বিশ্বব্যাপী নারীবাদ, নারী অধিকার আন্দোলন, মৌলিক মানবাধিকার অর্জন ও রায় এবং সর্বোপরি সমাজ পরিবর্তনে যারা প্রয়াসী তাদের জন্য এই কনভেনশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচি। কারণ এই কনভেনশনের কর্মসূচি ও অন্তর্নিêহিত সাংগঠনিক প্রক্রিয়া একে বিশেষ ও কার্যকর একটি জীবন্ত কর্মসূচিতে পরিণত করেছে।
জাতিসংঘের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অনুযায়ী এটি একটি মানবাধিকার চুক্তি। জাতিসংঘ কতৃêক গৃহীত ৬০টির অধিক সনদ বা চুক্তির মধ্যে মাত্র ৭টি সনদকে মানবাধিকার চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এর মধ্যে সিডও সনদ একটি। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত ও স্বীকৃত এই ৭টি সনদ হলোঃ ১· বর্ণবাদবিরোধী সনদ, ২· নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার, ৩· অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্ড়্গৃতিক অধিকার সনদ, ৪· নির্যাতন প্রতিরোধ সনদ, ৫· নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসন সনদ বা CEDAW সনদ, ৬· শিশু অধিকার সনদ, ৭· অভিবাসী শ্রমিক সনদ। সিডও কনভেনশনের মোট ৩৪টি ধারা আছে। এর মধ্যে ১ থেকে ১৬ ধারা পর্যন্ত নারী-পুরুষের সমতা সৃষ্টি তথা নারীর প্রতি বিরাজমান বৈষম্য দূর করা সংক্রান্ত। ১৭ থেকে ২২ ধারা পর্যন্ত সিডও কমিটির কর্ম পদ্ধতি সংক্রান্ত। ২৩ থেকে ৩০ ধারা পর্যন্ত সিডও কমিটির তথ্য প্রকাশন সংক্রান্ত। নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার লøে যেসব পদËেপর কথা উল্লেখ করেছে তা পর্যালোচনায় দেখা যায় মূলত তিনটি পরিপ্রেতি থেকে বিরাজমান বৈষম্য দূরীকরণের পথ নির্দেশ করে। ১· নারীর নাগরিক গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার ও আইনি সমতা নিশ্চিতকরণ, যার মাধ্যমে নারী রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে পুরুষের সমপর্যায়ে সব সুবিধা ভোগ করার ব্যাপারে। ২· নারীর প্রজনন ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও সামাজিক ভূমিকা হিসেবে গণ্য করা, যাতে প্রজননের তথা মাতৃত্বের দায়িত্ব পালনের কারণে নারীকে কোণঠাসা না করা এবং এËেত্র নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া। ৩· যে কোনো দেশের আচার প্রথা, সংস্ড়্গার ও বিধি যা নারীর জেন্ডার ভূমিকা নির্ধারণ করে তা বাতিল করা, যাতে নারী যে কোনো রাষ্ট্রীয় অধিকার ও সমাজে শুধু একজন মানুষ হিসেবে নারীকে গণ্য করে, নারী-পুরুষের মাঝে বিরাজমান বৈষম্য দূর করে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
বাংলাদেশে ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর তৎকালীন এরশাদ সরকার তিনটি মূল ধারা যথাক্রমে ধারা ২, ১৩ ক ও ১৬ ধারা রিজার্ভেশন রেখে অনুমোদন দান করে। এরপর ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৭ পর্যন্ত বিগত ২৩ বছরের ৬টি সাময়িক প্রতিবেদন জাতিসংঘ সিডও কমিটির কাছে পেশ করেছে। ৫ম প্রতিবেদনটি ২০০৪ সালের জুন-জুলাই সিডও কমিটির সেশনে বিস্তারিত আলোচিত হয় এবং আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে বাংলাদেশ সরকারকে বাংলাদেশে নারীর মতায়নে ও নারী-পুরুষের মাঝে সমতা আনয়নের লøে ৪৯টি Concluding comments সমাপনী মন্তব্য এই শিরোনামে ভবিষ্যৎ কাজের জন্য বিশেষ পরামর্শ ও সুপারিশ করেছে। ওই সুপারিশগুলোর ভিত্তিতেই আগামী ২০০৯ সালের ৬ষ্ঠ সাময়িক প্রতিবেদন বাংলাদেশ সরকারকে পেশ করতে হবে। ৪৯টি সুপারিশের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ রয়েছে যা এখনই বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন রয়েছে। যেমন- বর্তমানে বিদ্যমান নাগরিক আইন যা নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্যমূলক। বাংলাদেশ সরকারের অবিলম্বে সিডও সনদের ধারা-২ অবশ্যই অনুমোদন দান প্রয়োজন। ধারা-২ হলো সিডও সনদের প্রাণ। এটাই একটি মৌলিক ধারা যা এ কনভেনশনের মৌল দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচিকে তুলে ধরছে। এই ধারা বাংলাদেশের সংবিধানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নীতি সংবলিত ধারার সঙ্গে একান্তই সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন- সংবিধানের ধারা ১৯(১)(২)(২৬)-এর (২) ও ২৭ নং ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। অথচ সিডও সনদের ধারা-২ এখনো বাংলাদেশ সরকার অনুমোদন দেয়নি। অথচ নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসন সনদ বা CEDAW সনদের ধারা-২ অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসমূহ, শ্রমজীবি নারী মৈত্রী, নারী মুক্তি সংসদ, মহিলা পরিষদ, অন্যান্য নারী সংগঠনসহ নারী আন্দোলন ও সিডও কমিটি ধারাবাহিকভাবে বিশেষ দাবি জানিয়ে আসছে। এই ধারায় সম্মতি না দেওয়ার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারার সঙ্গে সরকারের বিরোধপূর্ণ অবস্থান, যা খুবই দুঃখজনক। বাংলাদেশ সরকার সিডও কমিটির প্রতি সভায় বাংলাদেশ প্রতিবেদন পর্যালোচনার সময় সিডও কমিটি কতৃêক সমালোচিত হয় এবং যা বাংলাদেশের বাম প্রগতিশীলরাও সঠিক মনে করে না। এ ব্যাপারে সমাপনী মন্তব্যেও এ বিষয়ে কড়া সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসমূহের প েআমি দ্রুত এই ধারার অনুমোদন দেওয়ার জন্য বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ৮:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


