১.
রহিম ভালো ছেলে। ছেলেবেলায় আদর্শলিপিতে পড়া ভালো ছেলের অবিকল কপি-কাট-পেস্ট সংস্করন। সে প্রত্যহ বিদ্যালয়ে যায়। কাহারো সহিত ঝগড়া করেনা। নিয়মিত অধ্যয়ন করে। সকল শিক্ষক তাহাকে ভালোবাসেন। সে বাংলা ছবির নায়কের ন্যায় প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে। মাথায় সরিষা তৈল মাখিয়া মেধাকে স্থির রাখে।
রহিম এসএসসি পরীক্ষায় উত্তমরুপে পাশ করিয়াছে। এইচএসসি পরীক্ষাতেও তাহার ফলাফল ঈর্ষণীয়। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় সফল হইয়াছে। তাহার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহন করিবার জন্য সে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করিয়াছে। সংগে রহিয়াছে মায়ের দেয়া একটা তাবিজ আর তাহার ছেলেবেলার বন্ধু করিম।
২.
করিম রহিমের বন্ধু। করিমকে ভালো ছেলে বলিলে রহিমকে উপহাস করা হয়। সনাতন আদর্শলিপির সহিত প্রতারনা করা হয়। করিম পড়ালেখায় মধ্যম মানের। কিন্তু তাহার ফলাফল বরাবরই ভালো হইয়া যায়। কিভাবে এত ভালো ফলাফল হয় তাহা শিক্ষকদের অপার কৌতূহলের বিষয়। করিমের নিকটও তাহা অবোধ্য।
করিমের প্রিয় পাঠ্য হইল প্রেম। এলাকায় কাহার সহিত কে প্রেম করিতেছে, কাহার প্রেমে কে পড়িতে যাইতেছে, কাহার সহিত কাহার প্রেম টিকিবে না, কাহার সহিত কাহার প্রেম করা উচিত তাহা সে চোখ বন্ধ করিয়া বলিয়া দিতে পারে। ইতোমধ্যে সে অসংখ্যবার প্রেমে পড়িয়াছে। অসংখ্যবার তাহার প্রেমের সম্পর্ক ভাঙিয়াছে। বিরহের প্রথম দুই তিন দিন বিষন্ন হৃদয়ে বাঁচিয়া থাকাকে তাহার অর্থহীন মনে হইয়াছে । তাহারপর একসময় সে আবার নব উদ্যমে নব নব প্রেমে জড়াইয়া পড়িয়াছে।
করিম উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় রহিমের মত ভালো ফলাফল করিতে পারে নাই। তবে তাহার ফলাফলকে খারাপও বলা যাইবেনা। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ভাগ্যের কৃপায় উত্তীর্ণ হইয়াছে। প্যাকেজ নাটকে দেখা প্রেমপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহন করিবার জন্য সে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করিয়াছে। সংগে রহিয়াছে রহিম, পাশের বাড়ির সেলিনার দেয়া একখানা রঙিন শার্ট আর পাড়ার মসজিদের ইমাম সাহেবের মেয়ে কুলসুমের দেয়া একখানা সাদা রুমাল। সাদা রুমালটিতে লাল সুতা দিয়া কুলসুম পরম যতনে লিখিয়াছে "ভুলোনা আমায়"।
করিমের মনে গভীর উত্তেজনা। তাহার মন প্যাকেজ নাটকের খন্ড খন্ড চিত্রের দোলায় দোলায়িত হইতেছে। সে অস্ফুটে স্বরে উচ্চারন করিল 'প্রিয় কুলসুম, তোমাকে ভুলিবোনা তাহা প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিতে পারিতেছি না।'
৩.
