somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গরীববেলার স্মৃতি-৩ (রিপোস্ট)

১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৪:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তখন সবে বুঝতে শিখেছি যে আমাদের দিনগুলো আর আগের মত নেই। আমরা দিনে দিনে গরীব হয়ে যাচ্ছি। আব্বা সবসময় পড়ার জন্য বাটার স্যান্ডেল কিনে দিতেন। বাটার স্যান্ডেল টেকে বেশী। ডিজাইনও সুন্দর। তাছাড়া মধ্যবিত্ত সমাজে তখন বাটার কোন বিকল্পও ছিলোনা। আমার আগের স্যান্ডেল জোড়া কোন ভাবেই পড়ার উপযুক্ত নয়। তিন বছর আমার সেবায় নিয়োজিত ছিলো। এবার তার চির বিশ্রাম প্রয়োজন। অথচ বাইরে যেতে হলে আমাকে সেই অসুস্থ স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে শামুক গতিতে হাটতে হত। দিনগুলো অন্যরকম হয়ে যাওয়াতে সেবার প্রথম ব্যতিক্রম হল। পাড়ার দোকান থেকে অত্যন্ত শস্তা দামের প্লাস্টিকের স্যান্ডেল কেনা হল। ভীষণ শক্ত। পরম তৃপ্তি নিয়ে সেই শক্ত স্যান্ডেল ব্যবহার করছিলাম।

রমজান মাসের শেষভাগে নতুন স্যান্ডেল জোড়ার কল্যানে হোক বা অন্য কোন কারণে আমার ডান পায়ে এক ছোট দানা জন্ম গ্রহন করলেন। বেশ টন টনে ব্যাথা। সেই ব্যাথা প্রতি নে বাড়ছিল। সহ্য করে যাচ্ছিলাম নীরবে। কারন ততদিনে শিখে গিয়েছিলাম যে সামান্য ব্যাথায় ব্যস্ত হয়ে ডাক্তারের কাছে দৌড়ানোর কোন কারণ নেই। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা যতই খারাপ হচ্ছিল প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান ততই বেড়ে যাচ্ছিল। যেমন জ্বর হলে তিনদিন দেখতে হবে। প্রয়োজনে ডিসপ্রিন (প্যারাসিটামল ট্যাবলেটের রাজত্ব তখনও শুরু হয় নাই) খাওয়া যেতে পারে। ভাইরাস জ্বর সাতদিনে এমনি এমনি সেরে যায়। জন্ডিসের কোন ওষুধ নেই, বিশ্রামেই আরোগ্য হয়। বাস্তবতা হলো ডাক্তারের কাছে যাওয়া ছিলো আমাদের কাছে বাজেট বর্হিভূত অপ্রয়োজনীয় ব্যয়।

জন্মগ্রহনের তিনদিনের মাথায় সেই ছোট দানা নিজের গুরুত্ব আদায় করে নিলেন। অর্থাৎ জানান দিলেন তিনি সামান্য নন। পায়ের পাতা ফুলে ঢোল। মাকে জানালাম যে সারারাত ঘুমোতে পারি নাই। মা একটা ডিসপ্রিন খেতে দিলেন আর পানি গরম করে দিলেন বরিক পাাউডার দিয়ে পা সেঁকবার জন্য। নিজ হাতে পা সেকলাম। মা নিজেও পা সেঁকে দিলেন। ডাক্তারকে এড়াতে সম্মিলিত ডাক্তারি কার্যক্রম আর কি! দিন শেষে ফলাফল শুণ্য। পায়ের রং পুরো লালচে হয়ে গেছে। অসহ্য ব্যাথায় কুকঁড়ে গেছি।

