somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লাউয়াছড়া বন, শেভরন ও জরিপ

০৩ রা মে, ২০০৮ রাত ৮:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লাউয়াছড়া বন, মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন

পরিবেশ-প্রতিবেশ বিনাশী থ্রিডি সিসমিক জরিপ
-সৈয়দ আমিরুজ্জামান

বাংলাদেশ এখন প্রকৃত অর্থেই সাম্রাজ্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর এক অবাধ ও একচেটিয়া লুণ্ঠন, স্বেচ্ছাচারিতা আর যথেচ্ছাচারের দেশে পরিণত হয়েছে। এই অবাধ ও একচেটিয়া লুণ্ঠন, স্বেচ্ছাচারিতা আর যথেচ্ছাচার যারা করছে তাদের সঙ্গে দেশের উন্নয়ন ও স্বার্থের এবং জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ এই লুণ্ঠন, স্বেচ্ছাচারিতা আর যথেচ্ছাচারের ফলে দেশ ও জনগণের ক্ষতি, এমনকি মারাত্মক ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হচ্ছে না।
কত শত ক্ষেত্রে যে এই তি হচ্ছে তার তালিকা ও বিবরণ দেওয়া আমার এই ছোট্ট নিবন্ধে সম্ভব নয়। দেশের সরকার হাত-পা ছেড়ে দিয়ে এমন অবস্থায় রয়েছে যাতে দেশীয় দালাল গণশত্রু ও সাম্রাজ্যবাদীদের বিভিন্ন কোম্পানি বা কর্পোরেশন ও সংস্থা এবং এজেন্সির এখন বাংলাদেশে যে কোনো ক্ষেত্রে নির্ভয়ে লুণ্ঠন, স্বেচ্ছাচারিতা আর যথেচ্ছাচার অব্যহত রাখার মতো পরিস্থিতি আরও একচেটিয়া ও নিরঙ্কুশ হয়েছে। জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এসব সাম্রাজ্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানি বা কর্পোরেশন ও এজেন্সির বেপরোয়া লুণ্ঠন, স্বেচ্ছাচারিতা আর যথেচ্ছাচারে বাধা দেওয়ার শক্তি কি সরকারের নেই? সরকার কী এ গুলি দেখে না? দেশ ও জনগণের ক্ষতি, উন্নয়নের জন্য আত্মঘাতি প্রকল্প, পরিবেশ-প্রতিবেশ-বনের জন্য মারাত্মক ক্ষতি আর লাভ-ক্ষতির হিসাবটা সরকার কী বুঝে না? আরও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এদের বেপরোয়া লুণ্ঠন, স্বেচ্ছাচারিতা আর যথেচ্ছাচারে বাধা দেওয়ার ইচ্ছাও সরকারের আছে কিনা? আমার কেন জানি মনে হয় যে, সরকারের সেই ইচ্ছা নেই। সরকারের ইচ্ছা যে নেই এটা বোঝা যায়। সরকারের ইচ্ছাই যদি থাকতো, তাহলে এ ক্ষেত্রে জনগণের প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ শক্তি কাজে লাগাতে পারতো। তা ব্যবহারের ব্যাপারে সরকারের ঘোরতর আপত্তি ও বিরোধিতাই লক্ষ্য করা যায়। সরকার জরুরি আইনের শৃঙ্খলে জনগণের হাত-পা বেঁধে রেখে তাদের প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের শক্তিকে অকেজো করে রেখেছে।
এইসব লেখার প্রয়োজন হলো এইজন্য যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী তেল-গ্যাস বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন কর্তৃক মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল এলাকার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ভূতাত্ত্বিক জরিপ কাজ চালানোর ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে। গত ২৫ এপ্রিল থেকে পরদিন ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত এ দুই দিন তারা এই জরিপ কাজ চালানোর সময় বেপরোয়াভাবে অনেক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশ। সেখানকার খাসিয়াপুঞ্জির একটি টিলায় গাছপালাতে আগুন লেগে অনেক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। দুই শতাধিক পানগাছ পুড়ে ছাই হয়ে গরিব খাসিয়াদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, এভাবে খাসিয়াপুঞ্জিতে আগুন লাগলেও শেভরনের কোনো লোক এই আগুন নেভাতে আসেনি। কিন্তু বনকর্মীসহ স্থানীয় জনগণই নিজেদের কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত আগুন নেভাতে সক্ষম হয়েছেন।