রহিম এবং করিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশ করিতে শুরু করিয়াছে। রহিম ভালো ছেলে। ভালো ছেলেরা কিছুটা লাজুক হইবে এবং তাহাদের প্রবল সংকোচ থাকিবে ইহাই নিয়ম। রহিম নিয়মের বাহিরে নহে। আর অ-ভালো ছেলেরা লাজুক হইবেনা। সহজেই সখ্যতা স্থাপন করিবে। দুইদিনের পরিচয়ে ইয়ার দোস্তের মত আচরন করিবে। ইহাও নিয়ম বটে এবং করিম নিয়মের বাহিরে নহে।
ইট কাঠ পাথরের এই ঢাকা শহরের বিশাল বিদ্যায়তনের লাজুক রহিম অনেকাংশে করিমের প্রতি নির্ভরশীল। প্রচন্ড নির্ভরশীল।
৪.
জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলিয়া থাকেন সাবধানের মার নাই। আর যুক্তি বলে মারেরও সাবধান নাই। ঘটনা বা দূর্ঘটনা যাহা ঘটিবার তাহা ঘটিবেই। সাবধান থাকিলে নিজেকে প্রবোধ দেয়া যায় যে আমি নির্দোষ ছিলাম। রহিমের মত ভালো ছেলে একটি ঘটনা ঘটাইয়া ফেলিল। ঘটনা না বলিয়া দূর্ঘটনা বলাই ভালো হইবে।
রহিম তাহার ক্লাশের একটি মেয়ের প্রেমে পড়িয়াছে। মেয়েটিকে নোটিশ না দিয়াই সে একতরফা ভাবে প্রেমে পড়িয়াছে। মেয়েটি ক্লাশের সকলের সহিত বন্ধুর মত আচরন করিয়া থাকে। কিন্তু রহিমের সংকোচ তাহাকে ঐ মেয়ের সহিত সহজভাবে মিশিতে বাঁধা দিয়াছে। ক্লাশের ফাঁকে ফাঁকে সে যখন উদাস নয়নে বাহিরে তাকাইয়া থাকে তখন করিম এবং ঐ মেয়েটি এবং আরো কয়েকজন আড্ডায় মাতিয়া থাকে। চা খায়, সিঙারা খায়, ঝালমুড়ি খায়। রহিমের ইচ্ছা করে। কিন্তু সে সহজ হইয়া তাহাদের সহিত মিশিতে পারে না। এই ব্যর্থতা শুধু রহিমের নহে, এই ব্যর্থতা আদর্শ লিপি মার্কা সকল ভালো ছেলেদের। হায় আদর্শলিপি, হায় ভালো ছেলে, হায় মনের আকুতি!!
করিম চতুর ছেলে। এই শহরে আসিয়া সে আরও চতুর হইয়াছে। রহিমের যে একটা কিছু হইয়াছে তাহা সে অনুমান করিতে পারে। কিন্তু তাহা জানিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেনা। কারণ সে জানিয়াছে এই শহরে নিজে বাঁচিলে বাপের নাম সার্থকতা পায়। অযথা সাধিয়া সাধিয়া উপকার করিবার কোন অর্থ হয়না।
৫.
রহিমের আবেগের বেড়ী বাঁধ ভাঙিতে শুরু করিয়াছে। তাহার ভালো ফলাফল চাই। পড়ালেখা শেষে একখানা ভালো চাকুরী চাই। আর সর্বাগ্রে চাই ঐ মেয়ের সহিত প্রেমপূর্ণ সম্পর্ক। জীবনকে দিনে দিনে অর্থহীন করিবার কোন সুযুক্তি রহিম খুঁজিয়া পাইলো না। সে করিমের দারস্থ হইলো।
করিম অভিজ্ঞ ব্যক্তি। গ্রামে থাকিতে সে প্রেমের কত যে সম্পর্কের সূচনা করিয়া দিয়াছে, কত সর্ম্পক ভাঙিয়া দিয়াছে, কতজনকে নতুন সম্পর্কে জড়াইতে সাহায্য করিয়াছে তাহা দুই হাতের বিশ আঙুলে গুনিয়া শেষ করা যাইবেনা। রহিম ভালো ছেলে। সে যোগ্য গুরু নির্বাচন করিয়াছে। এইবার যদি মুশকিল আসান হয়।
করিম মেয়েটিকে রাজী করাইয়া ছাড়িবে বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিল। কিন্তু মেয়েটিকে রাজী করাইবার জন্য , তাহার সহিত গভীর সখ্যতা করিবার জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে। ইহা করিম কিরুপে সংস্থান করিবে!!
