জাতীয় বাজেট ও কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ
-সৈয়দ আমিরুজ্জামান
জুন মাস বাজেটের মাস। এই মাস আসা মাত্রই বাজেট উত্থাপনের আগে পরে এ নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠে। বর্তমান অনির্বাচিত সরকার ২০০৮-০৯ অর্থ বছরের জন্য ৯৯ হাজার ৫শ' কোটি টাকার এক গতানুগতিক বাজেট ঘোষণা করবেন। বাজেটে রাজস্ব ব্যয় ধরা হবে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) বা উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ হবে ২৫ হাজার ৫শ' কোটি টাকা। সামগ্রিক ঘাটতি ২১ হাজার কোটি টাকার ৬০ ভাগ স্থানীয় এবং ৪০ শতাংশ বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে অর্থায়ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কৃষিতে বড় ধরনের ভর্তুকির কথা বলা হয়েছে। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। গত অর্থ বছরে এ খাতে ভর্তুকি রাখা হয়, ২ হাজার ২শ' কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা ৩ হাজার ৯শ' কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। দেশের মোট রফতানিতে কৃষিপণ্যের অবদান ৭·৩৪ শতাংশ। বিগত অর্থ বছরে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ছিল ২১·১১ শতাংশ। সর্বোচ্চ ভর্তুকি আর বরাদ্দের কথা বলা হলেও দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার অগ্রগতির জন্য যতো না তার চেয়ে আগামী অর্থবছরে সরকারি ঠাটবাট কিভাবে কতটুকু বজায় রাখা যায় তার ব্যবস্থাপত্র উপস্থাপন করা হবে বলে সহজে অনুমেয়। যদিও কৃষি উৎপাদন, কৃষিপণ্য রফতানি, থাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি গবেষণাসহ গোটা কৃষি খাতে দ্বিগুণ বরাদ্দ আর সার, ডিজেল ও বীজ এই ৩টি খাতে ভর্তুকি বর্তমান অর্থ বছরের তুলনায় দ্বিগুণ করার কথা বলা হয়েছে। দাতা সংস্থার উপর নির্ভর করে তৈরি এই ব্যবস্থাপত্রে কতটুকু গণস্বার্থ ও জাতীয়স্বার্থ রক্ষিত হবে এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে সাধারণভাবে এক কথায় বলা যায়, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ ও নির্দেশনার উপর নির্ভর করে তৈরি এই বাজেট দিয়ে যে প্রকৃত গণস্বার্থ ও জাতীয়স্বার্থ রক্ষিত হবে না, তা বলাই বাহুল্য। এটা মেনে চলা যাবে কি না, সেই প্রশ্নও থেকে যায়। দাতারা টাকা দিলে কাজ হবে, না হয় পরিকল্পনা ছাঁটাই করা হবে। আর শর্ত হিসেবে যখন যেটা বলবে সেটা শুনতে হবে। জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম বাড়াও, এটা কর, সেটা করো আর না হয় ঋণ পাওয়া যাবে না। ফলে প্রতি বছরের ন্যায় জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে, বাড়ানো হবে গাড়ি ভাড়া, বাড়ি ভাড়া, নিত্যনৈমেত্তিক জিনিসের দাম। ফলে দেখা যাবে যে, বাজেটে এক ধরনের কর ও মূল্য পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেট পাস হওয়ার ক'দিন পর দেখা যাবে যে, আবার সরকারি নির্দেশের মাধ্যমে দফায় দফায় বিভিন্ন জিনিসের দাম বৃদ্ধি করা হবে। সুতরাং এ ধরনের বাজেট থেকে জনগণ উপকৃত হয় না এবং কোনো দিক নির্দেশনাও পায় না। এ ধরনের বাজেটে সাম্রাজ্যবাদ, বিদেশি বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি বা কর্পোরেশন, সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর আমলা মুৎসুদ্দী বুর্জোয়া-লুটেরা ধনিক-বণিক শ্রেণীর লোকজনের ও তাদের প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ যতটা দেখা হয়, ততটা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক-খেতমজুর-শ্রমিক-নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তসহ সাধারণ মানুষের স্বার্থ ততটা দেখা হয় না। দেশের সরকার যতোদিন বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের মতো সংস্থার পরামর্শে চলবে এবং দেশকে বিদেশি ঋণ নির্ভর করে রাখবে ততোদিন এ ধরনের কর্মকান্ড চলতেই থাকবে।
