। তাই রেটও হাই যায়। যে জায়গায় ৫০ টাকা ভাড়া হবে সেখানে তারা চেয়ে বসে ১০০ টাকা। অনেক সময় তা আরও বেড়ে যায়।

নাহ। গল্প শুরু করা দরকার।

গল্প নং এক:
আমার স্কুলের এক মেয়ে বন্ধু ছিল। আপনাদের কিন্তু শুরুতেই বলেছি, মেয়ে বন্ধু মানে শুধু বন্ধু। আর যখন তা ইংলিশে উচ্চারণ করবেন তখনই কিন্তু সম্পর্কের বৈশিষ্টটা পাল্টে যাবে। যাইহোক, তো, সেই বন্ধুর প্রেম হয় আমরা যখন কলেজে উঠি। তখন থেকেই তাদের প্রেম। সে প্রেম কি! বলতে হবে মহা প্রেম। মিনিটে মিনিটে ফোন। জানু আমি এখন ক্লাসে যাচ্ছি। জানু আমি এখন লাঞ্চ করছি। জানু আমি এখন বাসায় যাবো। জানু আমি এখন বাস খুজছি।
কি আশ্চর্য। প্রতিটি ঘটনার বর্ণনা দেয়া হতো। আর জানু ছাড়া কোনো কথাই নেই। জানু জানু জানু।
একদিন আমি দুষ্টামি করে বলেছিলাম, দোস্ত তুই কি টয়লেটে যাওয়ার আগেও ফোন দিয়ে বলিস, জানু আমি এখন টয়লেটে যাচ্ছি। তারপর আরও কিছু বলেছিলাম তবে তা আপনাদের বলবো কেনো?
যাইহোক। কলেজের শেষের দিকে হঠাৎ একদিন আমাদের সব বন্ধুদের এক বিশাল আয়োজন করে একটি কথিত হাইফাই রেষ্ট্রুরেস্টে খাওয়ানো হয়। তারা আমাদের সব বন্ধুদের ট্রিট (ট্রিট শব্দটাও কিন্তু ইংরেজী। কোনো বিশেষ কিছু হলেই কিন্তু বন্ধুরা বলে, ট্রিট দে) দেয়। উদ্দেশ্য তাদের নাকি দুই বছর পূর্তি। ব্যপারটা হাস্যকর ছিল তখনই। প্রেমের দুই বছর পূর্তি এ যেনো এক বিশাল সফলতা।
তো, সেই বন্ধুর সাথে কলেজ ছাড়ার পর আর তেমন যোগাযোগ হয়নি। হঠাৎ অনেক বছর পরই বলতে হবে, আমাকে সেই মেয়ে বন্ধুটি ফোন দেয়। আমি একটু হকচকিয়ে যাই। ঘটনা কি! হঠাৎ ফোন। আমি হকচকিয়ে গেলেও সে কিন্তু খুব নরমাল। এবং খুব সাধারণভাবেই আমাকে একটা পার্টির দাওয়াত দেয়। বলে, দোস্ত আমাদের ১ বছর পূর্তি। চলে আসিস। তোকেও অনেকদিন দেখি না। দেখাও হলো। খাওদাওয়াও হলো।
কথাটা শুনে আমি নিজেও একটু ভড়কে যাই। আরে বলে কি! হিসাব অনুযায়ী আমি ওর প্রেমের দুই বছর পূর্তিটা খেয়েছি। আর হিসাব কষলে দেখা যাবে, ঐ প্রেমের বয়স হবে, ৬ বছর।
তাহলে, এক বছর কীভাবে হয়?
প্রশ্ন করতে কিন্তু আমি ছাড়ি নাই। আমি বলেছি, এর মানেটা কি?
আমার মেয়ে বন্ধুটিরও সাবলিল উত্তর, ধুর শালা। তুই এখনও ঐ ইতিহাস নিয়ে বসে আছিস। হি ইজ নাও ওয়াজ। ওর সাথে ব্রেকাপ হয়েছে ৩ বছর হয়ে গেছে। অনেক বছর একা কাটালাম। এখন জুয়েলকে পেয়েছি। অসাধারণ একটা ছেলে। ওর মতো ছেলে পেয়ে মনে হচ্ছে প্রেম কাকে বলে। হি ইজ নাইস পারসন। তোরও ভালো লাগবে। চলে আসিস।
ফোনের লাইনটা কেটে একটু হাসলাম। হায়রে প্রেম। এই একই কথা ও এর আগের বারও বলেছিল। হি ইউ নাই পারসান। সময়ের সাথে সাথে নাইস পারসানরা বদলে যায়। প্রেমের ডেফিনেসানটাও মনে হয় এরা জানে না। প্রেমকে ধরে রাখার যে আপ্রাণ চেষ্টাটা থাকা উচিত তাই হয়তো ওরা অনুভব করে না। ওদের হাতে হয়তো অপশান থাকে। একজন গেলে কি হলো.....আরেকজন তো আসবেই। আর যে আসবে সে তো এর চেয়ে ভালো হবেই। ব্যাপারটা হয়তো ওরা এভাবেই দেখে।