করিমের প্রতিজ্ঞায় রহিম নিশ্চিন্ত হইল। তাহার জন্য গ্রামের বাড়ী হইতে টাকা আসে। ইহা ছাড়া সে একটি টিউশনী করে। সে নতুন আরো দুইটি টিউশনী করিবে। সুতরাং খরচের বিষয়ে করিমকে চিন্তামুক্ত হইতে বলিয়া সে নির্ভার হয়। করিমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা সে খুজিয়া পায় না।
৬.
করিম দায়িত্বপরায়ন ব্যক্তি। এক সপ্তাহের মধ্যেই দেখা গেল মেয়েটিকে লইয়া করিম একা ক্যাম্পাসে বসিয়া আলোচনায় মগ্ন হইতেছে। রিকশায় করিয়া নিউ মার্কেটে যাইতেছে। টিএসসিতে বসিয়া বাদাম খাইতেছে। দিন শেষে রহিমকে আন্তরিকভাবে বলিতেছে মেয়েটির কঠিন হৃদয়। তবুও করিম বরফ গলাইবার জন্য আপ্রাণ চেস্টা করিয়া যাইতেছে। রহিমকে কিছুদিন ধৈর্য্য ধরিয়া অপক্ষা করিতে হইবে। রহিম আনন্দিত হয়। করিমের পকেটে তাহার টিউশনীর টাকা গুঁজিয়া দিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
করিমের কাজের ফলাফল রহিম পাইতে শুরু করিয়াছে। আজকাল রহিমের চোখে চোখ পড়িলে মেয়েটি লাজুকভাবে হাসিয়া চোখ সরাইয়া লয়। রহিমের হৃদয় আনন্দে ভরিয়া উঠে। করিমের প্রতি তাহার আস্থা বাড়িয়া যায়। করিমের পরামর্শ অনুযায়ী সে ধৈর্য্য ধারন করে। কারণ গুরুবাক্য অমান্য করিতে নাই।
৭.
রহিমের অপেক্ষার পালা শেষ হইতে চাহিতেছে না। আবার গুরুবাক্য অমান্য করিবার সাহস তাহার নাই। তাই করিম যখন মেয়েটিকে রাজী করাইবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করিতেছে তখন রহিম একা একা বসিয়া এই শহরের মানুষদের কর্মকান্ড বিশ্লেষণ করিয়া সময় পার করিতেছে।
রহিমের অপেক্ষার অবসর। এই অবসর ক্রমেই তাহার অসহ্য হইয়া উঠিতে লাগিলো। মেয়েটিকে রাজী করাইবার জন্য রহিম যে আর্থিক সহায়তা প্রদান করিতেছে করিম তাহাকে বলে বাদাম সাপ্লাই-এর পয়সা। রহিম বাদাম সাপ্লাই-এর ব্যবসার প্রতি আগ্রহী হইয়া পড়িল। অল্প পূঁজি দিয়া বাদাম ব্যবসার সূচনা করিল।
অর্থের একটা ধর্ম আছে। সে যখন হাতছানি দেয় তখন পৃথিবীর আর কিছুই মূল্যবান বলিয়া মনে হয়না। রহিমকে অর্থ হাতছানি দিয়াছে। সে বাদাম সাপ্লাইয়ের প্রতি শতভাগ আগ্রহী হইয়া পড়িল। এক বাদাম সরবরাহকারীর সহিত তাহার পরিচয়ও হইয়া গেল। নিয়তির খেয়াল কে বুঝিতে পারে!
