somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সিডও সনদের ধারা-২ অনুমোদন প্রসঙ্গে

২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ৯:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাজনীতি ও মতাদর্শের প্রশ্নে বিতর্কিত হলেও ঠুটো জগন্নাথ হিসেবে খ্যাত জাতিসংঘ নারীর মর্যাদা বিষয়ক কমিশন সত্তরের দশকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপ্লবিক কাজ করে। একটি হলো, নারী দশকের বিস্তারিত কার্যসূচি গ্রহণ করা। আরেকটি হলো, নারীর প্রতি বিরাজমান সব ধরনের বৈষম্য বিলোপের জন্য একটি কনভেনশনের খসড়া প্রণয়ন করা। যদিও ১৯৭২ সালেই একটি Anti-Discrimination Convention গ্রহণ করার জন্য নীতিগতভাবে জাতিসংঘ একমত হয়েছিল বলে জানা যায়। তথাপি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা, মত বিনিময় ও জাতিসংঘ প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতার দীর্ঘ পর্যায় অতিক্রম করে ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সিডও কনভেনশন গৃহীত হয় এবং ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সিডও কনভেনশনের কার্যকারিতার মতা অর্জন করে। বর্তমানে জাতিসংঘের ১৮৫টি সদস্য রাষ্ট্র সিডও কনভেনশন অনুমোদন দিয়েছে। সিডও কনভেনশনের একটি বিস্তৃত পটভূমি যে রয়েছে তাতে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৮১ এই দীর্ঘ নয় বছরে অনেক আলোচনা মতামত নানা বিতর্ক ও নানা প্রক্রিয়া ও পর্যায় পার হয়ে তা কনভেনশনে পরিণত হয়ে একটি আন্তর্জাতিক সনদ হিসেবে সমগ্র বিশ্বের জনগণের সামনে উঠে আসে। আজ এই সনদ বিশ্বব্যাপী নারীর মানবাধিকারের বিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী নারীবাদ, নারী অধিকার আন্দোলন, মৌলিক মানবাধিকার অর্জন ও রায় এবং সর্বোপরি সমাজ পরিবর্তনে যারা প্রয়াসী তাদের জন্য এই কনভেনশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচি। কারণ এই কনভেনশনের কর্মসূচি ও অন্তর্নিêহিত সাংগঠনিক প্রক্রিয়া একে বিশেষ ও কার্যকর একটি জীবন্ত কর্মসূচিতে পরিণত করেছে।
জাতিসংঘের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অনুযায়ী এটি একটি মানবাধিকার চুক্তি। জাতিসংঘ কতৃêক গৃহীত ৬০টির অধিক সনদ বা চুক্তির মধ্যে মাত্র ৭টি সনদকে মানবাধিকার চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এর মধ্যে সিডও সনদ একটি। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত ও স্বীকৃত এই ৭টি সনদ হলোঃ ১· বর্ণবাদবিরোধী সনদ, ২· নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার, ৩· অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্ড়্গৃতিক অধিকার সনদ, ৪· নির্যাতন প্রতিরোধ সনদ, ৫· নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসন সনদ বা CEDAW সনদ, ৬· শিশু অধিকার সনদ, ৭· অভিবাসী শ্রমিক সনদ। সিডও কনভেনশনের মোট ৩৪টি ধারা আছে। এর মধ্যে ১ থেকে ১৬ ধারা পর্যন্ত নারী-পুরুষের সমতা সৃষ্টি তথা নারীর প্রতি বিরাজমান বৈষম্য দূর করা সংক্রান্ত। ১৭ থেকে ২২ ধারা পর্যন্ত সিডও কমিটির কর্ম পদ্ধতি সংক্রান্ত। ২৩ থেকে ৩০ ধারা পর্যন্ত সিডও কমিটির তথ্য প্রকাশন সংক্রান্ত। নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার লøে যেসব পদËেপর কথা উল্লেখ করেছে তা পর্যালোচনায় দেখা যায় মূলত তিনটি পরিপ্রেতি থেকে বিরাজমান বৈষম্য দূরীকরণের পথ নির্দেশ করে। ১· নারীর নাগরিক গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার ও আইনি সমতা নিশ্চিতকরণ, যার মাধ্যমে নারী রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে পুরুষের সমপর্যায়ে সব সুবিধা ভোগ করার ব্যাপারে। ২· নারীর প্রজনন ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও সামাজিক ভূমিকা হিসেবে গণ্য করা, যাতে প্রজননের তথা মাতৃত্বের দায়িত্ব পালনের কারণে নারীকে কোণঠাসা না করা এবং এËেত্র নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া। ৩· যে কোনো দেশের আচার প্রথা, সংস্ড়্গার ও বিধি যা নারীর জেন্ডার ভূমিকা নির্ধারণ করে তা বাতিল করা, যাতে নারী যে কোনো রাষ্ট্রীয় অধিকার ও সমাজে শুধু একজন মানুষ হিসেবে নারীকে গণ্য করে, নারী-পুরুষের মাঝে বিরাজমান বৈষম্য দূর করে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
বাংলাদেশে ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর তৎকালীন এরশাদ সরকার তিনটি মূল ধারা যথাক্রমে ধারা ২, ১৩ ক ও ১৬ ধারা রিজার্ভেশন রেখে অনুমোদন দান করে। এরপর ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৭ পর্যন্ত বিগত ২৩ বছরের ৬টি সাময়িক প্রতিবেদন জাতিসংঘ সিডও কমিটির কাছে পেশ করেছে। ৫ম প্রতিবেদনটি ২০০৪ সালের জুন-জুলাই সিডও কমিটির সেশনে বিস্তারিত আলোচিত হয় এবং আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে বাংলাদেশ সরকারকে বাংলাদেশে নারীর মতায়নে ও নারী-পুরুষের মাঝে সমতা আনয়নের লøে ৪৯টি Concluding comments সমাপনী মন্তব্য এই শিরোনামে ভবিষ্যৎ কাজের জন্য বিশেষ পরামর্শ ও সুপারিশ করেছে। ওই সুপারিশগুলোর ভিত্তিতেই আগামী ২০০৯ সালের ৬ষ্ঠ সাময়িক প্রতিবেদন বাংলাদেশ সরকারকে পেশ করতে হবে। ৪৯টি সুপারিশের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ রয়েছে যা এখনই বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন রয়েছে। যেমন- বর্তমানে বিদ্যমান নাগরিক আইন যা নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্যমূলক। বাংলাদেশ সরকারের অবিলম্বে সিডও সনদের ধারা-২ অবশ্যই অনুমোদন দান প্রয়োজন। ধারা-২ হলো সিডও সনদের প্রাণ। এটাই একটি মৌলিক ধারা যা এ কনভেনশনের মৌল দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচিকে তুলে ধরছে। এই ধারা বাংলাদেশের সংবিধানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নীতি সংবলিত ধারার সঙ্গে একান্তই সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন- সংবিধানের ধারা ১৯(১)(২)(২৬)-এর (২) ও ২৭ নং ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। অথচ সিডও সনদের ধারা-২ এখনো বাংলাদেশ সরকার অনুমোদন দেয়নি। অথচ নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসন সনদ বা CEDAW সনদের ধারা-২ অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসমূহ, শ্রমজীবি নারী মৈত্রী, নারী মুক্তি সংসদ, মহিলা পরিষদ, অন্যান্য নারী সংগঠনসহ নারী আন্দোলন ও সিডও কমিটি ধারাবাহিকভাবে বিশেষ দাবি জানিয়ে আসছে। এই ধারায় সম্মতি না দেওয়ার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারার সঙ্গে সরকারের বিরোধপূর্ণ অবস্থান, যা খুবই দুঃখজনক। বাংলাদেশ সরকার সিডও কমিটির প্রতি সভায় বাংলাদেশ প্রতিবেদন পর্যালোচনার সময় সিডও কমিটি কতৃêক সমালোচিত হয় এবং যা বাংলাদেশের বাম প্রগতিশীলরাও সঠিক মনে করে না। এ ব্যাপারে সমাপনী মন্তব্যেও এ বিষয়ে কড়া সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসমূহের প েআমি দ্রুত এই ধারার অনুমোদন দেওয়ার জন্য বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ৮:০৩
৪টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×