অগ্নিকান্ডের খবর পেয়ে গণমাধ্যমের কয়েকজন রিপোর্টার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ওই এলাকায় শেভরন কোম্পানি সিসমিক জরিপের কাজ করছিল। তাদের এই জরিপের বিরুদ্ধে আগে অনেক প্রতীকি মানব বন্ধন প্রতিবাদ ও লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু সরকার জনগণের সেসব প্রতিবাদকে আমলে নেয় নি। জনগণের প্রতিবাদকে পাত্তা না দিয়ে এই সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানি শেভরনকে ওই সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যানে তাদের জরিপ কাজ চালানোর ছাড়পত্র দেয়। সেই ছাড়পত্রের অনুমতির জোরে তারা ভারি ভারি যন্ত্রপাতি ও সে সঙ্গে বিস্ফোরক দ্রব্য সংরক্ষিত এলাকাতে নিয়ে গিয়ে জরিপের কাজ শুরু করেছে। শেভরন কর্তৃক ত্রিমাত্রিক অনুসন্ধান অভিযানের ফলে 'ডিনামাইট' বিস্ফোরণের ধাক্কায় যে ভূকম্পন সৃষ্টি হয়, তাতে শত শত কাঁচা-পাকা ঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে। তাছাড়া এই বিস্ফোরণের বিকট শব্দ ও ভূকম্পনের ফলে লাউয়াছড়াবনের বিভিন্ন অংশ থেকে লজ্জাবতী বানর, মায়া হরিণসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী পার্শ্ববর্তী গ্রাম এলাকায় বের হয়ে গেছে। বন-পরিবেশ ও প্রাণীকুলের আশ্রয়স্থল ধ্বংসের আশঙ্কা করে জরিপ বন্ধের দাবি জানিয়েছিলাম। তবুও সংরক্ষিত বনে শেভরন তেল কোম্পানি ইআইএ (পরিবেশগত তিকর প্রভাব নিরূপণ) প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ না করেই ত্রিমাত্রিক অনুসন্ধান পরিচালনা করেছে।
ত্রিমাত্রিক জরিপের ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে আশঙ্কা করে এ জরিপের বিরোধিতা "মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের তিপূরণ আদায় কমিটি'সহ বিভিন্ন মহল থেকে করা হয়েছিল। কিন্তু একদিকে সরকারের অমতাজনিত ঔদাসীন্য এবং অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানিটির দোর্দন্ড প্রতাপের কারণে তারা ইচ্ছামতো নিজেদের জরিপ কাজ একটি লাল তালিকাভুক্ত ঘোষিত সংরক্ষিত বনভূমিতে চালিয়ে যেতে অসুবিধে বোধ করেনি।
মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট সরকারের হোমরা-চোমরা কর্তাব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির সঙ্গে এই কোম্পানির সম্পর্ক সকলেরই জানা আছে। তিনি এর আগে কোম্পানিটির বড়কর্তা ছিলেন। সে সময়েই এই কোম্পানির বাংলাদেশে ঢোকার ব্যবস্থা হয়। পরে ইউনোকলের স্বত্ত্ব কিনে নিয়ে এরা বাংলাদেশে নিজেদের কারবার শুরু করে। এ কোম্পানির উচ্চমহলের চাপে ১৯৭৪ সালে প্রণীত বন্যপ্রাণী সংরক্ষন (সংশোধিত) আইনের ২৩/৩ ধারা লঙ্ঘন করে লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে শেভরনকে জরিপ কাজ চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে তেল গ্যাস কোম্পানির অনুসন্ধানের অনুমতি ১৯৯৯ সালের জাতীয় পানিনীতি, ২০০০ সালের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি, ১৯৯২ সালের জাতীয় পর্যটন নীতিমালা, ১৯৯৭ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৫ সালের বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ (সংশোধিত) অধ্যাদেশ, ১৯২৭ সালের বন আইন, ১৯৭৭ সালের পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ এবং ১৯৯২ সালের (সিবিডি) জাতিসংঘ প্রণীত আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কিন্তু দেশের এতগুলো আইন ও নীতিমালা লঙ্ঘন ও ভঙ্গ করে একটি বিদেশি কোম্পানির স্বার্থে এই বিরল সম্পত্তিতে জরিপ অনুসন্ধানের অনুমোদন দিয়েছে তা জনগণকে বিস্মিত করেছে। রাষ্টের এতগুলো আইন ও নীতিমালা ভঙ্গের বিষয়টি খারাপ উদাহরণ হিসেবে বিশ্বে আলোচিত হবে। বন-পরিবেশ-প্রতিবেশ ও প্রাণীকুল আমাদের বায়ুমন্ডলের ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। বায়ুমন্ডলের ভারসাম্য রক্ষায় যেখানে ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল প্রয়োজন, সেখানে আমাদের শতকরা ৭% ভাগও নেই। এ অবস্থায় যেখানে বনাঞ্চল সম্প্রসারণ ও রক্ষা করা জরুরী, সেখানে এই মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে বিদেশিদের স্বার্থে তেল উত্তোলন কোনো অবস্থাতেই সমর্থনযোগ্য নয়।
এ ছাড়া অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সরকারের সঙ্গে নতুন 'উৎপাদন অংশীদারী চুক্তি-পিএসসি' সম্পাদন করা জরুরী হয়ে পড়েছে। কারণ বর্তমান 'উৎপাদন অংশীদারী চুক্তি-পিএসসি' অনুযায়ী বাংলাদেশ পাচ্ছে মাত্র ২০ ভাগ আর বিদেশী বহুজাতিক তেল গ্যাস কোম্পানি পাচ্ছে ৮০ ভাগ এবং গ্যাস উত্তোলন-উৎপাদন-বিপনণের খরচ অর্থাৎ কস্ট রিকোভারি বাংলাদেশ সরকারকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী অবশ্য তাদের অংশের ৮০ ভাগ গ্যাস বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য। আর তাই দেখা যায় পেট্টোবাংলার কাছ থেকে সরকার প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস মাত্র ৭ টাকা ধরে কিনছে, সেখানে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে ওই পরিমাণ গ্যাস অর্থাৎ প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস সাড়ে ৩ ইউএস ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশী মুদ্রায় ২৪৫ টাকা ধরে কিনতে হচ্ছে। এতে করে তাদের অংশের গ্যাস পেট্টোবাংলার তুলনায় ৩৫ গুণ বেশি দামে কিনতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়াও বিদেশী কোম্পানী কর্তৃক গ্যাসত্রে উন্নয়ন-উত্তোলন-বিপণনসহ যাবতীয় খরচ কস্ট রিকোভারি হিসেবে দেখিয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে আদায় করা হয়। ফলে এ ধরনের বিদেশী বিনিয়োগ নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য আত্মঘাতি। সঙ্গতকারণেই উল্লেখ্য যে, ১৮৭২ সালের চুক্তি আইনে এ ধরনের জাতীয়স্বার্থ ও গণনীতি বিরুদ্ধ চুক্তি বাতিলযোগ্য। জাতীয় ও গণস্বার্থ বিরোধী 'উৎপাদন অংশীদারী চুক্তি-পিএসসি' বিগত দলীয় সরকার সমূহের দুর্নীতির ফসল; সুতরাং বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানকালে এসব জাতীয় ও গণস্বার্থ বিরোধী 'উৎপাদন অংশীদারী চুক্তি-পিএসসি' বাতিল করা সময়ের দাবী।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বা অনুমতিও যে শর্তসাপেক্ষে দেওয়া হয় তার প্রায় সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই কোম্পানিটি নিজেদের জরিপ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বন বিভাগের 'নিসর্গ সহায়তা প্রকল্প'-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কথা ছিল লাউয়াছড়ার সংরক্ষিত এলাকায় কোনো যানবাহন চলাচল করবে না, কোনো ভারি যন্ত্রপাতি নেওয়া যাবে না। কিন্তু ভারি যন্ত্রপাতি সেখানে নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো বহন করার জন্য ভারি যানবাহনও ব্যবহার করা হয়েছে। ২৫০ জনের মতো লোক জরিপ কাজে নিযুক্ত আছে এবং বিস্ফোরণের জন্য জমিতে অন্তত ৪০০ গর্ত করা হয়েছে। ( ডেইলি স্টার ২৮·৪·২০০৮)। আশেপাশের গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, অনুসন্ধানের জন্য লাউয়াছড়া বনের জমিতে অন্তত প্রায় ২৫০০ গর্ত ও ৫ হাজার ডিনামাইট পোতা হয়েছে।