সরকার এ বছর কৃষি ক্ষেত্রে বিরাট সাফল্যের দাবি করছে। এবার অর্থ ও প্রধান উপদেষ্টা বড় অংকের কৃষি বাজেটের কথা বলছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিগত দিনগুলোতে কৃষিতে যে কয় টাকা বরাদ্দ বা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে সেটা কি যথেষ্ট ছিল? ওই টাকা খোদ কৃষক-খেতমজুররা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কতটুকু পেয়েছে? তাছাড়া চলতি সরকার কৃষকদের জন্য যতোটুকু সহায়তা ঘোষণা করেছিল তা কি কৃষক পেয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ার মধ্যে কি কোনোরকম দুর্নীতি আর অনিয়ম হয়নি? সরকারের কৃষি ও অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সরকার কি এসব পর্যালোচনা করেছেন? তাছাড়া পরামর্শ ও দিক নির্দেশনার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ কৃষক-খেতমজুর সংগঠনগুলোর সাথে বসে আলাপ-আলোচনার কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করছি না।
আমি যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো উল্লেখ করছি এবং এই আঙ্গিকে বাজেটে কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ করলে কৃষক-খেতমজুররা উপকার পাবে। আমি মনে করি যে কোনো বিষয় নির্ধারণের আগে তা পূর্ণাঙ্গভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। সেটা না করে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু করলে তাতে সামগ্রিকভাবে বিষয়টি অগ্রসর হয় না।
কৃষির জন্য যা যা প্রয়োজন তা আগে নির্ধারণ করতে হবে। যেমন সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ব্যবস্থা এগুলো ছাড়া কোনো কৃষি হবে না। এগুলোর চাহিদা অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা এবং এগুলো কৃষকের কাছে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। বিগত প্রায় বিশ বছর হলো এই উপকরণে সামান্য অংশ সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়। বেশিটাই ব্যক্তি মালিকদের মাধ্যমে হচ্ছে- ডিলারদের মাধ্যমে হচ্ছে।
আর এ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি মালিকদের অতি মুনাফার লোভে বাড়ছে ভেজাল। ভেজাল বীজ, ভেজাল সার, ভেজাল কীটনাশক। এতে উৎপাদন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবারেও বহু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডিজেল ও সারের ভর্তুকির টাকা বিতরণে দুর্নীতি হয়েছে। ব্যাংক সুপারভাইজার ও স্থানীয় প্রশাসন মিলে একাজ করেছে। এ ক্ষেত্রে কৃষক-খেতমজুর সংগঠনগুলো কিছু করতে পারলো না। কিছু করতে গেলেই নাকি জরুরি অবস্থা আর পুলিশের বাধা। সাধারণ কৃষক কিন্তু আন্দোলন করেছে। আর কৃষক-খেতমজুর সংগঠনগুলো শুধুমাত্র স্থানীয় প্রশাসনকে ডেপুটেশন দিয়েছে। তবুও সরকার কথা শুনে নি।
এখন পর্যন্ত যেটা লক্ষ্য করা যায় সেটা হলো কৃষিক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃষিতে ভর্তুকিসহ বিএডিসি সংকুচিত করে ফেলা, সেচ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেয়া প্রভৃতি পদক্ষেপ কৃষি ব্যবস্থাকে সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সন্দেহ নাই। আজ এই দূরাবস্থা দূর করতে হলে বিএডিসিকে তার অতীতের পূর্ণ অবয়বে চালু করা দরকার। সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচ বিএডিসি'র মাধ্যমে করা জরুরী হয়ে পড়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কৃষি সম্প্রসারণের নামে যে সকল কর্মকান্ড করতো সেগুলো ফের চালু করা দরকার। কৃষি গবেষণার ওপর গুরুত্ব প্রদান এবং এ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা কেন্দ্রে'র বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যেই