বাংলাদেশের চা শিল্প ও চা শ্রমিকরা হুমকীর মুখে। প্রতিকার কী?
( ধারাবাহিক-৬ )
-সৈয়দ আমিরুজ্জামান
অবিভক্ত ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশে চা শিল্পের বিকাশঃ
বর্তমান বাংলাদেশের চা বাগান এলাকা সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে উত্তর-পূর্ব ভারতীয় চায়ের একটি অংশ ছিল।
এক সময় অনেকের ধারণা ছিল যে, চীন ও জাপান ছাড়া পৃথিবীর আর অন্য কোথাও চা উৎপাদন সম্ভব হবে না। অবিভক্ত ভারতবর্ষে চা শিল্পের বিকাশ এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এর পেছনে জড়িত ছিলেন আসামের আদিবাসী সম্প্রদায় বা জাতিগোষ্ঠি। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের শুরুতেই অবিভক্ত ভারতবর্ষে ব্যবসায়িক পুঁজির বিকাশ ও মুনাফার স্বার্থেই চা শিল্প-সংস্কৃতির বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা। ১৭৮০ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ক্যাপ্টেন লে. কিড চীন থেকে বীজ এনে কলকাতার শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে সর্বপ্রথম বপন করেন। এরফলে ১৭৮৮ সালে স্যার যোশেফ ব্যাংক ভারতবর্ষে চা আবাদের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৮১৫ সালে আসাম বিষয়ক প্রতিবেদনে কারলেন লেটার উল্লেখ করেছিলেন যে, 'আসামের সিংকো উপজাতিদের মধ্যে চা পানের অভ্যাস আছে।' অবশেষে ১৮৩৪ সালে তৎকালিন ভারতের গভর্ণর জেনারেল স্যার উইলিয়াম বেন্টিং ভারতবর্ষে চা আবাদের ও বাণিজ্যিক মুনাফার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখার জন্য প্রথম কার্যকরী কমিটি গঠন করেন। ১৮৩৬ সালে সিএ ব্রুস আসামে চা পাতা থেকে তৈরী চায়ের কিছু নমুনা কলকাতায় পরীক্ষার জন্য পাঠান। পরীক্ষার পর প্রতিবেদনে বলা হল, 'বেশ ভালো।' ১৮৩৭ সালে আসামের চা পাতা থেকে পর্যাপ্ত চা তৈরী করে ভারতের গভর্ণর জেনারেল-এর কাছে পাঠানো হয়। এর গুণাগুণ-মান দেখে তিনি খুশী হয়ে মন্তব্য করলেন যে, এগুলো রপ্তানীযোগ্য। এ চায়ের উপর মন্তব্যের জন্য টি কমিটি ১৮৩৮ সালের মার্চে ১২ বাক্স আসাম চা যুক্তরাজ্যের লন্ডনে পাঠানো হয়। এতে মন্তব্য আসে, 'অতি চমৎকার।' এ ফলাফলে চা শিল্পের বিকাশে এক নতুন দিঘন্ত উন্মোচন করলো। এতদিন অনেকের ধারণা ছিল যে, চীন দেশের চা গাছ থেকেই কেবলমাত্র চা উৎপাদন সম্ভব। আসাম চায়ের উৎপাদনের পর এ ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটতে থাকে। কারণ গুণে-মানে ও উৎপাদনের দিক থেকে আসাম চা ছিল অনেক ভালো। ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস-এর সাথে চায়ের আরেকটি নতুন প্রজাতি হিসেবে যুক্ত হলো- 'ক্যামেলিয়া আসামিকা।' এই সিএ ব্রুসকেই চা আবাদের জনক বলা যায়। সিএ ব্রুস-এর পুরস্কার স্বরূপ তাকে চা বাগানসমূহের অধিক্ষক নিয়োগ করা হয়। তিনি চীনা চায়ের পাশাপাশি আসাম চা উৎপাদন শুরু করেন। তাতে দেখা গেল আসাম চা উৎপাদন লাভজনক। এরপর আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চা আবাদ শুরু হলো। এ ছাড়া অনুসন্ধান চলতে থাকলো বুনো চা গাছ ও চা উৎপাদন এলাকার। এরফলে সিলেটের জৈন্তা ও খাসি হিলস / পাহাড়ে প্রচুর বুনো চা গাছের সন্ধান পাওয়া গেল।
অবিভক্ত ভারতের উনবিংশ শতাব্দির ক্রান্তিলগ্নে চা শিল্পের বিকাশে বৃটিশ মালিকানায় অনেকগুলো বেনিয়া লিমিটেড কোম্পানীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। '৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর শুরু থেকেই উত্তর-পূর্ব ভারতীয় অঞ্চলের চা ও বাংলাদেশের চা আলাদাভাবেই বিকশিত হতে থাকে।
আজ থেকে ১৬৮ বছর আগে ১৮৪০ সালে বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রামে প্রথম চা আবাদের উদ্যোগে নেয়া হয়। চট্টগ্রাম ডিষ্ট্রিক্ট কালেক্টর মিঃ স্কন্স কিছু আসাম চা বীজ ও কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে চীনা চায়ের চারা সংগ্রহ করে চাষ করার চেষ্টা করেন। এরপর মিঃ হুগ ব্যাক্তিগতভাবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে কোদালায় বাগান তৈরী করে চা আবাদ শুরু করেন। ১৮৪৩ সালে সর্বপ্রথম চট্টগ্রামে এই পাতা থেকে চা তৈরী করা হয়। আজ থেকে ১৫৪ বছর আগে ১৮৫৪ সালে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম সিলেটের মালনিছড়ায় চা বাগান প্রতিষ্ঠা ও চা উৎপাদনের সূত্রপাত ঘটে। এরপর ১৪৮ বছর আগে ১৮৬০ সালে মৌলভীবাজার জেলার মিরতিঙ্গা ও হবিগঞ্জ জেলার লালচান্দ চা বাগান প্রতিষ্ঠা ও উৎপাদনের শুরু হয়। তারপর ১২৮ বছর আগে ১৮৮০ সালে শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা উপত্যকায় বাগান প্রতিষ্ঠা ও চা আবাদ শুরু করা হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, নাগরিক সুবিধাবিহীন, বিদ্যুতবিহীন এ বাংলার জনপদে সস্তা শ্রমের সুযোগ পেয়ে বৃটিশ পুঁজিপতিদের শোষণ-লুণ্ঠন-মুনাফা তথা বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের অদম্য ইচ্ছা, অদম্য সাহস, উৎসাহ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে সবুজ নিসর্গ 'চা বাগান'। চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হবার পর দ্রুত বদলে যেতে থাকে এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থা। চা আজ একটি আন্তর্জাতিক পণ্য, পুঁজি ও শ্রমঘন এবং দীর্ঘমেয়াদী কৃষিভিত্তিক শিল্প। চা দেশের জিডিপি'র প্রায় ০·২২ শতাংশ অবদান রাখছে। জাতীয় অর্থনীতিতে চা শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম ও সুদূরপ্রসারী।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মে, ২০০৮ দুপুর ১:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



