আমি একজনকে বলেছিলাম ১৫-১৬ বৎসর বয়েসী একটি ছেলে প্রয়োজন। যে অফিসে সকাল ৯:৩০ থেকে বিকাল ৩:০০টা পর্যন্ত কাজ করবে। তার কাজ হবে দোকান থেকে ফটোকপি করিয়ে আনা এবং গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র পৌছে দেয়া। ৩:০০টার পর কোন ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে কাজ শিখবে। যাতে একটি সম্মানজনক পেশায় নিয়োজিত হতে পারে। তার নির্দিস্ট বেতন থাকবে। এছাড়া সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার এবং টেনিং সেন্টারের ব্যয় আমিই বহন করবো।
ঐ লোক কোরবানী ঈদের সপ্তাহখানেক আগে আমার কাছে আসিফকে নিয়ে এলেন। অল্প বয়েসী ছেলে। তাকে দিয়ে কাজ হবেনা। কিন্তু ছেলেটার বৃত্তান্ত শুনে তাকে আর না করতে পারিনি। বয়স'তো আর কম হলোনা কিন্তু এখনো খুব সহজে 'না' বলতে শিখি নাই। ঐ লোককে বললাম ও আপাতত থাকুক। আপনি একজন কাজের লোক ঠিক করে দিন।
আসিফ আরো ছোট থাকতেই তার মা মারা গেছে। বাবা আবার বিয়ে করেছেন। বিয়ের পর আসিফকে তার নতুন মা (সৎ মা শ্বদটি আমার কাছে আপত্তিকর মনে হয়। তাই ব্যবহার করলাম না।) এক লোকের কাছে বিদেশ নিয়ে যাবার জন্য বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এই বিক্রির বিষয়ে তার বাবারও সম্মতি ছিলো। তার চাচা এবং চাচী জানতে পেরে তাকে ২০,০০০/-(বিশ হাজার) টাকা জরিমানা দিয়ে আসিফকে ছাড়িয়ে আনে।
নিম্নবিত্ত চাচা এবং চাচীর মানবিকতায় সে চাচা-চাচীর কাছেই থাকে। চাচাকে বাবা এবং চাচীকে মা বলে ডাকে। তার চাইতে ৪ বৎসরের বড় চাচাতো ভাই আরিফকে আপন ভাই বলেই জানে। দুই ভাই এখন কাজ করে পাশাপাশি অফিসে। বাবা কঠিন রোগভোগের পর এখন সম্পূর্ণ প্যারালাইজড। তার চা আর পানসিগারেটের দোকানটা চালান আরিফ-আসিফের মা। আর এই দুই ভাই স্বচ্ছলতার জন্য এই কঁচি বয়সেই কাজ করে ।
আসিফ আজ অফিসে এসে শুধুই ঘুমাচ্ছিলো। নতুন অফিসে এমনিই কাজের চাঁপ কম। তাছাড়া ওর বিশেষ কোন কাজ নেই। ওর গায়ে হাত দিয়ে শিউরে উঠলাম। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করতে জানালো আগের রাত থেকে জ্বর। কোন ওষুধ খায় নাই। এই শীতের সকালে নাস্তা খেয়েছে পানিভাত। তারপর পৌনে একঘন্টা হেটে পৌচেছে অফিসে। কারন ডিউটিতে না এলে যদি চাকুরীটা চলে যায়!!
আমি তাড়াতাড়ি ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি ফিরবার আগে পাড়ার এক ডাক্তারের সাথে আলাপ করে ওষুধ নিলাম। তারপর আমার মা'র কাছে ওকে বুঝিয়ে দিয়ে আবার অফিসে গিয়েছি। পাশের অফিস, যেখানে আসিফের ভাই আরিফ কাজ করে সেখানে গিয়ে আরিফকে কিছুটা বকাঝকা করলাম। কারণ বাচ্চাদের নিয়ে এই ধরনের কান্ডকারখানা দেখলে নিরীহ আমারও মাথায় রক্ত চড়ে যায়। প্রচন্ড ক্রোধ জন্ম নেয়।
ঐ অফিসের স্বত্বাধিকারী একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানীর মালিক। তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন চা খাবার জন্য। ভদ্রতার খাতিরে না করতে পারলাম না। তিনি একথা সেকথার পর বললেন, 'ভাই, আপনিতো এই বদমায়েশগুলোর সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এদের অভ্যাস খারাপ করে দিচ্ছেন। এরা আদর পেলে মাথায় উঠে।' আমি জানতে চাইলাম আমি আদর করলাম কোথায়!! তিনি যা জানালেন তা অনেকটা এরকম যে, আমি ঈদে আসিফকে কাপড় দিয়েছি, সালামী দিয়েছি (এবার ঈদে আমার মন বেশ খারাপ অর্থ সংকটের কারণে। বিস্তারতি লিংকে দেখুন Click This Link) তাই তাকেও আরিফকে সালামী দিতে হয়েছে। আমি আসিফকে একটি নাইট স্কুলে আসবার পরদিনই ভর্তি করে দিয়েছি এখন আরিফ পড়ালেখা শিখতে চাইছে। সর্বশেষ আসিফকে আমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছি এখন তাকেও এই কাজ করতে হতে পারে। আমি তাকে কিছুই বলিনি। কারন এই যার ভাবনা তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। আর মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের সাথে কোন সু্স্থ বিষয়ে আলোচনা চলতে পারেনা।
ঘন্টা দুয়েক আগে বাড়ি ফিরে দেখলাম ড্রইং রুমের সোফায় আসিফ আরাম করে ঘুমাচ্ছে। জ্বর ছেড়ে গেছে। আমি তাকে ঘুম থেকে জাগালাম। মা তাকে নিজ হাতে নাস্তা করিয়ে দিলো যেমন নিজের নাতী-নাতনীদের দেন। তারপর আমাকে বললেন যেন অবশ্যই একটা পাউরুটি আর মিল্কভিটা বা মার্কস গুড়ো দুধ কিনে দেই ওকে। জ্বর নিয়ে রাতে ভাত খাওয়া ঠিক হবেনা। আমি তাকে নিজে তার বাড়িতে পৌছে দিয়ে এসেছি পাউরুটি এবং দুধ সমেত। তার চাচী আর ভাইকে বলে এসেছি সকালে এসে আমি ওকে নিয়ে যাবো। যখন ফিরার সময় বললাম, "কিছু বলবে বাবা!!" সে কিছূই বলেনি। তার চোখদুটো ছলছল করছিলো। আর ক্রমশ সে সংকোচিত হয়ে যাচ্ছিল।
আমি আসিফ আর আরিফের মত বদমায়েশের (!!) সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছি!! বদমায়েশগুলোর অভ্যাস খারাপ করে দিচ্ছি!! তাদের আদর দিয়ে মাথায় উঠবার জন্য প্ররোচিত করছি। এটা অবশ্যই অপরাধ। কিন্তু ক্ষমা চাইবো কার কাছে!!
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