গল্প নং. দুই:
চারিপাশে বন্ধুদের গার্লফেন্ডের ছড়াছড়ি দেখে আমারও সখ জাগে, ইস যদি আমার এমন এক থাকতো। সারাদিন পুতু। পুতু পুতু আহলাদি কথা বলবে। জানু কি করো? কই যাও। খবরদার ঐখানে যাবা না। খবরদার সিগারেট খারা না।
এমন খবরদারি দূর থেকে তো ভালোই লাগে। তবে কপালের দোষে তা হয়ে ওঠে না। পায়ের জুতো খসে যাওয়া। অনিয়ন্ত্রিত জীবন। হেয়ালী, দায়িত্বজ্ঞানহীন, আনরোমান্টিক একটা ছেলের কপালে কি আর গার্লফ্রেন্ড জোটে!!!
তাই বন্ধুদেরটাই দেখি। দেখি আর হাসি। আমার এক বন্ধু বলে, তুই তো শালা সারা জীবন মজা নিয়ে গেলি। অন্যেরটা দেখে মজা নেস। যেদিন ফাঁদে পড়বি দেখবি তোর মজা সবাই নেবে।
ওর কথা শুনে আমিও হাসতাম। আমার এই বন্ধুটি অত্যন্ত লাল্টু টাইপ। বড়লোক পিতার একমাত্র ছেলে। নিজগাড়ি ড্রাইভ করে আর পটাপট ইংলিশে কথা বলে। ওর সাথে থাকলে আমার একটা লাভ হয়। স্মার্ট হওয়ার একটা সুযোগ থাকে। ওর সাথে পটাপট ইংলিশ ছাড়তে যাই। নির্ভূলভাবে ইংলিশ বলে নিজেই গর্বিত হই নিজের দক্ষতা দেখে।
যাইহোক। আমার সেই বন্ধুরও একটি গার্লফ্রেন্ড আছে। অতি স্মার্ট গার্লফ্রেন্ড। সেই একই নেকামি টাইপ গার্লফ্রেন্ড। জানু আর বেবি ছাড়া কথাই বলতে পারে না।
তাদের সাথেই ঘুরতে বের হয়েছিলাম একদিন। কি প্রেম তাদের। আমি গাড়ির পেছনের সিটে চুপচাপ নিজেই বিব্রতবোধ করছিলাম। নিজেকে মনে হচ্ছিল, একটা মুরগী। ওদের অতিমাত্রায় প্রেমে আমিও নিজেও বিগলিত। আর মনে মনে আফসোস। হায়রে। কেন যে আমার গার্লফ্রেন্ড নাই। কত্ত সুখ এই প্রেমে।
এই সব ভাবতে ভাবতে দেখি সামনের সিটে চিৎকার চেচামেচি। ঘটনাটা ঠিক মত দেখলামই না। হঠাৎ রাস্তায় গাড়ীটা থামানো হলো। আর আমি স্পষ্টভাবে শুনলাম, তুই তুকারি করে তারা একে অপরকে বলছে। এক পর্যায়ে মেয়েটাকে গাড়ী থেকে জোর করে নামিয়ে দেয়া হলো। আর সো করে গাড়িটিকে টানা হলো।
আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পেছন থেকে শুধু বলছি, দোস্ত মেয়েটা ওঠা।
সে পেছন থেকে বলল, তুই চুপ থাক।
আর বার বার ফোন। বার বার ফোন। আমি শুনছি মেয়েটির কান্নার আওয়াজ। বার বার ফোন দিচ্ছে আর আমার বন্ধুর ধমকে লাইন কেটে যাচ্ছে। আবার ফোন। বার বার ফোন। কথা একটাই, প্লিজ আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। আমি কিচ্ছু চিনি নাতো।
আর আমার বন্ধু খুব গম্ভীর ভাষায়, ট্যায়েক এ সিএনজি। এন্ড গো হোম।
মেয়েটারও নেকামী যায় না। বার বার ফোন দিয়ে একটাই কথা। আমি একা কিভাবে যাবো। মনে হয়, এই ঢাকা শহরে তার একা চলে কোনো অভ্যাস নাই।
শেষে আমিও অনুরোধের বাতি জালাই। বেচারা আমার বন্ধু শেষে বাধ্য হয়ে আবার গাড়ী ঘুরিয়ে সেই জায়গায় পৌছায়। যেখানে মেয়েটি নামিয়ে দিয়েছিল।
বেচারি গাড়ী উঠেই অঝোরে চিৎকার করে কাদতে থাকে। তার একটাই প্রশ্ন। আমাকে তুমি এভাবে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিলে। এভাবে কিভাবে পারলে। হাউ ক্যান ইউ ডু দিস।
আমি পেছন সিটে চুপচাপ বসে আছি। সামনে কান্না আর প্রশ্ন। আর আমার বন্ধু তখন গাড়ী ড্রাইভে মনোযোগ দিয়ে আছে।
---------------------------------------------------------------------------

হ্যা প্রেম। এগুলোই প্রেম। আমাদের প্রেমগুলো এমনই হয়ে গেছে। সম্পর্কের নূন্যতম মর্যাদা এখন আর নেই। রিলেশান নামক বিষয়টা যেনো এখন স্টাইল আর ফ্যাশান পর্যায়ে চলে এসেছে। এখন আর কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করে সময় নষ্ট করবে না। এখন কেউ প্রেমের জন্য সব কিছু সেকরিফাইস করবে না। এখন যুগ পাল্টেছে। এখন এগিয়ে যাওয়ার সময়। তাই এই সম্পর্কগুলোও এগিয়ে যাচ্ছে। সন্দিহান সম্পর্কগুলোর উদ্দেশ্যহীনতা নিয়ে কেউ ভাবছে না। আমার এক শিক্ষক বলেছিলেন, হিন্দি সিরিয়ালগুলো সম্পর্ক নামক বিষয়টাকে খেলা বানিয়ে দিয়েছে। তার সেই খেলা আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে বাস্তব হয়ে। আর প্রজন্ম এখন এই খেলায় মেতে উঠেছে। প্রেমকে এখন আর ভালোবাসা দিয়ে জয় করতে পারে না। ভালোবাসা কি তবে এতই মূল্যহীন হয়ে গেছে? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/28980259 http://www.somewhereinblog.net/blog/sasshunam/28980259 2009-07-19 02:41:04