আমাদের পাড়ায় তখন বিনয় বাবু (আমরা ডাকতাম কাকু) রোগী দেখতেন। দীর্ঘদিন কম্পপাউন্ডারি করবার পর তিনি কি একটা প্রশিণ সম্পন্ন করে ডাক্তার হয়েছিলেন। হাতেও যশ ছিলো। ইফতার শেষে বিনয় কাকুর কাছে গেলাম। তিনি ফ্রি রোগী দেখতেন। শুধু ওষুধগুলো তার কাছ থেকে কিনতে হত বা রোগীরা চু লজ্জার কারনে তার কাছ থেকেই ওষুধ কিনতেন। তিনি ভালো করে দেখে বললেন পায়ে ইনফেকশন হয়েছে। অপারেশন করাতে হবে। যদিও ছোট অপারেশন তবু সেটা কোন হসপিতালে করালেই ভালো হয়। আমি তাকে বললাম যে হসপিতাল ভয় পাই (মধ্যবিত্ত মানসিকতার জন্য বলতে পারি নাই যে হসপিতালে যাওয়ার মত অর্থনৈতিক অবস্থা আমাদের নাই)। অগত্যা তিনি নিজেই অপারেশন করলেন। বেশ ভালো ভাবেই অপারেশন শেষ করলেন। বেশ যতœ নিয়ে তে গজ ঢুকিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। অনেকদিন পর ভালো ভাবে ঘুমালাম।

অপারেশন-এর দুই কি তিনদিন পরে ঈদ। ঈদের আলাদা একটা অনুভূতি আছে, আনন্দ অনুভূতি। সেই আনন্দ অনুভূতি নিয়েই খুব সকাল বেলা ঘুম থেকে জাগলাম। গোছল সেরে ফ্যানেল কাপড়ের পুরানো ক’র্তা পরে নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিলাম। পুরানো ক’র্তাটা ছাড়া নামাজ পড়তে যাওয়ার মত আর কোন কাপড় ছিলোনা। ভাদ্র মাসের গরমে ফানেল কাপড়ের কূর্তা পরে অনবরত ঘামছিলাম। এই জন্য কোন কারো প্রতিই কোন অনুযোগ ছিলোনা। ব্যান্ডেজ করা পা স্যান্ডেলে ঢুকতে অসম্মতি জানালো। অনেক চেস্টা করলাম। সকল চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল। জীবনে প্রথমবার ঈদের জামাত পড়তে পারলাম না।

চাঁদরাতে বাড়ির সবাই নতুন কাপড় পেয়েছে। আব্বা কোন না কোনভাবে ম্যানেজ করেছেন। শুধু আমি নতুন কাপড় পাই নাই। আব্বা আর মা-ও নেননি। আমার ওষুধ আর ড্রেসিং-এ অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে গেছে। বলা যায় বাজে খরচ। সেই ঈদে নতুন কাপড় না পাওয়াতে কষ্ট পাই নাই। ঈদের জামাত পড়তে না পারার জন্য কষ্ট পেয়েছিলাম। গাঢ় কষ্টে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম দুপুর পর্যন্ত। গায়ে ছিলো ফ্যানেল কাপড়ের পুরানো ক’র্তা। ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে পিঠের সাথে লেপ্টে ছিলো। প্রচন্ড গরম লাগছিলো আবার খুলতেও ইচ্ছে করছিলো না।

অনেকেই অনেক কিছু ভুলে যায়। অথবা খুব সহজেই কেউ কেউ ভুলে যেতে পারে বা ভুলে থাকতে পারে সব। আমি ভুলে থাকতে পারিনা। এক একটা দিন এই সব স্মৃতিগুলো প্লাবনের মত আসে। একটার পর একটা .. তারপর আর একটা.. চলতেই থাকে। আব্বা মারা গেছেন অনেকদিন হল। আজ ফানেল কাপড়ের সেই কূর্তাটাও নেই আর স্যান্ডেল জোড়াও নেই। এই দুটো সামান্য জিনিসের জন্য অসামান্য কষ্ট হয়। শুধু পায়ে অপারেশনের দাগটা আছে, স্মৃতির মত পষ্ট এবং গভীর।

(এই লিখাটা কিছুদিন আগে পোস্ট করেছিলাম। আজ আবার করলাম। রোজার দিনগুলোতে ইফতার করতে বসলে সেই স্মৃতিগুলো একে একে মনে পড়ে। আজ আর দিনটাও এমন মেঘময় যে ইচ্ছা না করলেও অনেক স্মৃতি মনে পড়ছি। তাই এই লিখাটি আবার আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম।
পাঠক, সতত শুভ কামনা আপনার জন্য, সকলের জন্য।)

গরীববেলার স্মৃতি-এর আগের লিখা গুলোর লিংকঃ

গরীববেলার স্মৃতি-১
Click This Link

গরীববেলার স্মৃতি-২
Click This Link

গরীববেলার স্মৃতি-৩
Click This Link

গরীববেলার স্মৃতি-৪
Click This Link
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×