উন্নত জাতের উফসি ধানসহ নানা ধরনের ধান উৎপাদন করে তাদের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তারা প্রমাণ করেছেন পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর তুলনায় তারা কোনো অংশেই কম নন। হাইব্রিড ও জিএম ফুডসহ বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির কৃষিপণ্যের প্রতি না ঝুঁকে দেশের কৃতী সন্তানদের কৃতিত্বকে স্বীকৃতি ও সম্মান দিয়ে এবং তাদের প্রতিভাকে দেশের কল্যাণে বিকাশের সুযোগ করে দিতে বাজেটে যে কোনো মূল্যে কৃষি গবেষণার জন্য মোটা অংকের অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।
আর বর্তমানে বাজার ব্যবস্থা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। কৃষকেরা কোনো ফসলের ন্যায্য দাম পায় না। এমনকি কৃষক ফসলের যে দাম পায়, তাতে তার উৎপাদন খরচও উঠে না। এখানে মধ্যসত্ত্বভোগীরাই লাভবান হয়। এটা দূর করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেয়া উচিত।
গ্রামের প্রতিটি হাটে মনিটরিংসহ সরকারি ক্রয়কেন্দ্র খোলার পদক্ষেপ গ্রহণ অথবা সুবিধামতো জায়গায় সরকারি উদ্যোগে বাজার বসাতে হবে। বগুড়া জেলায় সেনা প্রধানের নেতৃত্বে একটি সরকারি বাজার হয়েছে। তাতে কৃষক লাভবান হচ্ছে। একইভাবে সারা দেশে এ ধরনের বাজার গড়ে তোলা এবং শাক-সবজি আর শস্য দানা অর্থাৎ চাল, গম, আলুসহ যে কোনো ফসল সংরক্ষিত করার জন্য কোল্ড স্টোরেজ এবং বড় বড় এলএসডি গোডাউন বানানো দরকার। এরপর বিক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থা। বর্তমান সরকার হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে যে সমস্ত বাজার ব্যবস্থা ব্যক্তি মালিকদের কাছে ছেড়ে দিলে কি অবস্থার সৃষ্টি হয়! শেষ পর্যন্ত বিডিআরের মাধ্যমে ওএমএস ব্যবস্থায় চাল, চিনি ইত্যাদি বিক্রি করা হচ্ছে। তাও কোনো কিনারা করতে পারছেন না। বিশ্ব বাজারে মূল্যবৃদ্ধি দেখিয়ে তো আপনারা পার পাবেন না। উন্নত বিশ্বে ক্রেতা-ভোক্তাদের মূল্যবৃদ্ধির জন্য ভাতা দিচ্ছে। খোদ আমেরিকায় ১০ কোটি লোককে মাসে ৬শ' ডলার করে দিচ্ছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হওয়া দরকার অথচ সরকার কিছুই করেনি। রেশনের কথা উঠেছিল বিশ্বব্যাংক নিষেধ করেছে। এখন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সরকার বিশ্বব্যাংকের কথা শুনবে না জনগণের কথা শুনবে। আমাদের মতো গরিব দেশে গ্রাম থেকে আরম্ভ করে শহর পর্যন্ত রেশনের ব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্যের দোকান থাকতে হবে। জনগণের আয়ের সংস্থান গড়ে তুলতে হবে।
সকল বিষয় বৃহত্তর জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে কৃষির জন্য বাজেটে বরাদ্দ নির্ধারণ করতে হবে। এটাই সরকারের জরুরি বিষয়। অতীত সরকারের মতো মিগ, ফ্রিগেড আর অস্ত্রশস্ত্র কেনার খাতে বেশি বরাদ্দ না দিয়ে উৎপাদন খাতে বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদন অর্থাৎ কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দিয়ে খাদ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে খাদ্য ব্যবস্থাপনায় মৌসুমি মজুদ রাখা দরকার। এ জন্য বছরের ৪টি সময়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে খাদ্যশস্য সংগ্রহ বাবদ ৯ হাজার ৫শ' ২০ কোটি বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করেছেন । দেশের আমলা মুৎসুদ্দী বুর্জোয়া-লুটেরা ধনিক-বনিক ও সুবিধা ভোগী শ্রেণীর ভোগ বিলাস কমানোর ব্যবস্থা করুন। ভোগ ও বিলাস সামগ্রী এবং দামি গাড়ি আমদানি বন্ধ করুন। জ্বালানি তেলের জন্য ঋণের টাকা খরচ বন্ধ করুন। দেশের কৃষি বাঁচান, কৃষক ও খেতমজুর বাঁচান। দেশকে খাদ্যে স্বনির্ভর করুন। এটাই এই অর্থ বছরের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