নিসর্গ সাপোর্ট প্রোজেক্ট কমিটির অধ্যাপক রফিক জানিয়েছেন, শেভরনের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, জরিপের সময় পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে জরিপ কাজ চালানো হবে। কিন্তু বাস্তবে সে ধরনের কাউকে সঙ্গে না নিয়ে কোম্পানিটি শুধু নিজেদের লোক নিয়েই জরিপ কাজ চালিয়ে আসছে।
লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনে অসংখ্য প্রজাতির গাছ, পাশুপাখি, কীটপতঙ্গ, সরীসৃপ আছে; যেগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। তাদের রক্ষার জন্যই লাউয়াছড়াকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু যেভাবে এই এলাকায় তেল কোম্পানিগুলোকে ইচ্ছামতো কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং সরকার যেভাবে তাদের অনিয়ম ও যথেচ্ছাচারের প্রতি উদাসীন, তাতে অদূর ভবিষ্যতেই এ সংরক্ষিত এলাকাটিতে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
২৫ ও ২৬ এপ্রিল লাউয়াছড়া বনভূমিতে ত্রিমাত্রিক জরিপ কাজ চালাতে গিয়ে যে ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড চালানো হয়েছে, তার সবকিছু অস্বীকার করে শেভরনের পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বলা হয়েছে, 'জঙ্গলে যে আগুন লেগেছে তার সঙ্গে শেভরনের জরিপ কাজের সম্পর্ক থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কী কারণে আগুন লেগেছে সেটাও নির্ধারণ করা হয়নি।' শত কান্ড করার পরও তারা বলেছে, 'জনগণ, বন্যপ্রাণী এবং বনের গাছপালা, জীবজন্তুর নিরাপত্তা শেভরনের অগ্রাধিকারের অন্তর্ভুক্ত।' তাদের কথা অনুযায়ী জরিপ কাজের কোনো তিকর প্রভাবই সংরক্ষিত এলাকার কোনো জায়গাতেই পড়েনি। ২৭ তারিখে পেট্রোবাংলা এ ব্যাপারে তদন্তের জন্য তাদের এক জেনারেল ম্যানেজারকে সেখানে পাঠিয়েছে। (ডেইলি স্টার ২৮·৪·২০০৮)।
বাংলাদেশ সবরকম অনিয়ম, দস্যুপনা আর লুণ্ঠনের অভয়ারণ্য। কাজেই এসব লুটেরা দস্যুদের দ্বারা বাংলাদেশের সবকিছুই দীর্ঘদিন ধরে আক্রান্ত আর লুণ্ঠিত। এই আক্রমণ আর লুণ্ঠন এখনো একইভাবে এবং অপ্রতিহত গতিতে চলছে। তবে আগের পরিস্থিতির সঙ্গে এদিক দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির তফাৎ আছে। আগে এ ধরনের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, লুণ্ঠন আর দস্যুবৃত্তির বিরুদ্ধে মানুষ যেভাবে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে পারতো, এখন তারও উপায় নেই। সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে; কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণ কোনো প্রতিবাদে নামলে পুলিশ ও র‌্যাব তাদের লাঠিপেঠা আর নির্যাতন করছে।
লাউয়াছড়ায় মার্কিন তেল কোম্পানি জরিপের নামে দেশের প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি করছে, এটা দেশীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে ক্ষমার অযোগ্য এক বড় অপরাধ। ক্ষমার অযোগ্য এই অপরাধের শাস্তিবিধান কে করবে? সরকারের পক্ষে তা নাকি সম্ভবই নয়। অথচ স্থানীয় জনগণ অথবা ঢাকা ও অন্যত্র জনগণ যদি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের চেষ্টা করলে সেটা এখন সরকারের কাছে এক মহা অপরাধ। এখানে