করিম মেয়েটিকে রাজী করাইবার কাজে ব্যস্ত। রহিম তাহার বাদাম সরবরাহের ব্যবসায় ব্যস্ত। তাহার ব্যবসা গতিপ্রাপ্ত হইতেছে। পড়ালেখা, ব্যবসার কাজ শেষে হঠাৎ করিয়া মেয়েটির কথা মনে পড়ে। তাহার মন আকুল হইয়া উঠে। করিমকে বাদাম সাপ্লাইয়ের পয়সা দিয়া মনকে শান্ত করে।
৮.
কখনও কখনও সুসংবাদ এবং দু:সংবাদ দুইটি একত্রে আসে। রহিমের ক্ষেত্রে তাহাই ঘটিয়াছে। সে দুইটি কর্পোরেট খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে বাদাম সাপ্লাই-এর জন্য মনোনীত হইয়াছে। পুলকিত হইবার মত সংবাদ। সে পুলকিত হইয়াছে। কিন্তু এই পুলক বেশীক্ষন স্থায়ী হয় নাই। কারন করিম। করিম তাহাকে জানাইয়াছে মেয়েটি প্রেমের সম্পর্ক স্থাপনের জন্য একশত ভাগ রাজী হইয়াছে। তবে তাহা রহিমের সহিত নহে, করিমের সহিত।
রহিম তাহার কষ্ট প্রকাশ করে নাই। মুখে মৃদু হাসি আনিয়া বলিয়াছে মেয়েটিকে সে ভালোবাসে। তাই তাহার ইচ্ছাকে সে সম্মান করে। তবে করিম স্পষ্ট দেখিতে পাইলো রহিমের চোখ ভিজিয়া উঠিয়াছে।
৯.
ইতিমধ্যে দশ বছর অতিক্রান্ত হইয়াছে। সকলের দশ বছর করিয়া বয়স বাড়িয়াছে। আর চারপাশের অনেক কিছুই সময়ের নিয়মে বদলাইয়া গিয়াছে।
রহিম আজ প্রতিষ্টিত ব্যবসায়ী। ঢাকার অভিজাত অফিস পাড়ায় তাহার সুসজ্জিত অফিস। সে দুইটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে বাদাম সরবারহ করে। মধ্যপ্রাচ্যেও সে বাদাম রফতানী করে। সে বিবাহ করিয়াছে। সুখী পরিবার। তবুও কোন কোন দিন হঠাৎ মেয়েটির কথা তাহার মনে পড়ে। অজানা বিষাদে মন ভরিয়া যায়।
করিম বিবাহ করে নাই। সে রহিমের অফিসে একটি চাকুরী পাইয়াছে। তাহার অনুমান রহিম তাহাকে করুণা করিয়া চাকুরী দিয়াছে। অফিস শেষে সে তাহার বাড়িতে ফিরিয়া আসে। ঘরে তাহার জন্য অপক্ষা করিবার কেহ নাই। কোন কোন নিদ্রাহীন রাতে এই জীবন যাপন তাহার অসহ্য লাগে। ঐ মেয়েটির কথা তাহার মনে পড়ে। মন কেমন করিয়া উঠে।
গরুর বাজারে অস্ট্রেলিয়ান গরুর বিশেষ কদর রহিয়াছে। আর বিবাহের পাত্রের বাজারে অস্ট্রেলিয়ায় এমবিএ করা পাত্রের বিকল্প নাই। মেয়েটি বাস্তববাদী। তাই সে করিমকে প্রত্যাখান করিয়া অভিবাবকদের পছন্দ করা এক অস্ট্রেলিয়ান এমবিএ- এর সহিত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছে। সে বেশ ভালো আছে। সুখে আছে।
কমন নাউন মামার ইলেকশন ডিজিজ (একটি করুণ রম্য গল্প)[/sb
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