উল্লেখ্য যে, এ ক্ষেত্রে শেভরনের অপরাধটা 'অপরাধ' হিসেবে গণ্য হবে না অর্থাৎ তাদের জন্য সাতখুন মাফ। অনিয়ম, দুর্নীতি, লুণ্ঠন আর দস্যুবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হলে যে অপরাধ জনগণের হবে, সেটা সরকারের কাছে মাফ নেই। প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে জনগণ যদি মিটিং-মিছিলের চেষ্টা করেন তাহলে হেয় প্রতিপন্ন করাসহ পুলিশের লাঠি ও র‌্যাবের কাঁদানে গ্যাস নিক্ষিপ্ত হবে। আন্দোলন জোরদার বা পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হলে গুলিও চলতে পারে।
পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সুরা আজ সারাবিশ্বে এক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হলেও জাতিসংঘও সমস্যাটিকে গুরুত্ব দিয়ে নানা প্রকার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে জনমনে প্রশ্ন, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষায় বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী ও সরকারের ভূমিকা নাই কেন? এ পরিস্থিতিতে খাল-বিল-নদী-নালা-ছড়া, শব্দ ও হাওর-বাওরের দূষণ বাংলাদেশে যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে তার তুলনা দুনিয়ার আর কোথাও আছে কি? খোদ ঢাকা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ, শীতল্যা ইত্যাদি নদ-নদীর দূষণ এখন এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট সৃষ্টির ক্ষেত্রে এ দূষণ একটা বড় কারণ। এছাড়া এ দূষণের ফলে নানাভাবেই মানুষের স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার দু'ধার ভূমিদস্যুদের দ্বারা নিয়মিতভাবে দখল হয়ে তার প্রস্ত সংকুচিত ও প্রবাহ ধীরগতি হয়ে নদীটিকে এখন মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশে যেভাবে খাল-বিল-নদী-নালা-ছড়া ও হাওর-বাওর পর্যন্ত ভূমিদস্যুদের দ্বারা দখল হচ্ছে, এর দৃষ্টান্ত বিশ্বের অন্য কোথাও নেই। যেহেতু সরকার, সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকজন, তাদের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনই এ কাজ করে এবং এর সঙ্গে দুর্নীতি অবিচ্ছিন্নভাবে সম্পর্কিত, সেহেতু এ প্রক্রিয়া বন্ধ করা কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাকারী বর্তমান সরকারের অবস্থা এদিক দিয়ে আগের সরকারগুলোর থেকে ভিন্ন কিছু নয়।
শুধু লাউয়াছড়ার সংরক্ষিত বন এলাকাতেই নয়; সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, মধুপুর এবং অন্য অনেক অঞ্চলে দস্যুরা গাছপালা উজাড় করছে। বন বিভাগের কর্তাব্যক্তিরাসহ সংশ্লিষ্ট লোকেরা কীভাবে ও কত বড় আকারে এটা করছে তা কিছুদিন আগেই কিছুসংখ্যক উচ্চপর্যায়ের বন কর্মকর্তার দুর্নীতির খতিয়ান বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এই ধরনের কিছু লোককে গ্রেফতার করা হলেও দস্যুতা ও লুণ্ঠনের যে প্রক্রিয়া এভাবে চলছে, তা বন্ধ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হয় নি। এই মর্মে অনেক রিপোর্টও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে।
জনগণকে সঙ্গে না নিয়ে কোনো সরকারের পক্ষে দেশি-বিদেশি এসব অনিয়ম, লুণ্ঠন আর দস্যুতার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা সফল হবে না। ফলে অনিয়ম, লুণ্ঠন, দস্যুতা ও দুর্নীতি বন্ধ করা আদৌ সম্ভব হবে না। আর এটা সম্ভব না হলে, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০০৮ রাত ৮:৫৪
১৯টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×